দেবলরাজার গড় – ৩

পরদিন ভোর ভোর থানা থেকে লোক ডাকতে এল আমাদের। আজ থেকেই নাকি কাজ শুরু হবে। বেশিক্ষণের কাজ নয়। শুধু জঙ্গলের মধ্যে রাজার গড়টা লোকেট করে চলে আসা, এই আর কী! বাগলমশাই খুব করে চাইছেন আমরা যেন সঙ্গে থাকি।

বুঝতে পারলাম, এলাকার প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের প্রতিনিধি পাশে থাকলে বাগলবাবুর কাজের সুবিধা হয়। তাই এই এত্তেলা।

গিয়ে দেখি, একটা ছোট জমায়েত হয়ে গেছে। বাগল আর তাঁর সঙ্গী ভদ্রলোক তো আছেনই। আরও জনাচারেক লোক আছে জঙ্গল কাটার জন্য। এদের বাইরে থেকে আনা হয়েছে৷ দরকার পড়লে যাতে ঝোপ জঙ্গল কেটে পথ করে নেওয়া যায়।

কিন্তু অসুবিধা এক জায়গাতেই৷ জঙ্গলের মধ্যে গড়টা ঠিক কোথায়, কেউ জানে না। লোকের মনের মধ্যে ওই রাজার গড় নিয়ে এমনই ভয় ঢুকে আছে যে, ওর ভেতরে যাওয়ার কথা কেউ ভাবতেই পারে না।

বাগলবাবু হতাশ হয়ে ওসমান আলিকে বললেন, ‘ও আলিসাহেব, কাউকে না পেলে তো জঙ্গলে ঢুকে কোনও লাভ নেই। বলি, একটা ব্যবস্থা করুন না!’

আলিসাহেব হাত উলটে বললেন, ‘আরে মশাই, লোকে রাস্তা চেনে, কিন্তু যেতে চাইছে না—এরকম কেস হলে একরকম। তখন নাহয় ধমকধামক দিয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজ করা যায়। এখানে তো দেখছি, কেউ রাস্তাই চেনে না। ব্যবস্থাটা করব কী করে?’

‘বলছিলাম যে আশা করা যায়, গড়টা জঙ্গলের মাঝামাঝি। কম্পাসের সাহায্য নিয়ে একটা দিক আন্দাজ করে এগোনো যায়।’

কথাটা এমন একজনের কাছ থেকে এল যে আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। পীতাম্বরবাবু!

জয়ন্ত বিস্মিত হয়ে বলল, ‘পীতাম্বরকাকা, আপনি বলছেন এই কথা? আপনিই তো ওই জঙ্গলে ঢোকার ব্যাপারে সবাইকে সবচেয়ে বেশি বারণ করেন। এখন আপনিই যেতে চাইছেন?’

পীতাম্বরবাবু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন, ‘বাবা জয়ন্ত, সরকারি কাজে সাহায্য করা আমাদের একটা সামাজিক কর্তব্যও বটে। সেইটে ভুলি কী করে?’

জয়ন্ত বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই লাফিয়ে উঠলেন জ্যোতিষ বাগল, ‘জয় মা! এই তো আসল লোক পেয়ে গেছি। এবার তাহলে তো আর চিন্তাই নেই।’

আমরা যখন জঙ্গলে ঢুকলাম, তখন ঘড়িতে ঠিক এগারোটা বাজে। সামনে জঙ্গল কাটার চারজন মজদুর। তাদের ঠিক পেছনে পীতাম্বরবাবু। পীতাম্বরবাবুর পেছনে সরকারি আধিকারিক মশাইরা। তাঁদের পেছনে আমি আর জয়ন্ত।

জঙ্গলের একটু ভেতরে ঢুকতেই বাইরের কোলাহল স্তিমিত হতে হতে একেবারেই থেমে গেল। এখন শুধু পাখপাখালির কিচিরমিচির। শীতের শুরুর দিক বলে রক্ষা। সাপখোপের উপদ্রবটা নেই। অবশ্য আমরা সবাই গামবুট পরে নিয়েছি।

শীতের অরণ্য অনেক নিষ্প্রাণ আর রুক্ষ। চারিদিকে শাল, পলাশ, অর্জুন, জারুল, হিজল, নিম গাছের ভিড়। এখন পাতা ঝরার সময়। বনতল শুকনো হলুদ পাতায় ছেয়ে আছে। নিষ্পত্র গাছগুলোর মোটা গুঁড়ির গায়ে শুকনো শ্যাওলা জমে আছে৷ গাছের গায়ে অজগরের মতো মোটা লতা, কাণ্ড জড়িয়ে উঠে গেছে মাথা অবধি।

প্রচুর কাঠবিড়ালি চোখে পড়ল। দু-একটা বনবিড়াল দেখলাম, আমাদের দেখেই থমকে গেল। মানুষ দেখার অভ্যেস ওদের নেই। একটা গোসাপ আমাদের সাড়া পেয়েই সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে এঁকেবেঁকে পালিয়ে গেল। তার গায়ের রং উজ্জ্বল হলুদ। মনে হল যেন একটা সোনার দ্যুতি ছিটকে গেল এদিক থেকে ওদিক।

জয়ন্ত হেসে বলল, ‘দেখলি নিবারণ, সেই চণ্ডীমঙ্গলের স্বর্ণগোধিকা।’

কথাটা কানে আসতেই একটা জিনিস আমার মাথার মধ্যে ঘাই দিয়ে উঠল।

এতক্ষণ অবধি যে ক’টা প্রাণী দেখলাম, সকলের গায়ের প্রধান রং হলুদ বা হলুদঘেঁষা বাদামি। বনবিড়াল, কাঠবিড়ালি, গোসাপ—যা দেখেছি, হয় উজ্জ্বল বাদামি না হয় হলুদ। অন্য রঙের মিশেল আছে বটে, কিন্তু এই দুটো রংই মুখ্য।

আড়চোখে জয়ন্তর দিকে তাকালাম। সে-ও কি লক্ষ করেছে ব্যাপারটা?

পাখিদের দিকে নজর দিলাম। চড়াই ছাড়া আরও কয়েকটাকে চিনতে পারলাম। ঘুঘু, দোয়েল, তিতির, বটের, চন্দনা, ময়না, শালিক এইসব। বাকিদের চিনতে পারলাম না।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, পাখিদেরও ডানাও পালক জুড়ে সেই উজ্জ্বল হলুদ রঙের উপস্থিতি। এমনকী শালিক পাখির পালকও যে হলদে বাদামি রঙের হয়, এটাও আমার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।

আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার, একটাও কাক দেখতে পেলাম না।

পীতাম্বরবাবুর নির্দেশমতো ঝোপঝাড় কাটতে কাটতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম জঙ্গলের উত্তর-পূর্ব কোণে। প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে ফেলেছি। পীতাম্বরবাবু হঠাৎ থেমে গিয়ে এক দিকে একটা আঙুল তুলে একজন গাছকাটিয়েকে বললেন, ‘দেখো তো, ওই দিকে একটা ঝিল আছে কিনা।’

লোকটা ঝোপঝাড় এড়িয়ে এগিয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক পর তার উচ্ছ্বসিত গলা শোনা গেল, ‘আছে তো দাদাবাবু, আছে!’

ঝিলের ধারে বসে একটু জিরিয়ে নেওয়া গেল। আমাদের অনেকেরই এতক্ষণ হাঁটার অভ্যেস নেই। বাগলমশাই তো রীতিমতো হাঁপাচ্ছিলেন। আমার আর জয়ন্তর অবস্থাও তথৈবচ। শুধু লাহাবাবু দেখলাম স্থির, অচঞ্চল। কিন্তু ভদ্রলোকের ট্রেডমার্ক স্মিত হাসিটি উধাও। ভুরুতে চিন্তার ভাঁজ।

বাগলমশাই কিছু শুকনো খাবার এনেছিলেন৷ সেগুলোর সদ্‌ব্যবহার হল। পীতাম্বরবাবু আমাদের বসিয়ে দিয়ে গাছ কাটিয়েদের একজনকে নিয়ে একটু আশপাশটা ঘুরে দেখতে গেছেন। ওদের খাবার রেখে দেওয়া হল। সবাই টুকটাক কথাবার্তা বলছি।

খেয়ে ঝিলের জলে হাত ধুতে গিয়ে একটা জিনিস দেখে থ মেরে গেলাম।

তীরের কাছেই কয়েকটা মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কে কবে ছেড়ে গেছিল, কে জানে। ধরার কেউ নেই। তাদের এখন বিশাল আকার। আমাকে দেখে খানিক অবাক হয়ে চেয়ে রইল। তারপর হুড়মুড় করে পালিয়ে গেল জলের গভীরে।

তাদের শিরদাঁড়া বরাবর উজ্জ্বল হলুদ রঙের দাগ!

ফিরে আসতে আসতে ধন্দে পড়ে গেলাম। সেদিন হলুদ রঙের আঁচল দেখেছিলাম জঙ্গলের মধ্যে। এখন দেখি জঙ্গলের মধ্যে সব পশুপাখি মায় মাছের গায়েও হলুদ রঙের ছোঁয়া৷ জঙ্গলের কি জন্ডিস হয়েছে?

গড়ের কাছে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় বেলা সাড়ে বারোটা। এতক্ষণ লাগার কথা নয়। কিন্তু মাঝখানে পীতাম্বরবাবু পথ হারিয়ে ফেলছিলেন। অনেক খুঁজেপেতে যখন দেবলরাজার গড়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন বলতে নেই, মনের ভেতর একটা আশ্চর্য উত্তেজনা অনুভব করছিলাম।

গড়টা আকারে বিশাল। লম্বা আর চওড়ায় প্রায় এক কিলোমিটার। গড়ের সীমানায় তিন থেকে চার ফুট চওড়া পাঁচিল, যাকে বলে ব়্যামপার্ট দিয়ে ঘেরা। দূরে তাকালে চোখে পড়ে গড়ের চার কোণে চারটে উঁচু মাটির টিলা, খুব সম্ভবত ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ব়্যামপার্ট ঘিরে ছয় ফুট মতন চওড়া খাত। এককালে পরিখা ছিল বলে বোঝা যায়। এখন অবশ্য সবই ধ্বংসস্তূপ। জঙ্গল গ্রাস করে নিয়েছে প্রায় সবটাই। সবটাই আমাদের অনুমান করে নিতে হচ্ছে। আর পীতাম্বরবাবু তো আছেনই।

আমরা দাঁড়িয়েছিলাম গড়ের প্রধান দরজার ঠিক সামনে। দরজার একটা মোটা থামই শুধু অবশিষ্ট আছে। তার সারা গা জড়িয়ে লতাপাতার ঘন আবরণ।

আমরা শুকনো নালাটা হেঁটে পার হলাম। এককালে নিশ্চয়ই গভীর খাত ছিল। এখন শুকনো পাতা, মরা গাছের ডাল, লতাপাতা মিলিয়ে খাত বুজে এসেছে প্রায়। একটু কষ্ট করলে দিব্যি হেঁটে পার হওয়া যায়। তারপর দরজার সামনের ঝোপঝাড় কেটে একটু পথ করে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম।

ভেতরে জায়গায় জায়গায় কালো শুকনো শ্যাওলাপড়া ইটের স্তূপ। সেই শ্যাওলাও শুকিয়ে হলুদ হয়ে আছে৷ ইটের স্তূপ থেকে বড় বড় গাছ গজিয়েছে৷ কোথায় কী ছিল এখন বোঝার উপায় নেই।

বাগলবাবুর চোখ জ্বলজ্বল করছিল। হাঁটতে হাঁটতেই নিচু হয়ে দু’-একটা কী কুড়িয়ে নিলেন। দেখলাম কয়েকটা আধভাঙা কলসি আর পোড়া মাটির ঢেলা। ভদ্রলোক চাপা উল্লাসের সুরে বলে উঠলেন, ‘লাহামশাই, মার দিয়া কেল্লা! যা হাতে আসছে—এ তো সাত রাজার ধন।’

লাহাবাবুর ভ্রুকুটি তখনও স্বাভাবিক হয়নি। তবুও তার মধ্যেই স্মিত হেসে বললেন, ‘তাই তো দেখছি। এসব খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলে তো আপনি প্রায় সেকেন্ড রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন। আজ ঘুম থেকে উঠে প্রথম কার মুখ দেখেছিলেন, বলুন তো?’

‘হোটেলের বেয়ারার, আর কার!’ লাহাবাবু হেসে উঠলেন।

আমরা বাকি তিনজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি দেখে বাগলমশাই ব্যাপারটা সবিস্তারে বুঝিয়ে দিলেন।

ভারতে আজ অবধি যে ক’টি প্রত্নতত্ত্বের সাইট খুঁজে পাওয়া গেছে, তার প্রায় সবই লোকবসতিপূর্ণ জায়গায়৷ তাতে অসুবিধা হচ্ছে যে স্থানীয় জনসাধারণ সব সময় সেখানকার ঐতিহাসিক মূল্য বোঝে না। ফলে অবহেলায় অনেক নমুনা নষ্ট হয়ে যায়।

অনেকে প্রত্নস্তূপের ইট বা স্ট্যাকো নিজেদের ঘরবাড়ি বানাতে নিয়ে যায়। শুধু স্থানীয় জনসাধারণ কেন, হরপ্পা প্রত্নস্তূপের ইট খুলে নিয়ে গিয়ে লাহোর মুলতান রেললাইন বানাচ্ছিলেন দুই ইঞ্জিনিয়ার ভাই, জন আর উইলিয়াম ব্রান্টন!

কিন্তু এখানে দৈব অভিশাপ বা যে কারণেই হোক, ধ্বংসের আগে এখানে যা যা ছিল, সেসব নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় নেই। আর যদি দেবলরাজার গড়ের কাহিনি আদৌ সত্যি হয়, তাহলে কুষাণ যুগ থেকে পাল যুগ পর্যন্ত মোটামুটি অনেক কিছুরই নিদর্শন পাওয়া যাবে। দুই বাংলা মিলিয়ে এই দেবলরাজার গড় হবে সবথেকে বড় প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। মহাস্থানগড়, বাণেশ্বরডাঙা, পাণ্ডুরাজার ঢিবি, চন্দ্রকেতুগড়, মহিষাদল, ভরতপুর, আর কোত্থাও এই পরিমাণ প্রত্ননিদর্শন পাওয়া যায়নি।

শুনে আমাদের মধ্যেও প্রবল উৎসাহ এসে গেল। বাগলবাবুর কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তো এই গাংনাপুর আনুলিয়া অঞ্চলের পক্ষে বিশেষ গৌরবের ব্যাপার।

জয়ন্ত বলল, ‘কী বলছেন জ্যোতিষবাবু? এই এলাকা তো তাহলে ফেমাস হয়ে যাবে!’

জ্যোতিষ বাগল মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘সে আর বলতে! সরকারের নজর পড়লে, এলাকার কত উন্নতি হবে সেটাও ভাবুন।’

পীতাম্বরবাবুর মুখ উত্তেজনায় চকচক করছিল। তিনি চাপাস্বরে বললেন, ‘আর একটু এগিয়ে দেখা যাক তাহলে?’

আমরা সন্তর্পণে গড়ের মধ্যে হাঁটতে লাগলাম। একটু এগোতেই মস্ত বড় কয়েকটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা বিশাল প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ। লাহাবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘খুব সম্ভবত দেবলরাজার প্রাসাদ।’

আমরা প্রাসাদের মধ্যে ঢুকলাম না। বাঁ দিকে অপেক্ষাকৃত কম গাছপালা। সেইদিক দিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম পিছন দিকে। সেখানে পৌঁছেই চমকে উঠলাম।

প্রাসাদের পিছনে অনেকটা ফাঁকা জমি। তাতে মাথা উঁচু ঘাসের বন। আর সেই ঘাসবনের ঠিক মধ্যিখানে মাথা তুলে আছে একটি মন্দির। মন্দিরটি ঘিরে অতি প্রাচীন বিশাল আকারের পাঁচটি গাছ। নিম, পিপুল আর বট, এই তিনটে গাছ চিনলাম, বাকি দুটো গাছ মন্দিরের ওপাশে, বোঝা গেল না। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই পাঁচটি গাছ ছাড়া পুরো জমিটায় আর কোনও গাছ নেই। এমনকী ঝোপঝাড়ও নয়।

এটা ঠিক সেই মন্দির, যাকে আমি গত পরশু স্বপ্নে দেখেছিলাম!

আমরা একসঙ্গে মন্দিরটার দিকে হাঁটা শুরু করলাম।