তৃতীয় পর্ব – রানাঘাট বয়েজ, সেকশন এ
প্রাণহীন এক প্রস্তর মূর্তির মতো মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থাকার পর অরিন্দম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে বাইরে। দেখে দরজার কাছে সুখেনবাবু ছাড়াও আরেকজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটা ক্লিপবোর্ড। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। পকেটে একখানা ফাউন্টেন পেন গোঁজা। দেখে পুলিশ বলে চেনার উপায় নেই।
‘আপনিই অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় তো?’ জিগ্যেস করলেন তিনি।
‘হ্যাঁ।’
‘আমিই সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষ। আইডেন্টিফিকেশনটা হয়ে গেছে দেখছি। আমায় সুখেনদা ফোন করতেই আমি ছুটে চলে এসেছি।’ কেজো গলায় বললেন অফিসার। ছুটে আসার ব্যাপারটা যে আক্ষরিক হলেও হতে পারে, তা বোঝা যাচ্ছে তাঁর দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে। তিনি আবার বললেন, ‘মিস্টার চ্যাটার্জি, একটু এদিকে আসুন প্লিজ। কিছু ফর্মালিটিস আছে।’
অরিন্দম তাঁর সঙ্গে একটা বেঞ্চের কাছে গেল। এতক্ষণ একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক বেঞ্চটায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। পুলিশদের আসতে দেখেই বোধকরি কাগজ গুটিয়ে উঠে পড়লেন। রতন, অরিন্দমকে বসতে বললেন। নিজেও বসলেন।
‘দেখুন, আমাদের কিছু ইনফরমেশন দরকার। রুটিন কাজ। বুঝতেই পারছেন। আপনার স্টেটমেন্টটা আসলে কোনওভাবেই স্কিপ করা যাবে না।’ রতন একটু ইতস্তত করে তাঁর ক্লিপবোর্ড থেকে একটা ফর্ম বের করলেন। সেটাকে মেলে ধরে বললেন, ‘প্রথমে আপনার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর।’
অরিন্দম যন্ত্রের মতো তথ্যগুলো দিয়ে গেল।
‘আপনার স্ত্রী আজ কোথায় গিয়েছিলেন জানেন?’
‘জানি না। আমি অফিসে ছিলাম। তবে সকালে বলেছিল যে শ্যামবাজার যাবে। কিছু কেনাকাটি করার ছিল।’
অফিসার খসখস শব্দে লিখে নিলেন।
অরিন্দম এবার কাতর স্বরে জিগ্যেস করল, ‘কিন্তু স্যার, আমার ছেলে? আরভ কোথায়?’
‘আপনাকে তো আগেও বলেছি স্যার। শুধু আপনার ওয়াইফের বডি রিকভার করা হয়েছে ঘটনাস্থল থেকে। আপনি তো এখনও বাড়ি যাননি। বাড়ি গিয়ে দেখুন একবার। আশেপাশের বাড়িগুলোতে খোঁজ নিন যে প্রিয়াদেবী ওকে কোনও প্রতিবেশীর বাড়িতে রেখে বাজার গিয়েছিলেন কিনা। চলুন, আমিও আপনার সঙ্গে যাচ্ছি। সেরকম হলে আমি আজই একটা মিসিং রিপোর্ট লজ করে দিচ্ছি।’
রতন ঘোষ একটু থামলেন। তারপর আরেকটু নরম গলায় বললেন, ‘অথবা এটাও হতে পারে বাচ্চাটা ঘটনার সময় ভয় কোথাও লুকিয়ে পড়েছিল। পরে ওই ক্যাওটিক সিচুয়েশনে পথ হারিয়ে ফেলেছে। ছোট বাচ্চারা তো মেলাতেও অনেক সময় হারিয়ে যায়, আর এটা তো…’
‘আরভের বয়স মাত্র পাঁচ। ও তো হারিয়ে গেলে পথ চিনে বাড়িও আসতে পারবে না।’ অরিন্দম এবার আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। এতক্ষণে জমে থাকা সমস্ত কষ্ট, অসহায়তা, আকুতি কান্না হয়ে ঝরে পড়ল তার দু’চোখে।
রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে শহর জুড়ে। মর্গ থেকে ফিরে আসার পর অরিন্দম তার শূন্য ফ্ল্যাটে বসেছিল উদ্ভ্রান্তের মতো। দেওয়ালের ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে ন’টা। অফিসার রতন ঘোষ আশেপাশের বাড়িগুলোয় খোঁজ নিতে গেছেন। তাকে নামিয়ে রেখে গেছেন বাড়িতে। অরিন্দম সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অফিসার রাজি হননি। রতন ঘোষ আরভের খোঁজ নিতে বেরিয়েছেন ঘণ্টাখানেকও হয়নি। এরই মধ্যে অরিন্দমের মনে হচ্ছিল যেন গোটা একটা সপ্তাহ কেটে গেছে। উদ্বেগ, আশঙ্কা আর উৎকণ্ঠার মায়াজালে বন্দি হয়ে রয়েছে সে।
ঠিক তখনই দরজায় বেল বাজল। অরিন্দম উঠে দরজা খুলে দিল। দেখল, রতন ঘোষ দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে।
‘একটু জল খাওয়াতে পারেন মিস্টার চ্যাটার্জি?’
