একাদশ পর্ব – উইন্ড চাইম

একাদশ পর্ব – উইন্ড চাইম

টানেলের ভেতর শ্যাডো, স্যাম, এলেনা আর রিয়া হাঁটছিল। হাঁটছিল বলা ভুল। ছোটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পায়ের নীচে জমে থাকা ঘন নোংরা জল তাদের সে সুযোগ দিচ্ছে না। টানেলটা বেশ সরু। মাথা নিচু করে এগোতে হচ্ছে। দেওয়াল ভেজা। সোঁদা মাটি আর জমা জলের পচা গন্ধ মিশিয়ে এক বিচিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। শ্যাডো সামনে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আর সবার পিছনে স্যাম তার ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে খেয়াল রাখছিল, যাতে কেউ পেছন থেকে আক্রমণ না করে।

রিয়া মাঝখানে হাঁটছিল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে। এই সরু, অন্ধকার জায়গায় প্রাচীন দানবের মতো ক্লস্ট্রোফোবিয়া তাকে চেপে ধরছে। সে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করল। তারপর নিজের হৃদয় নিংড়ে সবটুকু শক্তি একত্রিত করে আবার মনোযোগ দিল হাঁটায়।

‘আর কতদূর?’ এলেনা জিগ্যেস করল।

শ্যাডো উত্তর দিল, ‘প্রায় তিনশো মিটার।’

তারা হাঁটতে থাকল। দুটো ফ্ল্যাশলাইটের আলোও টানেলের ভিতরের নিকষ অন্ধকারকে দূর করতে পারছে না। ওদের পায়ের শব্দ বদ্ধ টানেলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা শব্দ এল। দূরে, কিন্তু স্পষ্ট। কেউ টানেলে ঢুকেছে। স্যাম দ্রুত পেছনে তাকাল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছে না।

‘ওরা ঢুকে পড়েছে। ক্যুইক!’ শ্যাডো চাপা গলায় বলল।

সবাই দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু টানেলের ভেতর দৌড়ানো কঠিন। মাথা নিচু রেখে, হোঁচট খেতে খেতে দৌড়াল তারা।

পেছন থেকে চিৎকার শোনা গেল, ‘দে আর রানিং! মুভ! মুভ!’

তারপর গুলির শব্দ। টানেলের ভেতর সেই শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে হতে তাদের তাড়া করে আসছে।

বুলেটগুলো টানেলের দেওয়ালে আঘাত করছে। পাথরের টুকরো ছিটকে ছড়িয়ে পড়ছে জমা জলে।

শ্যাডো চাপা হিংস্র গলায় বলে উঠল, ‘হেড ডাউন!’

সবাই ওই জলের মধ্যেই বসে পড়ল। শ্যাডো তার পিস্তল বের করে পেছনে তাক করেছে। সে এবার দুটো ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করল। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল টানেল। পিছন থেকে গুলির আওয়াজ থেমে গেল। ওরা সতর্ক হয়েছে।

‘মুভ! নাও!’ শ্যাডো গর্জন করল।

সবাই ফের দৌড়াতে শুরু করল। সামনে একটা ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। টানেলের শেষ। পিছন থেকে আরও গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এবার যেন খুব কাছে।

শ্যাডো সবার আগে বাইরে পৌঁছাল। এখানে একটা জং ধরা ধাতব হ্যাচ রয়েছে। সে হ্যাচ ঠেলে খুলে দিল। ভাগ্যেস জং ধরে কব্জাগুলো অকেজো হয়ে যায়নি। তাহলে তাদের বাঁচার আর কোনও আশা ছিল না। সবাই দ্রুত বাইরে উঠে এল। সবাই সবাইকে সাহায্য করল উঠতে।

সবাই উঠে এলে শ্যাডো হ্যাচ বন্ধ করে দিল। কোমরের বেল্ট থেকে একটা লম্বা ছুরি বের করে সেটা হ্যাচের হ্যান্ডেল দুটোর মধ্যে ফাঁসিয়ে দিল। এবার এটাকে ভিতর থেকে খোলা বেশ কষ্টসাধ্য হবে।

পুকুরের ধার ধরে অনেকটা এগিয়ে তারা একটা সরু রাস্তায় এসে পড়ল। তার খানিক পরেই চওড়া, বাঁধানো রাস্তা। রাত নেমেছে। আশেপাশে কোথাও কোনও মানুষ নেই।

‘এবার একটা গাড়ি দরকার।’ শ্যাডো বলল।

স্যাম চারপাশে তাকাল। রাস্তার ধারে একটা পুরোনো সেডান পার্ক করা। সে ছুটে সেডানের কাছে গেল। এদিক-ওদিক একটু পরীক্ষা করে নিয়ে স্যাম নিজের ব্যাগ থেকে টুলবক্সটা বের করল। তারপর তার হাতের জাদুতে তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ির দরজা খুলে গেল।

সবাই গাড়িতে উঠল। স্যাম বসল ড্রাইভারস সিটে। শ্যাডো তার পাশে। পেছনে এলেনা আর রিয়া। ইঞ্জিন চালু হল। গাড়ি ছুটে চলল পিচঢালা রাস্তা ধরে। স্যাম শহরের রাস্তা দিয়ে ট্রাফিক কাটিয়ে খুব স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলছিল। খুব দ্রুত চললে সন্দেহের কারণ হতে পারে। তখন ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি আটকালেই বিপদ।

শ্যাডো নিজের ফোনে ম্যাপ দেখছিল। সে বলল, ‘টেক দ্য নেক্সট রাইট। মূল শহরের দিকে যেও না। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। তবে এখনই কেউ প্রশ্ন করবে না। আমি যা বলছি, চুপচাপ ফলো করো। আমায় একবার চিফের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তার জন্য সিকিওর স্যাটেলাইট কানেকশন দরকার।’

স্যাম মাথা নাড়ল। তারপর শ্যাডোর কথামতো ডানদিকে গাড়ি ঘোরাল। এলেনা ফোনে কিছু একটা টাইপ করছিল। সম্ভবত ওর ওপরতলায় সিচুয়েশনের আপডেট দিচ্ছে। গাড়ি এখন বাইপাস ধরেছে। একটা ফাঁকা শুনশান জায়গায় এসে শ্যাডো বলল, ‘এখানেই দাঁড়াও।’

রাস্তার একপাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করাল স্যাম। সবারই শরীর অসম্ভব ক্লান্ত। পোশাক শুকিয়ে গেছে বটে। তবে তা থেকে বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সামনের দোকান থেকে চা কিনে সবে চুমুক দিয়েছে রিয়া, হঠাৎ দেখল দূর থেকে একটা গাড়ি এদিকেই আসছে। শ্যাডোর দিকে তাকালে সে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল। গাড়িটা এসে থামল ঠিক ওদের পিছনেই। সেখান থেকে একজন নেমে এসে প্রত্যেকের হাতে একটা করে ব্যাগ ধরিয়ে দিল।

শ্যাডো বলল, ‘এটা আমাদের নতুন গাড়ি। চোরাই গাড়িতে বেশিক্ষণ ট্রাভেল করা নিরাপদ নয়। এখান থেকে আপাতত আরেকটা সেফ হাউজে যাব আমরা। আমায় কিছু সিকিওর ফোন কল করতে হবে, আমাদের পোশাক পালটাতে হবে। তারপর সেখান থেকেও ইমিডিয়েটলি বেরোতে হবে আমাদের। আর দেরি কোরো না কেউ। তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠো।’

রিয়া বিরক্ত মুখে চায়ের ভাঁড়টা ছুড়ে ফেলে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। গাড়িতে উঠে সে মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল যাতে কেউ দেখতে না পায়। চওড়া রাজপথ ধরে গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটতে থাকল শহরের বাইরের দিকে।

ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটা যখন ল্যান্ড করল, তখন ঠিক রাত একটা চল্লিশ। ল্যান্ডিংয়ের ঝাঁকুনি, ব্রেকের শব্দ এবং তারপর স্বাভাবিক গতিতে ট্যাক্সিওয়ে ধরে এগোনো, সব পেরিয়ে তূর্য যখন বিমান থেকে নামল, কনকনে ঠান্ডা বাতাস তখন তাকে কাবু করে ফেলেছে। দিল্লিতে এর মধ্যেই এরকম ঠান্ডা পড়ে গেছে তার ধারণাই ছিল না। ডোমেস্টিক টার্মিনালে এই সময়ে যাত্রীর ভিড় কম।

তার ব্যাগেজ ক্লেইম করার ছিল না। সে বেল্ট পার করে বাইরে বেরোল। এই মধ্যরাতেও এয়ারপোর্টের বাইরে ট্যাক্সি, অটো, অ্যাপ ক্যাবের লম্বা লাইন। তূর্য সরাসরি প্রি-পেইড ট্যাক্সি কাউন্টারের দিকে গেল।

‘মহীপালপুর কত?’

‘দুশো পঞ্চাশ টাকা।’

টাকা দিয়ে রিসিট নিয়ে তূর্য নির্দিষ্ট ট্যাক্সিতে উঠল। সাদা ইন্ডিকা গাড়ি। ড্রাইভার একজন বয়স্ক শিখ।

‘কোথায় যাবেন মহীপালপুরে?’

‘ব্লক এ। স্ট্রিট নম্বর সেভেন। এলিভেট হোটেলের পাশের গলি। মিনিট সাতেক ঢুকতে হবে।’

‘ওকে স্যার। আমার বাড়িও ওদিকেই।’

গাড়ি ছাড়ল। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ফর্টি এইট ধরল। দিল্লির রাস্তা এই সময়ে প্রায় ফাঁকা। মাঝেমধ্যে কিছু ট্রাক, কিছু কন্টেইনার বহনকারী লরি ছুটে যাচ্ছে। রাস্তার দু’পাশে সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পের হলদে আলো।

‘স্যারজি, আপনি কোথা থেকে আসছেন?’

‘কলকাতা।’ তূর্য বোঝে সর্দারজি আলাপ জমাতে চাইছেন। কিন্তু তূর্য এখন পুরো ঘেঁটে আছে। কারওর সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার। তাই যতটা সম্ভব সংক্ষেপে উত্তর দিল।

‘আচ্ছা। এত রাতে? কোনও ইমার্জেন্সি?’

‘হ্যাঁ, একটু।’

সর্দারজি আর কিছু জিগ্যেস করলেন না।

গাড়ি স্ট্রিট নম্বর ফাইভ ধরে সার্ভিস রোড ছেড়ে মহীপালপুরের দিকে ঢুকল। এই এলাকাটা দিল্লির সবচেয়ে পুরোনো এলাকাগুলোর একটা। সরু গলি, পুরোনো বাড়ি, কিছু নতুন অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। এখন অবশ্য সব নিস্তব্ধ।

‘স্যার, এই তো পৌঁছে গেলাম। সেক্টর এ। কত নম্বর বাড়ি?’

‘সেভেন্টিন-এ।’

গাড়ি থামল একটা দোতলা বাড়ির সামনে। বাড়িটা বেশ পুরোনো। সামনে ছোট্ট একটা বাগান। যদিও তাতে যত্নের অভাব স্পষ্ট। নিচু পাঁচিল। গ্রিল গেটটাকে স্ট্রিটলাইটের ফ্যাকাসে আলোয় ঠিক একটা কঙ্কালের মতো লাগছে।

তূর্য ট্যাক্সি থেকে নেমে প্রথমে চারপাশে একবার তাকাল। এই বাড়িতে সে আগে একবারই এসেছে। সুলগ্নার বাবা এই বাড়িটা যখন কিনেছিলেন, তখন ওদের বিয়ে হয়নি। বিয়ের আগে সুলগ্না এখানেই থাকত। এখন তূর্যর সঙ্গে সেপারেশনের পর সুলগ্না আবার এই বাড়িতেই এসে রয়েছে। কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল তূর্য।

তারপর তূর্য ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগোল। গেট খোলা। একটু বিস্মিত হল তূর্য। সন্ধের পর সাধারণত সুলগ্না গেট লক করে রাখে। কী ব্যাপার? তূর্য গেট দিয়ে ঢুকল। দ্রুতপায়ে বাগান পার হয়ে সামনের দরজায় এসে থামল। দরজায় নক করবে? বেল বাজাবে? নাকি সরাসরি চাবি খুলে ঢুকবে? তার কাছে এখনও এই বাড়ির একটা চাবি আছে। বিয়ের পর দিল্লির এই বাড়ির এক সেট চাবি তাকে দিয়েছিল সুলগ্না। সেই থেকে নিজের বাড়ির চাবির রিংয়ে এটাও সবসময় থাকে।

এত রাতে কলিং বেল বাজালে সুলগ্না দরজা না-ও খুলতে পারে। হয়তো তাকে হঠাৎ দেখে চ্যাঁচামেচি করে একটা বিশ্রী কাণ্ড বাধাবে। তার থেকে চুপচাপ ঢুকে যাওয়াটা ভালো। যা অশান্তি হবে, ঘরের মধ্যে হবে। খানিক ইতস্তত করে তূর্য দরজার লকে চাবি ঢোকাল। তারপর আলতো চাপ দিতেই খুলে গেল লক। সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বাড়ির ভেতর মিশকালো অন্ধকার। লাইটের সুইচ অন করতে গিয়ে দেখল, জ্বলল না।

‘তিতলি?’ তূর্য নরম গলায় ডাকল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে আবার ডাকল, ‘সুলগ্না, তিতলি, কোথায় তোমরা?’

কোনও সাড়া নেই।

তূর্য লিভিংরুমে ঢুকল। সবকিছু স্বাভাবিক। সোফায় কুশন সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। টেবিলের উপর ম্যাগাজিন পড়ে আছে। সে রান্নাঘরে গেল; খালি। তারপর ডাইনিংরুম; সেটাও খালি।

‘সুলগ্না?’ এবার বেশ জোরেই ডাকল তূর্য, ‘কোথায় তুমি?’

এইবার ধীরে ধীরে একটা আতঙ্ক গ্রাস করছে তাকে। নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছে স্পষ্ট। তূর্য সিঁড়ির দিকে এগোল দোতলায় যাওয়ার জন্য। ঘড়িতে রাত প্রায় তিনটে। হয়তো এখন ওরা এতটাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন যে তূর্যর গলা শুনতে পাচ্ছে না। সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। এক ধাপ… দুই ধাপ… তিন ধাপ…

হঠাৎ তার পায়ের নীচে সিঁড়ির একটা ধাপ অদ্ভুত শব্দ করল। স্বাভাবিক শব্দ নয়। যেন কোনও মেকানিকাল ট্রিগার প্রেস করা হল।

তূর্য থমকে গেল। সেকেন্ডের ভগ্নাশের মধ্যেই তার অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক বুঝে নিল কী হতে পারে। সে অমানুষিক ক্ষিপ্রতায় এক লাফে সিঁড়ির রেলিং পেরিয়ে নীচে ঝাঁপ দিল। প্রায় এক তলা ওপর থেকে নীচে আছড়ে পড়ার সময় হাঁটুতে অসম্ভব চোট পেল। তবে সেই ব্যথা অনুভব করার সময় পেল না সে। তার আগেই মাথার ওপর সিঁড়ির যে জায়গায় সে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণ হল। সিমেন্টের প্লাস্টার খসে ঝুরঝুরে বালি ঝরে পড়ল তূর্যর মাথায়।

তারপরের ঠিক মিনিট দুয়েকের মধ্যেই খুব দ্রুত কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেল। উপরতলা থেকে একজন আগন্তুক বেরিয়ে এল। কালো পোশাক, মুখে মাস্ক, হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। রাইফেলটা তূর্যর দিকেই তাক করা। এইবার এলোপাথাড়ি গুলি করতে শুরু করল সেই লোকটা। সিঁড়িতে, দেওয়ালে, লোহার রেলিংয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট এসে আছড়ে পড়ছে। কখনও কাঠের স্প্লিন্টার ছিটকে উড়ছে, কখনও দেওয়ালের প্লাস্টারের টুকরো। তূর্য মেঝেতে গড়িয়ে সোফার পেছনে আশ্রয় নিল। তার পায়ে অসহ্য ব্যথা। ব্যথায় কাতরে উঠতে গিয়েও নিজেকে শাসন করল সে।

তূর্যর কাছে কোনও অস্ত্র নেই। যদিও থাকলে খুব একটা সুবিধা বোধহয় হতো না। বৃষ্টির মতো গুলি চলছে তার চারিদিকে। লোকটা গুলি করতে করতেই সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসছে। ঝাঁজরা হয়ে যাচ্ছে সোফা। কুশন থেকে ফাইবার বেরিয়ে আসছে। তূর্য হামাগুড়ি দিয়ে সরতে লাগল। সোফার পেছন থেকে ওয়ার্ড্রোবের পিছনে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? তূর্য বুঝতে পারছে সে ফাঁদে পড়ে গেছে। এখান থেকে মুক্তির আর কোনও উপায় নেই।

গুলি লেগে ডাইনিং টেবিলের কাচ ভেঙে পড়ল ঝনঝন করে। তূর্য নিজের শরীরটাকে দেওয়ালের সঙ্গে মিশিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল নিশ্চিত মৃত্যুর। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ড পাঁজরের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে বাইরে।

আচ্ছা, এরা কি সুলগ্না আর তিতলিকে মেরে ফেলেছে? তিতলির মুখটা ভেসে উঠল মনের চিত্রপটে। সেই মায়াবী দুটো চোখ, সেই নিষ্পাপ হাসিমুখ। সে স্পষ্ট শুনতে পেল তিতলি বলছে, ‘পাপা, আমি তোমায় খুব ভালোবাসি। ইউ আর দ্য বেস্ট!’

‘আমিও তোমায় ভালোবাসি। এই পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্যের থেকেও সহস্র গুণ বেশি।’ তূর্য দু’চোখ বন্ধ করেই ফিসফিস করে বলল।

ওদিকে গুলির আওয়াজ কখন থেমে গেছে খেয়ালই করেনি তূর্য। সে বুঝতে পারছে, একজোড়া ভারী পদশব্দ ক্রমশ তার কাছে এগিয়ে আসছে। তূর্য ধীরে ধীরে চোখ খুলল। খুব শান্ত দৃষ্টিতে সামনে তাকাল। লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক তার সামনে। হাতে ধরা অস্ত্রটা সরাসরি তার বুকের দিকে তাক করা।

সময়ও যেন ধীর লয়ে এগোচ্ছে। তূর্য দেখল, লোকটার আঙুল ধীরে ধীরে ট্রিগারে চাপ সৃষ্টি করছে। সে শেষবারের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দু-চোখ বন্ধ করল।

তারপর…

একটা গুলির ভোঁতা আওয়াজ। তূর্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল বুকে একটা ধাতব ধাক্কা অনুভব করার। শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার সময় যে অসহনীয় যন্ত্রণা সে অনুভব করবে, সেই অনুভূতির। কিন্তু কই? সেসব অনুভূতি তো হচ্ছে না! শুধু একটা ভারী কিছু জিনিস আছড়ে পড়ার একটা চাপা শব্দ এল কানে।

তূর্য বিস্মিত হয়ে চোখ খুলল।

দেখল, তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্যাডো। তার হাতে উদ্যত পিস্তল। ধূসর ধোঁয়া উড়ছে ব্যারেল থেকে।

‘মুভ! নাও!’ শ্যাডো গর্জন করে উঠল।

তূর্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, পারল না। তার পা কাঁপছিল। মুহূর্তে আরও গুলির শব্দ ভেসে এল। এবার রান্নাঘর থেকে। শ্যাডো দ্রুত দরজার ফ্রেমের পেছনে আশ্রয় নিল। তারপর রিটার্ন ফায়ার করল। পরপর দুটো শট। একদম নির্ভুল লক্ষ্য। একজন কাটা কলাগাছের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বাইরে থেকে আরও একজন ডাইনিংয়ে ঢুকল। তূর্য সেদিকে তাকিয়ে দেখল স্যাম দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। সে দ্রুত এগিয়ে এসে শ্যাডোকে কভার করল।

এলেনাও এসেছে। তার হাতেও অস্ত্র। সে সিঁড়ি কভার করে দাঁড়িয়ে। শ্যাডো এবার ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকল। স্যাম তাকে কভার দিতে দিতে এগোচ্ছে তার পিছনে। এলেনা অবশ্য ওপরে গেল না। সে চাপা গলায় তূর্যকে বলল, ‘চলো! আমার পিছনে এসো। আমাদের এখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে!’

‘কিন্তু আমার মেয়ে? আমার স্ত্রী তিতলি আর সুলগ্নাকে ছাড়া আমি কোথাও যাব না।’

‘জেদ কোরো না তূর্য। কাম অন!’

‘না। ওদের ছাড়া আমি কোথাও যাব না।’

হঠাৎ ওপর থেকে শ্যাডোর আওয়াজ পাওয়া গেল, ‘ফার্স্ট ফ্লোর ক্লিয়ার। তিতলি আর সুলগ্না ওপরেই আছে।’

তূর্য উদ্‌ভ্রান্তের মতো ছুটল ওপরে। তার হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু সেসব অবলীলায় উপেক্ষা করে সে ছুটে গেল দোতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠে করিডোর পার হয়ে বেডরুমের দরজার সামনে এসে থমকে গেল তূর্য। দরজা অর্ধেক খোলা। ভেতর থেকে ক্ষীণ কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।

তূর্য দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিল। আর তাতে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা দেখে তার বুকের ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। খাটের ওপর বসে আছে তিতলি আর সুলগ্না। দুজনেরই হাত-পা বাঁধা ছিল দড়ি দিয়ে। তিতলির গোলাপি ফ্রক ছিঁড়ে গেছে এক পাশ থেকে। মুখে ভয়ের ছাপ। চোখ লাল, অঝোর ধারায় কান্না গড়িয়ে পড়েছে নরম দুটো গাল বেয়ে। সুলগ্নার গালে একটা কাটা দাগ। সেখানে বাদামি রক্ত জমাট বেঁধে আছে। চুল এলোমেলো।

শ্যাডো খাটের পাশে দাঁড়িয়ে সাবধানে তাদের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিচ্ছিল।

‘তিতলি!’ তূর্যর মুখ থেকে নামটা ছিটকে এল আর্তনাদের মতো।

তিতলি মাথা তুলে তাকাল। তার ছোট্ট গালে নোনা জলের দাগ শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। সে চিৎকার করে উঠল, ‘পাপা!’

তূর্য ছুটে গেল। একসঙ্গে জড়িয়ে ধরল দুজনকে। তিতলির ছোট্ট শরীরটা তার বুকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। সুলগ্না সম্পূর্ণ নিথর। সে প্রথমে তূর্যকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর হঠাৎ কী মনে করে সেও তূর্যকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।

তিতলি এবার তার ছোট ছোট আঙুলগুলো দিয়ে তূর্যর মুখ স্পর্শ করল। তার আঙুল ভিজে গেল রক্তে। ভয়ে চিৎকার করে উঠল সে, ‘পাপা! তোমার মুখে এত রক্ত কেন? তোমার কি লেগেছে?’

‘না মা। আমি একদম ঠিক আছি।’ তূর্য তিতলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ভাঙা গলায় কোনওরকমে কথাগুলো বলল সে।

তিতলি তখনও কাঁদছিল। থেমে থেমে সে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছিল পাপা? ওই আঙ্কেলটা কে ছিল? সে আমায় আর মাম্মিকে হাত-পা বেঁধে পানিশ করছিল কেন? আমরা কি খারাপ কাজ করেছি? আমি তো ভালো মেয়ে পাপা। আমি কোনও দুষ্টুমি করিনি!’

তূর্য তিতলির মুখের দিকে তাকাল। চোখে চোখ রেখে বলল, ‘শোনো মা। তুমি কোনও খারাপ কাজ করোনি। ওই আঙ্কেলটা একজন ব্যাড পার্সন। ভেরি ভেরি ব্যাড। কিন্তু তোমায় আর কেউ পানিশ করতে পারবে না। পাপা এসে গেছে। আর কেউ তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’

তিতলি মাথা নাড়ল। তার কান্না এখন কিছুটা থেমেছে। সুলগ্না ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে জিগ্যেস করল, ‘এসব কী হচ্ছে তূর্য? এরা কারা? কেন আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমাদের বেঁধে রেখেছিল? পুরো বাড়িটা তছনছ করে দিয়েছে।’

‘আমি তোমায় সব বলব। কিন্তু তার আগে প্লিজ এখান থেকে চলো। এখানে তোমরা নিরাপদ নও।’

সুলগ্না কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তখন শ্যাডো এগিয়ে এসে বলল, ‘ম্যাডাম! আপনাদের দুজনকে রিসিভ করতে গাড়ি আসছে। আপাতত কিছুদিনের জন্য আমরা আপনাদের একটা সেফ লোকেশনে শিফট করব।’

সুলগ্না প্রথমে তূর্যর দিকে তাকাল। তারপর শ্যাডোর দিকে, ‘আপনি কে?’

তূর্য উত্তর দিল, ‘চিন্তা কোরো না। এরা সরকারি অফিসার। তোমরা এখন যাও। আমার কিছু কাজ আছে। শেষ করে কয়েকদিন পরেই আমি তোমাদের সঙ্গে দেখা করছি।’

শ্যাডো ঘড়ি দেখল। তারপর সবার দিকে তাকাল। বলল, ‘তাড়াতাড়ি করতে হবে। বাড়িতে গোলাগুলি চলেছে। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ পুলিশে ফোন করে দিয়েছে এতক্ষণ। যে কোনও মুহূর্তে তারা এসে পড়বে। তার আগেই আমাদের বেরোতে হবে।’

তূর্য তিতলিকে কোলে তুলে নিল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। সুলগ্না তার পাশে। শ্যাডো সামনে।

নীচে লিভিংরুমে এসে তূর্য থমকে গেল। মেঝেতে পড়ে আছে দুটো নিথর শরীর। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। দেওয়ালে বুলেটের দাগ। আসবাবপত্র ছিন্নভিন্ন। তিতলি সেগুলো দেখে ফেলার আগেই তূর্য তাড়াতাড়ি তার চোখ নিজের কাঁধে চেপে ধরল। সুলগ্না অবশ্য দেখল। তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। পা কাঁপছে। তূর্য তার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল। সামান্য দোনামোনা করে তূর্যর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরল সুলগ্না। বাইরে বেরিয়ে এল সবাই।

রাস্তায় পরপর দুটো কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে। দুটোর ইঞ্জিনই চালু। তূর্য তিতলিকে গাড়িতে বসিয়ে দিল। সুলগ্নাও বসল। তিতলি জানালা দিয়ে তূর্যর দিকে তাকাল। তার চোখে এখনও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট, ‘পাপা, তুমি আসবে তো?’

তূর্য একটু জোর করেই হাসল, ‘হ্যাঁ মা। খুব তাড়াতাড়ি। সামনের ফ্রাইডে তোমার বার্থডে না? তার আগেই আসব। প্রমিস।’

‘পাক্কা প্রমিস?’

‘পাক্কা প্রমিস।’

তিতলি তার ছোট্ট আঙুল বাড়িয়ে দিল জানালা দিয়ে। তূর্য নিজের আঙুল জড়াল তার সঙ্গে। গাড়ির দরজা বন্ধ হল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তূর্য দাঁড়িয়ে দেখল যতক্ষণ না গাড়ি রাস্তার মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়।

শ্যাডো তার কাঁধে হাত রাখল, ‘দে উইল বি সেফ। আই প্রমিস।’

‘থ্যাংক ইউ। কিন্তু আপনারা এত তাড়াতাড়ি এখানে পৌঁছালেন কী করে?’

‘আপনাকে পরবর্তী খালি ফ্লাইট টিকিটের অ্যাভেইলেবিলিটির জন্য যতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে, থ্যাঙ্কফুলি “র”-কে সেই অপেক্ষাটা করতে হয় না।’

তূর্য সামান্য হাসল। তারপর প্রশ্ন করল, ‘রিয়া কোথায়?’

‘কলকাতায়। আমরাও এখন ওখানেই যাব। মিশন কিন্তু সবে শুরু হল। আর ঠিক দশদিন পর ডিল সাইনিং। তার আগে আমাদের আরভকে এক্সট্র্যাক্ট করতে হবে, তারপর এজেন্ট মোহিনীর রেখে যাওয়া প্রুফ উদ্ধার করে যে-কোনও ভাবে ডিলটা জেপার্ডাইজ করতে হবে।’

‘আমাদের মানে?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করল তূর্য।

‘মানে ওয়েলকাম টু দ্য টিম। রিয়ার সোর্স আর আপনার ডিডাকশন পাওয়ার আমাদের কাজে লাগবে।’

‘কিন্তু আমরা তো সিভিলিয়ান। অফিশিয়ালি তো…’

এই প্রথম শ্যাডোকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখল তূর্য। হাসি থামিয়ে সে বলল, ‘আমাদের এই জগৎটাই তো সিভিলিয়ানদের কাছে এক্সিস্ট করে না। ভুলে গেলেন ফেলুদা? এখানে সবটাই আনঅফিশিয়াল। যদিও আমি চিফকে জানিয়ে রেখেছি যে এই মিশনে আপনাদের আমরা অ্যাডভাইজার হিসাবে ইনক্লুড করছি।’

তূর্য মাথা নাড়ল। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগোল। স্যাম ড্রাইভারস সিটে, এলেনা পাশে। শ্যাডো আর তূর্য পেছনে বসল।

স্যাম পেছনে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘রেডি এভরিবডি?’

তূর্য একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, ‘হ্যাঁ, লেটস গো।’

গাড়ি ছুটে চলল এয়ারপোর্টের দিকে। রাতের রাস্তা আগের মতো ফাঁকা। স্ট্রিটলাইটের আলো দু-পাশে ছুটে যাচ্ছে।

‘আরভকে নিয়ে ওরা রেস্টলেস হয়ে পড়েছে। বোধহয় সন্দেহ করছে যে অরিন্দম ওদের পেনড্রাইভটা প্রোভাইড করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে আরভকে বাঁচিয়ে রেখে ওদের লাভ নেই। আমার মনে হয়, আমাদের এক্সট্র্যাক্টশন মিশন কাল-পরশুর মধ্যেই এক্সিকিউট করতে হবে।’

স্যাম এবং এলেনা শ্যাডোর প্রস্তাবে সম্মতি জানাল। তূর্যর মাথার মধ্যে তখন চিন্তারা জট পাকাচ্ছে। শ্যাডো ফোনে কথা বলছিল, ‘ইয়েস। মিস্টার টি-জ ফ্যামিলি ইজ সিকিওরড। উই আর এনরুট টু দ্য এয়ারপোর্ট। ইটিএ থার্টি মিনিটস।’

শ্যাডো ফোন রেখে তূর্যর দিকে তাকাল, ‘পরের ফ্লাইট ভোর সাড়ে পাঁচটায়। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি চলে যাব নতুন সেফ হাউজে।’

গাড়ি এগিয়ে চলল। তূর্য জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। শেষ রাতের রুপালি আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।

মধ্য কলকাতার এই অঞ্চলে রাস্তাগুলো ভীষণই সরু। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে তূর্য দেখছিল পুরোনো বাড়ি, জীর্ণ দেওয়াল, আর গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে। স্যাম গাড়ি চালাচ্ছিল নিপুণ হাতে। নিজেদের সিটে এলেনা আর শ্যাডো বসে ছিল চুপচাপ। সেই এয়ারপোর্ট থেকেই দুজনে মুখে কুলুপ এঁটেছে। তূর্য এবং স্যাম নিজেদের মধ্যে টুকটাক আলোচনা চালাচ্ছিল।

‘কাছাকাছি এসে গেছি। আর পাঁচ মিনিট।’ শ্যাডো নীরবতা ভেঙে বলল।

গাড়ি আরও একটা সরু, ঘিঞ্জি গলিতে ঢুকল। দু’পাশে দু-তিনতলা পুরোনো বাড়ি। রং চটে গেছে, দেওয়াল থেকে ঝুলছে অশ্বত্থ-বটের চারা। এইরকমই একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। বাইরে থেকে দেখলে সেটাকে সাধারণ একটা বাড়ি বলে মনে হয়। দোতলা বাড়ি। জায়গায় জায়গায় সাদা রং চটে লাল সুরকির গাঁথনি বেরিয়ে পড়েছে।

শ্যাডো প্রথমে নামল গাড়ি থেকে। চারপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। তারপর হাত দিয়ে ইশারা করল বাকিদের। সবাই দ্রুত নামল। সে এগিয়ে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল বিশেষ একটা প্যাটার্নে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে খুলে গেল দরজা।

রিয়া দাঁড়িয়ে ছিল দরজায়, ‘আসুন। ওহ তূর্য! আপনি এসেছেন? সুলগ্না আর তিতলি…’

তূর্য উত্তর দেওয়ার আগেই শ্যাডো বলল, ‘ওরা সেফ আছে। ভাববেন না।’

সবাই ভেতরে ঢুকে এল। ভেতরের ঘরটা প্রশস্ত। যদিও আসবাবপত্র খুবই সাধারণ। একটা বড় টেবিল, তার চারপাশে কয়েকটা চেয়ার। দেওয়ালে একটা বড় ম্যাপ টাঙানো। কোনায় একটা ল্যাপটপ খোলা।

‘সবাই বসুন।’ শ্যাডো বলল, ‘অনেক কথা বলার আছে। হাতে সময় অল্প।’

টেবিলটাকে ঘিরে বসল সবাই। তূর্য, শ্যাডো, এলেনা, স্যাম আর রিয়া।

তূর্য প্রথম কথা বলল, ‘আচ্ছা, আগে একটা ব্যাপারে শিওর হওয়া প্রয়োজন। আরভকে ওরা এর মধ্যে সুখরান বস্তি থেকে সরিয়ে দেয়নি তো?’

‘না। আরভ ওখানেই আছে। আপনি হয়তো ভাবছিলেন, আমরা আগের বেসে চুপচাপ বসে ছিলাম। আরভকে এক্সট্র্যাক্ট করার জন্য কোনও এফোর্টই দিচ্ছিলাম না। কিন্তু সেটা নয়। আমরা এই আজকের রাতের মিটিংটার জন্যই নিজেদের রেডি করছিলাম। আপনি একটু পরেই বুঝে যাবেন কেন তখন মিশন শুরু করতে সময় নিচ্ছিলাম।’ বলল শ্যাডো।

এক্সট্রাকশন মিশন ইনিশিয়েট করায় দেরি হচ্ছিল বলে তূর্য যে সামান্য অসন্তুষ্ট হয়েছিল, একথা মিথ্যে নয়। তাই শ্যাডোর অভিযোগের কোনও প্রতিবাদ সে করতে পারল না।

শ্যাডো বলে চলল, ‘আমাদের এই মিশনে নামার আগে দুটো জিনিস সিকিওর করতে হতো। প্রথমত, কোনও ইনসাইড ম্যান জোগাড় করা। অর্থাৎ যার মাধ্যমে আমরা ওখানের খবরাখবর পাব। এবং সেই এলাকার একটা ডিটেইলড ম্যাপ। যাতে পুরো অপারেশনটা কোরিওগ্রাফ করতে সুবিধা হয়।’

‘ইনসাইড ম্যান কি পেয়েছেন?’

‘পেয়েছি। কিন্তু তার পরিচয় দেওয়ার আগে আমি একবার আমাদের মিশনের পুরো প্ল্যানিংটা সবার সঙ্গে শেয়ার করে নিই?’

‘প্রসিড।’ বলল তূর্য।

‘হাওড়ার সুখরান কলোনি বস্তিতে যে আরভ বন্দি আছে, এটা আমাদের কাছে কনফার্মড ইনফরমেশন আছে। এবার মুশকিল হল এটা রফিকের নিজস্ব এলাকা। একদম সিংহের গুহা বলা যায়। সেখানে তার একচ্ছত্র রাজত্ব। পুলিশ সেখানে ঢুকতে সাহস পায় না। কমপক্ষে বিশ থেকে পঁচিশজন সশস্ত্র গুন্ডা সবসময় পুরো এলাকাটা পাহারা দেয়।’

এলেনা সকলের উদ্দেশে বলল, ‘এবার সবাই একবার সুখরান বস্তির ম্যাপটা দেখে নিন।’

এলেনা ল্যাপটপটা ঘুরিয়ে দিল। স্ক্রিনে একটা ম্যাপ। সম্ভবত গুগলের স্যাটেলাইট ম্যাপের স্ক্রিনশট। তবে এই ম্যাপে প্রতিটা গলি, সেখানে দেশলাইয়ের বাক্সের মতো ছড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো—সবই আলাদাভাবে রেড, ব্লু বা গ্রিন ডট দিয়ে মার্ক করা। রফিকের বাড়ি, গোডাউন, দোকান, সবই আলাদাভাবে চিহ্নিত করা আছে। এমনকী ওর চ্যালাদের ঘাঁটিগুলো অবধি আলাদা করে হাইলাইট করা হয়েছে।

এবার স্যাম বলল, ‘আমরা দুজন মহিলা এজেন্টকে ওখানে পাঠিয়েছিলাম। তারা স্বাস্থ্যকর্মীর ছদ্মবেশে গিয়েছিল। বস্তির ভিতর বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাচ্চাদের টিকা দিচ্ছিল। আর সেই সুযোগে স্পাইক্যামের সাহায্যে আমাদের সম্ভাব্য এন্ট্রি আর এক্সিট রুট স্ক্যান করে নিয়েছিল। এখানে বাড়িগুলোকে যে আলাদা আলাদা করে মার্কিং করা গেছে, সেটাও ওই এজেন্টদেরই কৃতিত্ব।’

তূর্য ম্যাপটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। বস্তিটা ঘনবসতিপূর্ণ। সরু গলি, জড়সড় ঘরবাড়ি। একটা বড় বিল্ডিং মাঝখানে চিহ্নিত করা রয়েছে আলাদাভাবে।

‘এটা কী?’ জিগ্যেস করল তূর্য।

‘এটাই রফিকের ডেরা। মানে যাকে বলা যায় হেডকোয়ার্টার।’ এলেনা বলল, ‘খুবই সিকিওর ফেসিলিটি এটা। মোট তিনতলা বিল্ডিং। নিচতলায় রফিকের লোকজন থাকে। দোতলায় অস্ত্র আর বেআইনি দামি স্মাগলড ইনভেন্ট্রি রাখা হয়। তিনতলায় রফিক নিজে থাকে। আর আমাদের সোর্স অনুযায়ী, আরভকে রাখা হয়েছে সেই তিনতলাতেই, অর্থাৎ রফিকের ঠিক পাশের ঘরে।’

রিয়া একটু চিন্তিত কণ্ঠে বলল, ‘রফিকের নিজের বস্তির মাঝখানে ওরই হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের তিনতলা থেকে হস্টেজকে উদ্ধার করা কি এতটা সহজ হবে?’

‘সহজ যে হবে না সেটা তো বোঝাই যাচ্ছিল। হলে আমি নিজেই এতদিনে একটা ট্রাই নিয়ে নিতাম।’ তূর্য শান্ত স্বরে বলল।

এলেনা বলল, ‘অবশ্যই। ডাইরেক্ট অ্যাসল্ট কোনও অপশনই না। যদি আমরা বিরাট ফোর্স নিয়ে অ্যাটাকে নামি, তাহলে ওরা আমাদের দেখেই আরভকে মেরে ফেলবে অথবা অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়ে যাবে। তাই আমাদের ওয়েল-প্ল্যানড কোভার্ট অপারেশন চালাতে হবে।’

রিয়া বলল, ‘আমার কিছু রিসোর্স আছে। একজন পুরোনো ইনফরমার আছে, সুমন। খুবই বিশ্বস্ত। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে আমি ওর সঙ্গে ডিল করছি। ও স্থানীয় একটা এনজিও-তে কাজ করে। সুখরান কলোনিতেও ওরা রেগুলারলি কাজ করে। সুমন আমাদের ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।’

‘কীভাবে?’ শ্যাডো জিগ্যেস করল।

‘সুমনের এনজিও প্রতি মাসে একবার বস্তিতে মেডিকাল ক্যাম্প করে।’ রিয়া বলল, ‘আমার কাছে খবর আছে, পরশুদিন ক্যাম্প হবে। তার আগে আগামীকাল রাতে গাড়িতে তাদের ক্যাম্পের সরঞ্জাম, ওষুধের পেটি এসব ঢুকবে। আমরা তাদের সঙ্গে ভলান্টিয়ার হিসেবে ঢুকতে পারি। ওষুধের পেটিতে আর্মস নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।’

‘সেটা কি সেফ হবে? যদি ওরা গাড়ি চেক করে?’ জিগ্যেস করল তূর্য।

‘গাড়ি প্রতিবারই চেক করে। তবে যেহেতু প্রতি মাসেই ক্যাম্প হচ্ছে, তাই এখন ওই ওপর ওপর দায়সারাভাবে চেক হয়। আর্মসের পেটিটা নীচের দিকে রাখতে হবে।’ রিয়া উত্তর দিল।

‘না না। ইটস টু রিস্কি।’

‘এটুকু রিস্ক নিতেই হবে। দিস ইজ আওয়ার বেস্ট অপশন। অন্য কোনওভাবে রফিকের ওই দুর্গে লুকিয়ে ঢোকা অসম্ভব।’ শ্যাডো বলল।

তূর্য চিন্তা করল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। ভেতরে ঢোকা না হয় হল। কিন্তু আমাদের আরও তথ্য দরকার। বিল্ডিংয়ের ভেতরের লেআউট, পাহারাদারদের সংখ্যা আর পজিশন, আরভকে ঠিক কোন রুমে রাখা হয়েছে…’

‘এইখানেই তো ম্যাজিক দেখাবে করিম মিয়া। এর কথাই বলছিলাম। রফিকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার অপরাধে করিমচাচার ছেলেকে লোক লাগিয়ে খুন করিয়েছিল রফিক। এরকম অনেক কাজ করার পরেও রফিকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস হয় না বস্তির কারোর। সবাই মুখ বুজে সহ্য করে। করিমচাচা লুকিয়ে হলেও সেই সাহসটা দেখাতে পেরেছে। একটু দাঁড়িয়ে যাও। আমাদের করিমচাচা এলেন বলে।’

ঘণ্টাখানেক পরে দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হল। রিয়া গিয়ে দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকল একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। পরনে মলিন চেক শার্ট, নীচে খাটো করে পরা লুঙ্গি। চোখে সতর্ক দৃষ্টি। সে ঘরে ঢুকেই চারপাশে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল।

শ্যাডো বলল, ‘ভয় পেয়ো না, করিমচাচা। এরা সবাই আমার কাছের লোক। এদের বিশ্বাস করতে পারো।’

করিম টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। তূর্য তাকে হাতের ইশারায় চেয়ারটা দেখিয়ে দিল। করিম চেয়ারে বসল জড়সড় হয়ে। শ্যাডো বলল, ‘বলো করিমচাচা, রফিক খানের বিল্ডিং সম্পর্কে তুমি যা যা আমাকে বলেছ, এদেরও বলো।’

করিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘বিল্ডিং না ছাই! নরক, নরক! রফিকের প্রায় পঁচিশ কি তিরিশজন গার্ড সবসময় পুরো বিল্ডিং পাহারা দেয়। নিচতলায় ঢোকার দুটো রাস্তা। সামনে একটা আর পেছনে একটা। সামনের দরজায় সবসময় চারজন গার্ড থাকে, পেছনে দুজন।’

তূর্য পকেট থেকে তার ছোট্ট নোটবইটা বের করে নোট নিচ্ছিল। করিম বলে চলল, ‘ভেতরে ঢোকার পর একটা লম্বা বারান্দা। বারান্দার শেষে সিঁড়ি। দোতলায় অস্ত্র রাখা হয়, বেআইনি সব জিনিসপাতি জড়ো করা থাকে বড় বড় কাঠের প্যাকিং বাক্সে। আর কিছু লোক সেখানে পাহারা দেয়। তিনতলায় রফিক থাকে তার দুই বিবিকে নিয়ে।’

‘আরভকে কোথায় রাখা হয়েছে?’ জিগ্যেস করে তূর্য।

‘বাচ্চাটাকে? তিনতলার পুবদিকের একটা ঘরে।’ করিম বলল, ‘আমি নিজে অবশ্য বাচ্চাটাকে দেখিনি। ওই ঘরের বাইরে সবসময় দুজন গার্ড থাকে।’

তূর্য আবার জিগ্যেস করল, ‘তিনতলায় যাওয়ার কোনও অল্টারনেট পথ আছে?’

করিম অনেকক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘আছে। বিল্ডিংয়ের পেছনে একটা লোহার সিঁড়ি আছে। আগে ওই সিঁড়ি দিয়ে জমাদার ঢুকত। ওইটা দিয়ে সরাসরি তিনতলায় যাওয়া যায়। কিন্তু সেটা তো বহু বছর ব্যবহার করা হয় না। মরচে পড়ে গেছে। আপনারা ওই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে সিঁড়ি ভেঙে পড়বে কিনা বলতে পারব না। তাছাড়া সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে, সেই দরজা গ্রিল দিয়ে আটকানো থাকে।’

‘তুমি রফিকের জন্য কী কাজ করো?’ জিগ্যেস করে তূর্য।

করিম হেসে তার ডান হাতটা তুলে দেখায়। সেই হাতের তিনটে আঙুল নেই। শ্যাডো বলে, ‘করিমচাচা পেটো বানানোর পিকাসো। সুতলি জড়ানো যদি আর্ট হতো, তাহলে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসার বদলে করিমচাচার বাঁধা পেটো রাখা থাকত।’

নিজের দরাজ সুখ্যাতি শুনে পানের পিকে রাঙানো দাঁত ক’খানা বের করে হাসে করিম।

তূর্য কম্পিউটারে খোলা ম্যাপে ফায়ার এস্কেপের জায়গাটা চিহ্নিত করল। তারপর করিমকে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা চাচা, তিনতলার সেই দরজাটার গ্রিল কেমন? মোটা?’

করিম চিন্তা করল, ‘মোটা না, কিন্তু বেশ মজবুত। পুরোনো দিনের কাজ তো।’

‘কী ভাবছেন তূর্য?’ জিগ্যেস করে শ্যাডো।

তূর্যর মাথায় ততক্ষণে একটা পরিকল্পনা তৈরি হতে শুরু করেছে। সে শ্যাডোর দিকে তাকাল, ‘আমাদের কিছু জিনিস চাই। ওয়্যার কাটার… সম্ভব হলে অক্সি-অ্যাসিটিলিন টর্চ, দড়ি, হুক আর একটা ছোট ফ্ল্যাশলাইট।’

শ্যাডো মাথা নাড়ল, ‘বেশ। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

তূর্য এবার দলের দিকে তাকাল, ‘এবার শোনো আমাদের প্ল্যান। আগামীকাল রাতে আমরা মেডিকাল ক্যাম্পের আড়ালে বস্তিতে ঢুকব। শ্যাডো আর আমি লোহার সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠব। স্যাম নীচে থাকবে, লুকআউট হিসেবে। কোনও বিপদ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সিগন্যাল দেবে। এলেনা আর রিয়া, আপনারা বস্তির কাছাকাছি গাড়ি নিয়ে রেডি থাকবেন। আমাদের পালানোর পথ ক্লিয়ার রাখবেন।’

‘আইডিয়া খারাপ নয়, কিন্তু আমি কয়েকটা ডিটেইল অ্যাড করতে চাই।’ বলল শ্যাডো।

পরের ঘণ্টাখানেক সময় ধরে সবাই পরিকল্পনার ডিটেইলিং নিয়ে আলোচনা করল। প্রতিটা পদক্ষেপ ঠিক করা হল। টাইমিং, সিগন্যাল, ব্যাকআপ রুট— সবকিছু। করিম তাদের বস্তির আরও কিছু তথ্য দিল। কোন গলি দিয়ে যাওয়া নিরাপদ। কোন জায়গায় রফিকের গুন্ডারা টহল দেয়।

সবশেষে যখন করিম উঠে যাচ্ছে, শ্যাডো একটা সাদা খাম গুঁজে দিল করিমের হাতে। করিম দোনামোনা করে খামটা নিয়ে সেলাম ঠুকল সবাইকে। করিম যখন বিদায় নিচ্ছে, তূর্য হঠাৎ করিমকে ডাকল, ‘করিম চাচা, আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে।’

তূর্য করিমকে ঘরের অন্যপ্রান্তে নিয়ে গিয়ে কী সব আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শ্যাডো এবং এলেনা নিজেদের নিজেদের বসদের ফোন করে আপডেট দিচ্ছিল। রিয়া উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার রাতের দিকে তাকিয়ে রইল। বড় মায়াবী লাগছে রাতটাকে!

কিছুক্ষণ পরে তূর্য এসে তার পাশে দাঁড়াল, ‘আগামীকাল রাত। সবকিছু ঠিকঠাক হলে আগামীকাল রাতেই আরভকে উদ্ধার করা যাবে। আমি অরিন্দমের থেকে কিন্তু এইটুকুই দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আরভকে উদ্ধার করে দেওয়ার দায়িত্ব। অথচ এ কী গোলকধাঁধায় পড়ে গেলাম বলুন তো!’

রিয়া হাসে। বলে, ‘এটুকু নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে এই পরিস্থিতিতে আরভকে উদ্ধার করে অরিন্দমের হাতে তুলে দিলেই আপনার কাজ শেষ হয়ে যাবে না।’

‘জানি। ওরা আরও বড় অ্যাটাক করবে ওদের ওপর।’

‘এক্স্যাক্টলি। জানি না আপনি জানেন কিনা, আরভকে এক্সট্র্যাক্ট করার পরই অরিন্দমবাবুকেও সেফ হাউজে সরিয়ে ফেলা হবে। এই মিশন পুরো শেষ না হওয়া অবধি আরভ এবং অরিন্দমবাবু “র”-এর সেফ হাউজেই থাকবেন।’

‘সেটা অবশ্য আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম।’

এরপর আরও দু-চারটে কথা বলার পর যে যার রুমে চলে গেল রেস্ট নিতে। তূর্যর ঘুম আসছিল না। সে উঠে এল ছাদে। এসে দেখল, রিয়া আগেই ছাদের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে। আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কী যেন দেখছে। তূর্য কখন তার পাশে গিয়ে বসল, রিয়া টেরই পেল না।

আকাশে মেঘ ঘনিয়েছে। বৃষ্টি হতে পারে। গুড়গুড় শব্দে মেঘ ডাকছে। আকাশে তারা নেই, হাওয়া বইছে না। গুমোট একটা গরম থমথমে করে রেখেছে পরিবেশটাকে। তূর্য বলে উঠল, ‘যেদিন পৃথিবী ধ্বংস হবে, দেখবেন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। সেই বৃষ্টির তোড়েই ভেসে যাবে গোটা ব্রহ্মাণ্ড।’

সে ভেবেছিল হঠাৎ তার গলা শুনে রিয়া হয়তো চমকে যাবে। কিন্তু সেসব কিছুই হল না। রিয়া মুচকি হেসে বলল, ‘আপনি বৃষ্টিকে ভয় পান বুঝি?’

‘নাহ, তবে খুব একটা পছন্দ করি না।’

ঝড় উঠেছে হঠাৎ। রিয়ার এক মাথা ঢেউখেলানো চুল পাহাড়ি নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে শূন্যে। তার শরীর থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছে তূর্য। ঝাঁঝালো নোনতা একটা গন্ধ। তার কেমন যেন ঘোর লাগছে।

‘আপনি সুলগ্নাকে খুব ভালোবাসেন, বলুন?’

‘নাহ, আমরা তো সেপারেটেড। ডিভোর্সটা হয়তো মিটে যাবে এই বছরের মধ্যেই।’ তূর্যর গলায় যেন বিষণ্ণতার সুর।

‘সেসবের সঙ্গে ভালোবাসার কী সম্পর্ক?’

‘সম্পর্ক নেই? ভালোবাসা ফুরিয়েছে বলেই তো দুটো মানুষ আলাদা হচ্ছে।’

‘হ্যাট! দুটো মানুষের প্রায়োরিটি মিলছে না বলে তারা আলাদা হচ্ছে। অথবা তাদের জীবনযাত্রা বা দুজনের একে অপরের প্রতি এক্সপেকটেশন মিলছে না বলে আলাদা হচ্ছে। ভালোবাসার সঙ্গে এসবের কোনও সম্পর্ক নেই।’

ভালোবাসা? কথাটা শুনেই তূর্যর মনটা যেন হঠাৎ হারিয়ে গেল কোনও দূর দেশে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। জীবনের সমস্ত কষ্ট, না-পাওয়া, ব্যর্থতা, যা কিছু ভীষণ গোপনীয়—সবকিছু আগল ভাঙা বন্যার মতো আছড়ে পড়তে চাইছে। সে দূরের অস্পষ্ট রাস্তার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল চুপচাপ।

‘মন খারাপ নাকি?’ প্রশ্ন করে রিয়া।

তূর্য সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়, ‘নাহ!’

‘বৃষ্টি নামছে। নীচে চলুন।’

‘আপনি যান। আমি এখানে কিছুক্ষণ বসব।’

রিয়া আর কিছু না বলে নীচে চলে যায়। তূর্য ছাদের কিনারে বসে ভিজতে থাকে, একা।

পুরোনো দিনগুলোর কথা ভীষণ মনে পড়ছে তার। বছর ছয়েক আগের একটা রাতের কথা মনে পড়ছে। একবার সুলগ্নার সঙ্গে দিল্লির পালিকা বাজার থেকে একটা উইন্ড চাইম কিনে এনেছিল তূর্য। কলকাতায় তাদের খোলা জানালার ফ্রেমের ঠিক মাঝখানে সেটা সরু সুতো দিয়ে বাঁধা। সকালের দমকা হাওয়ার দাপট লম্পট যুবকের মতো সেটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার। টুং টাং সুরে প্রতিবাদ জানাচ্ছে সেটা। তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো একটুকরো রোদ ওই স্বচ্ছ উইন্ড চাইমের খাঁজে খাঁজে ধাক্কা খেয়ে ভাঙচুর হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়।

সেরকমই একটুকরো রোদ এসে পড়ে তূর্যর চোখে-মুখে। সে মুখ থেকে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে পাশ ফিরে শোয়। মাথার ওপরে ঘড়ঘড় শব্দে ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের হাওয়ায় কলকাতার গরম পোষ মানে না। তূর্যর পাশে সুলগ্না শুয়ে। চোখ বন্ধ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নাকের ডগাটা ফুলে ফুলে উঠছে। ঘামে ভিজে চকচক করছে ফর্সা মুখ।

তূর্য হাত বাড়িয়ে একটা আঙুল দিয়ে সুলগ্নার গালে হাত বোলায়। সুলগ্না চোখদুটো সামান্য ফাঁক করে মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট আদুরে আওয়াজ করে তূর্যকে জড়িয়ে ধরে। তূর্যর নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। সুলগ্না চোখ খোলে। তূর্যর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। তূর্য হেসে জিগ্যেস করে, ‘কী দেখছ?’

‘তোমার চোখের মণিতে আমার ছায়া পড়েছে। নিজেকে দেখছি।’

‘বুঝলাম।’ এবার তূর্যও আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে সুলগ্নাকে।

‘নাহ, কিচ্ছু বোঝোনি। আচ্ছা, তোমার আজ না বেরোলে হয় না? আমরা সারাদিন এভাবেই শুয়ে থাকব, গল্প করব।’ সুলগ্না আদুরে সুরে বলে।

‘সম্ভব হলে থেকেই যেতাম। কিন্তু আজ বেরোতেই হবে। তুমি জানোই তো ইম্পর্ট্যান্ট কেস। মার্ডার ইনভেস্টিগেশন।’

‘ধুর! কেস আর কেস! যেদিন আমি মরে যাব সেদিন বুঝবে।’ উষ্মামিশ্রিত গলায় বলে সুলগ্না।

তূর্য এক ঝটকায় উঠে বসে। তারপর দুই হাঁটু ভাঁজ করে তার মধ্যে থুতনি রেখে বসে থাকে। তূর্য রাগ করেছে বুঝতে পেরে সুলগ্না স্বামীর পিঠে আলতো হাত রাখে। তূর্য এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে সুলগ্নার চোখের দিকে তাকায়। তূর্যর ওই চোখের মণিতে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। ভীষণ গভীর সে মায়া। যেন একটা আস্ত ঘূর্ণিঝড় ওই চোখের চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে পারে। সুলগ্না ওই চোখে চোখ রাখতে ভয় পায়।

‘এরকম কথা বলবে না। আমার ভালো লাগে না।’ বলে তূর্য।

‘আচ্ছা বেশ। সরি। আর বলব না। রাগ করে না।’

তূর্য এবার সুলগ্নাকে কাছে টেনে নেয়। কপালে একটা উষ্ণ চুম্বনচিহ্ন এঁকে দেয়। সুলগ্না তূর্যকে বলে, ‘আচ্ছা, তুমি সেই ছোট থেকেই গোয়েন্দা হতে চেয়েছিলে, বলো?’

তূর্য হাসে, ‘হ্যাট! ছোটবেলায় আমার স্বপ্ন আলাদা ছিল।’

‘কী স্বপ্ন?’ আয়ত চোখে তূর্যর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে সুলগ্না।

তূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন স্বপ্ন দেখতাম একটা দুধসাদা ঘোড়ায় চড়ে আমি কোনও দূর দেশে চলে যাব। তারপর সে দেশের রাজকন্যাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আমার ঘোড়ার পেছনে বসিয়ে টগবগিয়ে চলে যাব অনেক দূরে।’

এইবার সুলগ্না দু-হাতে মুখ ঢেকে হাসি চাপে। সে হাসিতে যোগ দেয় তূর্যও। বেশ কিছুক্ষণ চাপা স্বরে হেসে তূর্য পিছনের হেডরেস্টে হেলান দিয়ে বসে উদাস গলায় বলে ওঠে, ‘এখন তোমার হাসি পাচ্ছে বটে, কিন্তু সে সময় পৃথিবীটা অন্যরকম ছিল। ইট ওয়াজ অ্যান এরা উইদাউট ফেসবুক। আমরা ভালোবাসার মানুষের জন্য টিউশনশেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার মোড়ে সাইকেল দাঁড় করিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে জানতাম। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে খুঁজে নেওয়ার অপশন ভালোবাসার মানুষের জন্য অপেক্ষা করার সেই জাদুটাকেই যেন ফ্যাকাসে করে দিয়েছে। আমরা ধৈর্য ধরার অনুভূতি ভুলে গেছি। মানুষ বড় সহজলভ্য হয়ে গেছে সুলগ্না। মানুষ বড় সস্তা হয়ে গেছে।’

‘এই সস্তা পৃথিবীতেই কিন্তু আরেকটা দামি মানুষ আসতে চলেছে।’ খুব মৃদুস্বরে বলে সুলগ্না।

তূর্য উত্তর দেয় না। শুধু সুলগ্নার পেটে একটা হাত রাখে। তারপর সুলগ্নার পেটের খুব কাছে মুখ এনে বলে, ‘শুনতে পাচ্ছ ছোট্ট মানুষ? আমি তোমার পাপা। পৃথিবীতে তুমি পা রাখার পর যতই ঝড় আসুক, যতই বৃষ্টি নামুক, আমি ছাদ হয়ে তোমার মাথার ওপর থাকব।’

জানালার ফাঁক গলে এক টুকরো অবাধ্য আলো এসে পড়েছে সুলগ্নার মুখের ডানদিক জুড়ে। আধো অন্ধকারে চোখের মণিটা চিকচিক করছে তার। চোখের কোলে ওটা কি জল? সুলগ্না চাপা গলায় গুনগুনিয়ে গান ধরে…

You, who are on the road
Must have a code you try to live by
And so become yourself
Because the past is just a goodbye
Teach your children well
Their father’s hell did slowly go by
Feed them on your dreams
The one they pick’s the one you’ll know by.
Don’t you ever ask them why
If they told you, you would cry
So just look at them and sigh
And know they love you
And you, of tender years
Can’t know the fears your elders grew by
Help them with your youth
They seek the truth before they can die.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *