দেবলরাজার গড় – ৭

শিয়ালদা পুলিশের ট্রেজারির স্ট্রংরুমটা যেমন বড়, তেমনই অন্ধকার আর ঠান্ডা। ঢুকলেই মনে হয় বাইরে সব উত্তপ্ত কর্কশ কোলাহল যেন এখানে এসে মুহূর্তে স্তব্ধ হয়েছে। বোধহয় ব্রিটিশ আমলের সিলিং। মাথার ওপর কয়েকটা ঝিমধরা টিউবলাইট জ্বলছে। মাথার ওপরে আদিম সিলিং ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ তুলে।

জ্যোতিষ বাগল শিয়ালদা স্টেশনে নেমেই পরিকল্পনা অনুযায়ী আলাদা হয়ে গেছিলেন। শিয়ালদা থেকে কলেজ স্ট্রিট হেঁটেও যাওয়া যায়। উনি বললেন, আমাদের আসার আগেই উনি ‘দেবল বংশাবলী চরিত’ পড়ে নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন।

স্ট্রংরুমে ঢোকার আগে সব ব্যাগপত্র জমা করতে হয়। আমার ব্যাগটা জ্যোতিষ বাগল আগেই বইসমেত নিয়ে গেছেন। তবে প্রফেসর লাহার কাছে একটা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ছিল। সিকিউরিটিতে যিনি ছিলেন তিনি বোধহয় প্রফেসরের চেনা। ব্যাগটা খুলে, ‘ও আচ্ছা, বই আছে? নিয়ে যান,’ বলে ছেড়ে দিলেন। আমিও ব্যাগে উঁকি দিয়ে দেখলাম ব্যাগের মধ্যে একটা মস্ত মোটা বই।

আমরা দু’জনে বসে অপেক্ষা করার কিছুক্ষণ পর স্ট্রংরুমের ইন-চার্জ এলেন। ভদ্রলোক বয়সে প্রৌঢ়, বোধহয় রিটায়ারমেন্টের উপান্তে এসে পৌঁছেছেন। হাবেভাবে মনে হল প্রফেসর লাহার পূর্বপরিচিত। এসেই সহাস্যে কুশল জিগ্যেস করলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এঁকে তো চিনলাম না।’

প্রফেসর লাহা অম্লানবদনে বললেন, ‘ওর নাম নিবারণ চক্রবর্তী। আমাদের ডিপার্টমেন্টে গত মাসে জয়েন করেছে। আপাতত এই দেবলগড়ের এক্সকাভেশনের কেসটাতে আমাদের সঙ্গে আছে, ট্রেইনি হিসেবে। এসো নিবারণ। উনি হলেন হরেন রক্ষিত, এই স্ট্রংরুমের মালবাবু। এই রতন মণ্ডলের কেসটার পর থেকে এতবার আসতে হয়েছে, যে আমরা প্রায় বন্ধু হয়ে গেছি বললেই চলে। তুমিও চটপট আলাপটা সেরে নাও। এবার থেকে তো তোমাকেই আসতে হবে।’

আমি এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে মুখে একটা হাসি টেনে নমস্কার করতে বেশ কয়েক মুহূর্ত লাগল। হরেন রক্ষিত প্রতি নমস্কার করে আমাকে একবার মেপে নিয়ে বললেন, ‘বাহ বাহ, ইয়ং ম্যান, দেখে তো বয়েস বেশি মনে হচ্ছে না। এই বয়েসেই এত ভালো চাকরি পেয়েছেন, খুব ভালো। তা বাড়ি কোথায়? বাড়িতে কে কে আছেন?’

আমি কিছু বলার আগেই প্রফেসর লাহা বলে উঠলেন, ‘ওর বাড়ি বেহালায়, ক্যান্টনমেন্টের কাছেই। নিজেদের দোতলা বাড়ি, বাপ-মা মারা গেছেন কয়েক বছর হল। এক দিদি ছাড়া তিনকুলে আর কেউ নেই৷ তবে সেও বিয়ে করে দিল্লিতে থাকে, কালেভদ্রে আসে৷ নিবারণ খুবই ভালো ছেলে। নেশাভাঙ নেই, শুধু বইপত্তর নিয়েই আছে। আমরা তো ভাবছি এই সিনিয়র অফিস কলিগরা মিলেই ওর একটা বিয়ে দিই। আপনার হাতে ভালো পাত্রী থাকলে জানাবেন তো হরেনবাবু?’

হরেন রক্ষিতের মুখে মুহূর্তের মধ্যে যে আলোটা ফুটে উঠল তার তুলনা নেই। তখন অল্প বয়েস, সে আলোর আকুলতা বুঝিনি। এখন এই বয়েসে এসে, এত দুনিয়াদারির পর সেই আলোর মানে বুঝি। ও আলোর নাম আশা, নিজের সন্তানকে দুধে ভাতে বেঁচে থাকতে দেখার আশা।

হরেন রক্ষিত সাগ্রহে বললেন, ‘বাহ, বাহ, খুব ভালো। তা একদিন আমাদের বাড়ি আসুন না৷ আমাদের বাড়ি চেতলার কাছেই, বেহালা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। আমার মেয়ে এই বছর হিস্ট্রি নিয়ে যোগমায়া থেকে অনার্স নিয়ে পাশ করল। সে-ও বলছে সরকারি চাকরিতে বসবে। আপনি এসে যদি একটু গাইড করে দেন। বুঝতেই তো পারছেন, যা কম্পিটিশনের বাজার…’

প্রফেসর লাহা উদার হেসে বললেন, ‘কোনও ব্যাপার না। নিবারণ খুবই উপকারী ছেলে। অনেকদিন ছাত্র পড়িয়েছে। আপনার মেয়েকে ও ভালোই গাইড করতে পারবে। বাই দ্য ওয়ে, আপনারা কায়স্থ তো? নিবারণ কিন্তু ব্রাহ্মণ।’

আমার তখন মুখে বাক্‌স্ফূর্তি তো দূরস্থান, কী আলোচনা হচ্ছে সেটাও বুঝছিলাম না।

হরেন রক্ষিত কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন, ‘আজকাল আর ওসব কে মানে বলুন। এই তো আমার শালার মেয়ে পুলু, ভালো নাম পৌলমী, গত বছর স্কটিশ থেকে পল সায়েন্সে এমএ পাশ করল। তারপর বিয়ে করেছে ওরই এক ব্যাচমেটকে। অতি ভালো ছেলে, যেমন পড়াশোনায়, তেমন খেলাধুলায়। ছেলেটি জাতিতে মাহিষ্য। দুটিতে কী চমৎকার মিলেছে!’

প্রফেসর লাহা চিন্তিতমুখে বললেন, ‘তবে নিবারণ কিন্তু ঘটি, ডালে চিনি ঢেলে খায়। আপনারা তো বাঙাল, তাই না?’

হরেন রক্ষিত কাষ্ঠহাসির কাষ্ঠত্ব সামান্য বাড়ল, ‘আজকাল ওসব চিনি, সরষে, মিষ্টি, ঝাল সব এক হয়ে গেছে দাদা। তাছাড়া আমার মেয়ে বড় লক্ষ্মী, রান্নাবান্না ঝটপট শিখে নেয়।’

প্রফেসর লাহা বললেন, ‘হ্যাঁ, এবার মূর্তিটা আনুন দেখি। কয়েকটা জিনিস নোট করার আছে। আর ইয়ে, চায়ের কিছু ব্যবস্থা হতে পারে?’

হরেন রক্ষিত দ্রুত স্ট্রংরুমের দেওয়ালে সেঁটে রাখা মস্ত বড় ভল্টগুলোর দিকে গিয়ে চাবি দিয়ে একটা ড্রয়ার খুললেন। আন্দাজে মনে হল, তার মধ্যে একটা ছোটখাটো বাছুর ঢুকে যেতে পারে। সেখান থেকে সন্তর্পণে একটা ছয়-সাড়ে ছয় ইঞ্চি লম্বা মূর্তি এনে সামনে রেখে বললেন, ‘এই নিন। কী নোট করবেন করুন। আমি চায়ের ব্যবস্থা দেখছি।’

হরেনবাবু নজরের বাইরে যেতেই আমি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ‘এটা কী হল প্রফেসর লাহা? এই যা যা বলে গেলেন তার মানে কী?’

প্রফেসর লাহা কঠিন পাথুরে স্বরে বললেন, ‘কিপ ইওর মাউথ শাট৷ যা করছি চুপচাপ দেখে যান। ডোন্ট ক্রিয়েট আ ফাস।’

আমি দাবড়ানি খেয়ে চুপ করে গেলাম। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। কারণ এরপর ভদ্রলোক যেটা করলেন, সেটা দেখে আমি মুহূর্তের মধ্যে জমে পাথর হয়ে গেলাম।

প্রফেসর লাহা নিজের ব্যাগ থেকে সঙ্গে আনা মস্ত বড় বইটা বার করে আনলেন। হার্ড-বাউন্ডে বাঁধানো বইটার কভার খুলতেই বুঝতে পারলাম ওটা আসলে বই নয়, বইয়ের আকারে নিখুঁতভাবে তৈরি একটা ছোট ক্যাবিনেট। সেই ক্যাবিনেটের মধ্যে শুয়ে আছে একটি দেবীমূর্তি, আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটির হুবহু নকল!

প্রফেসর লাহা দ্রুত সেই নকল মূর্তিটা তুলে আসল মূর্তিটির জায়গায় বসিয়ে আসল মূর্তিটি বই-ক্যাবিনেটের মধ্যে রেখে সেটা ব্যাগের মধ্যে চালান করে দিলেন। পুরো ব্যাপারটাই এমন চকিতের মধ্যে ঘটে গেল যে আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

কিছু বলতে যাব, তার আগেই হরেন রক্ষিত সুদৃশ্য প্লেটে দু’কাপ চা, সঙ্গে দামি বিস্কুট নিয়ে উপস্থিত হলেন। চায়ের ভুরভুরে সুবাসে বুঝতে পারলাম খাঁটি দার্জিলিং টি। হরেন রক্ষিত হেঁ-হেঁ করে বললেন, ‘খাঁটি মকাইবাড়ি, বৈঠকখানার উষা টি কোম্পানি থেকে আনানো। খেলেই দিল একেবারে তরর হয়ে যাবে। বকুল, মানে আমার মেয়ে, তার তো এই চা ছাড়া মুখেই রোচে না। বাবা নিবারণ, খাও বাবা, খাও৷ এই দেখো, মনের ভুলে আবার তুমি বলে ফেললাম। কিছু মনে করোনি তো বাবা?’

প্রফেসর লাহা ওই আগুন গরম চায়ের কাপে দ্রুত চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘আরে না না, নিবারণ মনে করার ছেলেই নয়। তাছাড়া আপনি তো ওর বাবার বয়েসি, ওকে আপনি তুমি করে বলতেই পারেন। যাই হোক, অনেক ধন্যবাদ রক্ষিতমশাই। বকুল মা’কে আমার অনেক আশীর্বাদ দেবেন।’

বলতে বলতেই ভদ্রলোক নিজের কাপের শেষ চুমুকটা গলায় ঢেলে একটা হ্যাঁচকা টানে আমাকে দাঁড় করালেন, ‘চলো হে নিবারণ, আমাদের আবার একবার কারেন্সি বিল্ডিংয়েও যেতে হবে। বসে বসে চা খেলে চলবে?’

মালখানা থেকে বেরিয়ে আসার মুখ অবধি হরেন রক্ষিত আমাদের এগিয়ে দিতে এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বুভুক্ষু আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে বাবা নিবারণ, আসছ তো আমাদের বাড়ি?’

আমি কিছু বলার আগেই প্রফেসর লাহা ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমি তো ভাবছিলাম আগামী মাসের শেষ দিকেই একবার ওকে নিয়ে আপনাদের বাড়ি চলে আসি। বকুল মা বাড়িতে থাকবে তো?’

হরেন রক্ষিত শশব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘থাকবে থাকবে, অবশ্যই থাকবে। তারিখটা জানিয়ে দেবেন লাহাবাবু। আর বাবা নিবারণ, তুমি মাটন ভালোবাসো না চিকেন? গলদা চিংড়ি তো থাকছেই…’

আমি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই একটা ধাবমান অটো থামালেন প্রফেসর লাহা। হরেন রক্ষিতের দিকে হাত নেড়ে টাটা বাই-বাই করে আমাকে টেনে হিঁচড়ে পেছনের সিটে তুলে বললেন, ‘কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস, কুইক।’

অটোওয়ালা মুখ থেকে থুক করে একদলা গুটখা বাইরে ফেলে বলল, ‘বুক করে গেলে একশো টাকা লাগবে মাইরি।’

প্রফেসর লাহা বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দেবো রে ভাই দেবো। এবার জলদি চালাও দেখি।’

অটো চলতে শুরু করলে আমি রুদ্ধশ্বাসে জিগ্যেস করলাম, ‘এসব… এসব কী হল প্রফেসর লাহা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

প্রফেসর লাহা বললেন, ‘সব কিছু আপনাকে এক্সপ্লেইন করার সময় বা সুযোগ কোনওটাই নেই নিবারণবাবু। শুধু জেনে রাখুন, এই মূর্তিটা এই মুহূর্তে দেবলরাজার গড়ে পৌঁছনো দরকার! খুব দরকার। না হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে—মহাসর্বনাশ! একটা গোটা জনপদ ছারেখারে যাবে। আমি সেটা হতে দিতে পারি না।’

মাথাটা আমার গুলিয়ে গেল। একদিন আগেই মনা মাঝি আমার স্বপ্নে এসে এই কথাটাই বলে গেছিল না? ইনি কী করে জানলেন যে এক মহাসর্বনাশ হতে চলেছে দেবলগড়ে? আর সেটা আটকানোর জন্য ওঁরই বা এত উৎকণ্ঠাই বা কেন, যার জন্য ওঁকে আইনের বাইরে গিয়ে এত বড় ঝুঁকিটা নিতে হল?

প্রফেসর লাহা আমার দিকে তাকিয়ে এবার একটু নরমস্বরে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না নিবারণবাবু, বুঝতেই পারছেন যে আপনাকে একটা বেইট, মানে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি। কাজটা নিঃসন্দেহে অনৈতিক এবং অত্যন্ত বেআইনি। কিন্তু যে ভয়াবহ বিভীষিকা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে তাকে আটকাবার জন্য এই চাতুরিটুকু দরকার ছিল। নইলে একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে এতটা ঝুঁকি কিছুতেই নিতাম না। আমি কথা দিচ্ছি, যে আসন্ন বিপদ দেবলগড়ের মাথার ওপর জমাট বাঁধছে, সেটা সরে গেলেই মা বলাকামুখীর মূর্তি যথাস্থানে ফিরে যাবে।’

প্রফেসর লাহা যেটা বললেন, যেটা হৃদয়ঙ্গম করতে কিছু সময় লাগল। তবু একটা কাঁটা কেন যেন মনের মধ্যে খচখচ করছিল। তার কারণটা ঠিক বুঝতে পারলাম না৷ শুধু মনে হল, কোথাও যেন এমন কিছু একটা শুনেছি যেটা ঠিক স্বাভাবিক না। কিন্তু সেটা যে কী, অনেক চেষ্টা করেও সেটা মাথায় এল না।

কলেজ স্ট্রিটের মোড় অবধি পৌঁছতে সময় লাগল প্রায় পনেরো মিনিট। সেখান থেকে হেঁটে যখন কফি হাউসের দোতলার বিশাল হলঘরের কোনার দিকের টেবিলে পৌঁছলাম, তখন সেখান জ্যোতিষ বাগল আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সামনে আমার ব্যাগ থেকে ছিটকে পড়া বইটা, যেটা শিয়ালদা স্টেশনে প্রফেসর লাহা হস্তগত করেছিলেন।

আমরা গিয়ে বসতে না বসতেই প্রফেসর লাহা প্রশ্ন করলেন, ‘বইটা পড়লেন?’

জ্যোতিষ বাগল উত্তর করলেন না, শুধু সামনে রাখা বইটি প্রফেসর লাহার দিকে ঠেলে দিলেন।

প্রফেসর লাহা যখন অতি সন্তর্পণে বইটার প্রতিটি পাতা উলটোচ্ছিলেন, তখন আমি ঘাড় ঘুরিয়ে চারিপাশ তাকিয়ে দেখছিলাম। কলকাতায় এতদিন থাকলেও কফি হাউসে এই আমার প্রথম আসা৷ বড় বাড়ি, জমকালো দরজা, উঁচু সিলিং, ছেলেমেয়েদের ভিড়, সবমিলিয়ে বেশ জমজমাট পরিবেশ।

ঘাড় ঘুরিয়ে চারিদিক দেখছি, এমন সময় লাহাবাবু বইটা পড়তে পড়তে আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘নিবারণবাবু, আমার ব্যাগ থেকে মূর্তিটা বের করে সামনে একবার রাখুন তো একবার।’

প্রফেসরের আদেশ পালন করে ওঁর ব্যাগ থেকে নকল বই-আকারের ক্যাবিনেটটা বার করে, তার ডালা খুলে মূর্তিটা ধরে টেবিলের রেখেছি কি রাখিনি, আমার মনে হল আমার পায়ের নীচের পৃথিবীটা যেন অকস্মাৎ বিপুলবেগে দুলে উঠল। একটা সহস্র ভোল্টের শক শিরদাঁড়া থেকে বিদ্যুৎগতিতে নেমে গেল আমার পায়ের নখ অবধি। তবে তা মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আবার সব স্থির, সুস্থ, স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি, কিছুই ঘটেনি আগের মুহূর্তটিতে।

প্রফেসর লাহা বা জ্যোতিষবাবু কিছুই বুঝলেন না। তাঁরা ঝুঁকে পড়লেন মূর্তিটির উপর। দুজনে এমন তন্ময় হয়ে গেলেন, যেন চারিদিকে আর কিছু নেই। আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।

বুঝতে পারলাম, আমার হাতে মোক্ষচানীর বেঁধে দেওয়া আঁচলের টুকরোটা ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আর তার সঙ্গে আমার মাথার মধ্যে এতদিন জমাট হয়ে একটা কুয়াশা যেন আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে একটা আলো ফুটে উঠছে। বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে এল, আর মাথার ভেতরটা শান্ত, স্থির।

আমি হাত দু’খানা মুদ্রাবদ্ধ করে চোখ বন্ধ করলাম। আমি জানি না কে এই দেবী মোক্ষচানী, আর কেনই বা তিনি এক প্রৌঢ়া গ্রাম্য মহিলার রূপ ধরে আমার হাতে এই কাপড়ের টুকরোটি বেঁধে দিয়ে গেলেন। তবে গুরু চেয়েছেন তাঁর দেওয়া শিক্ষা যেন ব্যর্থ না হয়, যেন জাগ্রত হয়। সিদ্ধগুরু যদি চান তাঁর শিষ্যের দ্বারা কোনও মহৎ কর্ম সাধিত হোক, তাহলে তাকে আটকায় এমন সাধ্য কার?

একটু পর ধীরে ধীরে চোখ খুললাম। ঠিক সামনে প্রফেসর লাহার চিন্তামগ্ন মুখটা। হঠাৎ চোখের সামনে অন্য একটা জগতের দৃশ্য ফুটে উঠল। এক ধূসর লণ্ঠনের মধ্যে দিয়ে দেখলাম একটি ছোট ছেলে… স্কুলে পড়াশোনা করছে… প্রাইজ পাচ্ছে… লাইব্রেরিতে সেই ছেলেটি, অনেক রাত অবধি… কলেজজীবন… শিপ্রাকাকিমা… দুজনে গঙ্গার ঘাটে… গাংনাপুর রাজবাড়ির বইঘর… তারপর দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি…।

চকিতের মধ্যে দৃশ্যাবলি পরিবর্তিত হয়ে গেল… বিদেশের কোনও এক বিশ্ববিদ্যালয়… সেই ছেলেটি তখনও লাইব্রেরিতে… তারপর দেশে ফিরে এসে অধ্যাপনা… তার পরেও লাইব্রেরি… প্রফেসর লাহা এখন আর ছেলেটি নন… তবুও তাঁর অবয়ব আবছা বোঝা যায়… খুব দ্রুত সরে যাচ্ছে আবছা দৃশ্যগুলো। সিনেমার ঘষা ফিল্ম যেমন দ্রুত সরে যায়, তেমনই।

কিন্তু দৃশ্যগুলো যেন চকিতের মধ্যে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। আবার স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে এল।

দেখলাম প্রফেসর আমার দিকেই সোজা চেয়ে আছেন। আমাকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী নিবারণবাবু, অমন থম মেরে গেলেন যে? শরীর ঠিক আছে তো?’

ভাবলাম একবার জিগ্যেস করি, সারা জীবন ধরে লাইব্রেরিতে কী খুঁজে গেলেন প্রফেসর লাহা? নিজের জীবন, যৌবন, একজন অসামান্যা নারীর বিলিয়ে দেওয়া ভালোবাসা, সব তুচ্ছ করে কী খুঁজে গেলেন? এই বইটা? কী আছে এর মধ্যে?

নিজেকে সামলে নিলাম। মনের মধ্যে কিলবিল করছে নতুন উত্তেজনা। হ্যাঁ, আমার চেষ্টার ফল ফলেছে। দেবীর মোক্ষচানীর কৃপাতে হোক বা গুরুর আদেশেই হোক, খুব সামান্য হলেও আমার কাকচক্ষু উন্মীলিত হয়েছে।

জ্যোতিষবাবুর গলা শুনে প্রফেসর লাহা আবার নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেন। শুনলাম জ্যোতিষবাবু বলছেন, ‘এটাই যে সেই মূর্তি, সে তো স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে বইতে যে অভিশাপের কথা লেখা রয়েছে সেটা সত্যি কিনা! তার থেকেও বড় প্রশ্ন, বইটায় যা লেখা আছে সেটা কতটা অথেনটিক? আপনি সত্যিই এর অথেনটিসিটির ব্যাপারে শিওর?

‘একদম। আমি বহুদিন ধরে বইটার খোঁজে ছিলাম। বইটা শুধু দুষ্প্রাপ্য নয়, অমূল্যও বটে।’

‘কেন? দুষ্প্রাপ্য কেন?’

‘কারণ বইটা নিয়ে একটা মিথ আছে। এই বইটা নাকি যে যে পড়েছে, তাদের প্রত্যেকের জীবনে ঘোর দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে। একেই বইটার একটিই মাত্র এডিশন ছাপা হয়েছিল, তাও খুব অল্পসংখ্যক কপি। তার ওপর ওই মিথ! তাই বইটা ক্রমে লোকচক্ষু থেকে হারিয়ে যায়।’

আমি ইতস্তত করে বললাম, ‘সে বুঝলাম, কিন্তু আজ সকাল থেকে কী কী হচ্ছে সে নিয়ে খোলসা করে যদি কিছু বলেন তো… কিছুই বুঝতে পারছি না। মানে আজ সকালে আপনার ওই মূর্তি নিয়ে ইয়ে ব্যাপারটা, তারপর এই বই নিয়ে আপনারা কী যে বলছেন…’

প্রফেসর লাহা বইটা সন্তর্পণে বন্ধ করে মূর্তিটার দিকে ফিরলেন। তারপর তার গায়ে সস্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘আজ দেবলগড়, গাংনাপুর, আনুলিয়া জুড়ে যা ঘটছে নিবারণবাবু, তার বীজ কিন্তু আজ নয়, বোনা হয়েছিল অনেক, অনেক বছর আগে।’

ভদ্রলোকের দিকে আমরা নির্বাকচোখে চেয়ে রইলাম।

‘আপনি নিশ্চয়ই দেবপাল বা দেবল নামের এক কুমোর কী করে এক সাধুর পাথর চুরি করে এই অঞ্চলের রাজা হয়ে বসল, সেই গল্পটা জানেন?’

বললাম, ‘হ্যাঁ, শিপ্রাকাকিমার মুখে শুনেছি।’

‘গুড। এই গল্পটা, অবশ্য গল্পের বদলে লোককথা বলাই ভালো, তার ব্যাপারে আমরা জেনেছি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের “অন্নদামঙ্গল” থেকে। আরও কিছু সোর্স আছে, তবে মোটামুটি গল্পের কাঠামো একই। শুধু একটিমাত্র ব্যত্যয় আছে। এই এলাকার অন্য একটি প্রচলিত লোককথা বলছে, সাধুটি ওই অলৌকিক পাথরটি পান কাছেরই কামালপুর গ্রামের এক বিশেষ শিবলিঙ্গ থেকে। কিন্তু এই বইটিতে দেবলরাজার গড় নিয়ে যেসব তথ্য দেওয়া আছে, সেসব সমস্ত লোককথা থেকে শুধু যে আলাদা, তাই-ই নয়, যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনই চমকপ্রদ৷’

জ্যোতিষবাবু বললেন, ‘সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু আপনি এই বইটার ব্যাপারে জানলেন কী করে?’

ততক্ষণে আমাদের টেবিলে তিন কাপ পানীয় এসে উপস্থিত হয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম চা। তারপর শুনলাম তার নাম নাকি ইনফিউশন। চুমুক দিয়ে মনে হল, এমন অখাদ্য পানীয় জীবনে আর দুটি খাইনি। এমনিতেই এখানকার বেয়ারাদের বেয়াড়া হাবভাব দেখে মনটা খিঁচড়ে ছিল। এই অত্যন্ত খারাপ জিনিসটা খেয়ে পুরো কফি হাউসের ওপরে একটা অচ্ছেদ্দা ভাব এল।

প্রফেসর লাহা বিস্বাদ পানীয়তে চুমুক দিয়ে একটা আরামের শব্দ করে বললেন, ‘এটার সন্ধান প্রথমে পাই নবদ্বীপের রাজবংশ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে৷ তখনই জেনেছিলাম, বইটা অত্যন্ত দুর্লভ এবং দুষ্প্রাপ্য। এটা রিপ্রিন্টে না যাওয়ার প্রথম কারণ যদি হয় যে পড়েছে সেই মরেছে গোছের অভিশপ্ত মিথ, তাহলে দ্বিতীয়টা হচ্ছে বইটার বিষয়বস্তু। অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য।’

আমি সপ্রশ্নচোখে তাকিয়ে রইলাম। প্রফেসর লাহা ওই অখাদ্য ইনফিউশনে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলা শুরু করলেন।

‘দেবলরাজার রাজত্বপ্রাপ্তির পর তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা সুবুদ্ধিমিশ্র যে পিশাচখণ্ডী নামের এক চণ্ডালজাতির সঙ্গীকে জুটিয়ে যে দেবী বলাকিনী বা বলাকামুখীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটা নিশ্চয়ই শিপ্রার থেকে, আই মিন রানিমার মুখ থেকে শুনেছেন। আর শুনেছেন দেবলরাজার উত্তরাধিকারী বিক্রমরাজের রাজত্ব এক রাতের মধ্যে উচ্ছন্নে যাওয়ার কাহিনি, তাই তো?’

মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

‘কিন্তু এই বইটা আরও অনেক কথা বলেছে। তার মধ্যেই আমাদের এই বর্তমান সঙ্কট আর তার থেকে পরিত্রাণের উপায় লুকিয়ে আছে। আমি বইটাতে যা লেখা আছে সেটার সামারি বলছি। আপনারা শুধু শুনে যান।

‘দেবলরাজা সেই সাধুর থেকে ছিনিয়ে আনা পাথরের দৌলতে দেবলগড়ের রাজত্ব, রাজপাট, রাজপ্রাসাদ, সবই তো আয়ত্ত করলেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা হল কী করে এই রাজত্ব চিরস্থায়ী হয়।

‘তাই তিনি একটা আশ্চর্য কাণ্ড করলেন, যা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। তিনি, সুবুদ্ধিমিশ্র আর পিশাচখণ্ডী, ওই সাধুবাবার দেওয়া পাথরটা কুঁদে এক পক্ষীমুখী দেবীমূর্তি বানিয়ে তাঁকে এক মন্দিরের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে লাগলেন।’

জ্যোতিষ বাগল মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়ের শব্দ করলেন। আমি রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলাম, ‘মানে এই মূর্তিটা তাহলে…’

ধীরে ধীরে ওপরে নীচে মাথা নাড়লেন প্রফেসর লাহা, ‘হ্যাঁ, এই মূর্তিটা সেই সাধুর থেকে চুরি করা আনা দৈবী পাথর দিয়েই তৈরি।’

শুনে সারা শরীরে শিহরন খেলে গেল৷ জ্যোতিষবাবু খানিকক্ষণ বিস্ফারিত চোখে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে তো এর কাছে, ইয়ে মানে এঁর কাছে যা চাইব, তাই পাব।’

প্রফেসর লাহা সামান্য হেসে বললেন, ‘সে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে কিছু না পাবার সম্ভাবনাই বেশি। তার একটা কারণ— ওই লোককথাটার কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। দ্বিতীয়ত, যদি ভিত্তি থেকেও থাকে, তবে এই মূর্তির সেই ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। কারণ শাস্ত্রে বলে প্রতিষ্ঠিত দেবদেবীর মূর্তি স্থানচ্যুত হলে, বা দীর্ঘকাল অপূজিত অবস্থায় থাকলে সেই মূর্তি আবার বিধিমতো পুজো করে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।’

জ্যোতিষবাবু দমে গেলেন।

প্রফেসর লাহা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘বইটিতে বলছে এই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠার আগে একটি বিশেষ ক্রিয়া করার প্রয়োজন ছিল। সেটি হচ্ছে রাক্ষসসাধনা।’

আমরা প্রফেসরের দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছি।

‘রাক্ষসসাধনা হচ্ছে একজন সুলক্ষণযুক্ত চণ্ডালকে দেবীর সামনে উৎসর্গ করা। উৎসর্গ মানে তাকে বলি দিয়ে তার মাথাটা দেবীকে নিবেদন করা।’

‘নরবলি!’ আমার মুখ থেকে ছিটকে বেরোল।

‘নরবলি ব্যাপারটা কি খুব অস্বাভাবিক নিবারণবাবু? জৈন, বৌদ্ধ, শিন্টো এরকম দু-চারটে ধর্ম বাদে পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই নরবলির বিধান আছে। আর পেগান বা প্রাকৃতিক ধর্মে তো বলির ছড়াছড়ি। প্রাচীনকালে লোকে বিশ্বাস করত যে, বলি দিলে প্রকৃতিদেবী সন্তুষ্ট হন, জমি উর্বর হয়, সঙ্গে তাদের গোষ্ঠী সুখে থাকে। আর হিন্দুধর্মে নরবলি বা গঙ্গাসাগরে সন্তান উৎসর্গ তো দেড়শো-দুশো বছর আগেও প্রচলিত ছিল।

‘সে যাই হোক, তিনজনে মিলে স্থির করলেন যে এই যক্ষসাধনার জন্য সবচাইতে উপযুক্ত বলি আর কেউ নয়, পিশাচখণ্ডী স্বয়ং। একে তো সে জাতিতে চণ্ডাল, তার ওপর তন্ত্রমন্ত্রে তার বিশেষ প্রসিদ্ধি। তার থেকে উপযুক্ত বলির পাত্র আর কোথায়?

‘সেকালে দেবীর থানে বলি হতে পারা বিশেষ সৌভাগ্য বলে বিবেচিত হতো। তার ওপর অমন মহাপবিত্র মহাশক্তির কাছে নিজেকে নিবেদন করার পুণ্যই আলাদা। পিশাচখণ্ডী সানন্দে যক্ষ হতে স্বীকার হল।

‘দেবী বলাকামুখীর মূর্তিপ্রতিষ্ঠা বেশ ধূমধামের সঙ্গে হল। বইতে লিখছে, দেবী বলাকামুখীর মূর্তির বীজপ্রতিষ্ঠার জন্য যা আয়োজন করা হয়েছিল তাকে মহাযজ্ঞ বললেই চলে। দিনটা ছিল বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি। দশটি মহিষ, একশোটি মেষ মানে ভেড়ার সঙ্গে এক হাজার ছাগবলিও হয়েছিল। আর সব কিছুর শেষে পিশাচখণ্ডীকে দেবীর সামনে বলি দিয়ে তার মাথাটি দেবীকে উৎসর্গ করা হল।

দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি দিঘিও খোঁড়া হয়েছিল। পিশাচখণ্ডীর দেহ পুঁতে রাখা হল সেই সদ্য খোঁড়া দিঘির মাটিতে। পিশাচখণ্ডীর ধড় দীঘিতে পুঁতে রাখার পরদিনই কোনও এক অলৌকিক মন্ত্রবলে সেই দিঘি জলে ভরে উঠল। শুধু দেবলরাজা আর সুবুদ্ধিমিশ্র ভুললেন না কোন শর্তের বিনিময়ে পিশাচখণ্ডী তার নিজের জীবন বলিদান দিয়েছে।’

আমাদের পরের আলোচনাটা হচ্ছিল ট্রেনে করে দেবগ্রামে ফিরে যাওয়ার সময়। সচরাচর এই শহরতলির ট্রেনগুলো একদম ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই ট্রেনটা ছিল একদম ফাঁকা।

‘বইটা বলছে, দেবী বলাকামুখী ছিলেন সর্বার্থসিদ্ধি দেবী, এবং তাঁর উপাসনায় সিদ্ধিপ্রাপ্তি ঘটত অস্বাভাবিক দ্রুততায়। দেবীর নামই ছিল ব্রহ্মাস্ত্রস্বরূপিণী। তাই দেবীর মন্দির ছিল দেবলগড়ের সবচেয়ে পবিত্র, সুরক্ষিত স্থান। এখানে স্বয়ং রাজাকেও পুজো করতে আসার আগে প্রধান পুরোহিতের অনুমতি নিতে হতো। আর সেই মন্দিরে সুবুদ্ধিমিশ্রর উত্তরপুরুষরাই বংশপরম্পরায় প্রধান পুরোহিতের কর্তব্য পালন করে এসেছেন। এত গোপনীয়তার মধ্যে, সম্পূর্ণ পবিত্রতার সঙ্গে দেবীর পূজার্চনা করা হতো বলেই নাকি এক হাজার বছরের উপর দেবলরাজার বংশধরদের রাজত্ব টিকেছিল। যতবার বাইরের শত্রুর আক্রমণ ঘটেছে, ততবার রাজা দেবীর পুজো করে যুদ্ধে গেছেন এবং শত্রুদমন করে ফিরে এসেছেন, কখনও হারেননি।’

জ্যোতিষবাবু প্রশ্ন করল, ‘মানে বলছেন দেবলগড়ের রাজারা একমাত্র বাইরের শত্রু আক্রমণ করলে তবেই যুদ্ধে যেতেন? নিজেরা আগ বাড়িয়ে কখনও কাউকে আক্রমণ করেননি?’

জ্যোতিষবাবুর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন দেবব্রত লাহা, ‘আপনি তো জানেনই, যে সাধুর থেকে জাদু পাথর হাতসাফাই করে দেবল একজন সাধারণ কুমোর থেকে রাজা হয়ে বসেছিলেন, সেই সাধু বলে গেছিলেন যদি কখনও দেবলরাজার কোনও বংশধর সেই পাথরের দুর্ব্যবহার করে তবে সেই দণ্ডেই তার রাজত্ব ছারেখারে যাবে। তাই দেবলরাজার বংশধররা নিজেরা আক্রান্ত না হলে আগ বাড়িয়ে কাউকে আক্রমণ করতে যেতেন না৷ আর আক্রান্ত হলেই সর্বার্থসিদ্ধি দেবী বলাকিনীর আশীর্বাদ নিতেন।

‘কিন্তু এই নিয়মের বাইরে গিয়ে মস্ত বড় অন্যায় করেছিলেন বিক্রমরাজ। তিনি এমন একটি মস্ত অন্যায় করেন…’

বলতে বলতেই ট্রেনটা অকস্মাৎ একটা মস্ত ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। এমন চমকে গেলাম যে সিট থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম প্রায়। এ কী? আজ অবধি তো কখনও এভাবে কোনও লোকাল ট্রেনকে এমন সাংঘাতিক ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যেতে দেখিনি। কোনও বিপদ হল নাকি?

আশেপাশের কামরা থেকে আতঙ্কিত কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছিল। একটু সামলে নিয়েই প্রফেসর লাহা দ্রুত উঠে কামরার দরজার কাছে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। চারিদিকে চেয়ে বুঝলাম গাড়িটা দেবগ্রাম স্টেশনের ঠিক আগের হল্টে দাঁড়িয়ে পড়েছে, আর ঠিক তখনই আমাদের চমকে দিয়ে পুরো কামরার লাইট অফ হয়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যে আমার বুকটা যেন একটা দড়ি ছেঁড়া লিফটের মতো সাঁই সাঁই করে নেমে গেল কোন এক কয়লা খাদানের অতল অন্ধকারে। চারিদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, দু’পাশের ঘন জঙ্গল, আর জঙ্গলের বুক চিরে যাওয়া এই রেললাইনের ওপর আদিম বৃদ্ধ অজগরের মতো নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে আছে লালগোলা লোকাল।

আর ওপরে ছেয়ে আছে বৈশাখী রাত্রির আকাশ। মুখ বাড়িয়ে মাথা তুললাম। দেখলাম অশ্লেষা নক্ষত্রমণ্ডলী কুণ্ডলীকৃত সাপের মতো কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। মনে পড়ে গেল, আজও শুক্লপক্ষের অষ্টমী। আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে এমন দিনেই জাগিয়ে তোলা হয়েছিল দেবী বলাকামুখীকে।

প্রফেসর লাহা চাপাস্বরে বললেন, ‘আশ্চর্য কাণ্ড! এইভাবে তো ইএমইউ লোকালের থেমে যাওয়ার কথা নয়৷ আমার মনে হচ্ছে, কোথাও একটা বড় গন্ডগোল আছে। আসুন, নেমে পড়ে বাকি রাস্তাটা হেঁটেই যাওয়া যাক।’

তিনজনে নেমে পড়লাম। রেললাইন পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। লক্ষ্য করলাম, আরও অনেকে ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছে। টর্চ ছাড়া পাথুরে রেললাইন ধরে হাঁটা খুবই বিপজ্জনক। তাই আমরা পাশের জমিতে নেমে পড়লাম।

একটু পর লক্ষ করলাম পথটা যেন রেললাইন থেকে সরে অন্য দিকে যাচ্ছে। জ্যোতিষ বাগল ভয় পাওয়া সুরে বললেন, ‘এ কী, আমরা যাচ্ছি কোথায়?’

দেবব্রত লাহা আশ্বাসের সুরে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। এটা পায়ে চলা পথ। মানে এই রাস্তা দিয়ে লোকের যাতায়াত আছে। মনে হয় কাছেই কোনও গ্রাম আছে।’

প্রফেসর ঠিকই বলেছিলেন। একটু পরেই একটা ছোট গ্রাম নজরে এল। গ্রাম না বলে অবশ্য পাড়া বলাই ঠিক। ছোট কয়েকটা বেড়া দেওয়া কুঁড়েঘর, আর উঠোনে পোঁতা গাছ। দাওয়ায় টেমি জ্বলছে৷ বোঝা যায়, অবস্থাপন্নদের বাসস্থান নয়।

কোথায় এলাম! ইতিউতি তাকাচ্ছি, এই সময় পেছন থেকে একটা চেনা স্বর, ‘বাবু, আপনি এখানে? রাস্তা ভুল করে চলে এসেছেন বুঝি?’

ঘুরে দেখি, সেই হনুমানের খেলা দেখানো মাদারি। মুখে উজ্জ্বল হাসি। বললাম, ‘আর বোলো না, ট্রেনটা হঠাৎ থেমে গেল। তাই ট্রেন থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছি। এটা কোন জায়গা গো?’

‘এর নাম মণ্ডলপাড়া বাবু, দেবগ্রাম ইস্টিশন এখান থেকে কাছেই। আমি রাস্তা দেখিয়ে দেবখ’ন। ওই আমার বাড়ি। একটু জিরিয়ে নিন না। একটু চা খাবেন বাবু?’

বুঝলাম, বুড়ো এখনও ওই দশ টাকার কৃতজ্ঞতাটা ভোলেনি। হাসিমুখে বললাম, ‘বলছ যখন খাওয়াবে, তখন খাওয়াও।’

বুড়োর ঘরের দাওয়াতে একটা লম্ফ জ্বলছিল। আমরা তিনজনে তার চারিপাশে জুত করে বসলাম। বুড়ো ভেতরে গেল। সেই অবসরে জ্যোতিষ বাগল প্রশ্ন করলেন, ‘বিক্রমরাজ কী পাপকর্ম করেছিলেন সেটা কিন্তু জানা হল না।’

প্রফেসর লাহা আমার কাছ থেকে সিগারেট চেয়ে ধরিয়ে একটা মস্ত টান দিলেন। তারপর ফের শুরু করলেন।

‘আপনারা তো কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা জানেন। জ্যোতিষবাবু পণ্ডিত লোক, তিনি তো জানবেনই। নিবারণবাবুও মনে হয় জানেন।

‘পালসম্রাট কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনের নামে একটি অতি ঘৃণ্য কাজ করেছিলেন। তিনি টাকা ও জমির লোভ দেখিয়ে চোদ্দোজন ছোট-বড় সামন্তকে রাজি করিয়েছিলেন কৈবর্ত রাজধানী রামাবতী আক্রমণের জন্য। ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়ে নিজের দেশের প্রজাদের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্মম পরিকল্পনা আর কী।

‘যখন রামাবতী আক্রমণের পরিকল্পনা চলছে, তখন সম্রাট রামপাল দেবগ্রাম আসেন বিক্রমরাজের সঙ্গে দেখা করতে। সোজা কথায় বলতে গেলে, ডিল ফাইনাল করতে। আর এখানে এসেই তিনি এই সর্বার্থসিদ্ধি, ব্রহ্মাস্ত্রস্বরূপিণী দেবী বলাকিনীর কথা শোনেন। আর তখনই তিনি বিক্রমরাজের কাছে এক অন্যায় দাবি করে বসলেন।’

‘আস্তে আস্তে ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছিল। জিগ্যেস করলাম, ‘কী সেই অন্যায় দাবি? কৈবর্ত দমনের জন্য দেবী বলাকামুখীর আশীর্বাদ নেওয়া?’

‘দেবব্রত লাহা বিষণ্ণমুখে মাথা নাড়লেন, ‘ঠিক তাই। বলা বাহুল্য, বিক্রমরাজ প্রথমে এতে রাজি হননি। তারপর রামপাল তাঁকে প্রলোভনে ফেলার জন্য বিপুল পরিমাণে বাড়তি অর্থ আর জমি কবুল করালেন। এর সঙ্গে অনেক পীড়াপীড়ি, লোভ দেখানো। শেষ পর্যন্ত এসবের পর বিক্রমরাজ রাজি হয়ে যান।

‘এ বই বলছে, তিনি দেবী বলাকিনীকে তাঁর মন্দির থেকে উৎখাত করে নিয়ে গেছিলেন বারেন্দ্রীতে, করতোয়া আর গঙ্গার সঙ্গমস্থলে, যেখান থেকে রাজা রামপাল তাঁর ভাড়া করা সামন্ত আর সৈন্যদের নিয়ে রামাবতী আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন।

‘সেখানেই এক বৈশাখী শুক্লাষ্টমী তিথিতে মহাধুমধামের সঙ্গে দেবীর পুজো হল। বিক্রমরাজ সমস্ত তান্ত্রিক আচার মেনে দেবীর কাছে শত্রুনিপাতের বর চাইলেন। আর বইতে বলছে, তারপরেই রামপাল তাঁর ভাড়া করা সামন্তবাহিনী নিয়ে কৈবর্ত রাজধানী আক্রমণ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

দেবীর আশীর্বাদে পালসম্রাট রামপাল কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনে সফল হলেন। বিদ্রোহীদের নেতা ভীমকে পরাস্ত করে, তার চোখের সামনে পুরো পরিবারকে কচুকাটা করা হয়। শিশু, বৃদ্ধ, নারী কেউ রেহাই পায়নি।’

জ্যোতিষ বাগল মুখ কুঁচকে বললেন, ‘তার মানে দেবলরাজার উত্তরসূরিরা স্রেফ টাকা আর জমির লোভে ইষ্টদেবীর আশীর্বাদ বেচে দিয়েছিলেন?’

‘একদম তাই। এই সেই মহাপাপ, যার জন্য সাধুর সতর্কবাণী ফলে গেল। বিক্রমরাজ রাজ্যে ফিরে আসার পরদিনই সাধুর পোষা বকপাখিটি বকরাক্ষসের রূপে এক হাজার বছর পরে ফিরে এসে তাঁর রাজ্য এক রাতের মধ্যে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।’

আমার মাথায় একটা খটকা লাগল। আচ্ছা, শিপ্রাকাকিমা যে বলেছিলেন, এই বইটা প্রফেসর লাহা নাকি কখনও হাতে নেননি। কিন্তু আজ আমি বইটা ওঁর হাতে দেওয়ার পর ওঁকে বইটা টানা পড়তে দেখিনি। তাহলে উনি বইতে লেখা এই কাহিনিগুলো জানলেন কী করে?

ভাবনায় বাধা পড়ল। কারণ ঠিক তখনই মাদারিবুড়ো ফিরে এল, তার পেছন পেছন একটি বাচ্চা মেয়ে, বয়েস বছর তেরো-চোদ্দো হবে। তার হাতে একটা ভাঙা এনামেলের থালায় তিনটে বাঁকাচোরা ধোঁয়া ওঠা স্টিলের গ্লাস। বুঝলাম এই তার লক্ষ্মী মেয়ে সাকিনা, যে অবুঝের মতো বাপের কাছে বেলের মোরব্বা খেতে চেয়ে তাকে বিপদে ফেলেছিল।

বুড়ো তার হাত থেকে থালাটা নিয়ে আমাদের সামনে রেখে মেয়েকে বলল, ‘বাবুদের সেলাম করো মা, ওনাদের দয়াতেই…’

বুড়োকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘আহ কাকা, এই দুনিয়ায় কে কাকে দয়া করে বলো তো? দয়া করার মালিক এক ওই ওপরওয়ালা। তিনি খেতে দেন বলে আমরা খেতে পাই। যা হয় সব তাঁর ইচ্ছেয়। আমরা দয়া করার কে?’

বুড়ো শুনে যা খুশি হল, সে বলার নয়। তার মুখে তখন, ‘খোদা মেহেরবান’, ‘উপরওয়ালার বরকত’, ‘আল্লা আপনাদের জন্নত নসিব করুন’ পরপর বলে গেল। সাকিনা ঘরের মধ্যে ফিরে গেল।

জ্যোতিষ বাগল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘অনেকটা বোঝা গেল। কিন্তু একটা কথা ক্লিয়ার হল না কিন্তু।’

‘কোন কথাটা?’

‘ওই যে বললেন না, পিশাচখণ্ডী না কী কোন একটা বিশেষ শর্তের বিনিময়ে তার নিজের জীবন বলিদান দিয়েছিল? সেই শর্তটা কী ছিল শুনি?’

‘হ্যাঁ, ঠিক। সেটা অত্যন্ত জটিল আর আশ্চর্য শর্ত। আমার মনে হয়, সেটা বুঝতে পারলেই যা যা ঘটছে…’

বলতে বলতেই থেমে গিয়ে সোজা হয়ে বসলেন দেবব্রত লাহা৷ সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। প্রফেসর লাহা ভয় পাওয়া স্বরে ফিসফিস করে বললেন, ‘এসেছে, ও এসেছে…’

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একটা বমি উঠে আসা আঁশটে গন্ধ ঘিরে ফেলেছে পুরো জায়গাটা। সে গন্ধ যেমন বুনো, তেমনই উগ্র। তার সঙ্গে চারিদিকে একটা ভয় ধরানো, ঝিম ধরানো অবস্থা! মনে হল হাত-পা যেন অসাড় হয়ে আসছে… দেবী বলাকিনীর মন্দিরে যাওয়ার সময় যেমন হয়েছিল… আমরা চাইলেও হাত পা নাড়াতে পারছি না… ঘুম… যেন এক গহীন কালঘুম…

কিন্তু তখনই বুড়োর বাড়ির পেছন দিক থেকে শোনা গেল একটা হনুমানের মৃত্যুচিৎকার। অমন বীভৎস চিৎকার আমি আগে শুনিনি। মুহূর্তে আমাদের চটকা ভেঙে গেছে। বুড়ো দাওয়া থেকে লাফিয়ে নেমে দৌড় দিল বাড়ির পেছন দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও।

আমাদের পৌঁছতে বোধহয় কিছু দেরি হয়েছিল। গিয়ে দেখি বুড়ো মাটিতে বসে থরথর করে কাঁপছে।

তার সামনে পড়ে আছে ওর পোষা হনুমানের দেহটা। তার মাথাটা নেই…!

সেই দৃশ্যের বীভৎসতা দেখে আমরা তিনজনেই স্থাণু হয়ে গেলাম। আর মাথার মধ্যে টিক টিক করতে থাকা অস্বস্তিটা এবার বহুগুণ বেড়ে উঠল। সাপ, বেজি, শিয়াল আর এবার হনুমান। এদের মাথা দিয়ে কী হয়, কী হয়?

আমার চটকা ভাঙল কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দে। তাকিয়ে দেখি, সাকিনাও দৌড়ে এসেছিল সেই চিৎকার শুনে। এই ভয়ানক দৃশ্য নিতে পারেনি মেয়েটা। অজ্ঞান হয়ে বাপের পাশেই পড়ে গেছে সে। মেয়েকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল বুড়ো মাদারি।

দেবব্রত লাহা মুখটা উঁচু করে কী যেন শুঁকলেন। তারপর চাপা উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘ডাক এসেছে, ডাক এসেছে… জ্যোতিষবাবু, নিবারণবাবু… ডাক শুনতে পাচ্ছেন?’

জ্যোতিষ বাগল অল্প ভয় পাওয়া গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘কীসের ডাক, কার ডাক প্রফেসর লাহা?’

‘দেবলগড়ের ডাক এসেছে। আজ সেই রাত৷ আজই সেই রাত!… যেতে হবে, যেতে হবে আমাকে!’ ছটফট করে উঠলেন প্রফেসর লাহা, ‘আমাকে যেতে হবে, এক্ষুনি যেতে হবে… নইলে সব ছারেখারে যাবে। জ্যোতিষবাবু, নিবারণবাবু, আপনারা গ্রামের দিকে এগোন। আমাকে যেতেই হবে।’

বলেই দ্রুত বাড়ির পেছনে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা বাধা দেওয়ার সময় পেলাম না।

ততক্ষণে লোকজন জমতে শুরু করে দিয়েছিল৷ তাদেরই একজনকে জিগ্যেস করে অতি দ্রুত গাংনাপুরের রাস্তা ধরলাম। দৌড়তে দৌড়তে হাঁফাচ্ছিলেন জ্যোতিষবাবু। সেই অবস্থাতেই তিনি বললেন, ‘আপনি রাজবাড়িতে যান নিবারণবাবু। আমি থানায় যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আজ রাত্রেই কিছু একটা ঘটবে, সাংঘাতিক কিছু। উই নিড টু স্টপ দিস।’

দৌড়তে আমারও কষ্ট হচ্ছিল। তার মধ্যেই জিগ্যেস করলাম, ‘কী হবে জ্যোতিষবাবু? কী করে আটকাব সেটা?’

‘কী হবে, সেটা জানি না। তবে অত্যন্ত খারাপ কিছু, সব কিছু জ্বালিয়ে দিতে পারে এমন কিছু ঘটবে। আর তাকে আটকানোর একটাই উপায়, আজ রাতে আমাদের দেবলরাজার গড়ে যেতেই হবে, যে করেই হোক।’

রাজবাড়িতে ঢুকে কার্তিকের মা’কে উত্তেজিতস্বরে জিগ্যেস করলাম, ‘শিপ্রাকাকিমা, মানে রানিমা কোথায়?’

কার্তিকের মা বলল, ‘রানিমা বিশ্রাম করছেন৷ দেখা করবেন?’

আমি সিঁড়ি দিয়ে প্রায় লাফিয়ে লাগিয়ে উঠতে শুরু করলাম দোতলার দিকে। কার্তিকের মা হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল আমার দিকে। কিন্তু আমার তখন সময় নেই।

কাকিমা বিছানার হেডরেস্টে দুটো বালিশে হেলান দিয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিলেন। আমাকে ওভাবে ঢুকতে দেখে উঠে বসে বললেন, ‘কী ব্যাপার নিবারণ? এত উত্তেজিত কেন?’

আমি সরাসরি বললাম, ‘পিশাচখণ্ডী কী শর্ত দিয়েছিল তার প্রাণের বিনিময়ে?’

কাকিমা আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘বোসো। উনি কোথায়?’

উনি বলতে কার কথা বলা হচ্ছে, বুঝতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না। বললাম, ‘একাই গেছেন বকরাক্ষসের জঙ্গলে। জানি না কেন। বলছিলেন কাকে যেন আটকাতে হবে, এখনি। আর আজই সেই রাত। কী হচ্ছে কাকিমা? কী হতে চলেছে আজ রাতে? কাকে আটকাতে এত রাতে ওই জঙ্গলের মধ্যে ছুটে গেলেন প্রফেসর লাহা?’

ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা হয়ে বসলেন কাকিমা। তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলেন, ‘সে কী! আমি যে পইপই করে বারণ করেছিলাম আজ রাতে ওখানে না যেতে? লোকটা শুনল না আমার কথা? এত করে বলা সত্ত্বেও শুনল না?’

আজ অবধি যা করিনি, তাই করে বসলাম। কাকিমার পা-দুটো জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘কাকিমা, আমি জানি এখানে যা ঘটছে, সে রহস্যের অনেকটাই আপনি জানেন। বলুন, কী শর্ত দিয়েছিল পিশাচখণ্ডী?’

শিপ্রাকাকিমাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁর মনের মধ্যে তখন ঝড় বইছে। বললেন, ‘হ্যাঁ বাবা, এখন আমাকে বলতেই হবে। বড় দেরি হয়ে গেল। আগেই বোধহয় তোমাকে সব কথা খুলে বলা দরকার ছিল।

‘পিশাচখণ্ডী তার আত্মবলিদানের বিনিময়ে দেবীর কাছে একটি বিশেষ বর চেয়ে নিয়েছিল। যদি কখনও কারও অনাচারে এই রাজ্য ধ্বংস হয়, তাহলেও দেবলরাজ, সুবুদ্ধিমিশ্র এবং তার, এই তিনজনের বংশধারা যেন লোপ না পায়। দেবী নাকি তাতে সম্মত হন। সঙ্গে সঙ্গে একটি অতি কঠিন শর্ত দিয়েছিলেন। শর্ত হচ্ছে যদি কখনও এই রাজ্য ছারেখারে যায়, তাহলে দেবী তৎক্ষণাৎ এই রাজ্য ত্যাগ করবেন, শুধু তাঁর মূর্তিটি পড়ে থাকবে মন্দিরে। তিনি ঠিক এক হাজার বছর অপেক্ষা করবেন মন্দিরে ফিরে আসার জন্য। ততদিন এই জঙ্গল অভিশপ্ত হয়ে থাকবে আর পিশাচখণ্ডীর কবন্ধ দেহ বকরাক্ষস হয়ে রক্ষা করবে তাকে।’

‘অভিশপ্ত বলতে?’

‘এই অরণ্য মায়া-অরণ্য। ক্ষণে ক্ষণে এর দিক, রূপ, প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়। যে বিনা অনুমতিতে এই জঙ্গলে প্রবেশের চেষ্টা করবে, হয় সে উন্মাদ হয়ে যাবে, নইলে তার খোঁজ পাওয়া যাবে না। এই জঙ্গলের ভুলভুলাইতে ঘুরে ঘুরে মরবে সে।’

মুহূর্তের মধ্যে আমার স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু একটা খটকা তখনও পরিষ্কার হল না।

‘অনুমতি? ওই জঙ্গলে প্রবেশের জন্য কার অনুমতির প্রয়োজন কাকিমা?’

‘দেবলরাজা, সুবুদ্ধিমিশ্র আর পিশাচখণ্ডী, একমাত্র এই তিনজনের উত্তরাধিকারীই ওই জঙ্গলে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারেন। নইলে ওখানে প্রবেশ করে ফিরে আসা অসম্ভব।’

‘কিন্তু কাকিমা, সেদিন যে আমরা সবাই মিলে গেছিলাম ওই জঙ্গলে…’

কাকিমা আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘কারণ সেদিন তোমাদের সঙ্গে একজন নয়, অন্তত দুজন এমন মানুষ ছিলেন, যাদের কাছে ওই অরণ্যে প্রবেশের অনুমতি ছিল।’

কথাটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, ‘তার মানে… তার মানে… আমাদের মধ্যে এমন দুজন আছেন যাঁরা ওই তিনজনের কারো না কারো বংশধর?’

‘হ্যাঁ। যে রাতে দেবলগড় ধ্বংস হয়, সেই রাতে বিক্রমরাজ আর তাঁর মন্ত্রীর দুই সন্তান রাজ্যের বাইরে ছিলেন। আর পিশাচখণ্ডীর উত্তরাধিকারী তো এমনিতেই ভিনদেশের বাসিন্দা ছিল। তাই তাঁরা তিনজনেই বেঁচে যান।’

‘কোথা থেকে এসেছিল পিশাচখণ্ডী?’

‘বইতে লেখা আছে বারেন্দ্রভূমির পূর্ব দিক থেকে। গ্রামের নাম বটগোহালী, এখন বাংলাদেশের মধ্যে, বর্তমান নাম নওগাঁ।’

এই নামটা সদ্য কোথায় যেন শুনেছি। কোথায় যেন? কোথায়? উত্তেজনার মধ্যে কিছুতেই মনে পড়ল না। অথচ মনে পড়লে…

চিন্তাটা ক্ষণিকের মধ্যে মাথা থেকে মুছে গেল, কারণ তখন আমার মনে প্রশ্নের ঝড় উঠেছে৷ প্রশ্ন করলাম, ‘কিন্তু তাঁদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কোন দুজন এখন আমাদের মধ্যে আছেন কাকিমা?’

কাকিমা ধীরে ধীরে বললেন, ‘বলব বাবা, সব বলব তোমাকে৷ একটু ধৈর্য ধরো। আগে শোনো এই সঙ্কট থেকে মুক্তির উপায় কী।

‘দেবীর আদেশ ছিল, ওই হাজার বছরের মধ্যে এই তিনজনকে একত্র হয়ে দেবীকে আবার বিধিমতে তাঁর আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর তাঁকে প্রথমবার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা হয়েছিল, ঠিক তার পুনরাবৃত্তি করতে হবে। অর্থাৎ বিধিমতো প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর পিশাচখণ্ডীর উত্তরাধিকারীকে বলি দিয়ে তার দেহটি ঝিলের জলে ডুবিয়ে রাখতে হবে।’

‘আর যদি তা না হয়?’

‘দেবলরাজার গড় ধ্বংস হওয়ার ঠিক এক হাজার বছর পর দেবীর ঝিল থেকে উঠে আসবে পিশাচখণ্ডীর কবন্ধ। উঠে আসবে তার এক হাজার বছরের খিদে নিয়ে। উঠে আসবে রক্ত, মাংস আর চোখের খোঁজে। আর যদি দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে পিশাচখণ্ডী ফিরে পাবে তার দৃষ্টি। তখন এই জনপদ ধ্বংস করবে সে। মানুষ-পশু-পাখি কেউ বাঁচবে না। কিচ্ছু বাঁচবে না। তাকে ঠেকানোর চেষ্টা বৃথা। সে অজেয়, অবধ্য।’

হৃৎপিণ্ডটা মেলট্রেনের মতো দৌড়চ্ছিল। জিগ্যেস করলাম, ‘কিন্তু কাকিমা, কবন্ধপিশাচ শুধু চোখ নিয়ে কী করবে? দেখার জন্য তো একটা মাথা চাই…’

কথাটা বলতে বলতেই স্থির হয়ে গেলাম। যে অস্বস্তিটা আমার মাথার মধ্যে প্রতিটা মুণ্ডহীন প্রাণীর দেহ দেখার পর বিব্রত করছিল, কে যেন তার উত্তরটা ফিসফিস করে আমার কানে বলে যেতে লাগল… সাপ, বেজি, শিয়াল, হনুমান… তারপর… তারপর…

কাকিমা আমার অসমাপ্ত প্রশ্নটা শুনে অতি ধীরস্বরে বলা শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, তার জন্য একটা মাথা চাই। একটা মাথা। দেবী বলেছিলেন পাঁচটি প্রাণীর মাথা একত্র করে একটি আসনে বসে সাধনা করার কথা। আর সেই পাঁচটি প্রাণী হচ্ছে…’

অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘সাপ, বেজি, শিয়াল, হনুমান… আর… আর…’

কাকিমা অস্ফুটে বললেন, ‘আর মানুষ। একজন মানুষের মাথা, একজন চণ্ডালের মাথা। আর এই পাঁচটি মুণ্ড নিয়ে তৈরি হয় একটি মহাতন্ত্রসিদ্ধ আসন, পঞ্চমুন্ডির আসন…’

কাকিমা এই শেষ কথাটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করেই যেন মাথার মধ্যে কী একটা হয়ে গেল। কাকচক্ষু নিজের ইচ্ছে ছাড়া উন্মীলিত হয় না। কিন্তু বুঝতে পারলাম এই মুহূর্তে আমার ইচ্ছা ছাড়াই আমার কাকচক্ষু খুলে যাচ্ছে…

আমি দেখতে পেলাম, একটি ছোট মেয়ে গম্ভীরমুখে বেণি দুলিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। সহপাঠীরা তো বটেই, স্কুলের শিক্ষকরা অবধি সম্ভ্রম করে কথা বলেন তার সঙ্গে। তারপর কলেজ। মেয়েটি আরও ব্যক্তিত্বময়ী হয়ে উঠেছে। কলেজের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে আসছে এক সুদর্শন তরুণ, তার ধাক্কা লাগল উঠতে থাকা সেই মেয়েটির সঙ্গে।

তারপর তাদের আলাপ… আলাপ হল কলেজ ক্যান্টিনে… ধোঁয়া ওঠা কফি… কলেজ স্ট্রিট… বইমেলা… হাতে হাত রেখে হাঁটা… বৃষ্টির দিনে গঙ্গার ধার… নৌকো… আর তার মধ্যে থরকম্পিত চুম্বন…

দেখতে দেখতে ঘামছি আমি। ওই তরুণীকে তো বটেই… তরুণকেও বিলক্ষণ চিনি। প্রফেসর লাহার মুখ আর শরীরের আদল একই রয়ে গেছে প্রায়। মনে হচ্ছিল যেন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এক নিষিদ্ধ সিনেমা অভিনীত হয়ে চলেছে আমার চোখের সামনে। চাইলেও চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছি না।

কাকিমার স্বর ভেসে এল, ‘ওই পাঁচটি মাথা দিয়েই তৈরি হয় পঞ্চমুন্ডির আসন। দেবী বলাকিনীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য সুবুদ্ধিমিশ্র পঞ্চমুন্ডির আসন পেতেছিলেন। আর তার মানুষের মাথাটি ছিল পিশাচখণ্ডীর।’

কথাগুলো আমি শুনছিলাম, আবার শুনছিলামও না। তখন আমার চোখের সামনে দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল। দুটি তরুণ-তরুণী এই রাজবাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরছে… মাঝে গোপন চুম্বন… বইঘর… দেবব্রত লাহা আঁতিপাঁতি কী যেন খুঁজছেন… পাচ্ছেন না… শিপ্রাকাকিমার সঙ্গে তর্কাতর্কি… তারপর সব কিছু যেন শূন্যে মিলিয়ে গেল।

শিপ্রাকাকিমার শেষ কথাটা শুনে কে যেন আমার চোখের সামনে একটা পর্দা এক টানে ছিঁড়ে ফেলল। রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করলাম, ‘তার মানে আজ অবধি যা যা ঘটছে, তা কেন ঘটছে আপনি সবই জানতেন?’

‘হ্যাঁ নিবারণ। আমি জানতাম যা ঘটছে তা বিধিনির্দিষ্ট। ঘটবারই ছিল। কিন্তু আমি কী করতাম বলো? হাজার বছরের পুরোনো কবন্ধপ্রেত নিষিদ্ধ জঙ্গলের ঝিল থেকে উঠে এসে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে বললে কেউ কি বিশ্বাস করত আমাকে?’

‘তাই কি আপনি চিঠি দিয়ে আমাকে এখানে ডেকে আনলেন?’

আবার দৃশ্যাবলি ফুটে উঠল আমার চোখের সামনে। বিয়ের পর বাপের বাড়ি এসেছেন কাকিমা… ট্রেনে করে কোথায় যেন যাচ্ছেন… একটা ছোট ফ্ল্যাট… দেবব্রতবাবুর বুকে মাথা রেখে কাঁদছেন কাকিমা… তারপর দুটো শরীর মিশে গেল বিছানার আদিম অন্ধকারে।

অসম্ভব মনের জোরে কাকচক্ষু সংবৃত করলাম আমি। সব কিছু দেখা ঠিক নয়, উচিত নয়।

‘হ্যাঁ নিবারণ, তুমি না এলে এটা… এটা এইভাবে প্রকাশ্যে আনা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।’

উঠে দাঁড়ালাম। আজই বৈশাখী শুক্লাষ্টমী। অর্থাৎ আজই সেই দিন! আমি জানি আজ দেবব্রত লাহা দেবী বলাকিনীর মূর্তি নিয়ে দেবলরাজার গড়ে ওই মন্দিরে গেছেন। আমি জানি, আমাকেও যেতে হবে। পিশাচখণ্ডীর উত্তরাধিকারী কে জানি না। সুবুদ্ধিমিশ্র’র উত্তরাধিকারী কে, জানি না। শুধু বুকের মধ্যে কে যেন ডাক দিয়েছে, যেতে হবে, যেতে হবে। অমোঘ, অটল সেই আহ্বান।

চলে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘আমি যাচ্ছি কাকিমা। আজ একাই ঢুকব জঙ্গলে। কারও অনুমতি না নিয়ে। জানি না কী হবে…’

কাকিমা শান্তস্বরে বললেন, ‘তোমাকে একা যেতে হবে না বাবা। আমিও তো মা। তোমাকে একা বিপদের মুখে ঠেলে দিই কী করে? জয়ন্তকে নিয়ে যাও বাবা। ওই-ই তোমার অনুমতি।’

কাকিমার শেষ কথাটা বুঝলাম না। তাকিয়ে রইলাম ওঁর দিকে। কাকিমা শূন্যদৃষ্টিতে বললেন, ‘প্রফেসর দেবব্রত লাহা, ওরফে দেবল হচ্ছেন বিক্রমরাজের সেই বেঁচে যাওয়া সন্তানের উত্তরসূরি। আর… আর… জয়ন্ত ওঁরই ছেলে…’

অন্ধের মতো জঙ্গলের মধ্যে হাঁটছিলাম আমরা। জয়ন্তর হাতে একটা বড় টর্চ, যদিও তার আলোতে অন্ধকার হটে যাওয়ার বদলে আরও গাঢ় হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল আমাদের ওপর। তবুও তার মধ্যেই আন্দাজ করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

জয়ন্তকে দেখে মনে হচ্ছিল, ও যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। ও যেন জানে, কোন পথ ধরে গেলে দেবলরাজার গড়ে পৌঁছব। যেতে যেতে একবার আমাকে ফিসফিস করে বলল, ‘ডাক শুনতে পাচ্ছিস নিবারণ?’

হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছিলাম আমি। বুকের ভেতর কে যেন ক্রমাগত একটানা ডেকে চলেছে, ‘ওরে আয় আয় আয়।’ সে ডাক এতই অমোঘ, এতই দুর্নিবার, অপ্রতিরোধ্য যে তাকে অগ্রাহ্য করার শক্তি কারও নেই।

আমাদের পিছনে পিছনে নিঃশব্দে হেঁটে আসছিলেন জ্যোতিষ বাগল, ওসমান আলি এবং আরও দুজন। ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন জঙ্গলে ঢোকার ঠিক মুখে, দেবীর থানের বটগাছটার সামনে। দুজন অচেনা লোকের একজনকে দেখে চিনতে পারলাম। গণেশ পাখিরা, যে রমেন সাঁতরার সর্পোদ্যান দেখাশোনা করে। আরেকজন বোধহয় বাবলু সাঁতরা, রমেন সাঁতরার ছেলে।

ওসমান আলি শুকনোমুখে বললেন, ‘আমার মন বলছিল, আপনারা আসবেন। আপনাদের ছাড়া এত রাতে এই জঙ্গলে ঢোকার সাহস পাচ্ছিলাম না। ইতিমধ্যে আরও একটা কাণ্ড ঘটেছে।’

প্রশ্ন করলাম, ‘কী হয়েছে?’

‘রমেন সাঁতরার সাপের খাঁচা থেকে সবক’টি সাপ একসঙ্গে উধাও। কী করে হল, কিছু বুঝতে পারছি না। গণেশ বলছে ওরা সব জঙ্গলের দিকে…’

গণেশ কী বলছে, সেটা পুরোটা শোনা হল না। কারণ বাবলু সাঁতরা জয়ন্তকে দেখে বললেন, ‘জয়ন্ত, এই জয়ন্ত! আমি বাবলু। চিনতে পারছিস না?’

জয়ন্তকে দেখে মনে হল ও যেন কথাটা শুনতেই পেল না। সোজা এগিয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে। আমরা ওর পিছু নিলাম। জ্যোতিষবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘পীতাম্বরবাবু এলেন না?’

শুনে মনে পড়ল, কাল আমার গলা টিপে ধরার পর থেকে ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। কোথায় গেলেন তিনি? রাজবাড়ির সন্তান প্রায় মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ বংশানুক্রমিক নায়েবমশাইয়ের খোঁজ নেই!

কথাটা মাথায় আসতেই আরও একটা খটকা জেগে উঠল মনের ভেতর। দিন দুয়েক আগে আমি যখন রাতের খাবার খেয়ে দেবীর থানের দিকে আসছিলাম, দেখেছিলাম যে পীতাম্বরবাবুর ঘরে বিজলিবাতির বদলে মোমবাতির আলো জ্বলছে, অথচ এসি কিন্তু বন্ধ ছিল না। ঘরের আলো পাখা বন্ধ করে, মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে কী করছিলেন পীতাম্বরবাবু?

মনের কথা মনেই রয়ে গেল। কারণ ওসমান আলি একবার ফিসফিস করে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো নিবারণবাবু?’

রাতের জঙ্গলের নিবিড় নিস্তব্ধতা ভেদ করে এগিয়ে চলেছিলাম আমরা। উত্তর দেওয়ার বদলে একবার ইশারায় জয়ন্তকে দেখিয়ে দিলাম। আমি জানি, আজ ওই-ই আমাদের কম্পাস। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই জঙ্গল যেন ওর বড় চেনা। অথচ আমি জানি, তা নয়। ওর মাথার মধ্যে জেগে উঠেছে হাজার বছরের, জন্ম-জন্মান্তর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত স্মৃতি। সেই স্মৃতি ওকে নিয়ে যাচ্ছে ওর পিতৃভূমিতে, যেভাবে পরিযায়ী পাখিরা পথের নিশানা চিনে ফিরে আসে নিজের ঘরে।

কিছুক্ষণ পর ডান দিকে সেই ঝিল দেখা দিল। আমরা ধীরে ধীরে তার দিকে এগোলাম, ঠিক প্রথম দিনের মতো। জলের উপরিভাগ পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে। এতটুকু কাঁপন নেই। ঝিলের বুকে নেমে এসেছে অষ্টমীর চাঁদ। বড় নিখুঁত, বড় নিষ্কম্প সেই প্রতিবিম্ব।

নির্মেঘ আকাশ। অতি ধীর মৃদু হাওয়া বইছে। কোনও শব্দ নেই।

ধীরে ধীরে একের পর এক ঝিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমরা ছয়জন। সবাই চুপচাপ, কারও মুখে কোনও কথা নেই। জয়ন্ত নিষ্পলকে জলের দিকে তাকিয়ে ছিল। একটু পর মুখ তুলে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, ‘ঝিলের জলে সাতটা ছায়া কেন?’

আমরা ঝিলের দিকে তাকালাম। দলের একদম শেষে দাঁড়িয়ে ছিল গণেশ। জলে তার দুটো ছায়া পড়ছে!

আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, গণেশের পায়ের কাছের ঝিলের জল যেন সাপের মতো পাকিয়ে উঠে এল ডাঙায়, চেপে ধরল তার পা-দুটো!

ব্যাপারটা এত পলকের মধ্যে ঘটে গেল যে গণেশকে বাঁচাবার কোনও চেষ্টা করার সুযোগ হল না আমাদের। অসহায়চোখে দেখলাম, আছাড়িপিছাড়ি করা গণেশকে জলের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই কালো জলের রশি। তার আর্তচিৎকার রাত্রির নৈঃশব্দ্য ছিন্নভিন্ন করে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে স্থির হয়ে গেছি… আমার পা-দুটো থরথর করে কাঁপছে… গলা শুকনো, বুকের মধ্যে হাপরের শব্দ।

গণেশের আর্তনাদ আর জলের ওপর জেগে ওঠা বুদ্বুদ মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক পর আমাদের ভীত সন্ত্রস্ত চোখের সামনে ঝিলের জলের শান্ত বুকে ঘূর্ণি জাগতে শুরু করল। সেদিন স্বপ্নে যেমনটা দেখেছিলাম, ঠিক তেমনই।

মাথার মধ্যে পাগলাঘণ্টি বাজতে শুরু করল। আমি জয়ন্তকে টানতে টানতে কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। বাকিদের দেখে মনে হচ্ছে, কয়েকটি পাথরের মূর্তি।

ঘূর্ণিটা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল ঝিলের বুক জুড়ে, তার পরেই সেই ঘূর্ণির মধ্যে জেগে উঠল দুটো হাত, চওড়া বুক, লোমশ হাত, প্রাচীন শ্যাওলায় জড়ানো একটা মহাকায় শরীর… শুধু তার মাথাটা নেই!

দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো আর্তচিৎকার করে ওঠার আগেই কানের কাছে কে ফিসফিস করে উঠল, ‘পালাও খোকাবাবু, পালাও। দাঁড়িও না, যেদিকে দু’চোখ যায়, পালাও।’