চতুর্দশ পর্ব – দি আর্কিটেক্ট

চতুর্দশ পর্ব – দি আর্কিটেক্ট

নিমতলা ঘাটের রাস্তায় এখন ভীষণ ট্রাফিক। তূর্য, শ্যাডো, স্যাম আর এলেনা তাদের গাড়িতে চড়ে ফিট-এক্স জিমের কাছে এল। জিমটা একটা পুরোনো বিল্ডিংয়ের দোতলায়। সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়।

‘সামথিং ইজ নট রাইট!’ শ্যাডো ফিসফিস করে বলল। তার হাত ততক্ষণে জ্যাকেটের ভেতরে চলে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তূর্যও টের পেল। চারিদিক বড্ড বেশি নিশ্চুপ। কোনও আওয়াজ নেই।

দোতলায় উঠে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তূর্য আঁতকে উঠল। রিসেপশনের টেবিলের পেছনে একটা মেয়ে মাটিতে উপুর হয়ে পড়ে আছে। তার মাথার পিছনে টাটকা রক্ত!

‘শিট!’ এলেনা তার পিস্তল বের করল, ‘উই আর লেট।’

শ্যাডো দ্রুত মেয়েটার কাছে গেল, তার নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করে বলল, ‘পালস নেই। কিন্তু এখনও গা গরম। কিছুক্ষণ আগেই শুট করা হয়েছে।’

তূর্য এবার চারপাশে তাকাল। জিমের অফিসটা তছনছ হয়ে আছে। ফাইলের আলমারি খোলা। কাগজপত্র ছড়ানো। বোঝাই যাচ্ছে, কেউ কিছু খুঁজছিল।

‘রোগ! ওরা বোধহয় মোহিনীর লকার নম্বর খুঁজছিল।’

‘কিন্তু ওরা জানল কীভাবে?’ স্যাম বলল।

‘সেটা পরে ভাবা যাবে। আগে দ্যাখো লকার রুমটা কোথায়! ওরা কি অলরেডি পেনড্রাইভটা পেয়ে গেছে?’ বলল এলেনা।

তূর্য দ্রুত চারিদিক দেখতে লাগল। রিসেপশনের কম্পিউটরটা তখনও অন রয়েছে। তূর্য স্যামকে বলল, ‘শোনো, ওদের মতো সব ফর্ম বা কাগজ হাতড়ে লকার নম্বর খোঁজা অনেক সময়সাপেক্ষ। তুমি একবার কম্পিউটারে চেক করো। ওদের ডেটাবেসে নিশ্চয়ই থাকবে যে, কোন লকার কাকে অ্যালোকেট করা হয়েছে। না হলে প্রতিবার নতুন কেউ লকার নিতে এলে নিশ্চয়ই ওরা সব ফর্ম বের করে খোঁজে না যে, কোন কোন লকার খালি। একটা কাস্টমার ডেটাবেস নিশ্চয়ই থাকবে।’

স্যাম দ্রুত কম্পিউটারে নিজের আঙুল চালাতে লাগল। তারপর একসময় উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘পেয়েছি! প্রিয়া চ্যাটার্জি, লকার নম্বর ডি-সেভেন।’

‘লকারগুলো কোথায়?’ শ্যাডো জিগ্যেস করল।

‘প্রোবাবলি তিনতলায়। দোতলায় তো ওদের অফিস আছে দেখছি।’ তূর্য কথাটা বলতে বলতে টেবিল থেকে একটা পেপারওয়েট তুলে পকেটে ভরল।

সন্তর্পণে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল তারা। ঠিক তখনই তিনতলা থেকে একটা মৃদু আওয়াজ এল। মুহূর্তে চারজনেই সতর্ক হয়ে গেল। তারপর পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকেই দেখল দুজন লোক হাতে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল নিয়ে দরজার দিকেই তাক করে আছে।

‘ডাউন!’ শ্যাডো চাপা চিৎকার করে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গুলির শব্দ। সাইলেন্সার লাগানো বন্দুক দিয়ে গুলি করলেও একটা মৃদু ভোঁতা শব্দ হয়। সেই শব্দে একটা বুলেট তার মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পিছনের দেওয়ালে গেঁথে গেল।

স্যাম পালটা গুলি ছুড়ল। একটা লোক কাঁধে গুলি খেয়ে পেছনে ছিটকে গেল। কিন্তু অন্যজন আড়াল নিয়ে ফের আক্রমণ শুরু করল।

‘তূর্য, আপনি এগিয়ে যান।’ শ্যাডো ফিসফিস করে বলল, ‘পেনড্রাইভটা নিয়ে আসুন! আমরা আপনাকে কভার করছি!’

তূর্য একবার ইতস্তত করল। কিন্তু সে জানত, এই মুহূর্তে পেনড্রাইভটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে দরজার পাশ দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পেছনে গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। লকার রুমে ঢুকে দেখল, আরেকজন লোক লকারের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তূর্য নিজেকে লুকিয়ে ফেলার আগেই লোকটা তাকে দেখে ফেলল।

লোকটা পিস্তল তুলল। তূর্য মুহূর্তে জানালার ফ্রেম ধরে নিজেকে টেনে একপাশে সরাল। একটা বুলেট তার পাশ দিয়ে ছুটে গেল চাপা শব্দ করে। এবার তূর্য হাতের পেপারওয়েটটা নিজের সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে ছুড়ে মারল লোকটাকে লক্ষ্য করে। পেপারওয়েটটা লোকটার কপালে আঘাত করল সজোরে। রক্তের ছিটে দেওয়াল রাঙিয়ে দিল। লোকটা হেলে ব্যালকনিতে গড়িয়ে পড়ল।

যেখানে জিম ইক্যুইপমেন্টস আছে, তার পাশেই ছোট একটা ঘর। দেওয়ালে সারি সারি লকার। তূর্য দ্রুত খুঁজতে লাগল ডি-সেভেন। হঠাৎ পেছন থেকে একটা আওয়াজে তূর্য ঘুরে তাকাল। আরেকজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। লোকটা অস্বাভাবিক লম্বা। চওড়া কাঁধ, মুখে একটা লম্বা কাটা দাগ। হাতে একটা বড় ছুরি। ঘরের নরম আলোয় তীক্ষ্ণ ছুরির ফলা ঝকমক করছে।

‘হোয়্যার ইজ দ্য পেনড্রাইভ?’ লোকটা জিগ্যেস করল। তূর্য লোকটার উচ্চারণে বুঝল সে আমেরিকান।

তূর্য উত্তর দিল না। তার চোখ চারপাশে খুঁজতে লাগল হাতের কাছে কোনও অস্ত্র, বা কোনও পালানোর পথ।

লোকটা এবার এগিয়ে এল, ‘পেনড্রাইভটা দিয়ে দাও, বেঁচে যাবে।’

‘কোনও গ্যারান্টি আছে?’ তূর্য ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলতে বলতেই এক পা এক পা করে পিছনে সরছিল।

লোকটা বিশ্রী অসমান দাঁত বের করে হাসল, ‘না। কোনও গ্যারান্টি নেই।’

এবার হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটা। তূর্য পাশে সরে যেতে গিয়েও পারল না। ছুরিটা তার বাহু চিরে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। তূর্য সেটাকে অগ্রাহ্য করে একটা লকারে ভর দিয়ে নিজের শরীরটাকে শূন্যে খেলিয়ে লোকটার দিকে লাথি ছুড়ল। লাথি লোকটার পেটে গিয়ে লাগল সপাটে। কিন্তু তাতে তার বিশেষ কোনও হেলদোল দেখা গেল না।

লোকটা আবার তূর্যকে আক্রমণ করল। এবার তূর্য একটা চেয়ার তুলে সামনে ধরল। ছুরিটা চেয়ারের কাঠে বিঁধে গেল। তূর্য চেয়ারসমেত ধাক্কা দিল লোকটাকে। সে এবার পেছনে হুমড়ি খেয়ে দেওয়ালে গিয়ে পড়ল।

এই সুযোগে দ্রুত লকারগুলোর দিকে ছুটল তূর্য। ডি-সেভেন… ডি-সেভেন… এই তো! ছোট লকার। তার ওপর একটা ডিজিটাল লক।

পেছনে লোকটা উঠে দাঁড়াচ্ছে। তূর্যর হাত কাঁপছে। তার মাথা কাজ করছে না। লকের ডিসপ্লেতে আট ডিজিটের পাসওয়ার্ড চাইছে। পাসওয়ার্ড কী হতে পারে? প্রিয়ার জন্মদিন? অরিন্দমের জন্মদিন? তাদের বিয়ের তারিখ? নাকি আরভের জন্মদিন?

লোকটা এবার এগিয়ে আসছে। তূর্য সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। তার আগেই দেখল, স্যাম এসে দাঁড়িয়েছে লোকটার পিছনে। সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকের চাপা গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে লোকটার বিশাল দেহটা প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ল মেঝেতে।

‘স্যাম, তাড়াতাড়ি অরিন্দমকে ফোন করো।’

বার দুয়েক রিং হওয়ার পরেই ডেল্টা ফোন ধরে। তারপর সে অরিন্দমকে দিলে স্যাম মোবাইলটা এগিয়ে দেয় তূর্যর দিকে।

‘অরিন্দম, যা প্রশ্ন করব তার ঠিক-ঠিক জবাব দিবি। এখন কোনও প্রশ্ন নয়। তাড়াতাড়ি প্রিয়ার জন্মতারিখ বল।’

‘ছাব্বিশে মে, উনিশশো তিরানব্বই।’

তূর্য দ্রুত প্রিয়ার জন্মদিনের তারিখ টাইপ করল। লাল আলো ব্লিঙ্ক করল।

‘আরভের জন্মদিন বল?’

‘বারোই জানুয়ারি, দু’হাজার কুড়ি।’

নাহ! ভুল। আর শুধু একটা চান্স বাকি। তার পরে লক পারমানেন্টলি বন্ধ হয়ে যাবে। সেটাকে ভাঙা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অতটা সময় ওদের হাতে নেই।

‘ভাই, আমায় শেষবার একটা কথা বল। এমন কোনও ডেট বা সংখ্যা আছে, যেটা প্রিয়ার খুব পছন্দের বা কাছের ছিল? তোকে বলেছিল কখনও?’

বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে অরিন্দম। তারপর হঠাৎ কী একটা মনে পড়তেই বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ, মনে পড়েছে। বারোই অগাস্ট, দু’হাজার আঠেরো।’

তূর্য কাঁপা হাতে নম্বরটা টাইপ করল। ১… ২… ০… ৮…

একটা আলতো ক্লিক শব্দ হল। সবুজ বাতি জ্বলে উঠল। ধীরে ধীরে খুলে গেল লকারটা। ভেতরে একটা ছোট জিপলক ব্যাগ। তার ভেতরে একটা পেনড্রাইভ।

তূর্য সেটা তুলে নিল। তারপর পকেটে পুরে দরজার দিকে দৌড়াল। করিডোরে এসে দেখল সিঁড়ি বেয়ে শ্যাডো উঠে আসছে। তার হাতে গুলি লেগেছে।

‘পেয়েছেন?’ শ্যাডো জিগ্যেস করল।

‘হ্যাঁ। আচ্ছা, আপনি এক কাজ করুন তো! আপনি মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। আর স্যাম, তুমি ওই আলমারির পিছনে লুকিয়ে যাও। ফাস্ট!’

‘মানে? কী বলছেন এসব?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করল শ্যাডো।

‘জাস্ট ট্রাস্ট মি ফর ওয়ান্স। প্লিজ শ্যাডো। আই ইনসিস্ট।’

তূর্যর কথামতোই কাজ হল। শ্যাডো এক কোণে শুয়ে পড়ল নিস্তব্ধ হয়ে। স্যাম গিয়ে লকারের আলমারির পিছনে লুকিয়ে পড়ল। পরমুহূর্তেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল এলেনা। ঘরের অবস্থা দেখে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে গেল, ‘কী হয়েছে এখানে? শ্যাডো…’

‘শ্যাডোকে গুলি করেছে ওরা। স্যামকেও খুঁজে পাচ্ছি না। ওকেও বোধহয়…’

‘আপনার হাতের অবস্থাও তো খুবই খারাপ দেখছি।’

‘হ্যাঁ। কিছুতেই রক্ত বন্ধ হচ্ছে না।’

‘পেনড্রাইভটা পেয়েছেন?’

‘হ্যাঁ পেয়েছি। লকারেই ছিল।’

‘যাক! এবার আমায় তাহলে ওটা হ্যান্ডওভার করুন। চলুন, আমরা তাড়াতাড়ি বেসে ফিরি। যে কোনও সময় পুলিশ এসে পড়বে। আমাদের ইমিডিয়েটলি পেনড্রাইভটা “র”-এর চিফের হাতে হ্যান্ডওভার করতে হবে।’

‘হ্যাঁ চলুন।’

‘পেনড্রাইভটা দিন। ওটা আমি আগে সিকিওর করি।’ তূর্যর দিকে হাত বাড়ায় এলেনা।

‘আপনার হাতের ট্যাটুটা কিন্তু সত্যিই খুব সুন্দর।’ শান্ত গলায় বলে তূর্য।

হঠাৎ এই কথায় একটু থতমত খেয়ে যায় এলেনা। হতচকিত স্বরে বলে, ‘মানে? এখন এসব…’

‘আসলে আমি এই ট্যাটুটা আগেও দেখেছি। কোথায় বলুন তো? আরভকে অপহরণ করেছিল যে বোরখা পরা মহিলা, তার হাতে। কী অদ্ভুত সমাপতন বলুন তো!’

এবার এলেনা ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, ‘হতেই পারে। একই ট্যাটু কি দুজন মানুষের হাতে থাকতে পারে না?’

‘নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু আমার অবাক লাগছে যে প্রিয়াকে হত্যা করা হয় স্নাইপার রাইফেল দিয়ে। অর্থাৎ কেউ আগে থেকেই কোনও বহুতল বাড়ির ছাদে উঠে টার্গেট সেট করেছিল। তার মানে প্রিয়া বা মোহিনী শ্যামবাজারে এক্স্যাক্টলি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটার ইনফরমেশন ছিল ওদের কাছে।’

‘আপনি কী ইমপ্লাই করতে চাইছেন?’ এবার এলেনার চোয়াল শক্ত হয়।

‘আমি বলতে চাইছি যে আমাদের আগের সেফ হাউজের লোকেশন থেকে শুরু করে আমাদের আজকের এই জিমের লোকেশন, সব কেমন ফ্ললেসলি পৌঁছে যাচ্ছে না রোগের কাছে? এমনকী আরভকে এক্সট্র্যাক্ট করতে গিয়ে হঠাৎই অতজন লোক এমনভাবে আমাদের ঘিরে ফেলল; নিন্দুকেরা বলবে, ওটা আগে থেকেই সাজানো একটা ট্র্যাপ! তখন যদি করিমচাচা আমাদের ওভাবে হেল্প না করত, তাহলে ওখান থেকে এই শর্মার অন্তত বেঁচে বেরোনো চাপ ছিল।’

‘আপনি কিন্তু মিথ্যে অ্যালিগেশন আনছেন।’

‘আমি কেন? বললাম না নিন্দুকেরা বলবে? নিন্দুকেরা এও বলতে পারে যে প্রথম থেকেই আমাদের টিমে একজন মোল ছিল। তাই সব সেন্সিটিভ ইনফরমেশন লিক হয়ে যাচ্ছিল অবলীলায়।’

এবার এলেনা কোমর থেকে একটা পিস্তল বের করে তূর্যর দিকে সরাসরি তাক করল। হিসহিসে কণ্ঠে বলল, ‘ভালোয় ভালোয় পেনড্রাইভটা দিয়ে দিন। নইলে…’

‘নইলে কী হবে?’ পিছন থেকে বলে ওঠে শ্যাডো। মুহূর্তে গর্জে ওঠে তার পিস্তল। এলেনার হাত থেকে বন্দুক ছিটকে যায়। ততক্ষণে আলমারির পিছন থেকে বেরিয়ে এসেছে সশস্ত্র স্যাম। শ্যাডো এলেনার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে জিগ্যেস করে, ‘কতদিন ধরে চিনের ডবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন?’

‘উনি সম্ভবত চায়নার ডবল এজেন্ট নন। উনিই তো প্রথম আপনাদের জানিয়েছিলেন, এই ডিলের ডার্ক সাইডের কথা। তখনও ওর দুবের সঙ্গে আতাঁত হয়নি। পরে কখন যে উনি দল বদল করেছেন, আপনারা টের পাননি। আসলে উনি আপনাদের ব্যবহার করে এই পেনড্রাইভটা হাতিয়ে দুবেকে হ্যান্ডওভার করার প্ল্যান করেছিলেন। প্রথমদিনই আমায় যখন উনি বলেন যে প্রিয়া পেনড্রাইভ ওকে হ্যান্ডওভার করতে শ্যামবাজার এসেছিল, তখনই আমার খটকা লাগে।

‘এজেন্সির মিশনের কোনও কাজে এলে প্রিয়া কোনওভাবেই আরভকে সঙ্গে নিয়ে আসবে না। এলেনা সম্ভবত এমনি কোনও অছিলায় দেখা করতে চেয়েছিলেন প্রিয়ার সঙ্গে। প্রিয়া কল্পনাও করতে পারেনি, তার জন্য সেখানে মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে। এদিকে এলেনা সেখানে বোরখা পরে উপস্থিত হয়েছিলেন, যাতে সিসিটিভিতে উনি ধরা না পড়েন।

‘প্রিয়ার মৃতদেহের পাশে আরভকে পড়ে থাকতে দেখেই ওর মাথায় কিডন্যাপিংয়ের আইডিয়াটা আসে। আরভকে উনি নিজেই পৌঁছে দেন রফিক খানের কাছে। আরভকে কাজে লাগিয়ে যদি ব্ল্যাকমেইল করে প্রমাণটা হাতানো যায়! ম্যাডামের প্ল্যান দুর্দান্ত চলছিল। কিন্তু সেই প্ল্যানের মাঝে হঠাৎ আমি এসে পড়ায় প্রথম থেকেই আমাকে রাস্তা থেকে সরাতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। রোগের কাছে নিয়মিত নিপুণভাবে বেনামি টিপস চলে যাচ্ছিল। কী, তাই তো ম্যাম?’

‘আমি ওসব দুবে-টুবের জন্য কাজ করি না। আমি যার জন্য কাজ করি, সে সর্বশক্তিমান। আমায় মেরে ফেললেও আপনারা তাকে ঠেকাতে পারবেন না। হি ইজ দ্য নেক্সট অ্যাপোক্যালিপ্স।’ এলেনা মেঝেতে থুতু ফেলে নিজের ভাষায় কিছু অজানা গালাগালি দিল। তারপর হঠাৎই লজেন্সের মতো কিছু একটা দাঁতের চাপে ভেঙে ফেলল।

শ্যাডো ‘শিট! সায়ানাইড ক্যাপসুল!’ বলে ছুটে এসে ঠেকাতে চেষ্টা করল এলেনাকে। কিন্তু তার ছুটে আসার আগেই এলেনার প্রাণহীন শরীরটা এলিয়ে পড়ল মেঝেতে।

গাড়িতে ফিরতে ফিরতে শ্যাডো তার ফোন বের করে হেড- কোয়ার্টারে জানাল, ‘প্যাকেজ সিকিওর্ড। রিটার্নিং টু বেস। প্রিপেয়ার ফর ইভাক্যুয়েশন।’

সেফ হাউজে পৌঁছে স্যাম তার ল্যাপটপে সিকিওর কানেকশন সেট আপ করে বলল, ‘পেনড্রাইভটা দিন।’

তূর্য পেনড্রাইভটা বের করে স্যামের হাতে দিল। স্যাম সেটা তার ল্যাপটপে ঢোকাতেই কয়েক সেকেন্ড লোডিং হওয়ার পর স্ক্রিনে ফোল্ডারের একটা লিস্ট এল।

‘এনক্রিপ্টেড ফাইল সব।’ স্যাম বলল।

রিয়া চিন্তিত মুখে বলল, ‘তাহলে?’

‘চিন্তা নেই। মোহিনী “র”-এর স্ট্যান্ডার্ড এনক্রিপশন প্রোটোকল ব্যবহার করেছে।’ স্যাম হাসল।

তারপর সে কি-বোর্ডে দ্রুত টাইপ করতে লাগল কিছু। বাকিরা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। মিনিট পাঁচেক পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল কয়েকটা ফোল্ডার।

‘বিঙ্গো!’ স্যাম আনন্দে শিস দিয়ে উঠল, ‘এ তো প্রমাণের খনি। ই-মেইল এক্সচেঞ্জ, সুইস ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার রেকর্ড, মিটিংয়ের অডিও রেকর্ডিং। সাবাস এজেন্ট মোহিনী!’

সকলের মুখে হাসি ফুটল। শ্যাডো একটু উদাস গলায় বলল, ‘উই লস্ট আ জেম। আমি আমার এত বছরের কেরিয়ারে মোহিনীর মতো এফিশিয়েন্ট এজেন্ট আর দেখিনি।’

একটা ফাইল খুলল স্যাম। একটা অডিও রেকর্ডিং। দুবের গলা শোনা গেল, ‘ড্রোনগুলোতে আপনাদের যে ব্যাকডোর সফটওয়্যার ইনস্টল করা থাকবে, সেটা আমাদের এক্সপার্টরা ধরতে পারবে না তো?’

ও-প্রান্ত থেকে ডিফেন্সটেকের ঝাও মিংয়ের গলা শোনা যায়, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন। আমাদেরও নিশ্চিত হতে হবে যাতে আমরা ভারতীয় আকাশসীমায় নজরদারি করতে পারি। যদি ম্যালওয়ার ডিটেক্ট করা এতটাই সহজ হবে, তাহলে আমরা এত টাকার ডিল করার মতো রিস্ক নিতাম? আপনি ওসব না ভেবে যে পাঁচ মিলিয়ন ডলার আপনার সুইস অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হবে, সেটা নিয়ে কী করবেন তাই ভাবুন।’

ফোনের ও-প্রান্তে মিনিস্টার দুবের হাসির আওয়াজ পাওয়া যায়।

‘এই প্রমাণ দিয়ে শুধু ডিল ক্যানসেল না, আমরা দুবেকে জেলেও পাঠাতে পারব।’ রিয়া বলে।

‘আমরা শুধু এটা “র”-এর হাতে তুলে দেব। তারপর হেডকোয়ার্টার আর পিএমও বুঝবে দুবের সঙ্গে কী করা হবে।’ শ্যাডো বলে।

রিয়া বিরক্ত স্বরে বলল, ‘আমি জানি কী হবে। একটা লকড রুম বৈঠক হবে। তারপর দুবে মিডিয়াতে এসে জানাবে যে বর্তমান জিও-পলিটিকাল সিচুয়েশনে আমরা চিনকে এই মুহূর্তে ভরসা করতে পারছি না, তাই এই ডিল ক্যানসেল হচ্ছে। আমরা ভারতেই নতুন টেকনোলজি ডেভেলপ করছি অত্যাধুনিক সার্ভেইলেন্স ড্রোনের। “বয়কট চাইনিজ প্রোডাক্ট” বলে আরেকবার ট্রেন্ড ভাইরাল হবে। লোকের কাছে উলটে হিরো হয়ে যাবে এই দুবে।’

‘তাতে কী? ড্রোন ডিল তো আটকানো যাবে।’

‘হ্যাঁ। আপনার মিশন তো কমপ্লিট। আপনারা অন্য মিশনে চলে যাবেন। তারপর দুবে আর রফিক মিলে টার্গেট করবে আমাকে আর তূর্যকে। আপনারা নিশ্চয়ই সারাজীবন আমাদের বেবিসিট করবেন না।’

‘কিন্তু আমাদের আর কিছু করার নেই ম্যাডাম। এটাই প্রোটোকল।’ শান্ত গলায় বলে শ্যাডো।

‘আপনি বুঝছেন না। আমাদের এটা পাবলিক করতে হবে।’ রিয়া বলল, ‘একবার এটা পাবলিক ডোমেইনে চলে গেলে, ওদের পুরো সেট-আপটাই ভেঙে যাবে।’

‘অসম্ভব! এটা করা মানে অর্গানাইজেশনকে বিট্রে করা। আমি এটা হতে দিতে পারি না। আমাদের মিশন ছিল, প্রমাণ উদ্ধার করে অর্গানাইজেশনের হাতে তুলে দেওয়া, ব্যস! মোরাল জাজমেন্ট করতে বসা একজন এজেন্টের কাজ নয়। সরি গাইজ। প্লিজ হ্যান্ডওভার দ্য পেনড্রাইভ টু মি, অ্যান্ড গো অ্যাওয়ে।’

কথা বলতে বলতেই শ্যাডোর হাতে উঠে এসেছে অটোমেটিক পিস্তল। সেটা তূর্যদের দিকে তাক করে সে বলে, ‘দেখুন, আমি প্রথম থেকেই আপনাদের দুজনকে সেফ হাউজে এনেছিলাম আপনাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। কিন্তু এই মিশনে ইনভলভ হওয়াটা আপনাদের নিজেদের ডিসিশন ছিল। সুতরাং এর কনসিকোয়েন্সেস আপনাদেরই বহন করতে হবে। আমি আপনাকে প্রথম থেকেই বলেছিলাম, প্রুফ পাবলিক করা যাবে না। আমার কাছে সেই অর্ডার নেই।’

শ্যাডোকে থামিয়ে দিয়ে স্যাম বলে উঠল, ‘গাইজ, আমার কম্পিউটার স্ক্রিন ফ্রিজ হয়ে গেছে। আমি কিছু অ্যাকসেস করতে পারছি না।’

ওরা সবাই ছুটে এল স্যামের ল্যাপটপের সামনে। সেখানে এখন কালো স্ক্রিনের ওপর কয়েকটা সবুজ বিন্দু ফুটে উঠেছে। ধীরে ধীরে সেই বিন্দুগুলো একত্রিত হয়ে একটা মুখের মতো অবয়ব তৈরি করল। অবশ্য ঠিক মুখ নয়, একটা মুখোশ। এরপর একটা যান্ত্রিক গলা ভেসে এল সেই মুখোশের আড়াল থেকে, ‘হ্যালো এভরিওয়ান! নাইস টু মিট ইউ।’

স্যাম এক ঝটকায় পেনড্রাইভটা বের করে নিল ছিল ল্যাপটপের পোর্ট থেকে। এবার সেই যান্ত্রিক গলা হেসে উঠল, ‘ওই পেনড্রাইভটা এখন বোধহয় আপনাদের আর কোনও কাজে আসবে না। ওটা হার্ড ফর্ম্যাট করে দেওয়া হয়েছে। কোনও ডেটা রিকভারি সফটওয়্যারের সাধ্য নেই ওটা থেকে আর কোনও ডেটা রিট্রিভ করবে।’

‘কে আপনি?’ তূর্য প্রশ্ন করে।

‘ওহ, সো সরি! আমি নিজের পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি। হাও রুড অফ মি! আমি দি আর্কিটেক্ট। কংগ্র্যাচুলেশনস বাই দ্য ওয়ে। ইওর মিশন ওয়াজ সাকসেসফুল।’

‘আপনি ইনটেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টের সিকিওর সার্ভার হ্যাক করলেন কী করে?’ হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করে স্যাম।

‘সেটা ইম্পর্ট্যান্ট নয়। আচ্ছা মিস্টার তূর্য, আপনি নেসেসারি ইভিলে বিশ্বাস করেন?’

তূর্য উত্তর দিল না। তার কেমন যেন মনে হল, উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশায় প্রশ্নটা করেনি লোকটা।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে দি আর্কিটেক্ট আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ খারাপ বলে কিছু হয় না। আমরা প্রত্যেকটা জিনিসকে নিজেদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে এবং বিচার করতে ভালোবাসি। যেমন ধরুন, কোনও একটা ঘটনা নিজে থেকে ভালো ঘটনা বা দুর্ঘটনা হয় না। ঘটনা ঘটনাই। কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি বলে, সেই ঘটনার মধ্যে আমাদের নিজেদের স্বার্থের পক্ষে বা বিপক্ষে ঘটা ভালো বা খারাপ এলিমেন্টগুলো দিয়ে ঘটনাটাকে ভালো ঘটনা বা দুর্ঘটনা বলে দাগিয়ে দিই।

‘ঠিক সেইরকমই পৃথিবীর কোনও মানুষই আদপে ভালো বা খারাপ হয় না। বা হয়তো হয়, কিন্তু সেইরকম আদর্শ পৃথিবী আজকের যুগে দাঁড়িয়ে কল্পনা করা অক্সিমোরন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমন একাধিক ধূসর পর্দাও রয়েছে, যেগুলোকে আমরা বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে সযত্নে ঢেকে রাখি। যেমন, এখন এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আপনারা মনে করছেন যে আমি মানুষটা ভীষণ খারাপ কিন্তু হয়তো এখন যে-কোনও চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ দেখার পর আপনাদের সেই ধারণা পালটে যাবে।’

স্যাম ততক্ষণে ফোন বের করে নিউজ পোর্টালগুলোয় চোখ বোলাতে শুরু করেছে। হঠাৎ সে চমকে উঠে বলল, ‘সর্বনাশ! মিনিস্টার দুবে এবং ডিফেন্সটেকের প্রতিনিধি ঝাও মিং খুন হয়েছেন!’

সবাই হতচকিত হয়ে স্যামের দিকে তাকাল। যান্ত্রিক স্বরে দি আর্কিটেক্ট তখনও বলে চলেছে, ‘এই একটু আগেই আপনারা ডিলেমায় ভুগছিলেন যে দুবে বোধহয় কোনও শাস্তি পাবে না। দেখুন, কী সুন্দর সেই সমস্যার সমাধান করে দিলাম।’

‘এলেনা তাহলে আপনার হয়েই কাজ করছিল?’ কঠিন স্বরে প্রশ্ন করে তূর্য।

‘আপনি বুদ্ধিমান। তবে শুধু এলেনা নয়। এখনও অবধি যা যা হয়েছে, যেভাবে হয়েছে, সবই আমার অঙ্গুলিহেলনে হয়েছে। যদিও আপনি মানুষটা ঠিক সুবিধার নন তূর্যবাবু। আমায় কেউ আগে কোনওদিন এভাবে ট্রাবল দেয়নি। তাই আমি ঠিক করেছি, আপনাকে একটু শাস্তি দেব। দেখুন তো! এটা চিনতে পারেন কিনা।’

হঠাৎ স্ক্রিনে একটা লাইভ ড্রোন ইমেজ ফুটে ওঠে। অনেক উঁচু থেকে একটা পুরোনো দোতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছে।

‘এটা তো “র”-এর সেফ হাউজ। এখানেই তো ডেল্টা অরিন্দম আর আরভকে নিয়ে রয়েছে।’ চিৎকার করে ওঠে শ্যাডো।

‘টেন অন টেন!’ শিশুর মতো হেসে ওঠে লোকটা। তারপরেই দেখা যায়, সেই বাড়িতে একটা শক্তিশালী বিস্ফোরণ হল। মুহূর্তে ধুলিসাৎ হয়ে গেল পুরো বাড়িটা। তূর্য চিৎকার করে ছিটকে গেল ঘরের কোণে। দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে মাটিতে ধপাস করে বসে পড়ল সে।

‘কষ্ট পাবেন না তূর্যবাবু। জীবন, মৃত্যু সব আপেক্ষিক। সব অস্থায়ী। আপনার, আমার সবার জীবন দুর্বল কোনও সুতোর এক প্রান্তে বাঁধা। সেই সুতোর অপর প্রান্ত ধরা অজানা করেও হাতে। আর সেই হাত সর্বশক্তিমান। সেই হাতকে লোকে সেলাম ঠোকে, শ্রদ্ধা করে, ভয় পায়।

‘শুধু একবার ভাবুন তো তূর্যবাবু, যদি কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই হাত থেকে সুতোটা ছিনিয়ে নিতে পারেন? যদি আপনাদের সেই সর্বশক্তিমানের বদলে সুতোর শেষ প্রান্ত থাকে আপনারই হাতে? আপনার আঙুলের একটা ইশারায় যদি ঝরে পড়ে একটা তাজা ফুল? কী দারুণই না হয়! আমি ইচ্ছে করলে এর জায়গায় অন্য একটা সেফ হাউজ উড়িয়ে দিতে পারতাম। যেখানে রয়েছে একজন একলা মা আর তার ফুটফুটে একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে…’

‘শাট আপ ইউ স্ক্রাউন্ডেল! কী চাই তোর?’ চিৎকার করে ওঠে তূর্য।

‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ তূর্যবাবু। আমি যা চাই, তা আপনি দিতে পারবেন না। শুধু একটাই অনুরোধ, ভবিষ্যতে আমার কোনও প্ল্যানে এভাবে নাক গলাবেন না। তাহলে আপনিই একটু মুশকিলে পড়বেন। যাই হোক, আমার যা দরকার ছিল আমি তা পেয়ে গেছি। সবাই বলে টাকাই নাকি ক্ষমতা। ভুল বলে তূর্যসাহেব, ভুল বলে! আসল ক্ষমতা হল ইনফরমেশন।’

‘আপনি তো দুবেকে মেরেই ফেললেন। তাহলে এই প্রমাণ নিয়ে আপনি কী করবেন? কাকে ব্ল্যাকমেইল করবেন?’ জিগ্যেস করল রিয়া।

‘দুবে? ধুর! ও তো এই খেলায় সামান্য একটা বোড়ে! ট্রাই টু সি দ্য বিগার পিকচার মিস জার্নালিস্ট। যাই হোক, আজ আসি। আশা করছি আবার দেখা হবে। গুড বাই এভরিওয়ান।’

ধীরে ধীরে সেই মুখোশটা আবার কয়েকটা বিন্দুতে ছড়িয়ে পড়ে অবশেষে মুছে গেল কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে। স্যাম কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে বলল, ‘সব শেষ। পেনড্রাইভ পুরো ক্লিন। আমিই বোকার মতো এখানে পেনড্রাইভ ইনসার্ট করলাম। এলেনা নিশ্চয়ই আগে থেকে ফায়ারওয়ালে কোনও বাগ ইমপ্ল্যান্ট করে রেখেছিল, যাতে সহজেই এই আর্কিটেক্ট লোকটা পুরো সার্ভারের রিমোট অ্যাকসেস পেয়ে যায়।’

শ্যাডো ফোনে কথা বলছিল। ফোন রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল, ‘ব্লাস্টে পুরো বাড়ি ধসে পড়েছে। ডেল্টা, অরিন্দম, আরভ তিনজনেই স্পট ডেড।’

শেষের কথাগুলো তূর্যর কানে যাচ্ছিল না। সে অন্যমনস্কভাবে সিগারেট ধরিয়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। নীচে পিচঢালা রাস্তায় হলুদ স্ট্রিটলাইটের আলোয় একজন মাতাল বেহিসেবি এলোমেলো পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাকে তাড়া করেছে একদল কুকুর। লোকটা মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকিয়ে চিৎকার করে অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে। রাত্রি নামলে এই খোলা জানালা থেকে অনেকটা কলকাতা দেখা যায়। দূরে জোনাকির মতো মিটমিট করে জ্বলে ছোট ছোট আলো।

আমরা যখন নিজেদের থেকে অনেক বড় কিছুর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তখন নিজেদের ভীষণ গুরুত্বহীন, ভীষণ ক্ষুদ্র মনে হয়। দূরের বহুতলের জানালার ওই চৌকো চৌকো আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে ঠিক সেইরকমই মনে হল তূর্যর। খুব খেলো মনে হল নিজেকে। সে শ্যাডোর কাছ থেকে ফোনটা চেয়ে নিয়ে ডায়াল করল সুলগ্নার সেফ হাউজের নম্বর। সুলগ্নাই ফোন ধরল।

‘হ্যালো সুলগ্না। তোমরা ঠিক আছ তো?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু এভাবে কতদিন এখানে বন্দি হয়ে থাকতে হবে?’ সুলগ্নার কণ্ঠে বিরক্তি।

‘আর থাকতে হবে না। আমি আসছি তোমাদের কাছে।’

সুলগ্না উত্তর দেয় না। শুধু ফোনের ও-প্রান্তে ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়। তূর্য হঠাৎ বলে, ‘সুলগ্না…’

‘বলো।’

‘আরেকবার কি সবকিছু নতুন করে শুরু করা যায় না? তোমাদের ছাড়া আমি ভালো নেই।’

কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে যায় সুলগ্না। তারপর ধীর কণ্ঠে বলে, ‘সব কথা কি ফোনেই বলতে হবে? আসছ বললে তো! এসো, শুনছি। তিতলি তোমার জন্য কান্নাকাটি করছে।’

তূর্য ম্লান হেসে ফোনটা কেটে দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *