কাকচক্ষু – অভীক সরকার
কাকচক্ষু – অভীক সরকার
প্রথম মুদ্রণ জানুয়ারি ২০২৬
Kakchokkhu
Dark fantasy novels of Mythology and Occult
by Avik Sarkar
.
সুলেখক, প্রকাশক এবং প্রিয় দুই বন্ধু,
শুভব্রত বসু
এবং
অর্ক পৈতণ্ডীকে
.
ভূমিকা
আমাদের সামনে যে দৃশ্যমান জগৎ আছে, মানুষের চোখ দিয়ে যা দেখি, তার সবই কি সম্পূর্ণ সত্য? নাকি চোখের সামনের এই চেনা পৃথিবীর আড়ালে আরেকটি স্তর রয়েছে—যেখানে সময় জমাট বেঁধে থাকে, ঘটমান বর্তমানের নিঃশব্দ পুনরাবৃত্তি হয়, আর সেই পুনরাবৃত্তির প্রতিধ্বনি হয়তো কোনও এক বিশেষ অনুভূতিশীল চোখে ধরা দেয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ‘কাকচক্ষু’-র জন্ম।
এই বইয়ের কেন্দ্রে যে মানুষটি রয়েছেন, তাঁর নাম নিবারণ চক্রবর্তী। বয়স, পেশা, পারিবারিক পরিচয়—এসব দিয়ে তাঁকে চেনা যায় না। তাঁকে চেনার একটাই পথ, তাঁর অব্যর্থ অভিজ্ঞান—তিনি একজন মানুষের দিকে তাকালে সেই মানুষটির অতীত দেখতে পান। অতীত মানে শুধু স্মৃতি নয়; সময়ের স্তরে জমে থাকা ঘন ছায়া, অপরাধবোধ, ভয়, অভিশাপ, আবার কখনও বা অমোঘ কোনও নিয়তির চিহ্ন। এই অতীত দেখার ক্ষমতাই তাঁকে মানুষের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। আর এই আলাদা হয়ে পড়ার যন্ত্রণাই তাঁর দীর্ঘ জীবনের ছায়াসঙ্গী।
কাকচক্ষু একটি অতি প্রাচীন গাড়ুরিক বিদ্যা—তন্ত্রশাস্ত্রের এক গুপ্তধারা, যার কথা সাধারণ তান্ত্রিকেরা জানলেও চর্চা করতে সাহস পান না। কারণ এই বিদ্যার মূলেই রয়েছে দহন। যে এই বিদ্যা আয়ত্ত করে, সে শুধু অন্যের অতীতই দেখে না—অন্যের দুঃখ, অপরাধবোধ, পাপ ও যন্ত্রণাও নিজের মধ্যে অনুভব করে। প্রতিটি মানুষ যেন এক-একটি ভারসাম্যহীন গ্রহ, আর নিবারণ সেই গ্রহগুলির আকর্ষণ বারবার নিজের ওপর টেনে নেওয়া একজন মানুষ—চোখ রাখলেই যাঁর ওপর নেমে আসে অতীতের ঝড়।
এই বিদ্যার প্রথম দীক্ষা তিনি পেয়েছিলেন এক ভাগ্যহত তান্ত্রিকের কাছে—মনা মাঝি। নামের সঙ্গে মাঝির সম্পর্ক নেই, সে কোনও নদীতে নৌকো চালাত না। কিন্তু জীবন যেন তাকে বারবার নৌকোয় তুলে গভীর জলের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভাগ্যের পরিহাসে সমাজ তাকে ছুড়ে দিয়েছিল সভ্য সমাজের উপান্তে। আর সেই অপরাধবোধ, অপবাদ আর অন্তহীন একাকিত্বর গর্ভ থেকে উঠে এসেছিল তন্ত্রের যে অন্ধকার গরল, তারই নাম কাকচক্ষু। সেই তন্ত্রচর্চার একাকী অন্ধকার পথেই একদিন তার সঙ্গে আলাপ হয় তরুণ নিবারণের।
নিবারণ তখনও জানতেন না যে তাঁর স্বাভাবিক চেহারার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক অকল্পনীয় ভবিতব্য। মনা মাঝির চোখে তিনি কি জীবনের মিছিলে হারিয়ে যাওয়া এক যাত্রী ছিলেন?
এই একটি আলাপই নিবারণের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে এক দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ অথচ অবধারিত পথ—যেখানে তিনি হবেন দর্শক, বিচারক নন; কেবল অতীতের সাক্ষী।
এই বইয়ের দুটি রচনা—‘কাকচক্ষু’ এবং ‘দেবলরাজার গড়’—নিবারণ চক্রবর্তীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তবে এগুলো কেবল ভয়াবহতার গল্প নয়। ভয় এখানে মানুষের ভেতরের এক অদৃশ্য অন্ধকার—যা ইতিহাস, তন্ত্র, বিশ্বাস, অভিশাপ, কারও মোহ, কারও লোভ, কারও ভালোবাসা—সব কিছুর সঙ্গে মিলেমিশে এক অনিবার্যতার রূপ নেয়।
‘কাকচক্ষু’ গল্পটি শুরু হয় খুব সাধারণভাবে—এক গ্রাম্য আবহে, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন আর আত্মগোপনের মধ্যে কেউই নিজের অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চায় না। অথচ সেই অঞ্চলেই এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের অতীত রক্তমাখা অথবা অভিশপ্ত। নিবারণ সেইসব মানুষের মুখোমুখি হন এবং তাঁর চোখের সামনে খুলে যায় তাদের জীবনের একটি করে চাপা অধ্যায়। কখনও সেই অতীত ভয়ানক, কখনও নির্মম, কখনও ভীষণ নিরুপায়। কিন্তু প্রতিবারই নিবারণ অনুভব করেন সেই অপরাধবোধ ও যন্ত্রণার স্রোত, যা তাঁকে ক্রমে ক্লান্ত করে তোলে। আর গল্পের শেষে এসে পাঠক অনিবার্যভাবে মুখোমুখি হন এক পরিণতির সঙ্গে যা একইসঙ্গে বীভৎস এবং করুণ।
অন্যদিকে ‘দেবলরাজার গড়’ উপন্যাসটিতে গল্পের বিস্তার আরও গভীর এবং ইতিহাসনির্ভর। এখানে এসে নিবারণ যেন দাঁড়ান এক প্রাচীন দুর্গের প্রাচীরে, যেখানে রাজা-প্রজার ইতিহাস, রক্তের উত্তরাধিকার, আর তন্ত্রের আঁশটে গন্ধ একসঙ্গে মিশে আছে। এই গড় শুধু ইট-পাথরের নয়; এখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ভয়ের স্মৃতি আর এক ভয়ানক শক্তির উপস্থিতি ঘনীভূত হয়ে রয়েছে। কেউ ডাকুক আর না ডাকুক—নিবারণের চোখ সেখানে যা দেখে, তা পাঠকের বিস্ময় ও আতঙ্ক উভয়কেই এক অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে যায়। কারণ এই গড়ের ভিতরে লুকিয়ে আছে দেবলরাজার কাহিনি—যেখানে মানুষ, ক্ষমতা, তন্ত্র আর অভিশাপের যোগসূত্র এমনভাবে বাঁধা যে তা থেকে কেউ সহজে মুক্তি পায় না।
নিবারণ চক্রবর্তী এই গল্পগুলির ভিতরে পড়ন্ত দিনের মতো এক শান্ত উপস্থিতি। তিনি প্রচারবিমুখ। বিদ্যা অর্জনের গর্ব তাঁর নেই, বরং এই ক্ষমতাকে তিনি অনেকটা অভিশাপ হিসেবেই দেখেন। তিনি জানেন, একজন মানুষ যত কম জানে, তত স্বস্তিতে বাঁচে। কিন্তু তাঁর চোখ তাঁকে সেই অজ্ঞতার আরাম দেয় না। তিনি বাধ্য হন দেখতে। বাধ্য হন বুঝতে। আর অনেক সময় সেই দেখা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় ঘটনাপ্রবাহের গভীরে—যেখানে সত্য উদ্ঘাটনের সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে ভয়, আতঙ্ক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে, মুক্তিও।
এই বইয়ের পাতায় তন্ত্র মানুষের অস্তিত্বের গভীরে স্পর্শ করা এক মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক শক্তি। আবার ইতিহাসও এখানে কেবল পড়াশোনার বিষয় নয়—ইতিহাস এখানে এক জীবন্ত চরিত্র, যার শ্বাস, স্মৃতি, এবং প্রতিশোধ আছে। বড়ো শহরের নাগরিক জীবনের চৌহদ্দি পেরিয়ে গ্রামবাংলার গভীরে, নদীর ধারে, গড়ের প্রাচীরে, শ্মশানের নিস্তব্ধতায়—এই ইতিহাস আর তন্ত্রের মিলিত ছায়া মানুষের ভবিষ্যতকে আজও প্রভাবিত করে চলছে। আর নিবারণ সেই ছায়াদের দেখতে পান—চোখ খোলা রেখেই, জেগে থেকে।
‘কাকচক্ষু’ বইটি তাই শুধু ভয়ের গল্পের সংকলন নয়। এটি মানুষের মনে জমে থাকা অন্ধকার সঞ্চয়ের গল্প। যেমন একটি পুরোনো ঘরের আলমারি খুললে ধুলো উড়ে ওঠে, তেমনি মানুষের জীবনের গোপন কোনায় হাত দিলেই বেরিয়ে আসে চেপে রাখা স্মৃতি, পাপ, আর না-বলা কথা। নিবারণ সেই আলমারির দরজাটা খুলে দেন—কিন্তু বিচার করেন না। কারণ বিচার করার অধিকার তাঁর নেই। তিনি কেবল সেই ভেতরের অন্ধকারকে আলোয় নিয়ে আসেন। আর আলো পড়লেই ভয় জাগে—এটাই এই বইয়ের মূল অনুভূতি। ভয় এখানে বাহুল্যহীন, তীক্ষ্ণ এবং মানবিক।
এই বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় তাই আছে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—ভয় ও কৌতূহলের। পাঠক হয়তো অনেক সময় মনে করবেন, এই নিবারণ চক্রবর্তী যেন একদিকে আশ্রয়দাতা, অন্যদিকে অদৃশ্য কোনো সীমানার প্রহরী। তিনি না থাকলে হয়তো সত্য গোপন থাকত, অনেক রহস্য অজানার অন্ধকারেই পড়ে থাকত। আবার তিনিই সেই সত্যকে এমনভাবে উন্মোচন করেন, যে তা থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। তাঁর কৌতূহল নেই, কিন্তু দায়িত্ব আছে। তাঁর ইচ্ছা নেই, কিন্তু দৃষ্টি আছে। আর সেই দৃষ্টিরই নাম—কাকচক্ষু।
এই বইয়ের নাম নেওয়া হয়েছে বাংলা লোকবিশ্বাস থেকে। কাক—এক অদ্ভুত পাখি, যাকে আমরা কখনও অপয়া, কখনও ভবিষ্যদ্রষ্টা, কখনও পূর্বপুরুষের দূত বলে মনে করি। কাকের চোখ নাকি তীক্ষ্ণ। মানুষের দুঃখ, মৃত্যুর ছায়া, ভবিতব্য—এসব আগে থেকেই টের পায়। নিবারণের চোখেও সেই ঝলক আছে। তিনি দেখেন—কিন্তু কথা বলেন কম। তাঁর নীরবতা তাই এই বইয়ের আরেকটি চরিত্রের মতো—যে কথা না বলেও অনেক কথা বলে যায়।
এই বইয়ে তন্ত্র, ইতিহাস, রহস্য এবং ভয়ের পাশাপাশি আছে মানবিকতার এক গভীর সুর। কারণ যতই আমরা অতিপ্রাকৃতের কথা বলি না কেন, শেষ পর্যন্ত গল্পের কেন্দ্রে থাকে মানুষ—তার ভয়, তার প্রেম, তার অপরাধবোধ, তার আকাঙ্ক্ষা। নিবারণ সেই মানুষগুলোর কাছাকাছি আসেন, তাদের দিকে তাকান আর তাদের অতীতের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প তাই একেকটি পরাবাস্তব স্বীকারোক্তির মতো—যেখানে দোষী কিংবা নির্দোষ, উভয়েই তাদের অন্ধকার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিবারণের সামনে।
‘কাকচক্ষু’-র জগতে আপনাকে স্বাগত জানাই। এখানে আলো আছে—কিন্তু তার পাশে গভীর ছায়াও রয়েছে। আর সেই ছায়ার চোখে হয়তো আপনিও তাকিয়ে আছেন।
অভীক সরকার
পয়লা জানুয়ারি, ২০২৬
মুম্বাই, আন্ধেরি






Please Upload “Tahader Sesh Tarpan” by Goutam Bhattacharya.
এক কথায় অপূর্ব। প্রচুর Research work করে এই উপন্যাস দুটি লেখা। একজন Technologist & Corporate Manegement এর দায়িত্ব সামলে এই ধরণের মঞ্জরী উপহার দিলেন তার এক কথায় অনবদ্য।
মগজ দখল by কাজল ভট্টাচার্য
অসংখ্য ধন্যবাদ বইটি দেওয়ার জন্য | অসাধারণ ও অতুলনীয় |
বেশ ভালো লাগলো। তবে এবং ইনকুইজিশন আর কাউরী বুড়ির মন্দির আগে পড়েছিলাম, সেগুলো অনেক অনেক বেশি বেটার লেগেছিল।