অরিন্দম মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই! আসুন, ভিতরে আসুন।’
অরিন্দম জল এনে দেখল, রতনবাবু ড্রয়িংরুমের সোফাতে বসে আছেন। মুখে একটা থমথমে গম্ভীর অভিব্যক্তি। অরিন্দম উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে। তিনি সম্ভবত সেটা লক্ষ করেই বলেন, ‘আই অ্যাম সরি মিস্টার চ্যাটার্জি। আপনাদের গলির মুখে যে দোতলা ক্রিমরঙা বাড়িটা আছে, কী যেন নাম বললেন ভদ্রমহিলার…’
‘সোমা ঘোষাল। অখিলেশ ঘোষাল আর ওঁর ওয়াইফ সোমা কাকিমা থাকেন ওখানে।’ ক্লান্ত গলায় বলে অরিন্দম।
‘রাইট! তো সেই ভদ্রমহিলা জানালেন, তিনি নিজে আরভ আর প্রিয়াকে বাজারে যেতে দেখেছেন। প্রিয়ার পোশাকের রংও সঠিক বলে দিলেন। সো উই ক্যান অ্যাজিউম…’
‘যে আরভ নিখোঁজ! তাই তো?’
‘আনফরচুনেটলি, ইয়েস! তবে এখনই ভেঙে পড়বেন না। আমি অলরেডি থানায় ফোন করে একটা মিসিং ডায়েরি রেডি করতে বলে দিয়েছি। কলকাতা পুলিশের মিসিং পার্সন স্কোয়াড কিন্তু খুব অ্যাকটিভ। তাছাড়া শ্যামবাজার মোড়ে ট্রাফিক লাইনে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো আছে। এমনিও তো ওটার ফুটেজ আমাদের চেক করতেই হবে জানোয়ারগুলোকে আইডেন্টিফাই করার জন্য। তখন ফুটেজে নিশ্চয়ই আরভকে পাব। আমি অলরেডি মেইল করে দিয়েছি ট্রাফিক কন্ট্রোলে। কাল সকালে আমি নিজে গিয়ে ফুটেজ কালেক্ট করে আনব। আমি শিওর ফুটেজটা পেলেই আরভের একটা না একটা ক্লু ঠিক পাওয়া যাবেই।’
অরিন্দম উত্তর দেয় না। সোফায় হেলান দিয়ে সিলিংয়ের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। রতনবাবু স্বভাবতই একটু অপ্রস্তুতভাবে বলেন, ‘দেখুন স্যার, আমি জানি এই মুহূর্তে আপনার মনের অবস্থা কী! কিন্তু আপনার ছেলেকে খুঁজে তো বের করতেই হবে, বলুন? আর এজন্য আমাদের কিছু বেসিক ইনফরমেশন প্রয়োজন।’
অরিন্দম মাথা নামিয়ে যান্ত্রিক স্বরে বলল, ‘বলুন।’
রতন ঘোষ তার পকেট থেকে একটা নোটবুক বের করলেন। ‘আপনার ছেলের সম্পূর্ণ নাম আরভ চট্টোপাধ্যায়, তাই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘বয়স?’
‘পাঁচ বছর।’
‘কোন স্কুলে পড়ে?’
‘লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল। এই সামনেই। আমাদের পুল-কারও করতে হয়নি। ওর মা’ই দিয়ে আসত।’
রতন ঘোষ লিখে নিতে নিতেই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার স্ত্রী কি নিয়মিত শ্যামবাজার থেকেই কেনাকাটি করতেন? কাছাকাছিও নিশ্চয়ই মার্কেট আছে।’
অরিন্দম একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘সুনীতা টেলার্স নামের একটা দোকান আছে শ্যামবাজারে। প্রিয়া ওখান থেকেই চুড়িদার বা ব্লাউজ বানানো, পিকো, ফলস পাড় বসানো—এইসব কাজ করাত। আজ সকালেও বলেছিল সুনীতাতেই যাবে।’
‘অত দূরে? কাছাকাছি অন্য দোকান…’
‘হ্যাঁ, থাকবে না কেন? কিন্তু প্রিয়া এসব ব্যাপারে একটু খুঁতখুঁতে ছিল।’
‘আপনাদের কোনও আত্মীয়স্বজন আছেন, যারা কলকাতায় থাকেন?’
‘না। প্রিয়ার বোন ব্যাঙ্গালোরে। আমার মা রানাঘাটে। এখানে আমাদের দুজনেরই কোনও আত্মীয় নেই।’
‘কেন? প্রিয়াদেবীর পেরেন্টস?’
‘নাহ! ওর পেরেন্টস বছর দশেক আগে দিল্লি টু আমেদাবাদ যে প্লেন দুর্ঘটনাটা হয়েছিল, তাতেই…’
‘আই সি। আচ্ছা এমন কোনও জায়গা, যেখানে প্রিয়াদেবী নিয়মিত আরভকে নিয়ে যেতেন?’
‘দেখুন, আমি সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকি। বাজারহাট বেশিরভাগ দিনই প্রিয়া করত। আর আরভের স্কুল না থাকলে, তখন ও আরভকেও নিয়ে যেত। তো এভাবে পার্টিকুলার কোনও জায়গার কথা বলা মুশকিল।’
রতন ঘোষ খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা, আমি আগামীকাল সকালে আপনার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করব। সিসিটিভি ফুটেজ চেক না করা অবধি মনে হচ্ছে না নতুন কোনও লিড পাব বলে।’
আচমকা অরিন্দমের একটা প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলেন রতনবাবু, ‘আচ্ছা স্যার, আপনি পার্সোনালি কী মনে করেন? আমার আরভ ঠিক আছে তো?’
থতমত ভাবটা মুহূর্তে কাটিয়ে উঠে রতনবাবু বললেন, ‘দেখুন, আমি মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাই না। কিন্তু এও সত্যি যে ছোট বাচ্চারা অনেক সময় এরকম পরিস্থিতিতে হারিয়ে গেলেও বেঁচে থাকে, সুস্থ থাকে। হয়তো কোনও ভালো মানুষ ওকে খুঁজে পেয়ে কোনও নিরাপদ জায়গায় রেখেছে।’
‘আমার মাথা কাজ করছে না। একটা বেলার মধ্যে সবকিছু কেমন তছনছ হয়ে গেল। এখন শুধু চাই আমার বাচ্চাটা আমার কাছে ফিরে আসুক। ব্যস!’ দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলে অরিন্দম।
‘আমরা সবরকম চেষ্টা করব মিস্টার চ্যাটার্জি। আপনি প্লিজ একটু ধৈর্য রাখুন।’
অরিন্দম আর কিছু বলার আগেই রতন ঘোষ মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আচ্ছা, আমি তাহলে আজ উঠি। কাল সকালে দেখা হচ্ছে।’
রতনবাবু চলে যাওয়ার পর অরিন্দম দরজা বন্ধ করে আবার সোফায় বসে পড়ল। ঘরটা অদ্ভুত এক অশরীরী নিস্তব্ধতায় ভরে গেছে। শুধু রেফ্রিজারেটরের গুনগুন যান্ত্রিক শব্দ আর দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
খিদে পাচ্ছে অরিন্দমের। অনেকক্ষণ থেকেই একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু এতক্ষণ সেদিকে আমল দেওয়ার সুযোগ পায়নি সে। এখন হঠাৎ অসম্ভব খিদে আর ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরল শ্বাপদের মতো। শরীর টলছে। মদ্যপ মানুষের মতো টলোমলো পায়ে সে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে। ঢুকে দেখল, সকালে প্রিয়া চা বানানোর জন্য চিনির শিশিটা ক্যাবিনেট থেকে বের করে ফের ঢোকাতে ভুলে গেছে। সিঙ্কে এখনও এঁটো বাসন নামানো। খিদের জ্বালা মুহূর্তে ভুলে গেল অরিন্দম। বুকের ভিতর সেই দমবন্ধ করা কষ্টটা আবার মাথা তুলছে।
অরিন্দম প্রায় ছুটে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আরভের ঘরে গেল। ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে খেলনাগুলো। খালি বিছানায় বালিশের পাশে হেলান দিয়ে রাখা আরভের প্রিয় টেডি বিয়ার। পাশে পড়ে আছে তার আঁকার খাতা, রং পেনসিল।
খাতাটা দু’হাত দিয়ে তুলে নিল অরিন্দম। একটা ছবিতে আরভ নিজেকে, প্রিয়াকে আর অরিন্দমকে একসঙ্গে এঁকেছে। তিনজন হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। উপরে নীল আকাশ, নীচে সবুজ ঘাস। মাথার উপর উজ্জ্বল গোলাপি একটা সূর্য হাসছে।
অরিন্দম আরভের টেডি বিয়ারটা বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারছে, ঝিমঝিমে একটা তন্দ্রার ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে ক্রমশ।
চারিদিকে সাদা কুয়াশা। দু’হাত দূরে দৃষ্টি পৌঁছয় না। কুয়াশায় হাত, মাথা ভিজে যাচ্ছে। চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করল অরিন্দম। চারিদিকে যেটুকু দৃষ্টি যায়, তাতে বোঝা যাচ্ছে এটা কোনও বড় মাঠ। ম্লান আলোয় দেখা যাচ্ছে, দূরে বাঁশের ডগায় একটা ছেঁড়া পতাকা উড়ছে। সেই বাঁশের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলা ঝোড়ো বাতাস করুণ বাঁশির সুর তুলেছে।
অরিন্দম হাঁটছে। কিন্তু নিজের পায়ের শব্দ সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে না। নরম ঘাসের বদলে ঠান্ডা, পিচ্ছিল কিছু স্পর্শ করছে তার পায়ের পাতা।
হঠাৎ দূর থেকে শোনা গেল কোনও শিশুর হাসি। একটা খেলনাগাড়ি ঘড়ঘড় শব্দ তুলে গড়িয়ে আসছে কুয়াশার ভেতর থেকে। অরিন্দম ছুটে গেল সেদিকে, ‘আরভ? আরভ?’
কিন্তু যতই সে গাড়িটার দিকে ছুটে যায়, গাড়িটা যেন ক্রমশ আরও দূরে চলে যেতে থাকে। অরিন্দম দৌড়াতে দৌড়াতেই দেখল, একটা ছোট্ট হাত কুয়াশার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
সে চিৎকার করার চেষ্টা করল। কিন্তু গলা ফেটে গেলেও, শব্দ বেরোল না। তারপর কানে এল একটা অদ্ভুত আওয়াজ। যেন মস্ত কোনও ঘড়ির কাঁটা দ্রুতগতিতে উলটোদিকে ছুটছে।
হঠাৎ অরিন্দমের চারিদিকে সবকিছু জ্বলন্ত মোমের মতো গলে যেতে লাগল। চারিদিকের ঘন কুয়াশা তরল কাজলের মতো গলে পড়ছে মাঠে। মাঠের কচি ঘাস, দূরের সেই পতাকা, সবই কেমন যেন সেই দগ্ধ মোমবাতির মতো গলে পড়ছে অবিরত। এবার সেই তরল কুয়াশার ভেতর থেকে দেখা গেল একটা আকাশছোঁয়া টেডি বিয়ার। সেই দানবাকৃতি টেডি বিয়ার হাতছানি দিয়ে ডাকছে অরিন্দমকে। তার মনে হল, কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘আমি মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাই না মিস্টার চ্যাটার্জি। আপনার ছেলে বোধহয় আর…’
একটা চাপা আর্তনাদ করে অরিন্দম ঘুম থেকে উঠে বসল। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে। চারদিকে তাকিয়ে বুঝল সে তখনও আরভের ঘরে। ভোরের আলো ফোটেনি। ঘড়িতে সাড়ে তিনটে বাজে।
সে উঠে বাথরুমের দিকে গেল। বেসিন খুলে মুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাল। চোখ লাল হয়ে আছে। মুখ ফ্যাকাসে।
অরিন্দম বাথরুমের দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বসে পড়ল। চোখের সামনে দিয়ে বায়োস্কোপের মতো তার গোটা জীবনটা যেন ঝড়ের গতিতে ছুটে যাচ্ছে। সে স্পষ্ট দেখতে পেল প্রিয়ার সঙ্গে তার প্রথম দেখা। পরক্ষণেই দেখল চারিদিকে উজ্জ্বল আলোর শামিয়ানা। তাদের বিয়ে। প্রিয়াকে লাল বেনারসি শাড়িতে কী সুন্দরই না দেখাচ্ছে!
আবার পরের মুহূর্তেই সে দেখল আরভের জন্ম। উফ্ সেই দিনটা! ঝমঝম বৃষ্টিতে সে হাসপাতালে ছুটছে প্রিয়াকে নিয়ে। ডাক্তার বলছেন, ‘কনগ্র্যাচুলেশনস! ইউ আর আ ফাদার নাও!’
কিন্তু সবকিছুই আজ পূর্বজন্মের স্মৃতির মতো ঝাপসা লাগছে।
ভোর হতে শুরু করেছে। বাথরুমের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছে ভেজা টাইলসে। পাখিরা ডাকাডাকিতে ব্যস্ত। কলকাতা শহর জেগে উঠছে ধীরে ধীরে।
সকাল আটটার দিকে দরজায় কলিং বেল বাজল। অরিন্দম উঠে দরজা খুলল। দেখল, রতন ঘোষ দাঁড়িয়ে আছেন, ‘মিস্টার চ্যাটার্জি, আমার সঙ্গে একটু আসতে হবে। আই হ্যাভ সামথিং টু শো ইউ।’
অরিন্দম দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। গাড়িতে বসে রতন ঘোষ বললেন, ‘কাল আপনার বাড়ি থেকে বেরিয়েই ট্রাফিক লাইনে গিয়েছিলাম। সিসিটিভি ফুটেজের জন্য ইনডেন্ট দিয়ে নিজে বসে থেকে ফুটেজ কালেক্ট করেছি। কাল সারারাত থানায় আমরা তিনজন মিলে ফুটেজ চেক করেছি। ফাইনালি আজ ভোরবেলা…’
‘কী পেয়েছেন?’ অরিন্দমের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। প্রশ্নটা করতে গিয়ে শব্দগুলো কেমন যেন দলা পাকিয়ে গেল গলার ভেতর।
‘চলুন। দেখাচ্ছি।’
মিনিট কুড়ি পর তারা থানায় পৌঁছাল। রতন ঘোষ অরিন্দমকে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। টেবিলের উপর একটা খোলা ল্যাপটপ।
‘দেখুন!’ ল্যাপটপ অন করে স্ক্রিনের দিকে ইশারা করলেন রতন ঘোষ, ‘এটা শ্যামবাজার মোড়ের সিসিটিভি ফুটেজ। গতকাল দুপুর দেড়টা নাগাদ থেকে প্লে করছি। এই দেখুন।’
স্ক্রিনজুড়ে একটা ব্যস্ত রাস্তার দৃশ্য। পাঁচমাথার মোড়টা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মানুষজন হাঁটাচলা করছে। গাড়ি-ঘোড়া ট্রাফিক কন্ট্রোলের ইশারায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকা যন্ত্রের মতো হোঁচট খেতে খেতে এগোচ্ছে। হঠাৎ কিছু একটা ঘটল। মানুষজন হঠাৎ বাহ্যজ্ঞানহীনভাবে দৌড়াতে শুরু করল।
‘ওয়েট।’ রতন ঘোষ সামান্য স্কিপ করলেন, ‘এইবার দেখুন।’
অরিন্দম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে জল এসে গেল। স্ক্রিনে সে দেখতে পেল আরভকে। একটা নিথর শরীরের পাশে বসে কাঁদছে সে। সিসিটিভিতে মুখ স্পষ্ট বোঝা না গেলেও অরিন্দম জানে ওই মৃত শরীরটা প্রিয়ার।
‘আরভ!’ চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল অরিন্দম।
ফুটেজে দেখা যাচ্ছে আরভ প্রিয়ার নিষ্প্রাণ গালে হাত দিয়ে ডাকছে। কিন্তু প্রিয়া সাড়া দিচ্ছে না।
‘এবার দেখুন, মিস্টার চ্যাটার্জি। ভালো করে এই ভদ্রমহিলাকে খেয়াল করবেন।’
স্ক্রিনে দেখা গেল, একজন বোরখা পরা মহিলা আরভের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। সে আরভকে কোলে তুলে নিল। আরভ প্রথমে বাধা দিল, কিন্তু মহিলা তাকে জোর করে কোলে তুলে নিল।
‘দেখুন, চিনতে পারছেন এই ভদ্রমহিলাকে?’
ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, বোরখা পরা মহিলাটি আরভকে কোলে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছেন।
‘না না, একদমই না! মুখই তো দেখা যাচ্ছে না। কে উনি?’ অরিন্দম জিগ্যেস করল।
‘সেটাই আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আমি অন্যান্য ক্যামেরার ফুটেজও দেখছি। দেখি ওকে ট্র্যাক করতে পারি কিনা।’ রতন ঘোষ ল্যাপটপ বন্ধ করলেন। বললেন, ‘মিস্টার চ্যাটার্জি, এই ফুটেজ একটা বড় ক্লু। আমরা আশেপাশের আরও ক্যামেরার ফুটেজ দেখে যদি ট্র্যাক করতে পারি এই মহিলা কোনদিকে গেছেন, তাহলে কেসটার জলদি একটা সুরাহা হবে।’
‘তাও কতদিন লাগবে?’ উৎকণ্ঠিত গলায় জিগ্যেস করল অরিন্দম।
‘এক-দুই দিনের মধ্যে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যাবে আশা করি। তবে ইন দ্য মিনটাইম, আপনি একটা কাজ করতে পারেন।’
‘কী?’
‘আপনার স্ত্রীর সমস্ত বন্ধুবান্ধব, পরিচিত মানুষদের একটা লিস্ট করুন। লিস্ট কমপ্লিট হলে আমায় দিন, তারপর আমি দেখছি।’
‘ঠিক আছে, আমি লিস্ট করে আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপ করছি।’
রতন ঘোষ উঠে দাঁড়ালেন, ‘আর একটা কথা। নতুন কোনও ইনফরমেশন যদি কিছু মনে আসে, যে কোনও ছোট তথ্যও, যেটা আপনার কাছে হয়তো ইউজলেস মনে হচ্ছে, তাও সঙ্গে সঙ্গে আমায় ফোন করবেন।’
যন্ত্রের মতো মাথা নেড়ে অরিন্দম থানা থেকে বেরিয়ে এল। দিনের এই সময়টায় ওলা-উবারে সার্জ চলে। গলাকাটা দাম হাঁকায়। অন্যসময় হলে নেহাত খ্যাপা কুকুরে না কামড়ালে সে এই সময় ক্যাব বুক করত না। এইটুকু রাস্তা, ঠিকই বাস বা মেট্রোতে চলে যেত। কিন্তু আজ নির্বিকার মুখে সে মোবাইল বের করে ক্যাব বুক করছিল। ঠিক তখনই চেরি রঙের মারুতি গাড়িটা সশব্দে এসে থামল তার সামনে।
‘আরে, অরিন্দম না? হ্যাঁ! ঠিক চিনেছি। তুই তো হেব্বি মোটা হয়ে গেছিস রে! স্কুলে তো তালপাতার সেপাই ছিলি।’
‘সরি, আপনাকে তো ঠিক…’
‘আরে! চিনতে পারছিস না? আমি পার্থ। রানাঘাট বয়েজ, সেকশন এ, রোল নম্বর ছাব্বিশ।’
‘ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। শুধু নাম বললেই হতো। তোর চেহারা তো পুরো পালটে গেছে।’
‘আরে শালা! নিজেকে দ্যাখ। কোথায় যাচ্ছিস? আয় গাড়িতে ওঠ। ছেড়ে দিচ্ছি।’
‘আমি কোনদিকে যাব তুই জানলি কী করে?’
‘জানার দরকার নেই। আগে আমার বাড়ি যাচ্ছিস। বউকে বলে দিচ্ছি লুচি বানাতে। তারপর তুই যে মুলুকে বলবি ছেড়ে দিয়ে আসব। এই, তুই লুচি খেতে ভালোবাসিস তো আগের মতো?’
‘সে বাসি। কিন্তু আজ ছেড়ে দে ভাই। একটু অসুবিধায় আছি। পরে কোনও একদিন…’
‘নো স্যার। আজ যখন একবার বাগে পেয়েছি, আর ছাড়ছি না। কেন, কোনও ইম্পর্ট্যান্ট কাজে বেরোচ্ছিস নাকি এখন?’
‘না, তা ঠিক নয়…’
‘তাহলে ভ্যানতারা করছিস কেন? আয়, উঠে আয়।’
অরিন্দম ম্লান হেসে গাড়িতে উঠে বসল। পার্থর বাড়ি বেহালা ম্যান্টনে। শহরের একদম উলটো প্রান্তে। যেতে যেতে টুকটাক পুরোনো দিনের স্মৃতি দিয়ে কথা শুরু হল। তারপর আস্তে আস্তে যখন আলোচনা অরিন্দমের রূঢ় বাস্তবে গিয়ে আছাড় খেল, তখন গাড়ির ভিতরের পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। পার্থ কিছুক্ষণ আগেও খুব প্রাণখোলা হাসি হাসছিল। এখন গম্ভীর হয়ে গেছে। গাড়ি তখন জেমস লং ধরে এগোচ্ছে। পার্থ ভারী গলায় বলল, ‘কীভাবে এসব হয়ে গেল রে অরিন্দম!’
অরিন্দম উত্তর দেয় না। শুধু খোলা জানালা দিয়ে বাইরে লাল হয়ে জ্বলতে থাকা ট্রাফিক লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ পার্থ বলে, ‘আচ্ছা অরিন্দম, তোর তূর্যকে মনে পড়ে?’
‘হ্যাঁ, সেকেন্ড না থার্ড হতো না ক্লাসে? একটু চুপচাপ শাই টাইপের ছেলে ছিল।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। ও-ই। ও কিন্তু এখন বেশ নামজাদা প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তুই একবার যোগাযোগ করতে পারিস।’
‘তাই? কোথায় থাকে তূর্য? রানাঘাটেই আছে?’
‘না না। কলকাতায়। বাগবাজারের কাছে কোথায় যেন থাকে শুনেছি।’
‘তাহলে তো নর্থেই। একবার দেখা করাই যায়। পুলিশ যদিও কো-অপারেট করছে, কিন্তু তাও আমি একদমই…’ খানিক ইতস্তত করে বলে অরিন্দম।
‘না না, আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। দাঁড়া, আমার কাছে নম্বর নেই। আমি সন্তোষের থেকে ঠিকানা নিয়ে তোকে দিচ্ছি। তুই ডিরেক্টলি ওর বাড়িতে চলে যা। তোর বাড়ি থেকে তো বেশি দূর না।’
সেদিন পার্থর বাড়ি থেকে ফিরতে বেশ রাতই হয়ে গেল। ঈষৎ মদ্যপানও হয়েছিল। আরভ হওয়ার পর থেকে এসব এড়িয়ে চলত অরিন্দম। ফিরতে দেরি হলে প্রিয়াও রাগারাগি করত। কিন্তু এখন আর সেসবের বালাই নেই। ফ্ল্যাটে ঢুকে শাওয়ার চালিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল অরিন্দম। জলের সঙ্গে কি মানুষের দুঃখগুলোও এরকম অবলীলায় ধুয়ে যেতে পারে না?
রাত সাড়ে বারোটা। বিছানায় শুয়ে অরিন্দম এপাশ-ওপাশ করছে। চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। যতবার চোখ বন্ধ করছে, ততবার ভেসে উঠছে প্রিয়ার মুখ, তার হাসি। আরভ যখন প্রথম ‘বাবা’ ডেকেছিল সেই মুহূর্তের অনুভূতি। তন্দ্রা এলেই মনে হচ্ছে, আরভের ছোট্ট হাতদুটো তার আঙুল চেপে ধরছে বারবার।
মাথার উপর ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অরিন্দম। তিনদিন। পুরো তিনটে দিন কেটে গেল। প্রিয়া আর তার পৃথিবী যাকে ঘিরে আবর্তিত হতো, সেই আরভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেন বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সে।
আজ বিকেলে পার্থর ফোনে বলা কথাগুলো মনে পড়ে, ‘শোন, তুই একটা কাজ কর। এই নে তূর্যর ঠিকানা। সন্তোষ কল করেছিল, মালটা তুলল না। হয়তো কোনও ইম্পর্ট্যান্ট কেস নিয়ে বিজি আছে। ওর কিন্তু এখন বেশ নামডাক হয়েছে। অনেকগুলো মিসিং কেস সলভ করেছে শুনলাম। তুই কাল একদম আর্লি মর্নিং একবার ওর সঙ্গে দেখা কর।’
অরিন্দম শুধু শুনেছিল। কিছু বলেনি। পুলিশ যখন কিছু করতে পারছে না, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কী-ই বা করবে?
