পঞ্চদশ পর্ব – শুরুর শেষ, শেষের শুরু

পঞ্চদশ পর্ব – শুরুর শেষ, শেষের শুরু

এয়ারপোর্টে ঢোকার পর থেকে শ্যাডো একবারও তূর্যর দিকে ফিরেও তাকায়নি। তূর্য একবার কথা বলতে গেলে সম্পূর্ণ অপরিচিতের মতো সৌজন্যমূলক কেঠো হাসি হেসে উঠে গেছে সিট ছেড়ে। তূর্য ফ্লাইটের টিকিটটা হাতে নিল। এয়ার আরাবিয়া এয়ারলাইন্সের টিকিট। দিল্লি টু ইস্তানবুল সাবিহা এয়ারপোর্ট। কব্জি উলটে ঘড়ি দেখল তূর্য, এখনও প্রায় আড়াই ঘণ্টা দেরি।

তূর্য এগিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট ভিসা চেক করিয়ে বোর্ডিং পাস করিয়ে আনল। বোর্ডিং পাস আর টিকিট ব্যাগে ভরে সে সিকিউরিটি চেক-ইন সেরে ওয়েটিং এরিয়ায় একটা ক্যাফেতে ঢুকল। অর্ডার দিয়ে সবে চেয়ারে এসে বসেছে, উলটোদিকের চেয়ারে এসে বসল শ্যাডো।

চোখাচোখি হতেই স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘হাই! বাঙালি মনে হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছেন? মাইসেলফ সুনন্দ চ্যাটার্জি।’ তূর্যও হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বলল, ‘আমি সুব্রত দত্ত। ইস্তানবুলে যাচ্ছি, অফিসের কাজে। টেক্সটাইল এক্সপোর্টের ব্যবসা। আপনি?’

‘আমিও তো সেইখানেই যাচ্ছি মশাই!’ একগাল হেসে জবাব দিল শ্যাডো। তারপর খাওয়ায় মন দিল। করমর্দনের সময় একটুকরো কাগজ তার হাতে গুঁজে দিয়েছিল শ্যাডো। তূর্য হাত ধুতে ওয়াশরুম যাওয়ার অছিলায় বাথরুমে ঢুকে সেটা খুলে দেখল। তাতে লেখা আছে, ‘আপনার পেছনের নীল শার্টকে এড়িয়ে চলুন।’

বাথরুম থেকে বেরিয়ে লোকটার দিকে একবার চোখ বোলাল তূর্য। বেশ কয়েক বছর আগে একবার বন্ধুদের সঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে তন্ত্রায় গিয়েছিল। সেখানে ডিস্কো রুমের কোনায় কোনায় কয়েকজন লোক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল মূর্তির মতো। সুমন্ত্র তাদের একজনকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘ওই যে লোকটাকে দেখছিস, ওদের বলে বাউন্সার। মাল খেয়ে বেচাল করলেই ঘেঁটি ধরে বাইরে ফেলে দেবে।’

এখন ওদের সিটের ঠিক পেছনে বসে থাকা লোকটাকে দেখে অবিকল ওইরকমই মনে হল। চৌকো চোয়াল, পেশীবহুল দুটো হাত যেন জামার হাতার বাঁধন কাটিয়ে মুক্তি পেতে চাইছে। নীল হাফ-হাতা জামা আর কালো প্যান্ট। কানে হেডফোন।

তূর্য এগিয়ে এসে চেয়ারে না বসে টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সোজা বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে। লবি পেরিয়ে এস্কালেটর দিয়ে নামতে লাগল ওয়েটিং এরিয়ায়। সামান্য মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিল লোকটাও পিছু নিয়েছে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। ওয়েটিং এরিয়ায় প্রত্যেকটা গেটের কাছে সারি সারি চেয়ার সাজানো রয়েছে।

ওর ফ্লাইট টার্মিনাল থ্রিতে। দুশো একুশ নম্বর গেট। সেখানে পৌঁছে একটা চেয়ারে বসল তূর্য। লোকও একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ নিয়ে একটু দূরে একটা চেয়ারে গিয়ে বসল। তূর্য কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে উঠে গেল নিজের চেয়ার ছেড়ে। একটু এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে ওয়াশরুম।

চোখে-মুখে জল দিচ্ছে, হঠাৎ চমকে উঠে তূর্য দেখে তার ঠিক পিছনে সেই লোকটা দাঁড়িয়ে। ঘুরে দাঁড়াবার আগেই চকিতে পিছন থেকে আক্রমণ করে লোকটা। বলিষ্ঠ বাহুর নাগপাশ থেকে প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে তূর্য। কিন্তু নিজেকে যতই ছাড়াবার চেষ্টা করে, ততই সেই কাঁকড়ার দাড়ার মতো বাহু তার গলায় চেপে বসতে থাকে।

তূর্যর মনে হচ্ছে এবার সে নিজের চেতনা হারাবে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের ভিতর থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু তার গলা টিপে ধরে রেখেছে সেই রোমশ বাহু। শুধু একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে, ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে নামছে লালা, হাত-পা ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছে।

ঠিক তক্ষুনি দরজা খুলে ঝড়ের গতিতে ভিতরে এল শ্যাডো। আয়নায় তাকে ঢুকতে দেখে তূর্যকে ছেড়ে এবার পিছনে ঘুরল লোকটা। ততক্ষণে তূর্যর চেতনা প্রায় লোপ পেয়েছে। ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে সে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। তবু তার মধ্যেই সে যা দেখল, তা তার প্রতিটি স্নায়ুকে মুহূর্তে সচকিত করে তুলল। খাড়া হয়ে উঠল শরীরের প্রতিটি রোমকূপ।

লোকটা ঘুরে শ্যাডোকে আক্রমণ করতে গেল। কিন্তু শ্যাডো আলোর গতিতে নিজের জায়গা থেকে পিছিয়ে এল। লোকটা ততক্ষণে শূন্যে ঘুসি চালিয়েছে। শ্যাডো লোকটার চোখ থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই দরজা ভিতর থেকে লক করে দিল। প্রথমবারের চেষ্টায় আঘাত হানতে অকৃতকার্য হওয়ায় লোকটা দ্বিতীয়বার শ্যাডোর পেট লক্ষ্য করে ঘুষি চালাল। এইবার শরীরটা অদ্ভুত কায়দায় ডানদিকে সরিয়ে দিয়ে সেই আক্রমণও প্রতিহত করল শ্যাডো।

চোখের দৃষ্টি তখনও পরিষ্কার না হলেও তূর্য দেখতে পায় শ্যাডোর ঠোঁটের কোণে হাসি, সে হাসিতে তাচ্ছিল্য স্পষ্ট। লোকটা এবার ছুটে যায় শ্যাডোকে লক্ষ্য করে। শ্যাডো চকিতে বসে পড়ে নিজের বাঁ পা প্রসারিত করে ডান হাঁটু মুড়ে, সেই পায়ের গোড়ালিকে কম্পাসের অক্ষের মতো ব্যবহার করে নিজের শরীরটাকে দ্রুত বেগে একবার আবর্তিত করে। ফলে এগিয়ে রাখা বাঁ পা তীব্র গতিতে আঘাত করে ধেয়ে আসা লোকটার পায়ে। ভারসাম্য হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা। থুতনি কেটে রক্ত ঝরতে থাকে।

শ্যাডো এগিয়ে এসে তূর্যকে হাত ধরে টেনে তুলল। তূর্য কোনওরকমে নিজের চেতনা ফিরে পেয়ে নিজেকে সামলাচ্ছে, হঠাৎ দেখল লোকটা শ্যাডোকে পিছন থেকে আক্রমণ করতে আসছে। তূর্য চিৎকার করে উঠতে যাবে, তার আগেই শ্যাডো বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে হাতের তালু দিয়ে লোকটার কাঁধ আর গলার সংযোগস্থলে আকস্মিক আঘাত করল। লোকটা কাটা কলাগাছের মতো শব্দ করে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে।

শ্যাডো লোকটার পা ধরে টেনে নিয়ে একটা ল্যাট্রিনের খোপে লোকটা সুদ্ধ ঢুকে গেল। তারপর ভিতর থেকে লক লাগিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ওপর দিয়ে ফাইবারের পার্টিশন টপকে বেরিয়ে এল। এসে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে ভীষণ শান্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘চলে আসুন। আমাদের বোর্ডিং টাইম প্রায় হয়ে এল।’ তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

তূর্য তখনও সম্পূর্ণ ধাতস্থ হয়নি। তার পোশাকও অবিন্যস্ত। জামা গুঁজতে গুঁজতে সে-ও প্রায় দৌড়ে এসে শ্যাডোর পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘মেরে ফেললেন নাকি লোকটাকে?’

শ্যাডো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। তূর্যর দিকে না তাকিয়েই মুচকি হেসে বলল, ‘খেপেছেন? চারিদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা। টয়লেটের বাইরে লবিতে ডানদিকে একটা লাগানো। আমরা টয়লেটে ঢুকেছি সেটা দেখা যাচ্ছে। আমরা বেরিয়ে আসার পরই ওখান থেকে একটা লাশ পাওয়া গেলে কি আমাদের বসিয়ে আইসক্রিম খাওয়াবে? জ্ঞান ফিরলে যাতে নিজেই চুপচাপ বেরিয়ে আসতে পারে সেইজন্যই ল্যাট্রিনে ঢুকিয়ে ভিতর থেকে লক করে এসেছি। জ্ঞান ফিরলে বাছাধন নিজেই সুড়সুড় করে পালাবে।’

‘তার মানে ওখানে সিসিটিভি না থাকলে আপনি লোকটাকে মেরে ফেলতেন?’ চাপা গলায় প্রশ্ন করে তূর্য।

‘উঁহু।’ বলে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল শ্যাডো। ততক্ষণে ওরা গেটে দাঁড়িয়ে বোর্ডিং পাস দেখিয়ে করিডোর ধরে নামছে। নীচে একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে ওদের ফ্লাইট অবধি নিয়ে যাওয়ার জন্য।

বাসে উঠে তূর্যর পাশে বসে শ্যাডো চাপা গলায় কৌতুকের স্বরে বলল, ‘আমাদের ফলো করা হচ্ছে, সেটা আপনি জানতে পারার আগেই মেরে ফেলতাম। বাথরুম যাওয়া অবধি ওয়েট করতাম না।’ কথাটা শেষ করে তূর্যর মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল সে।

তূর্য বলল, ‘কিন্তু ওকে ইন্টারোগেট করলে দি আর্কিটেক্টের ব্যাপারে হয়তো কিছু ইনফরমেশন পাওয়া যেত।’

‘ধুর! পাগল নাকি? এরা সব চুনোপুঁটি। এরা হয়তো কোনওদিন আর্কিটেক্টের নামই শোনেনি। ক্রাইম সিন্ডিকেটের একদম বেস লেভেলে যারা অপারেট করে, তারা বেশিরভাগ সময়েই নিজেদের রেক্রুটারদের পরিচয় অবধি জানতে পারে না।’

ফ্লাইটে দুজনের সিট আলাদা। তূর্য নিজের সিটে বসে চোখ রাখল জানালার বাইরে। যেন মনে হচ্ছে জানালার কাচে কেউ এক পোচ নীল রং করে দিয়েছে। ক্লান্তিকর একঘেয়ে ফ্যাকাসে আকাশ দেখতে দেখতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল তূর্য। ঘুম ভাঙল একদম ল্যান্ডিংয়ের খানিক আগে। একজন অপরূপা ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্ট এসে বিনীত কণ্ঠে অনুরোধ করল সিটবেল্ট বেঁধে নিতে। তূর্য একটু অপ্রস্তুতভাবে হেসে সম্মতি জানাল।

অল্প সময়ের জন্য হলেও খুব গভীর ঘুম হয়েছে। বেশ ঝরঝরে লাগছে। উঁকি মেরে দেখল, শ্যাডো একমনে একটা ম্যাগাজিন পড়ছে। বড় অদ্ভুত, নিরুত্তাপ একটা মানুষ! পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রতিকূলতা, কিছুই যেন তার উপরে সামান্যতম প্রভাব ফেলতে পারে না। এমনকী ভয়ানক ঝাঁকুনি দিয়ে যখন প্লেনটা মাটি স্পর্শ করল, তখনও অবধি ম্যাগাজিন থেকে পলকের জন্যও নজর সরল না। প্লেন ল্যান্ড করে দরজা খোলার পরেও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল সে। আস্তে আস্তে ভিড় কমলে ধীরেসুস্থে উঠে একবার তূর্যর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে আসতে বলে নেমে গেল। তূর্য উপর থেকে ব্যাগটা নামিয়ে বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে।

ইমিগ্রেশনের ঝামেলা মিটিয়ে ইস্তানবুল সাবিহা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ফোন করল শ্যাডো। সম্ভবত গাড়িকে আসতে বলে দিল। ইস্তানবুলে এই প্রথমবার এল তূর্য। দুই মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই টার্কি বা তুরস্ক। একদিকে ইউরোপ, অন্যদিকে এশিয়া। বেরিয়ে লবিতে ব্যাগেজ পিক আপ করার জায়গা। তূর্যদের আলাদা লাগেজ ছিল না। ওদের দুজনের ব্যাগই ওদের সঙ্গে ছিল।

গাড়িতে উঠে সারা রাস্তা একটাও কথা বলল না শ্যাডো। গাড়ি বিমানবন্দরের চত্বর ছেড়ে ডি হান্ড্রেড হাইওয়ে ধরে এগোতে লাগল। রাস্তার দু’ধারে তুর্কি ভাষায় সাইনবোর্ড। তূর্য বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু একটা শব্দও পড়তে পারল না। গাড়ি Bakırköy এলাকা পেরিয়ে Zeytinburnu-র দিকে এগোচ্ছে। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট চলার পর গাড়ি একটা সরু গলির সামনে এসে থামল। পর্যটকদের ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে একটা পুরোনো আবাসিক এলাকা। গলির মুখে তুর্কি ভাষায় লেখা সাইনবোর্ড।

গাড়ি থেকে নেমে তূর্যর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গলিতে ঢুকে গেল শ্যাডো। তূর্য বুঝল সরু গলি, গাড়ি ঢুকবে না। বাকি রাস্তা পায়ে হেঁটে যেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতেই শ্যাডোকে প্রশ্ন করল তূর্য, ‘কোথায় যাচ্ছি আমরা?’

শ্যাডো থামল না। চলতে চলতেই অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল, ‘আমিও জানি না। আর্কিটেক্ট এখানে এসেছিল, সেই খবর পেয়েছি। ট্রেল ফলো করে দেখি, কী পাই।’

গলির দু’পাশে প্রাচীন উসমানীয় স্থাপত্যের ছোঁয়া লাগানো পুরোনো বাড়ি। কোথাও দেওয়ালের প্লাস্টার উঠে গেছে, কোথাও জানালার কাঠ পচে ঝুলে আছে। সন্ধের আলো নিভে আসছে, রাস্তার দু’পাশে কমলা স্ট্রিটলাইট জ্বলে উঠেছে। দূরে কোথাও থেকে আজান ভেসে আসছে। বাতাসে সমুদ্রের নোনা গন্ধ! তূর্য খেয়াল করল, শ্যাডো খুব সতর্ক পায়ে হাঁটছে। চোখ সজাগ, হাত জ্যাকেটের পকেটে।

গলির একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ একটা তিনতলা বাড়ি। নিচতলায় একসময় হয়তো দোকান ছিল, এখন সেটা বন্ধ। ভাঙা শাটারে তুর্কি ভাষায় কিছু একটা লেখা। শ্যাডো একবার চারপাশে তাকাল, তারপর বাড়ির ভাঙা কাঠের দরজায় হাত রাখল। দরজা খোলা। ভিতরে ঢুকতেই একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল। অন্ধকার সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। শ্যাডো পকেট থেকে একটা ছোট টর্চ বের করে আলো ফেলল। তারপর ইশারায় তূর্যকে থামতে বলে নিজেই এগিয়ে গেল।

তূর্য দেখল, শ্যাডো অন্য হাতে একটা বন্দুক বের করেছে। ছোট, কালো, সাইলেন্সার লাগানো। শ্যাডো খুব ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে লাগল। তূর্যও তার পিছু নিল। নিজের ব্যাগ থেকে সে-ও একটা ছোট পিস্তল বের করল। গ্লক নাইন্টিন। হালকা, কমপ্যাক্ট। তূর্যর প্রিয় অস্ত্র।

নিচতলা পেরিয়ে দোতলায় উঠল তারা। সিঁড়ির মাথায় একটা ছোট করিডোর। ডানদিকে দুটো দরজা, বাঁ-দিকে একটা। শ্যাডো থামল। চারপাশে কান পাতল। কোনও শব্দ নেই। তারপর ডান হাতের প্রথম দরজার দিকে এগোল। খুব আস্তে ঠেলে দরজাটা কিছুটা খুলল। শ্যাডো উঁকি দিল ভিতরে। তারপর তূর্যর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, অর্থাৎ খালি!

দ্বিতীয় দরজায় এল। এবারও একই প্রক্রিয়া। কিন্তু এবার দরজা খুলল না। ভিতর থেকে লক করা। শ্যাডো সজাগ হয়ে উঠল। তূর্যকে ইশারা করল সিঁড়ির দিকে ফিরে যেতে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। লোকটা একলাফে এগিয়ে এল তূর্যর দিকে। তূর্য বন্দুক তাক করার আগেই লোকটা বলে উঠল, ‘দি আর্কিটেক্ট সেইজ হাই!’

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে তূর্য নিজের ঘাড়ে একটা শীতল স্পর্শ অনুভব। সে ঘুরে তাকাতে যাবে, কিন্তু পারল না। তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। হাঁটু মুড়ে যাচ্ছে। মেঝে যেন উঠে আসছে তার দিকে। শেষ যেটা মনে আছে, সেটা হল দূর থেকে শ্যাডোর চিৎকার, ‘তূর্য!’

তারপর সব নিকষ অন্ধকার।

কপালে টিপটিপ ঠান্ডা জলের ফোঁটায় সজাগ হয়ে ওঠে তূর্য। এক ঝটকায় উঠে বসতে গিয়েও পারে না। উপলব্ধি করে, তার শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা রয়েছে একটা লম্বা বেঞ্চের সঙ্গে। হাত আর পায়ের আঙুল ছাড়া শরীরের আর কোনও অংশ নাড়াবার জো নেই। শরীরকে চিৎ করে শুইয়ে বেঞ্চের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। কপালের ঠিক উপরে ফুট দুয়েক উচ্চতায় একটা সরু জলের নল। সেখান থেকেই ঠান্ডা জল ফোঁটা ফোঁটা করে এসে পড়ছে কপালের উপর।

ঘরটাকে ঘর না বলে গুদাম বললেই বোধহয় যথার্থ হয়। পাথরের দেওয়াল, স্যাঁতসেঁতে, মাকড়সার জাল লাগানো ছাদ। ভ্যাপসা একটা কটু গন্ধ ঘরময় ছড়ানো, প্রায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। মনে হচ্ছে, কোনও পুরোনো বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট। হয়তো কোনও পরিত্যক্ত ভবন। ইস্তানবুলে এরকম অসংখ্য পুরোনো বিল্ডিং আছে, যেগুলোর নীচে প্রাচীন সুড়ঙ্গ, গুদাম, এমনকী বাইজেন্টাইন যুগের ভাঙা কাঠামোও রয়েছে।

তূর্য বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে রইল। এভাবে কপালের ওপর টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে, ব্যাপারটা যথেষ্ট বিরক্তিকর। তূর্য মাথা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হল। মাথা শক্ত করে আটকানো।

আরও কিছুক্ষণ কাটল। দশ মিনিট। বিশ মিনিট। আধঘণ্টা। এইবারে বিরক্তি সীমা অতিক্রম করছে। প্রতিটা ফোঁটা যেন একটা ছোট হাতুড়ির আঘাতের মতো। টপ… টপ… টপ… মাথার একই জায়গায়। একঘেয়ে, নিরন্তর, অসহ্য।

তূর্য এবার নিজের সর্বশক্তি একত্রিত করে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করার চেষ্টা করল, বৃথা চেষ্টা। দড়ি শক্ত, দক্ষ হাতে বাঁধা। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল এই যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।

উন্মাদের মতো অস্থির লাগছে নিজের মনের ভিতরটা। নিজেকে এতটা অসহায় বোধহয় আগে কখনও লাগেনি। পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে তূর্য। চিৎকার করে সাহায্য চায়। কিন্তু তার নিজের গলা অনুরণিত হয়ে তার কাছেই ফিরে আসে। হা ঈশ্বর! এ কেমন অমানবিক অত্যাচার!

এটা কি কখনও শেষ হবে?

হঠাৎ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটা আলোর রেখা ফুটে ওঠে। দূর থেকে। সেই আলোর রেখা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাপা, ধীর পদক্ষেপ। যেন কেউ খুব সতর্ক হয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে হাঁটছে। একটা হ্যান্ড-হেল্ড লণ্ঠন দুলছে তার হাতে। ধীরে ধীরে সেই আলো কাছে এসে স্থির হল।

তূর্য যতটুকু সম্ভব মাথা তুলে দেখতে চেষ্টা করে। একজন পুরুষ। মাঝারি উচ্চতা, দোহারা গড়ন। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কালো জ্যাকেট, চাপদাড়ি। মুখে একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব। আঙুলের ফাঁকে সরু, লম্বা তুর্কি সিগারেট।

সে তূর্যর মাথার কাছে এসে চাপা অথচ বিনীত স্বরে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে, ‘তাহলে অ্যাট লাস্ট আমাদের দেখা হল মিস্টার তূর্য ভট্টাচার্য? আই অ্যাম দি আর্কিটেক্ট! আমি এখন আপনার বাঁধন খুলতে যাচ্ছি। আর এই যে ইঞ্জেকশনটা আপনাকে দিতে বাধ্য হচ্ছি, এটা খুব মাইল্ড ডোজের স্কোপলামাইন নামক একটা কম্পাউন্ড। এটা আপনার রক্তে প্রবেশ করলে আপনি ধীরে ধীরে সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন। ফলত আপনার কল্পনাশক্তি হ্রাস পাবে। মানুষের কল্পনাশক্তি হল তার সবথেকে বড় রক্ষাকবচ। কারণ কল্পনাশক্তি না থাকলে আমরা মিথ্যে বলতে অপারগ।

‘উনিশশো বাইশ সালে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে স্কোপলামাইনকে ট্রুথ সিরাম হিসাবে ব্যবহারের জন্য গবেষণা শুরু হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই গবেষণা বাতিল করে এটিকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয় এটির মাত্রাতিরিক্ত সাইড-এফেক্ট থাকার কারণে। অবশ্য দেশ-বিদেশের অনেক ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এখনও এটাকে ট্রুথ সিরাম হিসেবে ব্যবহার করে। যাই হোক, চিন্তা নেই। আপনি জেগেই থাকবেন। শুধু নিজেকে সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হতে পারে। আশা করি, আপনি কিছু মনে করবেন না।’

তূর্য নিরুত্তর থাকে। সে বুঝে গেছে, এখানে তার সম্মতি বা অসম্মতি গুরুত্বহীন। আর্কিটেক্ট তূর্যকে ইঞ্জেকশন দিয়ে পাশে রাখা একটা টুল টেনে নিয়ে বসে। আস্তে আস্তে তূর্যর চোখের পাতা আবার ভারী হয়ে আসতে থাকে, হাত-পায়ের আঙুলগুলো যেন অবশ হয়ে আসছে। সে টের পায়, তার হাত-পায়ের বাঁধন খোলা হচ্ছে। তূর্য প্রতিরোধের চেষ্টা করে না।

ঘরে ততক্ষণে আরও দুজন প্রবেশ করেছে। একটা স্ট্রেচার দু’দিকে ধরে নিয়ে আসছে তারা। পরনে কালো রেনকোটের মতো পোশাক, মুখ মুখোশে ঢাকা। তূর্যকে ধরাধরি করে তারা শুইয়ে দেয় স্ট্রেচারে। তারপর নিয়ে চলে কোনও অজানা গন্তব্যে।

এর পরের অনেকটা সময় ঘষা কাচের মত ঝাপসা। টুকরো টুকরো মুহূর্তের কোলাজ। মনে আছে একজন তাকে অনেক প্রশ্ন করছে। তার ছোটবেলা, আরভের এক্সট্র্যাকশনের সময়ের কথা, কী যেন একটা মিশনের কথা… তূর্যর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। বারবার ঘুমে ঢুলে পড়ছে দু’চোখ। কেউ তার গালে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে তাকে জাগিয়ে রাখছে।

ঘরে ঠিক ক’জন আছে তূর্য বুঝতে পারে না। কখনও মনে হয় একজন, পরমুহূর্তেই মনে হয় দুজন, আবার হঠাৎ মনে হয় তাদের পিছনে অনেকগুলো ঝাপসা ছায়ামূর্তি। দেওয়ালে লণ্ঠনের আলোয় ছায়া নাচছে। তূর্য কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?

প্রশ্নগুলো আসতেই থাকে। এক-একটা প্রশ্ন যেন তার মাথার ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, মগজ খুঁড়ে তথ্য বের করে আনছে। তূর্য প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। শব্দগুলো তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে নিজের ইচ্ছের বাইরে।

‘লাস্ট মিশন কোড কী ছিল?’

‘আলফা… সেভেন… নাইন…’

‘মিশন তারিখ?’

‘মার্চ… পনেরো… দু’হাজার পঁচিশ।’

‘কন্ট্যাক্ট পয়েন্ট?’

‘সেফ হাউজ… থার্টিন… হায়দ্রাবাদ।’

মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। উন্মাদের মতো হেসে ওঠে তূর্য। লোকটা কাঁধে হাত রেখে তাকে স্তিমিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তূর্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। সে হাসতে হাসতেই চিৎকার করে কেঁদে ফেলে। চেপে রাখা সমস্ত যন্ত্রণা এবার যেন বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো আছড়ে পড়ে। টেবিলের কোণ শক্ত করে খামচে ধরে হাসি এবং কান্নামিশ্রিত এক অদ্ভুত অমানুষিক চিৎকার করতে থাকে সে।

তারপর মনে হয়, আস্তে আস্তে যেন সে তলিয়ে যাচ্ছে কোনও এক অতল গহ্বরে। হাতের বাহুতে একটা চিনচিনে ব্যথা। যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে একঘেয়ে মৃদু যান্ত্রিক আওয়াজ।

হঠাৎ কে যেন বলে উঠল, ‘তূর্য উঠুন। আমার সঙ্গে চলুন। আমি শ্যাডো। প্রায় দশদিন পর আপনাকে এই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট থেকে উদ্ধার করলাম। আমরা এখন ইস্তানবুলের ফাতিহায়, বসফরাসের কাছে। আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে।’

তূর্য অসংলগ্নভাবে বিড়বিড় করে বলে, ‘আমি তাকে দেখেছি শ্যাডো… আমি দেখেছি… আই স দ্য ডেভিল!’

‘কে? কাকে দেখেছেন?’ শ্যাডো জিগ্যেস করে। তার গলায় উদ্বেগের সুর স্পষ্ট।

‘দি আর্কিটেক্ট!’ কোনওরকমে জড়ানো গলায় উচ্চারণ করে তূর্য। তার চোখ ঘোলা, মুখ ফ্যাকাসে। ‘সে এসেছিল… সে নিজে এসেছিল…’

‘ওকে। নাও হোল্ড ইওরসেল্ফ। উই হ্যাভ টু মুভ নাউ।’ তূর্যকে প্রায় কাঁধে তুলে বেসমেন্টের সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠে শ্যাডো।

বাইরে বেরিয়ে শ্যাডো একটা গভীর শ্বাস নেয়। দূরে মসজিদের মিনার দেখা যাচ্ছে। বসফরাসের দিক থেকে সমুদ্রের বাতাস ভেসে আসছে। রাস্তায় এসে শ্যাডো একটা ট্যাক্সি ডাকে। ড্রাইভার তুর্কি ভাষায় কিছু জিগ্যেস করে। শ্যাডো ভাঙা তুর্কি ভাষায় বলে, ‘হাসপাতাল। কুইক!’

ড্রাইভার অনিচ্ছার দৃষ্টিতে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে শ্যাডো পকেট থেকে একমুঠো লিরা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। টাকা দেখেই ড্রাইভারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

শ্যাডোর মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছে। দি আর্কিটেক্ট নিজে এসেছিল তূর্যর কাছে? এটাই প্রথমবার! কেউ তাকে নিজের চোখে দেখল এবং বেঁচে রইল।

কিন্তু কেন? কেন সে নিজে তূর্যকে দেখা দিল? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শীঘ্রই পাওয়া যাবে। তবে একটা চিন্তা রয়েই গেল। কারণ তাদের মিশন ব্রিফিংয়ের সময় বলা হয়েছিল যে দি আর্কিটেক্ট যখন নিজে খেলায় নামে, তখন নাকি খেলার নিয়মই বদলে যায়।

যদি তাই হয়, তাহলে এবার মনে হচ্ছে, খেলা সবে শুরু হয়েছে।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *