নবম পর্ব – ইউ আর আ মনস্টার!
দোতলা বাড়ি। কিন্তু বেশ পুরোনো। জায়গায় জায়গায় দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে । লাল ইটের পাঁজর বেরিয়ে আছে অসহায়ভাবে। সামনের লোহার গেটটার রং একসময় কী ছিল বলা কঠিন। এখন সময়ের আঘাতে মরচে পড়ে সেটা প্রায় কালো হয়ে গেছে। পাঁচিলের ওপরের অংশটা ঝুঁকে আছে একদিকে, যেন যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। বাড়ির সামনে যেটা এককালে বাগান ছিল, এখন সেখানে আগাছা, কাঁটাঝোপ আর শুকনো পাতার স্তূপ।
‘এটা কোন জায়গা?’ জিগ্যেস করল তূর্য।
‘সেফ হাউজ।’ শ্যাডোর সংক্ষিপ্ত জবাব।
‘দেখে তো খুব একটা সেফ বলে মনে হচ্ছে না। পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে শেষে ভূতের হাতে মারতে চান নাকি?’
‘আজ পর্যন্ত কোন গোয়েন্দা গল্পে দেখেছেন যে গোয়েন্দা ভূতের কবলে পড়ে মারা পড়েছে? নেমে আসুন চুপচাপ।’
গাড়ি থেকে নামল দুজনে। গাড়িটা ইউটার্ন নিয়ে যেদিক থেকে ওরা এসেছিল, শুকনো ধুলো উড়িয়ে সেদিকেই ফিরে গেল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল তূর্য। এই জায়গাটা গ্রামের একদম বাইরে। কোথাও কোনও মানুষজন নেই। দূরে একটা পুকুর দেখা যাচ্ছে। তার ধারে কয়েকটা নারকেল গাছ। কলকাতার এত কাছে এরকম একটা জায়গা আছে, না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।
‘আসুন আমার সঙ্গে।’ শ্যাডো বলল।
সে গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। গেটটা ঠেলতেই সেটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে প্রবল আপত্তি জানিয়ে কোনওমতে খুলল। ভিতরে ঢোকার পথটা পরিষ্কার করা। মানে, আগাছার ভিতর দিয়ে একটা সরু পথ কাটা হয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, মাঝেমধ্যেই এখানে মানুষের আসা যাওয়া আছে।
ঢুকেই একটা প্রশস্ত করিডোর। করিডোরের শেষে একটা ঘর। দরজা বন্ধ। শ্যাডো দরজায় একটা বিশেষ ছন্দে টোকা দিল। ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিল কেউ।
ভিতরে ঢুকে তূর্য চমকে গেল।
বাইরে থেকে যা দেখেছিল, ভিতরটা ঠিক তার উলটো। পরিষ্কার, গোছানো। দেওয়ালে সাদা পেইন্ট। মেঝেতে নতুন কার্পেট। কোনায় একটা লম্বা টেবিল, তার ওপর খোলা ল্যাপটপ, কিছু ইলেকট্রনিক গ্যাজেট।
ঘরের মাঝখানে আরেকটা বড় টেবিল। তার চারপাশে ছ’টা চেয়ার।
‘ওয়েলকাম।’ একজন মহিলা এগিয়ে এল।
লম্বা, ফর্সা, ধূসর চোখ। চুল ছোট করে কাটা। পরনে জিনস আর কালো সোয়েটার। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি হবে। হাতের কব্জিতে একটা ড্র্যাগনের ট্যাটু।
‘আমি এলেনা ভলকভ।’ মহিলা হাত বাড়াল। ভদ্রমহিলার ইংরেজি একটু ভাঙা ভাঙা। কথায় রাশিয়ান অ্যাকসেন্ট স্পষ্ট। তবে কথা বুঝতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না।
তূর্য হাত মেলাল, ‘হাই, আমি তূর্য। আপনার এই ট্যাটুটা বেশ ইন্টারেস্টিং তো!’
‘ওহ থ্যাংক ইউ! ইউ ক্যান ফাইন্ড ইট অনলি ইন রাশিয়া। জামি গোরোনিচ নাম এই ড্র্যাগনের। আমাদের পপুলার কালচারের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
শ্যাডো অন্য ঘরে গিয়েছিল। ফিরে এসে তূর্য আর এলেনাকে গল্প করতে দেখে বলে উঠল, ‘ওহ! এর মধ্যেই আপনাদের পরিচয় হয়ে গেছে নাকি? তাও আমি ফর্মালি একবার ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিই, মিট এলেনা। আমাদের টিমের সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট। অরিজিনালি ফ্রম এসভিআর।’
‘রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স!’ তূর্য অবাক হয়ে তাকাল। এলেনা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ঘরে ঢুকল অন্য দু’জন।
রিয়া এবং স্যাম।
‘তূর্য!’ রিয়া এগিয়ে এল। মুখে উদ্বেগের ছাপ, ‘আপনি ঠিক আছেন তো? স্যাম বলছিল, আপনার ওপর হামলা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ওরা সেটাকে নিউট্রালাইজ করার চেষ্টা করছে।’
তূর্য হাসতে হাসতে বলল, ‘ওহ! স্যামও তাহলে “র”-এরই লোক! এখনও অবধি তো ঠিকই আছি। কিন্তু একই ঘরে “র” আর এসভিআর-এর তিনজন ফিল্ড এজেন্টের সঙ্গে নিরস্ত্র তূর্য ভচ্চাজ আর একজন ইয়েলো জার্নালিস্ট! এরপর কতক্ষণ ঠিক থাকব জানি না।’
রিয়া কিন্তু হাসল না। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল। স্যাম টেবিলের পাশের চেয়ারগুলো দেখিয়ে ইশারায় তাদের সেখানে বসতে বলল। তূর্য এবং রিয়া বসলে বাকিরাও একে একে এসে বসল তাদের পাশে।
‘এবার বলুন তো বস।’ শ্যাডো তূর্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মোহিনী ব্যানার্জির নাম কীভাবে জানলেন? আপনি তো মশাই কামাল করে দিয়েছেন। নিজের দেশের সিক্রেট সার্ভিসের সিক্রেসিই আরেকটু হলে মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন।’
‘তদন্ত করতে গিয়ে যদি কোনওভাবে “র”-কে বিপদে ফেলে থাকি, তাহলে আমি দুঃখিত। আমি আসলে…’
‘ধুর! ওসব সরি-ফরি পরে হবে। আগে বলুন, অরিন্দম চ্যাটার্জির কেসটা ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে ঠিক কতটা গর্ত খুঁড়ে ফেলেছেন?’ শ্যাডো প্রশ্ন করল।
‘ঠিক যতটা খুঁড়েছি বুঝলে আপনি আমায় মেরে ফেলবেন, তার থেকে একটু কম।’
শ্যাডো এবার হাসিতে ফেটে পড়ল। তারপর হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আপনাকে যদি মেরে ফেলারই হতো, তাহলে আপনি এই শ্যাডোর শ্যাডো চোখে দেখতে পাওয়ার আগেই হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেন। তূর্য ভট্টাচার্য বলে এই কলকাতায় কেউ যে বাস করত, সেটাও এতদিনে ভুলে যেত দুনিয়া। “র”-এর হাতে সিভিলিয়ানদের খুনখারাপি করে বেড়ানো ছাড়াও অন্য কাজ আছে।’
রিয়া এবার এগিয়ে এসে বলল, ‘কিন্তু আপনারাও তো সিস্টেমেরই একটা অংশ। পুলিশ যদি তূর্যকে বেআইনিভাবে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করতে পারে, তাহলে আপনাদেরই বা বিশ্বাস করা যায় কীভাবে?’
শ্যাডো এবার রিয়ার দিকে ঘুরল। চোখে চোখ রেখে বলল, ‘ম্যাডাম, আপনি দুটো ভুল করছেন।’
‘কী ভুল?’
‘প্রথমত, পুলিশ তূর্যকে সরিয়ে দিতে চায়নি। কিছু ক্ষমতাবান লোক, যারা পুলিশের একাংশকে নিজেদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে কন্ট্রোল করছে, তারা পুলিশের সেই কোরাপ্টেড সেকশনটাকে দিয়ে তূর্যর ক্ষতি করতে চেয়েছিল। দুটো সিনারিও কিন্তু ডিফারেন্ট।’
‘কিন্তু ওরা তো…’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান। আমি কথাটা আগে শেষ করে নিই। দ্বিতীয়ত, আমরা বিশ্বাস না করার মতো তো কিছু করিনি। সেরকম কিছু করলে ব্যাপারটা অন্যরকম হতো। যেমন ধরুন আপনি, তলায় তলায় একটা ইন্টারন্যাশনাল সংবাদ সংস্থার কাছে এই ড্রোন ডিলের পেছনের ডার্টি গেম ইনভেস্টিগেট করে তাদের এক্সক্লুসিভ স্টোরি দেবেন বলে মোটা টাকা অগ্রিম নিয়ে বসে আছেন। এরকম কিছু করলে, তখন বরং আপনি আমাদের ওপর এসব অভিযোগ আনতে পারতেন।’
রিয়ার মুখ হাঁ হয়ে গেল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও তোতলাতে লাগল।
শ্যাডো তখনও বলে চলেছে, ‘তারপর নিজে ইনভেস্টিগেট করে হালে পানি না পেয়ে তূর্যবাবুকে ভুজুংভাজুং দিয়ে আপনার দলে টেনে নিয়েছেন। এবার বলুন, এসব জানতে পারলে কি আপনার ওপর তূর্যবাবুর বিশ্বাসে সামান্য চিড়ও ধরবে না?’
ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছে। রিয়া মাথা নিচু করে বসে পড়ল নিজের চেয়ারে।
শ্যাডো এবার একটু থেমে মাথাটা নিচু করে ভারী গলায় বলল, ‘তারপর যদি উনি জানতে পারেন যে, সেই ইন্টারন্যাশনাল সংবাদ সংস্থাটি আদতে ভারতের শত্রু দেশের মদতপুষ্ট এবং তারা ভারতের বিরুদ্ধেই নিয়মিত স্টোরি করে চলেছে? সবথেকে বড় কথা হচ্ছে, এই খবরটাও দিনের শেষে অ্যাজ আ নেশন ভারতের ব্যর্থতাকেই ফোকাস করে লেখা হবে। সেটা আপনি ইতিমধ্যেই জানেন, তাও শুধুমাত্র পয়সা আর পুলিৎজার-টুলিৎজারের লোভে এইসব তথ্য একেবারে বেমালুম চেপে গেছেন। তাহলে কি তূর্যবাবুর বিশ্বাসটায় ধরা সামান্য চিড়টা আরেকটু চওড়া হয়ে যাবে না?’
রিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মুখ লাল হয়ে গেছে। স্যাম কড়া গলায় বলল, ‘বসে যাও রিয়াদি। তুমি যবে থেকে ওই সংস্থার অফিস ভিজিট করেছ, তবে থেকেই আমাদের রেডারে আছ। মনে করো, ঠিক সেই সময়েই তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়। তোমাকে বেশ কিছু কাজে হেল্প করলাম। এই কেসে তোমাদের রোগ মার্সিনারি গ্রুপের সন্ধান দিলাম যাতে আমার ওপর তোমাদের ট্রাস্ট বিল্ড হয়। আমার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে যে টেবিলের ওপর তোমরা ফোন রাখলে, সেটা বেসিকালি একটা ক্লোনিং ডিভাইস। সেখান থেকেই তোমার মেইল বক্সের অ্যাকসেস পেলাম আর সেখান থেকেই তোমার ব্যাপারে সব তথ্য পাওয়া গেছে। তাই ডিনাই করার চেষ্টা কোরো না, লাভ হবে না।’
‘বেঁচে থাকতে গেলে অন্যদের বিশ্বাস তো আমাদের করতেই হয় ম্যাডাম।’ শ্যাডো শান্ত স্বরে বলল, ‘কোনও সময় আমরা সেই বিশ্বাসের বদলে আনুগত্য পাই। আবার কোনও সময় বিশ্বাসঘাতকতা।’
‘এনাফ!’ রিয়া চিৎকার করে উঠল। রাগে, অপমানে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। ভাঙা গলায় সে বলল, ‘আমি একজন সাংবাদিক। আমার কাজ সত্যিকে সামনে আনা। আমি এই স্টোরি করতে চেয়ে অনেক সংবাদ সংস্থার কাছে গেছি, কেউ এরকম সেন্সিটিভ স্টোরি করতে রাজি হয়নি। ভয় পেয়েছে। বলেছে, এই স্টোরি করতে গেলে অনেক প্রবলেম ফেস করতে হবে। নেতা, মন্ত্রী, বড় বড় বিজনেসম্যানরা এর সঙ্গে ইনভল্ভড। বড়সড় ঝামেলা হয়ে যাবে।’
‘তাই আপনি গেলেন এমন এক সংস্থার কাছে, যারা ভারতবিরোধী স্টোরি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে?’ তূর্য বলল।
‘আমি তাদের কাছেই গেছি, যারা স্টোরিটা করতে ইন্টারেস্টেড!’ রিয়া উঁচু গলায় বলল, ‘আমি তো ফ্যাক্টের ফ্যাব্রিকেশন করছি না। শুধু যা সত্যি, তাই দেখাতে চাইছি।’
‘সত্যি বা মিথ্যে অনেক সময় দৃষ্টিকোণের ওপরেও নির্ভর করে।’ এলেনা নিজের ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে বলল।
‘না! সত্যি সবসময় সত্যিই থাকে। ফ্যাক্টস আর ফ্যাক্টস! আর যারা সেই ফ্যাক্টটা পাবলিশ করার মতো দম রাখে, তাদের দ্বারাই সেটা পাবলিশ করাতে চাইছি। এতে দোষের কী আছে?’
‘দোষ নেই।’ তূর্য বলল, ‘কিন্তু ইন্টেনশনটাও দেখতে হয়।’
‘ইন্টেনশন মানে? একজন সাংবাদিকের কাছে কোনও স্টোরি পাবলিশ করার পিছনে একটাই ইন্টেনশন থাকে। সেটা হল, দেশের মানুষদের জানানো যে কারা তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তাদের দেশে তাদের দৃষ্টির আড়ালে কী চলছে।’
‘কিছু সময় কিছু তথ্য সিভিলিয়ানদের ড্রয়িংরুম অবধি না পৌঁছনোই তাদের জন্য সেফ। আর এই কাজটাই এত বছর ধরে আমরা করে আসছি। আপনারা যখন রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমান, তখন আমাদের মতো কোনও ইনটেলিজেন্স এজেন্সির এজেন্ট তার জীবন দিয়ে দেশকে কোনও ভয়ংকর পরিস্থিতির হাত থেকে উদ্ধার করে। আপনারা জানতেও পারেন না সেই মানুষটার বলিদানের কথা।
‘পরদিন সকালে উঠে দাঁত মেজে, গায়ে সেন্ট ঘষে অফিস যান। কেকেআর না আরসিবি, কে এবার আইপিএল জিতবে—সেই নিয়ে তরজা করেন। আমাদের কাছে এত সিক্রেট ইনফরমেশন স্টোর করা আছে, যা পাবলিশ হয়ে গেলে দেড়শো কোটি ভারতবাসীর রাতের ঘুম উড়ে যাবে এক মুহূর্তে। সেই ঘুমটাকেই আমরা প্রোটেক্ট করি ম্যাডাম।’ ঠান্ডা গলায় বলল শ্যাডো।
রিয়া চুপ করে রইল।
এলেনা এবার পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল, ‘ওকে, এনাফ! নিজেদের মধ্যে এখন ঝগড়া বা ভুল বোঝাবুঝি করে লাভ নেই। রিয়ার উদ্দেশ্য যা-ই হোক, সে একটা ব্যাপারে ঠিক। ড্রোন ডিলের আড়ালে একটা ডার্টি গেম চলছে।’
রিয়া আবার চেয়ারে এসে বসল। এলেনা বলে চলল, ‘এই খবরটা প্রথম পেয়েছে রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এসভিআর। আমরা এটা জেনেছি আমাদের চিনে থাকা একটা সোর্স থেকে।’
‘কী খবর?’ তূর্য জিগ্যেস করল।
‘এক্স্যাক্ট ডিটেইলস এখনও আমরা জানি না।’ এলেনা বলল, ‘কিন্তু সাসপিশন হল, ইন্ডিয়া যে ড্রোন টেকনোলজি কিনছে, তার মধ্যে একটা ব্যাকডোর আছে।’
‘ব্যাকডোর মানে?’ তূর্য ভুরু কুঁচকে তাকাল।
‘সেগুলোর সফটওয়্যারে কোনও ম্যালিশিয়াস কোড দেওয়া আছে। যেটা ওই কোম্পানি অ্যাক্টিভেট করতে পারবে রিমোটলি। তখন সব ড্রোন তারা রিমোটলি কন্ট্রোল করতে পারবে। এর পরিণাম কী ভয়ংকর হতে পারে একবার ভেবে দেখুন।’
তূর্য পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে পেরে চমকে উঠল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘এরপর আপনারা কী স্টেপ নিলেন?’