ঘড়িতে রাত একটা বাজে।
অরিন্দম মোবাইলটা তুলে নেয়। সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষের নম্বরে কল করে। কয়েকটা রিং হওয়ার পর কল কেটে যায়। কিছুক্ষণ পর রতনবাবু নিজে থেকে কল করেন।
‘বলুন মিস্টার চ্যাটার্জি। এত রাত্রে? এনি প্রবলেম?’ রতন ঘোষের গলায় ক্লান্তি।
‘সরি মিস্টার ঘোষ, এত রাতে আপনাকে ডিস্টার্ব করছি। কোনও নতুন আপডেট পাওয়া গেল আরভের ব্যাপারে?’
‘নো স্যার। আমরা সবরকম চেষ্টা করছি। কলকাতা পুলিশের মিসিং পার্সনের যে ওয়েবসাইট আছে, সেখানে আরভের ইনফরমেশন ছবিসহ আপলোড করা হয়েছে। পুরো স্টেটে সার্কুলার গেছে। মিসিং চিলড্রেন ট্র্যাকিং পোর্টালে একটা ফর্ম ফিল-আপ করতে হয়। সেটারও প্রসিডিওর কমপ্লিট।’
‘কোনও রেসপন্স আসবে?’
‘আসার তো কথা। তাছাড়া মিসিং পার্সন স্কোয়াডে আমার এক পুরোনো ব্যাচমেট আছে, সঞ্জয় চ্যাটার্জি। ওকে আমি আলাদা করে বলে রেখেছি আরভের কথা। ও নিজেও পার্সোনালি কেসটা দেখছে।’
‘আর ওই বোরখা পরা মহিলার কোনও হদিশ পেলেন?’
‘সিসিটিভি ফুটেজ থেকে আমরা কিছু লিড পেয়েছি। ওই মহিলা বাগবাজার অটো স্ট্যান্ডের সামনে থেকে একটা কালো স্কর্পিওতে উঠেছিল। গাড়ির নম্বর আমরা অলরেডি পেয়ে গেছি। ওটাকে ট্রেস করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, আগামীকালের মধ্যে ধরতে পারব। তখনই জানা যাবে, সে কোথায় নামিয়েছিল মহিলাকে।’
‘আরভকে আমি ফিরে পাব তো মিস্টার ঘোষ?’ অরিন্দমের গলা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
‘আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। এর বেশি আর কী-ই বা বলতে পারি বলুন? আমরা সবরকম চেষ্টা করছি। হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, এয়ারপোর্ট, সব জায়গায় সার্চ চলছে। নিশ্চয়ই তাড়াতাড়ি কোনও একটা ব্রেকথ্রু পাওয়া যাবে।’
‘হুম।’
‘আচ্ছা, বাই দ্য ওয়ে, প্রিয়াদেবী মাতৃশক্তি নামের কোনও এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?’
‘সেরকম তো কিছু শুনিনি। কেন বলুন তো?’
‘আপনাদের ওয়াড্রবে ওদের কিছু ফাইনান্সিয়াল ডকুমেন্টস দেখেছিলাম, তাই জিগ্যেস করছি।’
‘দেখুন, আমি আমার কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকতাম যে সত্যি বলতে প্রিয়ার সঙ্গে আমার সাংসারিক কেজো কথার বাইরে অন্য কথা প্রায় হতো না। আমি সত্যিই জানি না প্রিয়া কোনও এনজিও জয়েন করেছিল কিনা। তবে সেটা হলে ও আমাকে একবার অন্তত জানাত।’
‘ঠিক আছে। বাদ দিন, ওটা আমি দেখছি। আপনি চিন্তা করবেন না। উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট টু ফাইন্ড আরভ।’
অরিন্দম উত্তর দেয় না। সে এই একই কথা গত তিনদিন ধরে শুনছে।
‘ঠিক আছে।’ বলে ফোন কেটে দেয় অরিন্দম। এরপর সে মোবাইলটা পাশে রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। চারতলার ফ্ল্যাটের খোলা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। রাত্রের নরম হাওয়া চোখে-মুখে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবিন্যস্ত চুলগুলো আরও একবার ঘেঁটে দিয়ে যায়। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সে। একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজে লাইটার জ্বালায়। গভীরভাবে একবুক ধোঁয়া টেনে ফুসফুসে ভরে, তারপর আস্তে আস্তে ছেড়ে দেয় শহর কলকাতার বুকে।
নীচে পিচঢালা রাস্তায় হলুদ স্ট্রিটলাইটের আলোয় একটা কম্পমান ছায়া দেখা যাচ্ছে। কোনও গৃহহীন মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। অরিন্দম অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেদিকে। সিগারেটে আরেকটা টান দেয়। তারপর ব্যালকনির রেলিংয়ে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। দূরে কোথাও একটা বিড়াল কাঁদছে। রাতের নীরবতায় সেই ডাক যেন আরও করুণ শোনাচ্ছে।
আরভ… বাবা তোমাকে খুব মিস করছে। ম্যাঙ্গো আইসক্রিম খাবে না? মনে মনে বলে অরিন্দম।
কোনও উত্তর আসে না। চারিদিকে শুধু নিঃসীম নীরবতা।
কতক্ষণ অরিন্দম ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল, খেয়াল নেই। একসময় সে দেখল দূরের কালো আকাশ ফিকে হয়ে আসছে। পূর্বদিকে হালকা লাল আভা। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে জ্বলন্ত বাটটা মেঝেতে ফেলে পায়ের নীচে পিষে নেভায় অরিন্দম। আকাশের এক কোণে জমা হওয়া লাল-কমলা রঙের ছোপটা ধীরে ধীরে গোটা আকাশটাকে গিলে খাচ্ছে। পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে। একটা নতুন দিনের শুরু।
ঘরে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় অরিন্দম। চোখ বন্ধ করে। এবার তার দু’চোখ জুড়ে নেমে আসে গভীর ক্লান্তির ঘুম।
ঘড়িতে সকাল দশটা পঁয়তাল্লিশ। শ্যামপুকুর থানার সামনে অটো থেকে নামে অরিন্দম। ডান হাতে প্লাস্টিকের চ্যানেল ফাইল। ভেতরে তিন পাতার একটা তালিকা। প্রিয়ার সমস্ত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, স্কুলের পুরোনো সহকর্মী, পরিচিত মানুষের নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর। রতন ঘোষ আগেরদিন এটা চেয়েছিলেন।
অরিন্দম সকালে উঠে সেই লিস্ট তৈরি করেছে। প্রিয়ার ফোনবুক, ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ কন্ট্যাক্ট, ঘেঁটে ঘেঁটে সব নাম বের করেছে। প্রতিটা নামের পাশে লিখেছে তাদের সঙ্গে প্রিয়ার সম্পর্ক কী ছিল। অর্থাৎ কেউ ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কেউ সহকর্মী, কেউ আত্মীয়, আবার কেউ বা শুধুই পরিচিত।
আজ থানায় পা দিতেই অরিন্দম লক্ষ করে চারিদিকে একটা অস্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা। এই ক’দিনে বারবার যাতয়াত করে সে বুঝেছে, সকালবেলায় সাধারণত থানা তেমন জমজমাট থাকে না। কিন্তু আজ যেন অন্যরকম। পুলিশের বড়কর্তারা এসেছেন। তাঁরা এদিক-ওদিক দৌড়োদৌড়ি করছেন। কয়েকজন কনস্টেবল একসঙ্গে গোল হয়ে চাপা গলায় কিছু একটা আলোচনা করছে। থানার সামনে বেশ কয়েকটা প্রেসের গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অরিন্দম এগিয়ে যায় দরজার দিকে। সেখানে একজন বয়স্ক কনস্টেবল বসে আছে। অরিন্দমের সঙ্গে আগেও ভদ্রলোকের কথা হয়েছে। ভালো মানুষ, বিনয়ী স্বভাবের।
‘নমস্কার!’ অরিন্দম বলে, ‘আমি সাব-ইন্সপেক্টর রতন ঘোষ স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’
লোকটা মুখ তুলে তাকায়। চোখে অবাক দৃষ্টি। তারপর কেটে কেটে জিগ্যেস করে, ‘আপনি সকাল থেকে নিউজ দেখেননি?’
‘না। কেন বলুন তো? আসলে আমার ছেলের মিসিং কেসটা রতন ঘোষ স্যার হ্যান্ডল করছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন আজ সকালে আসতে।’
লোকটা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘স্যার… আর নেই!’
‘নেই মানে?’ চমকে ওঠে অরিন্দম।
‘আজ সকালে… একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন।’
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘কী… কী বলছেন?’
‘হ্যাঁ। আজ ভোরবেলা। স্যার কোনও কারণে ইএম বাইপাসের দিকে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় ডিভাইডারে ধাক্কা লেগে…’
অরিন্দমের পা যেন মাটিতে গেঁথে যায়। সে কোনওরকমে বলে, ‘তাহলে কি ঘটনাস্থলেই?’
লোকটা মাথা নাড়ে, ‘হ্যাঁ। স্পট ডেড। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সময়টুকুও দেননি।’
অরিন্দম পাশে রাখা বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়ে। নিজেকে সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। মাথা ঘুরছে। রতন ঘোষ মারা গেছেন? সেই রতনবাবু যিনি কাল মাঝরাতেও তার সঙ্গে কথা বলছিল? ওই লোকটাই তো একমাত্র ভরসা ছিল অরিন্দমের কাছে।
‘কী হবে?’ অরিন্দম নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে, ‘সব শেষ হয়ে গেল। আরভকে কোথায় খুঁজব এবার!’
‘আমার কেসটা তাহলে… মানে বলছিলাম যে… আমার ছেলের কেসটা এখন কে হ্যান্ডল করবে?’ যান্ত্রিক স্বরে জিগ্যেস করে অরিন্দম।
‘থানার ইন-চার্জ নিজেও নিতে পারেন, বা কাউকে অ্যাসাইনও করতে পারেন। আমি কী করে বলব বলুন? আসলে আজ তো সব এলোমেলো হয়ে গেছে, তাই আর কী… আপনি আরেকদিন আসবেন? অথবা ওই লিস্টটা রেখে যেতে পারেন, আমি স্যারকে দিয়ে দেব।’
অরিন্দম হাতের ব্যাগটা সামান্য তুলে ধরে তাকিয়ে থাকে। তারপর সেটা ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়েও থমকে যায়। তারপর কী যেন ভেবে বলে, ‘ছেড়ে দিন। আমি আরেকদিন আসব।’
