অষ্টম পর্ব – মৃত মানুষ কথা বলে না
শরতের এই সময়টায় কলকাতার আকাশ অদ্ভুত সুন্দর দেখতে লাগে। আকাশজুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। যেন মনে হয় আকাশজুড়ে কাশফুল ফুটেছে। রিয়ার সাদা হোন্ডা সিটি সেক্টর থ্রি-র রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছিল। সম্পূর্ণ রাস্তা রিয়া একটাও কথা বলেনি। বোধহয় তার মাথার মধ্যে একাধিক চিন্তা জট পাকাচ্ছে। পাশের সিটে বসে তূর্য জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। সে কিন্তু তুলনায় অনেক বেশি নিস্পৃহ।
‘অনিন্দিতা আইল্যান্ডের কাছেই তো?’ রিয়া জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ। ওই তো, বাঁ-দিকে টার্ন নিলেই পৌঁছে যাব।’
গাড়ি এবার একটা চওড়া রাস্তায় ঢুকল। দু’পাশে সারবাঁধা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। সল্টলেকের এই এলাকাটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রশস্ত রাস্তা, সুপরিকল্পিত ব্লক বিভাজন। অনিন্দিতা আইল্যান্ড থেকে তেরো নম্বর ট্যাঙ্ক যাওয়ার পথেই একটা বাড়ির সামনে এসে ম্যাপ শেষ হল।
‘ওই যে, ওই বিল্ডিংটা।’ তূর্য একটা তিনতলা বিল্ডিংয়ের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। বিল্ডিংয়ের সামনে একটা ছোট্ট বাগান। বাইরে থেকেও কিছু গাছপালা দেখা যাচ্ছে। বিল্ডিংয়ের একতলায় এনজিও-র অফিসটা। বিল্ডিংয়ের গায়ে মূল দরজার পাশেই বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে ‘মাতৃশক্তি’।
রিয়া গাড়ি পার্ক করল বিল্ডিংয়ের সামনে। দু’জনে নামল। তূর্য একবার চারদিকটায় চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বেঁটে গেট খুলে ঢুকে এল ভিতরে।
ভিতরে ঢুকেই একটা ছোট রিসেপশন এরিয়া। একজন তরুণী রিসেপশনিস্ট বসে আছে কম্পিউটারের সামনে। তাদের দেখে সে মাথা তুলে হাসল, ‘ওয়েলকাম টু মাতৃশক্তি। বলুন, কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি?’
‘আমি তূর্য ভট্টাচার্য। সৌমিলি রায়ের সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।’ তূর্য বলল।
‘ওহ! হ্যাঁ। আপনারা বসুন, আমি ম্যাডামকে ইনফর্ম করছি।’ রিসেপশনিস্ট এবার একটা ইন্টারকমে ফোন করল।
তূর্য আর রিয়া বসল রিসেপশন এরিয়ার একটা সোফায়। দেওয়ালজুড়ে টাঙানো রয়েছে এনজিও-র বিভিন্ন প্রজেক্টের ছবি। অ্যাসিড অ্যাটাক ভিক্টিম মহিলাদের স্বনির্ভরতা প্রশিক্ষণ, হ্যান্ড্রিক্রাফট শিক্ষা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ক্যাম্পের ছবি ইত্যাদি। রিয়া বেশ মন দিয়ে খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছিল।
মিনিটকয়েক পর একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা এসে দাঁড়ালেন ওদের সামনে। পরনে একটা ধূসররঙা সুতির শাড়ি। চুল চুড়ো করে মাথার উপরে খোঁপা করা। চোখে স্টাইলিশ ফ্রেমের চশমা।
‘নমস্কার। আমি সৌমিলি রায়, মাতৃশক্তির ম্যানেজিং ডিরেক্টর।’ তিনি হাত বাড়ালেন।
তূর্য উঠে দাঁড়িয়ে হাত মেলাল, ‘নমস্কার ম্যাডাম। আমি তূর্য, আর উনি রিয়া। “দুনিয়ার দর্পণ”-এর করেস্পন্ডেন্ট।’
রিয়া খেয়াল করল, তূর্য নিজের পরিচয়টা বেমালুম চেপে গেল।
‘আসুন আসুন, আমার অফিসে বসে কথা বলা যাক।’ সৌমিলি তাদের নিয়ে গেলেন একটা ছোট কিন্তু সুসজ্জিত কেবিনে। বেশ পরিপাটি অফিস সৌমিলি রায়ের। একটা এল্ আকৃতির টেবিল, কিছু ফাইলিং ক্যাবিনেট, দেওয়ালে ঝুলছে কিছু সার্টিফিকেট আর অ্যাওয়ার্ড। সৌমিলি তার চেয়ারে বসলেন, আর তূর্য-রিয়াকে ইশারা করলেন সামনের চেয়ারে বসতে।
‘হ্যাঁ, তো আপনি ফোনে বলেছিলেন যে আপনারা আমার একটা ইন্টারভিউ নিতে চান।’ সৌমিলি হাসিমুখে বললেন।
তূর্য সামনে ঝুঁকে বলল, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম। আসলে আপনাদের এনজিও নিয়ে আমরা একটা ফিচার করতে চাই।’
‘ওহ!’ সৌমিলির চোখে-মুখে আন্তরিক আনন্দ খেলে গেল, ‘তার আগে বলুন, চা খাবেন না কফি?’
রিয়া বারণ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তূর্য শান্ত গলায় বলল, ‘কফি একটু আগেই খেয়েছি। চা-ই হোক!’
এবার তূর্য পকেট থেকে একটা ছোট্ট নোটপ্যাড আর পেন বের করে ইন্টারভিউ শুরু করল, ‘আচ্ছা সৌমিলি ম্যাডাম। প্রথমেই জানতে চাইছি, মাতৃশক্তি এনজিও কবে থেকে এবং কীভাবে শুরু হয়েছিল?
‘দু’হাজার বারো সালে আমরা এই যাত্রা শুরু করি। আসলে আমার এক আত্মীয়া অ্যাসিড অ্যাটাকের শিকার হয়েছিল। তাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, তার চিকিৎসা, তারপর তার ডিপ্রেশনের সময় মানসিকভাবে তার পাশে দাঁড়ানো। এই পুরো অভিজ্ঞতাটাই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। বুঝেছিলাম, শুধু একজন নয়, হাজারো মহিলা এই নিষ্ঠুরতার শিকার। তাদের জন্য কিছু করতেই হবে।’
‘বেশ! আচ্ছা, আপনাদের সংস্থা মূলত কী কী কাজ করে?’
‘আমরা প্রধানত তিনটে দিকে কাজ করি। প্রথমত, নিয়মিত ওয়ার্কশপ আয়োজন করি, যেখানে ফাইনান্সিয়ালি উইক অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলারা বিভিন্ন হাতের কাজ শেখেন। মূলত সেলাই বা হস্তশিল্প। দ্বিতীয়ত, তাদের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করার ব্যবস্থা করি আমরা। কখনও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ করে দিই। যারা আইনি লড়াই করতে চান, তাদের মামলার খরচ বহন করি, প্রয়োজনে আইনজীবীও জোগাড় করে দিই। আর তৃতীয়ত, তাদের সাইকোলজিকাল কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করি।
‘এই কাজগুলো খুবই চ্যালেঞ্জিং নিশ্চয়ই?’
‘একদম ঠিক বলেছেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, এই মহিলাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। তারা শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। সমাজও তাদের গ্রহণ করতে চায় না অনেক সময়। কিন্তু যখন দেখি একজন মহিলা নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন, হয়তো নিজের দোকান খুলছেন, বা আদালতে জিতছেন, অ্যাটাকার শাস্তি পাচ্ছে, সেই মুহূর্তগুলোই আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়।’
‘বর্তমানে কতজন মহিলা আপনাদের সঙ্গে যুক্ত?’
‘এই মুহূর্তে প্রায় দেড়শোজন মহিলা সরাসরি আমাদের প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে আশিজন নিয়মিত আয় করছেন। এছাড়াও প্রায় তিরিশটা মামলা আমরা সাপোর্ট করছি।’
‘আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?’ কেজো স্বরে পরপর প্রশ্ন করে যাচ্ছিল তূর্য।
‘আমরা চাই জেলাগুলোয় আরও বেশি অ্যাক্টিভ হতে। একটা রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার খোলার পরিকল্পনা আছে যেখানে তারা থাকতে পারবেন, চিকিৎসা পাবেন। এবং সবচেয়ে জরুরি, সচেতনতা বাড়ানো। যাতে এই ধরনের ঘটনাই না ঘটে।’
‘আচ্ছা ম্যাডাম, আপনি বলতে পারবেন মোহিনী ব্যানার্জি নামে কাউকে আপনি চেনেন কিনা? সে কি আপনাদের এই দেড়শোজনের মধ্যে একজন?’
ততক্ষণে চা এসে গেছিল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই কথা চলছিল। তূর্য যখন শেষ প্রশ্নটা করল, তখন সৌমিলি রায় চায়ে চুমুক দিতে যাচ্ছিলেন। প্রশ্নটা শুনেই ভদ্রমহিলার হাত কেঁপে উঠে খানিকটা চা টেবিলে চলকে পড়ল। পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি এনে বললেন, ‘মোহিনী ব্যানার্জি? নাহ, এই নামে কাউকে আমি চিনি না। উনি কে?’
‘আপনাদের ওই দেড়শোজন মহিলার মধ্যে কেউ একজন হতে পারেন। কিংবা আপনার কোনও স্টাফ…’
‘নাহ! ওই নামের কেউ আমাদের সাপোর্টে নেই। আর ওই নামে কোনও স্টাফও নেই আমাদের।’
‘ভেবে বলুন। দেড়শোজন মহিলার নাম কি আপনার পক্ষে মুখস্থ রাখা সম্ভব?’
‘হ্যাঁ সম্ভব। আমি ওদের প্রত্যেককে পার্সোনালি চিনি। কিন্তু আপনি হঠাৎ এই প্রশ্নটা কেন করলেন জানতে পারি কি?’
‘কিছু না। আসলে ভদ্রমহিলা আমার পরিচিত। উনিও একজন অ্যাসিড অ্যাটাক ভিক্টিম। তাই ভাবছিলাম যদি মোহিনীও এই এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাই আর কী। জাস্ট চেক করছিলাম।’ তূর্য বলল। তারপর সে প্রসঙ্গ পালটে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, আপনাদের এনজিও তো বেশ বড়। আপনাদের ফান্ডিং কোথা থেকে আসে?’
‘আমাদের বিভিন্ন সোর্স থেকে ডোনেশন আসে। লোকাল ডোনার, কর্পোরেট সিএসআর, কিছু ফরেন ফাউন্ডেশন…’
‘মেইন ফরেন ফাইনান্সারের নাম বলতে পারবেন?’ তূর্য এবার সরাসরি প্রশ্ন করল।
সৌমিলি একটু অস্বস্তিমিশ্রিত গলায় বললেন, ‘দেখুন, আমাদের প্রাইভেট ফাইনান্সারদের নাম ডিসক্লোজ করার নিয়ম নেই। এটা কনফিডেনশিয়াল ইনফরমেশন। আশা করি আপনি সেটা বুঝবেন…’
তূর্য মৃদু হাসল। তারপর সে সামনে আরেকটু ঝুঁকে বলল, ‘ম্যাডাম, আমি একটা হাইপোথেটিকাল সিচুয়েশন নিয়ে আপনার মতামত নিতে চাই। ধরুন, কোনও এনজিও-র অ্যাকাউন্টে যদি আনট্রেসেবলভাবে বিভিন্ন দেশে রিরাউট করে একাধিক সোর্স থেকে টাকা ঢোকে, এবং সেই টাকা সেই একইভাবে একাধিক জাল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডিস্ট্রিবিউট হয়, এবং প্রপার কেওয়াইসি কমপ্লায়েড না হলেও যদি সেই অ্যাকাউন্টগুলো মিউল হিসাবে ব্যাঙ্ক রেস্ট্রিক্ট না করে… তাহলে এরকম সিনারিওতে পুরো ছবিটা কী হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’
সৌমিলি রায়ের চোয়াল এবার শক্ত হয়ে গেল। তিনি খরচোখে খানিকক্ষণ তূর্যকে জরিপ করে টেবিলে হাত রেখে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আশা করছি আপনাদের ইন্টারভিউ কমপ্লিট হয়েছে। আমাদের অফিস আওয়ারস প্রায় শেষ। আমার হাতে কিছু জরুরি কাজ আছে। সেগুলো শেষ করে আমাকে বেরোতে হবে। তাই…’
তূর্য ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তূর্যর দেখাদেখি রিয়াও উঠল। তূর্য সৌমিলি রায়ের চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ম্যাম, আমি কিন্তু জাস্ট একটা হাইপোথেটিকাল প্রশ্ন জিগ্যেস করেছিলাম। যাই হোক, আপনার সময় নষ্ট করার জন্য দুঃখিত। আসুন রিয়া। এখানে আমাদের কাজ শেষ।’
দু’জনে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। দরজার কাছে পৌঁছে আবার ঘুরে দাঁড়াল তূর্য। তারপর খুব বিনীত স্বরে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা ম্যাডাম, একটা শেষ প্রশ্ন। গত বারোই অক্টোবর, অর্থাৎ যেদিন ভোরবেলা শ্যামপুকুর থানায় সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষের বডি ইএম বাইপাসে পাওয়া যায়, তার আগেরদিন রাত্রিবেলা রতন ঘোষ কি এখানে এসেছিলেন?’
সৌমিলি এবার প্রায় ফেটে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘না। রাত্রিবেলা আমাদের অফিস বন্ধ থাকে। নমস্কার।’
তূর্য আর রিয়া বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এল। রিয়া গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘উনি মিথ্যে কথা বলছিলেন। রতন ঘোষ সেদিন এখানে এসেছিলেন। তাই না?’
‘সিওর ছিলাম না। তবে রতনবাবুর বাড়ির পথে ইএম বাইপাস পড়ে না। তাই আন্দাজে ঢিলটা ছুড়েছিলাম। ভাগ্যিস ছুড়েছিলাম। একেবারে বুলস আই!’ তূর্য হেসে জবাব দিল।
গাড়িতে উঠে রিয়া ইঞ্জিন স্টার্ট করল। গাড়ি চলতে শুরু করল। সাময়িক নীরবতা ভেঙে রিয়া আবার জিগ্যেস করল, ‘আপনি যে ইনফরমেশনগুলো বললেন, ওই আনট্রেসেবল ট্রানজ্যাকশন, মাল্টিপল অ্যাকাউন্ট, কেওয়াইসি না মানা, এসব কি স্যামের দেওয়া?’
‘নো ম্যাডাম।’ তূর্যর সংক্ষিপ্ত জবাব।
‘তাহলে?’
‘তাহলে আবার কী? সোর্স কি আপনার একার আছে নাকি?’
‘এই এনজিও-টা কি আসলে একটা ফ্রড এজেন্সি? ব্ল্যাক মানি হোয়াইট করার জন্য ব্যবহার হচ্ছে?’ রিয়া রাস্তায় চোখ রেখেই একটা টোটোকে ওভারটেক করতে করতে প্রশ্ন করল।
‘ওসব ছাড়ুন। আপনি তো শুনলেন, আমি সৌমিলি রায়কে ফান্ডিং নিয়ে কী প্রশ্ন করলাম! আপনাকেও সেমভাবেই জিগ্যেস করছি। ভালো করে মাথায় ভেবে জবাব দিন। আপনার কী মনে হয়? ওই সিনারিওতে গল্পটা কী হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে?’
রিয়া উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। তার কপালে ভাঁজ দেখে তূর্য বুঝল সে গভীরভাবে চিন্তা করছে। এবার তূর্য জানালার কাচ নামিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘ভাবুন ভাবুন। ভাবা প্র্যাকটিস করুন।’
কিছুক্ষণ পর রিয়া জিগ্যেস করল, ‘ওই মোহিনী ব্যানার্জি না মুখার্জি… যাই হোক, তাকে আপনি সত্যিই চেনেন?’
‘হ্যাঁ চিনি।’ তূর্য আবার সংক্ষেপে জবাব দিল।
‘সে কি এই মাতৃশক্তির সঙ্গে জড়িত?’
‘ওতপ্রোতভাবে।’
‘তাহলে আমরা তাকেই জিজ্ঞাসাবাদ করছি না কেন?’
তূর্য ঘন কালচে ধোঁয়া ছেড়ে বাইরে তাকিয়ে উদাস গলায় বলল, ‘কারণ মৃত মানুষ কথা বলে না।’
গাড়ি এগিয়ে চলল চওড়া রাস্তা দিয়ে। সল্টলেক থেকে বের হয়ে খান্নার দিকে চলল ওরা। ট্রাফিক একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে। অটো, ট্যাক্সি, বাস, প্রাইভেট গাড়ি, সবাই একসঙ্গে রেষারেষি করছে সবার আগে লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য।
কিছুক্ষণ পর তারা বাগবাজার এলাকায় এসে পৌঁছাল। রিয়া রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করল। তূর্য নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগে সে রিয়ার দিকে ফিরে জিগ্যেস করল, ‘একটা ধাঁধা যখন সলভ করছেনই তখন যাওয়ার আগে আরেকটা ধাঁধা দিয়ে যাই। বলুন তো, প্রিয়া চ্যাটার্জি শ্যামবাজারে কী করতে গিয়েছিল?’
রিয়া একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘ওই তো, টুকটাক বাজার করতে। আর তার একটা শাড়ির ফলস পাড় আর পিকো বসাতে দেওয়া ছিল, সেগুলো আনতে।’
‘বেশ। তাহলে ভেবে বলুন তো, ক্রাইম সিনে ওই পিকো করা শাড়িটা ছিল না কেন? এমনকী সিসিটিভি ফুটেজেও প্রিয়ার হাতে কোনও শাড়ির ব্যাগ দেখা যায়নি, কেন?’
রিয়া বোকার মতো একই প্রশ্ন জিগ্যেস করল, ‘কেন?’
তূর্য কোনও উত্তর দিল না। সে গাড়ির দরজা খুলে নামল। পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিল। জ্বলন্ত সিগারেটে একটা গভীর টান দিয়ে ধোঁয়ায় ঢেকে দিল তার মাথার ওপরের আকাশটা।
রিয়া গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে উষ্মার সঙ্গে বলল, ‘আপনি এত হেঁয়ালি করে কথা বলেন কেন বলুন তো? সরাসরি বলতে পারেন না?’
তূর্য ঘুরে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে বলল, ‘ও মা! সেদিনই তো বললেন, এই কেসে আপনি নাকি আমার সহকর্মী। কর্মচারী নন। তো একটু মাথা তো আপনাকেও খাটাতে হবে ম্যাডাম।’
রিয়া বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে নিজের মনে একটা অপশব্দ আওড়ে গাড়ির জানালা তুলে দিল। তূর্য দেখল ধীরে ধীরে রিয়ার গাড়িটা রাস্তার ট্রাফিকে মিলিয়ে গেল।
দক্ষিণ কলকাতার একটা বাস স্টপ। সন্ধ্যা নামছে। শীত প্রায় উপস্থিত। দূরে সূর্য পশ্চিমে ঢলছে আলগোছে। যেন লালচে-হলুদ বিশাল একটা থালা গড়িমসি করে মুখ লুকাচ্ছে দূরের উঁচু উঁচু অট্টালিকার আড়ালে। একজন পুরুষ বসে রয়েছেন বাস স্টপের স্টিলের চেয়ারে। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। ঋজু, একহারা চেহারা। পরনে ফুলহাতা নীল বুশশার্ট, কালো প্যান্ট, অক্সফোর্ড শু। চোখে বাদামি সানগ্লাস। মুদ্রাদোষে বারবার নাকের ডগায় আঙুল বুলাচ্ছেন। হাতে একটা পাতলা ম্যাগাজিন। অন্যমনস্কভাবে পাতা ওলটাচ্ছেন তিনি।
কিছুক্ষণ পর একটা কালো এসইউভি এসে দাঁড়ায় বাস স্টপের ঠিক সামনে। ড্রাইভারের পাশে বসা ভদ্রলোক জানালার কাচ নামিয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁচু গলায় জিগ্যেস করেন, ‘দাদা, এই ঠিকানাটা একটু বলতে পারবেন?’ ডান হাতে ধরা একটুকরো কাগজ বাড়িয়ে ধরেন সেই বসে থাকা ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে কাগজটা হাতে নেন। সাদা ছোট্ট কাগজে কালো ছাপার হরফে লেখা, ‘এজেন্ট কম্প্রোমাইজড। সিকিওর মিস্টার টি।’
কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে গাড়িতে বসে থাকা প্রশ্নকর্তার হাতে কাগজটা ফেরত দেন লোকটা। তারপর বলেন, ‘সোজা গিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে কয়েকটা বাড়ির পর।’ প্রশ্নকর্তা ধন্যবাদ জানিয়ে ফের গাড়ির কাচ তুলে নেন। একরাশ কালো ধোঁয়া ছেড়ে গাড়িটা বেরিয়ে যায়। ভদ্রলোক ফিরে এসে চেয়ারে বসে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নম্বর ডায়াল করেন। ফোনের ও-প্রান্ত থেকে গলার আওয়াজ শোনা গেলে বলেন, ‘ইটস টাইম।’
অরিন্দমের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল তূর্য। সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে। রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলোতে একে একে আলো জ্বলে উঠছে। তূর্যর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অরিন্দমের ফ্ল্যাটের সেই দৃশ্য। তছনছ হয়ে যাওয়া ঘর, ভাঙা আসবাব, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা জিনিসপত্র। সর্বহারা মানুষটা সেসব আর গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেনি। ওই ঘরেই এক কোণে বিছানা পেতে শুচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল তূর্যর। সঙ্গে মাথার ভিতর দানা বাঁধছিল একটা অদম্য লাগামছেঁড়া রাগ।
বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগোতে এগোতে তূর্য মোবাইলটা বের করল পকেট থেকে। স্যাম যখন ফোন করেছিল, তখন ফোনটা ধরার মতো পরিবেশ ছিল না। অরিন্দম তার হাতদুটো ধরে অঝোর নয়নে কাঁদছিল। এখনও বাস স্ট্যান্ড পৌঁছতে মিনিট পাঁচেক দেরি।
এই সময়ে কলকাতার এই সরু সরু গলিপথগুলো ফাঁকাই থাকে। জনশূন্য রাস্তায় একা হাঁটতে খানিক বোর লাগছিল তূর্যর। তাই ভাবল, স্যামের সঙ্গে কথাটা সেরে রাখা যাক। স্যামের নম্বর ডায়াল করতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা গাড়ির শব্দ এল। তারপরই তীক্ষ্ণ ব্রেকের আওয়াজ। তূর্য পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল একটা সাদা পুলিশের জিপ তার একদম কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
জিপ থেকে নামল তিনজন পুলিশ। ইউনিফর্ম পরা। মাঝারি বয়স। চেহারায় স্বভাবসুলভ পুলিশি রুক্ষতা। সামনের জন এবার এগিয়ে এল তূর্যর দিকে।
‘আপনিই তূর্য ভট্টাচার্য?’ পুলিশটা জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ, আমিই তূর্য। বলুন।’
‘আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’
তূর্য একটু পিছিয়ে এল, ‘যেতে হবে মানে? কী ব্যাপার?’
‘আপনার তো গতকাল ডিভোর্সের কেসের হিয়ারিং ছিল, তাই না? আপনি কোর্টে হাজিরা দেননি। এই নিয়ে তিনবার আপনি অ্যাপিয়ার করেননি। এটা মিউচুয়াল ডিভোর্সের কেস নয় কাকা, যে ইচ্ছে না হলে অ্যাপিয়ার হলেন না। এটা কনটেস্ট কেস। কনটেম্পট অফ কোর্ট মানে সোজা মামারবাড়ি।’
‘দেখুন স্যার। আমি এখন একটা ইম্পর্ট্যান্ট কেসে ফেঁসে আছি। আমি সুলগ্নার সঙ্গে কথা বলে নেব।’
‘ওইসব ধান্দাবাজি রাখুন। গাড়িতে উঠুন। আপনাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে।’
‘অ্যারেস্ট?’ তূর্য চমকে উঠল, ‘এক মিনিট। আপনাদের কাছে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে?’
‘ওয়ারেন্ট? কোথাকার আমার উকিলের নাতজামাই এল রে! মেলা ফ্যাচফ্যাচ না করে চল, গাড়িতে ওঠ!’
‘আমি ওয়ারেন্ট না দেখে কোথাও যাব না।’ দৃঢ় গলায় বলল তূর্য।
এবার দ্বিতীয় পুলিশটা এগিয়ে এল, ‘শালা, আইন মারানো হচ্ছে? চুপচাপ গাড়িতে ওঠ শুয়োরের বাচ্চা।’
‘আমি শুধু আমার অধিকার…’ তূর্য বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই প্রথম পুলিশটা তার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল।
তূর্য সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল, ‘হাত দেবেন না আমার গায়ে!’
‘শালা বেজন্মার বাচ্চা!’ দ্বিতীয় পুলিশটা এবার গর্জন করে উঠল। তারপর সে তূর্যর গালে সজোরে একটা চড় মারল। তূর্য এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল রাস্তায়। হাতের মোবাইল ছিটকে গিয়ে পড়ল দূরে।
‘ওঠ! গাড়িতে ওঠ!’ দ্বিতীয় কনস্টেবল চিৎকার করল।
তূর্য উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, তার আগেই তৃতীয়জন তার কলার ধরে টেনে তুলল। তারপর তার মুখে একটা ঘুসি বসিয়ে দিল। তূর্যর ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে এল।
‘কী করছেন? এভাবে গায়ে হাত তুলছেন কেন…’ কোনওরকমে বলল তূর্য। কিন্তু তারা থামল না। তাদের মধ্যে একজন তার কলার ধরে টেনে জিপের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা চাপা শব্দ শোনা গেল। গাড়ির ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জন। একটা কালো রঙের এসইউভি প্রায় উড়ে এসে রাস্তা আগলে দাঁড়াল। ধুলোয় অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ।
পুলিশগুলো অবাক দৃষ্টিতে তাকাল গাড়িটার দিকে। তূর্যও তাকাল। কালো কাচের জানালা। গাড়ির ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না।
এবার গাড়ির সামনের দরজা খুলে নামল একজন লোক। বয়স সম্ভবত চল্লিশের কোঠায়। কালো শার্ট, কালো জিনস। চুল ছোট করে কাটা। সুগঠিত শরীর। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল তূর্যর সামনে। তারপর ফিক করে হেসে বলল, ‘তিনটে নোয়াপাতি ভুঁড়িওয়ালা পুলিশের কাছে ক্যাল খাচ্ছিলেন বস? এই আপনি ফেলুদা হবেন?’
‘এই হারামজাদা! বেশি হিরোগিরি দেখাস না। পুলিশের কাজ করতে দে।’ একজন পুলিশ বলে উঠল।
লোকটা এবার খিকখিক করে হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল পুলিশগুলোর দিকে। তারপর হাসতে হাসতেই ভেংচি কেটে ছড়া কাটতে লাগল, ‘অ্যাই পুলিশ, ঘুষ খাবি? বাবার বিয়ে দেখতে যাবি?’
তূর্য এই পরিস্থিতিতে হেসে ফেলল। কনস্টেবলটা অগ্নিশর্মা হয়ে লোকটাকে বলল, ‘অ্যাই শালা শুয়োরের বাচ্চা! চুপচাপ কেটে না পড়লে উদোম ক্যালাব বলে দিলাম।’
লোকটা সেই কথার উত্তর না দিয়ে তূর্যর দিকে ফিরে বলল, ‘একটা বিড়ি হবে নাকি ভায়া?’
তূর্যর উত্তর দেওয়ার আগেই কনস্টেবল এগিয়ে এসে লোকটার পেটে ঘুসি মারল। তাতে লোকটা বিশেষ ভ্রুক্ষেপ করল না দেখে খানিক থতমত খেয়ে জিগ্যেস করল, ‘কে বে তুই?’
‘আমি? আমি সামান্য দূত।’
‘সে তুমি যে-ই হও চাঁদু। চুপচাপ কেটে পড়ো। নইলে কিন্তু কপালে অশেষ দুঃখ আছে। কেলিয়ে…’
‘বললাম তো আমি সামান্য দূত। দূত অবাধ্য। ইয়ে, না মানে অবধ্য। মারধরের কথা আসছে কোত্থেকে?’
‘ধ্যার বাল, তখন থেকে ভাট বকছে…’ তৃতীয় পুলিশটা লাঠি তুলে লোকটার দিকে এগোল। সজোরে আঘাত করতে গেল লোকটাকে। কিন্তু সে অবিশ্বাস্য গতিতে ডানদিকে সরে গেল। তারপর নিখুঁত দক্ষতায় এক পা পাশে সরে, তার ডান হাতটা বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে দিল পুলিশটার দিকে। চকিতে পুলিশটার লাঠি ধরা হাত ধরে ফেলল লোকটা। তারপর একটা মোক্ষম মোচড়। পুলিশটার মুখ বিকৃত হয়ে গেল যন্ত্রণায়। লাঠি পড়ে গেল মাটিতে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে লোকটা এবার হাঁটু তুলে পুলিশটার পেটে আঘাত করল সজোরে। পুলিশটা চিৎকার করে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে গেল রাস্তায়।
প্রথম পুলিশটা তূর্যকে ছেড়ে দিয়ে এবার লোকটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর লোকটার উদ্দেশে ঘুসি চালাল। কিন্তু লোকটা মাথা একপাশে হেলিয়ে সেই ঘুসি এড়িয়ে গেল অনায়াসে। তারপর বাঁ হাত দিয়ে পুলিশটার ঘাড়ের পেছনে সজোরে আঘাত করল। পুলিশটা প্রথমে টলে গেল। তারপর ভারসাম্য হারিয়ে দু-পা এগিয়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল রাস্তায়।
দ্বিতীয় পুলিশটা পেছন থেকে এসে লোকটার কাঁধ ধরল। জোরে টান দিয়ে পেছনে টেনে নিতে গেল লোকটাকে। কিন্তু সে ঘুরে গিয়ে পুলিশটার হাত সরিয়ে দিল। তারপর তার কনুই দিয়ে পুলিশটার মুখে একটা প্রচণ্ড আঘাত করল। ফিনকি রক্ত ছিটকে বেরোল নাক থেকে।
এরপর তিনটে ঘটনা একসঙ্গে ঘটল।
প্রথম পুলিশটা এতক্ষণে টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে এবার কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভারটা বের করল। লোকটা হিংস্র শ্বাপদের মতো লাফিয়ে পুলিশটাকে লাথি মারল। লাথি গিয়ে লাগল পুলিশটার হাঁটুতে। হাড় ভাঙার একটা স্পষ্ট শব্দ শোনা গেল। পুলিশটা রিভলভার ছেড়ে চিৎকার করে পড়ে গেল মাটিতে।
এবার লোকটা তূর্যকে ইশারায় গাড়িতে গিয়ে বসতে নির্দেশ দিল। লোকটার চোখের চাউনিতে এমন কিছু ছিল যে তূর্য তাকে অমান্য করতে পারল না। সে ছুটে গিয়ে কালো এসইউভিটার পিছনের দরজা খুলে ভিতরে বসে গেল। লোকটাও তূর্যর পাশে এসে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিল।
গাড়িতে ওঠার সময়েই ড্রাইভার একটা সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার আর একটা মোবাইল ফোন এগিয়ে দিয়েছিল লোকটার দিকে। গাড়ি চলতে শুরু করলে একটা সিগারেট ধরিয়ে গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়ল লোকটা। তারপর প্যাকেটটা এগিয়ে দিল তূর্যর দিকে। খানিকটা নিজের মনেই বলল, ‘আহা! এসব অ্যাকশনের পর সিগারেটে পোষায় না। এখন একটা বিড়ি থাকলে বড় ভালো হতো। যাকগে সেসব ছাড়ুন, কাজের কথায় আসি। আমরা আপনার সঙ্গে একটা ডিল করতে আগ্রহী। আমরা আপনার ক্লায়েন্টের ছেলেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দেব। বদলে আপনাকে আমাদের কথা শুনে চলতে হবে। রাজি?’
তূর্য হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল লোকটার মুখের দিকে। লোকটা কিন্তু সম্পূর্ণ নির্বিকার। আকাশের দিকে তাকিয়ে শিস দিতে লাগল।
‘কে আপনি?’ জিগ্যেস করল তূর্য।
‘বললাম যে, আমি সামান্য দূত। আমার নাম-ধাম এখানে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন। আমায় আপনি… মিস্টার শ্যাডো বলে ডাকতে পারেন। যাই হোক, আমি জানি আপনার মনে এখন হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করে আসছে। আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেব। কিন্তু শুধু “হ্যাঁ” বা “না” তে। ক্লিয়ার?’
‘আপনি “র”-এর লোক সেটা আমি বুঝতে পারছি। মাতৃশক্তি থেকে ফেরার পর থেকেই আমি আপনাদের তরফ থেকে কিছু একটা স্টেপ এক্সপেক্ট করছিলাম। কিন্তু আপনি আমায় এখন কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আর আরভের এক্সট্র্যাকশনের বদলে আপনারা কী চান আমার থেকে?’
খিক খিক করে হাসতে লাগল লোকটা ওরফে মিস্টার শ্যাডো, ‘উঁহু! ধুর মশাই! হচ্ছে না! ভুল প্রশ্ন করে যাচ্ছেন তখন থেকে। বললাম না, এমন প্রশ্ন করুন যার উত্তর হ্যাঁ বা না-তে হয়! আচ্ছা আমি প্রশ্ন করছি, আপনি উত্তর দিন। আপনার ক্লায়েন্ট, অর্থাৎ অরিন্দম চ্যাটার্জির ছেলে আরভ চ্যাটার্জিকে উদ্ধার করতে চান? হ্যাঁ কি না?’
তূর্য সদর্থক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়।
‘ব্যস। এইটেই হল আসল কথা। কী-কেন-কীভাবে এসব ছেড়ে এতে ফোকাস করুন।’ কথাটা বলে ঠোঁট উলটে শ্যাডো ফের বাইরের দৃশ্যে মন দিল।
তূর্য খানিকটা অসহিষ্ণুভাবে বলল, ‘তিনজন মানুষকে প্রায় মেরে ফেলছিলেন আপনি। এসবের কি খুব প্রয়োজন ছিল? আপনারা তো ভারত সরকারের হয়েই কাজ করেন। ইউ আর সাপোজড টু বি দ্য গুড গাইজ। আর আমাকে তো জামিনেই ছাড়িয়ে আনতে পারতেন। এভাবে তো আমি ফেরারি আসামি হয়ে গেলাম।’
প্রায় মিনিটখানেক কোনও উত্তর দিল না মিস্টার শ্যাডো। তারপর হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর স্বরে বলল, ‘পৃথিবীতে আল্টিমেট ভালো বা খারাপ বলে কিছু হয় না তূর্যবাবু। দেয়ার আর নো গুড ওর ব্যাড গাইজ। সবকিছুই যে বিচার করছে, তার দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে। যখন দুই পক্ষে যুদ্ধ চলে তখন নিজের দলের লোকেরা হয় ওয়ার-হিরো। আর অন্যপক্ষ ওয়ার-ক্রিমিনাল। তাই আপাতদৃষ্টিতে দেখেই বিচার করতে বসবেন না। সামনে অনেক বড় একটা যুদ্ধ আসছে ভায়া। আর রইল আপনার ফেরার হওয়ার কথা। ওটা ম্যানেজ হয়ে যাবে, চিন্তা করবেন না।
‘আপনি শুধু কোর্টের দুটো ডেট মিস করেছেন বলে আপনাকে ওরা এতটা ফলো করে জনশূন্য এলাকায় জোর করে গাড়িতে ওঠাচ্ছিল, এটা বিশ্বাস হল আপনার? কাম অন! ইউ আর আ প্রফেশনাল ইনভেস্টিগেটর। এতটা ইনোসেন্ট তো আপনি নন। তাছাড়া আমাদের কাছে যা ইনফরমেশন আছে, তাতে আপনার পরিবার বলতে শুধু স্ত্রী আর মেয়ে ছাড়া এমনিও কেউ ছিল না। তারাও তো আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে। সুতরাং, আপনার এই জীবনে নোঙর বলতে তেমন কিছুই নেই আর। তাই ফেরার হলেন, কি হলেন না, ডাজ ইট ম্যাটার এনিমোর?’
তূর্য বুঝতে পারছিল গাড়িটা যাচ্ছে এয়ারপোর্টের দিকে। বাইপাস ধরে সিটি সেন্টার টু, চিনার পার্ক ছাড়িয়ে ঝড়ের বেগে ছুটছিল গাড়িটা। হঠাৎ একটু আধো অন্ধকার জায়গায় সাইড করে দাঁড়িয়ে গেল। গাড়ির দরজা খুলে নামল মিস্টার শ্যাডো। তারপর তূর্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নেমে আসুন। ছোট্ট একটা কাজ আছে।’
কথা শেষ করে গাড়ির পিছনে গিয়ে ডিকি খুলে একটা ছোট ব্যাগ ছুড়ে দিল তূর্যর দিকে। তারপর ঠিক সেইরকমই আরেকটা ব্যাগ নিজে নিয়ে চোখের ইশারায় দেখাল পাশে একটা ছোট্ট ফাস্ট ফুডের রেস্টুরেন্টের দিকে। সেদিকে এগিয়ে যেতেই একটা বেঁটে-মোটা মতো লোক এগিয়ে এসে দাঁড়াল। মিস্টার শ্যাডো তার সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে তার হাতে দিল। লোকটা সেই কাগজে একবার চোখ বুলিয়েই কোনও কথা না বলে চুপচাপ দোকানের লাগোয়া অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেল। তাকে অনুসরণ করল ওরা দুজন।
দোকানের ঠিক পেছনদিকে এসে একটা ছোট ঘরের সামনে এসে থামল লোকটা। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলে চাবিটা মিস্টার শ্যাডোর হাতে তুলে দিয়েই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মিস্টার শ্যাডো চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। ভিতরে পায়রার খোপের মতো ছোট্ট ছোট্ট দুটো ঘর। শ্যাডো বলল, ‘পাশের ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করে নিন। অ্যাটাচড বাথরুম আছে। চাইলে স্নানও করে নিতে পারেন। তবে হাতে সময় কম। যা করার সতেরো মিনিটের মধ্যে করে নিন।’
কথা শেষ করে হাতের ব্যাগ নিয়েই লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে গেল সে। তূর্য দরজা খুলে পাশের ঘরে ঢুকল। ইট বের করা দেওয়াল। প্লাস্টার হয়নি এখনও। ঢুকেই বাঁ-দিকে একটা ক্যাম্বিসের খাটিয়া। ডানদিকে বাথরুম। অবশ্য ওটাকে বাথরুম বলা যায় না। টিনের দরজা। ছিটকিনি নেই। দরজা টেনে ভিতরে পেরেকের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধতে হয়। কোনওরকমে একজন মানুষের দাঁড়ানোর মতো জায়গা।
ভিতরে একটা নিচু কল, প্লাস্টিকের বালতি, একটা হাতলভাঙা মগ। তূর্য ব্যাগটা খুলে ভিতরের জিনিস বিছানার উপর ঢালল। এক সেট নতুন জামাপ্যান্ট। একটা তোয়ালে, সাবান, শ্যাম্পু। সঙ্গে একটা শেভিং কিট। যতটা সম্ভব দ্রুততার সঙ্গে দাড়ি কামিয়ে স্নান করে জামাপ্যান্ট পরে রেডি হয়ে গেল তূর্য।
জামা এবং প্যান্ট দুটোই চমৎকার ফিট হয়েছে। যেন ট্রায়াল দিয়ে কেনা। এরপর পাশের ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকতেই বেশ অবাক হল তূর্য। সেখানে চৌকির ওপর বসে জুতোর ফিতে বাঁধছিল মিস্টার শ্যাডো। তূর্যর ঢোকার শব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ আর লেট। পাক্কা তিন মিনিট।’
শ্যাডোর মুখের দিকে তাকিয়ে এবার আরও চমকে গেল তূর্য। এ কাকে দেখছে! এ তো সেই লোক নয়! নাকটা আগের তুলনায় তীক্ষ্ণ। ছোট ছোট চুল। নিখুঁতভাবে কামানো দাড়ি। চোখে একটা রিমলেস চশমা। চোয়াল আগের তুলনায় সুগঠিত। পাশে একটা ছোট টেবিলের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা কতকটা স্পষ্ট হল তূর্যর কাছে। সেখানে একটা প্রস্থেটিক নাক আর একটা মাড়িসুদ্ধ উপরের পাটির দাঁত। এই নকল দাঁতের পাটির জন্য গালের হাড়গুলোকে খানিকটা উঁচু লাগছিল।
এখন মিস্টার শ্যাডোর পরনে ঝকঝকে সাদা শার্ট। হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। আর নীল ডেনিম। অসম্ভব স্মার্ট লাগছে তাকে। নকল দাঁতের পাটি খুলে ফেলায় গলার স্বরও অনেক স্বাভাবিক শোনাচ্ছে।
এবারে তূর্যর দিকে না তাকিয়েই শ্যাডো বলল, ‘ওইখানে জুতো আর মোজা রাখা আছে। ঝটপট পরে নিন। আমাদের বেরোতে হবে। উই আর অলরেডি লেট। সো প্লিজ হারি।’
তূর্য বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু আমার জামা-জুতোর মাপ কোথা থেকে পেলেন আপনারা?’
যেন খুবই মূর্খের মতো প্রশ্ন করেছে, এমনভাবে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তূর্যর দিকে তাকাল মিস্টার শ্যাডো। তারপর প্রায় ধমকের সুরে বলল, ‘আপনার ব্রাউসিং হিস্ট্রি। যে ই-কমার্স সাইট থেকে আপনি জামা প্যান্ট জুতো কেনেন, সেখান থেকে। শান্তি? আপনার ফেভারিট রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পর্নের প্রেফারেন্স, সবই আমাদের নখদর্পণে। এবার দয়া করে আর দেরি করবেন না, ফর গডস সেক!’
তূর্য ব্যাগটায় শেভিং কিট, সাবান আর তোয়ালেটা ঢুকিয়ে নিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল মিস্টার শ্যাডো। তারপর হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘এসব কিচ্ছু নিতে হবে না। এখানেই রেখে দিন।’
জুতো পায়ে গলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েই ওরা দেখল, সেই লোকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার বাইরে। হাতে দুটো ছোট ছোট ডাফেল ব্যাগ। প্রায় একইরকম দেখতে। তূর্য বুঝল, তখন ওই ছোট্ট চিরকুটে এইগুলোই আনার আদেশ দেওয়া ছিল। মিস্টার শ্যাডো হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল তালা-চাবি কোথায় রাখা রয়েছে। লোকটা উত্তরে একটা অস্পষ্ট শব্দ করল। এতক্ষণে তূর্য বুঝল লোকটা কেন কথা বলেনি প্রথম থেকে। লোকটা কথা বলতে অক্ষম। খুব সম্ভবত শ্রবণশক্তিও নেই।
শ্যাডো ডাফেল ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে চেনের কাছে লাগানো দুটো ছোট্ট কাগজের ট্যাগে চোখ বুলিয়ে, একটা এগিয়ে দিল তূর্যর দিকে। তূর্য দেখল, ট্যাগে তার নাম লেখা। ব্যাগটা কোলে নিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে গিয়ে বসল শ্যাডো। এরপর শ্যাডো আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার বাইরে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আর দরকারি টুকটাক জিনিসপত্র আছে। আর সামনের পকেটে একটা ওয়ালেট আছে। তাতে কিছু টাকা আর ডকুমেন্টস আছে। পরে কাজে লেগে যেতে পারে।’
কোন ডকুমেন্টস, কী কাজে লাগবে—সে বিষয়ে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করল না তূর্য। বুঝতে পারছিল জিগ্যেস করে লাভও নেই। শুধু একটা ব্যাপার সে পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, অনেক আগে থেকেই প্ল্যানমাফিক টার্গেট করা হয়েছে তাকে। এবং সে নিজেও বলতে গেলে এদের হাতে বন্দি।
বাকি রাস্তা কোনও কথা বলল না মিস্টার শ্যাডো। লোকটার একটা হাত জানালার বাইরে বের করে রাখা। সেই হাতে ধরা আছে জ্বলন্ত সিগারেটটা।
একটা একটা করে দোকান, ঘরবাড়ি, ট্রাফিক সিগন্যাল পেরিয়ে যাচ্ছে ওরা। শীতকাল আসছে। এখনই তার আবেশ এসে গেছে সন্ধের হাওয়ার ঝাপটায়। তূর্যর ক্লান্ত শরীর ধীরে ধীরে চেতনা হারাচ্ছিল। তন্দ্রার অতলে তলিয়ে যেতে যেতে সে শুনতে পেল কেউ ফোনে বলছে, ‘স্যার, সিকিওরড মিস্টার টি। নাও মুভিং টু সেফ হাউজ।’
যশোর রোড ধরে গাড়িটা চলেছে প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে। শহরের কোলাহল ক্রমশ মিলিয়ে যেতে লাগল পেছনে। রাস্তার দু’পাশের দোকানপাট, ফ্ল্যাটবাড়ি—সবকিছু যেন পিছিয়ে পড়ছিল কোনও ঝাপসা স্মৃতির মতো। তূর্যর ঘুমটা ভেঙে গেল। জানালার পাশে বাইরে তাকিয়ে সে দেখল, পাশের সিটে যন্ত্রের মতো চুপচাপ বসে আছে মিস্টার শ্যাডো।
মধ্যমগ্রামের কাছাকাছি এসে গাড়িটা একটা তুলনামূলক সরু রাস্তায় ঢুকল। এই জায়গাগুলো তূর্য চেনে না। বেশ খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক অলিগলি ধরে গাড়ি ছুটে চলার পর রাস্তা আরও সংকীর্ণ হয়ে এল। দু’পাশে মাঠ, জমি, দূরে দূরে কিছু অবিন্যস্ত টিনের চালের বাড়ি। সেসবের মধ্যে দিয়ে গাড়ি একটা ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। ঝাঁকুনি বাড়ল। তূর্য বুঝল, তার চেনা শহর থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে তারা।
অবশেষে গাড়ি এসে থামল একটা পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে।
