শেষ মৃত পাখি – ৬

রাত ঘন হয়, আর অতি প্রাকৃতিক
ব্রহ্মপদ্ম ফুটে উঠলে ডেকে ওঠে ডোমের কুকুর
এই প্রসারতা অস্তহীন। 

—দেবদাস আচার্য 

.

‘এরপর?’ 

‘স্থানীয় পুলিশের এক কনট্যাক্ট পেয়েছি। আনন্দ পাঠক। এখানকার ওসি ছিলেন। আমাদের ম্যাগাজিনের এক সাব-এডিটর এঁর দূর সম্পর্কের কীরকম আত্মীয় হয়। লেবং রোডের কাছাকাছি একটা ক্যাফে, নাম নাইটিংগেল। ওখানে দেখা করবার কথা। তবে এখনও ঘন্টাখানেক দেরি আছে।’ 

‘নাইটিংগেল আমি চিনি। ছোটোবেলায় ওখানে প্লাম কেক খেতে যেতাম। এই শহরের সবথেকে ভালো কেক ওই ক্যাফের মালিক যিনি, মিস্টার ম্যান্ডেলি, তাঁর স্ত্রী বানান। ক্রিসমাসের আগে পুডিং, কেক আর টার্কি রোস্টের গন্ধ দিয়ে জায়গাটা চেনা যায়।’ সিদ্ধার্থ বলল, ‘আপত্তি না থাকলে হেঁটে যেতে পারি। একটা শর্টকাট চিনি। বেশি পরিশ্রম হবে না।’ বৃষ্টি ধরে এসেছে। হাতে এই একঘণ্টা কিছু কাজ নেই। মদনদাকে বলে দিলাম লেবং রোডের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করতে। 

ঝাপসা আলোয় ভরে আছে চারপাশ। পাইনের ডাল থেকে টুপটাপ জল পড়ছে। কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে নীচের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে খেলনার মতো বাড়ির দল ধারে ধারে গড়িয়ে গেছে। আমরা পাহাড়ের ধার ঘেঁষে একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, যার একপাশে খাদ, রেলিং দিয়ে ঘেরা। মাঝেই মাঝেই শ্যাওলা ঢাকা সিঁড়ির ধাপ উঠে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। পাশের জঙ্গল থেকে পাহাড়ি ঝোরার অবিরাম জল পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। নিঃশব্দ পায়ে ঘোলা কুয়াশা সেঁধিয়ে যাচ্ছে গাছের চামড়ায়। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে এক-একটা বেঞ্চ, কোথাও নিঃসঙ্গ লেপচা রমণী বসে আছে। এক একটা বাঁক ঘুরলে কুয়াশা ভেদ করে দেখতে পাচ্ছি রঙিন ছাতাদের আবছা অবয়ব। লোমশ স্পিৎজ নিয়ে ছাতা মাথায় হাঁটতে বেরিয়েছে মিনিস্কার্ট পরা এক তরুণী। কোথাও বা টুরিস্টের দল, এই ঘন বর্ষাতে যারা জনহীন শহরটিকে চাখতে আসে। 

চোখে পড়ল একটা কুচকুচে কালো ঘোড়া নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে। তার কেশর, পেশল পা এবং ধনুকের মতো পিঠে থিতিয়ে আছে বিন্দু বিন্দু জল। ঘোড়াটার মাথা নীচু। এরকম অদ্ভুত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন? ভয় লাগল। কেন, নিজেও বলতে পারব না, চোখ সরিয়ে দ্রুতপায়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেলাম। সিদ্ধার্থ হয়তো দেখেইনি। 

‘এই বর্ষাকালে আপনি দার্জিলিং আসেন প্রতি বছর? এসময় তো কিছুই করার থাকে না, অবসাদ ধরে যায় এমন বৃষ্টিতে।’ 

‘আমার শহর।’ ছোট্ট উত্তর দিল সিদ্ধার্থ। 

এত গোমড়ামুখো লোকের সঙ্গে চলা মুশকিল। মুখ বন্ধ রাখতে হয় সারাক্ষণ। হেঁটেই বা কেন যেতে বলল সেক্ষেত্রে, কে জানে! কিন্তু তখন সিদ্ধার্থ মুখ খুলল। 

‘এই শহর বর্ষাকালে নির্জন হয়ে যায়। টুরিস্ট আসে না। হোটেলগুলোর অনেকের ঝাঁপ পড়ে যায়। কর্মচারীরা দেশগাঁয়ে ফিরে যায়। চা-বাগানের পাতা তোলা বন্ধ থাকে। জিপগাড়িগুলো, যেগুলো সমতলের দিকে যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই গায়ে প্লাস্টিক জড়িয়ে অকেজো পড়ে থাকে। আর এই সময়টায় আমি প্রত্যেক বছর এই শহরে আসি। বিগত সাতবছর ধরে এই বর্ষার দার্জিলিংটাই আমার স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে। আবার ডাবলিন যখন ফিরে যাই, সেখানেও একই রকম স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া। প্রতি সন্ধেবেলা নিয়ম করে বৃষ্টি হবেই। একটা আবছা অন্ধকার ঘিরে আছে চারপাশে। মনে হয়, এক ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। দুটো শহর আসলে একটাই। আসল দার্জিলিং থেকে নকল দার্জিলিং-এর দিকে যাচ্ছি। অথবা নকল ডাবলিন ছেড়ে ফিরে আসছি আসলের দিকে।’ 

বাপরে! এ তো কবিও! সাহিত্যের ধারাটা কাকা ভালই চারিয়ে দিতে পেরেছে দেখছি। 

‘দার্জিলিংকে মিস করেন, না?’ 

উদ্দেশ্যহীন কাঁধ ঝাঁকাল সিদ্ধার্থ। তারপর পাউচ থেকে তামাক বার করে হাঁটতে হাঁটতেই সিগারেটের কাগজে ভরে রোল করতে লাগল। 

‘এই আনন্দ পাঠক কি এখনও চাকরি করেন?’ জিজ্ঞাসা করল সিগারেট ধরিয়ে 

‘কিছু বছর আগে রিটায়ার করেছেন। ফোনে কথা বলেছি। খোলামেলা লোক বলেই মনে হলো।’ 

‘ধনরাজ গম্বু আর ড্যানিয়েল লামা, দুজনকেই চেনেন?’

‘হ্যাঁ। তবে অমিতাভ মিত্রর খুনের ঘটনার সময় পুলিশের চাকরিতে ঢোকেননি। কিন্তু পুলিশের সেই সময়কার অন্যান্য কর্মচারী যাঁরা এখনও বেঁচে আছেন তাঁদের সন্ধান দিতে কাজে লাগবেন।’ 

কথা বলতে বলতে বিভিন্ন শর্টকাট দিয়ে, এই গলিতে কিছুটা নেমে, আবার পাশের গলির কয়েক ধাপ সিঁড়ি উপরে উঠে কখন লেবং রোডে চলে এসেছি, বুঝতেই পারলাম না। নাইটিংগেল ক্যাফের ভেতর ঢুকলে মনে হয় পুরোনো ইংল্যান্ডের কফির দোকানে ঢুকেছি। আলো আঁধারি চারপাশ, হিম হিম, ঝিমিয়ে থাকা। একটা বেড়াল ঘুমিয়ে আছে কাউন্টারের উপর। মৃদুস্বরে কান্ট্রি সংগীতের স্বর ভেসে আসছে। ঘর জুড়ে কফির সুবাস। 

আনন্দ পাঠক এলেন কাঁটায় কাঁটায় নির্ধারিত সময়ে। সাতষট্টি বছর বয়েস, কিন্তু এখনও ঋজু শরীর। ক্যাফেতে শুধু আমরাই বসে ছিলাম। ঢুকে আমাদের দেখে হাত নাড়িয়ে হাসলেন। হাসলে চোখের চামড়া কুঁচকে যায় আর হাসিটা মনে হয় গোটা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। সিদ্ধার্থর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম। 

‘অরুণবাবু, গ্রেট রাইটার! আমাদের এই শহরের গর্ব। আমি ইংরেজি অনুবাদে কয়েকটা বই পড়েছি। অসাধারণ জ্ঞান ভদ্রলোকের। আর পুলিশ প্রসিডিওরাল নিখুঁত জানেন। 

‘মিস্টার পাঠক, আপনি আমাকে কিছু যোগাযোগ দিতে পারেন? আমি পুলিশের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পটা শুনতে চাই।’ ফোনের রেকর্ডারের সুইচ টিপলাম। 

চেয়ারে হেলান দিয়ে আনন্দ পাঠক বললেন, ‘আমার জানা মতে অল্প লোকই বেঁচে আছে। ধনরাজ গম্বু থাকলে আপনার কোনো সমস্যাই হতো না। সব গল্প পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে ছিল তাঁর, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। 

‘আপনি ফোনেও বলেছিলেন এটা। কিন্তু ড্যানিয়েল লামাকে নিয়ে যখন জিজ্ঞাসা করলাম, এড়িয়ে গেলেন। আমি জানি ধনরাজ গম্বু হয়তো এই কেসের মূল কথক, কারণ শেষ অবধি তিনিই ছিলেন। কিন্তু ড্যানিয়েল তো তখন ইনচার্জ। প্রথম কয়েকদিন তদন্তকারী অফিসার। তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে ড্যানিয়েল মুছে গিয়েছেন এই ইতিহাস থেকে। কেন?’ 

ড্যানিয়েলের কথায় মুখটা হালকা বিকৃত হয়ে গেল পাঠকের। সামান্য সময়ের জন্যই। তারপরেই নিজেকে স্বাভাবিক করে মাথা নাড়লেন, ‘সেই সময়ে আমি পুলিশে ঢুকিনি। বয়সও অল্প ছিল। তাই বলতে পারব না। আর ড্যানিয়েলকে কাছ থেকে চিনতাম না। ধনরাজ স্যারকে বহুকাল দেখেছি, এবং আমার প্রায় অভিভাবকের মতো ছিলেন। তাই হয়তো আমি ওদিকে ঝুঁকে।’ 

‘ড্যানিয়েল কি বেঁচে নেই?’ 

‘আছেন।’ 

‘আছেন?’ হালকা উত্তেজনা শুরু হয়ে গেল আমার। প্লিজ যোগাযোগ করিয়ে 

দেবেন?’ 

‘ড্যানিয়েল বাড়ির বাইরে বেরোন না। লোকজনের সঙ্গে মেশেন না। তাঁকে বাইরে কমই দেখা যায়। আগে যদিও মাঝেমাঝে বেরোতেন। পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটা সিকিওরিটি সংস্থা খুলেছিলেন। শহরের নানা পানশালা এবং হোটেলে নিরাপত্তারক্ষী সরবরাহ করত তাঁর সংস্থা। কিন্তু তখনও সংস্থার দেখাশোনা করতেন মূলত তাঁর স্ত্রী এবং ভাই। ড্যানিয়েল বাড়ির ভেতরেই থাকেন। কখনো-কখনো, কোনো উৎসব উপলক্ষ্যে অথবা জনসভা হলে তাঁকে দেখা যেত। স্ত্রী মারা যাবার পর সেই কোম্পানি বিক্রি হয়ে গেছে। আর ড্যানিয়েলও বয়েস বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি করে মানুষজনকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন। বছর পাঁচেক তাঁকে দেখিনি। আজকাল নাকি বাড়ি গেলেও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না।’ 

ওঁর ফোন নাম্বার অথবা ঠিকানা, কিছু একটা দেবেন? একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি।’ কাগজ ও পেন এগিয়ে দিলাম। 

‘ড্যানিয়েলের বাড়ির নির্দেশ আমি দিয়ে দেব। সেন্ট পলস স্কুলের কাছে বাড়ি। কিন্তু তাঁর ফোন নম্বর আমার কাছে নেই।’

‘ড্যানিয়েল পুলিশ ছাড়লেন কেন?’ 

‘জানি না। আমরা যখন ছোটো ছিলাম, ড্যানিয়েল লামা এই জেলার ত্রাস ছিলেন। তখন নকশালবাড়ির সময়। ড্যানিয়েলের দাপটে শহর ঠাণ্ডা ছিল। অবশ্য কানাঘুষোও কম ছিল না এই নিয়ে। ড্যানিয়েল নাকি খোঁচড়দের টিম বানিয়েছিলেন। রাত্রিবেলা এক একটা পাড়া ঘিরে ধরা হতো পুলিশ-বাহিনী দিয়ে। স্থানীয় অল্পবয়স্ক ছেলেদের বাড়ির বাইরে বার করে এনে লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হতো। বোরখা পড়া খোঁচড় এসে এক একজনের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে ইঙ্গিত দিত, এই ছেলেটি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, অথবা যুক্ত নয়। সব মিটে যাবার পর নাকি চিহ্নিত হয়ে যাওয়া তরুণদের একটা ভ্যানে চাপিয়ে চলে যাওয়া হতো। তাদের আর খোঁজ মিলত না। আবার এটাও শোনা যেত, শহরের বাইরে ছোটো ছোটো আস্তানায় ড্যানিয়েল টর্চার সেল খুলেছিলেন। সন্দেহভাজনদের ধরে নিয়ে এসে তাদের জলে চুবিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, হাতের উপর চেয়ার রেখে বসে জিজ্ঞাসাবাদ, উলটো করে ঝুলিয়ে মার, এরকম অনেক গল্প শোনা যেত। কতটা সত্যি জানি না। আমরা ছোটোবেলায় দেখেছি, ড্যানিয়েল পাইপ মুখে সারা শহর টহল মারতেন নিজের জিপে। নিজে গাড়ি চালাতে পারতেন না। ড্রাইভারের পাশে বসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন। ওটাই মনে হয় নেশা ছিল। সারা শহর ঘুরে বেড়ানো। আর নেশা ছিল পাইপ। চব্বিশ ঘণ্টাই জ্বলন্ত অথবা নিভে যাওয়া পাইপ ঠোঁট থেকে ঝুলত তাঁর। আমার নিজের চোখে দেখা, ভুটিয়া বস্তির জমজমাট সাট্টার ঠেক চোখের পলকে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে দূর থেকে ড্যানিয়েলের জিপ দেখতে পেয়ে। ওরকম দাপুটে পুলিশ অফিসার যখন দুম করে চাকরি ছাড়লেন, সকলে অবাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ড্যানিয়েল, যেটুকু শুনেছি, যেমন নির্মম ছিলেন, তেমনই অহংকারী। কাউকে বলেননি চাকরি ছাড়বার আসল কারণ।’ 

আনন্দ পাঠকের মুখ থেকে বিতৃষ্ণার ভাব যাচ্ছিল না। ‘সত্যের খাতিরে বলা উচিত যে ড্যানিয়েলের হৃদয় পরিবর্তনও হতে পারে। সেটাই হয়তো তাঁর চাকরি ছাড়বার কারণ ছিল। মানুষ তো, কোথাও গিয়ে এত নিষ্ঠুরতা, এত এত বাচ্চা ছেলেদের এনকাউন্টার, এগুলো হয়তো মানতে পারছিলেন না। ওপর থেকে নির্দেশ আসছে, তাই ডিউটি করতে বাধ্য ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়তো খারাপ লাগাটা ছিলই। এটা বলছি এই কারণে যে পুলিশের চাকরিতে ঢুকে দেখেছি, বহু মানুষ অপরাধবোধে ভুগেছেন। ওই দিনগুলোতে যা করতে বাধ্য হয়েছেন, সেগুলো রাতের পর রাত তাঁদের ঘুমোতে দেয়নি। অনেকে পরে চাকরি ছেড়েও দিয়েছেন। আমি তো নিজে পুলিশ। তা সত্ত্বেও এগুলো খোলা মনে আপনাদের কাছে স্বীকার করতে বাধা নেই। তখন যা হয়েছিল, প্রচুর বাড়াবাড়ি। একজন সুস্থ মানুষকে জীবিকার প্রয়োজনে এসব করতে বাধ্য হতে হলে তার মানসিক অবস্থা কী হতে পারে, কেউ ভেবে দেখে না। যাই হোক, তখন দার্জিলিং-এ এত হোটেল আর রেস্তোরা, এমনিতেই, পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিরাপত্তা সংস্থা খুললে দশগুণ বেশি রোজগার হয়। ড্যানিয়েল হয়তো সেরকমই কিছু ভাবছিলেন।’ 

‘আর ধনরাজ?’ 

আনন্দ পাঠক এবার হাসলেন, এবং আবারও চোখ কুঁচকে সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল সারা মুখে। নরম হয়ে এল গলার স্বর। ‘ধনরাজ স্যারের মতো মানুষ ডিপার্টমেন্টে এসেছিলেন বলে এখনও গর্ব করে অন্যদের বলতে পারি যে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সততার কথা বলছি না। অধিকাংশ পুলিশ‍ই সৎ হয়। কিন্তু স্যার ছিলেন ডিপার্টমেন্টের কাছে ভগবান। আমাদের মতো জুনিয়ারদের যে কোনো সমস্যায় বুক পেতে দিতেন। ওপরওয়ালার কাছ থেকে আড়াল করতেন আমাদের। হ্যাঁ, কাজে ভুল করলে অথবা ফাঁকি দিলে এত বকাবকি করতেন যে তখন মনে হতো এই লোকটার থেকে বাজে কেউ হয় না। কিন্তু সেই রিপোর্ট কখনও ওপরতলা পর্যন্ত যায়নি, যদি না আপনি বড়োসড়ো ঘুষ খান, অথবা নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেন, অথবা আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করেন, সেসব ক্ষেত্রে স্যার নির্দয় ছিলেন। কারণ ডিপার্টমেন্টের বদনাম হবে, এমন কিছু তাঁর কাছে ছিল সবথেকে যন্ত্রণার। আর সবসময় বলতেন, ‘একজন অপরাধী ছাড়া পেয়ে গেলেও ততটা ক্ষতি নেই, যতটা ক্ষতি একজন নির্দোষ শাস্তি পেলে।’ ওই লক্ষণরেখা অতিক্রম না করলে স্যার সবসময় আপনার 

পাশে থাকতেন। অবসর নেবার পরেও মাঝে মাঝে আসতেন। সকলের সঙ্গে দেখা করে গল্পগাছা করে যেতেন। শেষ জীবনে কিছুটা একা হয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রী মারা গেছেন। একমাত্র মেয়ে বিবাহসূত্রে কলকাতায় থাকে। আসে ন-মাসে ছ-মাসে একবার। যখন থানাতে বা পুলিশ ক্লাবে ঢুকতেন, আমরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতাম সবাই। অতখানি সম্মান জীবনকালে আর কোনো অফিসারকে আমি পেতে দেখিনি।’ 

বাম হাতে ঘড়িটা দেখালেন পাঠক। মুখে প্রচ্ছন্ন গর্ব। অবসরের দিন আমার হাতে স্যার পরিয়ে দিয়েছিলেন। কী চোখে যে আমাকে তিনি দেখেছিলেন জানি না। কিন্তু নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতেন। হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছিলেন। স্যার চলে গিয়েছেন প্রায় বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু শেষ সময়েও তাঁকে ভুলে যাইনি। শরীর স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখতাম, দেখা করতে যেতাম নিয়মিত। এটুকুই সান্ত্বনা যে স্যার জেনে গিয়েছিলেন আমি তাঁর পাশে ছিলাম।’ 

‘ধনরাজ কখনও অমিতাভ মিত্রর হত্যারহস্য নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলেননি? মানে, এটা তো সেই সময়কার সবথেকে বড়ো রহস্য ছিল। ডিপার্টমেন্টের কাছেও একটা ব্যর্থতা, যে আপনারা সমাধান করতে পারেননি।’ 

নিজের জন্য অর্ডার দেওয়া সুগন্ধি চায়ে চুমুক দিলেন আনন্দ। ‘কথা হয়েছিল কয়েকবার। কিন্তু স্যার মুখ খুলতে চাইতেন না। মনে হতো, এই ব্যর্থতা তিনি মন থেকে মানতে পারেননি, বিশেষত যেখানে তিনিই ছিলেন তদন্তকারী অফিসার।’ 

‘ড্যানিয়েল লামা তদন্ত থেকে সরে গেলেন কেন?’ এবার প্রশ্ন করল সিদ্ধার্থ। 

‘বলতে পারব না। তবে যে কোনো তদন্তেই এসব আকছার ঘটে থাকে। তদন্তকারী দল বদলে যায়, অফিসার সরে যান। আর ড্যানিয়েল মূল মাথা হলেও, তদন্তের দলে কিন্তু ধনরাজ স্যারও সহকারী হিসেবে ছিলেন। যদি ভুল না হই, খুনের রাত্রে থানায় ফোন পেয়ে ধনরাজ স্যারই অরুণবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি।’ 

হঠাৎ কী মনে হলো, বললাম, ‘মিস্টার পাঠক, অমিতাভ মিত্র-র লেখা একটা অসমাপ্ত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আমার কাছে এসেছে। সেটা নাকি পুলিশের কাছে ছিল। সেখান থেকে অরুণবাবু নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। এটার ব্যাপারে কিছু জানেন? 

সিদ্ধার্থ দেখলাম অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে কিছু বলিনি এই ব্যাপারে। 

‘জানি। ধনরাজ স্যারের কাছে এটার টাইপ করা একটা ভার্সন দেখেছি আমি। স্যার বাঙালিদের মতো বাংলা জানতেন। ছোটোবেলায় কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়েছেন। কলেজও সেখানেই। প্রচুর বাঙালি বন্ধু ছিল। নিজেকে হাফ-বাঙালি বলতেন। স্যার উপন্যাসটা পড়েছিলেন। আমি পড়িনি যদিও, কারণ বাংলা পড়তে পারি না। তবে স্যারের মুখ থেকে শুনেছিলাম, এটাও একটা রহস্য উপন্যাস ছিল। এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্লু।’ 

‘আপনি জিজ্ঞাসা করেননি, মৃত্যুর আগে লেখা একটা খসড়া কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?’ 

‘করেছিলাম। স্যার সোজাসুজি উত্তর দেননি। শুধু বলেছিলেন, অরুণ চৌধুরী যে খুন করতে পারেন না, সেটা তিনি প্রথমদিন থেকেই বুঝতে পারছিলেন। এই উপন্যাসটা পড়ে তাঁর সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে।’ 

আমি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলাম না। একদিকে অরুণ বলছেন তিনিই খুন করেছেন, অপরদিকে দেখা যাচ্ছে তদন্তকারী অফিসার বুঝে গিয়েছেন যে অরুণ নিরপরাধ। অর্থাৎ তাঁর অপরাধের খুটিনাটি বোঝবার জন্য অরুণ যে লেখাটা দিয়েছেন, সেটাই আবার তাঁর নিরপরাধ হবার সাক্ষ্য দিচ্ছে। জটিল গোলকধাঁধা। 

‘কেন ধনরাজের মনে হয়েছিল যে অরুণ নিরপরাধ?’ 

কাউন্টারের উপর ঘুমিয়ে থাকা বেড়ালটা জেগে উঠে আড়মোড়া ভাঙল, এবং বিশাল হাই তুলল একটা। তারপর লাফ দিয়ে নেমে আনন্দ পাঠকের পায়ের কাছে এসে পিঠটাকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে গা ঘষতে লাগল। আনন্দ বেড়ালটাকে কোলে তুলে নিয়ে নরম আঙুল বোলালেন তার রোমশ গলায়। আরামে বেড়ালটার চোখ বুজে আসছিল, ঘড়ঘড় শব্দ বেরোচ্ছিল গলা থেকে। 

‘দেখুন পুলিশের তদন্তে যুক্তি এবং সূত্রের বাইরেও আর একটা জিনিস প্রয়োজনীয়, সেটা হলো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। একজন পুলিশ অনেক কিছুই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারে, যেগুলোর ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারবে না। আমি নিজে বহু কেসের তদন্তে গিয়ে এই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্য পেয়েছি অভ্রান্ত ভাবে। ধনরাজ স্যারের সেটাই মনে হয়েছিল সম্ভবত। এগুলোকে প্রশ্ন করা যায় না। গেলেও উত্তর মিলবে না সহজে।’ 

‘মিস্টার পাঠক’, সামনে ঝুঁকলাম, ‘আমার অবস্থাটা বুঝুন। চুয়াল্লিশ বছর আগের এক তামাদি হয়ে যাওয়া কেস নিয়ে লিখতে এসেছি, যার অধিকাংশ পাত্র-পাত্রী আজ মৃত। যেটুকু গল্প পেয়েছি তা দিয়ে ষোলো হাজার তো দূরের কথা, ষোলোশো শব্দও নামানো যায় না। জানি, এটা আমার সমস্যা। আপনার কিছুই আসবে যাবে না। আমি শুধু অনুরোধই করতে পারি, আপনি কি এমন কিছু ধনরাজ গম্বুর কাছ থেকে জেনেছিলেন যেটা অদ্ভুত? সামান্য হয়তো। হতেই পারে যে পাত্তা দেবার মতো কিছুই না। কিন্তু আমার কাছে তো কোনো অবলম্বনই নেই! আপনি যদি কিছু মনে করতে পারেন, তা সে যত সামান্যই হোক না কেন, আমাকে জানাবেন?’ 

আনন্দ পাঠক ভুরু কোঁচকালেন। বেড়ালটা ততক্ষণে তাঁর কোল থেকে নেমে গিয়ে দরজার সামনে বসেছে। সেখান থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখের মণি সবুজ। ম্যাও করে ডেকে উঠল একবার। 

‘একটা ছোট্ট জিনিস, যেটা স্যার বলেছিলেন। ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর খটকা ছিল, কিন্তু উত্তর পাননি।’ 

‘বলুন যত ছোটোই হোক হয়তো গল্পে কাজে লাগতে পারে।’ ফোন এগিয়ে দিলাম আনন্দ-র দিকে। 

‘যে রাত্রে অরুণ চৌধুরীর প্রতিবেশী, মিসেস বাসু মনে হয় নাম, তিনি পুলিশ স্টেশনে ফোন করেছিলেন, তখন অফিসার ইন-চার্জ ড্যানিয়েল থানায় ছিলেন না। সেদিন কোনো কিছু উপলক্ষে ছুটি নিয়েছিলেন। ডিউটি অফিসার ছিলেন ধনরাজ স্যার। তিনি দুজন পুলিশ নিয়ে মিস্টার চৌধুরীর বাড়িতে যান। বাড়িতে কিছু পাননি, কিন্তু বাগানের ঘাসে রক্ত দেখে তাঁর সন্দেহ হয়েছিল। তিনি মিস্টার চৌধুরীকে ধরে আনেন। কিন্তু রাত আড়াইটের সময়ে ড্যানিয়েল থানায় এসে উপস্থিত হন। গাড়ি ছিল না। হেঁটেই এসেছিলেন। স্যারের সময়টা মনে ছিল কারণ তখন ডিউটি বদল হচ্ছিল। ড্যানিয়েল প্রচণ্ড উত্তেজিত ছিলেন। অল্প মাতালও, মুখ থেকে হুইস্কির গন্ধ আসছিল। অরুণ চৌধুরীকে দেখে ড্যানিয়েল নাকি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তারপর ধনরাজ স্যারকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেন, এই কেস তিনি হাতে নিচ্ছেন। ধনরাজ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, কী কেস? কিছু ক্রাইম ঘটেছে কি না সেটাই তো জানা যাচ্ছে না! ড্যানিয়েল উত্তরে বলেন যে কেসই ঘটে থাকুক না কেন, সেটা তাঁর অধীনে থাকবে আজ থেকে। ধনরাজ স্যার ড্যানিয়েলকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি এত রাত্রে থানায় এসেছেন কেন। ড্যানিয়েল নাকি উত্তরে বলেছিলেন, তিনি ফোন পেয়েছেন থানা থেকে।’ 

কফিতে চুমুক দিয়ে আনন্দ বললেন, ‘ধনরাজ স্যার পরে আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন, সেই রাত্রে থানার কোনো পুলিশ ড্যানিয়েলের বাড়িতে ফোন করবার কথা স্বীকার করেনি। আর ওরকম দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুলিশ অফিসারকে মাঝরাত্রে ফোন করে বিরক্ত করবে, ধড়ে এমন মাথা সেই সময়ে কারোর ছিল না। প্রশ্নটা হলো, ড্যানিয়েল এরকম দাবি কেন করলেন? যদি পুলিশরা মিথ্যে বলে থাকে, যদি সত্যিই থানা থেকে ড্যানিয়েলের বাড়িতে ফোন গিয়ে থাকে, যেরকম তিনি দাবি করেছিলেন, তাহলে ড্যানিয়েলকে ফোন করেছিল কে? আর সেই ফোনেই বা কী এমন বলা হয়েছিল যে অত রাত্রে ড্যানিয়েল থানায় এসেছিলেন? এলেও গাড়ি না নিয়ে হেঁটে এসেছিলেন কেন? সবথেকে বড়ো ব্যাপার, কী কারণে তিনি এত উত্তেজিত ছিলেন?’ 

বুকের মধ্যে হালকা ধুকপুক করতে শুরু করল। এই প্রথম একটা স্টোরি পাচ্ছি, যা কোনো কাগজে কখনো বেরোয়নি। 

‘উত্তরগুলো জানা যায়নি?’ 

‘নাহ। আর একটা ব্যাপার, যেটা আরও অদ্ভুত’ আনন্দ আবার ভুরু কুঁচকালেন, ‘ড্যানিয়েল সবসময়ে ফিটফাট থাকতেন। মাথায় চুল থেকে পায়ের নখ অবধি একটা ভাঁজও পড়ত না। মুখের পাইপটাও ঝুলে থাকত পাক্কা ব্রিটিশ কায়দায়। কিন্তু সেই রাত্রে ড্যানিয়েল যখন এসেছিলেন, পরনে পুলিশের পোশাক ছিল না। সেটা স্বাভাবিক, কারণ ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। হয়তো পোশাক পরবার সময় পাননি। তাঁর মাথায় ছিল টুপি, গায়ে ওভারকোট, হাতে ছাতা এবং মুখে পাইপ। কিন্তু, যেটা স্যারের খটকা লেগেছিল, ড্যানিয়েলের পায়ে ছিল সাধারণ চটি।’ 

‘সেটা তো হতেই পারে। বাড়ি থেকে আসছেন যেহেতু।’ বলল সিদ্ধার্থ। 

‘আপনি সম্ভবত মন দিয়ে ঘটনাটাকে অনুসরণ করেননি মিস্টার চৌধুরী। তখন বর্ষাকাল। সেদিন তুমুল বৃষ্টি পড়ছিল। দার্জিলিং-এ বর্ষাকালে যেখানে রাস্তাঘাটের এরকম অবস্থা এবং ভয়াবহ জোঁকের উপদ্রব, সেখানে আমরা কি কেউ চটি পরবার কথা ভাবতে পারি? তাহলে ড্যানিয়েলের মতো একজন সাহেবি কেতার পুলিশ অফিসার এরকম আবহাওয়াতে চটি পরে বেরোবেন কেন? বিশেষত যেখানে তিনি আবহাওয়ার উপযোগী টুপি, কোট এবং ছাতা সঙ্গে রেখেছেন?’ 

‘আপনার কী মনে হয়?’ প্রশ্ন করলাম। 

‘ভেবে দেখিনি।’ মাথা নাড়লেন আনন্দ, ‘আমার কাছে এটা তুচ্ছ লেগেছিল। ভুলেও গেছিলাম এতদিন। আপনার কথায় মনে পড়ল। তবে এখন বলতে গিয়ে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা সত্যিই ভাবার মতো।’ 

আমাদের কফি শেষ। আনন্দ পাঠক উঠে পড়লেন। বললাম, ‘আপনাদের পুলিশ লাইব্রেরিতে পুরোনো কেসগুলোর রিপোর্ট আমি দেখতে চাই। অফিস থেকে আমাকে বলা হয়েছিল আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে। আর কাল আমার ফোটোগ্রাফার আসবেন। আপত্তি না থাকলে আপনার বাড়িতে তিনি যাবেন একটা ছবি নিতে।’

‘হ্যাঁ, অসুবিধে নেই। লাইব্রেরিয়ান আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। আপনাকে শুধু অফিসের পরিচয়পত্রের ফোটোকপি দিয়ে একটা চিঠি বানাতে হবে, যেখানে আসার উদ্দেশ্য ইত্যাদি লেখা থাকবে। চিঠিটা আমাকে আজ বিকেলের মধ্যে দিতে পারলে কাল অ্যাকসেস কার্ড পেয়ে যাবেন। দুজনের যোগাযোগ লিখে দিচ্ছি। ১৯৭৫ সালে এরা সকলেই ডিপার্টমেন্টে কর্মরত ছিল, এবং এখনও জীবিত। সেন্ট পলস স্কুলে অরুণ চৌধুরীর সমসাময়িক একজন, যাঁকে আমি চিনি। আর একজনের নম্বরও দিচ্ছি। ইনি এখানকার কোর্টের উকিল, যাঁর সঙ্গে সেই সময়ে অরুণের হৃদ্যতা ছিল। এই কয়েকজনকেই পেয়েছি। অরুণ এবং অমিতাভর বাল্যবন্ধুদের মধ্যে বাকিরা হয় মারা গেছেন আর না হলে কর্মসূত্রে অন্যত্র চলে গেছেন বহু আগেই। এই চারজনকে দিয়ে আপনার কাজ হবে কিনা জানি না, তবু একবার বাজিয়ে দেখতে পারেন। 

‘অনেক ধন্যবাদ। আর ড্যানিয়েল লামার বাড়ির ঠিকানা?’ 

আনন্দ বাড়ির নির্দেশ দিয়ে দিলেন। আমার হাতে চারজনের ফোন নাম্বার লেখা কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে দীর্ঘকায় শরীরটা এগিয়ে গেল ক্যাফের দরজার দিকে। বেড়ালটা একবার ডাক দিয়ে পায়ে মাথা ঘষতে গেল। আনন্দ নীচু হয়ে ঝুঁকে বেড়ালটার গলায় আদর করলেন। তারপর বেরিয়ে গেলেন বাইরে। 

সিদ্ধার্থ ভুরু কোঁচকাল, ‘অমিতাভ মিত্রর উপন্যাসের কথা তো বলেননি? 

আপনার কাকা দিয়েছেন। এই উপন্যাসের রহস্যের সমাধান করতে পারলে নাকি সব কিছুর উত্তর মিলবে।’ 

‘আমি কি দেখতে পারি একবার?’ 

‘চাইলে ফটোকপি করিয়ে নিন আজ রাত্রে। কিন্তু এই মুহূর্তে উপন্যাস গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার ধারণা এটা আপনার কাকার একটা খেয়াল মাত্র। আমার বুদ্ধি পরীক্ষা করতে চাইছেন।’

সিদ্ধার্থ মাথা নাড়ল, ‘কাকাকে আমি চিনি। কারণ না থাকলে কোনো কাজ করবে না।’ 

প্রসঙ্গ বদলালাম। ‘সিদ্ধার্থ, সামনে বেশ কিছু কাজ আছে। এখন ড্যানিয়েল লামার বাড়ি যাব। সেখান থেকে বেরিয়ে এই যে চারজনের নাম লিখে দিয়েছেন মিস্টার পাঠক, তার মধ্যে একজন, কুলবীর থাপাকে আজই সাক্ষাৎ করব। আমার রেকর্ড বলছে, ধনরাজ গম্বুর সঙ্গে যে দুজন কনস্টেবল অরুণের বাড়ি গিয়েছিলেন সেই রাত্রে, কুলবীর তাঁদের মধ্যে একজন। তারপর চিঠি বানিয়ে আনন্দ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে মদনদার হাত দিয়ে। তারপর হোটেলে ফিরে সাজাতে হবে সব ঘটনা। কাজেই, বেরোতে হবে এখনই।’ 

‘ড্যানিয়েলের বাড়ি পর্যন্ত আছি। তারপর আপনাকে একাই যেতে হবে। আমাকে একবার নিজের বাড়ি যেতে হবে, তারপর কাকার বাড়িতে লাঞ্চ।’

‘কোনো সমস্যা নেই। যখন খুশি আসবেন, আপনার ফাঁকা সময়ে। না এলেও অসুবিধে নেই।’ 

‘হোটেলে আসতে পারি, আপনি অন্য কোথাও থাকলে সেখানে। হোয়াটসঅ্যাপ করে দেবেন।’ 

ডিনারে নিমন্ত্রণ করা উচিত হবে কি? ভদ্রতার জন্য একবার বলাই যায়, কারণ আজ অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে ঘুরেছে, নিজের কাজকম্ম বাদ দিয়ে। না বলে দিলে বাঁচা যাবে, ওই গোমড়ামুখ দেখতে হবে না। 

‘এখানে তিব্বতি খাবার ভালো মেলে, এরকম কিছুর সন্ধান দিতে পারেন?’ 

আছে একটা। পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত রেস্তোরা। লগটেবিল নাম।’ 

‘আপনি চাইলে ডিনার করা যেতে পারে ওখানে। মাই ট্রিট।’ 

হাসল না একটুও! অদ্ভুত ছেলে তো! নিজের ফোনটা একবার ভুরু কুঁচকে চেক করে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ যেতে পারি। আপনি তো চিনবেন না। তুলে নেব।’ ধন্যবাদের বালাইটুকুও নেই। কিন্তু একে হাতে রাখা দরকার। অলিগলিতে ঘুরতে সুবিধে হবে। 

‘ঠিক আছে। তাহলে মদনদাকে ছেড়ে দেব। বেচারা পরপর দুইদিন বহুক্ষণ ধরে ডিউটি করছে। বিশ্রাম পাচ্ছে না। ডিনারের পর আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিলে ভালো হয়।’ 

আনন্দ পাঠকের পথনির্দেশ অব্যর্থ। সেন্ট পলস্ স্কুলের রাস্তায় একটা ফাটকওয়ালা বিশাল চত্বরের মধ্যে ড্যানিয়েল লামার বাড়ি। উঁচু দেওয়াল। সাদা দোতলা বাড়ির ধাঁচ অনেকটাই আধুনিক। দোতলার কাচের বড়ো বড়ো জানালার পর্দা ভেদ করে যেটুকু দেখা যায়, অন্ধকার। চত্বরটার চারিপাশে বড়ো বড়ো গাছ দিয়ে ঘেরা। জায়গাটা হিম হিম নির্জন। এই রাস্তাটাই আস্তে আস্তে উঠে গেছে পাহাড়ের গায়ে। অদ্ভুত ব্যাপার যেটা, এই বাড়ি থেকে অরুণের বাড়ির দূরত্ব একদমই বেশি নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও অরুণ বা অন্য কেউ ড্যানিয়েলের খোঁজ রাখেন না। আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেটের গায়ে আঘাত করলাম। ফাটকের ঢাকনা খুলে উঁকি মারল পাহাড়ি মুখ। 

‘কেয়া চাহিয়ে?’ 

সত্যিটাই বললাম। সাংবাদিক, দার্জিলিং-এর একটা পুরোনো অপরাধ নিয়ে স্টোরি করতে এসেছি। উলটোদিকের মুখ থেকে সন্দেহের ভাব না মোছায় নিজের কার্ডের পেছনে ইংরেজিতে লিখলাম, ‘অমিতাভ মিত্র হত্যা রহস্য’। তারপর লোকটিকে অনুরোধ করলাম মালিককে গিয়ে কার্ডটা দিতে। 

‘ঠেহরিয়ে ইধার।’ 

ঢাকনা আবার বন্ধ হয়ে গেল। সিদ্ধার্থ দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের মনেই বলল, ‘রাক্ষসপুরী। কিডনি খুলে বেচে দেবে।’ 

তরলতার ইচ্ছে হলো। জ্যাকপটের সন্ধান পেয়েছি। এখন কিডনি কেন, হৃদয় দিতে বললে সেটাও ওপেন হার্ট সার্জারি করিয়ে বার করে দেব।’ সিদ্ধার্থ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, অগ্রাহ্য করলাম। নির্বিকার ভাবে ব্যাগ থেকে পাফটা বার করে মুখে একবার বুলিয়ে নিলাম, ছোট্ট আয়নায় দেখে নিলাম ঠিকটাক লাগছে কিনা। 

ঢাকনা খুলে গেল। এবার অন্য মুখ। আমাদের সর্বাঙ্গ জরিপ করল, তারপর বলল, ‘সাহেব এখন ব্যস্ত আছেন। দেখা হবে না।’ 

শেষ চেষ্টা করলাম, ‘কখন এলে সাহেব ফাঁকা থাকবেন? 

‘বলতে পারছি না।’ 

‘প্লিজ, সাহেবকে বলবেন যে আমি অনেক দূর থেকে আসছি। একবার যদি দশ মিনিট তিনি আমাকে দেন— 

‘সাহেব ব্যস্ত আছেন। দেখা হবে না।’ কর্কশ গলায় যান্ত্রিক উচ্চারণ করল লোকটা। হাল ছেড়ে দিয়ে সিদ্ধার্থর দিকে তাকালাম। ঢাকনা বন্ধ হয়ে গেল। 

‘কিছু করবার নেই। ফিরে চলুন।’ বলল সিদ্ধার্থ। 

ফিরে আসতে ইচ্ছে করছিল না, কিন্তু জানি যে সত্যিই কিছু করবার নেই। গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। হঠাৎ মনে হলো, জানালার ধারে পর্দার ওপারের অন্ধকারে একটা মূর্তি নিশ্চল দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। 

গোটা দুপুর এবং বিকেল একরকম নিষ্ফল কাটল। পুলিশের সেই সময়কার কনস্টেবল কুলবীর থাপা মুখই খুললেন না। কিছুই নাকি মনে নেই। লেপাপোঁছা মাটির তালের মতো মুখের অভিব্যক্তি তাঁর। ড্যানিয়েলের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। বললেন মনে নেই কী হয়েছিল। শেষমেষ থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম অরুণ চৌধুরীর নাম শুনেছেন কিনা। কুলবীর যন্ত্রের মতো বলে গেলেন যে এই নামে তিনি কাউকে চেনেন না; তবে বাঙালিদের মধ্যে এরকম নামের অনেকে আছে। আর দার্জিলিং-এ অনেক বাঙালি। সেই হিসেবে হয়তো অতীতে কখনও কারোর আলাপ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে, কিন্তু এখন তাঁর মনে নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে হোটেলে এসে লাঞ্চ করে মদনদাকে পাঠালাম লাইব্রেরির চিঠি দিয়ে আনন্দ পাঠকের বাড়ি। তারপর গল্প সাজাতে গিয়ে দেখলাম, হাতে এখনও পর্যন্ত বিশেষ কিছুই আসেনি। চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল এই শহরে ঢুকেছি, কিন্তু ড্যানিয়েল লামার মধ্যরাত্রে থানায় আসা বাদ দিয়ে এ পর্যন্ত তেমন কিছুই জানতে পারিনি যা আগে অজানা ছিল। এমনকি অমিতাভ মিত্র মারা যাবার আগে স্থানীয় গ্রামের যে ঝুপড়িতে থাকতেন, সেটারও নাকি চিহ্নমাত্র নেই। ধ্বসে গুঁড়িয়ে গেছে। কোথাও কিছুই নেই— আমি কি তাহলে শূন্য থেকে স্টোরি আমদানি করব? মেজাজ খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সিদ্ধার্থর ফোনে ঘুম ভাঙল। ডিনারে বসেও বিরক্তিটা দূর হচ্ছিল না। 

‘কুলবীর থাপাকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা শূন্য আইকিউ-এর রোবট। হোপলেস।’ হতাশায় থুকপার চামচ মুখে তুলতে গিয়েও নামিয়ে রাখলাম আমি। হারমিটেজ রোডের উপর একটি ঝুলন্ত তিব্বতি রেস্তোরা লগটেবিল। আমাদের ব্যালকনির রেলিং-এর নীচ দিয়ে নেমে গেছে অরণ্যভর্তি পাহাড়ের ঢাল। হয়তো দিনের বেলা রোদ উঠলে এখান থেকেই চা-বাগানের মেয়েদের পাতা তুলতে দেখা যায়। রেস্তোরার ভেতরে ঝোলানো তিব্বতি চিত্রমালা, পুরোনো দার্জিলিং- এর ছবি। মিটমিটে কয়েকটা ঝুলন্ত ল্যাম্প আলোর থেকে বেশি অন্ধকার সৃষ্টি করছে। পাইনকাঠের দেয়ালের গায়ে ঘাম জমেছে। অদ্ভুত সব মথ আর পোকারা পাহাড় থেকে এসে ভিড় জমাচ্ছে আমাদের আশেপাশে। টিপটিপে বৃষ্টি। স্যাঁতসেঁতে এরকম পরিবেশে আলো অন্ধকার ঘেরা রেস্তোরাটাকে আরও বেশি করে রহস্যময় লাগছিল। 

‘ঠিক আছে। আরও তিনজনের সঙ্গে কথা বলা যাবে তো। আপনি গল্পটা গুছিয়েছেন? কাঠামো, শুরু কীভাবে করবেন, এসব?’ 

‘গল্প কোথায়? আপনার কাকা মুখ খুলছেন না। ড্যানিয়েল দেখা করছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাকে তো ফিরে যেতে হবে সিদ্ধার্থ।’ 

সিদ্ধার্থ থুকপায় মনোনিবেশ করল। আমি কার্ডিগানটাকে টেনে নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসলাম। সোয়েটারের ওপর জ্যাকেট চাপিয়েও পাহাড়ি ঠাণ্ডা থেকে রেহাই নেই। তার ওপর খোলা জায়গায় বসার ফলে একটা হিমেল হাওয়া মাঝে মাঝেই ঝাঁপিয়ে পড়ে হাড়ের ভেতর আঁচড়ে দিচ্ছে। 

‘আমার মনে হয়, আসল রহস্য লুকিয়ে আছে ড্যানিয়েলের মধ্যে।’ 

‘আসল রহস্য আপনার বিখ্যাত রহস্যলেখক কাকা। তিনি সব জানেন কিন্তু বলবেন না। ডেকে নিয়ে এসে, একটা ফালতু লেখা হাতে ধরিয়ে দিয়ে মজা দেখছেন।’ 

‘উহু! কাকার ভার্সন গল্পের একটা দিক। কিন্তু আনন্দ পাঠক যে খটকাগুলোর কথা বললেন? তার ওপর, মনে হচ্ছিল আনন্দ পাঠক ড্যানিয়েলকে অপছন্দ করেন। কিন্তু ড্যানিয়েল ইস্তফা দেবার পর আনন্দ পুলিশে এসেছেন। তাহলে এই অপছন্দ কি ধনরাজ গম্বর কাছ থেকে পাওয়া? অপছন্দের কারণ কী ড্যানিয়েল নির্মম অফিসার ছিলেন বলে? বহু তরুণকে হত্যা করেছিলেন, তাই? না কি অন্য কোনো কারণ?’ 

‘জানি না। এই গল্পের ভেতর যত ঢুকছি, একটার পর একটা জট একে অন্যের সঙ্গে পাকিয়ে পাকিয়ে আয়তনে বেড়েই যাচ্ছে। প্রশান্ত গুরুং না মিসেস বাসু কার কথা সত্যি? অমিতাভ অরুণের বাড়ি এসেছিলেন, নাকি আসেননি? রাইফেল থেকে একটাই গুলি ছোঁড়া হয়েছে, কিন্তু বুলেট পাওয়া যাচ্ছে দুটো, যারা ওই রাইফেলের সঙ্গে ম্যাচ করছে। কীভাবে? অমিতাভর মুখে আর বুকে গুলি করা পিস্তল কোথায় গেল? অমিতাভর পায়ের ছাপ বাগানে পড়ল না কেন? বাগানে যে বুটের ছাপ, সেটা কার? সেটাই কি অমিতাভর? অমিতাভর লাশ উপুড় করে শোয়ানো কেন? কেন তাঁর কবজিতে ক্ষতচিহ্ন ছিল, সেটাও আবার মৃত্যুর বেশ কিছুক্ষণ আগে? অমিতাভর পেটে মদ এল কীভাবে? এত এত প্রশ্ন, যার উত্তর বলতে আমার হাতে একটা শেষ না হওয়া উপন্যাসের খসড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি কি তাহলে সিরিজের শেষ স্টোরি হিসেবে এই উপন্যাসটা ছাপিয়ে দেব? পাঠকের সামনে নতুন চমক। নতুন যুগের সাংবাদিকতা? মাই ফুট!’ একটা সিগারেট জ্বালিয়ে জোরে ধোঁয়া ছাড়লাম অন্ধকার পাহাড়ের দিকে। সিদ্ধার্থ খাওয়া থামিয়ে নিশ্চুপে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। একটু পর বলল, ‘একটা ড্রিংক নেবেন? এখানে ভালো কালেকশন আছে।’ 

‘যা খুশি। তবে আমার জন্য এক পেগ, তার বেশি নয়। 

পানীয় না আসা পর্যন্ত কেউ আর কিছু বলিনি। সিদ্ধার্থ অন্যমনস্কভাবে অন্ধকার পাহাড় দেখে গেল, আর আমার মুখে সিগারেট তেতো লেগে গেল গোটা সময়টা। 

অ্যাবসল্যুট ভদকার সঙ্গে লাইম ও সোডা মিশিয়ে এগিয়ে দিল সিদ্ধার্থ। ‘এখানে এসে লাভ তাহলে হলো না, শুধু পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে টক করে দেওয়া বাদে!’ 

গা জ্বলে গেল ওর কথায়। উত্তর না দিয়ে পানীয়তে চুমুক দিলাম। 

‘আপনি কাজ ছাড়া অন্য কথা বলেন না কেন?’ আচমকা প্রশ্ন করল সিদ্ধার্থ। 

ঝাঁঝিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, আপনি জন্ম থেকে হাসেন না কেন? নিজেকে সামলে উত্তর দিলাম, ‘কী কথা? 

‘সাধারণ কথা। বাড়ি কোথায়, দিল্লিতে কতদিন আছেন, এইসব। কারণ এখন যত কাজের কথা ভাববেন, বিরক্তি বাড়বে।’ 

‘বাড়ি কলকাতায়। আপনি ডাবলিনে কোন অঞ্চলটায় থাকেন? আমার কলেজ জীবনের বন্ধু স্যান্ডিফোর্ডে থাকে।’ সিদ্ধার্থ ঠিকই বলেছে। অন্য কথায় মন না ঘোরলে আরও বিশ্রী লাগবে চারপাশ। 

‘ওটা শহরতলি। আমি বেলফিল্ডের বাসিন্দা, ডাবলিনের ভেতরেই। বান্ধবীর সঙ্গে একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকি। দুজনে মিলে ভাড়াটা ভাগাভাগি হয়ে যায় বলে গায়ে লাগে না। নাহলে ডাবলিন দামি শহর।’

বান্ধবীও কি পড়াশোনা করে? 

‘করত। ম্যাঞ্চেস্টারের মেয়ে। মাস্টার্স করেছে ট্রিনিটি থেকেই। এখন ডাবলিনের আইবিএম ল্যাবে রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে। আপনি দিল্লিতে কতদিন?’ ‘দশ বছর হয়ে গেল। মাস্টার্স করেছি জেএনইউ থেকে, তারপর চাকরি।’ আবার নীরবতা। সৌজন্যের পালা শেষ। 

‘যেটা মনে হচ্ছে,’ আমাকেই মুখ খুলতে হলো, ‘হোটেলে গিয়ে আবার প্রথম থেকে পড়তে হবে, যা যা পয়েন্ট করেছি। এদিকে আপনার কাকা বারবার বলছেন সত্তর দশকের কবিতা না পড়লে এই গল্প আমি লিখতে পারব না। সেই রিসার্চ এখনও কিছুটা বাকি।’ ইতস্তত করে বললাম, ‘একটা কথা জানাচ্ছি। বাইরে এখনই বলবার দরকার নেই। আপনার কাকা আমার কাছে কাল স্বীকার করেছেন যে তিনিই হত্যাকারী। 

সিদ্ধার্থ চমকে তাকাল আমার দিকে। ঝোড়ো হাওয়াতে ল্যাম্প কাঁপছিল। সেই কাঁপা আলোতে দেখলাম, ওর ভাঙা নাকের ছায়াটা নড়ছে। এক জায়গায় স্থির থাকছে না। সারা মুখের অজস্র ফাটল, হালকা দাড়ির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার গহ্বর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে ওর সারা মুখে। দমকা হাওয়া এল একটা, আর ছায়াগুলো ভেঙে গিয়ে আলোকিত হয়ে উঠল সিদ্ধার্থর মুখ। দেখলাম, ও তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। আমিও ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম, চোখের পাতা না ফেলে। তারপর সিদ্ধার্থর দৃষ্টি নরম হয়ে এল। সে মৃদুস্বরে বলল, ‘আর আপনি সেই স্বীকারোক্তিকে বিশ্বাস করছেন না।’ 

‘করছি।’ 

সিদ্ধার্থ চুপ করে থাকল। 

‘যদি আমাকে স্টোরি করতে গিয়ে এই স্বীকারোক্তির মর্যাদা রাখতে হয়, আপনার খারাপ লাগবেই। আগে থেকেই বলে দিলাম তাই, যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়।’ 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল সিদ্ধার্থ, ‘আপনার কি ধারণা আমি কোনো ভুল বিশ্বাস নিয়ে বসে আছি? কাকাকে আমি চিনি। ওই শান্ত মনটার ভেতরে কীরকম উথালপাথাল চলে, আর সেটাকে কীভবে চেপে রাখে সেটা দেখেছি। শুনেও ছি কিছু গল্প। বাবলা নামে একজন ছিল। কাকার বাড়ির মালি। তার গল্প শুনেছি। ওর একটা কুকুর চোখের সামনে মরে গিয়েছিল বলে কাঁদতে কাঁদতে বাবলা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ওকে কাকা নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসতো। চলে যাবার পর দু-দিন খায়নি। বসে থেকেছে বোগেনভিলিয়ার তলায়। টানা দুই দিন। ঘরে শুতেও যায়নি। একদম শান্ত, পাথরের মতো নিস্পন্দ হয়ে বসেছিল, ধ্যানী বুদ্ধর অবয়ব। এই ধ্যানমগ্ন লোকটার ভেতরটা আমরা বুঝতেই পারব না, এত চাপা। কাকাকে নিয়ে আমার কিছু অবিশ্বাস করবার নেই। খারাপ লাগবারও নেই। এটুকু জানি, সহ্য করতে করতে কতখানি রক্তক্ষরণ হয়েছে মানুষটার ভেতর।’ 

‘বাবলার কথা আমিও আজ সকালবেলা আপনার কাকার মুখে শুনলাম। ওই সুন্দর বাগান, সবটা নাকি ওর হাতে।’

‘বাইরের নির্বিকার শান্ত সমাহিত মুখটা দেখে ভুলবেন না। যে কষ্ট পাক না কেন, যত ক্ষতবিক্ষতই হোক, কিছুতেই সেই রক্তপাতকে বাইরে দেখাবে না। এত চাপা এবং অন্তর্মুখী মানুষদের আমার মাঝে মাঝে ভয় লাগে। এরা নীরবে যন্ত্রণা ভোগ করে একদিন চুপচাপ মরে যায়। কেউ টেরও পায় না। 

আস্তে আস্তে বললাম, ‘এবার উঠি। হোটেলে গিয়ে কাজ আছে।’ 

শুনশান অন্ধকার রাস্তা দিয়ে সিদ্ধার্থর ছাতার নীচে দুজন হাঁটছি। ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া রাস্তার পাশের পাইন বন থেকে অবিশ্রান্ত জল পড়ছে টুপটাপ। মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছি, এখানে ওখানে টায়ার জ্বালিয়ে চারপাশ ঘিরে ভবঘুরের দল বসে আছে। বৃষ্টির ছাটে আগুন নিভুনিভু হয়ে উঠলে কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটা পথকুকুর উত্তাপের লোভে জড়ো হয়েছে আগুনের পাশে। ভিখিরিদের হাততালি দেওয়া গানের সুরে লেজ নাড়ছে ওরা। খাদের নীচ থেকে একটা অবিশ্রান্ত ঝিঁঝির ডাক উঠে এসে সেই লেজ নাড়বার সঙ্গে তাল ঠুকছে। 

সিদ্ধার্থ হঠাৎ আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। উঃ, কাতরে উঠলাম। চামড়ায় নখ গেঁথে গেছে। অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতে ফিসফিস করে বলল, ‘পেছনের গাড়িটা। ফলো করছে আমাদের। অনেকক্ষণ থেকে দেখছি।’ 

একটা জিপ। ভেতরে কে বসে আছে, অন্ধকার রাস্তায় কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। জিপটাও দাঁড়াল। হাঁটতে শুরু করবার সঙ্গে সঙ্গে জিপ আবার চলতে শুরু করল। আমরা যে বুঝছি, তাতে কোনো মাথাব্যথা নেই গাড়ির চালকের। যেন বোঝানোর জন্যই এমন অনুসরণ। 

সিদ্ধার্থকে নীচু গলায় বললাম, ‘পা চালান। ঘাবড়াবেন না। অত রাত হয়নি যে দুম করে কিছু করতে পারবে। তবে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটব না। ধার ঘেঁষে চলুন। 

হোটেল পর্যন্ত গাড়িটা অনুসরণ করল আমাদের। আমরা এতটাই সতর্ক আর সন্ত্রস্ত ছিলাম যে নিজেদের মধ্যেও কথা বলতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিলাম, গাড়ি কতদূরে আছে। হোটেলের সামনে এলাম। গাড়িটা দাঁড়াল, তারপর গতি বাড়িয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেল অন্ধকারের দিকে।

সিদ্ধার্থ একটা বড়ো নিশ্বাস ফেলল। আমি কাঁপা হাতে সিগারেট ধরাচ্ছিলাম। সিদ্ধার্থও রোল করবার জন্য পাউচ বার করল, এবং হঠাৎ হাসল, প্রথমবার। দেখলাম, মৃদু হাসির নিঃশব্দ তরঙ্গ ওর অবয়বকে জলছবির স্নিগ্ধতা দিচ্ছে। তারপর ভুরু তুলল, ‘এখনও বলবেন, আপনি গল্প খুঁজে পাচ্ছেন না?’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *