৮
দুজনে কতক্ষণ ধরে, কোন দিকে দৌড়চ্ছিলাম জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল এই বুঝি পেছন থেকে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে কেউ। কতবার পায়ে পায়ে লতা আর গাছের ডাল জড়িয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি, জানি না। কিন্তু থামিনি।
কিছুক্ষণ পর একটা বড় গাছের গোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে দুজনে জিভ বের করে হাঁফাতে লাগলাম। আর বিন্দুমাত্র দৌড়বার ক্ষমতা অবশিষ্ট নেই। চোখে অন্ধকার দেখছি, ফুসফুসদুটো মনে হচ্ছে ফেটে যাবে।
ধপ করে বসে পড়লাম গাছের গোড়ায়। মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল ধরে এখানেই বসে থাকতে হবে। কারণ শরীর, মাথা, কিছুই আর কাজ করছিল না।
কতক্ষণ… জানি না… চোখ খুলে দেখলাম গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো জয়ন্তর গায়ে এসে পড়েছে। স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম, সে ধ্যানস্থ। চোখদুটি বোজা, হাতদুটো বিশেষ মুদ্রায় আবদ্ধ। বজ্রাসনে বসে আছে।
আশ্চর্য হওয়ার কারণ, জয়ন্তকে আজ অবধি পুজো-আচ্চার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেখিনি! এই মুদ্রা, এই ধ্যানাসন সে শিখল কোথায়?
জয়ন্তর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আবার হঠাৎ করে আমার কাকচক্ষু খুলে গেল, আমার কোনও প্রচেষ্টা ছাড়াই। জয়ন্তর ছোটবেলা, কলকাতা, কলেজ, মুম্বাইবাস, সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠল আমার সামনে। আরও স্পষ্ট, আরও তীব্র, আরও তীক্ষ্ণ, যেন হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁওয়া যাবে।
তার পরে শুরু হল এক অন্য ছবির দল। দেখলাম একজন মানুষ একটা বড় পাথর বুকে ধরে পালাচ্ছে অন্ধকার জঙ্গলের রাস্তা ধরে… তারপর সেই মানুষটি আরও একজনের সঙ্গে আলোচনায় মগ্ন… দ্বিতীয়জনের মুখ বড় চেনা চেনা লাগে… তাদের পরনে প্রাচীনকালের পোশাক…
পরক্ষণে দৃশ্যপট বদলে গেল। দেখলাম একদল শ্রমিক এক মস্ত প্রাসাদ তৈরি করতে ব্যস্ত… প্রাসাদের আদল বড় চেনা… তারপর মন্দির… এই মন্দির আমি দেখেছি গড়ের মধ্যে… দেবী বলাকামুখীর মূর্তি তৈরি হচ্ছে প্রথম মানুষটির নিয়ে আসা পাথর কুঁদে… পুজো হচ্ছে… প্রাণপ্রতিষ্ঠা হচ্ছে দেবীর… চেনা চেনা মুখের দ্বিতীয় মানুষটি পূজার আসনে… এক অতি দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ পুরুষ প্রণাম করে যূপকাষ্টে নিজের মাথা রাখলেন। ইনিই পিশাচখণ্ডী তবে! তাঁর পাশে যিনি বলির খড়্গ নিয়ে প্রস্তুত, তিনি দেবলরাজ স্বয়ং… বলির খাঁড়া সবেগে নেমে এল পিশাচখণ্ডীর ঘাড়ে… আর সেই রক্ত যেন ছিটকে এসে লাগল আমার কাকচক্ষুতে।
চোখ খুললাম আমি। বুকের মধ্যে একটা অবিশ্বাস আর ভয়ের ভাব ছড়িয়ে পড়ল। এ কী দেখলাম আমি? শুধু জয়ন্ত নয়, ওর সমস্ত পূর্বপুরুষদের অতীত খুলে গেছে আমার কাকচক্ষুর সামনে! কিন্তু মনা মাঝি তো এ বিদ্যা আমাকে শেখায়নি। এই অবিশ্বাস্য দৈবী ক্ষমতা আমার মধ্যে জন্মাল কী করে?
চারিদিকে তাকালাম। নিস্তব্ধ অরণ্য। জয়ন্ত একইভাবে বসে। আমি গাছটা ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আর তখনই সরসর শব্দটা কানে এল।
জঙ্গলের মাটিতে তখন অষ্টমীর চাঁদের আলো। সেই আলোয় দেখলাম প্রথমে একটি, তারপর দুটি, তারপর শয়ে শয়ে সাপ চলেছে কোন এক অজানা গন্তব্যের দিকে। আমি গ্রামের ছেলে, সাপ ভালোই চিনি। সভয়ে লক্ষ করলাম, এই ভুজঙ্গকুলের অধিকাংশ সাপই অতি বিষধর, এর একটিও যদি এদিকে ঘুরে আসে, তাহলে আর দেখতে হবে না। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল।
কিন্তু দেখলাম, এই সর্পকুলের আর কোনও দিকে লক্ষ্য্ নেই, আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। দ্রুত এবং নিশ্চিত একাগ্রতার সঙ্গে তারা সমবেতভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে। মনে পড়ল রমেন সাঁতরার সর্পোদ্যানের সব সাপ আজ উধাও হয়ে গেছে খাঁচা থেকে৷ এদের মধ্যে কি তারাও আছে?
শেষ সাপের লেজটুকু অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল জয়ন্ত। আমার দিকে শূন্যচোখে চেয়ে বলল, ‘চল নিবারণ, মা ডাকছেন।’
বললাম, ‘কিন্তু কোন দিকে যাব? অন্ধকারে রাস্তা চিনব কী করে?’
যেদিকে সাপেদের দল চলে গেছে একটু আগে, সেদিকে ডান হাত তুলে তর্জনী নির্দেশ করল জয়ন্ত, ‘ওই দিকে যেতে হবে। তুই ডাক শুনতে পাচ্ছিস না?’
হ্যাঁ, পেলাম। ঠিক তখনই আবার শুনতে পেলাম সেই ডাক। যেন আমার প্রতিটি রক্তকণিকার মধ্য থেকে, নাভিমূল থেকে, ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে শুনতে পাচ্ছি সেই ডাক, ‘আয়, ওরে আয়। কে কোথায় আছিস, মায়ের কাছে আয়…’ মা ডাকছেন… ‘আয় আয় আয়…’
আমরা দুজনে মন্ত্রমুগ্ধ, হাঁটা দিলাম সেদিকে।
