দেবলরাজার গড় – ৯

গড়ের ভাঙা সিংহদরজার কাছে যখন পৌঁছলাম, তখন অষ্টমীর বাঁকা চাঁদ মাথার ওপর। আস্তে আস্তে আমরা এসে দাঁড়ালাম সেই পরিখার সামনে। আমাদের সামনে কোনও এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মৃতদেহের মতো শুয়ে ছিল দেবলরাজার ভাঙা গড়। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল এখনই যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে।

পরিখা পেরিয়ে গড়ের ভেতর ঢুকেই মনে হল, সম্পূর্ণ অন্য জগতে পৌঁছে গেছি। বাতাস এখানে নিশ্চুপ, প্রকৃতি এখানে স্থবির, চারিদিকে পাথুরে শূন্যতা।

জয়ন্ত দেখলাম সম্মোহিতের মতো এগিয়ে চলেছে গড়ের পিছন দিকে। আমি জানি ও কোথায় যাচ্ছে। আজ সেখানেই দেবী বলাকামুখীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা।

প্রাসাদের পিছনে সেই উঁচু ঘাসবনের শূন্য মাঠ, আর সেই ঘাসবনের ঠিক মধ্যিখানে মাথা তুলে আছে দেবীর মন্দির। মন্দিরটি ঘিরে অতি প্রাচীন বিশাল পাঁচটি গাছ।

এখন আমি জানি, ওই পাঁচটি গাছ কী কী। বট, অশ্বত্থ, বেল, আর ওদিকে নিশ্চয়ই আমলকী আর অশোক। পঞ্চমুন্ডির আসন ঘিরে রাখে এই পাঁচটি দিব্যদ্রুম। এই পাঁচটি বৃক্ষ পঞ্চভূতের প্রতীক। সম্পূর্ণ মন্দিরটিই দেবলরাজ আর সুবুদ্ধিমিশ্রর পোঁতা পঞ্চমুন্ডির আসন।

দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল, মন্দিরের মধ্য থেকে আলো দেখা যাচ্ছে। আমরা দুজনে ঘাসে ছাওয়া মাঠে পা দেওয়ার আগে থামলাম। আগেরবার মায়ের অনুমতি পাইনি মন্দিরে যাওয়ার। আজ কি পাব?

আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েই যেন নড়ে উঠল এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকা বাতাস৷ ঘাসের মাথা দুলিয়ে, আমাদের ঘিরে পাক খেয়ে গেল সেই ডাক, ‘আয় রাজা আয়… আয়.. রাজা আয় আমার কাছে…।’

ঘাসজমিতে পা রাখলাম।

এবার শুধু জয়ন্ত নয়, আমিও অমোঘ আকর্ষণে এগিয়ে যাচ্ছিলাম মন্দিরের দিকে। না, কোনও বাধা নেই। শুধু আছে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলা। পথের ঘাস সরে গিয়ে, মাথা নুইয়ে পথ করে দিচ্ছিল আমাদের। চাঁদের আলোও যেন নিবিড় আলোয় ধুইয়ে দিচ্ছিল সেই পথ। শব্দহীন চরাচরে জেগে উঠেছিল ফিসফিসে শব্দ, ‘ওরে তোরা সরে যা, সরে যা… রাজা এসেছে, মায়ের পুজো করবে বলে রাজা এসেছে… সরে যা সবাই…।’

চুম্বক যেভাবে লোহার দিকে এগিয়ে যায়, সেভাবেই মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাছিলাম। জয়ন্তকে দেখে মনে হচ্ছিল, ও এই পৃথিবীতে আর নেই। ওই অবস্থাতেও লক্ষ করছিলাম, পাঁচটি গাছের ডালে উড়ে এসে বসেছে শয়ে শয়ে পাখি। পায়ের কাছ দিয়ে সরসর করে চলে যাচ্ছে সাপেদের দল। তাদেরও গন্তব্য ওই মন্দির৷ যেন এই অঞ্চলের সমস্ত বিহগ এবং ভুজঙ্গকুল ধেয়ে চলেছে এক আদিম মাতৃকার ডাকে।

ধীরে ধীরে মন্দিরের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। সামনে ঠিক আটটি ধাপের সিঁড়ি। তারপর একটি ছোট চাতাল। চাতালের পর মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ। সেখানে একটি বড় প্রদীপ জ্বলছিল।

আমরা যখন মন্দিরের সামনে পৌঁছলাম, তখন আমাদের দুজনেরই স্বাভাবিক চেতনা অবলুপ্ত। তবুও তার মধ্যেই সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিয়ে লক্ষ করলাম, মন্দিরের মধ্যে কেউ যেন বসে আছেন। এখান থেকে তার শুধু মাথার পিছন দিকটি দেখা যাচ্ছে। একটি করে ধাপ উঠছি, আর ক্রমেই তাঁর শরীরটি দৃশ্যমান হচ্ছে।

শেষ ধাপটি পার হয়ে দেখলাম প্রশস্ত চাতাল পেরিয়ে একটি অতি বৃহৎ গর্ভগৃহ। তার মধ্যে একটি সুউচ্চ বেদি। বেদির ওপর একটি মূর্তি। যে মূর্তি আমার বড় চেনা। দেবী বলাকামুখীর মূর্তি। আর সেই দেবীমূর্তির সামনে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ, খালি গায়ে, শুধুমাত্র একটি পীতবর্ণের অধোবাস পরে বসে আছেন। প্রায় চৈতন্যহীন অবস্থাতেও বুঝলাম, যে ওই দেহটি কার। ওই দেহের মালিককে আমি চিনি৷

আমরা চাতালের ওপর উঠে আসার পর প্রফেসর দেবব্রত লাহা, ওরফে বিক্রমরাজ ঘাড় না ঘুরিয়ে অতি শান্ত এবং গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘এসেছ পুত্র? এসো। আমার পাশে এসে অধিষ্ঠিত হও। আজ বড় পুণ্যতিথি, দেবী বলাকামুখীর চিত্তোদ্বোধনের দিন। এসো এই পুণ্যপূজার সমস্ত ক্রিয়াকাণ্ড অনুধাবন করো। এ বড় কঠিন ক্রিয়া, এর সামান্য ত্রুটিতে মা বলাকামুখী কুপিতা হন। আর এই ক্রিয়ায় সফল হলে মায়ের কাছে যা যাচ্‌ঞা করবে তা তৎক্ষণাৎ তোমার করায়ত্ত হবে। নিশ্চিত জেনো, গত সহস্র বৎসর ধরে আমাদের বংশের শাসন, প্রতিপত্তি, অধিকার, সবই যে এমন বিঘ্নহীন, অনায়াস, এবং সুচারুরূপে নিরবিচ্ছিন্ন বহমান রয়েছে, সে কেবলমাত্র এই দেবীর কল্যাণে।’

জয়ন্ত অর্ধচেতন অবস্থায় দেবল লাহার পাশে গিয়ে বসল। তারপর চেনাস্বরে, কিন্তু সম্পূর্ণ অচেনা ভঙ্গিতে বলল, ‘এসেছি পিতা। আদেশ করুন, আমার এখন কী কর্তব্য?’

অকস্মাৎ আমার সামনে এক বহু প্রাচীন দৃশ্য উন্মোচিত হল। বুঝতে পারলাম না, এ আমার মানুষী চক্ষু না কাকচক্ষু। মনে হল, মুহূর্তের মধ্যে আমি পৌঁছে গেছি অন্তত হাজার বছর আগের এক সময়ে। দাঁড়িয়ে আছি এক নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত প্রান্তরে। প্রান্তরের চারিদিক ঘিরে সৈন্যশিবির। রাত্রির অন্ধকারে সেইসব শিবিরে জোনাকির মতো জ্বলছে দীপবর্তিকা। তার মধ্যেই নদীর তীরে একটি অস্থায়ী পূজাবেদি, তার তার ওপর রক্ষিত আছে দেবী বলাকামুখীর মূর্তি।

আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি অতীতে আছি না বর্তমানে। আমার জাগতিক চক্ষু আর কাকচক্ষু ক্রমেই একে অপরকে অতিক্রম করে ছায়াপাত করছিল একে অন্যের উপর। আমার অতীত, বর্তমান, কল্পনা, বাস্তবতা সব এক ঘূর্ণাবর্তে ক্রমাগত ঘুরে চলেছে। আমি কখন বর্তমানে আছি, আর কখন অতীতে, বুঝে উঠতে পারছি না।

জয়ন্ত প্রশ্ন করল, ‘অতঃপর কী কর্তব্য পিতা?’

দেবব্রত লাহা ওরফে বিক্রমরাজ বললেন, ‘মহাপূজার প্রায় সমস্ত বিধি সুসম্পন্ন হয়েছে৷ শুধু একটি মাত্র বিধি সম্পাদিত হতে বাকি। মহামন্ত্রী তারই আয়োজনে গেছেন। কয়েক দণ্ড পরই তিনি আবির্ভূত হবেন।’

জয়ন্ত প্রশ্ন করল, ‘অকস্মাৎ এই মহাপূজার আয়োজন কেন পিতা? গর্ভগৃহ হতে দূরে, এই ভীম রণভূমিতে দেবীর চিত্তোদ্বোধনের প্রয়োজন পড়ল কেন?’

বিক্রমরাজ বললেন, ‘আজ আমাদের রাজাধিরাজ রামপালের বড় প্রয়োজন দেবীর আশীর্বাদের। তিনি চান মহাপরাক্রমী কৈবর্তনায়ক ভীমকে পরাস্ত করে তাঁর জনকভূ বারেন্দ্রভূমি উদ্ধার করতে। আর সেই জন্য দেবীকে এই রণভূমিতে আহ্বান করে আনা। সেই জন্যই এই মহাপূজার আয়োজন।’

‘কিন্তু পিতা, দেবীর আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য আমাদের কুলপ্রথা তো শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার জন্য, শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য। পররাজ্য আক্রমণের জন্য তো দেবীর আশীর্বাদ নেওয়ার প্রথা তো নেই পিতা। তাহলে কুলদেবীকে তাঁর গর্ভগৃহ হতে উৎখাত করে এখানে নিয়ে এসে চিত্তোদ্বোধনের কী প্রয়োজন?’

বিক্রমরাজের শরীর কি সামান্য সময়ের জন্য কঠিন হয়ে উঠল? স্তিমিতস্বরে বললেন, ‘পুত্র, এতদ্বারা আমাদের অধীনস্থ ভূভাগ ও রাজত্ব আরও সুবিস্তৃত হবে। তুমি চাও না অধিক ক্ষমতা? অধিক ভূভাগ? অধিক প্রজাপুঞ্জ? অধিক রাজস্ব?’

দেখলাম, পিতা-পুত্র দুজনেই খানিকক্ষণ নির্বাক বসে রইলেন। তারপর জয়ন্ত ধীরস্বরে বলল, ‘পিতার আদেশ ধর্মাদেশ। আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। পূজাপ্রক্রিয়ার কোন অন্তিম বিধিটি এখনও সম্পন্ন হয়নি পিতা?’

দীর্ঘশ্বাস নিলেন বিক্রমরাজ, ‘তুমি এই দেবীপূজার সাধারণ বিধির সমস্তই জ্ঞাত আছ। শুধুমাত্র যা জ্ঞাত নও সে বিষয়ে অবধান করো।

‘আজ থেকে সহস্র বৎসর পূর্বে, দেবীকে যখন তাঁর মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন তাঁর সামনে এক চণ্ডালজাতির উপাসকের বলিদান দেওয়া হয়েছিল। তার নাম পিশাচখণ্ডী। দেবী বলাকামুখীর মন্দির বড় পবিত্র স্থান, একাধারে পঞ্চবটী এবং পঞ্চমুন্ডির আসন। আর পঞ্চমুণ্ডের পঞ্চম মুণ্ডটি ছিল সেই চণ্ডাল উপাসকের। যতদিন দেবী তাঁর উদ্দেশে নিবেদিত পঞ্চমুন্ডির আসনে আসীন আছেন, ততদিন তাঁর প্রতি নিবেদিত প্রতিটি পূজাই তাঁর চিত্তদ্বোধনের জন্য উপযুক্ত।

‘কিন্তু দেবী যদি কখনও গৃহত্যাগী হন, অর্থাৎ তাঁকে তাঁর মন্দির থেকে উৎখাত করা হয়, তাহলে তাঁর প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য সেই প্রথম পূজার সমস্ত বিধি নিখুঁত অনুসরণ করা আবশ্যক। আর তার অঙ্গাঙ্গী, অবিচ্ছেদ্য, অবশ্যম্ভাবী অংশ হচ্ছে পিশাচখণ্ডীর কোনও উত্তরাধিকারীর বলিদান।’

‘অর্থাৎ?’

‘অর্থাৎ সেই একই বংশের রক্তধারায় স্নান করাতে হবে দেবীর পাদপীঠ। তবেই এই মূর্তিতে দেবীর প্রাণের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে। মহামন্ত্রী সেই উদ্দেশেই গেছেন পিশাচখণ্ডীর জন্মস্থানে, তার উত্তরাধিকারীর সন্ধানে।’

‘সেই উত্তরাধিকারী কি পিশাচখণ্ডীর মতো স্বেচ্ছায় নিজের বলিদানের জন্য স্বতঃপ্রবৃত্ত হবেন পিতা?’

বিক্রমরাজের দেহ কি কঠিন হয়ে উঠেই ফের স্বাভাবিক হল? তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘হতেও পারেন, না-ও পারেন। তবে দেবীর পূজাবিধি অলঙ্ঘনীয়।’

‘অর্থাৎ?’

‘অর্থাৎ তিনি সম্মত হোন না হোন, বলি তাঁকে হতেই হবে। স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়।’

‘কিন্তু পিতা, তিনি যদি অনিচ্ছুক হন, তাহলে?’

‘তাহলে তাঁকে যেনতেনপ্রকারেণ এখানে উপস্থিত করানোর দায়িত্ব মহামন্ত্রীর। সেই উদ্দেশেই তিনি গেছেন তাঁর ঈপ্সিত লক্ষ্যে…’

জয়ন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বোধহয় বিবেকের দোলাচলে দুলছিল সে। তারপর ধীরস্বরে প্রশ্ন করল, ‘কোথায় গেছেন মহামন্ত্রী? কোথায় পিশাচখণ্ডীর জন্মস্থান?’

‘এখন যেখানে আমরা অবস্থান করছি, সেই গঙ্গা-করতোয়ার সঙ্গমস্থল থেকে পূর্বে কয়েক ক্রোশ দূরে একটি জনপদ আছে, নাম বটগোহালী। সেখানেই পিশাচখণ্ডীর বংশধরদের বাস।’

ফট করে আমার চটকা ভেঙে গেল। বটগোহালী নামটা কয়েক ঘণ্টা আগেই শিপ্রাকাকিমার মুখে শুনেছিলাম না? বটগোহালীর বর্তমান নাম যেন কী বলেছিলেন উনি?

হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। নওগাঁ, এখন বাংলাদেশে। কিন্তু এই নওগাঁ নামটা আগেও তো শুনেছি। কোথায়?

আমার মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ ঘটল৷

যার কৌশলে দেবী বলাকামুখীর মূর্তি চুরি করা নিয়ে এই জটিল কাহিনির সূত্রপাত, যে নাকি কয়েকদিন আগে কলকাতার বিআর সিং হাসপাতাল থেকে কোমায় থাকা অবস্থাতে অলৌকিকভাবে উধাও হয়ে গেছে, সেই রতন মণ্ডল কোথা থেকে এসেছিল যেন?

এই সময়ে জলজ শ্যাওলার পচা আঁশটে গন্ধ যেন ঝাপট মারল আমার নাকে। আমার সমস্ত শরীরে ভয়ে, ঘেন্নায় কাঁটা দিয়ে উঠল। রোঁয়া দাঁড়িয়ে পড়ল আমার ঘাড়ের। আমার সমস্ত চেতনা যেন ভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘আসছে! ও আসছে!’

আমি দেখলাম দেবব্রত লাহাও উঠে দাঁড়িয়ে এদিকে ফিরে তাকালেন। কিন্তু আমাকে যেন দেখতেই পেলেন না৷ তাঁর চোখ সুদূর প্রান্তে নিবদ্ধ৷ শুধু অস্ফুটে বলে উঠলেন, ‘এসেছে? এসেছে সে?’

অষ্টমীর চাঁদের ম্লান আলোয় দেখলাম, সেই ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরের উপান্ত থেকে একজন উলঙ্গ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো হেঁটে আসছে আমাদের দিকে। তার চোখদুটি ঊর্ধ্বাকাশে নিবদ্ধ, রুগ্ন শরীরের হাড়-পাঁজর গোনা যায়, সারা মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল। তাকে দেখে একটি মনুষ্য পুত্তলিকার বেশি আর কিছু মনে হচ্ছে না। কাকচক্ষু উন্মীলনের প্রয়োজন হল না, আমার অন্তরাত্মা বলে দিল, এই-ই সেই তস্কর রতন মণ্ডল। তার পিছন পিছন হেঁটে আসছে একটি অতি চেনা শরীর।

আগেই বলেছি, আমার কাকচক্ষুর ওপর আমার বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমি দেখতে পেলাম, এক খোড়ো ছাউনিওয়ালা মাটির ঘরে বসেছে মদের আড্ডা। সেখানে মদ, মাংস, তামাকের ধোঁয়া, কী নেই! কয়েকজন যুবক সেখানে নেশায় উল্লাসে উন্মত্ত। একটু পর দেখলাম একজন প্রৌঢ় মানুষ নাকে মুখে গামছা চাপা দিয়ে ঢুকছেন সেই আড্ডায়।

রতনকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে কী যেন বোঝাচ্ছেন তাকে… রতনের আরও সঙ্গীসাথিরা দূরে… মদে আর তামাকের নেশায় একেবারে চুর তারা… চারিদিকে ধোঁয়া, মদের বোতল আর মাংসের চাট… রতন মণ্ডল হা হা করে হেসে উঠল একবার, তার চোখদুটো লোভে চকচক করছে…

তারপর এক অমাবস্যার রাত… রতন মণ্ডল বকরাক্ষসের জঙ্গলে ঢোকার মুখে দেবীর থানের সামনে দাঁড়িয়ে… সেই প্রৌঢ় ছায়ামানুষটি তার সঙ্গে… দুজনে জঙ্গলে ঢুকল… সেই ঝিলের ধার… রতন মণ্ডল মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল সেখানে… তাকে কি সামান্য অস্থির আর চঞ্চল দেখাল?…

মুহূর্তকাল পর দৃশ্যপট বদলে গেল! রতন মণ্ডল দৌড়ে পালাচ্ছে দেবী বলাকামুখীর মূর্তি বুকে চেপে। সেই প্রৌঢ় মানুষটি পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাকে… তাকে খুঁজে না পেয়ে আক্রোশে নিজের মাথার চুল টেনে ধরলেন তিনি… তারপর দেবীর থানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

ফের পালটে গেল দৃশ্যপট… সেই প্রৌঢ় এক টিমটিমে আলো জ্বলা ঘরের মধ্যে… দুজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন… কী যেন বোঝাচ্ছেন তাদের… দুজনে প্রথমে মাথা নেড়ে অস্বীকার করল… তখন পকেট থেকে একতাড়া নোট বার করে গুঁজে দিলেন তাদের হাতে… দুজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল…

সেই দুজনকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হল না আমার… রমেন সাঁতরার ছেলে বাবলু সাঁতরা আর গণেশ পাখিরা!

মনে পড়ে গেল, দুজনে হাসপাতালে কাজ করে শুনেছিলাম। কোন হাসপাতাল যেন?

উত্তরটা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হল না। পরক্ষণেই দেখতে পেলাম দুজনে হেঁটে যাচ্ছে হাসপাতালের করিডোর ধরে… মুখে রুমাল বাঁধা… গভীর রাত… একটা কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল দুজন… কেবিনের সামনে একজন কনস্টেবল… টেবিলে বসে ঢুলছে…

গণেশ পকেট থেকে একটা ছোট রুমাল বার করে কনস্টেবলটির মুখে আলতো করে বুলিয়ে দিল একবার… কনস্টেবলটির ঘাড় বুকের ওপর নুইয়ে পড়ল… দুজনে কেবিনের ভেতর… বেডের ওপর যার নিথর শরীর তাকে চিনতে ভুল হয় না…

দৃশ্য পালটে গেল… দুজন মিলে হাসপাতালের পেছনের ফায়ার এসকেপ দিয়ে নামিয়ে আনছে সাদা কাপড়ে মোড়া একটা শরীর… আমি জানি ওই শরীরটা কার… হাসপাতালের পিছনের দরজায় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে… তার পিছনের সিটে রতন মণ্ডলের কোমায় থাকা সাদা চাদরে ঢাকা শরীরটা অতি যত্নে তুলে দিল দুজনে…

বাবলু সাঁতরা এসে বসল ড্রাইভারের সিটে… গাড়িটা বেরিয়ে গেল দ্রুত… ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে সেই প্রৌঢ়… যাকে আমি চিনি, ভীষণ ভালো করে চিনি। সুবুদ্ধিমিশ্রর উত্তরসূরি, গাংনাপুর জমিদারবাড়ির বংশানুক্রমিক নায়েব, পীতাম্বর মিশ্র!

দুজনে মন্দিরের সামনে এসে থামলে প্রসন্নমুখে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন বিক্রমরাজ। পীতাম্বর মিশ্র এগিয়ে এসে অভিবাদন করে বললেন, ‘প্রণাম প্রভু। সব প্রস্তুত তো? সবাই উপস্থিত আছেন তো?

বিক্রমরাজ বললেন, ‘হ্যাঁ মহামন্ত্রী, পঞ্চমুণ্ডির আসনের উপচার চারটি মুণ্ড তো আপনি সংগ্রহ করেই গেছিলেন। প্রয়োজন ছিল শুধু পঞ্চম এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মুণ্ডটির। এখন তো দেখছি সেই অতিকাঙ্ক্ষিত মুণ্ডটির অধিকারী স্বয়ং এখানে উপস্থিত।’

পীতাম্বর মিশ্র বিনয়ী অথচ গর্বের হাসি হেসে বললেন, ‘অনেক পরিশ্রমের পর এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে প্রভু। সবই মা বলাকামুখীর আশীর্বাদ।’

‘কিন্তু মহামন্ত্রী, এই অসম্ভব সম্ভব হল কী করে? আমার কাছে সংবাদ ছিল পিশাচখণ্ডীর বংশধারা নাকি লুপ্ত হয়ে গেছে?’

‘সে সংবাদ অসত্য ছিল প্রভু। আপনি তো জানেন, সুবুদ্ধিমিশ্রর সময় থেকেই একমাত্র তাঁর উত্তরসূরিদের কাছেই এই তিন পরিবারের বংশধারার সংবাদ রক্ষিত থাকত। তা সত্ত্বেও সার্ধশতবর্ষ পূর্বে আমারই এক পূর্বপুরুষ পিশাচখণ্ডীর বংশপরম্পরার সূত্র হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি এই ভেবে ভীত হয়েছিলেন যে হয়তো তাঁরই অপারগতার কারণে এই সহস্রাব্দ প্রাচীন রহস্য অজানিত এবং অমীমাংসিত থেকে যাবে। তাই তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করে যান— “দেবল বংশাবলী চরিত” নামে। সেখানে এই রহস্যের সমস্ত কাহিনি লিপিবদ্ধ করে যান।’

বিক্রমরাজ, ওরফে দেবব্রত লাহা রাজসিক ভঙ্গিতে মন্দিরের চাতালে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘এ ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত আছি মহামন্ত্রী। এবং শুধুমাত্র এই রহস্য জীবিত রাখার জন্যই, উপযুক্ত সময়ে দেবীর চিত্তোদ্বোধনের জন্যই যে আপনার বংশধরদের এই ভূস্বামীবংশের দাসত্ব স্বীকার করতে হয়েছে, সে ব্যাপারেও সম্যক অবগত আমি। কিন্তু আমার কৌতূহল এখনও নিবৃত্ত হয়নি। আপনি এই অর্বাচীনের সন্ধান পেলেন কী করে বলুন তো?’

পীতাম্বর মিশ্র বিগলিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বললেন, ‘সে অনেক দীর্ঘ কাহিনি মহারাজ। এ আমার বহু বৎসরের, বহু পরিশ্রমের ফসল। আপাতত তার বিস্তারিত বিবরণের সময় নেই৷ শুধু জ্ঞাত হোন যে আমরা, মানে সুবুদ্ধিমিশ্রর বংশধারা এত বৎসর যাবৎ অপেক্ষা করছিলাম এই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যই। তাই অতি কষ্টে, অতি যত্নসহকারে পিশাচখণ্ডীর এই বংশাবতংসের সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়েছে আমাকে।’

রতন মণ্ডলের দুটি হাত আর মাথা ঊর্ধ্বাকাশে উঠে গেল। তার মুখে দুর্বোধ্য হাসি। সেই দিকে ইঙ্গিত করে বিক্রমরাজ বললেন, ‘এ তো শুনেছিলাম প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিল। একে এই অর্ধজীবন্ত অবস্থায় হাঁটিয়ে আনলেন কী করে?’

পীতাম্বর মিশ্রর মুখে গর্বের হাসি খেলে গেল, ‘মহারাজার আশীর্বাদে পূর্বপুরুষদের অধিগত বিদ্যার অতি সামান্যতম অংশ এখনও এই অধমের আয়ত্তে রয়েছে। তারই বলে এর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি মহারাজ।’

ঠিক এইখানে রতন মণ্ডল আবার হা-হা করে হেসে উঠল। কিন্তু আমার মনে হল রতন মণ্ডল যেন সত্যিকারের হাসছে না, হাসিটা শুধু তার শরীর থেকে ভেসে আসছে। সেই প্রাণহীন, যান্ত্রিক হাসি শুনে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।

বিক্রমরাজ প্রসন্নমুখে বললেন, ‘তাহলে দেবীর পূজা শুরু হোক?’

পীতাম্বর মিশ্রর মুখ অষ্টমীর চাঁদের আলোয় চকচক করছিল। তিনি বিগলিতস্বরে বললেন, ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ। আপনার আদেশ হলেই…’

পীতাম্বর মিশ্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি স্বর ভেসে এল, ‘কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও আমার জ্ঞাত হল না মহামন্ত্রী, এই অঞ্চল জুড়ে এত হত্যা, রক্তপাত, এ কী তাহলে আপনারই কীর্তি?’

জয়ন্তর দিকে তাকালেন পীতাম্বর মিশ্র। সম্ভ্রমে মাথা নুইয়ে বললেন, ‘এর উত্তর একইসঙ্গে না এবং হ্যাঁ যুবরাজ। আমি পূর্বেই জানতাম কবে আসবে দেবী বলাকামুখীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার সেই অতিবিশিষ্ট পুণ্যদিন। আপনার পিতাও জানতেন। বহু কষ্টে আমি পিশাচখণ্ডীর উত্তরসূরির সন্ধানপ্রাপ্ত হই। তাকে নিয়ে আসি এই মন্দিরে। কিন্তু সে আমাকে প্রতারণা করে। আমার মাথায় আঘাত করে মূর্তিটি নিয়ে পলায়ন করে।

ইতিমধ্যে কবন্ধপিশাচ জেগে উঠেছে। আমি আমার অধিগত বিদ্যা দ্বারা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি তাকে নিয়ন্ত্রণ করার। কিন্তু নিয়তিকে খণ্ডাবে কে? তার উৎপাত ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠল। তাকে নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই আমার অসাধ্য হয়ে উঠল। তবু তাকে দিয়েই পঞ্চমুন্ডির আসনের চারটি মুণ্ড সংগ্রহ করালাম।

এই সময়ে দৈবাৎ জ্ঞাত হলাম যে রতন ধৃত হয়েছে। এবং ভগবতকৃপায় সে আরক্ষার সেই আরোগ্যালয়ে অবস্থান করছে যার অন্তত দুইজন সেবক এই গ্রামের অধিবাসী, আমার পরিচিত। তাদের প্রলোভন দেখিয়ে রতনকে আবার হস্তগত করলাম।’

‘কী প্রলোভন দেখিয়েছিলেন তাদের?’

‘অর্থের উৎকোচ, আর দেবীর বরলাভের প্রলোভন।’

হা-হা করে হেসে উঠলেন দেবলরাজ। দেবলরাজ? নাকি বিক্রমরাজ? নাকি প্রফেসর দেবব্রত লাহা?

আমার চোখের সামনে আবার তিনটি সময়কাল মিলেমিশে এক হয়ে গেল। শুনলাম প্রফেসর লাহা ভরাট এবং ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলছেন, ‘মূর্খ, মূর্খ। এতই সহজ দেবীর বলাকামুখীর বরলাভ? এতই অনায়াসসাধ্য? ইনি কি যে সে দেবী? মানুষের সম্পূর্ণ আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যায় এঁর কণামাত্র কৃপালাভ করতে। আর এই দুই অর্বাচীন ভেবেছে এত অনায়াসে তাঁর বর লাভ করবে? এত স্পর্ধা?’

‘দুজনেই তার যোগ্য শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছে প্রভু। আজ ওদের সেই প্রলোভন দেখিয়েই নিয়ে এসেছিলাম এই অরণ্যে। আপাতত দুজনেই কবন্ধপিশাচের বলি হয়েছে।’

উঠে দাঁড়াল জয়ন্ত। এখনও বোঝা যাচ্ছে সে সম্পূর্ণ অন্য জগতে। কিন্তু তার চেহারায়, দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এক আশ্চর্য রাজসিক দৃঢ়তা এসেছে৷ সে প্রশ্ন করল, ‘কে এই দেবী বলাকামুখী, পিতা?’

প্রফেসর লাহা দেবীমূর্তির দিকে ফিরলেন, তার পর প্রণাম করে গদগদস্বরে বললেন, ‘পুত্র, ইনি মহাবিদ্যার অষ্টম দেবী, দেবী বলাকামুখী, বা বল্গামুখী। বর্ণবিপর্যয়ে দেবী বগলামুখী। দেবী সাক্ষাৎ সিদ্ধবিদ্যা, ত্রৈলোক্যস্তম্ভিনী, ব্রহ্মাস্ত্রস্বরূপিনী। দেবীর বিদ্যা স্তব্ধমায়া, প্রবৃত্তিরোধিনী বিদ্যা। তাই এই মন্দিরে দেবীর অনুমতি ব্যতীত কেউ প্রবেশ করার প্রচেষ্টা করলে তার হস্তপদ চিত্তবৃত্তি সবই স্তম্ভিত, রুদ্ধ হয়ে যায়।

‘তিনি মহাভিচারক্রিয়াপটিয়সী। তাঁর কৃপায় সমস্ত ঈপ্সিত কাম্যবস্তুর অতিদ্রুত প্রাপ্তি ঘটে। তিনি ধৃতমুদ্গরবৈরীজিহ্বা। দেবীর কৃপাকটাক্ষে অতি অনায়াসে প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুর উপরেও অনায়াসজয় সাধ্য হয়। তিনি শত্রুসম্মোহনজননী, সর্বদুষ্টবিনাশিনী। দেবী মহাস্তম্ভনকর্ত্রী, অথচ ভক্তস্তম্ভননিবারিণী।

‘তিনি স্বর্ণবর্ণা, পীতাম্বরী, পীতপুষ্পপ্রিয়া, কনকমাল্যবিভূষিতা। তাই তাঁর অধিবাস যে অরণ্যে, তার সবই পীতবর্ণের। তিনি পক্ষীমুখী, সর্পমাতৃকা। দেখো পুত্র, আজ এই অরণ্যের, এই গ্রামদেশের, এই রাজ্যের সমস্ত বিহগকুল, সমস্ত ভুজঙ্গকুল দেবীর দর্শনে আগত।’

পীতাম্বর মিশ্র বললেন, ‘পূজার আয়োজন হোক প্রভু?’

‘তথাস্তু।’

পীতাম্বর মিশ্র উঠে এসে দেবীর সামনে বজ্রাসনে বসলেন। পূজার উপচার সবই প্রস্তুত ছিল। তিনি ‘ওঁ সুভগায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রোচ্চারণ করে বললেন, ‘আসুন রাজন, ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী আদি অষ্টশক্তির পূজা আরম্ভ করা যাক।’

দেবব্রত লাহা দেবীমূর্তির সামনে মাটিতে রক্তচন্দন দিয়ে একটা ত্রিকোণ, এবং তার বাইরে একটি ষটকোণ আঁকলেন। তার বাইরে আঁকলেন অষ্টদল পদ্ম৷ তারপর বেলপাতা হাতে নিয়ে উচ্চারণ করলেন, ‘ওঁ পীতাম্বরাং সুবর্ণাভাং দ্বিভুজানাং দাহকোজ্জ্বলাম। শিলাপর্বতহস্তাঞ্চ রিপুকম্পাং মহোৎকটাং…’

ততক্ষণে আমি এক কোণে বসে পড়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম যে এই স্থানে আছি, কিন্তু এই কালে নেই। আমি এদের কাছে অলক্ষ্য। ওদিকে মন্দিরের ঠিক বাইরে রতন মণ্ডল পুত্তলিবৎ দাঁড়িয়ে আছে, মৃতবৎ, চলচ্ছক্তিহীন৷

আস্তে আস্তে মনে হল, এই মন্দির ঘিরে যেন একটা আশ্চর্য মায়াবী হলুদ আলোর বলয় গড়ে উঠছে। যে আলোয় কোনও উত্তাপ নেই, শুধু স্নিগ্ধ আর্দ্র উষ্ণতা আছে। ক্রমে সেই আলোর উজ্জ্বলতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল৷ ওদিকে সুস্পষ্ট প্রগাঢ় উচ্চারণ ভেসে আসছে, ‘মদনস্য রতেশ্চৈব প্রীতিস্তম্ভকারী পরা। মহাবিদ্যা মহামায়া সাধকানাং বরপ্রদা। যস্যাঃ স্মরণ্মাত্রেন ত্রৈলোক্যং স্তম্ভয়েৎ ক্ষণাৎ…’

ধীরে ধীরে সেই আলোর মধ্যে যেন ঢেউ খেলতে লাগল। বিশাল হ্রদে যেন মৃদুমন্দ ঢেউ ওঠে, ঠিক সেরকম। মনে হল এক উজ্জ্বল সোনালি আলোর হ্রদের মধ্যে বসে আছি আমরা। আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসছে আমাদের ঘিরে। কোথাও কোনও শোক নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই।

তখনও উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসছে, ‘সুধাম্বুধিমণিদ্বীপমধ্যমণ্ডলবর্তিনী। পাতু মামনিশং দেবী স্বর্ণসিংহাসনস্থিতা। হেমপ্রাকারমধ্যস্থা নৈঋত্যে পাতু মাং সদা। গদাস্ত্রধারিণী দেবী জঙ্ঘায়াং বিঘ্ননাশিনী…’

পূজা সমাপ্ত হলে উঠে দাঁড়ালেন তিনজন। তারপর দেবব্রত গম্ভীরমুখে বললেন, ‘মহামন্ত্রী, বলির আয়োজন করুন।’

পীতাম্বর মিশ্র ‘যথা আজ্ঞা রাজন’ বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।

দেবব্রত জয়ন্তর দিকে ঘুরে বললেন, ‘কুমার, এবার আপনি এই স্থান পরিত্যাগ করে নিজের বাসস্থানে ফিরে যান। এই পর্যন্তই আপনার কর্তব্য ছিল৷ পূজাবিধির বাকি অংশের জন্য আপনার উপস্থিতির প্রয়োজন নেই।

 জয়ন্তর মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল, ‘কিন্তু কেন পিতা? অকস্মাৎ এই আদেশ?’

সামান্য অসহিষ্ণু দেখাল দেবব্রত লাহাকে, ‘সব কিছু আপনার জ্ঞাত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই কুমার। মনে করুন, এ আমার আদেশ। আপনি এখনই এই স্থান পরিত্যাগ করুন। অবিলম্বে।’

ঠিক এই সময়ে সেই পচা আঁশটে গন্ধ আবার ধাক্কা মারল আমার নাসারন্ধ্রে। এবার আরও তীব্র, আরও উগ্র।

দেবব্রত লাহা ছটফট করে উঠলেন, ‘যাও কুমার! অবিলম্বে এই স্থান পরিত্যাগ করো!’

‘কিন্তু কেন পিতা?’

প্রায় চিৎকার করে উঠলেন দেবলরাজ, ‘প্রতিপ্রশ্ন করার স্পর্ধা কোরো না কুমার, রাজ আজ্ঞা পালন করো। এইমাত্র, এখনই…’

আমার চোখ তখন মন্দিরের সামনের প্রাঙ্গণে। বহু দূর থেকে একটা ছায়া হেঁটে আসছে না আমাদের দিকে? ওই তো তার সেই উলঙ্গ লোমশ দেহ, সেই হাঁটু অবধি ঝুলে থাকা দীর্ঘ হাত আর মুণ্ডহীন কাঁধ!

অস্তগামী চাঁদের ম্লান আলোয় ভেসে আসা সেই জলজ পৈশাচিক ঘ্রাণ যেন উন্মাদ করে দিল আমাকে। আমার ঘাড়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেল, বুকের মধ্যে ছেয়ে গেল আদিম মৃত্যুভয়। ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল আমার হাত পা। দেবব্রত লাহা উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠলেন, ‘যাও পুত্র, যাও, আমার অবাধ্য হয়ো না।’

‘কিন্তু কেন পিতা?’

এবার উত্তর দিলেন পীতাম্বর মিশ্র। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, ‘কুমার, রাজন যা বলছেন তা অবিলম্বে পালন করুন।’

জয়ন্ত কঠিনস্বরে বলল, ‘তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন মহামন্ত্রী। কেন আমাকে এই পূজার আসন ত্যাগ করে চলে যেতে হবে এখন? কেন আমি এই পূজার শেষাবধি উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করব না?’

ততক্ষণে সেই বিশালাকৃতির কবন্ধপিশাচ মন্দিরের প্রায় সামনে উপস্থিত হয়েছে। মনে হল সেই শতাব্দীপ্রাচীন পচা আঁশটে গন্ধে এবার আমার নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসবে প্রায়। দেবব্রত লাহা দেখলাম উন্মত্ত হয়ে গেছেন। তিনি চিৎকার করে মিনতির সুরে বললেন, ‘পুত্র, তোমাকে জোড়হস্তে অনুরোধ করছি, পালাও, এখান থেকে এখনই পালাও।’

জয়ন্ত কিছু করবার আগেই পীতাম্বর মিশ্র কবন্ধপিশাচের উদ্দেশে আদেশ দিলেন, ‘যাও, পিশাচখণ্ডী, দেখো, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তোমার বলি। যাও, ওর মুণ্ডটি কেটে আনো। আজ সেই মুণ্ড নিয়ে পুনরায় পাতা হবে পঞ্চমুন্ডির আসন। আবার দেবী ফিরে আসবেন আমাদের মধ্যে। আবার হবে আমাদের পূজা। আর তার পরই তোমার মুক্তি।’

এই শেষ কথাটা শুনে কবন্ধপিশাচের দেহটা যেন সামান্য ঘুরল পীতাম্বর মিশ্রর দিকে। তারপর এগিয়ে এসে দাঁড়াল রতন মণ্ডলের পিছনে।

রতন মণ্ডলের দুই বাহু তখনও ঊর্ধ্বাকাশের দিকে উত্থিত। তখনও তার সারা মুখে এক উন্মাদ হাসি।

কবন্ধপিশাচ ক্ষণিক দাঁড়াল তার পিছনে। তারপর তাকে গলাটা জড়িয়ে ধরল প্রবল আশ্লেষে।

আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ সজাগ হয়ে উঠল। বোধবুদ্ধি বলছে, ঠিক এখনই মুণ্ডচ্ছেদ হবে রতন মণ্ডলের, যেভাবে এই দানব মুণ্ডচ্ছেদ করেছে আরও চারটি প্রাণীর। আর সেই চারটি মুণ্ডের সঙ্গে রতনের মুণ্ড নিয়ে দুই সহস্রাব্দ পর পুনরায় রচিত হবে সেই পঞ্চমুন্ডির আসন রচনা। পরিপূরিত হবে দেবী বলাকামুখীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য সমস্ত শর্ত। কিন্তু কেন জানি না অন্তরাত্মার মধ্যে এক অতি ক্ষীণ পাগলাঘণ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি, জানি না কেন!

কবন্ধপিশাচ খানিক জড়িয়ে ধরে রইল রতন মণ্ডলের মৃতজড়বৎ দেহকে। আমরা প্রত্যেকে স্থাণুবৎ চেয়ে রইলাম সেই অতি অবিশ্বাস্য, অতি অলৌকিক দৃশ্যটির দিকে। এক সহস্রাব্দপ্রাচীন কবন্ধপিশাচ জড়িয়ে ধরেছে তার মৃতবৎ জাগতিক উত্তরাধিকারীকে, তার মুণ্ডচ্ছেদ করবে বলে।

কয়েকটি অনিঃশেষ বিদ্যুৎগর্ভ মুহূর্ত বয়ে গেল আমাদের মধ্যে। মনে হল সময় যেন অনন্তকাল হয়ে থমকে গেছে এই মন্দিরের সামনে। জানি না কখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসবে।

কিছুপর সেই ক্ষণ এল। আমার সমস্ত ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে রতন মণ্ডলের গলা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সেই কবন্ধপিশাচ। আর এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে!

দেবব্রত লাহার চিৎকার এবার আর্তনাদের মতো শোনাল। হাহাকার করে বলে উঠলেন, ‘পালাও পুত্র, পালাও! দোহাই তোমার, এখনও সময় আছে—পালাও।’

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই পীতাম্বর মিশ্র ডান হাত তুলে দেবব্রত লাহা এবং জয়ন্তর দিকে ইঙ্গিত করে কবন্ধপিশাচকে বললেন, ‘যাও পিশাচখণ্ডী, পঞ্চম মুণ্ডটি সংগ্রহ করে আনো। আজ যে করেই হোক, দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবেই।’

মনে হল আমার বুকের ভেতরটা যেন বরফ হয়ে গেল।

কবন্ধপিশাচ মন্দিরের প্রথম ধাপে উঠে এল। দেবব্রত লাহা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। জয়ন্ত ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘এই পিশাচ এখানে উঠে আসছে কেন পিতা?’

পীতাম্বর মিশ্র এবার বুক চিতিয়ে এগিয়ে এলেন মন্দিরের সামনে। তাঁর মুখে এক দুর্বোধ্য শয়তানি হাসি। দেবব্রত লাহা আর জয়ন্তর অবস্থা দেখে হা হা করে হেসে উঠলেন তিনি। তারপর ক্রূরস্বরে বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর আপনার পিতাই দিতে পারবেন যুবরাজ৷ তাঁকেই জিজ্ঞাসা করুন।’

দেবব্রত লাহা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘পুত্র, ওই কবন্ধপিশাচ তার বংশের কারও হত্যা করতে পারবে না। দেবীর আশীর্বাদ বা আদেশ যাই হোক, সে কিছুতেই নিজের উত্তরাধিকারীদের রক্তপাত করতে পারবে না। তাই সে উঠে আসছে এখানে। উঠে আসছে আমার বা তোমার মুণ্ডের সন্ধানে।’

দেবব্রত লাহার কথা শেষ হওয়ার ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ঘিরে থাকা সেই হলুদ রঙের আলোর হ্রদে ঢেউ উঠতে শুরু করল। মনে হল এক প্রবল ঝঞ্ঝাবাত্যা যেন শেষনাগের মতো পাকিয়ে উঠতে শুরু করেছে এই মন্দির ঘিরে।

ঝড়ের শব্দ ধেয়ে আসার আগেই, পীতাম্বর মিশ্রর শয়তানি হাসি খলখল কররে ছড়িয়ে গেল, ‘পিশাচখণ্ডীর কবন্ধ রতন মণ্ডলের মুণ্ডচ্ছেদ করতে পারবে না রাজন। শব হোক বা পিশাচ, ভূত হোক বা প্রেত, নিজের উত্তরাধিকারীর মুণ্ডচ্ছেদ নিজে করতে পারে না। সে আপনিও জানেন, আমিও।’

হলুদ আলোর ঝড়টা আমাদের আঘাত করার আগে শুনলাম জয়ন্ত বলছে, ‘তাহলে, তাহলে এখানে এই বলির আয়োজন করা হল কেন?’

পীতাম্বর মিশ্র বুক চিতিয়ে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের চাতালে। উন্মত্ত এবং খরতীব্রস্বরে বললেন, ‘কুমার, পিতা পিশাচ হলেও পিতাই হয়ে থাকে। পিশাচখণ্ডীর কবন্ধ তার উত্তরসূরির রক্তপাত করতে পারবে না। কিন্তু দেবীর আজ বলি চাই। সে বলি আমাদের তিনজনের যে কোনও একজনের হলেও গ্রাহ্য। তাই আজ আপনার বা আপনার পিতা, কারো একজনের বলি চাই। আপনার পিতা জানেন তার কারণ।’

দেবব্রত লাহা আতঙ্কে কেঁদে ফেললেন, ‘জানি মন্ত্রী, জানি। সহস্র বৎসর পূর্বে তাই তো ঘটেছিল। তাই তো আমি বার বার বলছি এখান হতে চলে যেতে, কিন্তু আমার অবাধ্য সন্তান যে আমার আদেশ পালন করছে না!’

জয়ন্ত এই ভয়াল ঝড়ের মধ্যেও এগিয়ে এল, উচ্চৈঃস্বরে চেঁচিয়ে বলল, ‘কী সেই কারণ মহামন্ত্রী? বলুন আমাকে৷ আমি জানতে চাই, কেন পিতা আমাকে বারবার এখান থেকে চলে যেতে বলছেন।’

দূরাগত ঝড়ের গর্জন আরও নিবিড় হয়ে এল। আমি দেখলাম, সেই ঝড়ের মধ্যে থমকে গেছে কবন্ধপিশাচ, থমকে গেছে এই বিশ্বচরাচর। তার মধ্যেই ভেসে এল দেবব্রত লাহা ওরফে বিক্রমরাজের আর্তস্বর, ‘তার একটিই মাত্র কারণ আছে পুত্র। আজ থেকে সহস্র বৎসর পূর্বে এমনই কিছু ঘটেছিল। পিশাচখণ্ডীর উত্তরাধিকারী যোগ দিয়েছিল কৈবর্তরাজ ভীমের দলে। তাই এখানে দেবীর চিত্তোদ্বোধনের জন্য পিশাচখণ্ডীর উত্তরাধিকারীর পরিবর্তে আমি, বিক্রমরাজ স্বয়ং নিজেই নিজেকে বলি দিয়েছিলাম। আমিই ছিলাম দেবীর পঞ্চমুন্ডির আসনের পঞ্চম মুণ্ড! তাই আমার সমগ্র রাজ্য বলিরূপে গ্রহণ করেছিলেন দেবী বলাকামুখী। আমি চাই না তার পুনরাবৃত্তি হোক। যাও, পুত্র, যাও। আমার আদেশ পালন করো…’

দেবব্রত লাহার কণ্ঠ থেকে শেষ বাক্যটি নির্গত হওয়ামাত্র কবন্ধপিশাচ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর কণ্ঠনালী লক্ষ্য করে। দেবব্রত লাহার আর্তচিৎকার আমার কানে পৌঁছবার আগেই শুনতে পেলাম আরো একটা ক্রুদ্ধ হুংকার। জয়ন্ত প্রাণের মায়া ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার পিতৃহন্তার ওপর।

এই অবিশ্বাস্য অমানুষিক সংগ্রাম কতক্ষণ চলত জানি না। তবে আমাদের চারিদিকে খেলতে থাকা পীতবর্ণের আলোর ঢেউ ক্রমেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। আর তখনই শুনলাম সেই শোঁ-শোঁ শব্দটা।

আকাশের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম আমি। অস্তমিত অষ্টমীর চাঁদের বুক অন্ধকার করে নেমে আসছে এক অতি বৃহৎ, অতি প্রাচীন বিহগ। তার ডানার বিস্তার যেন অনায়াসে গ্রাস করতে পারে এই মন্দির, এই গড়, এই ভূভাগ, এই জনপদ। আর তার দিগন্তপ্রসারী ডানা জুড়ে নেমে আসছে আগুনের স্রোত। যে আগুনের স্রোত এককালে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল এই গড়…

সেই দিগন্তবিস্তারী মহাবিহঙ্গটি মন্দিরের সামনে ডানা মুড়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেবীমূর্তির পাশে ফুটে উঠল এক শান্ত সৌম্য সাধুর রূপ। তাঁর নীল করুণাঘন চোখ, তাঁর আমলকী গায়ের রং, তাঁর কাঁধ অবধি নেমে আসা ঢেউ খেলানো চুল, তাঁর আজানুলম্বিত বাহু, তাঁর চুয়াচন্দনচর্তিত কপাল, তাঁর সপ্তসিন্ধুরাজত্বচিহ্ন আঁকা বুক, তাঁর দু’চোখ জুড়ে ভাসতে থাকা অপার শান্তি আর করুণার সাগর, এ যেন এই পৃথিবীতে আগে কখনও আসেনি৷ আর পরেও কখনও আসবে না।

আমার স্নায়ু জবাব দিয়ে দিয়েছিল। আমি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে কেঁদে ফেললাম, ‘প্রভু…’

সাধুবাবা কিছু বললেন না। শুধু অপার করুণাঘনস্নেহে দেবী মূর্তিটিকে কোলে তুলে কোমল স্বরে ডাকলেন, ‘মা।’

তারপর এক অপার্থিব আলোর বিস্ফোরণ। আমার আর কিছু মনে রইল না।

গল্প শেষ হলে তিনজনে খানিক চুপচাপ বসে রইলাম৷ আমাদের সামনে রাখা অ্যাশট্রে-তে তখন সিগারেটের মহেঞ্জোদারো জমে উঠেছে। সত্যব্রত সামান্য কাঁপাস্বরে জিগ্যেস করল, তারপর কী হল?

নিবারণবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।—জ্ঞান এলে দেখি মন্দিরের চত্বরে আমি আর জয়ন্ত। সিঁড়ির নীচে প্রফেসর লাহা আর পীতাম্বর মিশ্রর মৃতদেহ। রতন মণ্ডল বা কবন্ধপিশাচের চিহ্নমাত্র নেই।

জয়ন্তকে নিয়ে বহু কষ্টে জঙ্গলের বাইরে এসেছিলাম। দেবীর থানের বাইরে জ্যোতিষ বাগল আর ওসমান আলির অজ্ঞান দেহ পড়েছিল। আমাদের চারজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। অবশ্য বেশিদিনের জন্য নয়।

—তারপর?

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিবারণ চক্রবর্তী। ‘আমি সুস্থ হওয়ামাত্র কলকাতা ফিরে আসি৷ পরে শুনেছিলাম জ্যোতিষ বাগল আর আলি সাহেব দুজনেই নাকি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলেজে পড়ানোর চাকরি নিয়েছেন।

জয়ন্তও আর থাকেনি ওই অভিশপ্ত গড়ে। সে জমিদারি বেচে মা’কে নিয়ে মুম্বাইতে পাড়ি দিল। আজ থেকে বছর দশেক আগে কাজের সূত্রে একবার মুম্বাই যেতে হয়েছিল। দেখা হয়েছিল ওর সঙ্গে। বউ, বাচ্চা আর মা’কে নিয়ে ভালোই আছে সে।

—আর ওই প্রবল পুরুষের প্রারব্ধ না কী একটা যেন বললেন?

নিবারণ চক্রবর্তী সন্ধের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মধ্যে হাতে ধরা সিগারেটে শেষটানটা মেরে বললেন, কর্মফল হোক আর প্রারব্ধ, রক্তের টান বড় কঠিন টান হে। শত সহস্র জন্ম-জন্মান্তর পেরিয়েও সন্তানের রক্তের টান, দেবতা বা মানুষ তো ছাড়, এমনকী পিশাচও এড়াতে পারে না। সেই ভালোবাসার টানের কাছে কোথায় লাগে তুকতাক, আর কোথায় লাগে কাকচক্ষু।

***