পঞ্চম পর্ব – দ্য ব্রেভ লেডি
সন্ধে নামছে। দূরে মণ্ডলবাড়ির আবছা অবয়বের পেছনে সূর্য মুখ লুকাচ্ছে ধীরে ধীরে। ঝাঁকড়া নারকেল গাছগুলোর পায়ের নীচে নিকষ অন্ধকার। তূর্য, নন্তু ঘোষের জমির চওড়া আল ধরে হাঁটছে টলমল পায়ে। তাবৎ রানাঘাট এক ডাকে চেনে নন্তু ঘোষকে। ঘোড়েল লোক। যদিও তূর্যকে কোনও এক অজানা কারণে তিনি বড় স্নেহ করেন।
চোখের সামনে উঁচু-নিচু এবড়ো-খেবড়ো রাস্তাটা দুলে দুলে উঠছে। দূরে অস্পষ্ট ঢাকের আওয়াজ, হাওয়ায় পুজো পুজো গন্ধ।
আর হাঁটতে পারছে না তূর্য। বসে পড়েছে কাঁচলা জমিতে। তার জুতো জামা প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে খেতের জমা জলে, সে বুঝতে পারছে। কিন্তু অনুভব করতে পারছে না। অসাড় হয়ে আসছে শরীরের নিম্নাংশ। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
জমির আলে মাথা রেখে চোখ বুজল সে। ভীষণ কষ্টতেও একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। স্বপ্ন, আশা, উদ্বেগ—যা কিছু আমাদের আত্মাকে শরীরের খাঁচায় বন্দি করে রাখে, আমাদের একঘেয়ে জীবনের চরম অবসাদ থেকে আগলে রাখে; সেইসব যখন অস্পষ্ট বিন্দুর মতো আস্তে আস্তে দিগন্তে মিলিয়ে যায়, তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করে মনের অবচেতনকে। হার স্বীকারেও স্বস্তি আছে, তলিয়ে যাওয়াতেও সুখ আছে।
ঘোর কাটল ছাতুদার ডাকে। তূর্য চোখ মেলে দেখল, সে বাগবাজারের বাড়িতেই রয়েছে। চিলেকোঠায় নিজের ঘরে, বিছানায়। এতক্ষণ তবে স্বপ্ন দেখছিল সে। উঠে বসল তূর্য। হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে একটা সিগারেট ধরাল।
‘বাবু, কেউ এসেছে। বেল টিপছে। তোমার নাম ধরে ডাকছে।’
‘কে?’
‘তা আমি কী করে জানব?’
‘আরে, মানে ওই রবীন শেঠ নয়তো? তুমি গিয়ে বলো, আমি বাড়ি নেই। আমি বরং ততক্ষণে খিড়কির দরজা দিয়ে…’
‘না না, ধুর! রবীন-টবীন নয়। অন্য লোকের গলা পেলাম তো।’
‘পুলিশ?’
‘পুলিশ আসলে কি একা আসত?’
‘ওহ! তাও বটে!’ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তূর্যর বুক চিরে। পরক্ষণেই সে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘তাহলে বোধহয় ক্লায়েন্ট। তুমি নীচে বসাও। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নামছি।’
মিনিট পনেরো পরে যখন তূর্য নীচে নামল, ততক্ষণে ছাতুদা ভদ্রলোককে চা করে দিয়েছে। লোকটা অফিসঘরের এক কোণে প্লাস্টিকের চেয়ারে কেমন যেন গুটিয়ে বসে আছে। তূর্যকে দেখেই শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। তূর্য হাতের ইশারায় তাকে বসতে বলে নিজে একটা বেতের মোড়া টেনে নিল।
‘তূর্য, আমায় চিনতে পারছিস?’
তূর্য প্রায় মিনিটখানেক চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল আগন্তুকের দিকে। তারপর দরাজ গলায় হেসে বলল, ‘অরিন্দম! শালা কত বছর পর দেখা! নিজেকে আগে আয়নায় দ্যাখ হতভাগা। চেনাই যাচ্ছে না।’
আরও দু-একটা কথা বলার পর অরিন্দম বলল, ‘ভাই, আমি কিন্তু তোর কাছে একটা বিপদে পড়েই এসেছি।’
‘বেশ। শুনছি। তার আগে একটা সিগারেট ধরাই। তোর সিগারেট চলে তো?’
অরিন্দম সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। তূর্য নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে আর একটা এগিয়ে দেয় অরিন্দমের দিকে। সিগারেট ধরাতে ধরাতে এবার ঘরের চারিদিকে চোখ বোলায় অরিন্দম। জরাজীর্ণ একটা কাঠের টেবিল। তার এক কোণে রাখা শূন্য হুইস্কির বোতল আর একটা কাচের গ্লাস। টেবিলের অন্য পাশে সিগারেটের প্যাকেটের স্তূপ। দেওয়ালে ঝোলানো কিছু পুরোনো ছবি। তাদের উপর পুরু ধুলোর আস্তরণ। এই সবকিছুর মাঝে একটা বেতের মোড়ায় বসে সিগারেটে টান দিচ্ছে তূর্য। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। শার্টের প্রথম দুটো বোতাম খোলা। চোখের দৃষ্টি কেমন উদাস, ঘোলাটে। সে দৃষ্টিতেই চোখের মালিকের শারীরিক দুর্বলতা স্পষ্ট।
হঠাৎ বাইরে অসময়ের বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে অবিরাম।
অরিন্দম ধীরে ধীরে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল তূর্যকে। বৃষ্টির কারণে ঘরের ভেতরটা আবছা অন্ধকার। শুধু একটা টিমটিমে হলদেটে বাল্ব জ্বলছে মাথার ওপর। তূর্য আর অরিন্দম মুখোমুখি বসে আছে একটা ছোট্ট টেবিলের দু’পাশে। পরিবেশটা থমথমে, ভারী।
তূর্য আবার একটা সিগারেট ধরায়। গভীর টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে মিলিয়ে যায় আবছা আলোয়। চোখ সরু করে অরিন্দমের দিকে তাকায় সে।
‘কিছু মনে করিস না, একটা প্রশ্ন করছি। তোর বা প্রিয়ার কি কোনও শত্রু আছে?’
অরিন্দম চমকে ওঠে, ‘শত্রু? মানে?’
‘আরে, শত্রু মানে শত্রু। তুই তো ব্যাঙ্কে কাজ করিস, তাই না? হয়তো কোনও লোন কাস্টমার… যার সম্পত্তি ব্যাঙ্ক বাজেয়াপ্ত করেছে? বা লোন রিকভারি নিয়ে ঝামেলা? এসব থেকেও অনেক সময় পার্সোনাল গ্রাজ তৈরি হয়।’
অরিন্দম মাথা নাড়ে। ক্লান্ত হাসি ফোটে তার মুখে, ‘না, না। তুই ভুল বুঝছিস। আমি সামান্য ক্যাশিয়ার ভাই। ক্রেডিট সেকশন, রিকভারি, ওসব অফিসাররা ডিল করে। ছাপোষা মধ্যবিত্ত জীবন আমার। সকাল দশটায় অফিস, সন্ধে ছ’টায় বাড়ি। রবিবার আর সেকেন্ড এবং ফোর্থ শনিবার ছুটি। মাসে একবার সিনেমা দেখা। এই আমাদের জীবন। সেখানে শত্রুর প্রশ্নই ওঠে না।’
তূর্য সিগারেটের ছাই ঝাড়ে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে, ‘ঠিক আছে। আরেকটা কথা… শেষবার যখন সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষের সঙ্গে তোর কথা হয়েছিল ফোনে, তখন কি তার গলায় কিছু অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল?’
অরিন্দম কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর বলে, ‘আমিই কেসের অগ্রগতি জানতে ফোন করেছিলাম। তখন রতনবাবু ধরতে পারেননি। তারপর কলব্যাক করেছিলেন। নাহ! একদম স্বাভাবিক গলা ছিল রতনবাবুর। কোনও টেনশন বা উত্তেজনা ছিল বলে মনে হয়নি। নরমালভাবেই আমাকে পরদিন থানায় এসে দেখা করতে বলেছিলেন।’
‘আর কী বলেছিলেন উনি?’
অরিন্দম চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করে, ‘বলেছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ওরা কিছু লিড পেয়েছেন। যে বোরখা পরা মহিলা শ্যামবাজার থেকে আরভকে কিডন্যাপ করেছে, সেই মহিলা নাকি বাগবাজার অটো স্ট্যান্ডের সামনে থেকে একটা কালো স্কর্পিওতে উঠেছিল।’
তূর্য সামনে ঝুঁকে আসে, ‘গাড়ির নম্বর পাওয়া গেছে?’
‘হ্যাঁ, গাড়ির নম্বর নাকি অলরেডি পাওয়া গেছে। রতনবাবু বলছিলেন, ওটাকে ট্রেস করার চেষ্টা করছেন তিনি। বলেছিলেন, ড্রাইভারকে অ্যারেস্ট করা গেলেই নাকি অনেক নতুন তথ্য উঠে আসবে।’
‘হুঁ।’ তূর্য অন্যমনস্কভাবে ছাইদানিতে ঘষে সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে। তারপর গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা। শুধু ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ আর দূরে একটা-দুটো গাড়ির হর্নের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।
এবার অরিন্দম একটু উসখুস করে প্রশ্ন করে, ‘তাহলে তুই কেসটা নিচ্ছিস তো ভাই?’
তূর্য সেই কথার জবাব না দিয়ে বলে, ‘তোর ফোনে প্রিয়া আর আরভের ফটো আছে তো? আমায় একটু হোয়াটস্যাপ কর।’
‘হ্যাঁ, আমি এখনই করে দিচ্ছি। আজ তাহলে উঠি!’
তূর্য সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। অরিন্দম বোঝে, তার বাল্যবন্ধু এখন চিন্তার জগতে ডুবে গেছে। সে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আরও বেশ খানিকক্ষণ পর হাওয়ার দাপটে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘোর ভেঙে দরজার দিকে তাকায় তূর্য। এতক্ষণে সে অনুধাবন করে যে অরিন্দম চলে গেছে! জানালার বাইরে অলস দৃষ্টিতে তাকায় সে। বৃষ্টি থামার নাম নেই।
এবার সে উঠে এসে জানালার সামনে দাঁড়ায়। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নম্বরে কল করে।
দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে চেনা গলা ভেসে আসে, ‘হ্যালো তূর্য! এতদিন পর! কেমন আছিস?’
‘ভালো আছি সুবিমলদা। আপনি কেমন?’
‘বেশ আছি। বল, কী ব্যাপার? নিশ্চয়ই কোনও কেস সংক্রান্ত দরকার। এই গরিব দাদাটাকে তো কাজ ছাড়া তোর মনে পড়ে না।’
তূর্য উত্তর না দিয়ে হেসে ফেলে। সিআইডির সুপার সুবিমল চক্রবর্তী তূর্যকে খুবই স্নেহ করেন। সেই রূপাং বস্তির কেস থেকে শুরু করে এর আগেও বেশ কয়েকবার তূর্য তাঁর সাহায্য নিয়েছে। এবং প্রতিবারই সুবিমল তাঁর সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন।
‘শুনুন না দাদা, আমার সত্যিই একটা হেল্প দরকার। আমার বন্ধু অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী প্রিয়া শ্যামবাজারের ওই ফায়ারিংয়ের ঘটনায় ক্রসফায়ারে মারা গেছে। আর প্রিয়ার সঙ্গে ওর বাচ্চাটা ছিল। সে ওখান থেকেই অ্যাবডাক্টেড। আমি কেসটা দেখছি।’ এই বলে ঘটনাটা সংক্ষেপে বর্ণনা করে তূর্য।
‘হ্যাঁ, আমি ওই কেসটার ব্যাপারে আগেই শুনেছি। ওই ঘটনায় যে কত নিষ্পাপ লোকের দুনিয়া তছনছ হয়ে গেল। ভয়ংকর ব্যাপার!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুবিমল।
‘দাদা, আমার দুটো জিনিস দরকার। একটা হল প্রিয়া চ্যাটার্জির পোস্টমর্টেম রিপোর্ট। আর দ্বিতীয়টা হল, যে ব্ল্যাক স্কর্পিও গাড়িতে ওই বোরখা পরা মহিলা উঠেছিল, মানে যে বাচ্চাটাকে কিডন্যাপ করেছে, সেই গাড়ির নম্বরটা।’
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সুবিমল বলেন, ‘দ্যাখ তূর্য, কেসটা এখন আর কলকাতা পুলিশের হাতে নেই। স্পেশাল টাস্ক ফোর্স, মানে এসটিএফ দেখছে পুরো ব্যাপারটা। খুব সেন্সিটিভ ইস্যু।’
‘হ্যাঁ, সেটা আমি বুঝতেই পেরেছি।’
‘এর আগে ওয়েস্ট বেঙ্গলে এত বড় টেররিস্ট অ্যাটাক কখনও হয়নি তূর্য। যে স্কেলে এই হামলা হয়েছে শ্যামবাজারে, যতজন মারা গেছে, যেভাবে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে… এটা এখন আর সাধারণ মার্ডার কেস নেই। এর সঙ্গে ন্যাশনাল সিকিওরিটি জড়িয়ে আছে।’
‘কিন্তু আমায় যে এই কেসটা নিতেই হবে দাদা। অরিন্দমের তিনজনের সংসার। এখন হঠাৎ স্ত্রী এভাবে চলে গেল। ছেলেটাকেও হারালে কী নিয়ে বাঁচবে মানুষটা!’
‘না না। আমি কেস ছেড়ে দিতে বলছি না। আমি শুধু বলছি, তুই খুব সাবধানে এই কেসটা ডিল কর। কেসটা কমপ্লিকেটেড হয়ে আছে। অনেক স্তরে তদন্ত চলছে। এখনও কোনও টেররিস্ট অর্গানাইজেশন এর দায়ভার নেয়নি। যেটা আরও বেশি টেনশনের কারণ। তাই এই ঘটনাটার সঙ্গে কানেক্টেড কোনও কেস ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে একটু এদিক-ওদিক হলেই তোর বড়রকমের সমস্যা হতে পারে।’
‘আই’ল বি ভেরি কেয়ারফুল…’
সুবিমল একটু নরম সুরে বললেন, ‘বুঝতে পারছি রে। যাই হোক, আচ্ছা শোন, শ্যামপুকুর থানার একজন অফিসার আমার খুবই পরিচিত। নাম দ্বৈপায়ন সাহা। ভালো ছেলে। অনেস্ট, ডেয়ারিং অফিসার। আমি তোকে ওর নম্বরটা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাচ্ছি এখনই।’
‘থ্যাংক ইউ দাদা! আপনি একেবারে ডার্লিং!’
‘থাক! আর বাটার লাগাতে হবে না। কেস সলভ হলেই তো ডার্লিংকে ভুলে যাবি। আর শোন, আমি দ্বৈপায়নকে বলেও দিচ্ছি যাতে সে তোকে সবরকমভাবে সাহায্য করে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, গাড়ির নম্বর, যা যা দরকার সব পাবি। কিন্তু মনে রাখিস…’
‘সেন্সিটিভ কেস। সাবধানে ডিল করতে হবে। মনে আছে।’ হালকা হেসে জবাব দেই তূর্য।
‘গুড! আর সেরকম বিপদে পড়লে আমায় অবশ্যই একটা রিং করবি।’
‘যথা আজ্ঞা স্যার।’
‘ছ্যাবলামো মারিস না। তিতলি মা কেমন আছে?’
তিতলির নামটা শুনেই কিছুক্ষণ চুপ করে যায় তূর্য। তারপর বলে, ‘তিতলির খবর আমি কী করে জানব? সুলগ্না আমায় কথা বলতে দেয় ওর সঙ্গে?’
‘তার জন্য তো তোমারও দোষ কম নেই চাঁদু!’
‘সেটা আলোচনা করে সর্ট আউট করা যেত। আমার মেয়েকে আমার থেকে এভাবে কেড়ে নেওয়ার কি খুব দরকার ছিল?’
‘দ্যাখ, আমাদের প্রত্যেকের কাছে নিজের কাজের একটা করে জাস্টিফিকেশন থাকে…’
‘আমি অত কিছু জানি না সুবিমলদা। শুধু বুঝি, যে সুলগ্নাকে আমি রূপাং পাহাড়ে দেখেছিলাম, যে সুলগ্নাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, সে আর নেই।’
‘সুলগ্নার সঙ্গে আমার যখন শেষ কথা হয়, সেও কিন্তু আমায় তোকে নিয়ে একই অভিযোগ করেছিল। বলেছিল, তুই নাকি চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছিস।’
‘হয়তো যাচ্ছিলাম। একবার হাত বাড়িয়ে বাঁচাবার চেষ্টাও তো করতে পারত।’
‘বুঝলাম। তোদের দুজনের মধ্যে অভিমানের পাহাড় জমে গেছে।’ স্নেহের সুরে বলেন সুবিমল।
‘অভিমান জমে জমে ঘৃণা হয়ে যায় সুবিমলদা। অভিমানের পাহাড় হয়তো জয় করা যায়, কিন্তু ঘৃণার পাহাড় দুর্লঙ্ঘ্য।’
‘একবার চেষ্টা তো করে দেখতে পারিস!’
‘ভাঙা কাচ জোড়া লাগে না দাদা। জোর করে জোড়া লাগলেও ক্ষতর দাগ রয়ে যাবে আজীবন। শুধু শুধু ক্ষতবিক্ষত সম্পর্ক বয়ে বেড়াতে চাই না। এই একা-বোকাই ভালো আছি।’
আরও দু-চারটে কথার পর ফোন রেখে দিলেন সুবিমল চক্রবর্তী। তূর্য তার হাতলভাঙা সিংহাসনে গা এলিয়ে বসে রইল। সুবিমলদা তাকে এবং সুলগ্নাকে বড় ভালোবাসেন। হয়তো তূর্যকে এভাবে দেখে তাঁর করুণা হয়। ভাবেন, তূর্য বড় একা। সে তো সবাই কমবেশি একা।
আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত মিথ চালু আছে। আমরা একা মানুষ দেখলেই ভাবি, সে বুঝি দুঃখবিলাসী। ভাবি, মানুষটা বুঝি একসমুদ্র কষ্ট বুকে চেপে শতাব্দীভর পথ হেঁটে চলেছে। তাই একা অথচ সুখী মানুষ দেখলেই আমাদের সেই চেনা সমীকরণটা ওলট-পালট হয়ে যায়। তখন আমরা ভাবি, মানুষটা বোধহয় ভড়ং করছে। বুকের ভেতরে জমে থাকা সমস্ত কষ্ট সন্তর্পণে ঢেকে রেখেছে ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রাখা হাসিটা দিয়ে।
তূর্যর অবশ্য সে বালাই নেই। সে নিজের মতো জীবন কাটায়। কষ্ট হলে কাঁদে, আনন্দ হলে প্রাণ খুলে হাসে। শুধু মাঝে মাঝে তন্দ্রার সুযোগ নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দুটো পা তার বুকের ভেতর ছুটে বেড়ায়। সে প্রাণপণে চেষ্টা করে তাকে ছুঁতে। কিন্তু পারে না। ওই কষ্টটুকু বাদ দিলে তূর্য দিব্যি আছে।
শ্যামপুকুর থানার সামনে এসে দাঁড়াল তূর্য। পুরোনো বিল্ডিং। লাল উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। নীল দেওয়াল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে মনে তথ্যগুলো আরেকবার গুছিয়ে নিল সে। প্রিয়ার মৃত্যু, আরভের অপহরণ, রতন ঘোষের সন্দেহজনক অ্যাক্সিডেন্ট। সবকিছু কি একটা বড় জিগস পাজেলের আলাদা আলাদা টুকরো?
দোতলায় উঠে এল তূর্য। থানার ভেতর চরম ব্যস্ততা। ফোনের রিং বাজছে একটানা। কনস্টেবলরা ছুটোছুটি করছে। একজন অফিসার চিৎকার করে অধস্তনকে ধমকাচ্ছেন। একজন কনস্টেবলের কাছে গিয়ে দ্বৈপায়ন সাহার নাম বলায় সে আঙুলের ইশারায় একটা টেবিল দেখিয়ে দিল। টেবিলের পেছনে বসে আছেন একজন তরুণ অফিসার। তিরিশের কোঠায় বয়স, শার্প চেহারা, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তূর্যকে এগিয়ে আসতে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাত বাড়ালেন, ‘আপনিই নিশ্চয়ই তূর্যবাবু?’
‘হ্যাঁ। অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।’
‘আরে, সুবিমল স্যার নিজে বলে দিয়েছেন। আর এই কেসে আমরাও এখন সাইডলাইনে চলে গেছি। মানে বাচ্চাটার কিডন্যাপিংয়ের কেসটা আমাদের হাতে আছে, কিন্তু যতগুলো মার্ডার ওখানে হয়েছে, সেটা পুরোটাই এসটিএফ দেখছে। আমরা অ্যাসিস্ট করছি যদিও। তবে এসটিএফের চিফ নিখিল শর্মা খুব কড়া ধাতের লোক। মনে হয় না, কেসের ডেভেলপমেন্টের কোনও ইনফরমেশন শেয়ার করবেন।’
‘বুঝলাম। কিন্তু পোস্টমোর্টেম আর ব্যালিস্টিক রিপোর্টের অ্যাকসেস নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে আছে। আমায় আপাতত সেটাই প্রোভাইড করুন।
‘বেশ। একটু ওয়েট করুন। আমি খুঁজে আনতে বলছি। কিন্তু কপি আপনাকে দিতে পারব না।’
মিনিট পনেরো পর একজন কনস্টেবল এসে একটা কোবরা ফাইল রেখে যায় টেবিলের ওপর। তূর্য ফাইলটা হাতে নেয়। খোলে। প্রথম পাতাতেই প্রিয়ার ছবি। হাসিমুখ, প্রাণবন্ত চোখ। সে পাতা ওলটাতে থাকে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের বিস্তারিত তথ্য। গুলি লেগেছিল বুকের বাঁ-দিকে, সোজা হৃৎপিণ্ডে। তাৎক্ষণিক মৃত্যু।
এবার তূর্য ব্যালিস্টিক রিপোর্ট খোলে। চোখ বুলায় লাইনগুলোতে। হঠাৎ থমকে যায়। তারপর মাথা তুলে অবাক স্বরে প্রশ্ন করে, ‘স্নাইপার রাইফেল?’
‘হ্যাঁ। প্রিয়া চ্যাটার্জির শরীর থেকে যে বুলেট উদ্ধার করা হয়েছে, সেটা একটা বিদেশি স্নাইপার রাইফেলের। ব্যারেট এম-এইটটিটু, আমেরিকান মেড। খুব শক্তিশালী, লং রেঞ্জ। ফিফটি বিএমজি ক্যালিবার, আঠেরোশো মিটার রেঞ্জ। মিলিটারি গ্রেড অস্ত্র।’
তূর্য গভীর মনোযোগ দিয়ে ফাইলটা পড়ছিল। তার মগজে এখন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। চোখ না তুলেই সে প্রশ্ন করে, ‘এই ধরনের অস্ত্র সাধারণত কারা ব্যবহার করে?’
‘মিলিটারি, স্পেশাল ফোর্স বা খুব হাই-প্রোফাইল প্রফেশনাল হিটম্যান। এটা কোনও সাধারণ জঙ্গির হাতে থাকার কথা নয়। বুঝতেই পারছেন, এই রাইফেল দিয়ে এক কিলোমিটার দূর থেকেও টার্গেট লক করা যায়।’
‘মানে প্রিয়াকে প্ল্যানফুলি টার্গেট করা হয়েছিল। এটা কোনও ক্রসফায়ার নয়!’
‘দুটো সম্ভাবনা আছে। একটা তো আপনি যেটা বলছেন, আরেকটা হতে পারে টার্গেট অন্য কেউ ছিল। টার্গেট মিস হয়ে প্রিয়া ম্যাডামের গায়ে গুলি লাগে। তবে একটা ব্যাপার হল…’
দ্বৈপায়ন থেমে যান। একটা ফাইল থেকে কয়েকটা ছবি বের করেন। টেবিলে সাজিয়ে রাখেন, ‘ওইদিন শ্যামবাজারে যে হামলাটা হয়েছিল, সেখানে প্রিয়া ম্যাডামসহ মোট তেরোজন মারা গেছেন। এই ছবিগুলো হল সেই দিন ঘটনাস্থল থেকে কালেক্টেড বুলেট শেলের।’
তূর্য ছবিগুলো দেখে। ছোট ছোট ধাতব খোল, কিছু বড়, কিছু ছোট।
দ্বৈপায়ন একটা ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘এগুলো হল নাইন মিলিমিটার বুলেট শেল। পুলিশের স্ট্যান্ডার্ড পিস্তল। আর এগুলো একে-ফিফটিসিক্স আর একে-ফর্টিসেভেনের শেল। ওখানে যত বুলেট শেল পাওয়া গেছে, সবগুলোই হয় নাইন এমএম পিস্তল থেকে, না হয় একে-ফর্টিসেভেন বা ফিফটিসিক্স থেকে। একমাত্র প্রিয়া চ্যাটার্জির ক্ষেত্রে আলাদা। তার শরীর থেকে যে বুলেট বের করা হয়েছে, সেটা ওই স্নাইপার রাইফেলের। যেটা পুরো ঘটনায় আর কোথাও ব্যবহার হয়নি। এটার কোনও শেলও পাওয়া যায়নি। অবশ্য সেটা অবভিয়াস। নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে গুলি করা হয়েছিল।’
তূর্য পিছনে হেলান দেয়। চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড ভাবে। তারপর বলে, ‘তার মানে প্রথম সম্ভাবনাটাই ঠিক হওয়ার চান্স বেশি। কারণ, যদি প্রিয়া টার্গেট না হতো, তাহলে হয়তো আরেকটা সেকেন্ড চান্স নেওয়া হতো।’
‘যুক্তি তো তাই বলে।’
‘কিন্তু কেন? একজন সাধারণ সিভিলিয়ানকে মারতে এত এফোর্ট কেন? তাছাড়া কিলার তো ওই ভিড়ে মিশে গিয়েই গুলি চালাতে পারত। ওখানে তো অলরেডি গুলির বন্যা চলছিল। আলাদা করে স্নাইপারের দরকার পড়ল কেন?’
‘দুটো কারণ হতে পারে। এক, খুনি নিশ্চিত হতে চেয়েছিল যাতে প্রিয়া ম্যাডামের কিল কনফার্মড হয়। আর দুই, এক্স্যাক্টলি কে প্রিয়া ম্যাডামকে গুলি করছে, সেটা যাতে সিসিটিভি থেকে কোনওভাবেই প্রকাশ না পায়।’
‘তাহলে আগের প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে। প্রিয়া তো কোনও সেলিব্রিটি নয়, তাহলে সেই ভয়টাই বা থাকবে কেন? যাই হোক, স্নাইপার কোথা থেকে গুলি করেছিল, সেটা ট্রেস করা গেছে?’
‘চেষ্টা চলছে। এখন তো পুরো কেসটাই এসটিএফ দেখছে। আমাদের জাস্ট কিছু অর্ডার দিলে আমরা এক্সিকিউট করছি। কেসের প্রগ্রেস আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছে না এসটিএফ। তবে বুলেটের এন্ট্রি অ্যাঙ্গেল দেখে আমার ধারণা, স্নাইপার ছিল বিটি রোডের দিকের কোনও উঁচু বিল্ডিংয়ে।’
‘ঘটনার সময় প্রিয়া কোথায় ছিল?’
দ্বৈপায়ন এবার একটা ম্যাপ বের করেন, ‘এই দেখুন। এটা ঘটনাস্থলের ম্যাপ। এই যে লাল চিহ্নগুলো দেখছেন, এখানে বডিগুলো পাওয়া গিয়েছিল। প্রিয়া ম্যাডামের বডি পাওয়া গিয়েছিল এখানে। তিনি বোধহয় ঝামেলা বুঝে আশ্রয় নিয়েছিলেন এই চায়ের দোকানের সামনে।’
তূর্য ম্যাপটা মনোযোগ দিয়ে দেখে। মনে মনে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করে। হঠাৎ ক্রসফায়ার শুরু হয়, মানুষ ছোটাছুটি করছে, চিৎকার, আর্তনাদ। আর সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে বহুতলের ছাদে দাঁড়িয়ে একজন স্নাইপার, শান্ত মাথায়, লক্ষ্য স্থির করে, ট্রিগার টানে। প্রিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
‘আচ্ছা দ্বৈপায়নবাবু, আরভ কোথায় ছিল তখন?’
‘সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, গুলি চলা শুরু হতেই প্রিয়া আরভকে ওড়না দিয়ে নিজের সঙ্গে বেঁধে নেন। কিন্তু গুলি লাগার পর প্রিয়া ম্যাডাম পড়ে যান এবং ওড়নার বাঁধন খুলে দেন, যাতে আরভ পদপিষ্ট না হয়। তখন আরভ কাঁদতে শুরু করে। তারপর সেই বোরখা পরা মহিলা আসে, আরভকে তুলে নিয়ে যায়।’
‘বাপ রে! এ তো অসম্ভব সাহসী এবং ঠান্ডা মাথার মহিলা। হ্যাটস অফ!’
‘শুধু তাই নয়। ওই ক্রসফায়ারের মধ্যেই উনি আততায়ীদের পাথর ছুড়ে আহত করে সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। সত্যিই অসম্ভব ব্রেভ লেডি। এরকম একটা মানুষের মৃত্যুটা আমিও জাস্ট মেনে নিতে পারছি না।’
‘হুম। আচ্ছা, প্রিয়ার ফোনের কল লগ পাওয়া যাবে?’
‘হ্যাঁ। রতনবাবু কী সন্দেহ করেছিলেন জানি না, কিন্তু তিনি অলরেডি প্রিয়া ম্যাডামের কল লগ জোগাড় করেছিলেন। শেষ তিন মাসের। হয়তো আরভের মিসিং কেসের ইনভেস্টিগেশন করার জন্যই। এই নিন।’
ডকুমেন্টটা হাতে নেয় তূর্য। মোটা একটা ফাইল। পাতার পর পাতা নম্বর, তারিখ, সময়, কল ডিউরেশন। সে ফাইল খুলে প্রথম পাতা থেকেই দেখতে শুরু করে।
‘আমি নিজেও কৌতূহলবসত একবার চেক করেছি। বেশিরভাগই ফ্যামিলি। অরিন্দমবাবু, প্রিয়া ম্যাডামের শাশুড়ি অর্থাৎ অরিন্দমবাবুর মা, ম্যাডামের বোন আর দু-একজন বান্ধবী।’ বলেন দ্বৈপায়ন।
‘হুম। তাও একবার চোখ বুলিয়ে দেখি। কখনও কখনও ছোট জিনিস আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।’
‘অবশ্যই। টেক ইওর টাইম। আমি ততক্ষণ আমার হাতের কাজগুলো একটু সামলে নিই।’ এই বলে দ্বৈপায়ন নিজের কাজে মন দিলেন।
তূর্য মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে কল লগ দেখতে থাকে। একটা একটা করে নম্বর দেখে। কতবার কল হয়েছে, কত সময় ধরে কথা হয়েছে। বেশিরভাগ নম্বরই চেনা। অরিন্দম, বোন, শাশুড়ি। সেগুলোর নিচে স্টার মার্ক করে রিসিপিয়েন্টের নাম লেখা। কিছু অচেনা নম্বর রয়েছে। কিন্তু সেগুলো খুব কম। বেশিরভাগই জোমাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন ইত্যাদি।
হঠাৎ একটা নম্বরে তূর্যর চোখ আটকে যায়। একটা মোবাইল নম্বর, দু-তিনদিন পরপরই কল হয়েছে। কখনও একবার, কখনও দু’বার। ডিউরেশন বেশি না, খুব বেশি হলে দু-তিন মিনিট।
দ্বৈপায়ন কম্পিউটারে চোখ রেখেছিলেন। তূর্য তাঁকে ডেকে নম্বরটা দেখিয়ে জিগ্যেস করল, ‘এই নম্বরটা? প্রায় রোজই তো কল হয়েছে।’
দ্বৈপায়ন ঝুঁকে দেখেন নম্বরটা। তারপর হেসে বলেন, ‘ওহ, ওটা? হ্যাঁ। ওটা ট্রেস করেছিলাম। প্রিয়ার এক স্কুল ফ্রেন্ড। নাম রিমি ঘোষ। তার সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। খুব ভালো ফ্রেন্ড ছিল। প্রায়ই গল্পগুজব হতো। ওই সংসার, বাচ্চাদের পড়াশোনা, এইসব আর কী।’
তূর্য আরও কিছুক্ষণ ফাইলটা দেখে। আপাতভাবে কিছু অস্বাভাবিক খুঁজে পায় না।
‘আপনি কি প্রিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেছেন? তার অতীত, পড়াশোনা, বা কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিনা?’
‘হ্যাঁ, করেছি। খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকে উঠে আসা। বাবা একটা স্কুলে হেডমাস্টার ছিলেন, মা গৃহিণী। একটা অ্যাক্সিডেন্টে দুজনেই মারা যান। সেই সময় প্রিয়া ম্যাডাম একটা দীর্ঘকালীন ডিপ্রেশনে চলে যান। সমস্ত আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কানেকশন বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন। আর পড়াশোনা বলতে প্রিয়া ম্যাডাম যাদবপুরে পড়েছেন। ইংলিশ অনার্স। প্রথমে একটা প্রাইভেট স্কুলে জয়েন করেছিলেন। তারপর আরভ হওয়ার পর আর চাকরি কন্টিনিউ করেননি।’
‘কোনও পলিটিকাল কানেকশন?’
‘না। কোনও পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। শুধু সল্টলেকের একটা এনজিও-র সঙ্গে বোধহয় যুক্ত ছিলেন। সেটা রতনবাবুই প্রথম জানতে পেরেছিলেন। পরে তিনি সেখানে নিজে গিয়ে কনফার্ম করেছিলেন। তার নোটসেই সেকথা পেয়েছি আমরা।’
‘কী নাম এনজিও-র?’
‘মাতৃশক্তি। অ্যাসিড অ্যাটাক ভিক্টিমদের জন্য তৈরি। তাদের দিয়ে হ্যান্ডিক্রাফটস তৈরি করিয়ে সেগুলো এক্সিবিশন করানো হয়। মেনলি ইউএস ফান্ডিংয়েই চলে।’
‘বুঝলাম। আচ্ছা, এবার ওই ব্ল্যাক স্কর্পিও গাড়িটার ব্যাপারে কিছু ইনফরমেশন দরকার ছিল।’
দ্বৈপায়নের মুখটা এবার একটু গম্ভীর হল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। ব্ল্যাক স্কর্পিওর নম্বরপ্লেট জাল। যে নম্বরপ্লেট গাড়িতে লাগানো ছিল, সেই নম্বরের কোনও গাড়িই সরকারি রেজিস্ট্রেশনে নেই। আমরা আরটিও অফিসে চেক করেছি, সেই নম্বরে কোনও গাড়ি রেজিস্টার্ড নেই।’
‘তার মানে সেই গাড়িটা ট্রেস করা অসম্ভব?’
‘অসম্ভব বলব না। কিন্তু খুব কঠিন। আমরা এখন যেটা করছি, সেটা হল সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটে দেখছি। বাগবাজার থেকে সেই গাড়িটা কোনদিকে গেছে, কোন রাস্তা দিয়ে গেছে, সেটা ট্রেস করার চেষ্টা করছি। কিন্তু কলকাতায় সব জায়গায় তো সিসিটিভি নেই। অনেক জায়গায় গ্যাপ আছে। আমরা তখন দেখছি, আশেপাশে কোনও দোকান বা ব্যাঙ্ক বা সরকারি অফিস আছে কিনা, যেখানে সিসিটিভি আছে। সেই ফুটেজগুলোও রিট্রিভ করছি। পুরো ব্যাপারটা একটা পাজেল সলভ করার মতো।’
‘কতদূর পর্যন্ত ট্রেস করতে পেরেছেন?’
দ্বৈপায়ন আরেকটা ম্যাপ বের করে, ‘এই দেখুন। এটা আমাদের ট্র্যাকিং। বাগবাজার থেকে গাড়িটা উত্তরদিকে গেছে। বিদ্যাসাগর সেতু পার হয়েছে। তারপর হাওড়ার দিকে গেছে। কিন্তু তারপর আর কোনও সিসিটিভিতে এখনও অবধি ধরা পড়েনি।’
‘মানে লাস্ট নোন লোকেশন হাওড়া?’
‘হ্যাঁ। হাওড়ার ওই এলাকায় সিসিটিভি কভারেজ কম। আর যদি তারা জেনে বুঝে সিসিটিভি এড়িয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তো কাজটা আরও কঠিন।’
‘বোরখা পরা মহিলার কোনও আইডেন্টিটি পাওয়া গেছে?’
‘না। বোরখায় মুখ সম্পূর্ণ ঢাকা ছিল। উচ্চতা আন্দাজ পাঁচ ফুট নয় বা দশ ইঞ্চি। রোগা শরীর। এর বেশি কিছু বলা মুশকিল।’
‘বাপ রে! মেয়েদের তুলনায় এটা তো বেশ ভালো হাইট।’
‘হ্যাঁ সে তো বটেই। দাঁড়ান। পুরো সিসিটিভি ফুটেজটা আপনাকে দেখাই।’
তারপর প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে খুব মন দিয়ে তূর্য খুঁটিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের প্রতিটা ফ্রেম দেখল। যেখানে মহিলা হাত বাড়িয়ে আরভকে কোলে তুলছেন, সেখানে পজ করে বলল, ‘এইখানটা একটু জুম করুন তো।’
‘বুঝেছি। হাত দেখে বুঝতে চাইছেন তো সত্যি সত্যিই মেয়ে, নাকি আসলে কোনও পুরুষ বোরখা পরেছে? না মশাই, আমি চেক করেছি। মেয়েদের হাত দেখলেই বোঝা যায়। জুম করছি দেখুন।’
‘হুম। ইন্টারেস্টিং! আচ্ছা আরেকটা কথা জিগ্যেস করছি। এটা যদিও আমার কেসের সঙ্গে রিলেটেড না-ও হতে পারে। তবু বলতে পারেন খানিকটা পার্সোনাল কিউরিওসিটি থেকেই প্রশ্নটা করছি। সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষের মৃত্যুর ব্যাপারে যদি একটু ডিটেলড ইনফরমেশন দেন। তাঁর সঙ্গে যখন অরিন্দম শেষবার কথা বলেছিল, তিনি বলেছিলেন কিছু নতুন লিড পেয়েছেন।’
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। রতনবাবুর বাইক দুর্ঘটনা হয়েছিল ইএম বাইপাসে। ভোরবেলা। বাইক ডিভাইডারে ধাক্কা মারে, উলটে যায়। স্পটেই মৃত্যু।’
‘এটা কি সত্যিই অ্যাক্সিডেন্ট ছিল? নাকি কোনও ফাউল প্লে থাকলেও থাকতে পারে?’
‘টু আর্লি টু সে। ফরেনসিক টিম এখনও চেক করছে। গাড়ির ব্রেক ফেল হয়েছিল কিনা, নাকি কোনও ট্যাম্পারিং ছিল, সেটা দেখছে। কিন্তু এখনও কোনও কংক্রিট প্রুফ পাইনি। আপাতত যা জানা গেছে তা হল, রতনবাবু সেদিন রাতে একা ছিলেন। বাড়ি ফেরেননি। সেদিন ভোরবেলা কোথা থেকে আসছিলেন, বা কোথায় যাচ্ছিলেন, সেটা পরিষ্কার নয়।’
‘তাঁর ফোন রেকর্ড?’
‘এখনও হাতে পাইনি। যদি ফরেনসিক রিপোর্টে কিছু গড়বড় থাকে, তবেই সেটা আনাব ভেবেছিলাম। কেন বলুন তো? আপনি কি কিছু সন্দেহ করছেন?’
‘সবে তো কেসটা হাতে নিলাম। এখনই কিছু বলা মুশকিল। তবে আমি বলব কল রেকর্ড আনিয়েই রাখুন।’
‘বেশ। বলছেন যখন, আমি আনিয়ে দিচ্ছি।’
‘রতনবাবুর কি কোনও শত্রু ছিল? মানে পার্সোনাল বা প্রফেশনাল ফিল্ডে…’ খানিক নিচু গলায় প্রশ্ন করল তূর্য।
‘দেখুন, আমাদের যা কাজ, তাতে বন্ধুর থেকে শত্রুই বেশি। তবে এটুকু বলতে পারি যে, রতনবাবু একজন এক্সেলেন্ট পুলিশ অফিসার ছিলেন। সৎ, নিষ্ঠাবান। কোনও দুর্নীতির অভিযোগ নেই। পরিবারে স্ত্রী আর একটা মেয়ে। পার্সোনাল লাইফে অন্তত কোনও শত্রু থাকার প্রশ্নই ওঠে না।’
‘তার মানে যদি এটা মার্ডার হয়ে থাকে— মানে মার্ডারই হয়েছে সেটা বলছি না। কিন্তু যদি হয়ে থাকে— তাহলে শুধুমাত্র একটাই কারণ থাকতে পারে। এই কেস। তিনি হয়তো এমন কিছু জেনে গিয়েছিলেন, যেটা অন্য কারোর অস্বস্তির কারণ হতে পারে।’
‘হুম! অসম্ভব নয়।’
ঘরে আবার নীরবতা নামে। কিছুক্ষণ পর দ্বৈপায়ন বলেন, ‘সাধারণত কিডন্যাপিংয়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ব়্যানসম কল আসে। কিন্তু এখানে কিছুই আসেনি। ইতিমধ্যে চারদিন হয়ে গেছে। এটা একটাই জিনিস বোঝায়। কিডন্যাপারদের উদ্দেশ্য টাকা নয়।’
তূর্য নিরুত্তর থাকে। মোবাইল বের করে প্রিয়ার কল লগের শেষ তিনটে পৃষ্ঠার ছবি তুলে নেয়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এখন উঠছি। অনেক ধন্যবাদ। আপনার সাহায্য আমার অনেক কাজে লাগবে।’
‘গ্ল্যাড টু হেল্প।’ হেসে বলেন দ্বৈপায়ন।
তূর্যও মৃদু হেসে মাথা নাড়ে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে মনে মনে সব তথ্য গুছিয়ে নিতে থাকে। প্রিয়াকে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে মারা হয়েছে। মানে, তাকে স্পেসিফিকালি টার্গেট করা হয়েছিল। কিন্তু কেন? একজন সাধারণ হাউজওয়াইফকেই কেন? ব্ল্যাক স্কর্পিওর নম্বরপ্লেট জাল। মানে কিডন্যাপাররা পেশাদার। তার থেকেও বড় কথা, সবকিছু ওয়েল প্ল্যানড। কিডন্যাপাররা আগে থেকেই জানত, ওখানে ওই ঘটনাটা ঘটবে। অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটাই কানেক্টেড। তাছাড়া রতন ঘোষের সন্দেহজনক মৃত্যু! নর্মাল অ্যাক্সিডেন্ট, নাকি প্ল্যানড মার্ডার? আরভের কোনও খবর নেই। কোনও ব়্যা নসম কল নেই। সবকিছু মিলিয়ে একটা বড় ছবি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু এখনও সবকিছু অস্পষ্ট।
