ত্রয়োদশ পর্ব – পেনড্রাইভ

ত্রয়োদশ পর্ব – পেনড্রাইভ

মধ্য কলকাতার বউবাজার অঞ্চলের এই পুরোনো দোতলা বাড়িতে শ্যাডোরা তাদের সেফ হাউজ বানিয়েছে। বাড়িটার পেছনে একটা সরু গলি, আর সামনের চওড়া রাস্তা জুড়ে লোকজনের ভিড়। এমারজেন্সি সিচুয়েশনে পালানোর জন্য দুটো রাস্তাই খোলা থাকবে। জানালাগুলো থেকেও রাস্তার ওপর পুরো নজর রাখা যায়। ঘরের ভেতরে একটা বড় টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো কাগজপত্র, ল্যাপটপ, আর কলকাতার একটা বিশাল ম্যাপ।

তূর্য টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ম্যাপটা দেখছিল। শ্যাডো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাস্তায় নজর রাখছে। তার হাতে একটা ছোট বাইনোকুলার। স্যাম ল্যাপটপে কিছু একটা টাইপ করছে অনেকক্ষণ ধরে।

তূর্য কথা শুরু করল, ‘ব্যাপারটা হল, প্রিয়া একজন ট্রেইনড এজেন্ট ছিল। সে জানত যে এই মিশনটা অসম্ভব ডেলিকেট। সুতরাং তার পিছনে লোক লাগাটাই স্বাভাবিক। এমনকী যে কোনও সময়ে তার ওপরে হামলা পর্যন্ত হতে পারে। এমন অবস্থায় সে পেনড্রাইভটা এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখবে, যেটা বাইরের লোকের থেকে নিরাপদ। কিন্তু যেটা তার কাছের মানুষেরা বা এক্ষেত্রে কলিগরা খুঁজে পেতে পারবে।’

‘কিছু একটা প্যাটার্ন তো আছেই। যেটা হয়তো সামনেই আছে অথচ আমরা ব্রেক করতে পারছি না।’ বলল স্যাম।

‘এক্স্যাক্টলি। আচ্ছা এলেনা, যেদিন শ্যামবাজারে ম্যাসাকারটা হয়, সেদিন বা তার আগেরদিন আপনার সঙ্গে যখন প্রিয়া কথা বলছিল; তখন এমন কিছু কথা বলেছিল কি, যেটা আপনার অসংলগ্ন বলে মনে হয়েছিল? অর্থাৎ বাকি কথাগুলোর সঙ্গে আপনি সেই কথাটার কনটেক্সট মেলাতে পারেননি।’ জিগ্যেস করল তূর্য।

‘নাহ! কই, সেরকম কিছু তো মনে পড়ছে না।’ এলেনা মাথা নাড়ল।

তূর্য একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়ায় শ্যাডো বলে উঠল, ‘আসলে মোহিনী সোলো বার্ড ছিল। শুধু মিশন সংক্রান্ত আপডেটের বাইরে ওর সঙ্গে পার্সোনাল কথা তেমন হতো না। অথচ যেদিন শ্যামবাজারের ইনসিডেন্টটা হয়, তার আগেরদিন সকালে মোহিনী আমায় ফোন করেছিল। আমি ফোন ধরে হ্যালো বলতেই বলেছিল, “শ্যাডো, আমি জোড়াবাগান নিমতলা ঘাটের উলটোদিকে যে ফিট-এক্স জিম আছে, সেখানে ভর্তি হলাম।” আচমকা কথাটা শুনে আমি প্রথমে যে একটু অবাক হইনি তা নয়। আসলে ওই যে বললাম, কাজের বাইরে এই ধরনের পার্সোনাল খোশগল্প একদমই করত না মোহিনী। যাই হোক, তারপর ভাবলাম হতেই পারে, কোনও কারণে টিম মেম্বারদের সঙ্গে একটু ফ্রি হতে চাইছে সে।

‘আমিও তখন বললাম যে গুড ফর ইউ। আমাদের একটা মিনিমাম ফিটনেস ট্রেনিং রেগুলারলি করতেই হয়। জিমে গিয়ে ফ্রি-হ্যান্ড করলে আরও ফ্লেক্সিবিলিটি আসবে। দেখলাম, সেসবের তেমন উত্তর না দিয়ে হুঁ-হাঁ করে মোহিনী ফোনটা রেখে দিল। ঘটনাটা একটু অদ্ভুত ঠেকলেও আমি তখন ব্যাপারটাকে ততটা গুরুত্ব দিইনি।’

কথাটা শুনেই চকচক করে উঠল তূর্যর চোখ।

‘থ্যাংক ইউ শ্যাডো! এই ইনফরমেশন সত্যিই সবটা পরিষ্কার করে দিল।’ তূর্য এগিয়ে এসে শ্যাডোর সঙ্গে হাত মেলাল।

‘কিন্তু অত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস মোহিনী জিমে ফেলে আসবে? বেপারটা কেমন অড না? আর জিম কি ক্লাসিফায়েড এভিডেন্স রাখার জায়গা?’ জিগ্যেস করল এলেনা।

‘ফেলে কেন আসবে? জিমে পার্সোনালাইজড লকার নেওয়া যায়, ভুলে গেলেন? জিনিসটা নিরাপদও থাকল, আবার সকলের সন্দেহের ঊর্ধ্বেও থাকল।’ বলল তূর্য।

শ্যাডো এসে তূর্যর পিঠ চাপড়ে দেয়, ‘ব্রাভো ফেলুদা!’ স্যামও ততক্ষণে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছে।

অরিন্দম চ্যাটার্জি ক্লান্ত পায়ে বউবাজার বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। সন্ধে সাড়ে সাতটা। অফিসের কাজ আজ একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। রিপোর্ট ফাইনালাইজ করতে করতে সময় চলে গেছে। এখন বাড়ি ফিরতে হবে। আজকাল এই বাড়ি ফেরার সময় এলেই একটা অচেনা অস্বস্তি তাকে আঁকড়ে ধরে। বুকের মধ্যে একটা গভীর ক্ষত দগদগে ঘায়ের মতো টাটিয়ে ওঠে। তাই আজকাল যতক্ষণ সম্ভব অফিসেই কাটিয়ে দেয় সে। দিনের শেষে অফিসে তালা পড়লে তখন খানিকটা অনিচ্ছুক পদক্ষেপেই বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

বাস এল। ঠাসাঠাসি ভিড় সামলে বাসে উঠে এক কোণে কোনওমতে দাঁড়াল অরিন্দম। কলকাতার সন্ধের বাসের এ এক চিরচেনা দৃশ্য। বাস ছেড়ে দিয়েছে। অরিন্দম খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার রাস্তাঘাট কেমন যেন পালটে যায়। গাড়ির লাইন, হকারদের ডাকাডাকি, বাসের পাদানিতে কোনওমতে জুতোর আগা ঠেকিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড়— সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক পরিবেশ। রাতের আঁধার নামলেই ঘুম ভেঙে গা ঝেড়ে এই শহরের বুক চিরে জেগে ওঠে অন্য এক তিলোত্তমা।

অরিন্দমের কিন্তু এসবের দিকে বিশেষ খেয়াল ছিল না। তার মনে একটা চাপা অস্বস্তি বাসা বেঁধেছে গত কয়েকদিন ধরে। তূর্যকে ফোনে কিছুতেই পাচ্ছে না সে। তার বাড়িতেও গিয়েছিল অরিন্দম। ছাতুদা নামের যে মানুষটার সঙ্গে তূর্যর বাড়িতে আলাপ হয়েছিল, তিনিও জানেন না তূর্য কোথায়! তবে ছাতুদা জানালেন, এটা নাকি প্রথমবার নয়। এর আগেও এভাবে বার দুয়েক কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও হয়েছে তূর্য।

এদিকে আরভের অপহরণের পর কতদিন কেটে গেছে! থানার চক্কর কাটতে কাটতে জুতোর সুখতলা খুইয়ে ফেলেছে অরিন্দম। কিন্তু এখনও অবধি কোনও সুরাহা হয়নি। দ্বৈপায়নবাবু, মানে বর্তমান কেস অফিসার ভালো মানুষ। অরিন্দমের এতবার যাওয়াতেও বিরক্ত হননি। তবে কেসের কোনও অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তার গোটা ফ্ল্যাট এখনও ওইরকমই তছনছ হয়ে পড়ে রয়েছে। সবকিছু আবার গুছিয়ে নেওয়ার মতো শক্তি আর অরিন্দমের মধ্যে অবশিষ্ট নেই।

বাস এগিয়ে চলেছে। অরিন্দম এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই যখন আলগোছে চারিদিকে নজর বুলাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার নজর পড়ল লোকটার ওপর। পেছনের সিটে বসে আছে। সাদা শার্ট, নীল জিনস। চেহারা এমনিতে সাধারণ। কিন্তু অরিন্দমের ভীষণরকম মনে হতে লাগল, এই লোকটাকে সে আগেও কোথাও দেখেছে। মনে করার চেষ্টা করল সে। তারপর হঠাৎই মনে পড়ল। আর পড়তেই একরাশ আতঙ্ক জাঁকিয়ে বসল তার মস্তিষ্কে। এই লোকটাকে সে অবচেতনে অন্তত বার তিনেক দেখেছে গত দু’দিনে। কখনও বাস স্টপে, কখনও কোনও পানের দোকানে, আবার কখনও তার নিজের বাড়ির গলিতে।

লোকটা কি তাকে ফলো করছে? কিন্তু কেন? এই কি সেই লোক যে তার বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর করেছিল? এই কি সেই লোক যে আরভকে…

আর ভাবতে পারছে না অরিন্দম। সে বুঝতে পারছে, তার হাত-পা কাঁপছে। হাতের তালু ঘেমে যাচ্ছে এই শীতেও। মুখের ভিতর একটা তেতো স্বাদ অনুভব করছে অরিন্দম। সে বারবার অবচেতনেই মাথা ঘুরিয়ে লোকটার দিকে তাকাচ্ছিল। একবার চোখাচোখি হয়ে গেল। লোকটা অরিন্দমের দিকেই তাকিয়ে ছিল আড়চোখে। চোখে চোখ পড়তেই এবার লোকটা চোখ নামিয়ে নিজের ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। না, এটা কাকতালীয় ঘটনা নয়। লোকটা তাকে ফলোই করছে।

সে পকেট থেকে ফোন বের করল। তূর্যর নম্বরে ফোন করল আরেকবার। নাহ! যান্ত্রিক সুরেলা কণ্ঠ জানিয়ে দিল, তূর্যর ফোন সুইচড অফ।

অরিন্দম আবার পেছনে তাকাল। লোকটা এখন উঠে দাঁড়িয়েছে। যেন নামবে পরের স্টপেজে। কিন্তু তার চোখ এখনও অরিন্দমের ওপর স্থির। অরিন্দম সিদ্ধান্ত নিল, তাকে এখান থেকে নামতে হবে। সরাসরি বাড়ি যাওয়া যাবে না। লোকটা তাকে ফলো করছে, এই ব্যাপারে আর কোনও সন্দেহ নেই। বাস পরের স্টপেজে থামল। অরিন্দম দ্রুত নামল। দরজা দিয়ে নেমেই দৌড়াতে শুরু করল সে। পেছনে তাকাল না।

পেছন থেকেও দৌড়ানোর আওয়াজ এল। কেউ তাকে তাড়া করছে। অরিন্দম এবার আরও গতি বাড়াল। এগিয়ে চলল ফুটপাত ধরে। মানুষ ধাক্কা খেয়ে সরে যাচ্ছে। চিৎকার করে গালাগালি করছে। কিন্তু অরিন্দম থামল না। এবার সে বাঁক নিয়ে একটা সরু গলিতে ঢুকল। গলিটা সামান্য অন্ধকার। তবে ভিড় কম, ফলে দৌড়ানো সহজ।

পেছনে এখনও পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এবার সেটা খুব কাছে এসে গেছে। অরিন্দমের শ্বাস ফুরিয়ে আসছিল। সে নিয়মিত এক্সারসাইজ করে না। দৌড়ে অভ্যস্ত নয়। কতক্ষণই বা এরকম প্রাণপণে দৌড়াতে পারবে? আবার একটা বাঁক নিল সে। আরেকটা গলি। এবার আরও সরু। দু’পাশে সারি সারি দোকান। তবে বেশিরভাগই বন্ধ। অরিন্দম হাঁপাচ্ছে। তার পা ব্যথা করছে।

হঠাৎ সামনে একটা কালো রংয়ের গাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়িটা ব্রেক কষে থামল অরিন্দমের একদম সামনে। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে না নিলে গাড়িটার সঙ্গে প্রায় ধাক্কা খেতে বসেছিল সে। ড্রাইভারের সাইডের জানালা নামিয়ে ভেতর থেকে একটা মুখ বেরিয়ে এল। চশমা পরা মধ্যবয়সি মানুষ। অরিন্দমকে এভাবে দৌড়াতে দেখে খানিক অবাক হয়েছেন, বোঝাই যাচ্ছে।

‘কী হয়েছে? আপনি ঠিক আছেন?’ লোকটা জিগ্যেস করল।

অরিন্দম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমাকে কেউ তাড়া করছে… প্লিজ… হেল্প!’

লোকটা এবার অরিন্দমের পেছনে তাকাল। দেখল, সত্যিই সাদা শার্ট-নীল জিনস পরা একটা লোক দৌড়ে আসছে। মাত্র মিটার পঞ্চাশেক দূরেই রয়েছে লোকটা।

‘গাড়িতে উঠে আসুন! তাড়াতাড়ি!’

অরিন্দম পেছনের দরজা খুলল। প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল গাড়িতে। দরজা বন্ধ করল সশব্দে। ড্রাইভার অ্যাক্সিলারেটরে পা দিল। রাস্তার সঙ্গে টায়ারের ঘর্ষণের একটা বিশ্রী শব্দ করে ছুটে চলল গাড়িটা।

রিয়ার উইন্ডো দিয়ে অরিন্দম পেছনে তাকাল। সাদা শার্ট দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে-ও হাঁপাচ্ছে। অরিন্দম দেখল, সে ফোন বের করে কাউকে কল করছে।

অরিন্দম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, ‘থ্যাংক ইউ! থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি আমার জীবন বাঁচালেন।’

ড্রাইভার মাথা নাড়ল, ‘আরে না না! কিন্তু ওই লোকটা কে? আপনাকে তাড়াই বা করছিল কেন?’

‘আমি সত্যিই জানি না দাদা।’ অরিন্দম অসহায় গলায় বলল।

‘আজকাল কলকাতায় ছিনতাইবাজ এত বেড়ে গেছে! হয়তো চাকু দেখিয়ে আপনার সর্বস্ব লুঠ করত। যাই হোক, আপনাকে কোথায় নামিয়ে দেব?’

‘এমজি রোডে। আমার বাড়ি ওখান থেকে কাছেই। আমি হেঁটে চলে যাব।’

‘ওকে।’

গাড়ি এগিয়ে চলল। অরিন্দম পেছনের সিটে বসে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। এখনও তার হাত-পা কাঁপছে।

অরিন্দম চোখ বুজল। কিন্তু তারপর গাড়ি হঠাৎ ডানদিকে বাঁক নিল। একটা সরু গলিতে ঢুকল।

অরিন্দম সোজা হয়ে বসল, ‘কোথায় যাচ্ছেন? এমজি রোড তো সোজা।’

‘শর্টকাট।’ ড্রাইভার বলল, ‘এই রাস্তা দিয়ে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে।’

‘এখান থেকে আমার বাড়ি এক কিলোমিটারও নয়। এর জন্য শর্টকাটের কী দরকার? আপনি বরং আমায় এখানেই নামিয়ে দিন। আমি হেঁটে চলে যাচ্ছি।’

‘আরে ডোন্ট ওয়ারি। আমি রোজ এদিক দিয়ে যাই।’ লোকটা খুব শান্ত স্বাভাবিক স্বরে বলল।

বলতে বলতেই গাড়ি আরও একটা বাঁক নিল। এবার একদম অন্ধকার একটা গলিতে ঢুকে পড়ল। দু’পাশে পুরোনো বাড়ি। বেশ শুনশান পরিবেশ।

‘আপনি আমায় নামিয়ে দিন। আমার বাড়ি তো এদিকে নয়। আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?’ অসহায় গলায় জিগ্যেস করল অরিন্দম।

ড্রাইভার এবার কোনও উত্তর দিল না।

অরিন্দম দরজার হ্যান্ডেল ধরে টেনে খুলতে চেষ্টা করল। কিন্তু দরজা লক করা। তাও দরজা খোলার নিষ্ফল চেষ্টা করতে করতেই সে চিৎকার করল, ‘দরজা খুলুন! আমাকে নামিয়ে দিন!’

এবার অরিন্দম পকেট থেকে মোবাইল বের করল। অফিসার দ্বৈপায়ন সাহার নম্বরটা সার্চ করতে লাগল। ঠিক তখনই একটা গন্ধ পেল সে। মিষ্টি, অথচ তীব্র। গাড়ির ভেতরে গন্ধটা বাঁধভাঙা বন্যার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তে অরিন্দমের মাথা ঘুরতে লাগল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল। জিভ জড়িয়ে গেল।

‘আপনি… কী… করছেন…’ অরিন্দম জড়ানো গলায় বলল।

এবার ড্রাইভার পেছনে ফিরে তাকাল। অরিন্দম দেখল, তার মুখে একটা কালো রঙের গ্যাসমাস্ক। অরিন্দম আরও কিছু বলতে চাইল। কিন্তু তার গলা থেকে কথা বেরোল হল না। শরীর ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।

তারপর… সব অন্ধকার।

জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের পরিবেশ কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে অরিন্দমের। ধাতস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে তার। তারপর আস্তে আস্তে চোখের সামনে সম্পূর্ণ ঘরটা একটু একটু করে স্পষ্ট হতে থাকে। সে বসে আছে একটা সোফার ওপর। ঘরটা প্রায় ফাঁকা। সোফার ঠিক মুখোমুখি একটা দরজা। দরজার ডানদিকে একটা ছোট টেবিল, টেবিলের ওপর একটা টেবিল ল্যাম্প রাখা। সেই ল্যাম্পের আবছা কালচে- হলুদ আলোয় তার নিজের ছায়া পিছনের দেওয়ালে একটা বিশাল কালো অবয়ব তৈরি করেছে। তার নিজের শরীরের মৃদু মৃদু কম্পন সেই কালো অবয়বের মধ্যে যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেটাও অরিন্দমের শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মৃদু মৃদু দুলছে।

দরজার ডানপাশে আরেকটা কাঠের চেয়ার রাখা। মজবুত গড়ন, মোটা কাঠের হাতল। এতটা দূরে বসেও অরিন্দম স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে দরজাটা সামান্য খোলা রয়েছে। ও-প্রান্তের উজ্জ্বল আলো চুঁইয়ে ঢুকছে সেই ফাঁক গলে। ততক্ষণে অরিন্দম বুঝে গেছে যে সে অপহৃত হয়েছে। আর সেই ব্যাপারটা অনুধাবন করা মাত্রই তার সারা শরীর বেয়ে একটা ভয়ের শিহরন খেলে গেল। এক ঝটকায় সে সোফা থেকে উঠতে চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। তার হাত-পা বাঁধা নেই বটে, কিন্তু শরীর সায় দিচ্ছে না। একটা অদ্ভুত নেশার বাঁধনে বন্দি হয়ে রয়েছে তার শরীর।

আজ থেকে মাসখানেক আগে হলে এই মুহূর্তে অরিন্দম নিজের ওপর সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস হারিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যেত। কিন্তু এখন সে অদ্ভুতভাবে আবিষ্কার করল যে এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তার নার্ভ একদম ঠান্ডা রয়েছে। সে সোফা ছেড়ে আর ওঠার চেষ্টা করল না। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ঘরটাকে ভালো করে দেখতে লাগল।

সোফা, চেয়ার এবং দূরে ওই টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পটা ছাড়া ঘরে অন্য কোনও আসবাব নেই। অরিন্দম মাথা ঘুরিয়ে সোফার পিছনের দেওয়ালটা দেখল। তার নেশা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। চোখের সামনে সবকিছু হঠাৎ মৃদু মৃদু দুলে উঠছে। মাঝে মাঝে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। সে দু’হাতে চোখ কচলে দেওয়ালের গায়ে হাত বুলাতে লাগল। অসমান খসখসে দেওয়াল।

খানিক অপেক্ষা করে হাত-পায়ের সার ফিরে এলে অরিন্দম উঠে দাঁড়াল। তখনও তার পা কাঁপছে। দেওয়াল ধরে ধরে সে দরজার কাছে গেল। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। একটা লম্বা করিডোর। সামনে সিঁড়ি নীচে নেমে গেছে। সে সিঁড়ির রেলিং ধরে ধীরে ধীরে নামতে লাগল। নীচে একটা বেশ বড় ঘর। একদিকে সোফা, টেবিল, টিভি। অন্যদিকে ছোট সরু একফালি রান্নাঘর। রান্নাঘরের দিক থেকে বাসনের আওয়াজ আসছে। কেউ কি রান্না করছে?

অরিন্দম সেদিকে এগোল। তারপর রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াতেই দেখল, ভেতরে একজন লোক চা বানাচ্ছে। পিঠ ফেরানো অরিন্দমের দিকে। কিন্তু অরিন্দম তাকে চিনতে পারল। এই সেই সাদা শার্ট-নীল জিনস, যে তাকে ফলো করছিল।

লোকটা এবার ঘুরে তাকাল। অরিন্দমকে দেখে একটা চওড়া হাসি হাসল। একটা অদ্ভুত আন্তরিকতা আছে লোকটার হাসিতে, ‘আরে! উঠে পড়েছেন? ভালো ঘুম হয়েছে তো?’

তাপ-উত্তাপহীন স্বাভাবিক গলায় লোকটা এমনভাবে প্রশ্নটা করল যেন পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে।

অরিন্দম রাগে চিৎকার করতে চাইছিল। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে সে কঠোর গলায় জিগ্যেস করল, ‘কে তুমি? আমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে?’

লোকটা হাসতে হাসতে কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘আরে বাবা, এত রাগ করছেন কেন? চা খাবেন? আমি কিন্তু দারুণ চা বানাই।’

‘আমি তোমার চা খেতে চাই না! আমি শুধু জানতে চাই, এখানে কেন আনা হয়েছে আমাকে!’ অরিন্দম এবার আরও জোরে বলল।

লোকটা চায়ের কাপ নিয়ে টেবিলে রাখল। তারপর অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে। কৌতুকের ভঙ্গিতে বলল, ‘বাপ রে! কী দৌড়ই না করালেন আজ। যখন আর্মিতে ছিলাম, তখনও ইনস্ট্রাক্টর এত দৌড় করায়নি। আমার পা এখনও ব্যথা করছে।’

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকটা তাকে নিয়ে মজা করছে! এত সিরিয়াস পরিস্থিতিতেও? অরিন্দমের রাগটা আরেক পরদা চড়ে গেল, ‘এটা তোমার কাছে মজার লাগছে? তুমি জানো, আমি পুলিশে কমপ্লেইন করতে পারি?’

‘করতে পারেন।’ লোকটা স্বীকার করল, ‘কিন্তু করবেন না। কারণ তাতে উলটে আপনারই বিপদ বাড়বে।’

অরিন্দম থমকে গেল, ‘মানে?’

লোকটা চায়ের কাপ তুলে নিল। একটা চুমুক দিয়ে নিজেরই তারিফ করে বলল, ‘আহা, পারফেক্ট! বসুন। আমরা একটু কথা বলি।’

‘আমি বসতে চাই না। আমি শুধু জানতে চাই…’

‘আপনার ছেলে কোথায়? তাই তো?’ লোকটা কথাটা শেষ করল।

অরিন্দমের হৃৎস্পন্দন থেমে গেল, ‘আরভ? তুমি… তুমি কি জানো আরভ কোথায়?’

লোকটা উত্তর না দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে যেতে লাগল সশব্দে। অরিন্দম এবার এগিয়ে এল। লোকটার কলার ধরে বলল, ‘আরভ কোথায়? তুমি যদি তার কোনও ক্ষতি করে থাকো…’

‘রিল্যাক্স!’ লোকটা শান্ত গলায় বলল। অরিন্দমের হাত থেকে নিজের কলারটা ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল, ‘আরভ পারফেক্টলি সেফ আছে। দাঁড়ান, আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’

লোকটা হলের দিকে এগোল। অরিন্দম পেছনে পেছনে গেল। সে বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। এবার লোকটা একটা দরজার সামনে এসে থামল। তারপর দরজায় হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গীতে বলল, ‘রেডি?’

অরিন্দম কিছু বলল না। শুধু একরাশ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।

এবার দরজা খুলে দিল লোকটা। ভেতরে একটা ছোট্ট ঘর। খোলা জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে। সেই ঘরে একটা খাটের ওপর একটা ছোট্ট বাচ্চা শুয়ে আছে। কম্বল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে।

অরিন্দম দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। বাচ্চাটাকে দেখেই তার বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল। সেই ছোট্ট মুখ, কোঁকড়ানো চুল, গোলাপি গাল। সে এবার ছুটে গেল খাটের কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপা হাতে আরভের মুখ স্পর্শ করল।

‘আরভ… বাবু!’ তার গলা ভেঙে গেল কান্নায়।

আরভ এবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তারপর অরিন্দমকে দেখেই, ‘পাপা!’ বলে চিৎকার করে উঠল। এক ঝটকায় লাফিয়ে উঠে বাবাকে জড়িয়ে ধরল সে। অরিন্দমও তাকে বুকে চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে।

‘তুমি এসে গেছ পাপা! তুমি এসে গেছ!’

‘হ্যাঁ বাবু। পাপা এসে গেছে। এবার তোমার কিচ্ছু হবে না। কেউ তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’

আরভ এবার মুখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকাল, ‘পাপা, তুমি জানো? তূর্য আঙ্কেল আমাকে ব্যাড পার্সনদের কাছ থেকে সেভ করে এনেছে। এই আঙ্কেলটা তূর্য আঙ্কেলের ফ্রেন্ড। এরা সবাই খুব ভালো।’

অরিন্দম চোখ মুছে এবার লোকটার দিকে তাকাল। বলল, ‘সরি! আমি তোমায় না বুঝে অনেক কথা বলে ফেলেছি…’

লোকটা হাসল, ‘নো চাপ। আমাদের ডিউটিই আপনাদের সেফ রাখা। বাই দ্য ওয়ে, আমায় আপনি ডেল্টা বলে ডাকতে পারেন।’

‘আচ্ছা, তাহলে… তাহলে এইসব করলে কেন? আমাকে তাড়া করা, গাড়িতে আমায় অজ্ঞান করা…’

ডেল্টা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। হলে এসে সোফায় বসল। ইশারা করল অরিন্দমকেও বসতে, ‘আসুন। আমি বলছি।’

অরিন্দম আরভকে কোলে নিয়েই সোফায় বসল। ডেল্টা সামনে ঝুঁকে বলতে লাগল, ‘দেখুন, আরভকে উদ্ধার করার পর আমরা জানতাম যে যারা ওকে কিডন্যাপ করেছিল তারা রিভেঞ্জ নেবে। কোনওভাবেই তারা চুপ করে বসে থাকবে না। তাই আপনাকে আর আরভকে প্রোটেক্ট করার ব্যবস্থা করতে হয়েছে আমাদের।’

‘আপনারা কি পুলিশ?’

‘নাহ! তবে আমরা সরকারের হয়েই কাজ করি। যাই হোক, আমি আপনাকে ফলো করছিলাম প্রোটেকশনের জন্য। কিন্তু আপনি ভেবেছিলেন, আমি শত্রু।’

‘সেটা তো আমাকে বললেই…’

‘আপনাকে বললেই আপনি বিশ্বাস করতেন? যদি আমি হঠাৎ রাস্তায় উদয় হয়ে বলতাম, “নমস্কার, আমি গভর্নমেন্ট সিক্রেট সার্ভিসে কাজ করি। আপনার ছেলেকে আমরা রেসকিউ করেছি। কিন্তু আপনার এবং আরভের ওপর হামলা হওয়ার পসিবিলিটি রয়েছে বলে আমার সঙ্গে আমাদের সেফ হাউজে চলুন,” আপনি বিশ্বাস করতেন?’

অরিন্দম কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর মাথা নাড়ল।

‘এক্স্যাক্টলি।’ ডেল্টা বলল, ‘আপনি চ্যাঁচামেচি শুরু করতেন। লোকজন ডাকতেন। তাহলে পুরো অপারেশনটাই কমপ্রোমাইজড হয়ে যেত।’

অরিন্দম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘তূর্য কোথায়? আমি বেশ কয়েকদিন ধরে ওকে কল করার চেষ্টা করেছিলাম। ফোন সুইচড অফ বলছে।’

‘তূর্যর কাজ এখনও শেষ হয়নি। পুরো অপারেশন শেষ না হলে আপনাদের ওপর এই থ্রেট চলতেই থাকবে। আপনি আর আরভ কখনওই সম্পূর্ণ নিরাপদ হবেন না।’

‘এখন কোথায় আছে তূর্য?’ অরিন্দম জিগ্যেস করল।

‘সেটা আমি বলতে পারব না। মিশন শেষ হলে তূর্য নিজেই এসে আপনাদের সঙ্গে দেখা করবে।’

কথাটা বলে ডেল্টা নিজের ফোন বের করে একটা নম্বর ডায়াল করল, ‘শ্যাডো, ফরওয়ার্ড দ্য কল টু মিস্টার টি।’

তারপর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষার পর সে মোবাইলটা অরিন্দমের দিকে বাড়িয়ে দিল, ‘নিন। তূর্যর সঙ্গে কথা বলুন।’

অরিন্দম ফোন নিল, ‘হ্যালো? তূর্য?’

‘হ্যাঁ রে ভাই, বল। ঠিক আছিস তো? আরভকে ফিরে পেয়ে কেমন লাগছে?’

‘তূর্য… তুই জানিস না আমি কতটা কৃতজ্ঞ তোর কাছে। তুই আমাকে…’ অরিন্দমের গলা ভারী হয়ে এল।

‘আরে ধুর পাগলা! এত ভাবিস না। আর আমি একা নই। সবাই মিলেই আরভকে উদ্ধার করেছি। শোন, আমি জানি তুই অনেক স্ট্রেস আর ভয়ের মধ্য দিয়ে গেছিস। তাছাড়া ডেল্টা তোকে যেভাবে এখানে এনেছে, সেটা একটু… ইয়ে মানে, আনকনভেনশনাল ছিল। কিন্তু সেটা তোদেরই সেফটির জন্য।’

‘আমি বুঝেছি। ডেল্টা বলেছে আমায়।’ অরিন্দম বলল।

‘গুড। তুই আর আরভ এখন সেফ হাউজে থাকবি। ডেল্টা তোদের চব্বিশ ঘণ্টা প্রোটেকশন দেবে। খাবার, থাকার, সবকিছুর ব্যবস্থা আছে।’

‘কিন্তু কতদিন?’ অরিন্দম জিগ্যেস করল।

‘এক সপ্তাহ। ম্যাক্সিমাম।’ তূর্য বলল, ‘ততদিনে আমরা পুরো থ্রেট নিউট্রালাইজ করে ফেলব। তারপর তুই আর আরভ নরমাল লাইফে ফিরে যেতে পারবি।’

‘কিন্তু কীসের থ্রেট? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘ভাই, আমি তোকে পরে সব বুঝিয়ে বলব। এখন কিছু জিগ্যেস করিস না।’

‘ঠিক আছে। তুই সাবধানে থাকিস ভাই।’

‘একদম! যখন সব শেষ হবে, আমি প্রমিস করছি, তুই, আমি, সন্তোষ, পার্থ সবাই মিলে একটা পার্টি করব। কতদিন হয়ে গেল স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না।’

অরিন্দম হাসল। অনেকদিন পর প্রথমবার হাসল, ‘ওকে। আমি অপেক্ষা করব।’

‘ওকে ব্রাদার। কথা হচ্ছে।’ লাইন কেটে গেল।

অরিন্দম ডেল্টাকে ফেরত দিল ফোনটা। ডেল্টা বলল, ‘আমি আপনার জন্য একটা রুম দেখিয়ে দিচ্ছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিন। আমার হাতের রান্না খেলে বুঝবেন। কোথায় লাগে ভজহরি মান্না!’

ডেন্টার কথার ধরনে অরিন্দম হেসে উঠল। তারপর তারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *