দ্বিতীয় পর্ব – থানা থেকে বলছি

দ্বিতীয় পর্ব – থানা থেকে বলছি

বেঙ্গল ব্যাঙ্কের বউবাজার শাখাটা বেশ পুরোনো, কিন্তু সাজানো-গোছানো। কলোনিয়াল স্থাপত্যের ছোঁয়া এখনও টিকে আছে এর উঁচু কড়ি-বরগার ছাদে, মোটা দেওয়ালে। এসির মৃদু গুঞ্জন আর কাগজপত্রের খসখস আওয়াজ মিলে একটা নিখুঁত কেজো পরিবেশের মূর্ছনা তৈরি করেছে।

লাঞ্চ আওয়ার পেরিয়ে গেছে। দেওয়ালের পুরোনো কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ঘড়িটা তার ধাতব কাঁটা দিয়ে নির্ভুলভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে এখন সময়, দুপুর দুটো বেজে বত্রিশ মিনিট। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে সবাই আবার ফিরে আসছে নিজের নিজের কাউন্টারে। বন্ধ কাচের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের ব্যস্ত রাস্তার শব্দ ক্ষীণভাবে ভেসে আসছে। রিকশার ঘণ্টি, বাসের হর্ন, হকারদের ডাকাডাকি… সব মিলিয়ে কলকাতার চিরাচরিত দুপুরের কলতান।

অরিন্দম নিজের ক্যাশ কাউন্টারের সামনে ফিরে এসে একটা ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে চারপাশে তাকাল। রংচটা কাঠের পুরোনো ডেস্কগুলো পরপর সাজানো। প্রতিটা ডেস্কে কাগজপত্র আর ফাইলের স্তূপ। ভোরের পাহাড়সারির পিছন থেকে উঁকি দেওয়া সূর্যের মতোই স্তূপীকৃত ফাইলের পিছনে দেখা যাচ্ছে কম্পিউটার মনিটরগুলো। নীলচে রঙের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে থাকা কর্মচারীরা নিজের নিজের কাজে মগ্ন। কেউ কাস্টমারের কাছ থেকে এফডি রিসিট নিয়ে রিডেম্পশন করছে, কেউ আবার চেক ক্লিয়ারিং মেশিনে একের পর এক চেক ঢুকিয়ে যাচ্ছে।

অরিন্দম সারাটা সকাল কাস্টমার সামলে গত এক মাসের ক্যাশ রেজিস্টারের সিঙ্গেল লক, সয়েল্ড আর মিউটিলেটেড নোটের হিসাব মেলাচ্ছিল নতুন করে। তার চোখ ক্লান্তিতে লাল হয়ে গেছে। চশমার কাচে ধুলো জমেছে। সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নোটের স্তূপ। কিছু নোট অর্ধেক ছেঁড়া, কিছু পুরোনো হয়ে বিবর্ণ, কিছু আবার ময়লায় নষ্ট। প্রতিটা নোট গুনে গুনে আলাদা আলাদা বান্ডিলে সাজিয়ে রাখছে সে। একবার ভুল হলেই গোটা হিসাব গড়বড় হয়ে যাবে।

কাল যে কোনও সময় অডিট শুরু হবে। ক্যাশ ভেরিফাই করতে অফিসার আসবে রিজিওনাল অফিস থেকে। তখন একটা পয়সার তফাত হলেও বিপদ।

‘দাদা, আমার টাকাটা ঢুকল? একটু চেক করে দিন না!’

কাউন্টারের ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটা পরিচিত গলা। অরিন্দম চিনতে পারে। গতকাল বিকেলে চেক জমা দিয়ে গিয়েছিলেন এই ভদ্রলোক। মধ্যবয়সি মানুষ। চোখে-মুখে সবসময় একটা উৎকণ্ঠার ছাপ।

মাথা তুলল অরিন্দম। পেনটা বুকপকেটে গুঁজে চশমাটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে কাউন্টারের মোটা কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা কাস্টমারের দিকে তাকাল। ভদ্রলোকের পরনে সাদা পাঞ্জাবি। হাতে একটা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ। চোখে-মুখে সেই এক চঞ্চলতা।

‘আপনি চেকটা কাল বিকেলে ড্রপ করেছিলেন না? আমি তো তখনই কনফার্ম করে দিয়েছিলাম যে আজ আপনার চেক ক্লিয়ারিংয়ে যাবে। যদি রিটার্ন না হয়, তাহলে কাল দুপুর থেকে অ্যাকাউন্টে ফান্ড দেখতে পাবেন, কিন্তু সেটা হোল্ড হয়ে থাকবে। বিকেলের পর হোল্ড ক্লিয়ার হলে তখন কাউকে টাকা পাঠাতে পারবেন।’

অরিন্দমের গলায় ধৈর্যমিশ্রিত ক্লান্তি। একই প্রশ্নের একই উত্তর, তাকে দিয়ে যেতে হয় দিনের পর দিন। কাস্টমাররা ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের এত জটিলতা বোঝে না। তারা চায় সবকিছু তৎক্ষণাৎ হোক। কিন্তু বাস্তব অন্যরকম। প্রযুক্তি এগিয়েছে বটে, কিন্তু এখনও অনেক প্রক্রিয়াই সময়সাপেক্ষ।

ভদ্রলোক মুখ গোমড়া করে বিদায় নেন। অরিন্দম বোঝে তার উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট হননি। কিন্তু অরিন্দমের সত্যিই কিছু করার নেই। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফের কাজে মন দেয়।

পাশের ডেস্ক থেকে শোভনা হেঁকে বলে, ‘অরিন্দমদা, এই চার নম্বর কাউন্টারের প্রিন্টারটা বারবার পেপার জ্যাম করছে। একটু দেখুন না!’ শোভনা বয়সে অরিন্দমের চেয়ে খানিক ছোটই হবে। তবে টেকনিকাল বিষয়ে অরিন্দমের দক্ষতার ওপর তার ভরসা আছে। অফিসে টেক-স্যাভি হিসাবে অরিন্দমের বেশ সুনাম রয়েছে।

‘আরে বাবা! আমি আমার কাজটা কখন করব? প্রচুর কাজ পেন্ডিং। তোরা যে কী করিস না!’ অরিন্দম উঠে দাঁড়ায়। এখনও ক্যাশের হিসাব মেলেনি। আজও বোধহয় বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।

ঠিক তখনই ম্যানেজার সুব্রত বসুর দিকে নজর পড়ে অরিন্দমের। তাঁর কেবিনের কাচের দরজার ও-প্রান্ত থেকে হাত তুলে ইঙ্গিত করছেন অরিন্দমকে ভিতরে আসার জন্য। সুব্রতবাবুর মুখে একটা থমথমে গাম্ভীর্য। সাধারণত তিনি বেশ হাসিখুশি থাকেন। কিন্তু আজ তাঁকে কেমন যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে।

‘ওই দ্যাখো, আবার এখন কেবিনে যেতে হবে। এবার হয়তো বলবে ওপর থেকে গুঁতো আসছে, দশটা অটল পেনশন বা কুড়িটা পিএমএসবিওয়াই করো।’ বেজার মুখে অরিন্দম ভিতরে ঢোকে। সুব্রতবাবুর কেবিনটা বেশ সুসজ্জিত। মেহগনি কাঠের টেবিল। রিভলভিং চেয়ার। দেওয়ালজুড়ে ব্রাঞ্চের জেতা বিভিন্ন সার্টিফিকেট আর পুরস্কারের ফ্রেম। তাকভর্তি ফাইল আর রেজিস্টার। একটা ছোট এসি গুনগুন করছে কোনায়। এ ঘরের জানালার কাচের ও-প্রান্ত থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়।

চেয়ারে বসে থাকা সুব্রত বসু গম্ভীর মুখে বলে ওঠেন, ‘তোমার ফোনে অনেকক্ষণ থেকে কল আসছে। ধরছ না কেন?’

‘সাইলেন্টে রেখেছি স্যার। বারবার ফোন আসলে মাইন্ড ডাইভার্ট হয়ে যায়। আগের মাসেই দু’হাজার টাকা শর্ট খেয়েছি।’

‘সে ঠিকই করেছ। কিন্তু থানার একজন সাব-ইনস্পেক্টর ফোন করেছিলেন ব্রাঞ্চের ল্যান্ডলাইনে। তোমাকে অনেকক্ষণ ট্রাই করে না পেয়ে তারপর গুগল থেকে ব্রাঞ্চের নম্বর খুঁজে এখানে কল করেছেন। বললেন, খুব জরুরি কিছু কথা বলবেন। তুমি একটু কলব্যাক করে নাও। এই যে নম্বরটা।’ একটা কাগজের টুকরো সামনে এগিয়ে দিলেন সুব্রতবাবু।

‘পুলিশ?’ অজান্তেই অরিন্দমের ভ্রু কুঁচকে যায়। ম্যানেজারের কথা শুনে তার বুকের মধ্যে একটা মৃদু কম্পন শুরু হয়। থানা! পুলিশ! তার মতো একজন সাধারণ সরকারি চাকুরিজীবীর সঙ্গে এদের কী প্রয়োজন? সে তো জ্ঞানত কোনও অপরাধ করেনি। তাহলে পুলিশের ফোন কেন? অবশ্য এটা তার একার নয়, আপামর ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালির জন্মগত স্বভাব। পুলিশ মানেই ঝামেলা। পুলিশ মানেই বিপদ। নিজের কোনও দোষ না থাকলেও পুলিশের প্রসঙ্গ উঠলেই মনে একটা অজানা ভয় কাজ করে।

‘কোন থানা?’ থতমত কণ্ঠে জিগ্যেস করে অরিন্দম। অস্বস্তিতে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

‘শ্যামপুকুর থানা। নাম বললেন সাব-ইনস্পেক্টর রতন ঘোষ।’

শ্যামপুকুর! অরিন্দমের মনে পড়ে যায় আজ সকালের সংবাদপত্রের খবর। শ্যামবাজারে একটা মিছিল ছিল না? সেখানে নাকি দাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আজ সকালেই তো প্রিয়াকে সেখানে যেতে বারণ করছিল সে! একটা অদ্ভুত আশঙ্কামিশ্রিত অস্বস্তি তার মাথার ভিতর সব গোলমাল করে দেয়।

অরিন্দম পকেট থেকে ফোন বের করে। সত্যিই সাতটা মিসড কল। আননোন নম্বর। বোঝাই যাচ্ছে সেই সাব-ইনস্পেক্টরই বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছেন। চিরকুটে লেখা নম্বরটা প্রয়োজন হল না অরিন্দমের। সে শিথিল হয়ে আসা হাতে নিজের কল লিস্ট থেকে সেই অচেনা নম্বরে কল করল।

‘হ্যালো!’

ওপাশ থেকে একটা ভারী গলার আওয়াজ ভেসে এল, ‘হ্যালো! হ্যাঁ, অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় বলছেন তো? এসআই রতন ঘোষ বলছি শ্যামপুকুর থানা থেকে।’

‘হ্যাঁ, আমিই অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়। বলুন…’

ওপাশ থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য কোনও কথা ভেসে এল না। ভদ্রলোক বোধহয় নিজের মাথার ভিতর কথা খুঁজছেন। এই নিস্তব্ধতাটা অরিন্দমের কাছে অসম্ভব অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গেছে।

অবশেষে রতন ঘোষের গলা শোনা গেল। গলাটা এবার একটু অন্যরকম শোনালো। পেশাদার পুলিশ অফিসার হিসেবে এ ধরনের দুঃসংবাদ দেওয়ার অভ্যাস তাঁর আছে। কিন্তু এবারের ঘটনাটা সেসবের থেকে একদম আলাদা। তিনি ধীর গলায় থেমে থেমে বললেন, ‘উই আর সরি মিস্টার চ্যাটার্জি। আপনার স্ত্রী, মানে মিসেস প্রিয়া চট্টোপাধ্যায়, আজ দুপুরে শ্যামবাজার মোড়ে টেররিস্ট অ্যাটাকের সময় জঙ্গি এবং পুলিশের ক্রসফায়ারে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।’

অরিন্দমের কানে এই কথাগুলো পৌঁছতেই তার মস্তিষ্ক এক ঝটকায় অকেজো হয়ে গেল। প্রথমে মনে হল, সে ভুল শুনছে। এটা হতেই পারে না!

‘না, না, না…’ অরিন্দম অসংলগ্নভাবে ফিসফিস করতে থাকে। তার মনে হয়, তামাম দুনিয়ার সমস্ত শব্দ হঠাৎ যেন থেমে গেছে এক লহমায়। শুধু তার নিজের হৃৎস্পন্দনের আওয়াজটা কানে বাজছে যুদ্ধের দামামার মতো।

কিন্তু এই থমথমে নিস্তব্ধতা যুদ্ধের আগের পূর্বাভাস। ঝড় আসছে। সবকিছু তছনছ করে, জগৎ-সংসার রসাতলে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো একটা রাক্ষুসে ঘূর্ণিঝড় ধীরে ধীরে ফণা তুলছে তার বুকের মধ্যে। এই ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে অরিন্দমের বুকে জমা হওয়া দুঃখ, রাগ, অসহায়তা।

তার মনে হচ্ছে তার বুকের ভিতরটা যেন খালি হয়ে যাচ্ছে। একটা চিনচিনে ব্যথার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে, অবশ করে দিচ্ছে তার স্নায়ুতন্ত্র। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ শীত করছে ভীষণ। এয়ার কন্ডিশনিং তেমন কমানো না থাকলেও তার মনে হচ্ছে, সে যেন সাইবেরিয়ার বরফ ঝড়ের মধ্যে বসে আছে। চোখের সামনে দৃশ্যগুলোও কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। অফিসের সাদা দেওয়াল, টেবিলের ওপরের ফাইলগুলো, কম্পিউটারের স্ক্রিন, সবকিছু যেন তরল হয়ে নড়াচড়া করছে। মনে হচ্ছে, গোটা পৃথিবীটা যেন টলছে।

অরিন্দম কিছু একটা বলতে চাইল। প্রশ্ন করতে চাইল, এটা কি আদৌ সত্যি? ইনস্পেক্টরের কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? কিন্তু তার কথাগুলো গলার কাছে এসে কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। জিভ অবশ হয়ে গেছে। অস্পষ্ট একটা গোঙানির আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বেরিয়ে আসছে না তার গলা থেকে।

সে শুধু শুনতে পেল, অফিসার তখনও বলে চলেছেন, ‘আমরা হাসপাতালে বডি পাঠিয়েছি। সঙ্গে থাকা ফোন থেকে বডির আইডেন্টিফিকেশন হয়েছে। আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি, আপনি প্লিজ অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল আর জি কর হাসপাতালে চলে আসুন। আপনি ইন পার্সন আইডেন্টিফাই করলে তবে আমরা বাকি প্রসিডিংস…’

‘বডি’… ‘আইডেন্টিফিকেশন’… এই শব্দগুলো অরিন্দমের কানে তিরের মতো এসে বিঁধল। প্রিয়া কি এখন শুধুই একটা ‘বডি’? তার স্ত্রী, তার জীবনসঙ্গী, আরভের মা, যার সঙ্গে আজ সকালেও খুনসুটি করে এসেছে সে, সেই জলজ্যান্ত প্রাণবন্ত মানুষটা এখন শুধুই একটা ‘বডি’?

হঠাৎ তার মনে পড়ল আরভের কথা। তার পাঁচ বছরের ছেলে। আজ তো প্রিয়া বলেছিল ওকে নিয়ে বেরোবে। ওইটুকু বাচ্চাকে বাড়িতে একা রেখে তো নিশ্চয়ই বেরোবে না প্রিয়া। তাহলে আরভ কোথায়? মুহূর্তে কণ্ঠস্বর ফিরে পেয়ে অরিন্দম তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘কিন্তু আমার ছেলে? আরভ কোথায়? আরভের তো মায়ের সঙ্গেই বেরোনোর কথা। আজ ওর স্কুল ছুটি। ওরা একসঙ্গেই বেরোবে বলেছিল। আমার ছেলে ঠিক আছে তো?’

প্রতিটা প্রশ্নের মধ্যে অরিন্দমের টুকরো টুকরো আশা জড়িয়ে ছিল। হয়তো আরভ ঠিক আছে, নিরাপদে আছে। হয়তো পুলিশের হেফাজতেই আছে। হয়তো…

কিন্তু রতন ঘোষের পরবর্তী কথাগুলো তার সব আশাকে চূর্ণ করে দিল, ‘সরি স্যার। কোনও শিশুকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়নি। আমরা শুধুমাত্র আপনার স্ত্রীর বডিই পেয়েছি। ঘটনাস্থল থেকে দুটো বাচ্চার বডি পাওয়া গেছে বটে, কিন্তু দুজনই মেয়ে।’

কথাটা শুনেই অরিন্দমের মনে হল যেন তার বুকের ভিতরের সেই রাক্ষুসে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের বিষাক্ত সাপটা এবার তাকে ছোবল মারল সজোরে। এতক্ষণ যে দুঃখ এবং কষ্ট তাকে অবশ করে রেখেছিল, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হল একটা নতুন আতঙ্ক। আরভ কোথায়? তার ছেলে কোথায়?

সেই ধাক্কাতেই সে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়েই পা পিছলে পড়ে গেল আবার। হাতের ফোনটা মুঠো থেকে আলগা হয়ে গড়িয়ে পড়ল নীচে।

প্রবল জ্বরে আক্রান্ত রুগির মতো অরিন্দম কাঁপতে থাকে থরথর করে। দাঁতে দাঁত লাগার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তাকে পড়ে যেতে দেখে এফডি কাউন্টার থেকে বাসুদা ‘অরিন্দম!’ বলে চিৎকার করে ছুটে এলেন। বয়স্ক মানুষটা অরিন্দমকে সামলানোর চেষ্টা করলেন, ‘কী হল রে? অসুস্থ লাগছে?’

ততক্ষণে পরিস্থিতি বুঝে ব্রাঞ্চের বাকি স্টাফরাও এসে ভিড় জমিয়েছে ম্যানেজারের কেবিনের সামনে। সবাই চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে অরিন্দমের দিকে। রমাদি, সুমিত্রা, রাহুল—সবাই এসে দাঁড়িয়েছে।

সেই ভিড়ের মধ্যে থেকেই শোভনা এগিয়ে এসে একটা জলের বোতল থেকে অরিন্দমের চোখে-মুখে জলের ছিটে দিতে দিতে বলল, ‘অরিন্দমদা! অরিন্দমদা, কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? আপনার বাড়িতে একটা ফোন করি?’

কিন্তু অরিন্দম কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার চারপাশে মানুষজন কথা বলছে, কিন্তু সেসব তার কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না। তার মাথার ভেতর শুধু কয়েকটা অসংলগ্ন শব্দবন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছে যন্ত্রের মতো। সে শোভনার দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে বলল, ‘বাড়িতে তো আর কেউ রইল না। কাকে ফোন করবি?’

কথাটা বলতে বলতেই অরিন্দমের দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এল। পুরোনো ক্ষতের ওপর লেপটে থাকা শুকনো রক্তের স্তরের মতো কালচে অন্ধকার ধীরে ধীরে গ্রাস করল তার চেতনা।

হয় শহরের উত্তরদিকে ছুটে চলা গাড়িগুলো অস্বস্তিকরভাবে নিশ্চুপ হয়ে গেছে, নয়তো অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের কানে সেসব শব্দ পৌঁছচ্ছে না আর। মাথার ভিতর সবকিছু কেমন যেন ঘেঁটে যাচ্ছে। সামনের সিটে বসা সর্দারজি ড্রাইভার দু-একবার রিয়ার-ভিউ মিররে তার দিকে তাকালেন উদ্বিগ্ন মুখে। অরিন্দমের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হওয়ায় চোখ সরিয়ে নিলেন। ভদ্রলোকও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে তার কাস্টমার কোনও বিপদে পড়েছে। কৌতূহল হচ্ছে, কিন্তু হয়তো অস্বস্তি কাটিয়ে কিছু জিগ্যেস করে উঠতে পারছেন না।

অরিন্দম বুঝতে পারছিল না, কতক্ষণ ধরে সে এই গাড়ির ভেতর বসে আছে। অফিস থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরে শুধু, ‘হাসপাতাল।’ বলে চোখ বন্ধ করে বসেছিল। কোন হাসপাতাল, কোথায় যেতে হবে সেসব কিছুই জানায়নি।

সূর্য অস্তাচলে। জানালার বাইরে ধূসর শহর নিজের রং পালটে সোনালি হয়ে যাচ্ছে। সামনেই পুজো। চারিদিকে সাজো সাজো রব। রাস্তার ধারের বিল্ডিংগুলোর জানালায় সূর্যের আলো পড়ে ঝকমক করছে। হকাররা তাদের ঠেলাগাড়িতে কেরোসিনের আলো জ্বালাচ্ছে। কোথা থেকে রজনীগন্ধা ফুলের মালার গন্ধ ভেসে আসছে। সন্ধ্যার এই নরম আলোতে শহরটাকে রূপকথার মতো দেখতে লাগছে।

সর্দারজি একটু কেশে নিয়ে বললেন, ‘স্যার, কোন হাসপাতাল সেটা তো…’

‘আর জি কর মেডিকেল কলেজ। একটু তাড়াতাড়ি চালাবেন প্লিজ।’

সর্দারজি শুধু মাথা নেড়লেন।

গাড়িটা শ্যামবাজার ক্রসিং পেরোল। সর্দারজি গলায় সহানুভূতির স্পর্শ এনে বললেন, ‘স্যার, একটা কথা জিগ্যেস করি? আপনার পরিবারে কি কেউ অসুস্থ? আপনাকে খুবই ট্রাবল্ড দেখাচ্ছে।’

অরিন্দম জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর কেটে কেটে বলল, ‘কীভাবে এক মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে যায় বলুন তো সর্দারজি! মানুষের জীবন কি এতই সস্তা?’

‘এই যে ছবিটা ঝুলছে দেখছেন! এরা আমার পাপাজি আর মাম্মিজি। যেদিন ইন্দিরা গান্ধীজির অ্যাসাসিনেশন হল, সেদিন ওরা সিনেমা দেখতে গেছিল। আমি আর আমার ভাই বাড়িতে ছিলাম। আমার বয়স দশ। ভাইয়ের সাত। আমার কাকা যখন এসে আমাদের বলল যে ওরা আমাদের বাবা-মা’কে আমাদের পাড়ার রাস্তায় ফেলে অমানুষিক অত্যাচার করে, শেষে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, আমি অবাক হয়ে শুধু প্রশ্ন করেছিলাম, “কেন?”

‘আজও সেই প্রশ্নের জবাব পাইনি স্যার। জীবন তো সস্তাই। চাইলেই শেষ করে দেওয়া যায়।’

‘পথের হদিস পথই জানে, মনের কথা মত্ত

মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো।’

কবিতাটা হঠাৎ মনে পড়তেই বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল অরিন্দমের।

সর্দারজিও আর কিছু বললেন না। বোধহয় বুঝতে পেরেছেন, তাঁর যাত্রী এখন কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।

ট্যাক্সিটা যখন হাসপাতালের গেটে ঢুকল, তখনই নাকে এল সেই চেনা গন্ধটা। জীবাণুনাশক ফিনাইল, কাঁচা রক্ত, কড়া ওষুধ আর স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের সোঁদাগন্ধের মিশ্রণ। এই গন্ধ অরিন্দম বহু বছর আগেও পেয়েছিল, যখন বাবাকে হারিয়েছিল। সেই সময় অরিন্দমের বয়স ছিল মাত্র পনেরো। বাবা হার্ট অ্যাটাকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনদিন আইসিইউতে থেকে শেষ পর্যন্ত… কিন্তু সে ঘটনা অন্য কোনও শহরের, অন্য কোনও হাসপাতালের। তবু গন্ধটা একেবারে এক।

আসলে বোধহয় প্রতিটা দেশে প্রতিটা শতাব্দীতেই মৃত্যুর গন্ধ একই। এই দমবন্ধ করা গন্ধের কোনও পরিবর্তন নেই। সে অজর, অমর, অক্ষয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা বাধ্য হই সেই গন্ধের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে।

ট্যাক্সি থেকে নেমে অরিন্দম ভাড়া মিটিয়ে দিল। সর্দারজি টাকা নেওয়ার সময় বললেন, ‘স্যার, সব ঠিক হয়ে যাবে। ভগবানের ওপর ভরসা রাখুন।’

‘ধন্যবাদ!’ ফিসফিস করে বলল অরিন্দম। কথাটা বলতে গিয়ে তার গলাটা ভেঙে গেল। সর্দারজি বোধহয় সেটা খেয়াল করলেন না, মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলেন তিনি।

হাসপাতালের প্রধান গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ান জিগ্যেস করল, ‘কোথায় যাবেন?’

‘আমার কাছে ফোন এসেছিল পুলিশের তরফ থেকে…’

‘সোজা গিয়ে বাঁয়ে। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যান। দেখবেন একজন দিদিমণি আছে। ওখানে জিগ্যেস করুন।’

হাসপাতালের ইমার্জেন্সি করিডোরের দরজা ঠেলে ঢুকতেই কেমন একটা অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা ঘিরে ধরল অরিন্দমকে। একদিকে স্ট্রেচারে করে একটা রোগীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কয়েকজন আত্মীয় চিৎকার করে বিলাপ করছে। ডাক্তার-নার্সরা দৌড়োদৌড়ি করছে। সবদিক থেকে ভেসে আসছে কান্নার আওয়াজ, আর্তচিৎকার, অস্ফুট গোঙানি।

দরজার ঠিক বাঁ-দিকে একটা ছোট টেবিলে বসে থাকা নার্সকে এইবার দেখতে পেল অরিন্দম। কানে ইয়ারফোন, হাতে মোবাইল। গানের তালে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কী যেন টাইপ করছেন তিনি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। মুখে সামান্য বিরক্তির ছাপ।

অরিন্দম কাছে গিয়ে বলল, ‘এক্সকিউজ মি?’

নার্স মাথা তুলে তাকালেন। ইয়ারফোনটা কানে রেখেই বললেন, ‘হ্যাঁ বলুন।’

‘আমি প্রিয়া চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির লোক। আমার কাছে থানা থেকে ফোন এসেছিল…’

‘কী নাম বললেন যেন?’

‘প্রিয়া চট্টোপাধ্যায়।’

নার্স তার সামনের রেজিস্টারে চোখ বুলালেন। তারপর একটা কাগজে কী যেন লিখলেন। মুখের চুইং গাম সামলে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনিই অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়?’

অরিন্দম শুধু সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

নার্স ইয়ারফোনটা কান থেকে খুলে নিয়ে আঙুল দিয়ে ডানদিকের একটা অল্প খোলা দরজার দিকে ইশারা করলেন, ‘ওই গেটটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ডানদিকে দেখবেন নীল রঙের শাটার। ওপরে লেখা “ডিপার্টমেন্ট অফ ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি”। নীচে লেখা “পুলিশ মর্গ”। সামনে পুলিশের গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে দেখুন!’

পুলিশ মর্গ! কথাটা শুনেই অরিন্দমের বুক কেঁপে উঠল।

নার্স আবার ইয়ারফোনটা কানে লাগিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে মনোযোগ দিলেন।

অরিন্দম বেরিয়ে এল ইমার্জেন্সি থেকে। হাসপাতালের লম্বা করিডোর জুড়ে সন্ধের নরম আলো এসে পড়েছে। এখানে-ওখানে রোগীদের আত্মীয়স্বজন দাঁড়িয়ে আছে উদ্বিগ্ন মুখে। কেউ সিগারেট খাচ্ছে। কেউ ফোনে কথা বলছে। কেউ বা চা খাচ্ছে।

একটু খোঁজাখুঁজি করে নীল রঙের শাটার দেখতে পেল অরিন্দম। সত্যিই ওপরে বড় করে লেখা ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি’। নীচে ছোট করে ‘পুলিশ মর্গ’। সামনে দুটো সাদা রঙের পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে।

মর্গের দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন পুলিশকর্মী। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথার চুল কাঁচাপাকা। মুখে একটা অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভাব।

‘আপনি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়?’ অরিন্দম কিছু বলার আগেই তিনি জিগ্যেস করলেন।

‘হ্যাঁ।’

‘আমি কনস্টেবল সুখেন জানা। এসআই রতন ঘোষ বোধহয় আপনাকে ফোন করেছিলেন।’

অরিন্দম মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। রতনবাবুই ফোন করেছিলেন আমায়।’

‘দেখুন মিস্টার চট্টোপাধ্যায়।’ সুখেনবাবু মৃদু গলায় বললেন, ‘জানি এই কাজটা আপনার পক্ষে কম্ফর্টেবল হবে না। আপনার যদি মনে হয় একা একা পারবেন না, তাহলে কাউকে ফোন করে ডেকে নিতে পারেন। কোনও আত্মীয়স্বজন…’

‘না। আমি একাই পারব।’ সুখেনবাবুকে কথা শেষ করতে দিল না অরিন্দম।

সুখেনবাবু তাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। দরজার ধাতব হাতলটা স্পর্শ করতেই তার আঙুলগুলো ঠান্ডায় জমে গেল। আর ভিতরে পা রাখতেই হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়া শীতল বাতাস তাকে ঘিরে ধরল আষ্ঠেপৃষ্ঠে।

সাদা টালি মোড়া দেওয়াল। ছাদ থেকে ঝুলছে লম্বা লম্বা টিউবলাইট। সেই আলোতে সবকিছু অস্বাভাবিকরকম উজ্জ্বল, নির্জীব। দেওয়ালে দেওয়ালে ছোট ছোট নম্বর লেখা লকার। কিছু লকার খোলা, কিছু বন্ধ। খোলা লকারগুলোর ভিতর থেকে ধাতব ট্রে বেরিয়ে আছে।

ঘরের এক কোণে একটা ডেস্ক। সেখানে বসে একজন লোক মাথা নিচু করে কাগজপত্রে মুখ গুঁজে কাজ করছে। চোখে চশমা, মাথায় টাক।

ঘরের মাঝখানে একটা ধাতব টেবিল। তার ওপর ঢাকা সাদা চাদর। চাদরের নীচে হালকা উঁচু অংশ, তার রেখাচিত্র অবিকল একজন মানুষের অবয়ব ধারণ করেছে।

‘এই যে, আপনার স্ত্রী।’ সুখেনবাবু ধীরে ধীরে বললেন, ‘হোয়েনএভার ইউ আর রেডি…’

অরিন্দমের হাতটা তার অজান্তেই এগিয়ে গেল চাদরের কোনায়। হাতটা কাঁপছে। বুকের ভিতর ছটফট করা হৃৎপিণ্ডটা যেন পাঁজরের খাঁচা ভেঙে ছুটে পালাতে চাইছে। দম দেওয়া কলের পুতুলের মতো সে এক ঝটকায় সরিয়ে ফেলল চাদরটা।

কী অপূর্ব সুন্দর লাগছে প্রিয়াকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে তাকিয়ে রইল অরিন্দম। পানপাতার মতো গোল মুখ জুড়ে অদ্ভুত বিষণ্ণতা। চোখদুটো বন্ধ। দেখে মনে হচ্ছে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ঠোঁটদুটো শুকিয়ে ফেটে গেছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া কালচে রক্তের ফোঁটা। কপালের বাঁদিক থেকে গাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটা নীলচে কালশিটের দাগ। সম্ভবত গুলি লাগার পর রাস্তায় ছিটকে পড়ার সময় চোট পেয়েছিল। পরনে তার প্রিয় সাদা রঙের চুড়িদারটা। চুড়িদারটায় ভারি সুন্দর দেখাত প্রিয়াকে। কতবার বলবে বলবে করে আর বলে উঠতে পারেনি। আর বলা হল না।

মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে নিঃশ্বাস নিল অরিন্দম। প্রিয়ার শরীরের গন্ধটা যদি শেষবার বুক ভরে শুষে নেওয়া যায়! কিন্তু নাহ! প্রিয়ার শরীর জুড়ে এখন অন্য গন্ধ। মৃত্যুর গন্ধ। তীব্র কোনও জারক রাসায়নিকের ঝাঁঝ। অরিন্দমের নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে সেই গন্ধ, গলিত লাভার মতো তার শরীরের প্রতিটা অঙ্গ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে নামতে লাগল ধীরে ধীরে।

‘তুমি মরে গেছ প্রিয়া? তোমার তো মরে যাওয়ার কথা ছিল না। তুমি তো আমায় বলেছিলে, এই শহরটা আমাকে হাত ধরে ঘুরে দেখাবে একদিন। তুমি বলেছিলে, আমার সঙ্গে ভোরবেলায় বাগবাজারে রহমতের ছোট্ট গুমটির সেই মাটির ভাঁড়ের ধোঁয়া ওঠা চা খাবে। তোমাকে ছাড়া সেই ছোট্ট দোকানটা এই বিরাট শহরে কী করে খুঁজে পাব প্রিয়া? জানোই তো আমি মফস্‌সলের ছেলে। এই বিশাল শহরটা আমার কাছে এখনও অজানা।

‘কত কিছুই তো একসঙ্গে করা হল না আমাদের। তোমায় বলেছিলাম, আমার রানাঘাটের বাড়ির ছাদে শুয়ে আমরা সারারাত গল্প করব। তোমায় আমি সপ্তর্ষিমণ্ডল চেনাব। কলকাতায় আমাদের ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে তারাই দেখা যায় না! একবার চোখটা খোলো প্লিজ। তুমি তো কথা দিয়েছিলে, আমরা একসঙ্গে আরভকে বড় করে তুলব। নিজেও কথা রাখলে না, আমাকেও আমার কথাটুকু রাখতে দিলে না।’

অরিন্দম তার একটা হাত খুব আলগোছে প্রিয়ার গালের ওপর রাখল। সুখেনবাবু বাধা দিতে গিয়েও কী যেন ভেবে একটু পেছনে সরে এলেন। অরিন্দম খুব নিচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে অনুরোধ করল, ‘প্লিজ! একবার চোখটা খোলো। একবার আমার দিকে তাকাও। তারপর না হয় চলে যেও। কথা দিচ্ছি, আর পিছু ডাকব না। শুধু একটিবার চোখদুটো খোলো। আমার দিকে একবারটি তাকাও। শেষবারের মতো। প্লিজ!’

প্রিয়ার বন্ধ চোখদুটোর দিকে আসমুদ্র আকুতি নিয়ে তাকিয়ে থাকে অরিন্দম। অপেক্ষা করতে থাকে একটা ম্যাজিকের। কিন্তু হায়! সত্যিকারের ম্যাজিক বলে এই পৃথিবীতে কিছু হয় না। এই পৃথিবীকে ইট কাঠ পাথরের চরম বাস্তবতায় মুড়ে রেখেছেন বিধাতা।

অরিন্দমের মনে হল, সত্যিই কি সব শেষ? এইভাবে? এক লহমায়? আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে এভাবেই আরও একটা শতাব্দী পেরোবে। মাটিতে মিশে যাওয়া দুটো মানুষের বুকের ওপর জন্ম নেবে নামহীন দুটো বুনোফুল। ভেজা পৃথিবী জুড়ে হু-হু করে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়ার আশকারায় সে ফুলজোড়া গন্ধ ছড়াবে ভোরবেলা। প্রিয়ার প্রাণাধিক প্রিয় এই শহরে শুরু হবে নতুন একটা গল্প।

আমার শহরে নতুন তুমি অতিথি,
অলিগলি এখনও অচেনা।
এখনও জানো না এ শহর অভিমানী,
দাঙ্গা চেনে না, ধর্ম জানে না।
কখনও রাস্তার কলে জল আসে,
সব স্ট্রিটলাইট নিভে যায়।
কখনও শীতের ভোরে বাগবাজারের মোড়ে,
রহমত তার গুমটির ঝাঁপ খুলে চা বসায়।
ধোঁয়া ওঠে এনামেলের ডেকচিতে, মাটির ভাঁড়ে।
বিশ্বাস করো, এ শহর ভালোবাসতে জানে।
ঘেমো দুপুরে একলা ট্রাম চৌমাথা পেরোয়।
শেষ ট্রেনে ক্লান্ত হকারেরা খোঁজে বাঁচার মানে।
আমার শহরে নতুন তুমি অতিথি,
অলিগলি এখনও অচেনা।
এখনও জানো না এ শহর অভিমানী,
দাঙ্গা চেনে না, ধর্ম জানে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *