দ্বাদশ পর্ব – এক্সট্র্যাকশন

দ্বাদশ পর্ব – এক্সট্র্যাকশন

পরের দিন সন্ধ্যা নামল দ্রুত। শীত পড়ছে। এখন রাত নামলেই অ্যাসফল্টের রাস্তা ভিজে যায় শিশিরে। তূর্য, শ্যাডো আর স্যাম তৈরি হয়ে নিল। তিনজনেই সাধারণ পোশাক পরেছে, যাতে বাইরে থেকে দেখলে কারোর সন্দেহ না হয়। কিন্তু পোশাকের ভেতরে লুকানো রয়েছে ছোট ছোট ছুরি, ওয়্যার কাটার ইত্যাদি।

রাত্রি দশটা নাগাদ একটা ছোট ভ্যান এসে থামল ওদের সেফ হাউজের সামনে। ভ্যানের গায়ে লেখা ‘হাওড়া স্বাস্থ্য সেবা এনজিও’। ভ্যানের পেছনে কিছু মেডিকাল সরঞ্জাম, ওষুধের বাক্স।

সুমন স্টিয়ারিংয়ে বসেছিল। সহজ সরল মানুষ। শ্যাডো তূর্যর পাশে বসেছিল। সে নিচু স্বরে বলল, ‘স্যাম, আমাদের এক্সিট লোকেশন এলেনাকে বুঝিয়ে দিয়েছ? ওরা যদি লোকেশন ভুল করে তাহলে কিন্তু বড় গন্ডগোল হয়ে যাবে।’

স্যাম মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। গতকাল রাতে আমি ওদের দুজনের হাতেই মার্কড ম্যাপের হার্ডকপি দিয়ে দিয়েছি। লোকেশন ভুল হওয়ার কোনও চান্স নেই।’

‘কিন্তু কোনও সমস্যা হলে? মানে, ওরা যদি আপনাদের অস্ত্র খুঁজে পেয়ে যায়?’ সুমন একটু কাঁপা কণ্ঠে জিগ্যেস করল। বোঝাই যাচ্ছে, বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছে বেচারা।

‘তাহলে আমরা দু’হাত তুলে কীর্তন শুরু করব।’ শ্যাডো হালকা হেসে শান্তভাবে বলল, ‘চাপ নিচ্ছ কেন? ওষুধের পেটির তলায় একটা ফলস বটম আছে। খুব সাবধানে বানানো হয়েছে পুরো সেট-আপটা। কিচ্ছু হবে না।’

ভ্যান ছাড়ল। রিয়া আর এলেনা একটা আলাদা গাড়িতে পেছন পেছন আসছিল। তারা এক্সিট ভেহিকল হিসেবে থাকবে, কিন্তু কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। অফিস আওয়ারস শেষ হয়েছে। রাস্তায় গাড়ির চাপ কমছে ধীরে ধীরে। ভ্যান এগিয়ে চলল কলকাতার সরু রাস্তা দিয়ে।

প্রায় মিনিট কুড়ি পর ভ্যান সুখরান কলোনির কাছে পৌঁছাল। জায়গাটা আরও ভয়ংকর লাগছিল অন্ধকারে। সরু গলি, ভাঙা দেওয়াল, নোংরা পথ। জায়গায় জায়গায় মানুষ দাঁড়িয়ে জটলা করছে। কেউ ধূমপান করছে, কেউ চটুল অশ্লীল আলোচনা করছে। তূর্য লক্ষ করল, অনেকের কোমরেই অস্ত্র গোঁজা আছে। জামাগুলো ফুলে উঠেছে বেখাপ্পাভাবে। ভ্যান বস্তির মুখে এসে থামল। দুজন বিশাল চেহারার লোক পাহারা দিচ্ছিল। তারা ভ্যানের দিকে এগিয়ে এল।

একজন জানালায় টোকা দিল। সুমন জানালা নামিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘সেলাম সেলিম ভাই। কাল সকালে ক্যাম্প হবে। আগে থেকে মালগুলো রেখে দিয়ে যাই?’

সেলিম ধমকের সুরে বলল, ‘এটা মাল রাখার সময়? ক’টা বাজে দেখেছিস?’

সুমন আমতা আমতা করে বলল, ‘সরি ভাই। আসলে আজ আরেক জায়গায় ক্যাম্প ছিল। সেটা শেষ না করে ছাতা, টেবিল এগুলো তুলে আনতে পারছিলাম না। একবার ভাবলাম, থাক! কাল সকালেই যাব। তারপর ভাবলাম, সকালে অনেক ভিড় হবে। তাই রাতে এসে সরঞ্জাম নামিয়ে রাখছি। সকালে সরাসরি ক্যাম্প শুরু করব।’

সেলিম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার সঙ্গী তাকে থামাল, ‘ধুর! কী একঘণ্টা ধরে আলবাল বকছিস? এই সুমন, গাড়ির পেছন খোল, চেক করে নিই।’

দুজন গার্ড ভ্যানের পেছনে গেল। তূর্যর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। শ্যাডো পাশে অবিচলভাবে স্থির বসে আছে। তার চোখে কোনও চাঞ্চল্য নেই। পেছনের দরজা খুলল। ভেতরে মেডিকাল সরঞ্জাম, স্ট্রেচার, ব্যান্ডেজের বাক্স, ছাতা, চেয়ার আর বড় বড় ওষুধের পেটি।

একজন গার্ড উঠে এল ভ্যানে। সে ওপরের পেটিগুলো সরিয়ে একদম নীচ থেকে একটা পেটি তুলে নিয়ে হাতড়াতে শুরু করল। তূর্যর বুকের ভেতর দামামা বাজতে শুরু করেছে। সে প্রাণপণে স্থির থাকার চেষ্টা করল। পেটিটা খোলা হলে আপাতভাবে শুধু ওষুধের বোতল দেখা যাবে। কিন্তু তলার ফলস বটমে লুকানো আছে তিনটে পিস্তল আর সেমি-অটোমেটিক রাইফেল।

গার্ডটা পেটি খুলল। ভেতরে সারি সারি ওষুধের বোতল। সে একটা বোতল তুলে দেখল। শুঁকতে গিয়ে ঝাঁঝালো ওষুধের গন্ধ পেয়ে মুখ থেকে বিরক্তির ঘোঁতঘোঁত আওয়াজ করল।

তারপর পেটিটা বন্ধ করে দিল। কিন্তু এবার তার হাত পেটির তলায় গেল, যেন ওজন মাপছে। তূর্যর শরীর টান হয়ে গেল। শ্যাডো ধীরে ধীরে তার কোমরের দিকে হাত নিয়ে যাচ্ছিল। গার্ডটা কয়েক সেকেন্ড পেটিটা ধরে রাখল। তারপর নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। শালা ওষুধের গন্ধটা কেমন পচা পচা লাগে না?’

সুমন উত্তর না দিয়ে বত্রিশপাটি দাঁত একসঙ্গে খিঁচিয়ে একটা কিম্ভূত নার্ভাস হাসি হাসল। তূর্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শ্যাডোও হাত সরিয়ে নিল কোমরের কাছ থেকে। গার্ড দুজন নামল। একজন সামনে এসে সুমনকে বলল, ‘ভাই, আমায় একটা অম্বলের ওষুধ দিয়ে যাস না রে। শালা যা-ই খাই, বুক জ্বলে।’

সুমন মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে ভাই। আমি কাল অ্যান্টাসিডের একটা গোটা স্ট্রিপ দিয়ে যাব তোমায়।’

ভ্যান ভেতরে ঢুকল। বস্তির সরু গলি দিয়ে এগিয়ে চলল ধীরে ধীরে। দু’পাশে ভাঙাচোরা ঘর, কেউ কেউ আবার গাড়ির আওয়াজ পেয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে।

ভ্যান এবার একটা খোলা জায়গায় এসে থামল। একটা পুরোনো স্কুল বিল্ডিং। এখন যদিও বন্ধ। সুমন বলল, ‘এখানেই ক্যাম্প হওয়ার কথা। আসুন, সরঞ্জাম নামাই।’

সবাই নামল ভ্যান থেকে। ঝিরঝির করে অসময়ের বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তাতে এমনিতে অসুবিধে না হলেও শীতের প্রকোপ বেড়ে গেছে। তারা রীতিমতো কাঁপছে ঠান্ডায়। চারপাশ থেকে কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়ে এসে জড়ো হতে শুরু করল। তাদের পরনে ছেঁড়া স্যান্ডো আর হাফ-প্যান্ট, চোখে চকচকে কৌতূহল।

তূর্য, শ্যাডো আর স্যাম সাবধানে সরঞ্জাম নামাতে শুরু করল। প্রথমে স্ট্রেচার, তারপর ব্যান্ডেজের বাক্স। তারপর এল ওষুধের পেটি। তূর্য একটা ভারী পেটি তুলল। এর তলাতেই তাদের অস্ত্র লুকানো আছে। সে সাবধানে সেটা নামিয়ে স্কুল বিল্ডিংয়ের ভেতরে নিয়ে গেল। বিল্ডিংয়ের ভেতরটা অন্ধকার। শুধু একটা মোমবাতি জ্বলছিল।

তূর্য শ্যাডোর পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর তাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করল, ‘রফিক খানের বিল্ডিংটা কোথায়?’

শ্যাডো হেসে মাথা ঘুরিয়ে দেখল। স্কুলের পেছনে, একটু দূরে একটা তিনতলা বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। বিল্ডিংটা অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। আলো জ্বলছে সব তলায়।

‘ওইটা।’ শ্যাডো ওইদিকে ইশারা করল, ‘তবে এখান থেকেই বাড়ির সামনের গার্ড দেখা যাচ্ছে।’

তূর্য চোখ সরু করে দেখল, ‘চারজন সামনে। পেছনে কতজন জানি না।’

তারা আরও কিছু সরঞ্জাম নামাল। ওরা সুমনের সঙ্গে হাতে হাতে সবকিছু গুছিয়ে রাখছিল। এইসবে অনেকক্ষণ সময় লাগায় চারপাশের বাচ্চাগুলো ধীরে ধীরে চলে গেল। সুমন এসে তূর্যকে বলল, ‘এখন যাচ্ছি। কাল সকালে আবার আসব।’

তূর্য নিচু স্বরে বলল, ‘সকালের দরকার হবে না ভাই। আজ হয় এসপার নয় ওসপার। যা হওয়ার আজই হবে।’

সুমন ভ্যান নিয়ে চলে গেল। তূর্য, শ্যাডো আর স্যাম এখন একা।

স্যাম চারপাশ দেখে বলল, ‘এখন কী করব?’

শ্যাডো ঘড়ি দেখল। বলল, ‘আরও ঘণ্টা দুই অপেক্ষা করব। রাত যত গভীর হবে, গার্ডদের পাহারা তত আলগা হবে। স্যাম, তুমি এখানে থাকো। ওয়াকি-টকি অন রেখো। আমি আর তূর্য এগোচ্ছি।’

স্যাম সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। তার হাতে একটা ছোট ওয়াকি-টকি। ঘণ্টা দুয়েক পর সে নিজেই বলল, ‘ইটস টাইম। মুড নাউ!’

তূর্য আর শ্যাডো স্কুল থেকে বেরিয়ে বস্তির গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তারা বস্তির আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই হাঁটছিল, কিন্তু তাদের চোখ সতর্ক।

বৃষ্টিটা এখন আরও জোরালো হয়েছে। সেটা অবশ্য তাদের জন্য ভালোই। বৃষ্টিতে লোকে বাইরে ঘুরে ঘুরে ডিউটি কম করবে। তারা সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে চেষ্টা করবে। আর সেইটাই ওদের সুযোগ। তারা চুপিসারে রফিক খানের বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি পৌঁছাল। একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বিল্ডিংটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

বিল্ডিংটা তিনতলা। পুরোনো, কিন্তু বেশ মজবুত। সামনের দরজায় চারজন গার্ড, সবার হাতে অস্ত্র। শ্যাডো ফিসফিস করে বলল, ‘পেছনে যেতে হবে। সামনে দিয়ে ঢোকা অসম্ভব।’

তূর্য সম্মতি জানাল, ‘হ্যাঁ। চলুন, ঘুরে পেছনে যাই।’

তারা একটা সরু গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকে। গলিটা অন্ধকার। শুধু কিছু জায়গায় টিমটিমে আলো জ্বলছে। যদিও সেই আলো এই নিকষ কালো অন্ধকার দূর করতে পারছে না। দূরে কোথাও কুকুর ঘেউঘেউ করছে। কোথাও আবার বাচ্চা কাঁদছে। প্রায় দশ মিনিট ঘোরাঘুরির পর তারা বিল্ডিংয়ের পেছনে পৌঁছাল। এখানেও দুজন গার্ড, কিন্তু তারা এখন একটা ছোট্ট ঘরের ভেতরে বসে চা খাচ্ছে।

তূর্য দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শরীরটা অন্ধকারে মিশিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। বিল্ডিংয়ের পেছনের দেওয়ালে একটা জীর্ণ কঙ্কালের মতো অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মরচে ধরা লোহার সিঁড়ি, ওপরে তিনতলা পর্যন্ত উঠে গেছে।

‘ওটাই আমাদের পথ। ভিতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা অসম্ভব। কেউ না কেউ ঠিক দেখে ফেলবে।’ তূর্য ফিসফিস করল।

শ্যাডো সিঁড়িটা পরীক্ষা করে দেখল। ওঠা অসম্ভব নয়। ভেঙে পড়বে বলে মনে হয় না। তবে ওঠার সময় যাতে আওয়াজ না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। সে বলল, ‘কিন্তু গার্ড দুজনকে সরাতেই হবে। আমরা হাফ ওঠার পর ওদের নজর যাবে। আর নিচ থেকে গুলি ছুড়বে। তখন আমাদের কিছু করার থাকবে না।’

তূর্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

শ্যাডো একটা ছোট পাথর তুলে নিল। গার্ডদের থেকে বিপরীত দিকে, একটা টিনের চালে ছুড়ে মারল। টিনে লেগে একটা বিকট শব্দ করল পাথরটা। গার্ড দুজন সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল, ‘অ্যাই কে রে? কে ওখানে?’

‘কুকুর নাকি?’ একজন গার্ড বলল।

‘বোকার মতো কথা বলিস না তো! কুত্তা টিনের চালে উঠবে কী করে? আয় আমার সঙ্গে।’

গার্ড দুজন একবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে দুজনেই সাবধানে শব্দের উৎস অনুসরণ করে এগিয়ে গেল।

তূর্য তিন গুনতে শুরু করল মনে মনে। এক… দুই… তিন!

গার্ড দুজন টিনের চালের কাছে পৌঁছেছে। ওদিকে তূর্য আর শ্যাডো নিঃশব্দে অন্ধকারের আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে এল। বেড়াল পায়ে দ্রুত দৌড়ে টিনের চালের কাছে এগিয়ে গেল তারা। গার্ডদুটো এখনও পেছন ফিরে আছে। মুহূর্তের মধ্যে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকদুটোর ওপর। সঙ্গে থাকা শক্ত নাইলন দড়ি দিয়ে গলায় একটা করে ফাঁস দিয়ে দিল। লোকদুটো চিৎকার করতে চেয়েও পারল না। তার আগেই সঙ্গে থাকা অস্ত্রের বাঁট দিয়ে আঘাত করে তাদের অজ্ঞান করে দিল ওরা। তারপর লোকদুটোর মুখে কাপড় গুঁজে সেলোটেপ পেঁচিয়ে হাত-পা বেঁধে ওই টিনের চাল সংলগ্ন ঝোপের ভেতর ফেলে রাখল।

শ্যাডো বলল, ‘আপনার রিফ্লেক্স তো খারাপ না। আপনি ক্যারাটে জানেন, না?’

তূর্য হাসতে হাসতে বলল, ‘কলেজ পাশ করার পর যখন প্রথম গোয়েন্দা হওয়ার ঝোঁক চাপে, তখন শিখেছিলাম। এখন প্র্যাক্টিসের অভাবে আর ভুঁড়ি হয়ে যাওয়ায় রিফ্লেক্স অনেকটাই চলে গেছে।’

তূর্য প্রথমে সিঁড়িতে পা রাখল। সিঁড়িটা একটু কাঁপল। তারপর হালকা ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। তূর্য স্থির হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করল। শ্যাডোও এবার নিজের অস্ত্র উঁচিয়ে পিছন ফিরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। দুজনেই নড়বড়ে সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে খুব সাবধানে পা রাখছিল, যাতে কোনও শব্দ না হয়। সিঁড়িটা পুরোনো, মরচে ধরা। সাবধানতা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ করছেই।

ধীরে ধীরে প্রথম তলা পার করে তারা দোতলা পৌঁছাল। অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টি তাদের শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। পুরোনো লোহার সিঁড়িতে পিছলে যাচ্ছে পা।

তিনতলায় পৌঁছে তূর্য দাঁড়াল। যেহেতু সিঁড়িটা এখন পরিত্যক্ত, তাই সিঁড়ির মুখের একসময়ের দরজাটা এখন গ্রিল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভেতরে অস্পষ্ট আলো দেখা যাচ্ছে।

শ্যাডো ব্যাগ থেকে পোর্টেবল অক্সি-অ্যাসিটিলিন টর্চ বের করল। সেটার সাহায্যে ধীরে ধীরে গ্রিল কাটতে শুরু করল। এমনিতে এই উন্নত পোর্টেবল অক্সি-অ্যাসিটিলিন টর্চে শব্দ প্রায় হয় না বললেই চলে। কিন্তু এই মধ্যরাত্রে সেই সামান্য শব্দই অনেকগুণ বেশি শোনাচ্ছে। ধীরে ধীরে একটার পর একটা গ্রিল কাটতে লাগল শ্যাডো। কাজটা সময়সাপেক্ষ। তূর্য সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পাহারা দিচ্ছিল।

প্রায় দশ মিনিট পর গ্রিলের একটা অংশ খুলে গেল। মোটামুটি একজন মানুষ সেখান দিয়ে ঢুকতে পারে।

তূর্য জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি মারল। করিডোর খালি। আপাতত কোনও গার্ড নেই। একটা বাল্ব জ্বলছে দূরে। টিমটিমে আলোয় জায়গাটা কেমন যেন ভৌতিক দেখাচ্ছে। তূর্যই প্রথমে ঢুকল। সাবধানে গ্রিলের কাটা ফ্রেম ধরে ভেতরে নামল। তারপর শ্যাডোকে ঢুকতে সাহায্য করল। দুজনে করিডোর ধরে এগোতে লাগল নিঃশব্দে।

করিডোরটা সরু। দু’পাশে সারি সারি বন্ধ দরজা। দেওয়ালে প্লাস্টার খসে পড়েছে, স্যাঁতসেতে একটা গন্ধ। শ্যাডো এবার ব্যাগ থেকে একটা স্টেথোস্কোপের মতো যন্ত্র বের করে দেওয়ালে সেটা ঠেকিয়ে কী যেন শুনতে চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘পায়ের আওয়াজ নেই। একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। চলে আসুন।’

তারা ধীরে ধীরে করিমের কথামতো পূর্বদিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটা সাবধানি পদক্ষেপে দেওয়াল ঘেঁষে ছায়ার মতো অন্ধকারে মিশে পা ফেলছে ওরা। করিডোরের মাঝামাঝি পৌঁছেছে, হঠাৎ একটা দরজা খুলে গেল। তূর্য আর শ্যাডো সঙ্গে সঙ্গে নিঃশ্বাস বন্ধ করে একটা অন্ধকার কোণে লুকিয়ে পড়ল।

একটা লোক বেরিয়ে এল খোলা দরজা দিয়ে। তার হাঁটা দেখেই বোঝা যায়, সে মদের নেশায় বুঁদ। রামপ্রসাদী সুর ভাঁজতে ভাঁজতে টলোমলো পদক্ষেপে সে করিডোর দিয়ে হেঁটে তাদের দিকেই আসতে লাগল। শ্বাস বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তারা। লোকটা তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। কিছুই খেয়াল করল না। করিডোরের শেষ প্রান্তে সম্ভবত বাথরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল সশব্দে।

তূর্য একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।

তারা আবার এগিয়ে গেল। করিডোরের শেষে পৌঁছাল। একটা বন্ধ দরজা দেখা যাচ্ছে। দরজার সামনে দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে, হাতে অস্ত্র।

একজন গার্ড আরেকজনকে বলছে, ‘ওই শুয়োরের বাচ্চা নিমাই-ই খৈনির ডিবেটা চুরি করেছে। তোরা শালা ওকে খুব মাথায় চড়াচ্ছিস।’

‘তুই কি দেখেছিস? না দেখে বলছিস কেন?’

‘কুত্তাটার সাইড নিবি না সঈদ। খুব খারাপ হয়ে যাবে। পিতলের ডিবে ছিল ওটা। কম করে দেড়শো-দুশো টাকা দাম।’

শেষের কথাগুলো বেশ জোরেই বলল লোকটা। সঈদ এবার ঠোঁটের ওপর একটা আঙুল রেখে বলল, ‘ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাস না। বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে গেলেই আবার চেল্লামেল্লি করবে। তখন রফিক ভাইয়ের ঘুম চটকে গেলে তোর গাঁড়ে গরম শিক ঢুকিয়ে তন্দুরি বানিয়ে দেবে।’

‘ধুর! বাচ্চাটা উঠবে না। সেলিম বলেছে, বাচ্চাটা ত্যাঁদড়ামো করছিল বলে ওকে পুরিয়া খাইয়ে রেখেছে। নইলে সেলিমের হাতে নাকি কামড়ে দিয়েছিল।’

‘ওইজন্য মালটা হাতে ব্যান্ডেজ করে ঘুরছিল। জিগ্যেস করলাম, বলল নাকি চাকুতে কেটে গেছে।’ সেলিমের দুর্দশায় খুব আমোদ পেয়ে ভুঁড়ি দুলিয়ে নিঃশব্দে খিকখিক করে হাসতে লাগল সঈদ।

তূর্য আর শ্যাডো ততক্ষণে একটা অন্ধকার কোণে লুকিয়ে পড়েছে। গার্ডদের থেকে প্রায় দশ-বারো ফুট দূরে।

তূর্য শ্যাডোর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করল, ‘দুজনকে একসঙ্গে আক্রমণ করব। আপনি বাঁ-দিক থেকে যান, আমি ডানদিক থেকে যাচ্ছি।’

শ্যাডো মাথা নাড়ল। তার হাতে উঠে এল একটা ছোট ছুরি।

এবার তারা আলাদা হয়ে গেল। শ্যাডো করিডোরের একপাশ দিয়ে সরে গেল ছায়ার মতো। তূর্য অন্যপাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। তাদের প্রতিটা পদক্ষেপ সাবধানি।

গার্ড দুজন নিজেদের মধ্যে এখনও কথা বলছে। জনৈকা মোতি নামক এক মেয়ের দেহসৌষ্ঠব সংক্রান্ত চটুল আলোচনা চলছে। তূর্য গার্ডদের পেছনে পৌঁছে গেল। মাত্র পাঁচ ফুট দূরে। শ্যাডোও অন্যদিকে পৌঁছে গেছে।

তূর্য মনে মনে গুনল। তিন… দুই… এক! তারপর হাতের একটা ইশারা করল শ্যাডোকে। মুহূর্তে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল দুজনে। শ্যাডো একজন গার্ডের মুখে হাত চাপা দিল। অন্য হাত দিয়ে ঘাড়ের কাছে মোক্ষম আঘাত করল। গার্ড শব্দ করার চেষ্টা করেও পারল না। সে নিষ্ফল আক্রোশে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল। তূর্যও তার দিকের গার্ডকে একইভাবে অজ্ঞান করে ফেলল। তেমন কোনও শব্দ বা চিৎকার হল না। তারা দুজন গার্ডকে একপাশে টেনে নিয়ে গেল। তারপর একটা অন্ধকার কোণে লুকিয়ে রাখল।

এবার শ্যাডো দরজার কাছে গেল। দরজা লক করা। সে ব্যাগ থেকে একটা ছোট লকপিক সেট বের করল। অভিজ্ঞ হাতে লকের ভেতরে টুলটা ঢুকিয়ে ঘোরাতে লাগল।

মাত্র মিনিটখানেকের অপেক্ষা। ক্লিক ক্লিক শব্দে বার তিনেক মৃদু আওয়াজ হল। তারপর একটা যান্ত্রিক শব্দ করে তালাটা খুলে গেল। এবার তূর্যর দিকে তাকাল শ্যাডো। তূর্য তার চোখের ইশারা বুঝল। শ্যাডো তাকে ভিতরে গিয়ে আরভকে নিয়ে আসতে বলছে। সে নিজে দরজার বাইরে পাহারায় রইল।

ধীরে ধীরে দরজার হাতল ঘোরাল তূর্য। দরজা একটু ফাঁক হতেই ভেতর থেকে নাইটল্যাম্পের মৃদু আলো দেখা গেল। বেশ বড় ঘর। ঠিক মাঝামাঝি রাখা বিছানায় একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা ছেলে শুয়ে আছে। সে ঘুমাচ্ছে চাদর মুড়ি দিয়ে।

তূর্য নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল। শ্যাডো কথামতো বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে লাগল। তূর্য বিছানার কাছে গিয়ে পকেট থেকে আরভের ছবি বের করে ভালো করে মুখটা মেলাল। তারপর নিশ্চিত হয়ে ধীরে ধীরে হাত রাখল আরভের কাঁধে। ডাকল, ‘আরভ! আরভ, ওঠো!’

বাচ্চাটা একটু নড়ল। তারপর ঘুমঘুম চোখ খুলে। জড়ানো গলায় বলে উঠল, ‘পাপা? পাপা তুমি এসেছ?’

তূর্য নিচু গলায় বলল, ‘না। তবে আমি তোমাকে পাপার কাছেই নিয়ে যেতে এসেছি। এসো আমার সঙ্গে।’

আরভ হঠাৎ ভয় পেয়ে চিৎকার করতে যাচ্ছিল। তূর্য তার মুখ চেপে ধরল। ফিসফিস করে বলল, ‘আরভ, তুমি চিৎকার করলে লোকগুলো আমাদেরও ধরে ফেলবে। তখন কিন্তু আর পাপার কাছে যাওয়া হবে না। তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ?’

আরভ উপর নীচে মাথা নাড়ায়।

তূর্য এবার আবার মৃদু স্বরে বলে, ‘আমি হাতটা সরাচ্ছি। তুমি কিন্তু চিৎকার করবে না, ওকে?’

আরভ সম্মতিসূচক মাথা নাড়তে তূর্য খুব ধীরে ধীরে তার হাতটা সরিয়ে নেয়। আরভ এবার ফিসফিস করে কিছুটা জড়ানো গলায় বলে, ‘পাপা আসেনি?’

‘না। তবে তোমার পাপা তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে। আমাদের তোমার পাপাই পাঠিয়েছে। আমরা তোমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে একদম চুপচাপ থাকতে হবে। কোনও শব্দ করবে না। বুঝতে পারছ?’

আরভ আবার মাথা নাড়ল।

‘তোমাকে কি ওরা মেরেছে?’

আরভ মাথা নাড়ল, ‘না। কিন্তু আমায় সারাদিন এই ঘরে বন্ধ করে রাখে। আমি পাপার কাছে যাব।’

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাব, চলো।’

আরভ বিছানায় উঠে দাঁড়াল। সে একটা ছেঁড়া হাফ-শার্ট আর প্যান্ট পরে আছে।

তূর্য এবার তাকে কোলে তুলে নিল। পুরোনো ছবির সঙ্গে মিলিয়ে সে বুঝল আরভ একদিনে খুবই রোগা এবং দুর্বল হয়ে গেছে। এতটাই হালকা যে তাকে কোলে তুলতে মনে হল, কোনও ওজনই নেই। তূর্য তাকে কোলে নিয়েই দরজার কাছে এল।

শ্যাডো ভেতরে তাকাল, ‘পেয়েছেন?’

‘হ্যাঁ।’ তূর্য বলল।

‘চলুন, এবার ফাস্ট বেরোতে হবে।’

তারা করিডোর দিয়ে একইভাবে সন্তর্পণে ফিরে যেতে শুরু করল। তূর্য আরভকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। আরভ তার ঘাড়ে মাথা রেখেছে। করিডোরের মাঝামাঝি পৌঁছতেই হঠাৎ পিছন একটা বিশ্রী হাসি ভেসে এল, ‘রহিম! সুলেমান! কোথায় তোরা? চিড়িয়া ফাঁদে পড়েছে। দেখে যা।’

তূর্যর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। শ্যাডো মুহূর্তে সতর্ক হয়ে গেল। নীচে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সিঁড়ি দিয়ে অনেক মানুষ একসঙ্গে ওপরে উঠে আসছে।

‘দৌড়ান!’ শ্যাডো চাপা কণ্ঠে আদেশ দিল।

তারা দৌড়াতে শুরু করল সেই গ্রিলকাটা দরজাটার দিকে। কিন্তু তখনই সিঁড়ি দিয়ে পাঁচ-ছয়জন লোক উঠে এল। সবার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র।

‘ওই যে! বাচ্চাটাকে নিয়ে পালাচ্ছে!’ একজন চিৎকার করল।

গার্ডরা এবার তাদের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। একজন গুলি ছুড়ল। তূর্যর মাথার ওপর দিয়ে দেওয়াল ছুঁয়ে গেল গুলিটা।

অসম্ভব দ্রুততায় সেই গ্রিলকাটা দরজার সামনে পৌঁছে তারা দেখল, বাইরের সেই নড়বড়ে সিঁড়ি ধরে আরও দুজন লোক উঠে আসছে। তারাও সশস্ত্র।

গ্রিলের ফাঁক গলে তারা এবার ভিতরে এসে দাঁড়াল। তাদের উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র এখন তূর্যদের দিকেই তাক করা। মুহূর্তের মধ্যে তারা বুঝল, তারা ঘেরাও হয়ে গেছে।

তূর্য কোমর থেকে পিস্তল বের করতে যাচ্ছিল। শ্যাডো বলল, ‘লাভ নেই তূর্য। আমরা আটকা পড়ে গেছি!’

পেছন থেকেও গার্ডরা এসে পড়েছে। তাদের ঘিরে করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সবাই।

এইবার একজন সামনে এগিয়ে এল। তার পরনে লুঙ্গি আর সাদা ফতুয়া। চোখে সুরমা। পান চিবাতে চিবাতে তার হাতের বন্দুকটা উঁচিয়ে বলল, ‘ছেলেটাকে নামাও চাঁদু। না হলে গুলি করব।’ গলা শুনে তূর্য বুঝল এই লোকটাই প্রথমে কথা বলেছিল।

তূর্য বুঝেছে, এই সেই কুখ্যাত রফিক খান। অদ্ভুত কুতকুতে দৃষ্টি নিয়ে সে তাকিয়ে আছে তূর্যদের দিকে। ঠোঁটের কোণে একটুকরো কুটিল হাসি। তূর্য তখনও আরভকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।

ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগোতে লাগল রফিক খান। শ্যাডো নিজেও বেশ দমে গেছে এই পরিস্থিতিতে পড়ে। হঠাৎ তূর্য তার পকেট থেকে একটা ছোট হুইসিল বের করল। তারপর সকলকে চমকে দিয়ে সেটা মুখে নিয়ে জোরে বাজিয়ে দিল।

হুইসিলের তীক্ষ্ণ শব্দ পুরো করিডোর জুড়ে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। রফিকসহ বাকিরাও বিভ্রান্ত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। এমনকী শ্যাডো পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে জিগ্যেস করল, ‘এটা কী?’

ঠিক সেকেন্ড দুয়েক কিছুই হল না। তারপর…

হঠাৎ বিল্ডিংয়ের নিচতলায় একটা বিকট শব্দ হল। বিস্ফোরণের শব্দ। পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠল সেই শব্দের তীব্রতায়। পুরোনো নোনাধরা দেওয়াল থেকে প্লাস্টার খসে পড়তে লাগল।

লোকগুলো ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করল। এ ওকে জিগ্যেস করতে লাগল, ‘কী হল? কী হল?’

‘হারামজাদাগুলো গোটা বিল্ডিং ঘিরে ফেলেছে। বোম ছুড়ছে।’ রফিকের কথাটা আর্তনাদের মতো শোনাল।

তারপর আবার আরেকটা বিস্ফোরণ। এবার সম্ভবত দোতলায়। আরও তীব্র এবং বিকট শব্দে কানে তালা লেগে গেল। তারপর আবার একটা, তারপর আবার! গলগল করে কালো ধোঁয়া উঠতে শুরু করল নিচ থেকে। সিঁড়ি বেয়ে সেই ধোঁয়া তিনতলার করিডোরেও ছড়িয়ে পড়ল।

বারুদের অসহ্য গন্ধ, ধোঁয়া এবং বিশৃঙ্খলা।

লোকগুলো প্রাণভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তাদের তখন একটাই চিন্তা… নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে হবে। তূর্য আর শ্যাডোর দিকে তখন খেয়াল করল না কেউ।

‘বিল্ডিং ধসে পড়বে!’ একজন আর্তনাদের সুরে বলল।

অন্যজন চিৎকার করল, ‘পালা! নীচে নাম!’

গার্ডরা উদ্‌ভ্রান্তের মতো দৌড়াতে শুরু করল সিঁড়ির দিকে। মুহূর্তে করিডোর খালি হয়ে গেল। পড়ে রইল শুধু ধোঁয়া আর বিশ্রী গন্ধ। তূর্যরা সুযোগ বুঝে দ্রুত পায়ে নামতে লাগল লোহার সিঁড়ি বেয়ে। নামতে নামতেই অবাক গলায় শ্যাডো জিগ্যেস করল, ‘আপনি কখন এই ব্যবস্থা করলেন?’

‘কেন? গতকাল রাতে! যখন আপনি বললেন, করিমচাচা পেটো বোমা তৈরিতে এক্সপার্ট, তখনই মাথায় এই আইডিয়াটা এল। করিমচাচার কাজ ছিল এই হুইসিলটা শুনলেই শুধু দেশলাই জ্বালিয়ে একতলা আর দোতলার বোমা রাখা পেটিগুলোয় ফেলে দেওয়া।’

‘আপনি মশাই জিনিয়াস!’

‘জিনিয়াস বলে লজ্জা দেবেন না। আমি সামান্য খেটে খাওয়া গোয়েন্দা।’

তারা ততক্ষণে দোতলা পার করে একতলায় নেমে এসেছে। শেষ কয়েকটা ধাপ নেমে মাটিতে পা পড়তেই তারা ছুটতে শুরু করল। বস্তির গলি দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তারা বুঝতে পারছে, মানুষজন ঊর্ধ্বশ্বাসে বিল্ডিংয়ের দিকে দৌড়াচ্ছে। তারাও বুঝতে পারছে না যে কী হয়েছে। তখনও গলগলিয়ে ধোঁয়া উঠছে বিল্ডিং থেকে। জানালা দিয়ে আগুনের শিখাও দেখা যাচ্ছে।

এইবার ওয়াকি-টকিতে স্যামের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘হ্যালো শ্যাডো! কী হয়েছে? শব্দগুলো কীসের?’

‘উই আর সেফ!’ শ্যাডো দৌড়াতে দৌড়াতেই বলল, ‘আরভ আমাদের সঙ্গে। পিক-আপ পয়েন্টে যাচ্ছি। তুমি ওখানেই মিট করো।’

‘গট ইট। উই আর রেডি। প্রসিডিং অ্যাকোর্ডিং টু দ্য প্ল্যান।’

একটা সরু গলি দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে হঠাৎ সামনে তিনজন লোক দেখা দিল। যদিও তারা সশস্ত্র নয়।

‘এই কে রে তোরা? এলাকার মাল বলে তো মনে হচ্ছে না!’ একজন চাপা হুংকার দিয়ে বলল।

শ্যাডো কিন্তু দৌড় থামাল না। সে সরাসরি একই গতিতে তাদের দিকে দৌড়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথমজনের মুখে একটা জোরালো ঘুসি পড়ল। লোকটা এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কাটা কলাগাছের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সেই ঘটনার আকস্মিকতা কাটার আগেই শ্যাডো মুহূর্তে দ্বিতীয়জনের হাত ধরে মুচড়ে দিল। লোকটা যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠার আগেই তৃতীয়জনের পায়ে লাথি মারল সজোরে। লোকটা চিৎকার করে হাঁটু ভাঁজ করে মাটিতে পড়ে গেল। সেই চিৎকারের সঙ্গেই একটা বিশ্রী শব্দ শুনে তূর্য বুঝল, লোকটার মালাইচাকি সম্ভবত গুঁড়িয়ে গেল।

পুরো ঘটনাটা ঘটতে সময় লাগল মেরেকেটে সেকেন্ড পাঁচেক।

‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলুন!’

শ্যাডোর কথায় ঘোর কাটল তূর্যর। তারা আবার দৌড়াতে শুরু করল। বৃষ্টি এখনও পড়ছে ঝিরিঝিরি। তাদের শরীর ভিজে গেছে। পাঁচ মিনিট দৌড়ানোর পর বস্তির গলি থেকে বের হয়ে তারা পিক-আপ পয়েন্টে পৌঁছল। একটা বন্ধ রেশন দোকানের সামনে। স্যাম গাড়ি নিয়ে ইঞ্জিন চালু করে সেখানেই অপেক্ষা করছিল। এলেনা আর রিয়াও বসে আছে ভিতরে।

তূর্য আরভকে নামিয়ে দিল পিছনের সিটে। বলল, ‘লাগেনি তো আরভ?’

‘না না! পাপা কোথায়?’

‘এই তো এবার তোমার পাপার কাছেই যাবে তুমি। ব্রেভ বয়!’ হাত বাড়িয়ে আরভের চুল ঘেঁটে দিল রিয়া।

শ্যাডো তাড়া লাগাল, ‘হারি আপ, এখান থেকে বেরোতে হবে।’

স্যাম গাড়িতে স্টার্ট দিল। গাড়ি দ্রুত বস্তির বাইরে চলে গেল। পেছনে সুখরান কলোনি থেকে ধোঁয়া উঠছে তখনও। অস্পষ্ট মানুষের কোলাহল ভেসে আসছে। কিন্তু তারা এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ দূরত্বে।

গাড়ি কলকাতার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল। বৃষ্টি থেমে এসেছে। আকাশে মেঘ সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। চাঁদ তার নরম আলো জ্বালিয়ে উঁকি দিচ্ছে। আপাতত আরভ ফিরে যাবে তার বাবার কাছে অন্য কোনও সেফ হাউজে। আর তারা যাবে তাদের বেসে। এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি।

আজ অমাবস্যা। মাথার উপরের ঘন কালো মখমলি আকাশে তারা ঝিকমিক করছে। তূর্য দোতলা সংলগ্ন ঝুলন্ত কার্নিসের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে একদৃষ্টে আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ পিছন থেকে খচমচ আওয়াজ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখল, পাশে এসে বসেছে শ্যাডো। হাতে দুটো বিয়ারের বোতল। একটা বোতল তূর্যর দিকে এগিয়ে দিল সে। তূর্য হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিয়ে তাতে চুমুক দিল। কতদিন পর অ্যালকোহলের স্বাদ পেল সে।

বেশ খানিকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। তারপর একসময় শ্যাডো নিজেই নৈঃশব্দ্য ভেঙে বলে উঠল, ‘জানেন তূর্যবাবু, ছোটবেলায় এভাবেই আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও বা সারারাত। রাতের আকাশ আমাকে বরাবরই আকর্ষণ করে। আমার মনে হয়, পৃথিবীতে মহাকাশের মতো রহস্য ধারণ করার ক্ষমতা আর কারওর নেই।’

‘হ্যাঁ। আমি বাবার সঙ্গে রাতের পর রাত আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম। রানাঘাটের আকাশ কলকাতার মতো ধোঁয়াটে ছিল না। বাবা আমাকে নিজে হাতে করে চিনিয়েছিলেন সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ বা আকাশগঙ্গা। তারপর আমি যখন ক্লাস এইটে উঠি, তখন আমাকে একটা দূরবিন কিনে দিয়েছিলেন। তেমন কিছু আহামরি দূরবিন নয় অবশ্য। তবে রাতের পর রাত সেটাই চোখে দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম ওই আকাশের দিকে। চোখ বুজে কল্পনা করতাম যে আমার মাথার উপরের এই আকাশটা শুধুই শূন্য, যত দূর অবধি যাব শুধুই অনন্ত, আমার কল্পনাও যেন কোথাও একটা গিয়ে ধাক্কা খেত।’

শ্যাডো হাসল। বলল, ‘সেটা মহাকাশের নয়, আপনার কল্পনার অক্ষমতা। আমার ব্যাপারটা আবার একটু অন্যরকম। আমি খালি মনে করতাম, এই রাত্রিবেলার ওই দূরের কালো আকাশের ওপারে আরও একটা সূর্য আছে। আর একটা কালো চাদর দিয়ে যেন কেউ সেই সূর্যটাকে আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছে। সেই কাপড়ের ছোট্ট ছোট্ট ফুটিফাটা গলে তার আলো অনধিকার প্রবেশ করছে আমাদের পৃথিবীতে। তাদেরই আমরা তারা ভাবছি।’

তূর্য শুনে সশব্দে হেসে ওঠে। তার হাসিতে যোগ দেয় শ্যাডো। হাসতে হাসতেই জিগ্যেস করে, ‘কাল থেকে আমাদের আরও কঠিন একটা মিশন শুরু। এজেন্ট মোহিনীর লুকিয়ে রাখা পেনড্রাইভ খুঁজে বের করে প্রমাণ জোগাড় করা এবং তারপর এই পুরো শেডি ডিলটা যে করে হোক ক্যানসেল করানো। আরভের এক্সট্র্যাকশনের থেকেও বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে এই লাস্ট মিশনটা। নার্ভাস লাগছে?’

তূর্য কথার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বোতলে চুমুক দেয়। তারপর বলে, ‘আপনাদের কাছে হয়তো এটা জাস্ট অ্যানাদার মিশন। আপনাদের এমপ্লয়ারদের হাতে জিনিসটা তুলে দিয়ে মিশন কমপ্লিট করে আপনারা পরের মিশনের জন্য নিজেদের তৈরি করবেন। কিন্তু আমার কাছে এই মিশন মোটেও তেমন নয়। আমি এই মিশনে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রত্যেকটা পদক্ষেপে নিজের বিবেকের সঙ্গে লড়াই করে চলেছি। আমি একজন সামান্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ। “মিশন ইম্পসিবল”-এর টম ক্রুজ নই। তাছাড়া আমরা এই মিশনে প্রয়োজনে মানুষের জীবন নিয়ে নিই অবলীলায়। এই যে সেদিন বোমগুলো ফাটল বিল্ডিংয়ে, কে জানে কতজন মারা গেল! এই মানুষের জীবন নেওয়াটা আইনগত বা নৈতিক দিক থেকে মোটেও স্বচ্ছ কি?

‘প্রত্যেকদিন সকালবেলায় ঘুম ভাঙার পর আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রাখতে পারি না। আমার অবচেতন মন সবসময় আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি একজন খুনি। আবার যে যে মুহূর্তে আমার চরম প্রাণসংশয় ঘটেছে, আপনিই এসে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। কতকটা সেই কৃতজ্ঞতাই আমাকে এই মিশনের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে…’

কথা বলতে বলতে তূর্য হঠাৎ চুপ করে যায়। শ্যাডো তার কথায় মৃদু হাসে। তারপর বলে, ‘এই মিশন আমার কাছে জাস্ট অ্যানাদার মিশন নয় তূর্য। আমি জাত সৈনিক। খুব অল্প বয়সে “র” জয়েন করার পর থেকে একের পর এক যুদ্ধ দেখে আসছি, লড়ে আসছি। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দুই পক্ষের মধ্যে এক পক্ষের হয়ে অস্ত্র তুলে নিতে নিতে আমার মধ্যের বিবেকটা হয়তো বহুদিন আগেই মারা গিয়েছে। যুদ্ধের সময় কোনও ন্যায়-অন্যায় থাকে না। কোনও নিয়ম থাকে না। কোনও আইন থাকে না। যুদ্ধের সময় শুধু একটাই লক্ষ্য থাকে, যে কোনও উপায়ে প্রতিপক্ষের পরাজয়।

‘যখন প্রথমবার আমি কোনও মানুষের প্রাণ নিই, তখন আমার বয়স… বাইশ কি তেইশ। আমার ছুরির ফলা লোকটার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল। সেই মুহূর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে আমি থরথর করে কেঁপেছি। আমার মনে হয়েছিল, ফলাটা লোকটার বুকের ভেতর থেকে একটানে বের করে আনলেই লাল রক্তের ধারা গলগল করে ছিটকে পড়বে মাটিতে। চারপাশ রক্তে লাল হয়ে যাবে। আমার হাত কাঁপছিল। তবু আমি কাঁপা কাঁপা হাতেই চোখ বন্ধ করে একটানে বের করে আনলাম আমার ছুরিটা। প্রাণহীন লাশটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ধপাস করে। আমি তখনও চোখ খুলিনি। কিছুক্ষণ পরে অনুভব করলাম, আমার পায়ের তলায় চ্যাটচ্যাটে রক্তের স্রোত।

‘এর পরেরবার যখন আবার কারোর প্রাণ নিতে হল, তখন আগের তুলনায় কুণ্ঠা কিছুটা কমে এসেছিল। এবার আর আমাকে চোখ বন্ধ করতে হল না। চোখের সামনে দেখলাম লোকটা কাতরাতে কাতরাতে ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। তারপর আবার, তারপর আবার… বারবার একের পর এক অগুনতি মানুষকে নিজের এই দুই হাতে খুন করে এসেছি আমি। কিন্তু জানেন, এতকিছুর পরেও আমি কীভাবে প্রতি রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি? কারণ দেশের শত্রুকে, আপনার মাতৃভূমির শত্রুকে পরাজিত করে মেরে ফেলা কর্তব্য, খুন নয়।

‘আমি শুধু আপনাকে একটাই উপদেশ দিতে পারি তূর্যবাবু। যুদ্ধের সময় বিপক্ষের প্রাণ নিতে আপনি বাধ্য। নইলে সে কিন্তু আপনার প্রাণ নিতে বিন্দুমাত্র হেসিটেট করবে না।’ কথা শেষ করে তূর্যর উত্তরের অপেক্ষা না করেই সেখান থেকে উঠে গেল শ্যাডো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *