চতুর্থ পর্ব – নিঃস্ব গোয়েন্দা

চতুর্থ পর্ব – নিঃস্ব গোয়েন্দা

জানালার বাইরে পিচরাস্তা ধরে অযথা ছুটোছুটি করছে গাড়িগুলো। একে অন্যকে টপকাতে তীব্র স্বরে হর্ন বাজাচ্ছে। সেই হর্নের কানফাটানো শব্দ বন্ধ জানালার ফাঁক গলে কানে আসছে। আজ বোধহয় বুধবার। তূর্যর ঘুম এখনও পুরোপুরি কাটেনি। দু’চোখ জুড়ে আসছে তন্দ্রায়। মুখের ভিতর অদ্ভুত টক স্বাদ। মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।

মশারির ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে সে মাথার কাছের টেবিলে রাখা চশমাটা খুঁজতে যাবে, তখনই ছাতুদা ঘরে ঢুকল। হাতে চায়ের কাপ। টেবিলে কাপটা রেখে চশমাটা হাতের কাছে এগিয়ে দিল ছাতুদা। তারপর একটু দূরে গিয়ে একটানে জানালার পর্দা সরিয়ে পাল্লাদুটো খুলে দিল।

হঠাৎ চোখে রোদ এসে পড়ায় মাথাটা ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল। দু’হাত দিয়ে চোখ ঢেকে, অনেকক্ষণ বসে রইল তূর্য। সে জানে, ছাতুদাকে বলে লাভ নেই। জানালা বন্ধ হবে না। ছাতুদা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর ধীর পায়ে নীচে নেমে গেল। এখান থেকে পাড়ার বারোয়ারি পুজোর ঠাকুরদালান দেখা যায়। ঠাকুর এখনও দালানেই বানানো হয়। কালই ঠাকুর গড়ার কাজ শেষ হয়েছে। একচালার প্রতিমা। ডাকের সাজ, সবুজ অসুর।

তূর্য শুনেছে, এককালে এই পুজো নাকি এই পরিবারের পুজো ছিল। অর্থাৎ, এখন তূর্য বাগবাজারের সরু গলির মধ্যে যে বাড়ির চিলেকোঠার ঘরটা ভাড়া নিয়ে আছে, তাদের। পুজোর ক’টা দিন নীচের দালানে এক হাজার লোকের পাত পড়ত। অষ্টমীতে কামান দাগা হতো।

এখন সেসব কিচ্ছু নেই। এই বিশাল বাড়ি কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে একা। মানুষ বলতে ছাতুদা, মানে তার সবসময়ের ফাইফরমাশ খাটার লোক, আর তূর্য নিজে। দুটো তলা মিলিয়ে মোট সতেরোটা ঘর। সামনের দু’ঘর ভাড়াটিয়া ছাড়া সবই ফাঁকা। নেহাত ভাগবাটোয়ারা নিয়ে শরিকে শরিকে দীর্ঘকালীন বিবাদ চলছে, নইলে এই ন্যূনতম ভাড়ায় এত বছর এখানে ঘাঁটি গেড়ে থাকা তূর্যর অনেক আগেই ঘুচে যেত।

বছর আটেক আগে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তূর্য বড় একা হয়ে গিয়েছিল। তার পর একটা কেসের সূত্র ধরেই তার জীবনে আসে এই ছাতুদা। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। পাকা চুল। কপালে বয়সের ছাপ। তার আগেই মালিক খুন হলে, পুলিশ ছাতুদাকেই বিনা অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। সেবার তাকে নিশ্চিত যাবজ্জীবনের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল তূর্য। সেই থেকে এই ছাতুদাই তার ডান হাত, বাঁ হাত, অজুহাত—সবই। তূর্যর একার সংসারে একমাত্র অভিভাবক।

প্রায় মাস ছয়েক হল, ছাতুদাকে কানাকড়িও মাইনে দিতে পারেনি তূর্য। তাও বিনা প্রতিবাদে, বিনা দ্বিধায় মানুষটা তূর্যর সঙ্গে রয়ে গেছে। হয়তো তার আর কোথায় যাওয়ার জায়গা নেই বলেই!

কতকটা বাবা-মা’র চলে যাওয়ার একাকিত্ব থেকেই, বছর সাতেক আগে সুলগ্নাকে আচমকাই বিয়েটা করে ফেলেছিল তূর্য। তার দু’বছর পর তিতলি এল ওদের দুজনের সংসারে। মাতিয়ে রাখত এই কঙ্কালসার, প্রায় পরিত্যক্ত বনেদি বাড়ির আনাচ-কানাচ। কিন্তু ওরা এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর তূর্য যেন আরও একা হয়ে পড়েছে।

বিশাল উঁচু উঁচু খিলানের কোণে জমেছে মাকড়সার জাল। সামনের উঠোন ছেয়ে গেছে হাঁটুছোঁয়া চোরকাঁটায়। উত্তরের ছাদের কোণে মাথা চাড়া দিয়েছে অশ্বত্থ গাছ। প্রায় প্রত্যেক মাসেই ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটাতে ভুলে যায় সে। আশ্বিন মাসের পাতাটায় জমতে থাকে ধুলোর পরত। দেওয়ালের কোনায় ড্যাম্পের স্যাঁতসেঁতে দাগটা ক্রমশ আরও বড় হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কোনও অজানা যুদ্ধবাজ দেশ একের পর এক যুদ্ধ জয় করে নিজের মানচিত্র বিস্তার করে চলেছে।

তূর্য চোখ মেলে তাকাল দেওয়ায় ঘড়ির দিকে। সাড়ে এগারোটা। আজও দেরি হয়ে গেল উঠতে। অবশ্য সকাল-সকাল উঠে হতোই বা কী! তার জীবনের রোজনামচায় একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটে চলে।

উফ! যন্ত্রণাটা আবার বাড়ছে। মাথাটা যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটছে প্রতিনিয়ত। গতরাতের হুইস্কির বোতলটা এখনও পাশের টেবিলে পড়ে আছে, খালি। এক-দু’ফোঁটা অবশিষ্ট তরল সেই বোতলের কাত করা মুখ থেকে চুঁইয়ে বেরিয়ে টেবিল ক্লথে দাগ ফেলেছে। তূর্য হাত বাড়িয়ে বোতলটা তুলে নিল। নাড়াল। নাহ, ফাঁকা!

অস্ফুটে একটা অশ্লীল শব্দ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। সারারাত দুঃস্বপ্ন দেখেছে তূর্য। সুলগ্না আর তিতলির মুখ। ওরা তূর্যর দিকে আঙুল তুলে হাসছে। তূর্য দাঁড়িয়ে আছে আদালতের কাঠগড়ায়। আকাশে পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে ডিভোর্সের কাগজ।

পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল তূর্য। এগারোটা মিসড কল। সবই সুলগ্নার। আবার মিহি সুরে বাজতে শুরু করেছে ফোনটা। সুলগ্নার নামটা স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে। নাক-মুখ কুঁচকে তূর্য কেটে দিল কলটা।

‘আবার টাকা চাইবে। পয়সার ধান্দা ছাড়া তূর্য ভট্টাচার্যকে কারও মনে পড়ে না বাল!’ গজগজ করতে করতে ফোনটা পাশে রাখা বালিশের ওপর ছুড়ে ফেলল সে।

এবার তূর্য উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে গিয়ে দু’পা টলমলিয়ে উঠল। কোনওরকমে ভারসাম্য রক্ষা করে সে বারান্দা সংলগ্ন ছোট বাথরুমটার দিকে এগিয়ে গেল। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আয়নার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে একটু সামলে নিল। বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, ‘ছাতুদা! ও ছাতুদা!’

নিচ থেকে ছাতুদার গলার আওয়াজ ভেসে এল, ‘আসছি!’

প্রায় তৎক্ষণাৎ ছাতুদার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল সিঁড়িতে। মাঝবয়সি মানুষটা দরজায় এসে দাঁড়াল।

‘বলো।’

‘চায়ের সঙ্গে দুটো বিস্কুট দিতে পারোনি?’

ছাতুদা সেই কথার জবাব না দিয়ে হাই তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘বিকেলে ওই চা-টুকুও এবার জুটবে না। ঘরে দুধ নেই আর। মহারাজের তো আবার লাল চা মুখে রোচে না!’ কথাটা বলেই কী ভেবে থেমে গিয়ে পিছন ফিরে ছাতুদা বলল, ‘আজ আবার বউদিমণির ফোন এসেছিল। তুমি নাকি ফোন ধরছ না?’

‘বেশ করেছি। এবার তোমায় ফোন করতে লেগেছে নাকি? কেন? কী চাই তার আবার?’

‘তিতলি মা’র স্কুলের ফি দিতে হবে।’

‘কত টাকা?’

‘সে আমি কী জানি! নিজে একবার ফোন করতে পারছ না?’

‘এই, মেলা ফ্যাচফ্যাচ কোরো না তো! জ্ঞান দিতে এসেছে! নিজে তো বিয়ে-টিয়ে করলে না…’

ফোনটা আবার বাজছে। তূর্য আড়চোখে নম্বরটা দেখে নিয়ে ফোন তুলেই রুক্ষ কণ্ঠে সটান জবাব দিল, ‘কী হয়েছেটা কী? সকাল সকাল বিরক্ত করছ কেন?’

‘ফোন ধরছিলে না কেন?’

‘ব্যস্ত ছিলাম।’

‘ডোন্ট লাই টু মি তূর্য। কীসের ব্যস্ততা তোমার? সারারাত মদ গিলে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলে। আমায় ছাতুদা বলেছে।’

‘বেশ করেছি। তোমার কী? তোমার বাপের টাকায় মদ গিলেছি নাকি?’

‘যে তুমি যত খুশি মদ খাও! আই ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু ভুলে যেও না, আমি এখনও লিগালি তোমার স্ত্রী। আমার আর তিতলির প্রতি তোমার একটা রেসপন্সিবিলিটি আছে।’

‘এই যে শোনো, তার জন্য আমার সঙ্গে থাকতে হতো। আমার মেয়েটাকে আমার থেকে কেড়ে নিয়ে দিল্লিতে বসে বসে রেসপন্সিবিলিটি মারানো হচ্ছে বাল!’

‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ! আর তোমার সঙ্গে থাকা যায় না তূর্য। কেউ থাকতে পারবে না। কেউ না। আজ থেকে আট বছর আগে রূপাংয়ের বাংলোতে যার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, সেই তূর্য মারা গেছে।’

‘গুড। তাহলে ছিনে জোঁকের মতো মরা মানুষের পিছনে পড়ে থেকো না। বলো, “বলো হরি, হরি বোল” অ্যান্ড মুভ অন। ঠিক আছে? রাখছি। বাই!’

‘বেশ। তাহলে তো ভালোই হয়। তিতলির কাস্টডি নিয়ে তাহলে আর ঝামেলা পাকিও না। আমি মেইলে নো অবজেকশন ফরম্যাট পাঠিয়ে দেব। নেক্সট হিয়ারিংয়ের আগে সাইন করে রেখো। এই নিয়ে দুটো হিয়ারিং মিস করেছ। আরেকটায় না এলে তোমায় জেলের ঘানি টানাব।’

‘শাট আপ ইউ বিচ! তিতলি আমারও মেয়ে। আন্ডারস্ট্যান্ড?’

‘বেশ। তাহলে মেয়ের স্কুল ফিজটা অন্তত প্রোভাইড কোরো, কেমন?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। পেয়ে যাবে। এখন মাথা খেয়ো না। তিতলিকে ফোনটা দাও।’

‘পাঁচ হাজার টাকা।’

‘ঠিক আছে, সব দিয়ে দেব বললাম তো। তুমি ফোনটা তিতলিকে দাও তাড়াতাড়ি।’

‘এখন সময় নেই। আমার দুপুর বারোটায় শিফট আছে। আমি বেরোব। রাখছি।’

‘এই খানকি মাগি! আমার মেয়েকে ফোনটা দে!’ চিৎকার করে উঠল তূর্য।

‘তিতলি স্কুলে গেছে। আনলাইক ইউ, শি ডাজ হ্যাভ আ লাইফ!’

ফোনটা ফেটে দিল সুলগ্না।

তূর্য কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। শেষে চা-টা এক চুমুকে শেষ করে দরজার দিকে এগোল। বিকৃত মুখে পুরোনো কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল নীচে।

নীচে কোনও ঘর ভাড়া নেওয়া নেই তূর্যর। তবে বাড়ির মালিক দীর্ঘদিন আসেন না। সেই সুযোগে সিঁড়ির নীচটা রান্নাঘর এবং সামনের একটা ছোট ঘর চেম্বার হিসাবে কবজা করেছে ওরা। তূর্য নেমে দেখল, ছাতুদা ভাত বসিয়েছে।

‘ছাতুদা, আজ কী রান্না করছ?’

‘আলুসেদ্ধ ভাত।’ নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দেয় ছাতুদা। এই মানুষটাকে কোনওদিন হাসতে দেখেনি তূর্য। জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরুত্তাপ, আজব একজন মানুষ। আনন্দ, দুঃখ, রাগ, কিছুই যেন মানুষটাকে ছুঁতে পারে না।

‘আলো চালের?’

‘নেই। সেদ্ধ চাল।’

‘ধুর! তাহলে একটু ঘি দিও সঙ্গে।’

‘কোথায় পাব?’

‘সেদোর দোকান থেকে ধারে একটা ছোট শিশি নিয়ে এসো না!’

‘সেদোর দোকানে তেরোশো ছিয়াত্তর টাকা ধার হয়ে আছে। আর বাকিতে জিনিস দেবে না। মুখের ওপর বলে দিয়েছে।’

‘শালা! একটা শুধু বড় কেস আসুক। আমি সব ধার-ফার মিটিয়ে দেব দেখো। তোমার মাইনেটাও…’

‘মাইনে হবে’খন, তার আগে বকেয়া বাড়িভাড়াটা দিতে হবে। বচ্ছর ঘুরতে গেল। এজমালি সম্পত্তি বলে তাই, নইলে এতদিনে পোঁদে লাথ মেরে বের করে দিত আমাদের।’

তূর্য কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সদর দরজায় বেল বাজল। সঙ্গে দরজায় জোরে কড়া নাড়ার আওয়াজ। তারপরই একটা চিৎকার ভেসে এল, ‘তূর্যবাবু! তূর্যবাবু! দরওয়াজা খোলিয়ে!’

ছাতু চমকে তাকাল, ‘আরে, এটা তোমার সেই পাগলা মক্কেল রবীন শেঠের গলা না?’

তূর্য মুখ বিকৃত করল, ‘এই শালার এখন আবার কী চাই?’

‘গিয়েই দ্যাখো না একবার। ডাকছে যখন।’

‘ডাকুক গে, আমি খুলব না। তাগাদা দিতে এসেছে। ফালতু ঝামেলা করবে। কমপ্লিকেটেড চুরির কেস। এত তাড়াতাড়ি সলভ হয় নাকি?’

দরজায় ধাক্কা এবার জোরালো হল। ভাঙা ভাঙা বাংলায় রবীন শেঠ চিৎকার করছেন, ‘তূর্যবাবু! হামি জানি আপনি অন্দরে আছেন! দরওয়াজা খুলুন, নইলে হামি তোড়িয়ে ফেলব!’

‘তুমি না খুললে আমি খুলছি। পলকা দরজা। এক্ষুনি কব্জা ভেঙে উপড়ে আসবে। তখন সেটা সারানোর পয়সা কে দেবে শুনি?’ রান্নার পিঁড়ি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ছাতুদা।

তূর্য রাগে বিড়বিড় করতে করতে দরজা খুলতে এগোল, ‘শালা শুয়োরের বাচ্চা! দু’পয়সার কেস দিয়ে ভাবে মাথা কিনে নিয়েছে। দরজা তোড়িয়ে ফেলব, ফ্যাল না দেখি সাহস থাকলে…’

গজগজ করতে করতে সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা না খুলেই বন্ধ দরজার এ-প্রান্তে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, ‘কী চান, বলুন!’

‘দরওয়াজা খুলুন আগে!’

‘না। এভাবেই বলুন। দরওয়াজা কা লক আটকে গ্যায়া। নেহি খুলতা হ্যায়।’

‘ঝুট মাত বোলিয়ে। হামার রুপিয়া চাই। এখনই চাই। মত বোলিয়ে ঝুট!’

‘ধ্যাততেরিকি তোর নাচ বোলিয়ে কোথাকার…’ তূর্য একঝটকায় দরজা খুলে দিল। রবীন শেঠ দাঁড়িয়ে আছে। মুখ রাগে থমথমে। দু’চোখে হিংস্র দৃষ্টি।

‘এই যে মশাই! এত সকালে এরকম চেল্লামেল্লি করছেন কেন? বিপি বেড়ে যাবে।’ তূর্য বিরক্ত গলায় বলল।

‘সকাল? কউন সা সকাল?’ রবীন শেঠ ব্যঙ্গ করে হাসল, ‘বারা বাজ গয়া হ্যায়। ঘড়িরও, আপনারও।’

‘আমার কথা আপনাকে অত চিন্তা না করলেও চলবে। একজন মহান ব্যক্তি বলে গিয়েছিলেন, নিজের চরকায় তেল দিন। শোনেননি?’ তূর্য দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল।

‘উওসব ফালতু বাতে ছোড়িয়ে। হামার পঁচ্চিস হাজার রুপিয়া কোথায়?’ রবীন শেঠ সরাসরি প্রসঙ্গে এল।

‘রুপিয়া? কীসের রুপিয়া?’ তূর্য চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে জিগ্যেস করল।

‘কীসের রুপিয়া মতলব? হামার অ্যাডভ্যান্স পেমেন্ট। আপনি তো কোনও ভি কাম করেননি। সো রুপিয়া ফেরত দিন।’

‘কাজ করিনি মানে? মামারবাড়ি নাকি? এসব চুরির কেস সলভ করতে কত সময় লাগে আপনি জানেন? দেড় মাস ধরে আপনার কেসের জন্য কলকাতা-মধুপুর ছুটে বেড়াচ্ছি। এখন টাকা ফেরত চান?’

‘ছুটে বেড়াচ্ছেন?’ রবীন শেঠ গলা তুলল, ‘কোথায় ছুটেছেন মিস্টার? হামি তো কোথাও আপনাকে দেখিনি।’

তূর্য মুচকি হাসল, ‘কেন? আপনি কি আমাকে ফলো করছিলেন নাকি?’

‘ঠিক হ্যায়। ফির আপনার এক্সপেন্সের একটা হিসাব-কিতাব দিন। বিল দিন, টিকিট দেখান।’

‘পারলাম না দাদা। আমায় আপনার অফিসের চাপরাশি পেয়েছেন নাকি যে আপনার কাছে টিকিট জমা দিয়ে টিএ ক্লেইম করব? আমার হাতে ট্রেনের টিকিট জমিয়ে রাখার থেকে বেটার কাজ আছে।’

তূর্যর গলায় তাচ্ছিল্যের সুর। খানিক থেমে সে আবার বলল, ‘যাই হোক, এক কাজ করুন। এত কিছু যখন করছেন, তখন বাকি গোয়েন্দগিরিটাও আপনি নিজেই সেরে ফেলুন। আমার দরকার কী?’

রবীন শেঠ তূর্যকে ঠেলা মেরে জোর করে ভিতরে ঢুকে পড়ল, ‘হামি ওসব জানি না। হামি হামার রুপিয়া লিয়ে, তবেই যাব।’

তূর্যও নির্বিকার কণ্ঠে বলল, ‘অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত হয় না। এগ্রিমেন্টে লেখা আছে। দেখে নিন।’

‘টু হেল উইথ ইওর এগ্রিমেন্ট! দেখুন, ভালোয় ভালোয় হামার রুপিয়া হামায় ফিরিয়ে দিন। নেহি তো রবীন শেঠ আপনা রুপিয়া উসুল করার শ রাস্তা জানে, কেমন?’

‘বেশ। নতুন ইনফরমেশন জেনে খুশি হলাম। এবার আপনি প্লিজ কাটুন… ইয়ে মানে আসুন।’ তূর্য দরজার কোণে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে ইশারা করল।

‘আসব?’ রবীন ভারী গলায় বলল, ‘এভাবে লোক ঠকিয়ে লাইফে সুকুন পাবেন তো?’

তূর্যর মুখটা কঠিন হয়ে গেল। সে কড়া গলায় বলল, ‘সে আমার ব্যাপার, আমি বুঝব। আপনি কেটে পড়ুন।’

‘আপনার বেপার?’ রবীন শেঠ এক পা এগিয়ে এল, ‘হামার রুপিয়া মেরে বসে আছেন, আর বলছেন আপনার বেপার?’

‘আপনি স্বেচ্ছায় আমাকে আপনার রুপিয়া দিয়েছিলেন। আমি জোর করে নিইনি।’

‘কারণ আপনি বলিয়েছিলেন, হামার কাজ হোয়ে যাবে! কিন্তু আপনি কোনও কাজ করেননি।’ চিৎকার করে উঠল রবীন শেঠ।

তূর্য বাড়ির ভিতরে ঢুকে ড্রয়ার খুলে একটা কাগজ বের করে আনল। সেটা রবীন শেঠের মুখে প্রায় ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘এই দেখুন, এগ্রিমেন্ট! টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের থার্ড পয়েন্টটা পড়ুন। এখানে পরিষ্কার লেখা আছে, অগ্রিম ফেরত হবে না।’

রবীন কাগজটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে বলল, ‘সে তো অ্যাড দেতে টাইম আপনি এও লিখেছেন যে, আপনি নাকি সাকসেসফুল ইনভেস্টিগেটর। বারো বচ্ছরের এক্সপেরিয়েন্স! অভি কাঁহা গ্যায়া আপকা বারো বচ্ছরের এক্সপেরিয়েন্স? সচ সচ বোলিয়ে তো, কোথায় কোথায় কাজ করেছেন আপনি?’

‘আমার এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না।’

‘জরুর হবে! হামি আপনার ক্লায়েন্ট আছি। হামার হক আছে জানার।’

‘দেখুন, আমার এখন এসব প্যাঁচাল ভালো লাগছে না। আপনি প্লিজ ফুটুন। আমি কাল আরেকবার আপনার দোকানে যাব। কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে দেখব। চিন্তা করবেন না। চোর ঠিকই ধরা পড়বে।’ অনেকক্ষণ পর ঠান্ডা গলায় কথা বল তূর্য।

‘কুছ হোবে না। হামি আপনাকে বিশোয়াস করেছিলাম।’

‘ভুল করেছিলেন।’ তূর্য নির্বিকার গলায় বলল।

রবীন শেঠ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তূর্যর দিকে। তারপর কেটে কেটে বলল, ‘আপ এক নাম্বার কা ফ্রড হো!’

‘ফ্রড?’ তূর্যর গলা উঁচু হল, ‘মুখ সামলে কথা বলুন।’

‘সাহি তো বোলে হ্যায়। আপনি নাকি বহুত এফিশিয়েন্ট ইনভেস্টিগেটর! কিন্তু আপনি রুপিয়া লিয়ে কোনও কাজই করেননি।’

‘আমি কাজ করিনি?’ তূর্য এগিয়ে গেল, ‘আমি আপনার দোকানে কতবার গেছি, সেটা ভুলে গেলেন?’

‘ফির চোর এখনও ধরা পড়ল না কেন?’

তূর্য সামান্য দমে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, ‘দেখুন, আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু এখনও সফল হইনি। সেটা তো আর আমার দোষ নয়।’

‘আপনার দোষ নয়? চোরি হোনেকে বাদ ভি হামি আপনাকে পঁচ্চিস হাজার রুপিয়া অ্যাডভান্স দিয়েছি।’

‘সেটা তো দিতেই হবে। সেটা তো আর আমার প্রবলেম নয়।’

‘আপনার প্রোবলেম নয়?’ রবীন শেঠ হকচকিয়ে গেল, ‘মতলব? আপনি কী কিসিমের মানুষ?’

‘আমি বিজনেসম্যান। বিজনেসম্যানরা ইমোশনাল হয় না।’

‘বিজনেসম্যান?’ রবীন শেঠ ব্যঙ্গ করে হাসল, ‘কীসকা বিজনেস? এই ভূতিয়া হাভেলিতে বসে বসে লোক ঠকানো আর দারু পিনা?’

‘আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কমেন্ট করবেন না প্লিজ।’

‘কেনো? ঝুট বাত বললাম?’ রবীন শেঠ আরও কাছে এগিয়ে এল, ‘আপনি একজন বেওড়া ইনসান। পুরা মহল্লা জানে দেখলাম। ওই পান্ডালে একজন বলল আপনার বউ-বাচ্চাও নাকি আপনাকে ছেড়ে…’

‘শাট আপ!’

রবীন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার কথা শুরু হওয়ার আগেই তূর্যর ঘুসি তীব্র বেগে তার নাকের উপর এসে আছড়ে পড়ল।

‘আহ্!’ অস্ফুট আর্তনাদ করে মেঝেতে বসে পড়ল রবীন। তার নাক থেকে গড়িয়ে এল টাটকা রক্তের ধারা।

তূর্য রক্তাক্ত রবীনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার হাত এখনও মুঠো করা। রবীন দু’হাতে নাক চেপে ধরে আছে। তার হাতের ফাঁক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত মেঝেতে পড়ছে।

‘তু মেরেকো মারা?’ রবীন শেঠের গলা কাঁপছে।

‘হ্যাঁ, মারলাম। নাকটা গেছে। এবার দাঁতগুলো আস্ত রাখার ইচ্ছে থাকলে মানে মানে কেটে পড়ো তো বাপু।’

‘হামি পুলিশে যাব।’ গর্জে উঠল রবীন শেঠ।

‘স্বচ্ছন্দে।’

‘তু…’

‘আমি কী?’ তূর্য আরও কাছে এগিয়ে গেল। হিসহিসে কণ্ঠে বলল, ‘বলো ব্রাদার, আমি কী?’

রবীন তূর্যকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়ে দরজার দিকে দৌড়াল।

তূর্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল খোলা দরজার দিকে। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বন্ধ করার আগে দেখল, রবীন তার রক্তাক্ত নাকে রুমাল চেপে ধরে দ্রুত পায়ে গলি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

 সিঁড়ির কাছে ছাতুদা দাঁড়িয়ে ছিল। তূর্য সিঁড়ির মুখে পৌঁছে তার মুখোমুখি হল। ছাতুদা নিশ্চুপ হয়ে সরে গেল একপাশে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে যেতে তূর্য বলল, ‘ছাতুদা, উঠোনের রক্তটা পরিষ্কার করে দিও।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *