একটি দাঁতের জন্যে – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

একটি দাঁতের জন্যে

[এই গল্পের কতটা ঐতিহাসিক সত্য আর কতটা কল্পনা তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব পাঠকদের। যদিও না খুঁজতে চাইলেও অসুবিধে নেই।]

সাল ১৯২০, স্থান ‘মিশরের ভ্যালি অফ দ্য কিংস’। খননকার্য চালাচ্ছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার। রাজা তুতেনখামুনের মমি খুঁজে পেতে তাঁর এখনও দু-বছর দেরি আছে। কার্টার আসলে খুঁজছেন অন্য একজনের শবাধার।

যাঁরা মিশর ও মিশরের হায়রোগ্লিফ নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের সবাই মাঝে মাঝেই একটা নামের উল্লেখ পেয়েছেন বিভিন্ন প্রাচীন পিরামিডের লিপিতে- ‘হাতসেপসুত’! প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, ‘সবচেয়ে অভিজাত নারী’। কিন্তু, তিনি কে? তিনি কি কোনো রানি ছিলেন? এর উত্তর কারুর জানা নেই।

কী কারণে যেন তাঁর ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। তবুও পিরামিডের দেয়ালে বা প্রাচীন কিছু পাপাইরাসের লেখায় বার বার এই নারীর নামটা উঠে আসে। মিশরীয়দের মধ্যে লোকশ্রুতি আছে যে, এই নারী নাকি পুরুষের বেশে শাসন করতেন রাজ্য। কিন্তু এর কি সত্যিই বাস্তব ভিত্তি আছে? নাকি সব কিছু শুধুই গল্পকাহিনি মাত্র?

হয়তো এইবার তার প্রমাণ হবে। কারণ, কার্টার এখন যেখানে খনন করছেন, সেটা হাতসেপসুতের সমাধিক্ষেত্র। আজ যদি তাঁর মমি খুঁজে পাওয়া যায়, তবে এটা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার।

বেশ কয়েক দিনের চেষ্টার পর রাজসমাধিগৃহ আবিষ্কার হল। হ্যাঁ, ওই তো, দুটো শবাধার রয়েছে তাতে। কার্টার এগিয়ে গিয়ে কফিন দুটোর ওপরের লিপি পাঠ করে উত্তেজনায় ফেটে পড়লেন। কারণ, একটা শবাধারের ওপর লেখা আছে সেই কাঙ্ক্ষিত নামটি— হাতসেপসুত! আর দ্বিতীয় শবাধারটা রাজা দ্বিতীয় থুতমোসের।

কিন্তু, তাঁদের এই উত্তেজনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। কারণ, কফিনের সেই বহুযুগ আগে বন্ধ করে দেওয়া ঢাকনা দুটো সরাতেই দেখা গেল, দুটো শবাধারই খালি!

তবে, একটা জিনিস পাওয়া গেল সেখানে। রত্নখচিত একটা ছোট্ট বক্সে রানি হাতসেপসুতের একটা দাঁত। কিন্তু, দেহ না পেলে যে কিছুই প্রমাণ হয় না। তবে কি হারিয়ে যাবে মানব ইতিহাস থেকে ‘হাতসেপসুত’-এর নাম? কেন তাঁকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল তাঁর উত্তরসূরি?

.

মিশর, ৩০০০ বছর আগে।

‘হোরাসের কৃপা আপনার ওপর সর্বদা বজায় থাক, মহারানি।’

‘সেনেনমুত। আসুন, মহামতি।’

রানির রাজকক্ষে প্রবেশ করলেন সেনেনমুত। মুখে তাঁর প্রাজ্ঞতার ছাপ। তিনি আজকে সকালেই দেখেছেন যে, রানি কী কারণে যেন বিচলিত হয়ে আছেন। তিনি জানতেন রানি তাঁকে ডাকবেনই। আরও একবার অভিবাদন জানিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

‘আমায় ডেকেছেন রানি?’

‘হ্যাঁ। আমায় একটা কথার উত্তর দিন, সেনেনমুত। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, স্বপ্ন মানুষকে আসন্ন ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেয়?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহারানি হাতসেপসুতের বিশ্বস্ত প্রধানমন্ত্রী সেনেনমুত বললেন,

‘আমি শুধু মনে করি যে, আমাদের জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে। কিন্তু, হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন রানি?’

রানি হাতসেপসুতের মুখে ছায়া নামল। বললেন,

‘কাল রাতে আমি দুঃস্বপ্ন দেখেছি, মহামতি। আমি দেখলাম যে, আমার মূর্তি ভেঙে পড়ছে। আমার নাম ধীরে ধীরে পিরামিডের গা থেকে মুছে যাচ্ছে। এটা অশুভ লক্ষণ মহামতি। আমি জানতে চাই এই ঘটনা কি সত্যি ভবিষ্যতের পূর্বাভাস?’

একটু ভেবে মন্ত্রী বললেন,

‘আপনি কী করতে চান রানি? আমার মনে হচ্ছে আপনি ইতিমধ্যেই ভেবে রেখেছেন যে করণীয় কী।’

রানি গম্ভীর মুখে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন,

‘এই নীলনদের দেশে একজনই আছে যে নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যৎ বলতে পারে। আমি চাই আপনি তাকে এখানে নিয়ে আসুন।’

সেনেনমুত এই কথায় চমকে উঠলেন। উত্তেজিত হয়ে বললেন,

‘এ আপনি কী বলছেন, মহারানি? না! কখনো না। ওই শয়তান পুত্ৰ বৃদ্ধ জাদুকরকে আমরা বিতাড়িত করেছি। সে সর্বনাশ ছাড়া কিছুই ডেকে আনে না।’

‘কিন্তু, তার অতিলৌকিক শক্তি সম্বন্ধে কি কোনো সন্দেহ আছে?’

‘কিন্তু, রানি…’

‘আর কোনো উপায়ও তো নেই, সেনেনমুত। আপনি তাকে নিয়ে আসুন। জাদুকর আপেপমসকে আমার চাই।’

.

শতচ্ছিন্ন নোংরা একটা কাপড়ের টুকরো গায়ে জড়িয়ে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে রানি হাতসেপসুতের রাজসভায়। স্বর্ণখচিত এই প্রাসাদের মাঝে এই ব্যক্তি সম্পূর্ণ বেমানান। এই মুহূর্তে এই বৃদ্ধ ছাড়াও উপস্থিত শুধু রানি নিজে এবং প্রধানমন্ত্রী সেনেনমুত। এই কদাকার বৃদ্ধ বিশ্রীভাবে মিটমিট হাসছে রানির দিকে তাকিয়ে। অসম্ভব বিরক্তিতে সেনেনমুতের ভ্রূ কুঁচকে আছে।

এই অদ্ভুত বৃদ্ধর আসল নাম লোকে ভুলে গেছে। প্রচলিত নামটা আসলে তার নিজেরই নিজেকে দেওয়া নাম বা উপাধি বিশেষ। আপেপমস, যার আক্ষরিক অর্থ হল শয়তান আপেপের পুত্র। মহানাগরূপী শয়তান আপেপকে নিজের বাবা বলে দাবি করা এই ব্যক্তি একজন মহা শক্তিশালী কালো জাদুকর। আপেপের পুজো কখনোই মেনে নিতে পারেনি সেই দেশের মানুষ, ইগলরূপী হোরাস যাদের ইষ্টদেবতা। ইগল ও নাগ তো বরাবরই শত্রু, তাই না?

অন্য কেউ হলে, নিজেকে শয়তানের পুত্র দাবি করার অপরাধে তাকে তৎক্ষণাৎ প্রাণদণ্ড দেওয়া হত নিঃসন্দেহে। কিন্তু, আপেপমসকে শুধুমাত্র রাজ্যের সীমানা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। তার প্রতি এই দয়াশীল ব্যবহারের কারণ যদিও ফারাও স্বীকার করেননি কোনোদিন। কিন্তু, সত্যটা সকলেই জানে যে, আসলে মহা শক্তিশালী রাজারাজড়াও ভয় পায় তার অভিশাপকে। তার জাদুশক্তি আর আশ্চর্য ক্ষমতার কথা সবাই জানে। বহুবার সে তার অতিলৌকিক ক্ষমতা আর ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হওয়ার পরিচয় দিয়েছে। আজ রানি তাকে আবার গোপনে ফিরিয়ে এনেছেন।

রানি হাতসেপসুত প্রশ্ন করলেন, ‘আপেপমস, তুমি কি সত্যিই ভবিষ্যৎ দেখতে পাও?’

‘ভূত-বর্তমান-ভবিষ্য এগুলো তুচ্ছ মানুষদের কাছে আলাদা হলেও আমার কাছে এর কোনো পার্থক্য নেই।’

‘হেঁয়ালিতে কথা বোলো না জাদুকর। সোজা উত্তর দাও, তুমি কি মানুষের ভবিষ্যৎ সত্যিই বলে দিতে পারো?’

‘কেন রানি? রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে চিন্তিত নাকি? হে হে হে হে।’

আবারও বিচ্ছিরিভাবে হেসে উঠল নোংরা বৃদ্ধ। চকিত হয়ে হাতসেপসুত তাকাল সেনেনমুতের দিকে। ভ্রূ আরও খানিকটা কুঁচকে গেল মন্ত্রীর। রানির মনের প্রশ্ন অনুমান করতে পেরেই ঘাড় নেড়ে তিনি রানিকে বুঝিয়ে দিলেন যে, না, তিনি আপেপমসকে দুঃস্বপ্নের ব্যাপারে কিছুই বলেননি। তবু কোনো অলৌকিক উপায়ে জাদুকর সেই কথা জেনে গেছে।

হাতসেপসুত জাদুকরের দিকে ফিরে বললেন,

‘তুমি যদি এতই শক্তিশালী হও, তবে বলো জাদুকর, কী আমার ভবিষ্যৎ? ইতিহাস কি আমায় মনে রাখবে?’

‘হা হা হা। আজ তবে নিজেকে স্বয়ং হোরাসের কন্যা বলে দাবি করা মহারানিরও এই নাগপুত্রের প্রয়োজন পড়েছে?’

‘আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, জাদুকর।’

‘বেশ! শোনো তবে, রানি। তোমার পরমপূজ্য দেবতা হোরাসের ক্ষমতা নেই তোমায় ইতিহাসের পাতায় স্থান দেয়ার। তোমার মৃত্যুর কয়েক বছর পরেই তোমার সৎপুত্র তোমার সব স্মৃতি মুছে ফেলবে। তোমার কর্ম, তোমার অবদান সব ভুলিয়ে দেবে তারা। তোমার নাম আর ছবি প্রতিটা পিরামিড থেকে মুছে ফেলা হবে। তোমাকে বিস্মৃত করা হবে। প্রমাণের অভাবে ভবিষ্যতের মানুষ তোমার অস্তিত্ব নিয়েই সংশয়ে পড়বে।’

এই কথায় চোখে জল চলে আসে হাতসেপসুতের। তবে তাঁর দুঃস্বপ্নই সত্যি? ভুলে যাবে মানুষ তাঁকে?

‘কিন্তু কেন? আমি কি কোনো অংশে ফারাওয়ের চেয়ে কম? আমি এত বছর শুধু দেশের উন্নতির স্বার্থে কাজ করে এসেছি। আমি যুদ্ধ করিনি কারুর সঙ্গে বরং বাণিজ্যপথ স্থাপন করেছি ‘পন্ত’-এর সঙ্গে। কর্নাকে এই মন্দির নির্মাণ করেছি। কেউ অস্বীকার করতে পারবে যে, আমার অধীনে গত দশ বছরের শাসনকালে মিশরের শুধুই সার্বিক উন্নতি হয়েছে? আমার সৎপুত্র তো আমায় নিজের মায়ের মতোই সম্মান করে। তবে কেন আমার নাম সে মুছে ফেলতে চাইবে? এ হতে পারে না।’

‘তোমার পুত্রকে অন্যান্য মন্ত্রী আর সভাসদ বাধ্য করবে তোমার নাম মুছে ফেলতে।’

‘কিন্তু কী দোষ আমার?’

‘কারণ তুমি নারী! এটাই সবচেয়ে বড়ো দোষ। তোমার আধিপত্য যারা আজ স্বীকার করেছে বাধ্য হয়ে, তারা ভবিষ্যতে তোমার নাম মুছে ফেলতে চাইবে। তাদের ঠুনকো পৌরুষ কীভাবে মেনে নেবে যে, এক নারী তাদের চেয়ে ভালো শাসক?’

চোখের জল আটকে উঠে দাঁড়ালেন মহারানি…না…ফারাও হাতসেপসুত। দৃঢ় গলায় বললেন,

‘আপেপমস। তোমার ফারাও তোমায় আদেশ করছে, এই ভবিষ্যৎ তোমায় বদলাতে হবে। আমার নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেতে আমি দেব না। তার জন্যে যেকোনো মূল্য দিতে আমি প্রস্তুত। যত সোনা তুমি চাও, তাই পাবে।’

‘হা হা হা। সোনা দিয়ে দাস কেনা যায়। ভবিষ্যৎ নয়। এর মূল্য অনেক বড়ো রানি।’

‘কী মূল্য?’

‘ইতিহাসের মূল্য তোমার জীবন! নিজের আয়ু, নিজের জীবন যদি অর্পণ করতে পারো আপেপের চরণে, তবেই তোমার নাম ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে। নিজের জন্মগত ধর্মবিশ্বাসকে ত্যাগ করতে পারবে, রানি? ত্যাগ দিতে পারবে হোরাসকে?’

‘আমি প্রস্তুত।’

বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়া উত্তর দিলেন রানি। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন সেনেনমুত,

‘মহারানি এ আপনি কী বলছেন?’

‘আমি ঠিকই বলছি, মহামতি। আমি ইতিহাসের পাতা থেকে ভুলে যেতে দেব না হাতসেপসুতের নাম। স্বয়ং রানি ক্লিয়োপেট্রার পরেই আমার নাম, রানি হাতসেপসুতের নাম জানবে লোকে। তারা জানবে যে আমিই সেই রানি যে ‘রাজা’ হয়েছিল। ফারাও হাতসেপসুতের নাম জানবে ভবিষ্যতের মানুষ।’

.

পাঁচ বছর পরের একটা দিন।

মসৃণ সোনার পাতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছেন রানি হাতসেপসুত। তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন তাঁর সময় ঘনিয়ে আসছে। তাঁর শরীর দুর্বল, গাল ভেঙে গেছে, তাঁর শরীরের হাড়ে বাসা বেঁধেছে মারণ কর্কট রোগ। কয়েক বছর আগে জাদুকর আপেপমস যেমন বলে গেছিল, ঠিক তেমনই হচ্ছে। হাতসেপসুতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ হয় আজকাল। রোগের ফলে দাঁত নড়বড়ে, সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা।

আজ তাঁর মাড়ি থেকে আলগা হয়ে প্রথম একটা দাঁত পড়ল।

রানির আদেশে তাঁর সেই দাঁত নিয়ে গেল দাসরা। সেটা সযত্নে একটা রত্নখচিত পাত্রে রেখে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন রানি। তিনি এও আদেশ দিয়েছেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন এই দাঁতসমেত পাত্রটা রাখা হয় তাঁর সমাধিস্থলে।

হাতসেপসুত জানেন যে, তিনি শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। কিন্তু তিনি জানেন না যে, এই যন্ত্রণা সহ্য করার পরেও সত্যিই তাঁর নাম ইতিহাসে থাকবে কি না।

পাঁচ বছর আগের সেই ভয়ংকর রাতে, আপেপমস তাঁকে নিয়ে বসেছিল তার কালো জাদু ক্রিয়ায়। যতই ক্রিয়া এগিয়েছিল ততই দুর্যোগ বাড়তে থাকে। সারা আকাশ জুড়ে বজ্রবিদ্যুৎ। অশুভ কালো মেঘে ঢেকে গেছিল সারা মিশর। গর্জে উঠেছিল নীলনদ।

নিজের হাতে হাতসেপসুতকে দিয়ে দেবতা হোরাসের মূর্তি থেকে তার চোখ ভেঙে বের করতে বাধ্য করেছিল সেই জাদুকর। এটাই ছিল দেবতার প্রতি চরম অপমান। একটা পাত্রে রানির হাত কেটে রক্ত বের করে তা ভোগ চড়িয়েছিল শয়তানের উদ্দেশে। হাতসেপসুতের এখনও মনে আছে, আশ্চর্যজনকভাবেই কোথা থেকে যেন সেই বন্ধ ঘরে একটা কালো কুচকুচে সাপ এসে উপস্থিত হয়। আর আপেপমসের বাড়িয়ে দেওয়া পাত্র থেকে রানির রক্ত পান করে চলে যায় সেই নাগ। বুড়ো জাদুকর বলেছিল এতেই তাঁর আত্মা আর আয়ু উৎসর্গ হয়েছে শয়তান আপেপের কাছে। সাপের রূপে এসে স্বয়ং আপেপ সেই নৈবেদ্য গ্রহণ করে গেছে। সেই ভোগরক্ত জাদুকর রানির সারাশরীরে মাখিয়ে দিয়ে বলেছিল— শয়তানের দীক্ষা সম্পন্ন হল!

এর এক বছরের মধ্যেই রানির শরীর ক্রমশ ভাঙতে থাকে। তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে মারণ রোগ, যার কোনো চিকিৎসা নেই। সেই থেকেই এক যন্ত্রণাদায়ক পথ ধরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন রানি হাতসেপসুত।

আপেপমস বলেছিল, এই ব্যাধিই নাকি রানিকে স্থান করে দেবে ইতিহাসের পাতায়। তাই কি সম্ভব? তাঁর বিশ্বস্ত মন্ত্রী সেনেনমুতের মৃত্যু হয়েছে কয়েক বছর আগেই। তিনি বহুবার বারণ করেছিলেন তাঁকে কালো জাদুকরের কথায় রাজি হতে। আজকে এই জীবনের শেষ ধাপে এসে সেই প্রাজ্ঞ মন্ত্রীর অভাব বড়োই বোধ করছেন রানি হাতসেপসুত।

হঠাৎই দমকা কাশি বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় হাতসেপসুতের। হাত দিয়ে মুখ ঢাকেন তিনি। কাশি থামতে নিজের হাতের দিকে চাইলেন রানি। দেখলেন তাতে রক্ত লেগে আছে।

রানি মনে মনে বুঝলেন যে, আর বেশি দেরি নেই। তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাঁর মৃত্যু আসন্ন।

.

সাল ১৯৮৯, মিশর।

ফোনে কথা হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক ড জাহি হাওয়াস আর ডিস্কভারি নেটওয়ার্কের এক কর্মকর্তার।

‘ড হাওয়াস, ডিস্কভারি চ্যানেলের ডকুমেন্টারির জন্যে কিছু ভেবেছেন? কালকেই কিন্তু আমাদের শুটিং দল কায়রো পৌঁছে যাচ্ছে।’

‘হ্যাঁ। আমি একটা জায়গা ঠিক করেছি যেখানে আমি কাজ শুরু করব। ব্যাপারটা হয়তো শুনতে হাস্যকর লাগবে। কিন্তু, আমার একটা ইনটিউশন কাজ করছে। আমি একটা বিশেষ সমাধিক্ষেত্রে রিসার্চ চালাতে চাই।’

‘কোনটা?’

‘সাইট KV60।’

‘সেখানে কী আছে? সেখানে তো কোনো বড়ো রাজসমাধি নেই বলেই শুনেছি।’

একটু ভেবে হাওয়াস বললেন,

‘আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই, এই বছর ডোনাল্ড রায়ান ওই সাইটে একটা সাধারণ সমাধিক্ষেত্রে দুটো মমির শবাধার খুঁজে পায়। একটা কোনো এক আয়ার বা ধাইয়ের দেহ ছিল। আর দ্বিতীয়টা নামবিহীন, অজানা নারীর। ধরে নেয়া হয়েছে সেটাও কোনো সাধারণ দাসীর।’

‘হ্যাঁ। তো?’

‘আগের সপ্তাহে আমি সেখানে গেছিলাম। মমি দুটো দেখতে গিয়ে লক্ষ করি সেই দ্বিতীয় মমিটার বেশ কিছু দাঁত নেই। আমার মনে একটা সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। আমি ওইটার সিটি স্ক্যান করাতে চাই।’

ডিস্কভারির কর্মকর্তার গলার নিরুৎসাহ ভাবটা ডক্টর হাওয়াসের কান এড়াল, না, ‘ঠিক আছে। কিন্তু, কেন? ওটা তো একটা সাধারণ শবাধার ছিল। মৃদু হেসে হাওয়াস বললেন,

‘সেই হাতসেপসুতের সমাধিমন্দিরে উদ্ধার করা ফাঁকা শবাধার আর সেই দাঁত মনে আছে?’

নিরুৎসাহ কেটে গিয়ে সেই জায়গায় উত্তেজনা ফুটে উঠল এবার লোকটার গলায়,

‘আপনি কি সন্দেহ করছেন…’

‘হাতসেপসুতের নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিল তার উত্তরসূরি। তাই এটাই কি স্বাভাবিক নয় যে, তার মৃতদেহ রাজসমাধি থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা হবে? আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে ওই অজানা, অচেনা মমিটা আমাদের খতিয়ে দেখা উচিত। আরও একটা ব্যাপার…। আপনি শুনলে হয়তো ভাববেন আমার ভীমরতি হয়েছে।’

‘বলুন। শুনি না হয়।’

‘ওই KV60 তে আগের সপ্তাহে গিয়ে একটা কালো সাপ চোখে পড়ে আমার। ওই মমির পাশেই বসে ছিল। গতকাল হাতসেপসুতের মন্দিরে গিয়েও আমি সেই সাপটাকেই দেখতে পেয়েছি। আমার বৈজ্ঞানিক মনেও কেন জানি না সন্দেহ জাগছে যে, এটা একটা সংকেত। পূর্বাভাসে বিশ্বাস করেন আপনি?’

***

এরপরের ইতিহাস সকলের জানা। তুতেনখামুনের সমাধি আবিষ্কারের পরেই দ্বিতীয় সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কারটা ঘটেছিল এরপর। অচেনা, অজানা একটা মমির সঙ্গে বেশ কয়েক বছর আগে খুঁজে পাওয়া হাতসেপসুতের একটা দাঁতের ডিএনএ ম্যাচ করানো হয়। এবং, তাতেই নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, সেটা রানি হাতসেপসুতের দেহ। নাহ্, প্রমাণিত হয় যে, হাতসেপসুত কোনো গল্পকথা নয়। তিনি মিশরের সেই মহান রানি যিনি ফারাও হয়েছিলেন; শাসন করেছিলেন মিশর ১৫০৭ থেকে ১৪৫৮ খ্রিস্টপূর্ব অবধি। তাঁর কর্ম, তাঁর নাম, তাঁর যশ অনেক প্রচেষ্টাতেও মুছে ফেলা যায়নি ইতিহাস থেকে। হাজার চেষ্টা ব্যর্থ করেছেন তিনি। পৃথিবী জানতে পেরেছে সেই কুলশ্রেষ্ঠ নারীর নাম- হাতসেপসুত! আর এই সবই সম্ভব হয়েছিল…সেই একটা দাঁতের জন্যে।

.

Reference:

1. https://www.theguardian.com/world/2007/jun/27/egypt.science

2. https://www.smithsonianmag.com/science-nature/egyp- tian-mummy-identified-as-legendary-hatshepsut-180940772/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *