কাকচক্ষু – ২

—আমার জন্ম বীরভূমের নলহাটির কাছে আটগ্রাম বলে একটা জায়গায়। আমরা বৈষ্ণব, নিত্যানন্দ গোঁসাইয়ের শিষ্য পরম্পরা। বাবা ছিলেন গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের বাংলার টিচার। তার সঙ্গে গুরুগিরি করতেন। বৈষ্ণবদের মধ্যে গুরুপ্রথা খুব প্রবল, জানো নিশ্চয়ই। ওটাই ছিল আমাদের পৈতৃক ব্যবসা।

ছোটবেলা থেকেই আমার বাড়ির ওপর টান একটু কম ছিল। পড়াশোনা করতে ভালো লাগত না। বাড়িতে থাকতে ভালো লাগত না। এমনকী বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেও ভালো লাগত না।

আমার শুধু ভালো লাগত নদীর ধারে, পুকুরপাড়ে বা জঙ্গলের মধ্যে কোনও ফাঁকা জায়গায় একা একা বসে থাকতে৷ এমনকী মাঝেমধ্যে গ্রীষ্মের ভরা দুপুরে শ্মশানে গিয়েও বসে থাকতাম। সাংসারিক কোলাহল, জীবনের বিচিত্র বিশৃঙ্খলা, মানুষের জাগতিক ক্ষুদ্রতা—এসবের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার তীব্র বিরাগ ছিল।

বলা বাহুল্য, আমার এসব রকম-সকম দেখে বাবা-মা ভয় পেতেন। আমাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতেন। ভাবতেন, এই বুঝি বাড়ি ছেড়ে বিবাগি হয়ে গেলাম। তাঁদের ভয়ও যে খুব অমূলক ছিল তা নয়। এমনিতেই বীরভূমের মাটিতে বৈরাগ্য আছে। তার উদাসী বাউল-হাওয়ার ডাক মানুষকে এমনিতেই ঘর থেকে বার করে আনে।

সে যাই হোক, এভাবেই দিন চলছিল। এমন সময় এক শ্রাদ্ধবাড়িতে তুষ্ণীরাম হওয়ার ডাক এল।

—কী রাম?

সত্যব্রত মনে হয় শব্দটা শুনতে পায়নি ভালো করে। আমার অবস্থাও তথৈবচ।

মৃদু হাসলেন নিবারণবাবু—ও হো, সরি, তোমাদের, ইয়ে মানে আপনাদের কাছে যে তুষ্ণীরাম শব্দটা অজানা সেটা আগে বোঝা উচিত ছিল।

আমি বললাম, আহা, তুমিটাই থাকুক না। আমরা আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট। সে যা হোক। এই তুষ্ণীরাম বস্তুটা কী?

—বলছি, রোসো।

নিবারণবাবু বোধহয় আমাদের তুমি বলতে পেরে খানিকটা স্বস্তি পেলেন।

—তুষ্ণীরাম হওয়ার আগে শ্রাদ্ধ ব্যাপারটা ভালোভাবে জানতে হবে। হিন্দুস্মৃতিশাস্ত্র মতে, শ্রাদ্ধাদিসংস্কার বহু ধরনের হতে পারে, যেমন তিলকাঞ্চন, চন্দনধেনু, বৃষোৎসর্গ ইত্যাদি। এই বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধে প্রয়োজন হয় একটি বিশেষ ধরনের বস্তুর, নাম বৃষকাঠ।

জিনিসটা আর কিছুই না, বেল বা নিমগাছের গুঁড়ি কেটে খোদাই করে, যাঁর শ্রাদ্ধ তাঁর একটি প্রতিকৃতি তৈরি করা। সেই মূর্তির মাথার ওপর চৌকো ফ্রেমের মধ্যে একটি বৃষ বা ষাঁড়ের মূর্তি। তার ওপর শিবলিঙ্গ, তার ওপর রথের চুড়ো। আর সবার ওপর একটি ত্রিশূল। সবই ওই একই কাঠের তৈরি।

তারপর এই বৃষকাঠ পোঁতা হতো যেখানে শ্রাদ্ধ হওয়ার কথা, সেই জমির ঈশান কোণে। তার গলায় থাকত গামছা, পরনে কাপড়। যে বৃষটি উৎসর্গ করা হতো, তাকে এই বৃষকাঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা হতো। নিয়ম ছিল শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর বৃষকাঠটি দু’রাত্তির সেখানেই পোঁতা থাকবে কড়া পাহারার মধ্যে। শ্রাদ্ধশান্তির ব্যাপার, অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়।

এই বৃষকাঠ পাহারা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল বৈষ্ণব বাড়ির ব্রাহ্মণ সন্তান। অবিবাহিত, উপনয়ন হয়েছে এবং স্বভাবে ধার্মিক এমন কেউ। তার কাজ ছিল সারা রাত রামনাম বা কৃষ্ণনাম করতে করতে বৃষকাঠের কাছে বসে থাকা। তাদেরই বলা হতো তুষ্ণীরাম।

বুঝতেই পারছ, কাজটা সহজ নয়৷ শ্রাদ্ধশান্তির সময় প্রেতলোকের অধিবাসীদের আনাগোনা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। রাতের অন্ধকার তো তাদের আরও আকর্ষণ করে। তাছাড়া সেকালে গ্রামগঞ্জের মাঝরাত মানে নির্জন শ্মশানের থেকে কিছু কম ভয়াবহ ছিল না। সন্ধে সাতটার পর মনে হতো যেন কোনও এক দৈত্য একটা মায়াবলে গোটা একটা বিস্তীর্ণ জনপদকে রাতারাতি নিঝুমপুরী করে রেখে গেছে। সেখানে সারা রাত একটা শ্রাদ্ধের জন্য উৎসর্গীকৃত অমন প্রমাণ সাইজের অদ্ভুতদর্শন মূর্তি পাহারা দিতেও যথেষ্ট সাহস লাগত।

—আর ষাঁড়টার কী হতো? সত্যব্রতর প্রশ্ন।

—তাকে প্রকৃতির মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হতো। ধর্মের ষাঁড় হয়ে ঘুরে বেড়াত, এই আর কী! সে যাই হোক। এসবের জন্যই সেকালে তুষ্ণীরাম হওয়ার জন্য ভালো পয়সা মিলত। একে তো অমন দামি শ্রাদ্ধ নেহাত পয়সাওয়ালা ঘর ছাড়া কেউ করতে পারে না। সেকালেও পারত না, এখনও পারে না। তার ওপর কাজটা করতেও সাহস লাগে। তাই অমন কঠিন কাজে যারা ব্রতী হয় সেসব ব্রাহ্মণসন্তানদের দিতে-থুতেও তাদের তেমন গায়ে লাগত না।

কম করে পাঁচশোটি টাকা, তার সঙ্গে ধুতি, কাপড়, ফলমূল, সিধে সবমিলিয়ে যেটা পাওয়া যেত সেটাও কম না। আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সে যথেষ্টরও বেশি।

সেবার মারা গেলেন হরিপদ সাহা। শুধু আটগ্রাম কেন, গোটা নলহাটিতেও তাঁর মতো বড়লোক আর দ্বিতীয় ছিল না। একটা কোল্ড স্টোরেজ, দুটো তেলকল, বাজারে সবচাইতে বড় আড়ত, সার আর বীজের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ, কী ছিল না তাঁর! সেই সঙ্গে দুই ছেলে আর বউমা মিলে ভরভরন্ত সুখের সংসার।

হরিপদবাবু শুধু বড়লোকই নয়, মানুষ হিসেবেও বড় ভালো ছিলেন। দানধ্যানই হোক বা বিভিন্ন সামাজিক এবং ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন, সবেতেই তাঁর ভারি উৎসাহ ছিল। আশেপাশের গ্রামের মেধাবী অথচ দরিদ্র শিশুদের পড়াশোনার খরচ হোক বা দরিদ্র বাপের মেয়ের বিয়েতে যৌতুকের ব্যবস্থা, তাঁর ভাণ্ডার সদাই উন্মুক্ত থাকত। তাঁর ছেলে দুটিও ভারি ভালো, হরিপদবাবুর মতোই সদয় অথচ বুদ্ধিমান লোক। তাঁদের আমি কাকা বলে ডাকতাম—বলাইকাকা আর জগাইকাকা।

তা বলাইকাকা যখন এসে আমাকে তুষ্ণীরাম হওয়ার জন্য বললেন, প্রথমে না না করলেও পরে বাপ-মায়ের কথা শুনে রাজি হয়ে গেলাম। একে হরিপদবাবুর দুই ছেলেই আমার বাবার ছাত্র। তাঁরা বাবাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধাভক্তি করতেন। তাছাড়া তাঁরা যা টাকাপয়সা দিচ্ছিলেন, সে আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে অনেকটাই বেশি। সংসারের প্রতি তেমন টান না থাকলে কী হবে, বাপ-মায়ের সংসারযাত্রা নির্বাহ করার কষ্ট বিলক্ষণ বুঝতাম।

প্রথম দিন যখন ওঁদের বাড়ি পৌঁছলাম তখন সন্ধে সাতটা। সান্ধ্যাহ্নিক করে এসেছি, তার ওপর তুষ্ণীরাম হওয়ার কিছু প্রাথমিক প্রক্রিয়া থাকে, সেসব করে আসতে আসতে রাত হয়ে গেল। বলাইকাকা আর রূপাকাকিমা এসে সাদরে ডেকে নিয়ে গেলেন।

সেকালে নিয়ম ছিল, যে তুষ্ণীরাম হবে, সে ওই দু’দিন স্বপাক নিরামিষ আহার করবে, শুদ্ধাচারে থাকবে। আমাকে রান্নার জায়গা দেখিয়ে দেওয়া হল। ভাঁড়ারঘর থেকে গোবিন্দভোগ চাল, ডাল, আলু, আরও বেশ কিছু সবজিপাতি দিয়ে গেল, সঙ্গে এক শিশি গাওয়া ঘি। আর তার সঙ্গে একজোড়া কোরা ধুতি আর ফতুয়া। বলাইকাকা নিজে এসে বললেন, ‘লজ্জা কোরো না ভাইপো, তুমি আমাদের ঘরের লোক বললেই চলে। নিজের মনে করে যা যা দরকার চেয়ে নেবে।’

চালে ডালে ফুটিয়ে, আলুসিদ্ধ আর গাওয়া ঘি দিয়ে ভাত খেয়ে যখন উঠলাম তখন রাত ন’টা। গাঁ-গঞ্জের দিকে এখনও ন’টা মানে যথেষ্টই রাত, তাহলে সেকালের কথা কল্পনাই করতে পারো। হরিপদবাবুর বাড়ির লোকজন সব শুয়ে পড়েছে। চারিদিকে নিঝুম, নিথর। এমন সময় ওদের খাস চাকর রামা একটা হারিকেন হাতে নিয়ে এসে বলল, ‘চলুন খোকাবাবু, আপনেরে নিয়ে যাই।’

আমি নতুন ধুতি ফতুয়া পরে তৈরিই ছিলাম। হাতে একটা লাঠি নিয়ে বললাম, ‘চলো।’

এখনও মনে পড়ে, দিনটা ছিল কৃষ্ণা চতুর্দশী। অন্ধকার রাত। আকাশে নখের মতো ঝুলে আছে একটুকরো চাঁদ৷ ঝিকিমিকি করছে তারাদের দল। চারিদিকে ঝিল্লির ডাকে কান পাতা দায়৷ যেতে যেতে একটু দূর থেকে ব্যাঙের আর্তনাদ ভেসে এল, সাপেদের রাতের খাবার সময় এখন।

রামা সামনে লণ্ঠন নিয়ে যাচ্ছিল। বলল, ‘একটু দেখেশুনে পা ফেলবেন বাবু। তেনারা রাতে বেইরেছেন।’

বলার দরকার ছিল না যদিও। আমি গ্রামগঞ্জের ছেলে, রাতের বেলা গ্রামের পথে না দেখেশুনে চলা আর বিপদকে ডেকে আনা যে সমার্থক সে ভালোই জানি।

জায়গাটা ছিল হরিপদবাবুর বাড়ির ঠিক পিছনে একটুকরো ফাঁকা জমিতে। ওঁদের খিড়কি দোর দিয়ে বেরিয়ে বড়জোর আধ মিনিটের রাস্তা। কিন্তু ওই জমি আর খিড়কি দোরের মধ্যে একটা ডোবা আর ছোট বাঁশবাগান আছে। তাই ওখানে যেতে হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুরো বাড়িটাকে একটা বেড় দিয়ে তারপর বুনো ঝোপে ঢাকা একটা ছোট পথ পেরিয়ে পৌঁছতে হয়।

আমরা যখন সতর্ক পদক্ষেপে সেই বুনো ঝোপে ঢাকা ছোট পথ পেরিয়ে রুমালের আকারের চৌকোনা জমিটায় পৌঁছলাম, তখন বাড়ি থেকে বেরোবার পর প্রায় মিনিট দশেক কেটে গেছে। জমিটার ঈশান কোণে একটা বুড়ো অশ্বত্থগাছ ছিল। লোকে বলে, যবে থেকে এই গ্রামের জন্ম, তার আগে থেকেই নাকি এই অশ্বত্থগাছ আছে এখানে। প্রকাণ্ড তার আকার, বিশাল তার অবয়ব।

রামার হারিকেনটা দুলতে দুলতে চলমান আলোর অজগর তৈরি করছিল মাটিতে। আমি সেই চলমান অজগরের আবছায়া শরীরে পা দিয়ে দিয়ে অশ্বত্থের কাছে এসে পৌঁছলাম।

এসে দেখলাম, অশ্বত্থের গোড়ায় একটি শরীর মাদুরের ওপর জবুথবু হয়ে শুয়ে আছে। পাশে একটা নিভু নিভু হারিকেন। গাছের পাশে একটি প্রমাণ আকারের বৃষকাঠ। পুরোহিত বাড়িতে জন্ম, বৃষকাঠের ব্যাপারে আগে শুনেছিলাম বটে, তবে জিনিসটা কী সেটা আগে চাক্ষুষ দেখিনি কখনও। এখন রাতের অন্ধকারে, ধুতি পরানো, গামছা কাঁধে ফেলা ওই অদ্ভুত আকারের মূর্তিটা দেখে গা-টা ছমছম করে উঠল বইকি!

রামা একটু নিচু হয়ে শুয়ে থাকা লোকটাকে নাড়া দিল, ‘ও পেয়ারেলাল, ওঠো। খোকাবাবু এসে গেছেন। আর তোমাকে পাহারা দিতে হবেনি, খোকাবাবু এসে গেছেন।’

শরীরটা সামান্য নড়ল প্রথমে। তারপর একটা দশাসই শরীর উঠে বসল। এই পর্বতপ্রমাণ শরীর এ তল্লাটের সবাই চেনে। এ হচ্ছে পেয়ারেলাল, স্বর্গত হরিপদবাবুর সর্বক্ষণের সঙ্গী। এই অকুতোভয় এবং অতি বিশ্বস্ত মানুষটিকে ছাড়া তিনি এক পা-ও বেরোতেন না।

পেয়ারেলাল যখন উঠে দাঁড়াল, তখন হারিকেনের আলোয় মনে হল যেন একটা ভেঙেচুরে যাওয়া মানুষের ছায়াকে দেখছি। তার ঘাড় নুয়ে পড়েছে, চোখের দৃষ্টি উদ্‌ভ্রান্ত, সারা শরীরে একটা শিথিল ভাব। কিছুক্ষণ আমাদের দেখল, তারপর এদিক ওদিক তাকাল। একটু অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘লোকটা কই?’

রামা জিগ্যেস করল, ‘লোক? কোন লোক? আমরা তো কারোরে দেখলাম না।’

পেয়ারেলাল উদ্‌ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক দেখল। তারপর স্খলিতস্বরে বলল, ‘একটা লোক। কালো মতন দেখতে, খালি গা, মাথায় উসকোখুসকো চুল। ওদিক থেকে উঁকি দিচ্ছিল।’

বলে অশ্বত্থ গাছটার পেছনের দিকে নির্দেশ করল।

আমরা জানি ওদিকে বাবলা গাছের ঘন জঙ্গল। ওখানে মানুষ কেন, কোনও প্রাণীর পক্ষেই দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। রামা একটু ফিক করে হেসে বলল, ‘তোমার আপিমটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গ্যাছে পেয়ারেলাল, তাই চোখে ভুলভাল দেখছ। তুমি এখন ঘরে চলো দেখি। খোকাবাবুরে বসতে দাও।’

রামা তার হাতের হারিকেনটা নামিয়ে রেখে, পুরোনোটা হাতে নিয়ে আমাকে বলল, ‘খুব সাবধানে পাহারা দেবে কিন্তু খোকাবাবু। দেখো, এই মূর্তির কাপড় আর গামছা যেন কেউ চুরি করে না নিয়ে যায়। আর যেন কোনওভাবেই এর অঙ্গহানি না ঘটে।’

আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘এই রাতের অন্ধকারে কে-ই এর কাপড় চুরি করতে আসবে, আর কে-ই এর অঙ্গহানি ঘটাবে?’

রামা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর গলা খাঁকরে বলল, ‘বড় মানুষের অনেক শত্রু থাকে সে তো জানোই। তারা সব শ্যাল-কুকুরের দল, শুধু পেটভর্তি হিংসে। জীয়ন্তে তো বাবুর টিকিটিও ছুঁতে পারেনি, মরার পর শ্রাদ্ধে একটু ব্যাঘাত ঘটিয়ে হয়তো ভাবল মস্ত বড় ক্ষতি করে দিল। বোঝোই তো, গাঁ-গেরামের মানুষ, পেটে পেটে বিষ।’

রামা স্খলিতপদ পেয়ারেলালের হাত ধরে আস্তে আস্তে চলে গেল। আমি মাদুরে বসে হারিকেনের পলতেটা কমিয়ে দিলাম। তারপর কৃষ্ণা চতুর্দশীর রাত যেন তার সমস্ত অন্ধকার নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

মাথার ওপর সারা আকাশ জুড়ে কালো শাড়িতে ছড়িয়ে থাকা হিরেকুচির মতো ঝকঝক করছে তারাদের দল। আমি ছোটবেলা থেকেই আকাশের তারা চিনতে পারতাম। বাবা ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতিষী, তাঁর কাছ থেকেই শেখা। ওই তো, সিংহরাশিতে মঘা নক্ষত্র বিরাজমান।

আমার আবার কুম্ভ রাশি, কুম্ভ লগ্ন, দুইয়েরই অধিপতি শনি। এদিকে রবি আর শনি পিতা-পুত্র হলে কী হবে, দুজনের মধ্যে চির অসদ্ভাব। অথচ আজ সিংহরাশিতে অবস্থান করছে তার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, মঘা। তাহলে কি আজকের দিনটা আমার জন্য তেমন ভালো নয়…

ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি মতো এসে গেছিল। একটু পর হঠাৎ করেই সজাগ হয়ে উঠলাম। কেন উঠলাম, জানি না। শুধু মনে হল, অকারণেই আমার ঘাড়ের রোঁয়াগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। সারা শরীরে একটা অস্থির ভাব। এই চৈত্রের রাতেও শীত শীত করছে। জুলফি পেরিয়ে নামছে শীতল ঘামের ফোঁটা।

ধীরে ধীরে নামগান শুরু করলাম, ‘হরি হরায় নম কৃষ্ণ যাদবায় নম, যাদবায় মাধবায় কেশবায় নম…’

গাইতে গাইতে বুঝতে পারলাম অস্বস্তিটা ক্রমশ বাড়ছে। ধরো, নির্জন স্থানে একা বসে আছ। আর তোমার ক্রমাগত মনে হচ্ছে যে তোমার দিকে আড়াল থেকে কেউ বা কারা চেয়ে আছে।

ঘাড়ের কাছটা শিরশির করে উঠল, স্নায়ুগুলো সজাগ। গানের জোর বাড়িয়ে দিলাম৷ সবে ‘জয় রূপ সনাতন ভট্ট রঘুনাথ’ অবধি পৌঁছেছি, এমন সময়ে ডান দিকে ঘাড়টা ঘুরিয়েই একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেলাম।

বৃষকাঠের ঠিক সামনে একটা লোক। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মূর্তিটাকে দেখছে। পাকানো শরীর, মিশকালো গায়ের রং, পরনে একটা খেটো ধুতি, খালি পা আর মাথায় উসকোখুসকো চুল। লোকটা বাহ্যজ্ঞানরহিতভাবে, নির্নিমেষে যে উদগ্র আগ্রহের সঙ্গে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে আছে, তার তুলনা নেই। যেন এই জড়জগত তার দৃষ্টির সামনে থেকে মুছে গেছে। তার সমগ্র অস্তিত্ব, সমস্ত সত্তা যেন ওই বৃষকাঠটির ওপর কেন্দ্রীভূত।

আমি এত চমকে গেছিলাম যে বলার নয়। লোকটা ভূত নয় নিশ্চিত, কারণ হারিকেনের আলোয় গাছের গায়ে তার ছায়া পড়ছে। অথচ লোকটার আকস্মিক উপস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, মনে হল শিরদাঁড়া দিয়ে নিমেষে একটা বিদ্যুৎ নেমে গেল যেন। বুকের ভেতরটা ধড়াস করে লাফিয়ে উঠে হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল।

একটু পর নিঃশ্বাস একটু স্বাভাবিক হলে সমস্ত সাহস একত্র করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই, কে তুমি?’

লোকটা প্রথমে আমাকে পাত্তাই দিল না। আরও খুঁটিয়ে মূর্তিটাকে দেখতে লাগল। তারপর অস্ফুটে বলে উঠল, ‘বাহ, কারিগরের তো হাত ভালো! সাহার পো-কে এরকমই দেখতে ছিল বটে। সেই নাক, সেই চোখ। চমৎকার ফুটিয়েছে কিন্তু!’

এবার আমার গলার জোর একটু বাড়ল। ততক্ষণে সাহসও ফিরে এসেছে কিছুটা। বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘এই, কথা কানে যাচ্ছে না? কে তুমি?’

লোকটা এবার ধীরে ধীরে ঘাড়টা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। লক্ষ্য করলাম, লোকটার চোখদুটো একটু অস্বাভাবিকরকমের বড় আর চোখের মণি প্রায় পুরো চোখই দখল করে নিয়েছে। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সে বলল, ‘আমার নাম মনোরঞ্জন গো খোকাবাবু। মনোরঞ্জন মাঝি। লোকে ডাকে মনা মাঝি।’

লোকটা যে ভূতপ্রেত নয় সেটা বুঝতে পেরে শরীরে মনে দুনো বল এল। এবার বেশ রুষ্টস্বরে বললাম, ‘এখানে কী করছ এত রাতে? আর তুমি এখানে এলেই বা কী করে?’

কথাটা বলেই পেয়ারেলালের কথাটা মনে পড়ে গেল। এই কি সেই লোকটা? কিন্তু বাবলাঝোপের ওপার থেকে…

লোকটা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ গো বাবু। আমি সেই লোকটাই বটে। পেয়ারেলাল আমাকেই দেখেছিল৷ আর বাবলাঝোপের মধ্যে কী করে দাঁড়িয়েছিলাম? সে তোমাকে বললে তোমার বিশ্বাস যাবে না গো বাবু। কণ্টকবন্ধন বোঝো?’

বুকের মধ্যে ফাঁকা ফাঁকা ভাবটা আবার ফিরে এল। কানের গোড়ায় ঘাম জমছে। এই মনা মাঝি না কে, এই নোংরা দেখতে লোকটা আমার মনের প্রশ্নগুলো বুঝল কী করে?

মনা মাঝি এবার আমার পাশে এসে বসল। একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, ‘দেখো খোকাবাবু, নোংরা ব্যাপারটা থাকে মানুষের মনে। আমি গরিব মানুষ, আদাড়ে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াই, স্নান-খাওয়ার ঠিক থাকে না বলে নাহয় আমার গায়ে ময়লা। তাই বলে আমাকে খারাপ মানুষ বলে দেগে দিলে? এটা কি ঠিক করলে গো?’

আমার বুকের মধ্যে একটু আগের ভয়টা আবার ফিরে এল। এ সত্যিই মানুষ? ভূত নয় তো?

লোকটা হেসে বলল, ‘না গো খোকাবাবু, আমি ভূত নই। মানুষ।’

সেদিন আমার কথা শুনে সত্যব্রতবাবুর যেমন অবস্থা হয়েছিল, ঠিক তেমনই হল আমার সঙ্গে। লোকটা কোন আশ্চর্য উপায়ে আমার মনের কথাগুলো বুঝে যাচ্ছে?

মনা মাঝি একটা শেষ টান দিয়ে বিড়িটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘ওতে অত অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই গো দাদাবাবু। এ খুবই সাধারণ বিদ্যা, এর নাম কাকচক্ষু।’

‘কী চক্ষু?’ আমি শব্দটা প্রথমে শুনতে পাইনি৷

‘কাকচক্ষু। এ বিদ্যে থাকলে তুমি যে কোনও মানুষের দিকে একবার তাকিয়েই তার অতীত, বর্তমান সব একেবারে বায়োস্কোপের মতো দেখতে পাবে। মনে হবে যেন সব তোমার চোখের সামনে ঘটছে।’

আমি অবিশ্বাসের সঙ্গে লোকটার দিকে চেয়ে রইলাম। এরকম বিদ্যা আবার হয় নাকি?

লোকটা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ‘হয় না তোমাকে কে বলল? তুমি জানো না বা শোনোনি বলে কি বিদ্যেটা মিথ্যে হয়ে যায়? বলি, সব বিদ্যেই কি আর বইপত্তরে লেখা থাকে, নাকি ইস্কুলে পড়ায়?’

কথাটা মিথ্যে নয় সে তো দেখতেই পাচ্ছি। যে কোনও কথা আমার মনের মধ্যে উদয় হওয়ামাত্র এ টের পেয়ে যাচ্ছে। তবুও…

লোকটা এবার অল্প হেসে বলল, ‘তবুও বিশ্বাস হচ্ছে না তো? যাই হোক। কথায় বলে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর। আপাতত তুমি একটু ঘুমোও দিকি। আমার কিছু কাজ আছে।’

কথাটা শোনামাত্র আমি সজাগ হয়ে উঠলাম। কড়া গলায় বললাম, ‘ঘুমোব বলে তো আসিনি। আর তুমি এখানে কী করছ? কোনও বদ মতলব নেই তো? থাকলে কিন্তু সুবিধা হবে না, আগেই বলে রাখি। আপাতত মানে মানে কেটে পড়ো দেখি।’

লোকটা অদ্ভুতচোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কৌতুকের সুরে বলল, ‘রামা বুদ্ধিমান মানুষ, সে যা বলেছে তার অর্ধেকটা সত্যি, আর বাকি অর্ধেকটা মিথ্যে।’

আমি বললাম, ‘কেন? রামা আমাকে মিথ্যে বলবেই বা কেন?’

লোকটা পরের কথাটা বলল খুব ধীরে ধীরে, ‘কারণ সত্যি কথাটা বললে তুমি যে ভয় পেতে খোকাবাবু।’

লোকটার কথা শুনে বুকের মধ্যে শিরশিরে ভাবটা আবার চাগিয়ে উঠতে লাগল। এই অন্ধকার রাত, টিমটিমে হারিকেনের আলো, ঝিঁঝি পোকার রব, বুড়ো অশ্বত্থগাছের পাশে রাখা ভূতুড়ে বৃষকাঠ, আর এই অদ্ভুতদর্শন লোকটা, সবমিলিয়ে একটা পাথুরে ভয় খুব ধীরে ধীরে বুকের মধ্যে চেপে বসতে লাগল।

লোকটা এবার গান গাইতে শুরু করল। খুব মৃদুস্বরে, ধীর লয়ে। প্রথমে তার ভাষা বুঝতে পারছিলাম না। তারপর একটুখানি শুনতেই বুঝলাম, এ আমার চেনাজানা কোনও ভাষার গানই নয়। কিন্তু না বুঝলে কী হবে, সেই গান শুনতে শুনতে একটা অদ্ভুত ঘুম-ঘুম মায়া যেন আমাকে ঘিরে ফেলতে লাগল।

পৌষের চাঁদনি রাতে যেমন মিহি কুয়াশার চাদর নেমে আসে খেতের ওপর, তেমনভাবেই যেন অচিনপুরের কোন এক নরম পাখির বুকের মতো কোমল ক্লান্তি নেমে আসতে থাকল আমাকে ঘিরে। আহা, কী মধুর সেই শ্রান্তি, কী অনাবিল সেই আনন্দ! আমার চোখ বুজে আসতে লাগল, আমার মনের দরজা বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। মনে হল যেন আকাশভাঙা ঘুমের বৃষ্টি নেমে আসছে আমার ওপর। আমি তাতে ভিজে যাচ্ছি, তলিয়ে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি সেই একঘেয়ে ঘুমপাড়ানি সুরের মধ্যে…

ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল। চোখে রোদের আলো পড়তেই ধড়মড় করে উঠে বসলাম। ইস, কী বিশ্রী ঘুমটাই না পেয়ে বসেছিল আমাকে! তারপর চোখ রগড়ে দেখলাম, পুরো জায়গাটা ঘিরে একটা ছোটখাটো ভিড়। তার মধ্যে বলাইকাকা, জগাইকাকা, রামা, পেয়ারেলাল এরা তো ছিলই—আমার বাবাকেও দেখতে পেলাম৷ বুঝতে পারলাম, তারা বৃষকাঠটা ঘিরে দাঁড়িয়ে উত্তেজিতস্বরে কী সব আলোচনা করছে।

আমাকে উঠে বসতে দেখে ভিড়টার নজর আমার দিকে ঘুরে গেল। বাবা দু’পা এগিয়ে এসে প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল, ‘এত ঘুম তোর শরীরে? এত ঘুম?’

আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘কেন? কী হয়েছে?’

‘কী হয়েছে?’ হাহাকার করে উঠল বাবা, ‘তোকে একটা সামান্য কাজ দেওয়া হয়েছিল—সারা রাত জেগে একটা জিনিস পাহারা দেওয়ার। সেটাও পারলি না তুই? এত করে বলা সত্ত্বেও সেই তুই ঘুমিয়ে পড়লি?’

আমি আরও আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘তাতে কী হয়েছে?’

‘কী হয়েছে? এখনও জিগ্যেস করছিস কী হয়েছে? আয়, তবে আয়, নিজের চোখেই দেখে যা তাহলে!’

এই বলে বাবা আমার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল সেই বৃষকাঠের সামনে। তারপর সেখানে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘শুধু তোর জন্য এত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল, আর তুই এখনও জিগ্যেস করছিস কী হয়েছে?’

আমি তাকিয়ে দেখলাম বৃষকাঠের গায়ের ধুতি আর গামছা নেই, আর মূর্তির ডান হাতের পাঞ্জাটা কে যেন নিপুণ হাতে কেটে নিয়ে গেছে।

আমি কিছু বলার আগেই বলাইকাকা এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ‘কাল কী হয়েছিল পুরোটা বলো তো দেখি ভাইপো।’

আমি গতরাতে যা যা হয়েছিল সব বললাম, শুধু ওই কাকচক্ষুর ব্যাপারটা বাদ দিয়ে। পেয়ারেলালও ছিল সেখানে, সে-ও লোকটার বর্ণনা দেওয়ার সময় মাথা ঝাঁকিয়ে আমার কথা সমর্থন করল৷ তবুও দেখলাম সবার মুখ গম্ভীর। কিছুক্ষণ পর রামা জিগ্যেস করল, ‘লোকটা নিজের কী নাম বলেছিল খোকাবাবু?’

এবার মনে পড়ল যে এতক্ষণ আমি লোকটার নাম বলিনি। এবার বললাম, ‘মনোরঞ্জন মাঝি। বলেছিল, লোকে নাকি ওকে মনা মাঝি বলে চেনে।’

শোনামাত্র যেন কোন এক আশ্চর্য মন্ত্রবলে উপস্থিত সবাই চুপ করে গেল। একটু পর জগাইকাকা গলা খাঁকারি দিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল, ‘পাগলাটা আবার ফিরে এসেছে নাকি? সেই বিশ্রী কেচ্ছাটার পর উধাও হয়ে গেছিল না? সেও তো প্রায় বছর পনেরো হল।’

বিপত্তারণ ঘোষাল ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ। তিনি একটু চিন্তিতস্বরে বললেন, ‘ও পাগল নয় জগাই। যতটুকু জানি, গোঁসাইপুর থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর সে নাকি তারাপীঠের শ্মশানে কোন এক পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিকের কাছে গেছিল দীক্ষা নিতে। তারপর তাকে বহুদিন দেখা যায়নি। পরে জানা গেছিল ও নাকি কামাখ্যা গেছে কী সব সাধনা-টাধনা করতে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে এতদিন পর ফিরে এল কেন?’

জগাইকাকা বলল, ‘এর এত খবর আপনি কী করে জানলেন কাকা?’

‘গোঁসাইপুরের ঘোষালরা যে আমাদের জ্ঞাতি সে তো জানোই। মনাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর ভূপতি, মানে বড় ঘোষাল লোক লাগিয়ে রেখেছিল ওর গতিবিধির খোঁজ রাখতে। যাতে আবার ফিরে এসে ঝামেলা পাকাতে না পারে। ভূপতির কাছ থেকেই এসব শোনা। তারপর মনা কামাখ্যা চলে যাওয়ার পর ওরা খোঁজ রাখা ছেড়ে দেয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, এ আবার এতদিন পর এলাকায় ফিরে এল কেন?’

গোঁসাইপুর আটগ্রাম থেকে বিশ কিলোমিটার দূর। মনা মাঝি সেখানকার লোক সে তো বুঝলাম। কিন্তু বাকি কথাবার্তা কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। কারা এই ঘোষালরা? আর মনা মাঝিকে গ্রাম থেকে তাড়িয়েই বা দেওয়া হয়েছিল কেন?

কিছুই বুঝতে না পারলেও যেটা আমাকে ভাবাচ্ছিল, সেটা হচ্ছে মনা মাঝি হঠাৎ বৃষকাঠের ধুতি, গামছা আর ডান হাতের পাঞ্জা কেটে নিয়ে গেল কেন? আর তাতে এরা এত উত্তেজিতই বা হয়ে উঠেছে কেন?

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ততক্ষণে পুরোহিতমশাই এসে গেছেন। তিনি শান্তি স্বস্ত্যয়নের বিধি ব্যবস্থা করতে লাগলেন। আমি বাবার সঙ্গে সারা রাস্তা বকা খেতে খেতে এলাম।

সেদিন রাত্রে মায়ের পাশে ঘুরঘুর করছিলাম৷ মা কিছুক্ষণ পর কোমলস্বরে জিগ্যেস করল, ‘এমন অস্থির অস্থির করছিস কেন? কিছু বলবি?’

আমি এর অপেক্ষাতেই ছিলাম। মায়ের পাশে থেবড়ে বসে বললাম, ‘গোঁসাইপুরের ভূপতি ঘোষালদের বাড়িতে কী হয়েছিল গো মা? আর এই মনোরঞ্জন মাঝি লোকটাই বা কে? তাকে তাড়িয়েছিলই বা কারা? আর কেন?’

দেখলাম, মায়ের মুখটা নিমেষে গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘ওসব বড়দের কথার মধ্যে তোমাকে থাকতে হবে না খোকা। তুমি নিজের কাজে মন দাও।’

আজকাল বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যেমন ফ্রিলি মেশেন, আমাদের ছোটবেলায় সেসব ভাবাই যেত না৷ আমি তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেলাম। তারপর মায়ের পাশে এসে বসে বললাম, ‘তাহলে আরেকটা কথা বলো, বৃষকাঠের কাপড় চুরি করলে বা অঙ্গহানি হলে কী হয়?’

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘শ্রাদ্ধে উৎসর্গ করা বৃষকাঠ বড় পবিত্র জিনিস বাবা। যাঁর শ্রাদ্ধের জন্য ওটি বানানো, তাঁর আত্মা শ্রাদ্ধের পরেও অত সহজে নিজের জায়গা, নিজের স্বজনদের ছেড়ে যেতে পারেন না। সেই আত্মা দু’দিন ওই বৃষকাঠটিতে আশ্রয় করে থাকেন।

‘তখন নিম্নশ্রেণির তান্ত্রিক অঘোরীরা এই বৃষকাঠের কাপড় বা মূর্তির কোনও অংশ কেটে নিয়ে গিয়ে নিজেদের বিভিন্ন তুকতাকের কাজে লাগায়। বৃষকাঠ ভারি ভয়ঙ্কর জিনিস বাবা। শ্রাদ্ধে উৎসর্গ করা বৃষকাঠের অংশ কারও কারও কাছে ভারি দামি৷’

আমি শুনে চুপ করে গেলাম। ওই কাকচক্ষুর ব্যাপারটা আমি তখনও কাউকে বলিনি। ভেবেছিলাম মা’কে বলব। কিন্তু মায়ের কথা শুনে আমার গলা অবধি শুকিয়ে গেল। এই মনা মাঝি তাহলে কোনও অঘোরী তান্ত্রিক? নিশ্চয়ই তাই, নইলে সে কাকচক্ষুর মতো অলৌকিক বিদ্যা লাভ করল কী করে?

এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে অবশ্য বেশি দেরি হয়নি আমার। দিনটা ছিল অক্ষয় তৃতীয়ার আগের দিন।