৬
যজ্ঞটা শুরু হল রাতের বেলায়। ততক্ষণে ঘোষালবাড়ি জুড়ে কান্নার রোল উঠেছে। কারণ জেলা সদরের সবচেয়ে বড় ডাক্তার এসে বলে গেছেন, ও ছেলে বাঁচবে না। ওর আয়ু আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
রোগটার কী নাম আজ আর মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে যে ডাক্তারবাবু বলে গেছিলেন, রোগটা যে কী করে এত দ্রুত বাচ্চাটার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল, সেটা উনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না।
বাবা যজ্ঞের জোগাড়যন্ত্র করছে দেখে আমি চুপচাপ বেরিয়ে পড়েছিলাম। একটা নিরপরাধ শিশুর আসন্ন মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকার কোনও ইচ্ছেই আমার ছিল না।
ঘোষালবাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর সোজা হাঁটলে গ্রামের চৌমাথা। সেখানে একটা মস্ত বড় বটগাছ আছে। কত পুরোনো, কে জানে! তার তলায় বাঁধানো বেদি। সেখানে বসে হাঁটুদুটোর মধ্যে মাথা গুঁজে ভাবতে লাগলাম।
কত খুন করবে মনা মাঝি? ও নিজেই বলেছে ভুবনেশ্বরীদেবীর বাবাকে মেরেছে ও, ভূপতি ঘোষালকেও। তারপর বাচ্চাটাকে মারবে, আর মারবে ধূর্জটি ঘোষালকে। মানে দুজনকে মারবে আর দুজনকে ইতিমধ্যেই মেরেছে!
না, দুজনকে না। তিনজনকে। হঠাৎ করেই একটা কথা মাথায় আসতে সোজা হয়ে বসলাম। বিপত্তারণ ঘোষাল!
বিপত্তারণ ঘোষাল খুন হয়েছিলেন। তাঁর পাঞ্জা কেটে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক যেভাবে মনা মাঝি কেটে নিয়েছিল হরিপদ সাহার বৃষকাঠের পাঞ্জা। বিপত্তারণ ঘোষালের খুনটাও নিশ্চয়ই মনা মাঝিই করেছিল।
হ্যাঁ, তাই তো! যেদিন মনা মাঝির সঙ্গে আমার শেষ দেখা, সেদিন ও বলেছিল, কী একটা জিনিস জোগাড় করার জন্য ও আটকে ছিল আমাদের গ্রামে। ওইদিন সে নাকি জিনিসটা পেয়ে গেছে৷
কিন্তু কেন? বিপত্তারণ ঘোষাল তো মনা মাঝির কোনও ক্ষতি করেননি। তাহলে বিপত্তারণ ঘোষালকে খুন করে তার হাতের পাঞ্জা কেন কেটে নিয়েছিল মনা মাঝি?
ভাবতে ভাবতে বাঁধানো চাতালে শুয়ে পড়লাম।
আকাশটা আজ ভীষণ পরিষ্কার। সমস্ত নক্ষত্রমণ্ডলী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গোটা গ্রাম আজ শুনশান। সবাই গেছে ঘোষালবাড়ির যজ্ঞে। আমি এখান থেকেও অতি ক্ষীণস্বরে হলেও শুনতে পাচ্ছি বাবার মন্ত্রপাঠ।
আমি জানি ওসব ভুলভাল মন্ত্র। ওতে কিছু হবার নয়। কিন্তু গোটা গ্রামের লোকজন আজ ওখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা দৈব অঘটনের আশায়।
ভাবতে ভাবতেই একটা চিন্তা মাথার মধ্যে চিড়িক দিয়ে গেল। আমি উঠে বসলাম। দৈব ঘটন-অঘটন ঘটে একমাত্র গ্রহনক্ষত্রের দৈব সন্নিবেশে। আজ বৈশাখের কৃষ্ণা চতুর্দশী। কয়েকদিন আগেই বাবা বলছিল আজ নাকি পুষ্যা নক্ষত্রে পাঁচটি পাপ গ্রহের মহাসন্নিবেশ—রবি, মঙ্গল, শনি, রাহু এবং কেতু। একে নাকি প্রেতভৈরব যোগ বলে। এই সাংঘাতিক অশুভ যোগ কয়েকশো বছরে একবারই আসে।
আজই সেই কালরাত্রি। তাই মনা মাঝি আজকের দিনটা বেছে নিয়েছে। আজ একটা খারাপ কিছু হবে। খুব খারাপ।
আস্তে আস্তে উঠে বসলাম। কাকচক্ষু বিদ্যায় ভবিষ্যৎ দেখা যায় না। কিন্তু অতীত দেখা যায়। আজ আমি ধূর্জটি ঘোষালের অতীত দেখেছি। দেখেছি প্রবল পুরুষও কীভাবে মুহূর্তের ভুলে কামের ফাঁদে পড়ে ছটফট করে। দেখেছি কীভাবে ধূর্জটি ঘোষালকে দুইয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছিল শঙ্করী দুলে। তারপর পালিয়ে গেছিল অন্য এক নাগরের হাত ধরে।
দেখেছি ভুবনেশ্বরীদেবীর অতীতও। রূপে-গুণে লক্ষ্মী এক নারী কীভাবে বিপথগামী ধূর্জটি ঘোষালকে প্রেমে ভালোবাসায় ভরিয়ে ঠিক রাস্তায় ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। না, জীবনে আর বিপথে পা বাড়াননি ধূর্জটি ঘোষাল।
আরও দেখেছি সন্তানকামনায় কীভাবে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরেছেন দুজনে। কত জায়গায় মানত করেছেন, হত্যে দিয়েছেন, সাধু-সন্ন্যাসীদের পদসেবা করেছেন। তারপর পাঁচ বছর আগে ভুবনেশ্বরীদেবীর কোল জুড়ে এসেছে ওই এক রত্তির রক্তপুত্তলিটি। ওঁদের বুকের পাঁজর, সাগরসেঁচা ধন।
আরও একটা জিনিস দেখেছি। কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে না।
.
কিন্তু কী হতে পারে? কী করতে পারে মনা মাঝি? এখন যজ্ঞ চলছে, চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। সারা রাত চলবে এই যজ্ঞ। অথচ মনা মাঝিকে যা করার আজ রাতেই করতে হবে। ও নিজেই বলেছে, আজকের রাতের লড়াই মনা মাঝির জীবনের শেষ লড়াই। এই কালরাত্রিতে তার সামনে যে আসবে সেই মরবে। কিন্তু এত লোকের মধ্যে মনা মাঝি কী করে কী করবে?
ডান দিকে চোখ যেতেই থেমে গেলাম৷ একটা কালো ছায়া। এটা সেই কুকুরটা না, কালকে যার পা থেকে আমি লোহার শলাটা বার করে দিয়েছিলাম? যতই কুকুর ভালোবাসি না কেন, এই অন্ধকারের মধ্যে বিশালদেহী কুকুরটাকে দেখে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। এ কী, ও এখানে এল কোথা থেকে?
পরের পর আরও দুটো প্রশ্ন মাথার মধ্যে গেঁথে গেল। ওই বাঁশবনের মধ্যে তো ডেরা বেঁধেছিল মনা মাঝি। কুকুরটা কাল সন্ধেবেলা ওখানে কী করছিল? ওর পায়ে লোহার শলা বিঁধল কী করে?
ভাবতে ভাবতেই কুকুরটা মিশে গেল অন্ধকারে। আরেকটা ছায়া ভেসে উঠল তার জায়গায়। এবার আর চিনতে ভুল হল না। হিসহিস করে বলল, ‘কী খোকাবাবু, খেলা দেখবে না?’
আমি শান্তস্বরে বললাম, ‘যা করছ ঠিক করছ না মনা মাঝি। তোমাকে গুরু বলে মেনেছি, তোমার ভালো চাই, তাই বলছি। একটা সোনার সংসার নষ্ট করে দিও না। এত ক্ষমতা তোমার, কত সাধনা করেছ, কত কী সিদ্ধি আয়ত্ত করেছ, সেসব কি কারও জীবন নষ্ট করবে বলে?’
চাপাস্বরে হেসে উঠল মনা মাঝি। নোংরা চাদরের মতো একটা ছেঁড়া অন্ধরাত্রি ঝুলে আছে দিগন্তজুড়ে। তার সামনে ওর শুকনো শরীরটা হাসির দমকে দুলতে লাগল।
হাসি থামলে মনা মাঝি বলল, ‘এত সাধনা, এত সিদ্ধি, এত ক্ষমতা কেন শিখলাম খোকাবাবু? ওকে পাব বলেই তো? নইলে পনেরোটা বছর নষ্ট করলাম কেন বলো দেখি? আমি তো পারতাম অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে থাকতে, আর পাঁচজন যেমন থাকে। কিন্তু সবাই কি পুরোনো ভালোবাসা ভুলে যায় গো খোকাবাবু?’
আমি ওর কথায় কান দিলাম না। বললাম, ‘এই কুকুরটা কোথা থেকে পেলে তুমি?’
মনা মাঝি দু’পা এগিয়ে এল। লক্ষ্য করলাম, ও অল্প অল্প খোঁড়াচ্ছে। ফিসফিস করে বলল, ‘ও কুকুর নয় গো খোকাবাবু, ও কালভৈরবের বাহন। আজ রাতে ও প্রেতরূপ ধারণ করে ওদের সর্বনাশ করবে৷ আজকের রাত প্রেতভৈরবের রাত। প্রেতভৈরবের খেলা দেখবে না খোকাবাবু?’
আবার অগ্রাহ্য করলাম ওর কথা। জিগ্যেস করলাম, ‘বিপত্তারণ ঘোষালকে মারলে কেন?’
এবার থমকে গেল মনা মাঝি। গম্ভীর গলায় বলল, ‘প্রেতভৈরব সাধনার জন্য কী লাগে জানো খোকাবাবু? বৃষকাঠের অঙ্গ, আর যার জন্য প্রেতভৈরব বানাব, তার বংশের কারও রক্ত৷ রক্ত আরও রক্ত টানে, জানো না খোকাবাবু?’
গা-টা শিউরে উঠল। উফ, কী নৃশংস এই লোকটা! বিপত্তারণ ঘোষাল বলেছিলেন যে তিনি ধূর্জটি ঘোষালদের আত্মীয়। তাই তাকে খুন করে তার হাতের পাঞ্জা কেটে…
হঠাৎ করে চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গেল। আজ দুপুরে বাঁশবনের মধ্যে যেটা দেখেছিলাম সেটা তাহলে…
আমার মাথার মধ্যে এই চিন্তাটা আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই খরখর আওয়াজ। এবার আওয়াজটা আমার মাথার ঠিক ওপরে।
ধীরে ধীরে ওপরের দিকে তাকালাম। গাছের ডাল থেকে ওটা ঝুলে আছে। ঠিক আমার মাথার ওপর। পাঁচটা আঙুল একবার বন্ধ হল। আবার খুলে গেল। তারপর ওটা লাফিয়ে পড়ল আমার গলা লক্ষ্য করে।
আমি পাশে ছিটকে গেছিলাম। পাঞ্জাটা মাটিতে পড়ে এদিকে ওদিকে ঘুরল। আঙুলের ডগাগুলো উঁচিয়ে উঠল শুঁড়ের মতো। হাওয়ায় কী যেন শুঁকছে ওটা। তারপর ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
ভয়ে আতঙ্কে আমার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। পা-দুটো গেঁথে গেছে মাটিতে। হৃৎপিণ্ডটা মনে হচ্ছে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে।
পাঞ্জাটা ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর তর্জনীটা উঠে দাঁড়াল। ওটা নির্দেশ করছে আমার পকেটের দিকে।
কী আছে আমার পকেটে? একটু ভাবতেই মনে পড়ে গেল, সেই লোহার শলাটা, যেটা ওই কুকুরটার পা থেকে বার করে এনেছিলাম।
কাঁপা কাঁপা হাতে ওটা বার করে আনলাম। পাঞ্জাটা একটু পিছিয়ে গেল।
খিক খিক হাসির শব্দটা আবার ভেসে এল, ‘ভয় পেও না খোকাবাবু। ও নিজের মালিকের রক্ত শুঁকতে পারে। তোমার কিছু হবে না।’
বলতে বলতেই একবার আকাশের দিকে তাকাল লোকটা। তারপর দুর্বোধ্য ভাষায় কী একটা আদেশ ছুড়ে দিল পাঞ্জাটার দিকে।
আমি দেখলাম, পাঞ্জাটা খরখর আওয়াজ তুলে দৌড়তে শুরু করল ঘোষালবাড়ির দিকে। পেছন পেছন খোঁড়াতে খোঁড়াতে মনা মাঝিও। আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলাম সেই দিকে৷ আর আলোছায়ার মধ্যেই বুঝতে পারলাম মনা মাঝির দেহটা অন্ধকারে গলে যাচ্ছে, আর তার জায়গায় জেগে উঠেছে একটা মস্ত বড় কুকুরের শরীর!
.
কতক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। সম্বিৎ ফিরল আর্তনাদ আর হাহাকারের শব্দে।
এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম ঘোষালবাড়ি থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পালাচ্ছে লোকজন। তাদের ত্রস্ত চিৎকারের নখ চিরে ফেলছিল নিস্তব্ধ রাত্রির চামড়া। আর তাদের চারিদিকে তাড়া করে যাচ্ছে একটা মস্ত বড় কুকুরের ছায়া।
আমি হাত-পায়ের জড়তা কাটিয়ে দৌড়লাম ঘোষালবাড়ির দিকে। না, কুকুরের ভয় আমার নেই, আমি জানি যে মনা মাঝি আমার কোনও ক্ষতি করবে না। তবুও আমার বুকের মধ্যে ধড়ফড় করছে। সব কি তাহলে শেষ হয়ে গেল?
হাঁপাতে হাঁপাতে ওখানে পৌঁছে দেখলাম সমস্ত উঠোন খালি। লোকজন দুদ্দাড় করে যে যেভাবে পারে পালিয়েছে। যজ্ঞের সমস্ত আয়োজন পণ্ড। যাবতীয় যজ্ঞসামগ্রী চারিদিকে লুটোচ্ছে। আমার বাবা এক দিকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছে মহিলাদের আতঙ্কিত চিৎকার। যে ক’টা হারিকেন আর লণ্ঠন জ্বলছিল সেগুলো ভেঙেচুরে একাকার।
ঘোষালবাড়িসহ আশেপাশের কোনও বাড়িতে আলো জ্বলছে না৷ শুধু দূর, বহু দূর থেকে ভেসে আসছে এক কালান্তক কুকুরের গম্ভীর ঘেউ ঘেউ। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে যজ্ঞের নিভু নিভু আগুনে একটা একটা নারকীয় দৃশ্য ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে।
হাতের পাঞ্জাটা চেপে বসেছে ধূর্জটি ঘোষালের গলায়। অত বড় দেহটা মাটিতে পড়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে। দুই হাতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন পাঞ্জাটাকে ছাড়াতে৷ কিন্তু ক্রমেই সেই পৈশাচিক ফাঁস আরও নির্মম, আরও কঠিনভাবে চেপে বসছে তাঁর গলায়।
একটু পর গলা থেকে বেরিয়ে আসা ঘরঘরে আওয়াজটা একটু একটু করে স্তিমিত হয়ে এল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সামান্য কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল পা-দুটো।
পাঞ্জাটা নেমে এল ধূর্জটি ঘোষালের শরীর বেয়ে। আর ঠিক সেই সময়ে কেঁদে উঠল বাচ্চাটা। ধূর্জটি ঘোষাল আর ভুবনেশ্বরী দেবীর একমাত্র সন্তান।
ছেলেটা দুর্বল তো ছিলই। এতক্ষণ যজ্ঞকুণ্ডের ধারে একেবারে নেতিয়ে ছিল বলে আমার চোখেও পড়েনি। কিন্তু নিজের বাবাকে ওইভাবে নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখে ‘বাবা, বাবা’ বলে কঁকিয়ে উঠল একরত্তি বাচ্চাটা।
পাঞ্জাটা কাঁকড়াবিছের দাড়ার মতো দুটো শুকনো আঙুল তুলে কী যেন শুঁকল। তারপর খরখর আওয়াজ তুলে ধেয়ে গেল ছেলেটার দিকে।
আমি বাচ্চাটাকে বাঁচাবার জন্য দৌড়তে যাব, এমন সময় খোলা দরজা দিয়ে আলুথালু বেশে দৌড়ে এলেন ভুবনেশ্বরী দেবী। তাঁর চুল এলোমেলো, সিঁদুর লেপ্টে আছে সারা কপাল জুড়ে, কাঁধ থেকে খসে পড়া আঁচল ধুলোয় লুটোচ্ছে।
ভুবনেশ্বরীদেবী বিস্ফারিত চোখে দেখলেন পাঞ্জাটা দৌড়ে যাচ্ছে তাঁর একরত্তি বুকের পাঁজরের গলা লক্ষ্য করে।
তিনি আর্তনাদ করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাঁর সন্তানের সামনে ঢাল হয়ে, ‘নাআআআ, আমার ছেলেকে না…’
পাঞ্জাটা লাফিয়ে পড়ে চেপে ধরল ভুবনেশ্বরী দেবীর গলা।
এর পরের ঘটনাগুলো আমি যতবারই আমার মাথার মধ্যে টেপ রেকর্ডারের মতো রিওয়াইন্ড করে দেখেছি, ততবারেই লক্ষ্য করেছি যে সবমিলিয়ে মিনিটখানেকের বেশি লাগেনি। কিন্তু সেদিন আমার মনে হয়েছিল ঘটনাগুলো যেন অনন্তকাল ধরে চলছে।
পাঞ্জাটা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরল ভুবনেশ্বরীদেবীর কণ্ঠনালী। তিনি প্রথমেই প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় ওটাকে টেনে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। তাতে ফল হল আরও উলটো! পাঞ্জাটা ফাঁস আরও কড়া হয়ে চেপে বসল ওঁর গলায়।
নিভন্ত যজ্ঞের আলোয় দেখলাম ওই প্রেতভৈরবের পাঞ্জার পাঁচটা নখই ঢুকে গেছে ভুবনেশ্বরীদেবীর কণ্ঠার মধ্যে। উদ্দিষ্ট শিকারকে হাতের মধ্যে না পেয়ে নিজের সমস্ত আক্রোশ যেন শঙ্খচূড়ের বিষের মতো এক অসহায় মায়ের গলায় ঢেলে দিচ্ছে ওই অভিশপ্ত পাঞ্জা।
আমি পকেট থেকে লোহার শলাকাটা বার করে আনলাম। পাঞ্জাটা যখন চিরে ফেলছে ভুবনেশ্বরীদেবীর গলা, ঠিক তখনই শলাটা সর্বশক্তি দিয়ে গেঁথে দিলাম ওর শরীরে।
পাঞ্জাটা থরথর করে কেঁপে উঠল প্রথমে। তারপর খসে পড়ল ভুবনেশ্বরীদেবীর গলা থেকে। তারপর জোঁকের মুখে নুন দিলে যেমন হয়, ঠিক তেমনই ছটফট করতে থাকল ওটা।
আমি দ্রুত নিজের ফতুয়াটা খুলে ফেলে ভুবনেশ্বরীদেবীর গলায় চেপে ধরলাম। তারপর চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘কে কোথায় আছ? ব্যান্ডেজ আনো এক্ষুনি। গাড়ি ডাকো, ওঁকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে হবে।’
কিন্তু একটি প্রাণীও এগিয়ে এল না। আমি চেঁচাতে থাকলাম। ক্রমেই আমার গলা ভেঙে গেল। হাত ভিজে গেল রক্তে৷ আমার কোলের মধ্যে ক্রমেই নেতিয়ে এল ভুবনেশ্বরীদেবীর মাথা। তারপর যখন তাঁর শরীরটা সামান্য নড়ে স্থির হয়ে গেল, তখনও তাঁর দৃষ্টি তাঁর সন্তানের দিকে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আমার দু’হাতে রক্ত, দু’চোখে জল, সারা শরীর ঘামে ভেজা। পায়ের কাছে পড়ে আছে ভুবনেশ্বরীদেবীর মৃতদেহ, একটু দূরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বাচ্চাটা।
এমন সময় একটা ঝড়ের মতো দরজার কাছে এসে দাঁড়াল মনা মাঝি। তখনও সে বোঝেনি, কী মহাসর্বনাশ হয়ে গেছে তার। খোঁড়াতে খোঁড়াতে দু’পা এগিয়ে এল সে। তারপর অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে রইল ভুবনেশ্বরীদেবীর মৃতদেহের দিকে।
আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম মনা মাঝির দিকে। ওকে দেখে মনে হল ওর মাথায় যেন বজ্রপাত হয়েছে৷ ওর এতদিনের তিলে তিলে জমিয়ে রাখা সমস্ত সাধনা, কষ্ট, আত্মত্যাগ যে এইভাবে এক লহমায় নষ্ট হয়ে যাবে, তা বোধহয় মনা মাঝি স্বপ্নেও ভাবেনি। লোকটার দু’চোখে অবিশ্বাস আর হতাশার হাহাকার। মনে হল আমার সামনে একটা ফুরিয়ে যাওয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া, গলে যাওয়া মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
মনা মাঝি খোঁড়াতে খোঁড়াতে আরও দু’পা এগিয়ে এল। কাঁপা কাঁপা স্বরে অস্ফুটে দু’বার বলল, ‘ভুবি, আমার ভুবি…’
তারপর একটা বুকফাটা আর্তনাদ করে সপাটে আছড়ে পড়ল ভুবনেশ্বরীদেবীর মৃতদেহের ওপর।
আমি কয়েক পা পিছিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসলাম। দুটো পা থরথর করে কাঁপছিল। মাথা নিচু করে খানিকক্ষণ বসে রইলাম। তারপর চোখের পাতাদুটো নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে এল। টের পেলাম চোখের কোনা থেকে টপটপ করে জল পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে মাটি।
আচ্ছা, মনোরঞ্জন মাঝি তো আমার কেউ না, তাহলে ওর দুঃখে আমার বুকটা মুচড়ে মুচড়ে উঠছে কেন?
একটু পর যখন চোখ তুললাম, দেখলাম একটু একটু করে বেশ কয়েকজন জড়ো হয়েছেন ঘোষালবাড়ির উঠোন জুড়ে। দু-একজনের হাতে লণ্ঠন। উঠে বসেছেন ধূর্জটি ঘোষালও, না মরেননি তিনি।
খোকা তখনও যজ্ঞকুণ্ডের পাশে নেতিয়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে৷ ধূর্জটি ঘোষাল কোনওমতে হাতড়ে হাতড়ে উঠে এসে ছেলেকে কোলে নিলেন। তারপর নিজের স্ত্রী’র দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন তিনি।
ভুবনেশ্বরীদেবীর মৃতদেহের ওপর শুয়ে আছে আরেকটা মরা মানুষ। শুকিয়ে যাওয়া, নোংরা ভিখিরির মতো দেখতে একটা মানুষের দেহ। তার পরনে একটা ছেঁড়া লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু বুকের মধ্যে রয়েছে এক সমুদ্র বিষিয়ে যাওয়া ভালোবাসা।
ধূর্জটি ঘোষাল ছেলেকে কোলে নিয়ে পায়ে পায়ে অন্দরমহলে ঢুকে গেলেন।
নিবারণ চক্রবর্তী গল্প শেষ করে সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন।
আমরা দুজনেই চুপ। এর পর আর কথা চলে না। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আমি ওঠার উদ্যোগ করছি, এমন সময় সত্যব্রত প্রশ্ন করল, আচ্ছা, আপনি বললেন না যে ভুবনেশ্বরীদেবীর ব্যাপারে কাকচক্ষুতে আরও একটা জিনিস দেখেছিলেন, কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবতে চাননি। কী সেটা?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, ভুবনেশ্বরীদেবী মনোরঞ্জন মাঝিকে তেমন চিনতেনই না। ভালোবাসা-টাসা তো অনেক দূরের ব্যাপার। ললিতা মনা মাঝিকে যা বলেছিল, সব বানিয়ে বানিয়ে। ভুবনেশ্বরীদেবীর তাতে কোনও হাত ছিল না।
—তাহলে ললিতা?
—বোধহয় সেই-ই ভালোবেসে ফেলেছিল বাউন্ডুলে ছেলেটাকে। অথবা কী জানি, হয়তো মজা করে এমনিই বলেছিল মনা মাঝিকে। ব্যাপারটা এত সিরিয়াস হয়ে যাবে ভাবেনি।
—আপনি ললিতার দেখা পাননি?
মাথা নাড়লেন নিবারণবাবু, নাহ! ওই ঘটনার পর হাওয়ায় উধাও হয়ে গেছিল ললিতা। পরে শুনেছিলাম কোন মঠে নাকি সন্ন্যাসিনী হয়ে জয়েন করেছে। কী জানো ভাই, কত লোক যে তাদের বুকের মধ্যে মরে যাওয়া ভালোবাসার কঙ্কাল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তার খবর কোনও কাকচক্ষুতেই ধরা পড়ে না।
***