‘এসভিআর তখন “র”-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে। এক্স্যাক্টলি কী ধরনের ফাউল প্লে চলছে, সেটা তখনও আমরা ধরতে পারিনি। তাই এই থ্রেটটাকে ইন্টারসেপ্ট করে সেটাকে নিউট্রালাইজ করার জন্য এসভিআর এবং “র”-এর কোল্যাবরেশনে একটা ছোট স্পেশাল অপারেশন টিম রেডি করা হয়।’
‘আপনি সেই টিমের অংশ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু এতে রাশিয়ার লাভ কোথায়? রাশিয়া শুধু শুধু কেন এমন একটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ারে নাক গলাচ্ছে, যেখানে তাদের কোনও ইনভলভমেন্ট নেই?’
এলেনা হাসল, ‘কে বলল ইনভলভমেন্ট নেই? রাশিয়ান আর্মস অ্যান্ড ডিফেন্স টেকনোলজির সবথেকে বড় ইম্পোর্টার কে? ভুলে গেলেন?’
‘ইন্ডিয়া!’ তূর্য কতকটা নিজের মনেই বিড়বিড় করে উত্তরটা আওড়াল।
‘এক্স্যাক্টলি! ওরা যদি কোনওভাবে ইন্ডিয়ান ডিফেন্স সিস্টেমের সফ্টওয়্যারে কোনও ভাইরাস প্লান্ট করতে পারে এবং সেটা ব্যবহার করে রাশিয়ান-মেড মিসাইল বা অন্য ডিফেন্স টেকনোলজির ম্যালফাংশন করিয়ে দেয়, তাহলে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে রাশিয়ার গুডউইল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
‘বুঝলাম। এক্ষেত্রে রাশিয়ার স্বার্থ আছে ইন্ডিয়াকে বাঁচাতে।’
‘তাছাড়া জিও-পলিটিকসে ইন্ডিয়া-রাশিয়ার বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। সেটাও অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের কর্তব্য।’
এলেনার কথার মধ্যে বাধা দিয়ে শ্যাডো বলল, ‘আচ্ছা, আপনাদের আলোচনা ইন্টারাপ্ট করার জন্য ক্ষমা চাইছি। কিন্তু এসবের আগে আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম, যার উত্তর এখনও পাইনি। প্রিয়া চ্যাটার্জি মার্ডার কেসের তদন্ত করতে গিয়ে আপনি যা তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন, তাতে আরেকটু হলে আমাদের টিমের পুরো মিশনটাই জেপার্ডাইজ করে দিচ্ছিলেন। এবার সত্যি করে বলুন কী কী ইনফরমেশন পেয়েছেন।’
তূর্য চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, ‘তার আগে আপনি সত্যি করে বলুন মোহিনী ব্যানার্জিকে কে গুলি করেছিল?’
স্যাম বলল, ‘এই খবরটা কিন্তু আমি আপনাদের ভুল দিইনি। এটা রোগেরই কাজ। কেউ ওদের প্রচুর টাকা খরচা করে হায়ার করে কলকাতা নিয়ে এসে অপারেট করাচ্ছে। মোহিনীকে রোগের অপারেটিভই গুলি করেছে স্নাইপার গান ইউজ করে।’
‘আর তাতেই আমাদের সন্দেহ আরও প্রবল হচ্ছে যে চাইনিজ ম্যালওয়্যারের ইনফরমেশনটা সত্যি।’ শ্যাডো বলল।
রিয়া প্রশ্ন করল, ‘আমি প্রথম থেকেই এই মোহিনী ব্যানার্জির নাম শুনে যাচ্ছি। কিন্তু কে এই মোহিনী ব্যানার্জি?’
‘মোহিনী ব্যানার্জি ছিলেন “র”-এর একজন সিনিয়র ফিল্ড এজেন্ট।’ তূর্য বলল, ‘এবং যদি আমি ভুল না হই, তাহলে এই স্পেশাল অপস টিমের একজন প্রাক্তন সদস্যও ছিলেন তিনি।’
‘শুধু সদস্য নন। সি ওয়াজ আওয়ার টিম লিডার।’ স্যাম বলল।
‘এটা যদিও আমার অজানা ছিল। যাই হোক, রিয়ার বোঝার সুবিধার জন্য বলে দিই। আমরা তাকে অন্য নামে চিনি—প্রিয়া চ্যাটার্জি।’
রিয়া হতবাক হয়ে তূর্যর দিকে তাকাল, ‘কী?’ ফিসফিস করল, ‘আপনি… আপনি কীভাবে জানলেন?’
তূর্য চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তারপর চোখ খুলে সামনের দিকে ঝুঁকে বলতে শুরু করল, ‘প্রথম সন্দেহটা হয়েছিল যখন দেখলাম, একজন সাধারণ সিভিলিয়ানকে মারতে আলাদা করে স্নাইপার হায়ার করা হয়েছে। এছাড়া বারবার একটা তথ্য উঠে আসছিল। প্রিয়া গিয়েছিল সুনীতা নামের একটা টেলারিং শপে শাড়ি পিকো করতে দেওয়ার পর সেটার ডেলিভারি নিতে।’
‘হ্যাঁ। অরিন্দমবাবু তো তাই বলেছিলেন।’
‘অরিন্দম মিথ্যে বলেনি। সে যেটা জানত সেটাই বলেছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে বা সিসিটিভি ফুটেজে কোথাওই কোনও কাপড়ের ব্যাগের ট্রেস নেই। তখন মনে হল, এমন তো হতেই পারে যে হয়তো সুনীতা থেকে বলেছে কাপড় রেডি হয়নি, পরে আসুন। তখন আমি সুনীতাতে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সপ্তাহের ওইদিন দোকান বন্ধ থাকে। মেয়েরা এই ধরনের দোকান বা বিউটি পার্লার, মানে যেখানে তাদের ফ্রিকোয়েন্ট যাতায়াত হয়, সেগুলোর বন্ধ থাকার বার ভুলবে না। অরিন্দমের থেকে কনফার্ম হলাম যে প্রিয়া ওই দোকানের রেগুলার কাস্টমার ছিল। তখনই মনে হল, অরিন্দমকে মিথ্যে বলে প্রিয়া অন্য কোনও কাজে বেরিয়েছিল।’
‘কোথায় গিয়েছিলেন প্রিয়া ম্যাডাম?’ তূর্যকে মাঝপথে থামিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে জিগ্যেস করে রিয়া।
‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল। যাই হোক, তখন আমি প্রিয়ার পাস্ট চেক করতে শুরু করি। প্রিয়ার বোনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, প্রিয়ার মা-বাবা মারা যাওয়ার পর প্রিয়া ডিপ্রেশনে চলে যায়। এবং বেশ কিছুদিন কারোর টাচে থাকে না। অর্থাৎ সেই সময়টায় প্রিয়া নিজের বোনের সঙ্গেও যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। তারপর আবার হঠাৎই বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ততদিনে প্রিয়া অরিন্দমকে বিয়েও করে নিয়েছে।’
‘নিশ্চয়ই এর মধ্যেই প্রিয়া “র” জয়েন করেছিল?’ রিয়া প্রশ্নটা করে শ্যাডোর দিকে তাকিয়ে।
শ্যাডো ঘাড় নাড়িয়ে সায় দেয়, ‘বাবা-মা মারা যাওয়ার পরপরই হয়তো জীবনের লক্ষ্য খুঁজে নিতে প্রিয়া ইন্ডিয়ান আর্মি জয়েন করার জন্য পরীক্ষা দেয়। স্পোর্টসে বরাবরই এক্সট্রাঅর্ডিনারি ছিল। রিটেন এবং ফিজিকাল টেস্ট, দুটোতেই টপ করে। বছর আটেক আগে “র” নিজেই ওকে অ্যাপ্রোচ করেছিল। ফিল্ডে নামার পর থেকে, অর্থাৎ গত সাত বছরে একাধিক সফল কোভার্ট অপারেশন সাকসেসফুলি এক্সিকিউট করেছে। আমাদের খুবই ডেয়ারিং এজেন্ট ছিল মোহিনী। ভয় বা হেসিটেশন শব্দগুলো ওর ডিকশনারিতে ছিল না।’
তূর্য ফের বলতে থাকে, ‘আমার দুর্ভাগ্য এরকম একজন এজেন্টের সঙ্গে আমি পরিচয় করার সুযোগ পেলাম না। যাই হোক, আরেকটু কথা বলতে প্রিয়ার বোন জানায়, সে একটা ব্যাপার সন্দেহ করেছিল। যেহেতু আমি প্রিয়ার মৃত্যুর তদন্ত করছি, তাই সে ব্যাপারটা আমায় জানাতে চায়। কারণ তার মনে হয়েছে হয়তো তথ্যটা এই মার্ডার কেসে ইম্পর্ট্যান্ট হতে পারে। সে সন্দেহ করছিল, প্রিয়ার কোনও এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার আছে। একবার অরিন্দমকে ব্যাঙ্গালোর আসছে বলে প্রিয়া বেশ কিছুদিন কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। প্রিয়ার বোন অরিন্দমকে কিছু জানায়নি, যদি তার জন্য ওদের দুজনের মধ্যে একটা ঝামেলা সৃষ্টি হয়, সেই ভয়ে।
‘আমি ততক্ষণে বুঝে গেছি এসব এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ারের কেস নয়। এখানে অন্য কোনও গল্প আছে। কারণ ততদিনে আমি মাতৃশক্তি এনজিও-র ব্যাপারে জেনেছি। প্রথমে চেষ্টা করেছিলাম এনজিও-র বেনিফিশিয়ারি কোনও মহিলাকে পাই কিনা। তাহলে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, অনেক চেষ্টা করেও একজনকেও পেলাম না। সন্দেহ বাড়ল। মোটামুটি শিওর হয়ে গেলাম যে এনজিও-টা ফেক। অন্যকিছুর ফ্রন্ট হিসাবে কাজ করছে।
‘প্রথমে ভেবেছিলাম, ব্ল্যাক মানি হোয়াইট করার গল্প। অনেকে এনজিও-তে মোটা টাকা ডোনেট করেন ট্যাক্স বাঁচাতে। পরে সেই টাকা ঘুরে ফিরে আবার ফেরত চলে আসে ডোনারের অ্যাকাউন্টে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখলাম গল্পটা তা নয়। বিভিন্ন অফশোর আনট্রেসেবল অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা আসছে। তারপর কয়েকটা ফেক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সেই টাকা চ্যানেল হচ্ছে। এই তথ্য কিন্তু আমি স্যামের থেকে পাইনি। স্যামকে খোঁজ লাগাতে বলেছিলাম। ও বলেছিল ব্যাঙ্কের সার্ভার খুবই সিকিওর। হ্যাক করতে পারছে না।
‘এখন বুঝতে পারছি, আমাকে ইনফরমেশনগুলো জানাতে দিতে চায় না বলেই সেটা বলেছিল। তখন আমি আমার অন্য একটা ট্রাস্টেড কন্ট্যাক্টের থ্রু এই ইনফরমেশনগুলো বের করি। রিয়াকেও আমি সেই কন্ট্যাক্টের নাম জানাইনি।’
‘হ্যাঁ, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম স্যামই আপনাকে এই ইনফোগুলো দিয়েছে। বাই দ্য ওয়ে, বেনিফিশিয়ারি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলো যে ফেক, সেটা কীভাবে জানলেন?’ জিগ্যেস করল রিয়া।
‘কারণ আমার সোর্স দ্যাখে প্রতিটা অ্যাকাউন্টের ওপেনিং ডেট একই। আধার নম্বর ভেরিফাই করতে গেলে ইনভ্যালিড আধার নম্বর বলছে। ব্যাঙ্ক তো এরকম ফ্রড অ্যাকাউন্ট হয় মিউল, নয়তো কেওয়াইসি নন-কমপ্লায়েন্ট বলে বন্ধ করে দেয়। সেটা ব্যাঙ্ক কেন করছে না? ব্যাঙ্কের দু-চারজন স্টাফের ইনভলভমেন্টেও এটা হতে পারে না। কারণ এই প্রসেসটা অটোমেটেড। অর্থাৎ সিবিএস-এর সেন্ট্রাল সার্ভার থেকে এই অ্যাকাউন্টগুলো বাইপাস করা আছে। যেটা একমাত্র হতে পারে যদি কোনও বড়সড় লেভেলের গোপন সরকারি অর্ডার থাকে।’
‘স্লাশ ফান্ড। কোভার্ট অপারেশনের জন্য।’ শ্যাডো বলল।
‘সেটা আমি তখনই সন্দেহ করেছিলাম। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমার সোর্স ব্যাঙ্কেরই ভেতরের লোক। আমি তখন তাকে বলি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের ছবিগুলো একটু পাঠাতে। যদিও কাজটা বোধহয় খুব একটা লিগালি হয়নি। কিন্তু এইটুকু আইন আমায় ভাঙতেই হতো সত্যিটা খুঁজতে।’
‘তারপর?’ রিয়া জিগ্যেস করল।
‘তারপর সেখানেই পেলাম অমূল্য রতন। অর্থাৎ মোহিনী ব্যানার্জি ওরফে প্রিয়া চ্যাটার্জির ছবি।’
‘অরিন্দমবাবু কি কেসের এই প্রগ্রেস জানে?’ শ্যাডো জিগ্যেস করল।
‘একেবারেই না। ওকে যেটুকু ইনফরমেশন দেওয়া প্রয়োজন বোধ করেছি, সেইটুকুই দিয়েছি। তার বেশি নয়।’
শ্যাডো উঠে দাঁড়িয়ে এবার তূর্যর কাছে এল। তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘সত্যিই ইম্প্রেসিভ। পুরো ফেলুদা হতে না পারলেও পৌনে ফেলুদা আপনি হয়ে গেছেন ব্রাদার।’
‘মোহিনী সেদিন আমার কাছেই আসছিল।’ এলেনা বলল, ‘আমায় বলেছিল এই ড্রোন ডিলের পিছনে যে ফাউল প্লে হচ্ছে, সেটার অকাট্য প্রমাণ সে জোগাড় করে ফেলেছে।’
সবাই এলেনার দিকে তাকাল।
‘আমায় আগেরদিন রাত্রে ফোন করে বলল আমার সঙ্গে দেখা করবে শ্যামবাজারের কাছে। আমায় একটা পেনড্রাইভ দেবে। আমি নিজেও সেদিন শ্যামবাজারেই গিয়েছিলাম।’
‘তারপর?’
‘তারপর ওখানে হঠাৎই ওয়েন ব্রাউনকে দেখতে পেলাম। ওয়েনও আমায় দেখেছিল। আমি ভিড়ের সুযোগ নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাই। এজেন্ট মোহিনীকে জানিয়ে দিই ইমিডিয়েটলি মিশন অ্যাবর্ট করতে। অবশ্য তখন সেটার কারণ বলার মতো টাইম ছিল না। এখন মনে হয়, আমার ওকে ওয়েন ব্রাউনের ব্যাপারে ওয়ার্ন করে দেওয়া উচিত ছিল। যাই হোক, ওয়েন আমাকে চেনে। ওরা নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছিল যে মোহিনীর কাছে কোনওভাবে প্রুফ এসে গেছে। মোহিনীকে এক্সিকিউট করার এটাই একমাত্র কারণ।’
‘এটা আমারও মনে হয়েছিল।’ সায় দেয় তূর্য।
‘কিন্তু প্রিয়ার কাছে তো পেনড্রাইভটা পাওয়া যায়নি।’ রিয়া বলল।
‘সেটা খুব স্বাভাবিক। আমি যখনই মিশন অ্যাবর্ট করেছি, সেই মুহূর্তে মোহিনী পেনড্রাইভটা কোনওভাবে ডেস্ট্রয় করে দিয়েছে। ওর কাছে নিশ্চয়ই ওই পেনড্রাইভের কন্টেন্টের ব্যাকআপ ছিল। এগুলো আমাদের রুটিন প্রোটোকল। ব্যাকআপের ব্যাকআপ রাখা।’
‘ওয়েন ব্রাউনও সেটা জানত। সেই জন্য প্রয়োজনমতো যাতে ভয় দেখিয়ে সেই ব্যাকআপ হাতানো যায় তাই প্রিয়ার ছেলেকে অপহরণ করা হল।’ তূর্য বলল।
‘রাইট। ওয়েন বা ওদের টিমের কেউ নিজে বাচ্চাটাকে কিডন্যাপ করতে যেতে পারেনি, কারণ পুরো এলাকা তখন পুলিশ ঘিরে ফেলেছিল। সিসিটিভি তো রয়েইছে, তাছাড়া চারিদিকে পাবলিক মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করা শুরু করে দিয়েছে। তাই ওয়েন ফোন করে সব জানায় মিনিস্টার দুবেকে। দুবে ওর পোষা ডনকে কাজে লাগিয়ে আরভকে তুলে আনে। বোরখা পরা মহিলা একটা বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছে দেখলে, না পুলিশ সন্দেহ করবে, না সিসিটিভি বা অন্য কোনও ফুটেজে তাদের দেখা গেলে অপহরণকারীকে কেউ চিনতে পারবে।’
তূর্য মাথা নাড়ল, ‘বুঝলাম। তার মানে ওই ব্যাকআপ পেনড্রাইভের জন্যই আপনারা অরিন্দমের ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছিলেন?’
অভিযোগটা শুনেই শ্যাডো খেপে গেল, ‘আরে, আমরা কি চোর-ডাকাত নাকি যে একজনের বাড়ি ভর দুপুরে চড়াও হয়ে ভাঙচুর করব? আমরা যদি ওখানে কোনও কোভার্ট সার্চ অপারেশন করতামও, তাহলে আপনার বন্ধু বাড়ি ফিরে টেরও পেত না যে বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল। আমাদের অপারেশন এত মেসি হয় না। আর আমাদের বেসিক প্রোটোকল অনুযায়ী ব্যাকআপ কখনওই এজেন্ট নিজের বাড়িতে রাখবে না। ওই মাথামোটাগুলো সেটা জানে না।’
‘বুঝলাম। ওই ব্যাকআপ তাহলে কোথায় আছে সেটা আপনারাও জানেন না, তাই তো?’
‘নাহ। নো আইডিয়া।’ উত্তর দিল স্যাম।
এলেনা বলল, ‘দেখুন, এই অপারেশনটা শেষ হওয়া পর্যন্ত আপনাদের কষ্ট করে আমাদের এই সেফ হাউজেই থাকতে হবে। আপনাদের একটা করে ব্যাগ দেওয়া আছে যেখানে আপনারা আপনাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের সব সামগ্রী পেয়ে যাবেন…’
‘এক মিনিট। আগে অনেস্টলি বলুন তো, আমরা কি এখানে বন্দি?’ তুর্য প্রশ্ন করল।
‘একদমই না। এটা আপনাদের সেফটির জন্য। আপনারা যা যা ক্রিটিকাল ইনফরমেশন জেনে গেছেন, তাতে ইওর সেফটি ইজ কম্প্রোমাইজড। আজ আপনার ওপর যে অ্যাটাক হয়েছে সেটা আমরা নিউট্রালাইজ করতে পেরেছি। কিন্তু কালও যে পারব, সেটার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। আমাদের পক্ষে তো আপনাদের দুজনকে সর্বক্ষণ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।’
‘তাহলে আমাদের আপনাদের টিমে ইনক্লুড করে নিন। আমাদের দুজনেরই ইনভেস্টিগেশনের অভিজ্ঞতা আছে।’ রিয়া বলল।
‘সেটা সম্ভব নয়।’ এবার শ্যাডো বলল, ‘এটা কি পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ নাকি? আপনাদের কোনও ফর্ম্যাল কম্ব্যাট ট্রেনিং নেই। আমরা উলটে বিপদে পড়ব। তাছাড়া সবকিছুর একটা প্রোটোকল রয়েছে। আমাদের অর্গানাইজেশন আমাদের সেই পারমিশন দেবে কেন? ওসব সিনেমা সিরিয়ালে দেখানো হয়।’
‘তাহলে আমরা তো একরকম বন্দিই হলাম, তাই না?’ বলল তূর্য।
‘এই বাড়িতে সবরকম মর্ডান অ্যামিনিটিজ পাবেন। অসুবিধা কোথায় কয়েকটা দিন থেকে যেতে? মিশন কমপ্লিট হলে আমরা নিজেরাই আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসব। আর হ্যাঁ, একটা কথা। রিকোয়েস্ট মনে করলে রিকোয়েস্ট, অর্ডার মনে করলে অর্ডার।’ শেষ কথাটা রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল শ্যাডো।
রিয়া জিগ্যেস করল, ‘কী?’
‘আপনি ড্রোন ডিল সংক্রান্ত যাই জানেন, সেটাকে পাবলিক করা চলবে না।’
‘সেটা সম্ভব নয়।’
‘ম্যাডাম, আপনি একবার ভেবে দেখুন।’ এবার এলেনা বলল, ‘আপনি স্টোরি পাবলিশ করবেন। তারপর কী হবে? প্যানিক। দেশের ডিফেন্স সিস্টেমের ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে। সরকার এমব্যারাসড হবে। ডিফেন্সটেক যখন জানতে পারবে যে তাদের প্ল্যান এক্সপোজ হয়ে গেছে, তারা নতুন করে প্ল্যান করবে। আরও সাবধানে। আরও ফুলপ্রুফভাবে।’
‘সেম প্রস্তাব তূর্যবাবুর জন্যেও রাখছি।’ শ্যাডো বলল, ‘আপনি যা গর্ত খুঁড়ে ফেলেছেন, সেগুলোকে আবার চাপা দিয়ে দিন। যা জেনেছেন, তা যেন কাকপক্ষীতেও টের না পায়। বদলে আমরা আরভকে উদ্ধার করে এনে দেব।’
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর তূর্য ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। আমি রাজি।’
এলেনা তাকাল রিয়ার দিকে। রিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
‘আরেকটা কথা জানার আছে। সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষকে কি আপনারা মেরেছেন?’ জিগ্যেস করল তূর্য।
শ্যাডো বলল, ‘একদমই নয়। রতন ঘোষ মাতৃশক্তিতে প্রথমবার এসেছিলেন এগারো তারিখ বিকেলে। অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন তিনি কোম্পানির ডকুমেন্টস দেখতে চান। প্রিয়া চ্যাটার্জির অ্যাকাউন্ট থেকে কবে কত টাকা ডোনেট করা হয়েছে সেসব তথ্য জিগ্যেস করা শুরু করেন। সম্ভবত প্রিয়া অর্থাৎ মোহিনীর বাড়িতে মাতৃশক্তির কোনও ডকুমেন্ট পেয়েছিলেন তিনি। যাই হোক, ফর অবভিয়াস রিজনস, মাতৃশক্তি সেগুলো উইথআউট ওয়ারেন্ট প্রোডিউস করতে রাজি হয়নি। তখন রতনবাবু টয়লেট যাওয়ার নাম করে বাথরুমের পাশে সুইপার ঢোকার দরজার লক ডিসেবল করে দিয়ে আসেন। বাথরুমের একদম সামনে বলে ওই জায়গায় সিসিটিভি লাগানো ছিল না।
‘পরে মধ্যরাত্রে পিছনের পাঁচিল টপকে আবার ঢোকেন মাতৃশক্তির কম্পাউন্ডে। তারপর ওই সার্ভিস ডোর দিয়ে ঢুকে পড়েন ভিতরে। তিনি বোধহয় বুঝেছিলেন তাঁর কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করানোর মতো উপযুক্ত প্রমাণ নেই। ম্যাজিস্ট্রেট শুধু অফিসারের হাঞ্চ কী বলছে, তার ওপর নির্ভর করে ওয়ারেন্ট দেবেন না। তাই শুধু শুধু বোকার মতো এই কাজটা করলেন। যাই হোক, যেটা তিনি জানতেন না সেটা হল, ওই কম্পাউন্ডে মোশন ডিটেক্টর সেন্সর লাগানো রয়েছে।
‘সেন্সর অ্যাক্টিভেটেড হলে আমি ইমিডিয়েটলি ওখানে যাই। তখনও আমি বুঝিনি উনি ইন্সপেক্টর রতন ঘোষ। উনি মুখে রুমাল বেঁধে ঢুকেছিলেন। যাই হোক, রতনবাবু পালাতে থাকেন। আমি তাড়া করি। বাইপাস ধরে হাই স্পিডে পালানোর সময় উনি নিজেই ব্যালেন্স হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা মারেন।’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী! অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, লোক জড়ো হচ্ছিল। আমি ফিরে গেলাম। পরে জেনেছি উনি রতনবাবু।’
‘মানে? আপনি একবারও ভদ্রলোককে বাঁচাবার চেষ্টা করলেন না?’ তূর্য অবাক হয়।
‘খেপেছেন? তখন লোক জমে গেছে। আমার আইডেন্টিটি কম্প্রোমাইজ হয়ে যেত।’
তূর্য কিছুটা বিরক্তির সুরে বলল, ‘ইউ আর আ মনস্টার!’
‘আই নো। বাট দ্যাটস নট ইম্পর্ট্যান্ট। দ্য ইম্পর্ট্যান্ট থিং ইজ, দ্য মনস্টার ইজ অন ইওর সাইড।’
