সপ্তম পর্ব – লাল গ্যাসবেলুন
ঘণ্টা দেড়েক পর তূর্য সেখান থেকে সরাসরি চলে গেল দক্ষিণ কলকাতার একটা ছোট্ট ক্যাফেতে। ঘড়িতে এখন রাত ন’টা। ক্যাফের কোনার একটা টেবিলে বসেছিল রিয়া। তার পাশেই ল্যাপটপ আর কফির কাপ নিয়ে একজন অল্পবয়স্ক ছোকরা বসে আছে। বয়স মেরেকেটে কুড়ি-পঁচিশ হবে। তূর্য এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়াতেই রিয়া ছেলেটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, ‘এই তো এসে গেছেন। শুনুন, একজনের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই। এ হল স্যাম। বয়স পঁচিশ হলে কী হবে, হ্যাকিংয়ের দুনিয়ায় ইনি একেবারে শাহরুখ খান।’
তূর্য রিয়াকে একটু তফাতে ডেকে নিয়ে গিয়ে জিগ্যেস করল, ‘একে আপনি কতটা ভালো ভাবে চেনেন? ক্যান উই ট্রাস্ট হিম?’
‘নিঃসন্দেহে। আমার সঙ্গে বেশ কিছুদিন হল কাজ করছে। ওর দেওয়া ইনফরমেশন লিটারেলি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে। হি ইজ আ জিনিয়াস!’
তূর্য এবার অসম্ভব রোগা ছেলেটার দিকে ভালো করে তাকাল। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। চুল এলোমেলো। হাবিজাবি লেখা কালো টি-শার্টটা দেখে মনে হচ্ছে যেন হ্যাঙারে জামা ঝুলছে।
‘হ্যালো!’ স্যাম মৃদু হেসে বলল, ‘রিয়াদি আপনার কথা বলেছে। আপনি নাকি মর্ডান-ডে শার্লক হোমস!’
হঠাৎ এরকম অদ্ভুত কমপ্লিমেন্টে তূর্য সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে বোকার মতো হাসল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ফোন থেকে একটা ভিডিও ক্লিপ পজ করে স্ক্রিনশট নেওয়া ছবি দেখিয়ে বলল, ‘এই দ্যাখো। মিছিলের ফুটেজ। আর এই যে লোকটাকে দেখছ, এর পরিচয় বের করতে হবে। ফেসিয়াল রেকগনিশন রান করিয়ে দিয়ে বিভিন্ন ডেটাবেস ঘেঁটে দ্যাখো তো এর সন্ধান মেলে কিনা…’
স্যাম ভিডিওটা মনোযোগ দিয়ে দেখল। তারপর বলল, ‘পারব। ডার্ক ওয়েবে আমার কিছু কানেকশন আছে। একটু মাল্লু খরচা হবে, কিন্তু কাজ হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, সময় লাগবে। এসব কাজের জন্য একটু ধৈর্য ধরতে হয়।’
‘ঠিক আছে। তবে খবর পেলেই ইনফর্ম কোরো।’
‘ওকে বস। আর কিছু?’
‘হ্যাঁ, আরেকটা কাজ আছে।’ তূর্য গলাটা আরেক পরদা নামিয়ে বলল, ‘মাতৃশক্তি নামে একটা এনজিও আছে। এদের ব্যাঙ্ক ডিটেইলস বের করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নাকি এদের ফান্ড আসে। কত আসে, কারা পাঠায়, সেই টাকা কীভাবে অ্যালোকেট হয়—সব তথ্য চাই।’
‘ইন্টারেস্টিং। এনজিও-র রেজিস্ট্রেশন নম্বর জানেন? অথবা যে কোনও একজন অথোরাইজড সিগনেটরির ডিটেইলস? তাহলে ব্যাঙ্ক ডিটেইলস ট্রেস করা একটু সহজ হবে।’
‘না। যদি ওদের কোনও অফশোর অ্যাকাউন্ট থাকে, সেটাই মেনলি টার্গেট করো। শুধু ওদের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট না। ওখানে ফাউল প্লে থাকার সম্ভাবনা কম। নিশ্চয়ই রেগুলার অডিট হয়। ওই অডিট রিপোর্ট যা মিস করবে, আমার সেরকম তথ্য চাই। ডিগ ডিপার।’
‘জো হুকুম আকা!’ নাটকীয় ভঙ্গিতে স্যালুট করল স্যাম।
‘আর রিয়া,’ তূর্য এবার রিয়ার দিকে ফিরল, ‘আপনার কাজ হল, মিনিস্টার দুবের বিশ্বস্ত মানুষগুলোর একটা কমপ্লিট লিস্ট তৈরি করা। ডান হাত-বাম হাত সবার ডিটেইলস। কে কোথায় থাকে, কী করে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, যত বেশি তথ্য পাবেন, তত ভালো।’
রিয়া মৃদু হাসল, ‘এটা চাপের কিছু নয়। আমার কিছু সোর্স আছে পলিটিকাল সার্কেলে। আরামসে বের করতে পারব।’
‘ইনফরমেশন বের করাটা বড় ব্যাপার না। কিন্তু আমরা এতটাই ভয়ংকর একটা খেলায় নামছি, যে আমাদের প্রতিটা স্টেপ খুব সাবধানে ফেলতে হবে। আপনার ডান হাত যেন জানতে না পারে, বাম হাত কী করতে চলেছে।’
‘ডোন্ট ওয়ারি। আমি একজন সোর্সের ওপর পুরো দায়িত্ব দেব না। এক-একজনের থেকে এক-একটা ইনফরমেশন কালেক্ট করব। তারপর সেগুলো একসঙ্গে জুড়ে পুরো ছবিটা রেডি করব।’
‘গুড।’
তূর্য উঠে পড়ছিল, রিয়া তাকে বাধা দিয়ে জিগ্যেস করল, ‘তূর্য, আপনি কি নিশ্চিত যে প্রিয়া এই সবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না? মানে, এমনও তো হতে পারে যে তিনি জেনে বুঝে এই এনজিও-র সঙ্গে কোনও শেডি কাজ করছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে কোনও কারণে বনিবনা হয় না, আর সেই কারণেই…’
তূর্য চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘একদমই অসম্ভব নয়। তদন্তে নেমে কাউকেই প্রথম থেকে ক্লিনচিট দেওয়া যায় না। এমনকী নিজের ক্লায়েন্টকেও না। আমার কাছে পুরো ছবিটা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এখনও অবধি যা ইনফরমেশন পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে প্রিয়া হয়তো এমন কিছু জেনে ফেলেছিল, যা তার জানার কথা ছিল না। এমনকী পুরো ব্যাপারটায় যে মাতৃশক্তি জড়িত আছেই, সেটাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অনেক কিছুই হয়ে থাকতে পারে, যেটা এখনও আমরা জানি না। তাই এখনই গেসিং গেম খেলে কাজ নেই। আমরা অঙ্কের একটা একটা করে স্টেপ সলভ করতে থাকি। আল্টিমেটলি উত্তর মিলে যাবেই।’
রিয়া মাথা নাড়ল। তারা তিনজন উঠে দাঁড়াল। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তূর্য চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল। রাত্রি নেমে এসেছে শহর কলকাতার বুকে। শহরের কোলাহল খানিক স্তিমিত হয়ে এসেছে। তবে, তূর্যর ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বারবার সাবধান করে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, এই তদন্ত তাকে এমন এক জগতে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে সে খুবই সামান্য একটা ধূলিকণা মাত্র। যেখানে একজন সাধারণ গৃহবধূর মৃত্যু হয়তো একটা বিশাল ষড়যন্ত্রের খুব ছোট্ট একটা অংশ। কিন্তু সেখানে আঘাত করলেই পুরো ব্রহ্মাণ্ডে একটা মহাবিস্ফোরণ ঘটবে। সেই মহাবিস্ফোরণের উত্তাপ সহ্য করার মতো ক্ষমতা কি আদৌ রয়েছে তার?
স্ট্রিটলাইটের ঘোলাটে হলুদ আলোয় ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে তূর্য। দু’পাশের বাড়িঘরের জানালা চুঁইয়ে আসা আলোগুলোও নিভে যাচ্ছে একে একে। মরা চাঁদের ফ্যাকাসে আলো এই ঘিঞ্জি শহুরে রাস্তা আলোকিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। অন্ধকার ভীষণ প্রিয় তূর্যর। দিনের শেষে যখন চেনা শহরটা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন অন্ধকার কোণ থেকে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে একটা অন্য অচেনা শহর। সেই শহর নৃশংস, একরোখা। অনেকটা তার মতোই। এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে তাই এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পায় সে।
রাস্তার উলটোদিকে একটা ছোট্ট বার। কোলাপসিবল গেট অর্ধেক খোলা। সরু সিমেন্টের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। কাচের দরজা খুলে ঢুকতেই একটা কড়া ঝাঁঝালো গন্ধ এসে ঝাপটা মারে নাকে। কোণের একটা ছোট্ট টেবিলে বসে পড়ে সে। একটু পরেই সম্ভবত বার বন্ধ হয়ে যাবে। অসময়ে প্রায় সব টেবিলই ফাঁকা।
ফাঁকা টেবিলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল তূর্য। সন্ধের অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের পেছনে ওই সাদা দেওয়ালটায় মানুষের ছায়ারা ভিড় জমায়। টুং টাং কাচের গ্লাসের ঠোকাঠুকির আওয়াজে নেশাতুর হয়ে যায় ঘরের ওই নীল আলোটা। সোডার বোতল খোলার চাপা শব্দ, গুঞ্জন তোলে বাতাসে। তূর্য হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডেকে লার্জ রয়্যাল স্ট্যাগ অর্ডার করে। প্রথমে এক পেগ, পরে একসঙ্গে আরও দুটো।
ঘণ্টাখানেক পর বেশ কয়েক পেগ রঙিন জলের মাদকতাকে সঙ্গী করে সরু সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে তূর্য। ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে ধীরে ধীরে। ঘড়িতে এগারোটা বেজেছে। রাস্তার পাশে ছোট্ট ঠেলাগাড়ি, তাতে থরে থরে প্লাস্টিকের সানগ্লাস সাজানো রেয়েছে। একটা বাচ্চা তার মায়ের কাছে বায়না করছে সেই সানগ্লাসের জন্য। হাতে ধরা সদ্য কেনা লাল গ্যাসবেলুন।
তিতলি গ্যাসবেলুন বড় ভালোবাসে। হঠাৎ তূর্যর ইচ্ছে করে ওইরকম একটা গ্যাসবেলুন কিনতে। রাস্তার লোকে তাকাবে? সে তাকাক! ওই তো রাস্তার পাশে সেই বেলুনওয়ালা দাঁড়িয়ে ছোট্ট সবুজ গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে বেলুন ফোলাচ্ছে। সে স্খলিত পায়ে এগিয়ে যায় বেলুনওয়ালার দিকে।
হাতে লাল গ্যাসবেলুন ধরে সন্ধের আধো অন্ধকার ফুটপাত ধরে হাঁটছে তূর্য। রাস্তার দু’পাশের নিয়ন আলোগুলো জ্বলে উঠেছে একসঙ্গে। ঝকঝকে বিজ্ঞাপনে ঢাকা পড়ে গেছে একটা গোটা শহর। হাওয়া বইছে মৃদু মৃদু। সেই হাওয়া তূর্যর একমাথা কোঁকড়ানো চুল ঘেঁটে দিয়ে যাচ্ছে।
রাতের শিরশিরে ঠান্ডায় ভর করেই একরাশ মনখারাপি স্মৃতি আছড়ে পড়ে তার চোখে-মুখে। চোখের সামনে হঠাৎ সবকিছু কেমন দুলে ওঠে। দৃষ্টি ঘষা কাচের মতো আবছা হয়ে যায়। বুকের ভেতরের নরম মাটিতে কেউ যেন ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তবু সে থামছে না। টলোমলো পায়ে ফুটপাত ধরে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। ওই দূরে ল্যাম্পপোস্টের নীচে কি কেউ দাঁড়িয়ে আছে? লাল সালোয়ার, সরু ফ্রেমের চশমা… সুলগ্না…
তূর্য ভেজা গলায় প্রশ্ন করে, ‘তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে সুলগ্না? আমার কি আসতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল?’
কোনও উত্তর আসে না।
স্যামের অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার সময় একটু থমকে দাঁড়াল তূর্য। এটা ঘর নাকি গুহা? ঘরের জানালাগুলো মোটা পর্দায় ঢাকা। বাইরের আলোর বিন্দুমাত্র প্রবেশাধিকার নেই। চারপাশে ছড়িয়ে আছে মনিটর। ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত খান পাঁচেক। প্রতিটায় ভাসছে কোড, গ্রাফ আর নানারকম ডেটা স্ট্রিম। ঘরের তাপমাত্রা অসম্ভব কমিয়ে রেখেছে শক্তিশালী শীততাপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র।
‘বাপ রে! তোমার এখানে আসলে পরেরবার সোয়েটার পরে আসতে হবে।’
স্যাম বসেছিল তার মূল ওয়ার্কস্টেশনে। পাশাপাশি রাখা তিনটে মনিটরের সামনে। তূর্যর কথা শুনে জবাব না দিয়ে সে নিঃশব্দে মুচকি হাসল।
‘ওহ! এসে গেছেন?’ রিয়া বলল। ‘স্যাম বলছে, ওয়েন ব্রাউনের ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে পেরেছে।’
‘কে ওয়েন ব্রাউন?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল তূর্য।
‘আরে রিয়াদি, হঠাৎ এভাবে বললে মানুষ বুঝবে কী করে? লেট মি এক্সপ্লেইন।’ স্যাম ঘুরে বসল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, ‘আপনি যে ভিডিও ক্লিপটা দিয়েছিলেন, সেটা দিয়ে প্রথমে আমি এবং আমার ডার্ক ওয়েবের কন্ট্যাক্টরা বিভিন্ন দেশের সরকারি ডেটাবেসগুলো ঘেঁটেছি। যেমন ইন্টারপোল, এফবিআই, সিআইএ-র পাবলিক রেকর্ডস। কিছুই তেমন পাইনি। তারপর আরও গভীরে গেলাম। ডার্ক ওয়েবের কিছু মার্কেটপ্লেস আছে, যেখানে মার্সেনারি, হিটম্যান, প্রাইভেট মিলিটারি কন্ট্র্যাক্টরদের তথ্য পাওয়া যায়।’
স্যাম এবার একটা ফাইল ক্লিক করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা ছবি। ছবিতে মিছিলের ভিডিও থেকে ক্যাপচার করা সেই সামরিক পোশাকের লোকটা। তার পাশে আরেকটা ছবি। একই লোক, কিন্তু মার্কিন মেরিন ইউনিফর্মে।
‘মিট ওয়েন ব্রাউন!’ স্যাম ঘোষণার সুরে বলল, ‘এক্স-মেরিন কমান্ডো। আফগানিস্তান আর ইরাকে দু-দুটো ট্যুর অফ ডিউটি করেছে। অসাধারণ রেকর্ড। দু-হাজার এগারো সালে সিআইএ-তে জয়েন করে। স্পেশাল অপারেশনস ডিভিশন। মিডল ইস্ট আর ইস্ট ইউরোপে বেশ কিছু কোভার্ট মিশনে ছিল।’
তূর্য স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, ‘তারপর?’
‘তারপর হঠাৎ করেই উধাও। দু-হাজার কুড়ি সালে হঠাৎই সিআইএ-র রেডারের বাইরে চলে যায়। অফিশিয়াল কারণ বলা হয়নি, কিন্তু ডার্ক ওয়েবের কিছু ফোরামে যে গসিপ পাওয়া যায়, তাতে বলা হচ্ছে উনি একটা অপারেশনে কিছু বড়সড় প্রবলেম করেছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার জন্য ওকে সাসপেন্ড করে। সেই থেকে ব্রাউন রোগ হয়ে যায়।’
‘সেখান থেকেই মার্সিনারি গ্রুপ জয়েন করে?’ জিগ্যেস করে রিয়া।
‘হ্যাঁ। প্রায় তিন বছর পুরো অফ-দ্য-গ্রিড। কোনও ব্যাঙ্ক ট্রানজ্যাকশন নেই। কোনও সোশ্যাল মিডিয়া নেই। এমনকী কোনও হোটেল বুকিং পর্যন্ত নেই। যেন জলজ্যান্ত লোকটাই পৃথিবী থেকে মুছে গেছে। কিন্তু দু’বছর আগে…’
স্যাম এবার টর ব্রাউজার খুলল। স্ক্রিনজুড়ে দেখা গেল একটা ডার্ক ওয়েব পেজ। পেজের শীর্ষে একটা লোগো। একটা ঈগল, তার ঠোঁটে ধরে রাখা একটা তলোয়ার। নীচে লেখা: ROGUE – Private Military Solutions.
‘এটা কী?’
‘ওয়েন ব্রাউনের প্রাইভেট আর্মি।’ স্যাম বলল, ‘দু’বছর আগে ব্রাউন ডার্ক ওয়েবে রিসারফেস করে এই নাম দিয়ে। তার আন্ডারে প্রায় পঞ্চাশজন এক্স-মিলিটারি, এক্স-ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভ আছে। বিভিন্ন দেশ থেকে। আমেরিকান, ব্রিটিশ, ইসরায়েলি, রাশিয়ান। সবাই টপ-টায়ার প্রফেশনাল। এদের রেকর্ড দেখলে বুঝবেন, এরা শুধু মাসল পাওয়ার নয়। এরা স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্ল্যানার এবং ট্যাকটিকাল কমব্যাটে এক্সপার্ট।’
‘প্রাইভেট আর্মি? মানে এরা ভাড়াটে সৈন্য?’ জিগ্যেস করে তূর্য।
‘হ্যাঁ, ভাড়াটে বলতে পারেন, কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ নয়।’ স্যাম ব্যাখ্যা করল, ‘সাধারণ মার্সেনারিরা যে-কারোর জন্য কাজ করে, যদি টাকা পায়। কিন্তু রোগ খুবই সিলেক্টিভ। এরা শুধু হাই-প্রোফাইল, হাই-পেমেন্ট মিশন নেয়। আর এদের সাফল্যের হার অসাধারণ। ডার্ক ওয়েবের ফোরামে যে রিভিউ পাওয়া যায়, সেখানে এদের রেটিং প্রায় পারফেক্ট।’
তূর্য স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই প্রশ্ন করল, ‘এরা কী ধরনের মিশন করে?’
‘দেখুন। এই লিস্টটা আমি বিভিন্ন সূত্র থেকে জোগাড় করেছি। নিশ্চিত করে বলা যায় না, কিন্তু এগুলো রোগের কাজ বলেই সন্দেহ করা হয়। মায়ানমারে একটা পলিটিকাল এক্সট্র্যাকশন। একজন বিরোধী নেতাকে হোস্টাইল সিচুয়েশনে দেশ থেকে বের করে আনা। লোকাল ডনদের বিরুদ্ধে তানজানিয়ায় একটা ডায়মন্ড মাইনের সিকিউরিটি অপারেশন। কলম্বিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্ট্রাইক। একজন রিচ বিজনেসম্যানের ছেলেকে অ্যাবডাক্ট করা। প্রতিটা মিশন মিলিটারি প্রিসিশনে করা, জিরো মিসটেকস।’
‘বাপ রে! এদের তো অ্যাফর্ড করাও বেশ চাপের ব্যাপার।’ তূর্য বলল।
‘যদি পাঁচশো কোটি ডলার ঝুলে থাকে, তাহলে এদের অ্যাফর্ড করা কোনও ব্যাপার না। জাস্ট আ সিম্পল ইনভেস্টমেন্ট।’ রিয়া জবাব দেয়।
‘ঠিক তাই।’ স্যাম সায় দিল, ‘আর এদের হায়ার করার সবচেয়ে সুবিধার ব্যাপার হল, এদের ট্রেস করা প্রায় অসম্ভব। এরা কোনও ফিজিকাল ট্রেল রাখে না। মিশনের পর সব প্রমাণ মুছে ফেলে। ডিজিটাল কমিউনিকেশন করে এনক্রিপ্টেড চ্যানেলে, যেটা ক্র্যাক করা অসম্ভব। পেমেন্ট নেয় ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। মাল্টিপল ওয়ালেটের মধ্যে দিয়ে ট্রানজ্যাকশন করে, যাতে ট্র্যাক করা না যায়।’
তূর্য একটা চেয়ার টেনে বসল। তার মাথায় চিন্তাগুলো দ্রুত ঘূর্ণিঝড়ের মতো পাক খাচ্ছে। সে বলল, ‘মানে তুমি বলতে চাইছ, আমরা কোনওভাবেই এদের সঙ্গে দুবেকে কানেক্ট করতে পারব না। তাই তো?’
‘এক্স্যাক্টলি। ডার্ক ওয়েবে রোগের যে পেজ আছে, সেখানে কন্ট্যাক্ট করার একটা মাত্র উপায় হল একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সিস্টেম। কিন্তু সেটা ওয়ান-ওয়ে। মানে আপনি মেসেজ পাঠাতে পারবেন, কিন্তু তারা রিপ্লাই করবে কিনা, সেটা তাদের ইচ্ছে। আর যে ক্লায়েন্টরা তাদের হায়ার করে, তাদের পরিচয় তারা কখনওই প্রকাশ করে না।’
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তবে কি আমরা আটকে গেলাম?’
তূর্য মাথা নাড়ল, ‘না, এখনও আটকে যাইনি। পথটা যে কঠিন, সেটা নিশ্চয়ই আগেই জানতেন। এখন ধৈর্য হারালে চলবে না। আমাদের কাছে এখন একটাই অপশন আছে। যদি দুবে রোগকে হায়ার করে থাকে, তাহলে যতক্ষণ না ডিলটা সাইন হচ্ছে, ততক্ষণ ব্রাউনের পুরো টিম এখানেই থাকবে। কোনওভাবে যদি ফিজিকালি ওদের ট্রেস করা যায়…’
‘এত সহজ না তূর্যদা। তবু আমি যতদূর সম্ভব চেষ্টা করছি। যদি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ছেড়ে যায়, তাহলে কাজটা কঠিন হবে না। কিন্তু রোগ এত কাঁচা কাজ করে না।’
স্যামের কথাটা যে সত্যি, তা তূর্য জানে। তবু এই অসম লড়াইয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। তবে ঈশ্বর যে হাল না ছাড়া মানুষদের সর্বদা কৃপাদৃষ্টিতে দ্যাখেন, তার প্রমাণ পেল তূর্য পরেরদিন সকালের একটা ফোন কলে।
সকাল সকাল অমলেটটা দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তূর্যর। ডিমের অমলেট তূর্যর ভীষণ প্রিয়। গতকাল অরিন্দমের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার সময় অরিন্দম জোর করেই কিছু টাকা গুঁজে দিয়েছিল তূর্যর হাতে। তূর্য বাধা দিয়েছিল বটে! তবে সে নিজেও জানে, সেই প্রতিবাদ তেমন জোরালো ছিল না। কাল রাতেই বাড়ি ফিরে কিছু টাকা ছাতুদার হাতে দিয়ে সে বলেছিল, ‘ছাতুদা, কাল ক’টা ডিম এনো, বুঝলে? আর একটু বাটার এনো, আর এক প্যাকেট ব্রেড। ব্রেকফাস্টে ব্রেড, বাটার আর ডিমের সানি সাইড আপ। কেমন?’
‘আমি ওসব সানি দেওল-টেওল পারব না। ওই অনাসৃষ্টি করতে হলে সকাল সকাল উঠবে, তারপর নিজে রান্না করবে। আমি ববি দেওল করে দেব। মানে যা দেব, বোবার মতো মুখ বুজে তাই খেয়ে নেবে।’
‘ধ্যাৎ! মুডের বারোটা বাজাতে তোমার জুড়ি মেলা ভার। কাল দুপুরে একটু কচি পাঁঠার ঝোল অন্তত…’
‘হবে না। সেদোর দোকানে ধার আছে বললাম না? ওটা আগে মেটাব। তারপর ঘরে ভালো করে চাল ডাল তুলে রাখব। তিতলি মামনির স্কুলের কত টাকা বলেছিল যেন? সব এইবেলা মিটিয়ে রাখতে হবে। আবার কবে টাকার মুখ দেখব তার ঠিক নেই…’
তূর্য বুঝল, এই লোকের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। সেদিনের মতো রণে ভঙ্গ দিয়ে শুতে গিয়েছিল তূর্য।
কিন্তু আজ ডিমটার দিকে তাকিয়ে তার মুখটা কেমন যেন তেতো হয়ে গেল। অমলেটের ওপর মোটা বাদামি আস্তরণ পড়েছে। ছাতুদা ডিমটা এত বেশি ভেজেছে যে সেটা ডিম কম, চামড়া বেশি মনে হচ্ছে।
‘ছাতুদা!’ তূর্য চেঁচিয়ে ডাকল, ‘এটা ববি দেওল হয়নি, ববি দেওয়াল হয়ে গেছে। লোকের মাথা ঠুকে দিলে মাথা ফেটে যাবে।’
রান্নাঘর থেকে ছাতুদার গলা ভেসে এল, ‘সক্কাল সক্কাল রবীন শেঠ গুন্ডা নিয়ে এসেছিল ঝামেলা করতে। বলে গেছে, সাতদিনের মধ্যে টাকা ফেরত না দিলে হাজতের ঘানি টানাবে। ডিমটা বরং পকেটে রেখে দাও। চারিদিকে যা কেচ্ছা করে রেখেছ, বাইরে বেরোতে গেলে লোকে তাড়া করবে। তখন ওইটা ছুড়ে মেরো।’
‘এহ! মামারবাড়ি নাকি? আসুক শালা, দেখি ক’বাপের ব্যাটা…’
কথাটা শেষ করতে পারল না তূর্য, তার আগেই ফোনটা বেজে উঠল। ট্রু-কলারে নাম ভেসে উঠেছে দ্বৈপায়ন সাহা, শ্যামপুকুর পিএস।
দ্বৈপায়নকে সে বলে রেখেছিল, কেসের কোনও নতুন আপডেট এলে তাকে ইনফর্ম করতে। কিন্তু হঠাৎ এত সকালে ফোন? এর মানে নিশ্চয়ই কেসটা কোনও আনএক্সপেক্টেড টার্ন নিয়েছে।
‘হ্যালো?’
‘তূর্যবাবু, আপনি কি এখনই একবার থানায় আসতে পারবেন?’ দ্বৈপায়নের গলায় চাপা উত্তেজনা।
‘কেন? কী হয়েছে?’
‘ফোনে বলা যাবে না। আপনি প্লিজ আসুন। কিন্তু থানার ভেতরে নয়, বাইরে। রাস্তার উলটোদিকে যে চায়ের দোকানগুলো আছে না? ওখানে। এসে আমায় একবার কল করবেন।’
‘বেশ। তাহলে দেখা হলেই বাকি কথা হবে।’
‘হ্যাঁ। কতক্ষণে পৌঁছতে পারবেন?’ জিগ্যেস করল দ্বৈপায়ন।
‘ম্যাক্সিমাম আধঘণ্টা।’
‘ঠিক আছে। আমি আপাতত তাহলে থানাতেই থাকছি।’
‘ওকে ডান।’
রাস্তায় বেরিয়ে ট্যাক্সি পেতে ঠিক মিনিট পাঁচেক লাগল। অন্যদিন হলে হয়তো এই রাস্তাটুকু হেঁটেই চলে যেত। কিন্তু আজ পরিস্থিতি অন্য। মহানগরীর রাস্তায় সকালের ট্রাফিক ইতিমধ্যে তার জাদু দেখাতে শুরু করেছে। তূর্যর মাথায় নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। দ্বৈপায়নের গলার স্বর কেমন অন্যরকম শোনাল। কিন্তু কেন? এছাড়া ফোনে কথা না বলতে চাওয়া, থানার বাইরে দেখা করা… সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তিকর আশঙ্কা জন্ম নিচ্ছে তূর্যর মস্তিষ্কে।
ট্যাক্সি যখন শ্যামপুকুর থানার সামনে পৌঁছাল, তূর্যর হাতঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা বাজে। থানার সামনে ইতিমধ্যে লোকজনের ভিড় জমতে শুরু করেছে। তূর্য রাস্তা পার হয়ে চায়ের দোকানের দিকে গেল। ঠেলাগাড়ির ওপর বসা ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান। তূর্য দেখল, দোকানগুলোয় চায়ের পাশাপাশি সকালবেলা ডালপুরিও ভাজা হয়। কড়াইয়ে তেল টগবগ করছে। ডালপুরির গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। তূর্যর খুব ইচ্ছে হল ডালপুরি অর্ডার করতে। কিন্তু নিজের সেই ইচ্ছে সংবরণ করে সে দ্বৈপায়নের নম্বর ডায়াল করল।
দ্বৈপায়ন বোধহয় তার অপেক্ষাতেই ছিল। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট পরে সে নেমে এল নীচে। সিভিল ড্রেসে আজ একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে তাকে।
‘আসুন, তূর্যবাবু। একটু এদিকে আসুন।’ দ্বৈপায়ন তার দিকে এগিয়ে এল।
তারা দোকান থেকে একটু দূরে, ফুটপাতের একটা কোণে এসে দাঁড়াল। এখান থেকে থানাটা দেখা যায় না। তূর্য বুঝল, এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
‘কী ব্যাপার, স্যার? এত সিক্রেসি কেন?’ তূর্য সরাসরি জিগ্যেস করল।
দ্রুত একবার চারপাশে তাকিয়ে নিল দ্বৈপায়ন। তারপর নিচু স্বরে বলল, ‘একটা নতুন সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে।’
তূর্যর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। সে উত্তেজিত স্বরে জিগ্যেস করল, ‘আরভের?’
‘হ্যাঁ। হাওড়ার একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে লাগানো ক্যামেরা থেকে। গতকাল সন্ধ্যায় ফুটেজটা আমাদের কাছে এসেছিল। সেখানে দেখা যাচ্ছে…’
দ্বৈপায়ন থামল। তারপর আরও নিচু স্বরে বলল, ‘একজন বোরখা পরা মহিলা আরভকে নিয়ে একটা গলিতে ঢুকছে। আরভ তার সঙ্গে হাঁটছে বটে, তবে ওকে যে জোর করে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।’
‘সে কী! কোন গলি?’
দ্বৈপায়ন হঠাৎ একটু ইতস্তত করতে লাগল। তারপর থেমে থেমে বলল, ‘আসলে গলিটা সোজা চলে গেছে একটা বস্তির দিকে। কিন্তু জায়গাটা একটু প্রবলেম্যাটিক।’
‘প্রবলেম্যাটিক মানে?’
‘বস্তি মানে সুখরান কলোনি। রফিক খানের এলাকা।’
নামটা শুনে তূর্য চমকে উঠল। রফিক খান হাওড়ার সবচেয়ে কুখ্যাত সমাজবিরোধী নেতা। যার নাম শুনলে, পুলিশও স্টেপ নেওয়ার আগে দু’বার ভাবে। হাওড়ার একটা বিশাল অংশ তার নিয়ন্ত্রণে। মাদক, চোরাচালান, এমনকী খুনের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু সেসবের কখনও কোনও সলিড প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রুলিং পার্টির ছত্রছায়া আছে তার মাথার উপর।
‘তাহলে আপনারা সেখানে একটা এক্সট্র্যাকশন অপারেশন অ্যারেঞ্জ করতে পারেন না?’ অধৈর্য গলায় প্রশ্ন করে তূর্য।
দ্বৈপায়ন একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘সেটা আমি আগেই সুবিমল স্যারকে বলেছিলাম। কিন্তু উনিও কিছু করতে পারবেন না। পুরোটাই এখন এসটিএফ-এর হাতে। ওরা আরভের কেসটা টেকওভার করেছে।’
‘কখন?’
‘গতকাল রাতে। আমরা যখন ফুটেজটা নিয়ে উপরে রিপোর্ট করলাম, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই। দু-ঘণ্টার মধ্যে এসটিএফ-এর টিম এসে পুরো ফাইল নিয়ে চলে গেল।’
তূর্য হতবাক হয়ে গেল, ‘এসটিএফ? কেন? এটা তো একটা অপহরণের কেস। আপনারাই তো দেখছিলেন কেসটা।’
‘হয়তো শ্যামবাজারের টেররিস্ট অ্যাটাকের সঙ্গে রিলেটেড বলে। পুরো ব্যাপারটাই একটু কনফিউজিং তূর্যবাবু।’ দ্বৈপায়ন এবার একটু চাপা গলায় বলল, ‘উপর থেকে চাপও আসতে পারে। আসল কারণ বলা শক্ত।’
‘সেটা আপনি কীভাবে গেস করছেন?’
‘গেস নয়। এটা আমার ক্যালকুলেটেড কনক্লুশন। আমি যতদূর খবর পেয়েছি, কেসটা টেকওভার করার পরেই এসটিএফ ফুটেজটা ডেস্ট্রয় করে দিয়েছে। অফিশিয়ালি, এই ফুটেজ কখনও এক্সিস্টই করেনি। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ম্যানেজারকেও বলা হয়েছে, তার সিস্টেম থেকেও ফুটেজ ডিলিট করে দিতে। ওরা বলছে, এটা নাকি “সেন্সিটিভ ইনফরমেশন”। জনসমক্ষে আসলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।’
তূর্যর মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। সে বলল, ‘তাহলে আপনি এটা আমায় কেন বলছেন?’
দ্বৈপায়ন সরাসরি তূর্যর চোখের দিকে তাকাল। বলল, ‘কারণ আমি মনে করি, আপনার এটা জানা দরকার। আরভের বাবা আপনার ক্লায়েন্ট। আমার হাত-পা বাঁধা। কিন্তু আপনার নয়। আমারও আরভের বয়সি একটা ছেলে আছে। এত বড় সত্যিটা জানার পরেও যদি…’
‘আপনি জানেন তো এটা কতটা বিপজ্জনক? আপনার চাকরি পর্যন্ত যেতে পারে।’ ফিসফিস করে বলল তূর্য।
দ্বৈপায়ন এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিল না। শুধু চাপা গলায় বলল, ‘পারলে বাচ্চাটাকে রেসকিউ করুন তূর্যবাবু।’
‘থ্যাংক ইউ, দ্বৈপায়নবাবু। আপনি যে কী উপকার করলেন…’
‘দেখুন, আমার বিবেক যেটা বলেছে, আমি সেটাই করেছি। আপনি এবার দেখুন, কী করতে পারেন। তবে প্লিজ, যা করবেন খুব কেয়ারফুলি করবেন।’
তূর্য কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়াল।
তারপর ঘুরে হাঁটতে শুরু করল বাগবাজারের দিকে। সকালের রোদ এখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। শহর আরও ব্যস্ততর। তূর্য পকেট থেকে ফোনটা বের করে রিয়াকে একটা মেসেজ করল, ‘মিট মি এস্যাপ। কথা আছে।’
রিপ্লাই এল, ‘সেম হেয়ার। নিড টু টক। ফোর পিএম, কফি হাউজ।’
বিকেল চারটে বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি। কফি হাউজে ঢুকে তূর্য একটা কোণের টেবিল বেছে নিয়েছে। আগেরদিনের টেবিলটা খালি নেই। একজন অল্পবয়সি ছেলে সেখানে বসে খুব মন দিয়ে টেবিলের ওপর খোলা ইংরেজি বইয়ের পাতায় ডুবে আছে। এই সময়টায় কফি হাউজ মোটামুটি ভরা থাকে। তূর্য যেখানে বসেছে, সেই দিকটা তুলনামূলকভাবে একটু নিরিবিলি।
তূর্য সবে সে এবং রিয়া দুজনের জন্যই ব্ল্যাক কফি অর্ডার দিতে যাবে, তখনই ফোনটা বেজে উঠল। অরিন্দম। ফোনটা রিসিভ করতেই উলটোদিক থেকে ফোঁপানোর আওয়াজ ভেসে এল, ‘তূর্য… আমি অফিসে গিয়েছিলাম। তখন কেউ আমার ফ্ল্যাটে তালা ভেঙে ঢুকেছিল। সারা ঘর তছনছ করে দিয়ে গেছে।’
‘সে কী! তুই কী কী চুরি গেছে তার একটা লিস্ট…’
তূর্যর কথা শেষ হবার আগেই অরিন্দম বলল, ‘কিচ্ছু চুরি হয়নি। কিছুই নেয়নি। আমার ল্যাপটপ, ট্যাবলেট সবই ইনট্যাক্ট রয়েছে।’
‘ফ্ল্যাটের গার্ড কোথায় ছিল?’
‘ওই সময়ে সঞ্জীবদা, মানে আমাদের ফ্ল্যাটের গার্ড ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে যায়। বেশিক্ষণ না, এই ধর আধঘণ্টা।’
‘সিসিটিভি বোধহয় নেই, না?’
‘নাহ! পুরোনো ফ্ল্যাট। বুঝিসই তো… আর শুধু সেটা না। আমার কাছে এইমাত্র একটা ফোন এসেছিল।’
‘ব়্যানসাম?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু টাকা চাইছে না। বলছে যেটা লুকিয়ে রেখেছেন, সেটা আমাদের হ্যান্ডওভার করুন। তাহলেই ছেলেকে ফিরে পাবেন।’
‘বেশ। তুই এক কাজ কর। পুলিশে একবার জানা। আমি একজনের নম্বর দিচ্ছি। নাম দ্বৈপায়ন সাহা। ওকে কল করে সব বল। কলটা যদি ট্র্যাক করা যায়। যদিও তাতে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। এত কাঁচা খেলোয়াড় ওরা নয়। নেক্সট টাইম তোকে কল করলে বলবি, আগে আরভের সঙ্গে কথা বলব। তারপর জিনিসটা দেব কি দেব না, সেই ডিসিশন নেব।’
‘আরে, জিনিসটা কী তাই তো আমি জানি না।’
‘তুই জানিস যে তুই জানিস না। কিন্তু ওরা কি জানে যে তুই জানিস না? এত ভাবিস না। যা বলছি কর।’
অরিন্দমের ফোনটা কেটে দ্বৈপায়নকে একটা মেসেজ করে ঘটনাটার সংক্ষিপ্তসার জানিয়ে রাখল তূর্য।
রিয়ার আসতে বেশ খানিকটা দেরি হচ্ছে। নিজের এলোমেলো চিন্তার জগতে হারিয়ে গিয়েছিল তূর্য। তাহলে কি প্রিয়া সত্যিই এমন কিছু জেনে ফেলেছিল, যেটার জন্য তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হল? কিন্তু সেটা কী? আর এসবের মধ্যে রফিক খানই বা এল কোথা থেকে। নাহ! সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
‘সরি সরি, দেরি হয়ে গেল।’ রিয়ার কথায় চিন্তার তার ছিঁড়ল তূর্যর। রিয়া বসতে বসতে বলল, ‘হেব্বি ট্রাফিক ছিল।’
‘ইটস ওকে। আপনার জন্য ব্ল্যাক কফি বলে দিয়েছি।’
‘থ্যাংক ইউ। ইউ আর আ সুইটহার্ট।’
কথাটা বলার ধরনে হেসে ফেলল তূর্য। জিগ্যেস করল, ‘তারপর বলুন, হঠাৎ এত জরুরি তলব কীসের?’
‘শুনুন।’ রিয়া এবার গলার স্বর খাদে নামিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করল, ‘আমি গত দু’দিন ধরে মিনিস্টার দুবের ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁড়েছি। এবং যা পেয়েছি, সেটা… শালা ব্ল্যাকহোলের থেকেও ডার্ক।’
‘মানে?’
‘দুবে এখন ক্ষমতার শিখরে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। পার্টির মধ্যে খুব প্রভাবশালী। এমনকী মিডিয়ায় পর্যন্ত তার ইমেজ একদম ক্লিন। একেবারে ভদ্র, দুর্নীতিমুক্ত জনদরদী নেতা।’
‘সাউন্ডস টু গুড টু বি ট্রু।’
‘ইট ইজ। এই ইমেজ কিন্তু তৈরি হয়েছে মাত্র বারো কি পনেরো বছরে। অল থাংকস টু হিজ পিআর টিম। আর তার আগে? তার আগে তিনি ছিলেন একজন সাধারণ স্থানীয় ডন। কলকাতাসহ কলকাতা সংলগ্ন জেলাগুলোরও বেশ কিছু এলাকা দুবের আন্ডারে ছিল। অল বেঙ্গল পিপলস ফ্রন্টে জয়েন করার পর আস্তে আস্তে দুবে এসব থেকে সরে আসেন।
‘আর বছর আটেক আগে দলের লিডার বিকাশ ব্যানার্জি মারা যাওয়ার পর দুবে পার্টিটাকে একরকম হাইজ্যাক করে। তারপরে বাকিটা তো জানেনই। এখন সেন্ট্রালের অন্যতম পাওয়ারফুল মিনিস্টার হয়ে বসে আছে। যাই হোক, যেটা বলার ছিল। দুবে নিজের যত বেআইনি কাজ সবই করায় দুটো গ্যাংকে দিয়ে। খিদিরপুরের ভোলা মণ্ডলের গ্যাং আর হাওড়ায় রফিক খানের গ্যাং।’
‘রফিক খান!’ তূর্য নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠছিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। একই দিনে দ্বিতীয়বার নামটা শুনল তূর্য।
‘হ্যাঁ। রফিক খান আর দুবের সম্পর্ক প্রায় কুড়ি-পঁচিশ বছরের পুরোনো।’
কফি এল। ওয়েটার কাপগুলো রেখে চলে গেল। তূর্য এবার রিয়াকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে রিয়া অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘তাহলে দাঙ্গা বাধাতে গেলে তো রফিক খান বা ভোলাকেই কাজে লাগাতে পারত দুবে। রোগের মতো ইন্টারন্যাশনাল মার্সিনারি গ্রুপকে হায়ার করার কী প্রয়োজন ছিল?’
‘রোগকে সম্ভবত দুবে নিজে হায়ার করেনি। ওর দৌড় অতদূর নয়। পেছন থেকে অন্য কেউ কলকাঠি নাড়ছে।’
‘কে?’
‘এখনই এই প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে। ডিফেন্সটেক ডাইরেক্টলি ইনভলভড থাকতে পারে। অত বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাছে এদের হায়ার করা এমন কিছু ব্যাপার নয়।’
‘বুঝলাম। কিন্তু আরভকে উদ্ধার করার কী হবে?’
‘পুলিশের হেল্প যে পাব না, সেটা তো প্রথম থেকেই ক্লিয়ার। আবার কোনও সলিড ব্যাকআপ প্ল্যান ছাড়া ওই বস্তিতে একা ঢুকতে যাওয়া সুইসাইড করার সমান।’
‘আপনি আপনার ক্লায়েন্ট, মানে অরিন্দমবাবুকে জানিয়েছেন কেসের প্রোগ্রেস?’
‘কেসের প্রোগ্রেস মানে আরভের ওই বস্তিতে থাকার প্রবাবিলিটি? খেপেছেন? অরিন্দমকে বললে, ও হয়তো একা-একাই ওখানে হানা দেবে।’
‘তাও ঠিক।’ রিয়া সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়।
‘আচ্ছা, আপনার হাতে এখন টাইম আছে তো?’ ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে বলল তূর্য।
‘কেন বলুন তো?’
‘সল্টলেক যেতে হবে একবার।’
‘ওই মাতৃশক্তি এনজিও? কেন, কোনও ফিশি কেস আছে নাকি?’
‘ফিশি মানে? একদম ফিশ ফ্রাই আর চিলি ফিশ একসঙ্গে। চলুন, যেতে যেতে বলছি। শোভাবাজার নেমে অটো ধরতে হবে।’
‘দরকার নেই। আমার গাড়ি আছে। লেটস গো।’
