ষষ্ঠ পর্ব – মৌমাছি, মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি
থানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়তেই ঘোর কেটে যায় তূর্যর। তপ্ত সূর্যের আলো এসে আছড়ে পড়েছে মুখে। আলোর তীব্রতায় চোখ কুঁচকে যায় তার। সে মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নেয়। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুটপাত ধরে মেট্রো স্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকে।
হঠাৎ তার বুক পকেটে ফোনটা কেঁপে কেঁপে বাজতে শুরু করে।
‘হ্যালো?’
‘হ্যালো! আপনি তূর্য ভট্টাচার্য?
‘হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?’
‘আমার নাম রিয়া সেনগুপ্ত। আমি একজন সাংবাদিক। “দুনিয়ার দর্পণ”–এ কাজ করি। আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।’
‘কেন? আমি তো ভোটে দাঁড়াচ্ছি না। আমার সঙ্গে আবার সাংবাদিকদের কী দরকার?’
‘আপনি কি সাধারণত মানুষের সঙ্গে এরকমই রুড বিহেভ করে থাকেন?’
‘মানুষদের সঙ্গে করি না। শুধু সাংবাদিক দেখলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না।’ হেসে ফেলে তূর্য।
‘শ্যামবাজার টেররিস্ট অ্যাটাকের ব্যাপারে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন শেয়ার করার ছিল। আজ সকালে সুবিমল স্যারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, স্যার আপনাকে রেকমেন্ড করেছিলেন। আপনি সাংবাদিকদের এরকম খিল্লির চোখে দ্যাখেন, সেটা স্যার বোধহয় বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। যাই হোক, ফোনটা ধরার জন্য ধন্যবাদ। রাখছি।’
‘আরে, খেপছেন কেন? সরি সরি। বলুন কী তথ্য! আমি শুনছি।’
‘ফোনে বলতে পারব না। আমাদের দেখা করতে হবে। আজ সন্ধ্যায়?’
‘ঠিক আছে। কোথায়?’
‘কফি হাউস, কলেজ স্ট্রিট। ছ’টার সময়?’
‘ঠিক আছে।’
ফোন কেটে যায়। তূর্য মেট্রোর টিকিটের লাইনে দাঁড়ায়।
সন্ধে নামছে কলেজ স্ট্রিটে। স্ট্রিটলাইটগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। আর সেই আলোর নরম ছ’টা এসে পড়ছে পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর কাঠের দেওয়ালে। বিকেলের রোদ্দুর মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু বেলাশেষের নরম উত্তাপ এখনও বাতাসে রয়ে গেছে। চলন্ত ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দ, রিকশার ঘণ্টি, বইয়ের দোকানে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দরদামের গুঞ্জন, সব মিলিয়ে কলকাতার এই প্রাচীন রাস্তার এক চিরচেনা সন্ধ্যা।
কফি হাউসের ভিতরটা নরম আলোয় আলোকিত। সিলিং থেকে ঝুলছে পুরোনো ফ্যান। তার পাখাগুলো অবসন্ন লয়ে ধীরে ধীরে ঘুরছে। এই অদ্ভুত জায়গার প্রতিটা চেয়ার টেবিল বহন করছে অসংখ্য স্মৃতি। বাতাসে ভাসছে সদ্য তৈরি কফির গন্ধ। গাঢ়, তীব্র সেই গন্ধ নাকে এসে লাগছে। তার সঙ্গে মিশে আছে সিগারেটের ধোঁয়া, পুরোনো সোঁদা গন্ধ আর মানুষের চাপা স্বরে কথাবার্তার অদ্ভুত সুরেলা মূর্ছনা।
চারিদিকে মানুষ। এক কোণে কয়েকজন তরুণ উত্তেজিত হয়ে হাত নেড়ে, গলার স্বর চড়িয়ে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে। অন্য টেবিলে দুই বৃদ্ধ খবরের কাগজ পড়তে পড়তে মাথা নাড়ছেন। মাঝে মাঝে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় কিছু বলছেন। টেবিলে টেবিলে ছুটে বেড়ানো ওয়েটাররা ব্যস্ত।
তূর্য বসে আছে দোতলার এক কোণে। সামনের টেবিলে রাখা কফির কাপ থেকে উঠছে অস্বচ্ছ বাষ্প। সে বাষ্প কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে শূন্যে। হাতে মোবাইল ফোন। সবেমাত্র অরিন্দমের ফোনটা রাখল সে। অরিন্দম বড় উতলা হয়ে উঠেছে। যদিও তাতে কিছুমাত্র দোষ দেখছে না তূর্য। সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। সে নিজেও খানিক অন্যমনস্ক।
কফিতে একটা চুমুক দেয় তূর্য। ঠান্ডা হয়ে গেছে। তেতো লাগছে স্বাদ। নাক কুঁচকে ফেলে সে। ওয়েটারকে ডেকে নতুন একটা কফি আনতে বলবে, ঠিক তখনই নিজের নাম শুনে ফিরে তাকায়।
‘এক্সকিউজ মি, আপনিই তূর্যবাবু তো?
প্রথম দৃষ্টিতে মেয়েটার যা চোখে পড়ল, তা হল তার অদ্ভুত টুপি। টুপিতে মুখের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঢাকা। তার ওপর এই ভর সন্ধেবেলা ঘরের ভেতর সানগ্লাস পরায় বড় বেমানান লাগছে। টুপির বাধা পেরিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটার মুখটা ডিম্বাকার। গালে হালকা টোল। কপালে দু-একটা এলোমেলো চুল এসে আছড়ে পড়েছে। পাতলা ঠোঁটে নার্ভাস একটুকরো হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। পরনে সাদা খাদির কুর্তি। নীচে নীল জিনস। কাঁধে ঝোলানো একটা বাদামি রঙের বড় চামড়ার ব্যাগ। মেয়েটা যেভাবে ব্যাগটা ধরে আছে, তাতে সেটা বেশ ভারী বলেই মনে হচ্ছে।
সম্ভবত টুপিটার জন্যেই, তূর্য এক মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজেকে সামলে নেয়। উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘হ্যাঁ, আমিই তূর্য। আপনিই নিশ্চয়ই রিয়া সেনগুপ্ত?’
রিয়া অল্প হেসে জবাব দেয়, ‘হ্যাঁ। বসতে পারি?’
‘অবশ্যই। বসুন।’
রিয়া চেয়ারটা টেনে বসে পড়ে। তূর্য লক্ষ করে, মেয়েটার বসার ভঙ্গিতে একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়ো আছে। যেন যে কোনও মুহূর্তে কিছু একটা হয়ে যাবে। শরীরটা সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে, দুই হাত টেবিলের ওপর রেখে, আঙুলগুলো মুঠো করে বসেছে সে।
ওয়েটার এগিয়ে আসে। বয়স্ক মানুষ, পঞ্চাশের কাছাকাছি, সাদা ড্রেস, মাথায় সাদা ঝুঁটিওয়ালা টুপি। হাতে ছোট্ট নোটপ্যাড আর একটা সরু পেনসিল নিয়ে বিনয়ের সঙ্গে জিগ্যেস করে, ‘কী হবে ম্যাডাম?’
‘একটা কোল্ড কফি প্লিজ। আপনি?’ শেষ প্রশ্নটা সে করে তূর্যর চোখে চোখ রেখে।
তূর্য হাত নেড়ে বলে, ‘না, আমার দরকার নেই। থ্যাংক ইউ।’
‘ফোনে আমার পরিচয় দিয়েছি। তাও আরও একবার বলছি। আমি মূলত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। গত আট বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রেস্টিজিয়াস নিউজ এজেন্সিতে কাজ করছি।’
‘আমি তূর্য। অবশ্য আপনিই যখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তখন আই গেস আপনি আমার পরিচয় অলরেডি জানেন। তাই সরাসরি কাজের কথাতেই আসি। এবার বলুন, আপনি কোন ইনফরমেশন আমার সঙ্গে শেয়ার করার কথা বলছিলেন?’
‘বলছি। তার আগে একটা কথা বলে নিই। আমি জানি, আপনি অরিন্দম চ্যাটার্জির হয়ে তদন্ত করছেন। তার ছেলে আরভের অপহরণ এবং তার স্ত্রী প্রিয়ার মৃত্যুর কেসটা আপনি হাতে নিয়েছেন।’
‘সুবিমলদা বলেছেন নিশ্চয়ই?’
‘হ্যাঁ। আমার সঙ্গে সুবিমল স্যারের আলাপ অনেক বছরের। এর আগেও অনেক কেসে উনি আমাকে হেল্প করেছেন।’
‘হ্যাঁ। সুবিমলদার মতো হেল্পফুল মানুষ সিস্টেমে খুব কমই আছে।’
‘হ্যাঁ। এনিওয়ে যেটা বলছিলাম, সেদিন শ্যামবাজারে আমি ছিলাম। মিছিল কভার করছিলাম।’
তূর্য মাথা নিচু করে কাপে চুমুক দিচ্ছিল। রিয়ার শেষ কথাটা শুনে চমকে মাথা তুলে তাকাল। রিয়া বলে চলল, ‘হ্যাঁ। আমিই সেদিন স্টোরিটা কভার করছিলাম। আমার সঙ্গে থাকা ক্যামেরাম্যান ভিডিও করছিল। এবং সেই ফুটেজে আমি এমন কিছু দেখেছি, যা পুলিশ হয়তো সিসিটিভি ফুটেজে লক্ষ করেনি।
রিয়া এবার ব্যাগ হাতড়ে একটা ট্যাবলেট বের করল। সেটা অন করে ফুটেজটা চালিয়ে বলল, ‘এই দেখুন।’
ট্যাবলেটের স্ক্রিনে ভিডিও চলতে শুরু করে। মিছিলের ফুটেজ, মানুষের ভিড়, পোস্টার, ব্যানার…
রিয়া এক জায়গায় ভিডিওটা পজ করে বলে, ‘এই জায়গাটা দেখুন। এটা মিছিল শুরু হওয়ার দশ মিনিট আগের ফুটেজ।’
ভিডিওতে কয়েকজন মানুষকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পোশাক অদ্ভুতরকম ফুলে রয়েছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তারা সাধারণ মিছিলকারী নয়। এমনকী তাদের চলাফেরাও খানিকটা সামরিক ধাঁচের। মুখে স্কার্ফ বাঁধা, চোখে সানগ্লাস।
‘জামার তলায় বুলেটপ্রুফ ভেস্ট?’
‘এক্স্যাক্টলি। তাছাড়া পিঠের ব্যাগে অত্যাধুনিক অস্ত্রও লুকানো আছে। আরও দেখুন। এদের ভঙ্গি, দাঁড়ানোর স্টাইল দেখুন। এরা ট্রেইনড।’
‘জঙ্গি?’
‘নাহ! তেরো মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ডে স্কিপ করুন। একজনের স্কার্ফ খুলে গেছিল। এরা ভারতীয় বা পাকিস্তানি তো নয়ই, এশিয়ানও নয়। হয় ইউরোপিয়ান, নয়তো আমেরিকান। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এরা ভাড়া করা প্রাইভেট মার্সিনারি।’
তূর্য ভিডিও পজ করে জুম করে খুব কাছ থেকে লোকটাকে দেখে। সত্যিই লোকটা সাদা চামড়ারই বটে। পিঠে একটা ট্যাকটিকাল ব্যাগ।
তূর্য বিড়বিড় করে বলে, ‘মানে এরা আগে থেকেই প্ল্যান করে এসেছিল। সুযোগ বুঝে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।’
‘এক্স্যাক্টলি।’
ওয়েটার কফি নিয়ে আসে। দুজনেই চুপ করে যায়। কফি টেবিলে রেখে ওয়েটার চলে যায়।
‘আপনি এসব তথ্য পুলিশকে দিয়েছেন?’
‘নাহ! কেন দিইনি সেটা একটু পরে নিজেই বুঝতে পারবেন।’ বলে আবার রিয়া ট্যাবলেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
‘তো আপনি আমার কাছে এলেন কেন?’
‘কারণ পুলিশের ওপর যে পলিটিকাল প্রেশারটা আছে সেটা আপনার ওপর নেই। আর আপনি পেশাগতভাবে একজন গোয়েন্দা। আপনার এক্সপার্টিস আমার কাজে লাগবে। তাছাড়া যেহেতু আপনিও এই কেসের সঙ্গেই অ্যাসোসিয়েটেড, তাই আপনারও লাভ। আল্টিমেটলি দুজনের কাছেই উইন-উইন সিচুয়েশন।’
‘কিন্তু এতে আপনার স্বার্থটা কোথায়? আপনি একজন সাংবাদিক। আপনাদের মতো ইয়েলো জার্নালিজম করা সাংবাদিকদের কাছে ইনফরমেশন মানে তো জাস্ট একটা পণ্য। টিআরপি আর সেনসেশনালিজমের জন্য আপনারা যা খুশি করতে পারেন। এমনকী সেই ইনফরমেশন ফ্যাব্রিকেট অবধি করতে পারেন।’
মুহূর্তে রিয়ার চোখ-মুখ ধারালো হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে, ‘আপনি এর আগেও আমাকে ইনসাল্ট করেছেন। আমি তখন কিছু বলিনি। আপনি বোধহয় আমাকে চেনেন না, মিস্টার ভট্টাচার্য। আমি গত আট বছর ধরে মাথা উঁচু করে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করছি। আমি যা লিখি, তার পেছনে সলিড প্রুফ থাকে। কেউ আজ অবধি আমার গায়ে একফোঁটা কালি ছেটানোর সুযোগ পায়নি। আর এথিকস বিসর্জন দিলে আমি আজ এখানে আপনার সামনে বসে থাকতাম না।’
‘মানে?’ একটু অবাক হয় তূর্য।
‘মানে এর পেছনে অনেক বড় খেলা জড়িয়ে আছে। অনেক পাওয়ারফুল মানুষ এর সঙ্গে জড়িত।’
‘খেলা মানে? কীসের খেলা? একটু খুলে বলুন প্লিজ। এত হেঁয়ালি আমার ভালো লাগে না।’
‘আপনি ডিফেন্সটেক সল্যুশনসের সঙ্গে ইন্ডিয়ার যে অস্ত্র চুক্তি হতে চলেছে, সেই বিষয়ে কিছু জানেন?’
‘হ্যাঁ। জানি মানে যেটুকু খবরে দেখেছি। নেক্সট মাসে কলকাতায় যে ডিফেন্স ফেয়ার হচ্ছে, সেখানেই তো ডিল সাইন হবে শুনেছি।’
‘হ্যাঁ। ভারত সরকার চিনের একটা প্রাইভেট ডিফেন্স কোম্পানির কাছ থেকে সামরিক ড্রোন কিনছে। অত্যাধুনিক এআই চালিত ড্রোন, যেগুলো থেকে প্রায় দু-হাজার কিলোমিটার রেডিয়াস অবধি সার্ভেইলেন্স করা সম্ভব। চিনের সেই প্রাইভেট ডিফেন্স কোম্পানির নাম ডিফেন্সটেক সল্যুশনস। ডিলের আমাউন্ট প্রায় পাঁচশো কোটি ডলার।’
‘বাপ রে! এ তো বিশাল অঙ্ক।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু সমস্যা হল, এই ডিফেন্সটেক সল্যুশনসের ইন্টারন্যাশনাল রেপুটেশন ভালো নয়।’
‘মানে?’
‘মানে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে তাদের ওপর স্পাই হিসেবে কাজ করার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তারা যেসব দেশে অস্ত্র বিক্রি করেছে, সেসব দেশের গোপন সামরিক তথ্য তারা বিক্রি করে দিয়েছে অন্য দেশের কাছে। ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা— সব জায়গায় এদের কালো ইতিহাস আছে।’
‘তাহলে ভারত সরকার এদের সঙ্গে ডিল করবে কেন?’
‘সেটাই প্রশ্ন। বিপক্ষ দল তো বটেই, সরকারের মধ্যেও অনেকে এই ডিলের বিরোধী। খোদ পিএমও নাকি এই ডিল সাইন করতে রেডি ছিল না। সিকিউরিটি অ্যাডভাইজাররাও সতর্ক করেছিল। এমনকী মিডিয়াতেও এই নিয়ে শোরগোল শুরু হয়েছিল।’
‘তাহলে?’ বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করল তূর্য।
‘তাহলে আর কী! বর্তমান ডিফেন্স মিনিস্টার, প্রতাপ দুবে, একরকম কারোর কথা না শুনেই এই ডিলটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কোয়ালিশন সরকারের এটাই তো সবথেকে বড় সমস্যা। প্রতাপ দুবের দল সাপোর্ট সরিয়ে নিলে সরকার ভেঙে যাবে। সো বুঝতেই পারছেন…’
‘হুম! আর এই সবের মধ্যেই হঠাৎ…’
‘এই সবের মধ্যে হঠাৎ শ্যামবাজারে টেররিস্ট অ্যাটাক। তেরোজন মৃত। আরও ডজনখানেক আহত। পুরো কলকাতা আতঙ্কে কাঁপছে। আর মিডিয়া? মিডিয়া এখন শুধু টেররিজমের কথাই বলছে। ডিফেন্স ডিল এখন আর টিআরপি দিচ্ছে না।’
‘তার মানে আপনি কী বলতে চাইছেন…’
‘আমি বলতে চাইছি যে এই টেররিস্ট অ্যাটাকটা আসলে একটা ডিকয় ছিল। ডিফেন্স চুক্তি থেকে মিডিয়া এবং জনগণের নজর সরিয়ে নেওয়ার জন্য। এখন সাধারণ মানুষের মনে শুধু ভয়, ক্ষোভ, টেররিজমের বিরুদ্ধে রাগ। এবং এই পরিস্থিতিতে যদি সরকার বলে যে আমরা আরও শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জাম কিনছি, তাহলে কি কেউ আপত্তি করবে? বরং সবাই স্বাগত জানাবে।’
তূর্য পেছনে হেলান দেয়। তার মাথা ঘুরছে। এত বড় একটা ষড়যন্ত্র? এটাও কি সম্ভব?
‘আপনি যেটা বলছেন তার কোনও প্রমাণ আছে?’ হঠাৎ কী একটা ভেবে প্রশ্ন করে তূর্য।
‘কংক্রিট প্রমাণ নেই। শুধু সার্কামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স। টাইমিং, এই ট্রেইনড মার্সিনারিস আর এই ডিলের সঙ্গে কিছু ইনফ্লুয়েনশিয়াল মানুষের লিঙ্ক। সব মিলিয়ে একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে না?’
‘তাহলে আপনি এই স্টোরিটা পাবলিশ করছেন না কেন?’
‘করতে চেয়েছিলাম তো। কিন্তু আমার বস এখন আর চাইছেন না। তিনি বলছেন, এই টেররিস্ট অ্যাটাকের পরে মানুষের মনে একটা ক্ষত তৈরি হয়েছে। এই সময়ে ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে এমন কোনও চুক্তির বিরোধিতা করা মানে চ্যানেলের ক্ষতি করা। মানুষ আমাদের দেশদ্রোহী বলবে। টিআরপি নেমে যাবে। পাবলিক গ্রিভান্সের শিকার হতে হবে চ্যানেলকে।’
তূর্য হেসে ওঠে, ‘শালা মিডিয়ার টিআরপি আর বিজনেস…’
‘কিছু করার নেই। এথিকসের থেকে টিআরপি বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। বিশ্বাস করুন, স্টোরিটা রিলিজ করানোর জন্য আমি অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরে গেছি। আমার লেখা স্টোরি হয়তো এখন এডিটরের রুমের ডাস্টবিনে পড়ে আছে।’
তূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর কেটে কেটে বলে, ‘তো আপনি আমার কাছ থেকে কী চান?’
‘আমি চাই আমরা একসঙ্গে কাজ করি। আপনি খুঁজছেন আরভকে আর প্রিয়াকে মারার পিছনের আসল রহস্যকে। আমি খুঁজছি, এই পুরো ষড়যন্ত্রের পেছনের কংক্রিট প্রমাণ। আমাদের লক্ষ্য এক না-ই হতে পারে, কিন্তু পথ এক। আমি জানি, আপনি একজন ভালো ইনভেস্টিগেটর। সুবিমল চক্রবর্তীর কাছ থেকে আপনার ব্যাপারে শুনেছি। আর আমার কাছে এমন সব সোর্স আছে, যা আপনার নেই। মিডিয়ার কানেকশন, ইনসাইড ইনফর্মেশন।’
‘আর বিনিময়ে আপনি কী চান?’
‘যখন সত্যটা বের হবে, অর্থাৎ আমরা সলিড প্রুফ পাব, তখন আমি সেটা পাবলিশ করব। এক্সক্লুসিভ স্টোরি।’
‘এই তো পথে এসেছেন।’
তূর্যর কথায় মেখে থাকা শ্লেষটা বুঝতে অসুবিধে হল না রিয়ার। সে ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি স্টোরি চাই। কারণ সত্যটা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেটাই আমার একমাত্র অস্ত্র। আপনি যেমন আরভকে বাঁচাতে চান, আমিও চাই সত্যটা বাঁচুক।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তূর্য বলল, ‘ঠিক আছে। আমরা একসঙ্গে কাজ করব। কিন্তু শর্ত হল, আমি যা বলব, তাই করবেন। নিজে থেকে হুটহাট কোনও স্টেপ নেবেন না।’
‘সরি স্যার। এই কেসে আমি আপনার সহকর্মী। কর্মচারী নই।’ কেজো স্বরে জবাব দিল রিয়া।
‘ফাইন। কিন্তু আপনি যা বলছেন তা যদি সত্যি হয়, তাহলে এখানে অনেক শক্তিশালী মানুষেরা জড়িত। তারা আমাদের থামাতে যা খুশি করতে পারে। তখন বিপদ দেখে কেটে পড়বেন না যেন।’
‘সেটা আপনাকে আমায় না শেখালেও চলবে। আমি গত আট বছরে অনেক বড় বড় মানুষের বিরুদ্ধে স্টোরি করেছি। এখনও মাথা উঁচু করে সার্ভাইভ করছি।’
‘বাবা রে বাবা! ঠিক আছে, এই ভিডিওগুলো আমাকে পাঠান। আমায় আরেকটু খুঁটিয়ে দেখতে হবে।’
‘বেশ পাঠালাম। আর কিছু?’
‘আর ডিফেন্সটেক সল্যুশনসের ব্যাপারে যা কিছু ইনফরমেশন আপনার কাছে আছে, সব চাই। তাদের প্রতিনিধি হিসাবে কারা এসেছে, কলকাতায় তারা কোথায় থাকছে, কাদের সঙ্গে মিটিং করছে, সব।’
‘আমার কাছে একটা পুরো ফাইল আছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
তূর্য উঠে দাঁড়ায়, ‘ঠিক আছে। আমি এগুলো দেখব। কাল আবার যোগাযোগ করছি। ফোনে সবসময় অ্যাভেলেবল থাকবেন।’
রাত নেমেছে। তূর্য বাগবাজারের বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে তার খাটে আধশোয়া হয়ে মোবাইলে রিয়ার পাঠানো ভিডিওগুলো দেখছে। একটার পর একটা প্লে করছে, পজ করছে, জুম করছে। এরপর কয়েকটা স্ক্রিনশট নেয় সে। তারপর রিয়ার পাঠানো ডিফেন্সটেক সল্যুশনসের ফাইলটা খোলে। একটা একটা করে ডকুমেন্টগুলো পড়তে শুরু করে। কোম্পানির সিইও লি জিয়াং সম্পর্কে গুগল খুলে একটু পড়াশোনা করে। কলকাতায় তাদের প্রতিনিধি হিসাবে যে টিমটা এসেছে, তাদের লিড করছেন ঝাও মিং। কোম্পানির বেশ উঁচু পদে রয়েছেন ইনি।
এছাড়াও ফাইলে আছে তাদের অতীতের কেলেঙ্কারি। বেশ কিছু দেশ তাদের বিরুদ্ধে সামরিক তথ্য পাচারের গুরুতর অভিযোগ এনেছে। যদিও কোনওটাই এখনও পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। তূর্য মনোযোগ দিয়ে ডকুমেন্টগুলো পড়তে থাকে। যত পড়ছে, তত বুঝতে পারছে, রিয়া সম্ভবত ঠিকই বলেছে। এই কোম্পানির সঙ্গে কোনও ডিল করা সত্যিই বেশ রিস্কি।
কিন্তু প্রতাপ দুবে কেন সবার বিপক্ষে গিয়ে এই ডিল করতে বদ্ধপরিকর? টাকা? ক্ষমতা? নাকি অন্য কিছু?
মাথা ঝিমঝিম করছে। মনটা হালকা করতে ফেসবুক খুলে স্ক্রল করতে শুরু করল সে। একটার পর একটা পোস্ট, অচেনা মুখ, হাসিখুশি মানুষ, খাবারের ছবি। হঠাৎই একটা জায়গায় এসে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
একটা ছবি। রেস্তোরাঁর উষ্ণ হলুদ আলোয় তিনজন। সুলগ্না, তিতলি, আর একজন অচেনা লোক। সুলগ্নাই সেলফি তুলেছে। তিতলি তার ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে লোকটার গলা। সুলগ্নার অন্য হাতে রঙিন মকটেল। তিনজনেই মন খুলে হাসছে।
তূর্যর প্রথমে মনে হল ভুল দেখছে বুঝি। আবার ভালো করে দেখল। নাহ! সুলগ্না নিজেই পোস্ট করেছে। লোকেশন ট্যাগও আছে। দিল্লি শহরের একটা অভিজাত রেস্তোরাঁ। হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল তূর্যর। তারপর ধীরে ধীরে বিষাক্ত সাপের মতো হিসহিসিয়ে নেমে এল রাগ। ঠান্ডা, তীব্র, জ্বলন্ত রাগ। তার হাতটা কাঁপছিল থরথর করে।
রাগটা স্তিমিত হয়ে এলে কষ্টটা এল ঢেউয়ের মতো। তার মেয়ে তিতলি অন্য একজন মানুষের গলা জড়িয়ে ধরেছে। তূর্যর মনে হল, একটা অদম্য ঘৃণা পচা মদের মতো নেশাতুর করে তুলছে তাকে। কতকটা সেই নেশার ঘোরেই ফোনটা হাতে নিল সে। সুলগ্নার নম্বরটা ফোন থেকে ডিলিট করে দিয়েছিল। কিন্তু এখনও মনের গহীন থেকে সেটাকে খুঁজে বের করতে দেরি হল না। তূর্য নম্বরটা ডায়াল করল।
‘হ্যালো?’ সুলগ্নার গলায় বিরক্তি।
‘তুমি কোথায়?’
‘তূর্য, আমার কাছে এসবের সময় নেই। পরে ফোন কোরো। এখন রাখছি।’
‘চুপ! যেটা জিগ্যেস করেছি, সেটার জবাব দে!’ চিৎকার করে উঠল তূর্য।
‘সিন ক্রিয়েট কোরো না। তোমার মেজাজ শোনার জন্য আমি বাধ্য নই। আমি এখন বিজি আছি। ফোনটা রাখো। পরে…’
‘বিজি তো থাকবিই। শোন, তুই নিজে যেখানে যাবি যা। কিন্তু আমার মেয়েকে নিয়ে ভাতারের সঙ্গে দেখা করতে যাবি না। আমি শেষবারের মতো সাবধান করছি।’
‘মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ তূর্য! আর কী বললে? তোমার মেয়ে, নাকি? লজ্জা করে না কথাগুলো বলতে? মেয়ের প্রতি কোন দায়িত্বটা পালন করেছ তুমি? তুমি বাবা হিসাবে, স্বামী হিসাবে, এমনকী নিজের কাজের জায়গাতেও ব্যর্থ। তোমার নিজের ভুলে তোমার ক্লায়েন্ট মারা গিয়েছিল, আর সেটার জন্য দিনের পর দিন ভুগেছি আমরা। তোমার ডিপ্রেশন থেকে ভায়োলেন্ট হয়ে যাওয়ার শিকার হয়েছি আমরা। দিনের পর দিন মদ খেয়ে যে তাণ্ডব বাড়িতে করে গেছ, সেসব ভুলে গেলে?’
‘তখন একটু তো পাশে থাকতে পারতে সুলগ্না! আমি তো তোমাদেরই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম। আমার নিজের ভুলের জন্য একটা দশ বছরের বাচ্চা মেয়েকে মেরে দিল ওরা। আমি যদি আর একটা দিন আগে কেসটা সলভ করতে পারতাম, যদি আর একটা দিন আগে মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পারতাম, তাহলে হয়তো ও ওই সেপটিক ট্যাঙ্কের অন্ধকারের বদলে নিজের বাবা-মায়ের কোলে থাকত। আমি তখন কী করে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম বলো তো? কিন্তু তুমি তো একটু আমায় সামলাতে পারতে সুলগ্না! আমায় ওই অন্ধকারের মধ্যে ফেলে তোমরা চলে যাবে, সেটা আমি কোনওদিনও…’ ধীরে ধীরে গলা নরম হয়ে এল তূর্যর।
‘চেষ্টা করেছিলাম তূর্য। বিশ্বাস করো, অনেক চেষ্টা করেছিলাম।’
খানিক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। তারপর তূর্য বলল, ‘তিতলিকে একবার ফোনটা দেবে প্লিজ?’
‘একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্যাখো ক’টা বাজে! তিতলি অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে ওর স্কুল আছে।’
‘আর তুমি? তুমি এখনও জেগে আছ কেন?’
‘এই শোবো।’
‘বেশ। শুয়ে পড়ো। রাখলাম।’
‘হুম! গুড নাইট। আরেকটা কথা, রোহিত আমার ক্লায়েন্ট। হ্যাপিলি ম্যারেড। একটু খেয়াল করলে দেখতে পেতে ছবিতে ওর স্ত্রী-ও কমেন্ট করেছে।’
‘আমার কী? গুড নাইট।’ তূর্য মৃদু হেসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মাথাটা একটু হালকা লাগছে। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে একটা সিগারেট ধরায় সে। মাথার পাশে রাখা বালিশের ওপরেই ছাইটা ঝাড়তে থাকে।
সন্ধের আলো যখন কলকাতার আকাশ থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন তূর্য একটা বাসে চেপে চলল অরিন্দমের বাড়ির দিকে। আজ বিকেলেই অরিন্দম ফোন করেছিল। মাতৃশক্তি এনজিও থেকে নাকি একজন মহিলা এসেছিলেন অরিন্দমের বাড়িতে। কিন্তু কী এমন কথা হয়েছে তাঁর সঙ্গে যে অরিন্দম ইমিডিয়েটলি তূর্যকে তার বাড়িতে ডাকল? বাস যত এগোচ্ছিল, তত প্রশ্ন জমা হচ্ছিল তূর্যর মনে। মাতৃশক্তি এনজিও, নামটা যেন একটা অশরীরী ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এই পুরো তদন্তে। প্রিয়া কীভাবে তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? সিম্পাথাইজার? একটা ইউএস-ব্যাকড এনজিও-র কি প্রিয়ার মতো চুনোপুঁটি সিম্পাথাইজারের আদৌ প্রয়োজন আছে?
তূর্য এসে থামল বড়বাজার সংলগ্ন একটা শান্ত এলাকায়। চারতলা অ্যাপার্টমেন্টের দোতলায় অরিন্দমের ফ্ল্যাট। তূর্য সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে মনের মধ্যে একাধিক প্রশ্ন সাজিয়ে নিচ্ছিল পরপর।
বেল টিপতেই অরিন্দম দরজা খুলল। তার চোখের তলায় জমা হওয়া কালিতে ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের অনিদ্রা। সারা মুখ জুড়ে গোঁফ-দাড়ি বেড়ে উঠেছে। কেমন একটা অগোছালো, উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে। পরনের টি-শার্টটা বোধহয় হপ্তাদুয়েক ধরে একইভাবে পরে আছে।
‘আয়। চা খাবি?’ অরিন্দম ক্লান্ত গলায় বলল।
‘না, থাক। আমি বেশিক্ষণ বসব না। মাতৃশক্তি এনজিও-র সম্পর্কে তুই কী কী জানিস, একটু খুলে বল তো?’ তূর্য সোফায় বসে সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকে গেল।
অরিন্দম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘বিশেষ কিছুই জানি না রে! যিনি এসেছিলেন তিনি বলছিলেন, ওরা অ্যাসিড ভিক্টিম মহিলাদের কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করে। প্রিয়া নাকি মাঝে মাঝে ওদের কিছু অনুষ্ঠান বা ওয়ার্কশপে যেত। আমি তো সারাদিন বাড়িতে থাকতাম না। আরভও স্কুল যেত। তখন প্রিয়া কোথায় যেত না যেত… তেমন ডিটেইলসে কখনও জিগ্যেস করিনি।’
‘ওই ভদ্রমহিলা তোকে কী বলছিলেন?’
‘প্রথমে তো স্বাভাবিক সমবেদনার কথাই বলছিলেন। বললেন, প্রিয়া খুব ভালো মানুষ ছিল, ওদের এনজিও-র জন্য অনেক কাজ করেছে। তারপর হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে উনি অদ্ভুত সব প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। ওই জন্যই তো তোকে ডাকা।’
‘অদ্ভুত প্রশ্ন? যেমন?’ নড়েচড়ে বসল তূর্য।
‘যেমন ধর জিগ্যেস করলেন, প্রিয়া বাড়িতে কোনও ডকুমেন্টস বা প্যাকেট রেখে গেছে কিনা। ওদের এনজিও-র কিছু কাগজপত্র নাকি প্রিয়ার কাছে ছিল। আর প্রিয়া শেষ কয়েকদিন বিশেষ কারোর সঙ্গে কথা বলেছিল কিনা, সেটাও জানতে চাইলেন।’
তূর্য সামনে ঝুঁকে বসল, ‘তুই কী বললি?’
‘আমি আবার কী বলব? বললাম যে আমি কিছু জানি না। তারপর জোরজুলুম করতে লাগলেন, প্রিয়ার ঘরে ঢুকে কীসব খোঁজার জন্য। শেষে আমি বিরক্ত হয়ে ভদ্রভাবে তাকে বিদায় করে দিলাম।’
তূর্য সোফায় হেলান দিল। মাথার ভেতর চিন্তাগুলো দ্রুত সাজিয়ে নিচ্ছে সে। তারপর জিগ্যেস করল, ‘ওই মহিলার চেহারা মনে আছে তোর?’
‘হ্যাঁ। মনে কেন থাকবে না? এই তো কয়েক ঘণ্টা আগেই দেখলাম। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স হবে। শরীরটা একটু ভারীর দিকে। কালো পাড় দেওয়া সাদা শাড়ি পরেছিলেন। আর হ্যাঁ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা ছিল।’
তূর্য উঠে দাঁড়াল, ‘ঠিক আছে। আমায় একবার প্রিয়ার ঘরে, মানে তোদের বেডরুমে নিয়ে চল তো।’
দুজনে এসে ঢুকল বেডরুমে। আধুনিক কায়দার একটা ডিভান, একটা স্টিলের আলমারি, একটা বইয়ের ওয়ারড্রোব, খাটের পাশে রাখা একটা ছোট বেড টেবিল। তূর্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করতে লাগল। ডিভানের ভিতর, বেড-সাইড টেবিলের প্রতিটা ড্রয়ার! আলমারিতে সাজিয়ে রাখা শাড়িগুলো খাটের উপর নামিয়ে তন্নতন্ন করে কী যেন খুঁজতে লাগল। অবশেষে বইয়ের তাক থেকে প্রতিটা বই নামিয়ে নামিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল।
‘কী খুঁজছিস?’ একটু অবাক হয়েই জিগ্যেস করল অরিন্দম।
‘মধু খুঁজছি রে, মধু! যে মধুর গন্ধে গন্ধে মৌমাছিরা ভনভন করছে এই ফ্ল্যাটের চারিদিকে।’
অরিন্দম ফ্যাকাসে মুখে তাকিয়ে রইল বন্ধুর দিকে। তূর্যর হেঁয়ালিপূর্ণ উত্তরটা যে তার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পারেনি, তা বলাই বাহুল্য।
