দশম পর্ব – দ্য ট্র্যাপ
শেষ বিকেলে নিজের ঘরে চুপচাপ জানালার ধারে দাঁড়িয়েছিল তূর্য। দূরে উঁচু উঁচু নারকেল গাছের পিছনে লাল থালার মতো বড় সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সারা আকাশটা যেন একটা বিশাল সোনালি ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসে সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ কেউ এঁকে দিয়েছে নিপুণ হাতে। অস্তগামী সূর্যের সোনালি আলোর প্রতিফলন এসে পড়েছিল তূর্যর সামনের জানালার রঙিন কাচে। তূর্যর ঘরের দু-দিকে দুটো জানালা থাকলেও এটা তার বেশি পছন্দ। কারণ জানালার পরেই একটা বিশাল মাঠ। সেই মাঠের শেষে পুকুরের টলটলে স্থির জল দেখা যায়। আর সামনে মাঠ থাকায় সেদিক থেকে ফুরফুরে হাওয়া ঢোকে মাঝে মাঝে।
তূর্য চোখ বুজে মাথাটা সামান্য উঁচু করে জানালার পাল্লায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শীতল হাওয়া তার মুখের প্রত্যেকটা রোমকূপকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সেই স্পর্শে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছিল সে। ওই ঝোড়ো হাওয়াটায় যেন একটা অচেনা ভালো লাগার আবেশ লুকিয়ে আছে।
ঠিক এমন সময় দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল। তূর্য চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে দেখল, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া। তার চোখে চোখ পড়তেই সে মৃদু হাসল। তারপর হালকা চালে বলল, ‘ব্যাপার কী? কবি হয়ে গেলেন নাকি? জানালা দিয়ে বাইরে চোখ বন্ধ করে তাকিয়ে প্রকৃতি অনুভব করছেন। এটা তো আপনার চরিত্রের সঙ্গে ঠিক মেলে না।’
তূর্য প্রথমে সে কথার উত্তর না দিয়ে হালকা হেসে তাকে চোখের ইশারায় বিছানার পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে দেয়। তারপর এগিয়ে এসে নিজে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে। বলে, ‘আপনি আর আমায় কতটুকু চিনলেন? একসময় আমি বেশ কিছুদিন একটা পাহাড়ি গ্রামে কাঠকলের ম্যানেজারি করেছিলাম। প্রকৃতির নেশা আমায় সেই রূপাং বস্তিই ধরিয়ে দিয়েছিল আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে।’
রিয়া প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল, ‘আজ ওই পুকুরটার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কী সুন্দর পরিষ্কার জল। ভালো করে তাকালে জলের নীচে মাছ দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা, আমাদের তো আর কেউ এখানে বন্দি করে রাখেনি। ইচ্ছা হলে মাঝে মাঝে বাইরে থেকে ঘুরে আসতেই পারেন। সারাদিন এমন বন্ধ ঘরে নিজেকে বন্দি বানিয়ে রেখেছেন কেন? এখানে আশেপাশে ঘুরলে আমাদের কোনও ভয় নেই। এলেনা নিজেই বলেছে।’
তূর্য মৃদু হাসে। তারপর অলস গলায় বলে, ‘কোথায় আর যাব?’
‘কোথায় যাব মানে? এত বড় প্রকৃতির মাঝে কি যাওয়ার জায়গার অভাব? চলুন, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিন। পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। আমরা বেরোব।’
তূর্য আপত্তি করতে গিয়েও করে না। সামনের আলমারি খুলে একটা শার্ট বের করে চেঞ্জ করে নেয়। এই সময়ের আবহাওয়া বড় অদ্ভুত। দুপুরবেলা তেমন ঠান্ডা নেই। অথচ যেই সূর্য অস্ত যায়, একটা হালকা ফিনফিনে শীতল বাতাস যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে পুরো এলাকাটাকে। তখন গায়ে কিছু একটা না চাপালে সারা শরীর শিরশির করে ওঠে।
একটা হালকা জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে নিয়ে রিয়ার সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তূর্য। নীচে নেমে ডানদিকেই সেই কন্ট্রোল রুম। সেখানে তখন কম্পিউটার স্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ে মন দিয়ে কোনও ডকুমেন্ট পড়ছে এলেনা। ওদের বেরোতে দেখে বলে, ‘বেরোচ্ছেন? ঘুরে আসুন। ভালো লাগবে। তবে গ্রামের দিকে যাবেন না। আপনাদের পোশাক অন্যরকম। সিকিওরিটি কম্প্রোমাইজ হতে পারে।’
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সরু গলি ধরে খানিকটা এগিয়ে এসে একটা মোড় ঘুরেই সেই মাঠটা। একটু আগেই বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছিল সেখানে। এখন খেলা শেষ। ফিরে গেছে গ্রামের দিকে। কিছু লোক গরু-ছাগল চড়াতে এনেছিল। সন্ধে নামতে তারাও ফিরে গেছে। একটা ঝাঁকড়া কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে ঘাসে ঢাকা বেশ অনেকটা জায়গা। সেই ঘাসের উপর ওরা দুজনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল।
তূর্য অনেকক্ষণ ধরে ঠোঁটের কোণে একটা সিগারেট ঝুলিয়ে হাতের তালু দিয়ে সেটাকে সযত্নে আড়াল করে তাতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছিল। দূরে পুকুরের দিক থেকে আসা দমকা বাতাস তার সেই প্রচেষ্টায় বাধ সাধছে। বারবার হাওয়ার দাপটে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি নিভে যাওয়ায় সে মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে উঠে গেল একটু দূরে।
রিয়া পুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টে। হঠাৎই তূর্যর দিকে ফিরে হেঁকে বলল, ‘বাই দ্য ওয়ে, আপনি সাঁতার কাটতে পারেন?’
‘সে সেই ছোটবেলায় হেদুয়ায় শিখেছিলাম বছরখানেক। কাজ চালিয়ে নিতে পারি। কেন? ঠেলে ফেলে দেবেন নাকি?’
‘আপনি কিন্তু শ্যাডোর কাছে আমার কথাটা শোনার পর থেকে আমার সঙ্গে স্ট্রেঞ্জ বিহেভ করছেন।’
‘না না, ধুৎ! আপনি কী-ই বা এমন করেছেন? এমন করে বলছেন যেন আপনি দেশদ্রোহিতা করতে যাচ্ছিলেন।’
রিয়া কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে যায়। কিন্তু ওর মুখমণ্ডল জুড়ে নেমে আসা কালো ছায়া তূর্যর দৃষ্টি এড়ায় না। সে একটু হেসে বলে, ‘আরে এত চাপ খাচ্ছেন কেন? আপনার নিজের কাছে নিজের কাজের জাস্টিফিকেশন আছে তো? ব্যস! চিল।’
‘একজন সাংবাদিক নিজের বেসিক কাজ, অর্থাৎ একটা অথেন্টিক স্টোরি কভার করতে চেয়েছে। তাতে চারপাশের মানুষ তাকে কী সহজে দেশদ্রোহীর ট্যাগ দিয়ে দিচ্ছে! মানছি, আমি যেখানে স্টোরিটা পাবলিশ করার চেষ্টা করেছিলাম, তাদের একটা নেগেটিভ বায়াসনেসের রেপুটেশন রয়েছে। কিন্তু স্টোরিটা তো ওরা নয়, আমি করতাম। আমি নিজে হাতে লিখতাম। আপনারা হয়তো এটাও ভাবছেন যে আমি আমার দেশের বিরুদ্ধেই লিখতাম পয়সার জন্যে। এসব মাথায় চলতে থাকলে কী করে চাপ না নিয়ে চিল করব, সেটা একটু বলবেন স্যার?’ এক নিঃশ্বাসে ঝড়ের গতিতে কথাগুলো বলে হাঁফাতে লাগল রিয়া।
রিয়া অনুমান করেছিল এই কথায় তূর্য অসন্তুষ্ট হবে। আরও কোনও যুক্তি দিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে পিষে দেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু রিয়াকে অবাক করে দিয়ে তূর্য মিটিমিটি হাসতে লাগল। তারপর ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে সেটাকে আঙুলের টোকায় দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একরাশ ধোঁয়া হাওয়ায় ছেড়ে সুর করে বলে উঠল, ‘আরে, কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগোকা কাম হ্যায় কেহনা…’
সেফ হাউজের লিভিংরুমে হালকা হাসির রেশ ছড়িয়ে ছিল তখন। তূর্য, স্যাম, রিয়া আর এলেনা চারজনে গোল হয়ে বসে ছিল টেবিলটা ঘিরে। স্যাম একটা পুরোনো ঘটনা বলছিল তার ট্রেনিংয়ের দিনগুলোর। সে নাকি প্রথমবার প্যারাশুট জাম্প করতে গিয়ে এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে ইনস্ট্রাক্টরকেই প্রায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল।
‘না না, তোমরা ঠিক বুঝতে পারছ না…’ স্যাম হাসতে হাসতে বলছিল, ‘আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে ইনস্ট্রাক্টরের কলার ধরে চিৎকার করে বললাম, “আই হ্যাভ চেঞ্জড মাই মাইন্ড! আই ওয়ান্ট টু বি এ টিচার!” ’
এলেনা হাসতে হাসতে প্রায় চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিল। সে বলল, ‘অ্যান্ড হোয়াট ডিড দ্য ইনস্ট্রাক্টর সে?’
‘সে বলল, “রং ক্যারিয়ার চয়েস, বাডি। ইউ আর অলরেডি ইন দ্য এয়ার!” ’
রিয়া জিগ্যেস করল, ‘এখন তো তুমি এতগুলো মিশন কমপ্লিট করেছ। এখনও কি ভয় লাগে?’
‘এভরি সিঙ্গেল টাইম!’ স্যাম স্বীকার করল, ‘তবে এখন আমি ইনস্ট্রাক্টরকে আঁকড়ে ধরি না।’
তূর্য এবার প্রথমবারের মতো মৃদু হাসল। গত কয়েকদিন এখানে একরকম বন্দি থাকার পর সে কিছুটা হলেও বিরক্ত বোধ করছিল। তাছাড়া আরভের উদ্ধারের ব্যাপারে ঠিকঠাক তথ্য তাকে দিচ্ছে না শ্যাডো। জিগ্যেস করলে শুধু বলছে, ‘ট্রাস্ট আস। আরভ এখন আমাদের রেস্পন্সিবিলিটি।’
স্যামের কথায় সবাই হাসছিল। ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে গেল সশব্দে। চারজনেই সজাগ হয়ে উঠল। পরমুহূর্তেই একটা নিয়ন্ত্রণহীন সাইক্লোনের মতো ঘরে প্রবেশ করল শ্যাডো। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কিছু একটা মারাত্মক সমস্যা হয়েছে।
‘সবাই রেডি হয়ে যাও। এখনই।’ শ্যাডো কঠোর আবেগহীন গলায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
‘কী হয়েছে?’ রিয়া হতভম্ব হয়ে জিগ্যেস করল।
‘যা বলছি করো। জামাকাপড় নেওয়ার দরকার নেই। যা যা জরুরি, শুধু সেগুলো নাও। তোমাদের আইডি, যা যা ডকুমেন্টস এখান থেকে দেওয়া হয়েছে, ওয়েপন, কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক…’
কথাগুলো বলতে বলতেই সে বুঝতে পারছিল, বাকিরা বিহ্বল হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তখন সে স্পষ্ট করে বলল, ‘আওয়ার সেফ হাউজ হ্যাজ বিন কম্প্রোমাইজড।’
বাক্যটা পুরো ঘরে একটা বোমার মতো বিস্ফারিত হল। স্যাম সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। এলেনাও। তূর্য আর রিয়া পরস্পরের দিকে তাকাল। শ্যাডো এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর একটা রিভলভার আর একটা ডিজিটাল ক্যামেরা রাখল।
‘এগুলো কী?’ রিয়া জিগ্যেস করল।
‘একজন স্পাইয়িং করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তার কাছ থেকে রিকভার করা।’ শ্যাডো সংক্ষেপে বলল।
এলেনা এগিয়ে এসে ক্যামেরাটা তুলে নিল। ক্যামেরা অন করে ছোট্ট এলসিডি স্ক্রিনে দ্রুত ছবিগুলো স্ক্রল করতে লাগল। তার চোখ সরু হয়ে এল। তারপর সে ক্যামেরাটা তূর্যর হাতে দিল।
‘তূর্য, এগুলো দেখুন।’ গম্ভীরভাবে বলল এলেনা।
তূর্য ক্যামেরা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। প্রথম ছবিটা এই বাড়ির সামনের অংশের। বাইরে থেকে তোলা। অ্যাঙ্গেল এমন, যে বোঝা যাচ্ছে ছবিটা রাস্তার ওপাশ থেকে তোলা। পরের ছবি বাড়ির পেছনের অংশ। তারপর আরেকটা। প্রতিটা ছবি ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা।
তূর্য একের পর এক ছবি দেখতে লাগল। বাড়ির প্রতিটা কোণ ক্যাপচার করা হয়েছে। এমনকী জানালাগুলোর ছবিও আছে। কোন জানালায় কখন আলো জ্বলছে, সেটাও টাইমস্ট্যাম্প দিয়ে ছবি তোলা।
এবার একটা ছবিতে এসে তূর্যর আঙুল থমকে গেল। ছবিটা পেছনের মাঠের। সেখানে দুটো ফিগার বসে আছে ঘাসের ওপর। জুম করলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে; একজন তূর্য, অন্যজন রিয়া। তারা কথা বলছে। ক্যামেরার টাইমস্ট্যাম্প বলছে ছবিটা তোলা হয়েছে তিনদিন আগে। ঠিক যেদিন সন্ধ্যায় তূর্য আর রিয়া পেছনের মাঠে বসে গল্প করছিল।
‘একী…’ তূর্য ফিসফিস করে নিজের মনেই বলল।
সে আরও কয়েকটা ছবি দেখল। বাড়ির ভেতরের ছবি। কেউ জানালা দিয়ে জুম করে ছবি তুলেছে। লিভিংরুমের ছবি, ড্রয়িংরুমের ছবি, এমনকী রান্নাঘরেরও।
শ্যাডো বলল, ‘রোগ স্পাই রিক্রুট করেছিল এখানে সার্ভেইলেন্স করার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল যে, বাড়িতে ঠিক কতজন আছি, আমাদের রুটিন কী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন সেসব রেইকি করা।’
‘সেই স্পাই এখন কোথায়?’ তূর্য জিগ্যেস করল।
শ্যাডো তূর্যর দিকে তাকাল। তারপর আবেগহীন কণ্ঠে বলল, ‘ডোন্ট ওয়ারি। ইটস টেকেন কেয়ার অফ।’
বাক্যটার মানে সবাই বুঝল। তূর্যও। সে আর কিছু বলল না। আবার ক্যামেরার স্ক্রিনে মনোযোগ দিল। পরের কয়েকটা ছবি আবার বাড়ির বাইরের। বিভিন্ন দিক থেকে তোলা। তারপর হঠাৎ একটা ছবি এল, যেটা একদম আলাদা।
ছবিটা অন্য কোনও জায়গার। সুন্দর একটা বাড়ি। ছোট একটা বাগান আছে সামনে। বাড়িটা দেখেই সুখী মধ্যবিত্ত পরিবারের বাড়ি বলে মনে হয়। বাগানে একটা বাচ্চা মেয়ে বসে খেলছে। বছর পাঁচেক বয়স হবে। লম্বা চুল, গোলাপি রঙের ফ্রক পরা। তার হাতে একটা পুতুল।
তূর্যর সারা শরীর শক্ত হয়ে গেল। মুখের রক্ত শুকিয়ে গেল। শ্বাস আটকে গেল বুকে। হাত কাঁপতে শুরু করল। ক্যামেরাটা তার হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনওরকমে ক্যামেরাটা টেবিলের ওপর ঠক করে রেখে দিল। তার মুখ পাথরের মূর্তির মতো নিষ্প্রাণ। চোখে কোনও অভিব্যক্তি নেই।
রিয়া দ্রুত হাতে ক্যামেরাটা তুলে নিল। স্ক্রিনে তাকিয়ে সেও অবাক হয়ে গেল, ‘এই ছবিটা তো এই বাড়ির না। বোধহয় এর আগে এই স্পাই যেখানে কাজ করছিল, সেখানকার। হয়তো ভুলে পুরোনো ছবিগুলো ডিলিট করতে পারেনি।’
সে ছবিটার দিকে আরও ভালো করে তাকাল। তারপর তূর্যকে জিগ্যেস করল, ‘কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটা কে? আর আপনি হঠাৎ এই ছবিটা দেখে এতটা শকড হয়ে গেলেন কেন?’
তূর্য কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার পুরো শরীর এখনও অস্বাভাবিকরকম স্থির। মুখ ফ্যাকাসে, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা। থমথমে গলায় সে বলল, ‘এটা তিতলি। আমার মেয়ে।’
রিয়া কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে তূর্য যন্ত্রের মতো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। নীচে লিভিংরুমে সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শ্যাডো একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘এটা ইন্টেনশনালি করা হয়েছে।’
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল। শ্যাডো আবার বলল, ‘একজন প্রফেশনাল স্পাই কখনও আগের অ্যাসাইনমেন্টের ছবি ক্যামেরায় রেখে দেবে না। এটা খুব বেসিক ট্রেনিং।’
‘তাহলে?’ এলেনা প্রশ্ন করল।
‘তাহলে আর কী? এটা ডেলিবারেটলি করা হয়েছে। রোগ জানত যে আমরা স্পাইকে ধরব। সুনার অর লেটার। আর যখন ধরব, তখন ক্যামেরা চেক করব। এই ছবিটা রাখা হয়েছে যাতে আমরা দেখি। যাতে তূর্য দ্যাখে।’
‘কিন্তু কেন?’ রিয়া জিগ্যেস করল।
‘মেসেজ পাঠানোর জন্য।’ এলেনা বলল, ‘ইটস আ থ্রেট। রোগ তূর্যকে জানাচ্ছে যে তার ফ্যামিলিও টার্গেটে আছে। তার মেয়ে, তার ওয়াইফ, সবাই। রোগ চাইছে তূর্য রেস্টলেস হয়ে যাক। চাইছে সে আমাদের প্রোটেকশন থেকে বেরিয়ে আসুক।’
‘কেন তূর্যকে বেরিয়ে আসতে হবে?’ রিয়া প্রশ্নটা করতে করতেই মাঝপথে থেমে গেল। তারপর উত্তরটা নিজেই অনুধাবন করে বিড়বিড় করে বলল, ‘ওহ! তূর্য যদি তার মেয়েকে বাঁচাতে যায়…’
‘হ্যাঁ। তূর্য একা মানেই সফট টার্গেট। এটা একটা ট্র্যাপ। পারফেক্ট ট্র্যাপ। তূর্য একজন বাবা। সে তার মেয়ে বিপদে আছে বুঝলে প্রথমেই কী করবে? সে যে কোনও মূল্যে তার মেয়েকে প্রোটেক্ট করতে চাইবে। আর ঠিক তখনই রোগ-এর লোকেরা তাকে এলিমিনেট করবে।’
‘তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত?’ জিগ্যেস করল রিয়া।
এলেনা নিজের যন্ত্রপাতি ডিসঅ্যাসেম্বল করছিল। স্যাম ব্যাগ গোছাতে চলে গেছে ওপরে। শ্যাডো টেবিলের ওপর রাখা রিভলভারটা তুলে নিয়ে ম্যাগাজিন চেক করতে করতে বলল, ‘বললাম তো, আমাদের এখনই এখান থেকে মুভ করতে হবে। স্পাই যদি এতদিন ধরে ওয়াচ করে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে রিপোর্ট করেছে। রোগ জানে আমরা এখানে আছি। জানে কতজন আছি। তারা যে কোনও সময় অ্যাটাক করতে পারে। তাই প্লিজ আর দাঁড়িয়ে না থেকে অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল রেডি হয়ে নিন।’
‘ওকে!’ বলে রিয়াও ছুটল দোতলায় নিজের ঘরে।
শ্যাডো গলা তুলে সবার উদ্দেশে ঘোষণা করল, ‘ফাইভ মিনিটস ম্যাক্স। শুধু এসেনশিয়াল জিনিস নাও। ওয়েপন, ডকুমেন্টস, হার্ড ড্রাইভস আর ফার্স্ট-এইড বক্স। আর কিচ্ছু না। আমরা লাইট ট্র্যাভেল করব। ফাস্ট মুভমেন্ট ইজ নেসেসারি।’
সবাই ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে। এলেনার কমিউনিকেশন ইস্যুইপমেন্টস গোছানো শেষ। শ্যাডো তার ব্যাগ নিতে দোতলায় গেল।
উপরতলায় তূর্য তার রুমে ঢুকেছে। বেশ কিছুক্ষণ নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে রইল সে। মাথার ভিতর হাজারটা সাইক্লোন যেন একসঙ্গে পাকিয়ে উঠছে। ঠান্ডা মাথায় এখনও অবধি ঘটে যাওয়া সব ঘটনা পরপর সাজাতে চেষ্টা করতে লাগল তূর্য। কীভাবে যেন ঝড়ের গতিতে সবকিছু হয়ে যাচ্ছে। একজায়গায় থিতু হয়ে ভাবার সময়টুকু পায়নি সে। আজ মনের ভিতর জমে থাকা সব উৎকণ্ঠা তার মাথার ভিতরটা এলোমেলো করে দিচ্ছে।
উঠে গিয়ে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল তূর্য। তারপর পকেট থেকে ছোট্ট কাগজের মোড়কটা বের করে খুলল। ছোট্ট শক্ত কোনও একটা জিনিস একটা সাদা কাগজ দিয়ে মোড়ানো। মোড়কটা খুলতেই হাত কেঁপে যায় তার। গলার ভিতরটা হঠাৎ শুকিয়ে আসে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে থাকে। কোনওরকমে সামনের চেয়ারের হাতল ধরে বসে পড়ে তূর্য। ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে দুই হাঁটুর মধ্যে গুঁজে ফুঁপিয়ে ওঠে তূর্য। ধনুকের মতো বেঁকে থাকা পিঠ নিঃশ্বাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে।
নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। তূর্য চেয়ার ছেড়ে নীচে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। ওর হাতে ধরা লাল রঙের রং পেনসিল। তিতলির ভীষণ পছন্দ সেটা। সে একমনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে পেনসিলটা। ওর চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। পাশেই মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজের মোড়কটাও হাওয়াতে তিরতির করে উড়ছে।
তূর্য পেনসিলটা কাগজে মুড়িয়ে ফের পকেটে রেখে দিল। তারপর মেঝেতেই চোখ বুজে শুয়ে থাকল চুপচাপ।
মিনিটখানেক পর উঠে দাঁড়াল সে। ঘরের চারপাশটা একবার দেখে নিল। তার কাছে এখন এমনিও বেশি কিছু নেই। দু-চারটে পোশাক, পাসপোর্ট, কিছু টাকা। ফোন শ্যাডো জমা রেখে দিয়েছে লোকেশন ট্র্যাক হওয়ার ভয়ে। অবশ্য এখন তার কিছুই দরকার নেই। তার শুধু দরকার, যে কোনও উপায়ে তিতলির কাছে পৌঁছনো।
সে একটা ছোট্ট ব্যাকপ্যাকে দরকারি জিনিসপত্র ঢুকিয়ে নিয়ে জানালার কাছে গেল। জানালাটা খুলে নীচে তাকাল। দোতলার জানালা থেকে নীচে নামা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। জানালার ঠিক নীচেই একটা সানশেড আছে। যদিও পুরোনো বাড়ি। তবে শেডটা দেখে বেশ মজবুতই মনে হচ্ছে। আর তার পাশেই পুরোনো ধাতব রেইন পাইপ। যদি সে জানালা দিয়ে সানশেডে ঝাঁপ দিতে পারে, তাহলে সেখান থেকে রেইন পাইপ ধরে নীচে নামা যায়। ঝুঁকি আছে, কিন্তু চেষ্টা করতেই হবে।
বাইরের বাতাস চোখে-মুখে এসে লাগছে। আকাশের এক কোণে কালচে রংয়ের মেঘ জমছে। সন্ধে হয়ে আসছে।
তূর্য একবার ঘরের দিকে ফিরে তাকাল। তারপর জানালার ফ্রেম ধরে পা বাড়াল বাইরের দিকে।
নিজের নিজের ঘরে সবাই তাদের জিনিস গোছাচ্ছে। রিয়াও তার ব্যাগে কিছু জরুরি জিনিস ভরছিল। আইডি, চার্জার, তার ফিল্ডনোট…
সে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। ভাবল তূর্যকে একবার দেখে আসবে। হয়তো সে এখনও নিজের ব্যাগই গোছায়নি। তাকে আশ্বস্ত করা দরকার যে তারা সবাই মিলে কিছু একটা করবে। আপাতত যতটা দ্রুত সম্ভব এই বাড়ি ছাড়তে হবে।
করিডোরে এসে তূর্যর রুমের দরজায় নক করল রিয়া। কোনও সাড়া নেই।
‘তূর্য?’ রিয়া ডাকল। তাও কোনও উত্তর নেই। পাল্লাটা সামান্য ঠেলতেই সেটা খুলে গেল। রিয়া ভেতরে ঢুকল। ঘর খালি। রিয়া চারপাশে তাকাল। তূর্য নেই। সে ছুটে গিয়ে বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিল। সেটাও খোলা। জানালাও খোলা। পর্দা হাওয়ায় উড়ছে।
প্রথমে রিয়া ভাবল তূর্য হয়তো ইতিমধ্যেই নীচে নেমে গেছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপর কী যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল তার। কিছু একটা ঠিক নেই। সে আবার ঘরে ফিরে এল। এগিয়ে গেল খোলা জানালার দিকে। বাইরে ঝুঁকে দেখল নীচে সানশেডের ওপর পুরু হয়ে জমা ধুলোয় পায়ের ছাপ।
রিয়ার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। সে দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। লিভিংরুমে ঢুকেই চিৎকার করে বলল, ‘তূর্য বাড়িতে নেই। হি ইজ গন!’
শ্যাডো তখন ফোনে বোধহয় অন্য সেফ হাউজ অ্যারেঞ্জ করছিল। রিয়ার কথা শুনেই চমকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। বলল, ‘কী বললেন?’
‘তূর্য ওর রুমে নেই। আমি দেখেছি।’ রিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
‘শিট!’ শ্যাডো ফোন রেখে দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগোল। স্যাম আর এলেনাও পেছনে পেছনে গেল।
শ্যাডো দুটো করে তিনটে করে ধাপ টপকাতে টপকাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। তূর্যর রুমে ঢুকল। ফাঁকা। জানালার দিকে গেল। নীচে তাকাল।
শ্যাডোর চোখ সরু হয়ে এল। প্রথমেই সানশেডের ওপর ফুটমার্ক নজরে এল তার। তারপর সে রেইন পাইপের দিকে তাকাল। পুরোনো, জংধরা পাইপ। কিন্তু পাইপের কিছু জায়গায় জং উঠে গেছে। সেখানে ঘষার দাগ। অর্থাৎ কেউ পাইপ বেয়ে নীচে নেমেছে।
‘ড্যাম ইট!’ শ্যাডো নিষ্ফল আক্রোশে দেওয়ালে একটা ঘুসি মারল। স্যামও ততক্ষণে জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেও একবার বাইরে তাকিয়েই পরিস্থিতি বুঝে গেল। বলল, ‘এবার আমরা কী করব?’
শ্যাডো ঘুরে দাঁড়াল, ‘আমরা প্ল্যান অনুযায়ী মুভ করব। এখানে থাকা আর সেফ না।’
‘কিন্তু তূর্য…’ রিয়া তার কথায় বাধা দিল।
‘তূর্য তার ডিসিশন নিয়েছে। সে একজন ভেটেরান ইনভেস্টিগেটর। তার বোঝা উচিত ছিল যে এটা একটা ট্র্যাপ। তবুও সে গেছে। আমাদের সঙ্গে কনসাল্ট করারও প্রয়োজন বোধ করেনি। আমি ওকে দোষ দিচ্ছি না। ওর কনসার্নড হওয়ার কারণ আছে। কিন্তু আমরা এখন এখানে থেকে তূর্যকে খুঁজতে পারব না।’
‘তবু যদি একবার অন্তত হাইরোডের দিকটা…’
‘রিয়া, তূর্য একজন অ্যাডাল্ট। ইট ওয়াজ হিজ চয়েস। আমরা তিনজন স্পেশাল এজেন্ট আছি। আমাদের একবার ভরসা করে দেখতে পারত। আমার প্রোটেকশনে একজন সিভিলিয়ান আছে। আমি রিস্ক নিতে পারব না।’ শ্যাডো দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল।
‘কিন্তু তূর্য তো বিপদে পড়বে!’ রিয়া উদ্বিগ্ন স্বরে বলল।
‘হ্যাঁ। পড়বে। রোগের মার্সিনারি ওর জন্য অপেক্ষা করছে। হয় সুলগ্নার বাড়িতে, অথবা পথে। আমি জানি। কিন্তু কিছু করার নেই। চলে আসুন। হারি আপ!’
স্যাম এবার এগিয়ে গেল। তারপর পিছন ফিরে রিয়াকে বলল, ‘শ্যাডো ইজ রাইট।’
শ্যাডো ততক্ষণে দরজার নবে হাত রেখেছে। দরজাটা খুলতে গিয়েও সে থমকে গেল। বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে। একটা না, একাধিক গাড়ি। চাপা ইঞ্জিনের গরগর আওয়াজে জানালা-দরজার পুরোনো দুর্বল পাল্লায় কম্পন উঠছে। তারপর হঠাৎ আওয়াজটা থেমে গেল। ঝড়ের আগের থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এল চারিদিকে।
শ্যাডো দরজা থেকে সরে এল। জানালার পাল্লার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। রাস্তায় দুটো কালো এসইউভি পার্ক করা। আরেকটা গাড়ি আড়াআড়ি পেছনের গলি ব্লক করে দাঁড়িয়েছে। মোট তিনটে গাড়ি। গাড়ি থেকে লোক নামছে একে একে। সবার হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। পরনে ট্যাকটিকাল সুট।
‘উই আর টু লেট।’ শ্যাডো বিড়বিড় করল। তারপর সে ঘুরে সবার দিকে তাকাল, ‘দে আর হেয়ার। ব্যাকডোর। নাও!’
সবাই দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। পেছনের দরজা খুলতে যাচ্ছিল শ্যাডো, কিন্তু তখন পেছনের উঠোন থেকেও ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল।
‘উই আর সারাউন্ডেড।’ ফিসফিস করে বলল এলেনা।
শ্যাডো দ্রুত চিন্তা করল। সামনের দরজা ব্লকড। পেছনের দরজাতেও ওরা অপেক্ষা করছে। জানালা? অসম্ভব নয়! কিন্তু তারা নিশ্চয়ই সেগুলোও কভার করেছে।
‘সবাই পিছনের দিকে এসো।’ শ্যাডো বলল, ‘দেয়ার ইজ অ্যান অ্যাবান্ডন্ড টানেল। পুরোনো, কিন্তু ইউজেবল। লিডস টু দ্য পন্ড।’
‘প্রথমেই কেন ওটা টার্গেট করলাম না?’ স্যাম প্রশ্ন করল।
‘কারণ টানেলটা ভালো কন্ডিশনে নেই। এই জমিদার বাড়ির মেয়েদের স্নান করতে যাওয়ার জন্য ওটা আগে ব্যবহার করা হতো। বহু বছর ইউজ হয় না। যে কোনও সময় কোলাপ্স করতে পারে। তাই আমি চাইছিলাম নরমাল রুট দিয়ে বেরোতে। কিন্তু এখন আর অপশন নেই।’
সবাই পিছনের সিঁড়ির দিকে ছুটল। নীচে নামতে শুরু করল দ্রুতপায়ে। অন্ধকার সিঁড়ি। ফ্ল্যাশলাইট অন করল শ্যাডো।
ঠিক তখনই বাড়ির সামনের দরজায় প্রচণ্ড লাথির শব্দ হল। একবার… দু’বার… তিনবার! দরজা ভেঙে গেল হুড়মুড় শব্দে।
পিছনে শোনা যাচ্ছে ভারী পদধ্বনি। একজনের চিৎকার ভেসে এল, ‘ক্লিয়ার দ্য হাউজ! ফাইন্ড দেম!’
শ্যাডো টানেলের দরজা টেনে ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে দিল। এটা বেশিক্ষণ তাদের আটকাবে না। কিন্তু কিছুটা সময় অন্তত পাওয়া যাবে।
টানেলের ভিতরটা স্যাঁতসেঁতে। সর্বত্র মাকড়সার জাল। প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পচা কালো জল জমে আছে। অসম্ভব দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সম্ভবত কোনও প্রাণী পচেছে।
‘এগিয়ে চলো, জলদি!’ শ্যাডো বলল।
এলেনা প্রথম এগোল। তারপর রিয়া। তারপর স্যাম।
ঠিক তখনই পিছনে টানেলের মুখের দরজায় লাথি পড়তে শুরু করল। কাঠের পাল্লা ভাঙার শব্দ আসছে। তারা দরজার পাল্লা ভেঙে ভিতরে ঢুকছে।
তূর্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছিল। সে জানত না কোথায় যাচ্ছে। শুধু জানত, তাকে যতটা দ্রুত সম্ভব তিতলির কাছে পৌঁছতে হবে।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা। সন্ধের আলো মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সরু গ্রাম্য রাস্তা এখন একটু চওড়া হয়ে এসেছে। দু’পাশে স্ট্রিটলাইট জ্বলতে শুরু করেছে। তূর্য দৌড়াতে দৌড়াতেই দেখল, পেছন থেকে একটা তীব্র আলো এসে পড়ছে রাস্তার ওপর। অর্থাৎ কোনও প্রাইভেট গাড়ি আসছে। সে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে দু’হাত নেড়ে গাড়িটা থামানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু গাড়ি থামল না। দ্রুত গতিতেই তূর্যকে এড়িয়ে ছুটে বেড়িয়ে গেল। এভাবে আরও দু-তিনটে গাড়ি তূর্যকে এইভাবে উপেক্ষা করে ছুটে গেল গতি না কমিয়ে। অবশেষে বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টার পর একটা গাড়ি এসে থামল তার সামনে। ফাঁকা গাড়ি। ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, ‘কোথায় যাবেন?’
‘আপনি কোনদিকে যাচ্ছেন দাদা? আসলে আমার গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে গ্রামের ভিতরে। একদম ফেঁসে গেছি।’
‘আমি তো এয়ারপোর্ট যাচ্ছি আমার মালিককে পিক-আপ করতে। চলে আসুন, রাস্তায় কোথাও রিপেয়ারিং শপ পেলে নামিয়ে দিচ্ছি।’
‘অনেক ধন্যবাদ। আসলে আমিও এক বন্ধুকেই পিক-আপ করতে যাচ্ছিলাম এয়ারপোর্টে। আমাকে এয়ারপোর্টেই নামিয়ে দিন। ফেরার সময় আমরা কোনও রিপেয়ারিং গ্যারাজ থেকে মেকানিক তুলে নেব।’
‘আচ্ছা উঠে আসুন। কিন্তু দাদা একটু আগে নেমে হেঁটে চলে যাবেন। স্যার যদি আপনাকে দ্যাখেন, ভাববেন আমি রাস্তায় প্যাসেঞ্জার তুলেছি।’
‘না না! একদম চিন্তা করবেন না। আমি একটু আগে নেমে হেঁটে ঢুকে যাব।’ তূর্য গাড়িতে উঠে বসল। গাড়িটা ছুটে চলেছে রাস্তার বুক চিরে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
তূর্য বসে আছে ড্রাইভারের পাশের সিটে। তার দৃষ্টি স্থির আকাশের দিকে। আকাশে একটা রাতচরা পাখি উড়ে যাচ্ছে। তূর্যর কাছে এখন সবই ভিত্তিহীন। তার মাথাজুড়ে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তোলপাড় করছে। এই যান্ত্রিক গতি, এই রাস্তা, এই দূরত্ব—সবকিছু তার কাছে অসহ্য লাগছে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের বিশাল প্রবেশদ্বারের সামনে তূর্য যখন এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়িতে সন্ধে সাতটা। কাচের দেওয়ালে কৃত্রিম আলো এসে পড়ছে তির্যকভাবে। সেই মায়াবী আভায় পুরো টার্মিনাল যেন এক স্বপ্নিল জগৎ।
থ্রি বি নম্বর গেটের কাছে টিকিট বুকিং কাউন্টার। ইন্ডিগো, এয়ার ইন্ডিয়া, স্পাইসজেট, ভিস্তারা… প্রতিটা কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের লম্বা লাইন। ট্রলির চাকার শব্দ, ঘোষণার শব্দ, শিশুদের কান্না, বিদায়ের আলিঙ্গন, সব মিলিয়ে বিমানবন্দরের এক অনন্য সিম্ফনি।
তূর্য তার কাঁধের ব্যাকপ্যাকটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেল। শ্যাডো তাকে সেফ হাউজে ঢোকার সময় যে ওয়ালেটটা দিয়েছিল, তার ভিতর বেশ কিছু ক্যাশ ছিল। কতটা টাকা আছে, তা সে গুনে দ্যাখেনি বটে, কিন্তু বেশ মোটা অঙ্কের নোট যে সেখানে রাখা আছে সেটা সে খেয়াল করেছিল। টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল সে। ইন্ডিগোর কাউন্টারে নীল ইউনিফর্ম পরা এক তরুণী হাসিমুখে বসে আছে।
‘দিল্লির আজকের কোনও ফ্লাইট আছে? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব!’
মেয়েটা দ্রুত হাতে কম্পিউটারে টাইপ করতে লাগল। তারপর নরম গলায় বলল, ‘স্যার, নেক্সট ফ্লাইট রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশে। তার আগের ফ্লাইট সব ফুল।’
‘কত ভাড়া?’
‘ইকোনমি টেন থাউজ্যান্ড ফোর হান্ড্রেড, স্যার।’
দশ হাজার চারশো? সাধারণত কলকাতা-দিল্লি ফ্লাইটে চার হাজারের মতো ভাড়া পড়ে। প্রায় আড়াই গুণ! কিন্তু কিছু করার নেই।
‘ঠিক আছে। বুক করে দিন।’
‘আইডি প্রুফ প্লিজ!’
তূর্য তার আধার কার্ড বের করে দিল। মেয়েটা দ্রুত টিকিট বুকিং প্রসেস করে বলল, ‘পেমেন্ট ক্যাশে না কার্ডে?’
‘ক্যাশ।’
ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিল তূর্য।
টিকিট হাতে নিয়ে সে চেক-ইন কাউন্টারের দিকে এগোল। তার হাতে কোনও বড় লাগেজ নেই। শুধু একটা ছোট ব্যাকপ্যাক। কেবিন ব্যাগেজ হিসেবে সেটা যথেষ্ট। চেক-ইন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হল। বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে সে সিকিউরিটি চেকের লাইনে দাঁড়াল। সব প্রসিডিওর মিটলে তূর্য ওয়েটিং লাউঞ্জের এক কোণে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। কাচের দেওয়ালের ওপাশে রানওয়ে। একটার পর একটা বিমান টেক অফ করছে, ল্যান্ড করছে। আকাশ এখন গাঢ় নীল। রাত গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে।
খুব অস্থির লাগছে তূর্যর। সে বুঝতে পারছে তার মাথার ভিতর চিন্তাভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নার্ভ স্থির করতে সে উঠে গিয়ে একটা গরম কফির কাপ হাতে নিয়ে এসে বসল।
অবশেষে বোর্ডিং শুরু হল। ‘ইন্ডিগো ফ্লাইট সিক্স ই ওয়ান টু নাইন কলকাতা টু ডেলহি ইজ নাউ বোর্ডিং…’ ঘোষণাটা শুনে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল তূর্য।
দীর্ঘ এরোব্রিজ দিয়ে হেঁটে বিমানে উঠল। নীল-সাদা পোশাক পরিহিত এয়ার হোস্টেসরা হাসিমুখে যাত্রীদের স্বাগত জানাচ্ছে। তূর্যর আইল সিট। ব্যাগটা মাথার উপরের ক্যাবিনেটে রেখে নিজের সিটে বসল সে।
বিমানটা এবার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। ট্যাক্সিওয়ে ধরে রানওয়ের দিকে এগোচ্ছে। তূর্যর ধৈর্য বাঁধ ভাঙছে। এখন প্রতিটা মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এবং তারপর এল সেই মুহূর্ত। ইঞ্জিনের গর্জন বেড়ে গেল। বিমানটা তীব্র গতিতে ছুটতে শুরু করল রানওয়ে ধরে। চাকার শব্দ, কম্পন, এবং হঠাৎই, ভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতা। সেই অদ্ভুত অনুভূতি, যখন মাধ্যাকর্ষণের মায়া কাটিয়ে পৃথিবীকে নীচে ফেলে তুমি ভেসে উঠতে থাকো আকাশে।
তূর্য চোখ বুজল। দু’ঘণ্টার যাত্রা। ঘুম আসছে না, কিন্তু খানিক জোর করেই চোখ বন্ধ করে রাখল। একটু শান্ত হল মনটা।
