ক্রসফায়ার – রণদীপ নন্দী
প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০২৬
অলংকরণ – কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল
CROSSFIREA Compelling Thriller by Ranadip Nandy
জন্মসূত্রে আবদ্ধ না হয়েও যে সম্পর্কগুলো যত্নসূত্রে প্রস্ফুটিত হয়, এবং দিনশেষে আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থিতু হয়; তেমনই একজন মানুষকে। আমার এবং আমার লেখার সবচেয়ে বড় অভিভাবক। এই জগৎ-সংসারে আমার অন্যতম প্রিয় মানুষ।
.
ভূমিকা
থ্রিলার লিখতে বসা মানে ঠিক যেন অন্ধকার ঘরে লুকোচুরি খেলা। যে মুহূর্তে ভাবলাম, এই তো! এইবার পুরো গল্পটা মাথার মধ্যে পরিষ্কার। তখনই কোথা থেকে যেন নতুন এক চরিত্র উদয় হয়ে কাঁধে আলতো টোকা মেরে দেঁতো হাসি হেসে বলে, ‘দাদা, বলছি আমাকেও একটু ম্যানেজ করে গল্পে ঢুকিয়ে দিন না। চেষ্টা করলে আপনি কী-ই না পারেন!’
থ্রিলার তো অনেক লেখকই লেখেন। কিন্তু থ্রিলার লেখার সাইড-এফেক্টগুলো কি সেই লেখকেরা আপনাদের বলেন? এইবেলা আমিই বরং সেই গুহ্যকথা আপনাদের কাছে ফাঁস করি। প্রথমে প্ল্যান করেছিলাম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, খুন, রহস্য— সব সাজানো থাকবে একেবারে লাইন ধরে। সেই ছেলেবেলায় যেভাবে রেলগাড়ি খেলতাম, ঠিক তেমনই। কিন্তু লেখার টেবিলে বসতেই যেন শব্দগুলো দল বেঁধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে শুরু করল।
খলনায়ক, ভিক্টিম, গোয়েন্দা… সবাই মিলেমিশে এমনভাবে মাথার ভেতর নাচতে থাকল যে মাঝে মাঝে মনে হতো, এই উপন্যাস আমি আর লিখছি না। উপন্যাসের চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে দিব্যি নিজের খেয়ালে অশৈলী ব্যাপার-স্যাপার ঘটাচ্ছে, আর আমি হা-ক্লান্ত দর্শক হয়ে ব্যাকসিটে বসে পেনসিল চিবোচ্ছি।
মাঝে মাঝে গল্পের টুইস্ট আমারই পিলে চমকে দেয়। জমজমাট থ্রিলার লিখতে লিখতে আমি একসময় আমার বউ, পাড়ার কাকিমা, দুধওয়ালা, মুদির দোকানদার, মায় পোষা বিড়ালটাকেও ভয়ানক সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করি। গল্প যত ক্লাইম্যাক্সের দিকে এগোয়, ততই আমার ঘুম কমে যায়। কফির খরচ বেড়ে যায়। গুগল সার্চ-হিস্ট্রি দেখে মনে হয়, আমিই বোধহয় দেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধী।
‘ক্রসফায়ার’ লেখার সময় এই পুরো অভিজ্ঞতা আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। কারণ, এবার যে তূর্যকে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে, সে কিন্তু আগের সেই তরুণ, উদ্যমী, জীবনকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরা তূর্য নয়। ‘নিশিচর’-এর তূর্য ছিল প্রাণবন্ত, স্বপ্নিল, লড়াকু। কিন্তু এক দশক পার হতে না হতেই জীবন তাকে এমনভাবে ভেঙে দিয়েছে যে, সে আর সেই মানুষটা নেই।
এই উপন্যাসের তূর্য এখন এক জীবনবিমুখ মানুষ। জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সে ক্লান্ত, ভঙ্গুর। পেশাদারি জীবনের ব্যর্থতা তাকে নেশার আশ্রয়ে ঠেলে দিয়েছে। আর এই অবস্থাতেই তাকে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ হয়তো তার শেষ পদক্ষেপ হতে পারে।
যাই হোক, গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে বিস্তর যুক্তি-তর্ক, লড়াই-ঝগড়ার পর শেষমেশ একটা সমঝোতায় পৌঁছনো গেছে। মাথার মধ্যে ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকা প্লটখানাও কোনও এক অদ্ভুত জাদুতে পরিণত এবং পরিপক্ক হয়েছে। কখনও বিস্ময়ে, কখনও আতঙ্কে, কখনও আবার সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে হাবুডুবু খাওয়ার এই অনিশ্চয়তাই হয়তো থ্রিলারের সৌন্দর্য।
এই উপন্যাসের ভূমিকায় যার প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানানো আইনত অপরাধ হবে, সেই মানুষটার নাম শৈলী মুখার্জি। আমার ধর্মপত্নী। যার নিরন্তর ‘ওগো লেখো গো! কদ্দুর হল?’ ধরনের বাণী আমায় ক্রমাগত উজ্জীবিত করে গেছে। নিন্দুকেরা যাকে বলে মুখঝামটা, আর আমি বলি উৎসাহ, সেটি ছাড়া এই উপন্যাসের একটা অধ্যায়ও সম্পূর্ণ হতো কিনা সন্দেহ!
বইটা ভালো লাগলে বন্ধুদেরও কিনিয়ে ছাড়ুন (ধার দেবেন না। প্রথমত, বই ধার দিয়েছেন কি ফেঁসেছেন। দ্বিতীয়ত, বই ভালো বিক্রি হলে এই গরিব লেখক পাঁচ-দশ পয়সা রয়্যালটি পায়)। আর খারাপ লাগলে মন খুলে এসে আমাকে গালি দেবেন। আমি মাথা পেতে নেব।
রণদীপ নন্দী
ডিসেম্বর, ২০২৫



Leave a Reply