৫
বাবা শ্মশান থেকে ফিরে স্নান করে, নিমপাতা দাঁতে কেটে, লোহা ছুঁয়ে যখন ঘরে ঢুকল, তখন প্রায় আটটা বাজে। সারা ঘোষালবাড়ি প্রায় নিষ্প্রদীপ। তবুও ওই শোকের আবহের মধ্যেই গোপালিমাসি আমাদের খই-দুধ দিয়ে গেল। আমরা সেটা খেয়ে শোওয়ার উদ্যোগ করছি, এমন সময় দরজার কাছে একটা ছায়া পড়ল।
বাবা ধড়মড় করে উঠে বললেন, ‘কিছু বলবেন ছোটবাবু?’
ধরা গলায় ধূর্জটি ঘোষাল বললেন, ‘বাবা চলে গেলেন, আপনাদের ঠিক করে আপ্যায়ন করতে পারলাম না দাদা, মাফ করবেন। আপনি শ্মশানযাত্রী, আপনাকে তো শ্রাদ্ধে আসতে হবেই, সঙ্গে ভাইপোকেও কিন্তু অবশ্যই নিয়ে আসবেন। আর এবারের জন্য সামান্য কিছু প্রণামি।’
এই বলে একটা খাম বাবার দিকে এগিয়ে দিলেন। বাবা বিনা বাক্যব্যয়ে খামটা হাতে নিলেন।
ধূর্জটি ঘোষাল বললেন, ‘চালডাল সবজি এসব আর দিলাম না, নিয়ে যেতে অসুবিধা হবে। কাল সকালে আমাদের একজন আপনাদের বাস স্টপে ছেড়ে দিয়ে আসবে।’
বাবা বোধহয় ঘাড় নুইয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ধূর্জটি ঘোষাল প্রস্থান করলেন।
বাবা চট করে উঠে দরজা বন্ধ করে খাম থেকে নোটগুলো গুনে নিল একবার। তারপর চকচকে মুখে বলল, ‘চ, চ, ঘুমো এবার। যাওয়ার সময় তোর মায়ের জন্য শাড়ি, মাথার তেল, চুলের কাঁটা এসব নিয়ে যেতে হবে। আর তোর জন্য দু-একটা জামা।’
আমি উলটো দিকে ফিরে ঘুমোবার চেষ্টা করলাম। যদিও ঘুম আসছিল না। সন্ধেবেলার ঘটনাটা তখনও আমার শিরদাঁড়ায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল।
.
বাঁশবনের মধ্যে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের চাদর ঘিরে ধরেছিল আমাকে। আর সে কী ঘনঘোর দমবন্ধ করা অন্ধকার! সামনে, ডাইনে বাঁয়ে, পায়ের নীচে, মাথার ওপর, কোথাও এক ইঞ্চিও দৃষ্টি সরছে না, এমনকী নিজের হাত-পা অবধি দেখতে পাচ্ছি না। মনে হল যেন পাতালের আদিম তমসা ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমার ওপর।
আমি অন্ধের মতো দু’পা এগোলাম। আবার সেই ঠান্ডা শিরশিরে হাওয়া বয়ে গেল আমার শরীর ঘিরে। আমি একটু হাত বাড়ালাম। মনে হল যেন সেই চ্যাটচ্যাটে অন্ধকার আঠার মতো জড়িয়ে গেল আমার হাতে।
আরও দু’পা এগোলাম অন্ধের মতো। বুঝলাম সেই হিমশীতল কালো অন্ধকার এবার আমার শ্বাস টেনে ধরেছে৷ আর বাঁশবনের মধ্যে থেকে কে যেন আমাকে নিঝুমসুরে ডাকছে—আয় আয় আয়…
আর আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছি নিজের মধ্যে… আমার হুঁশ নেই, চেতনা নেই, বোধ নেই… শুধু সমস্ত শরীর জুড়ে একটা বন্য উতলা আলোড়ন জেগে উঠছে… যেতে হবে, আমাকে যেতে হবে…
আমি আস্তে আস্তে ওই অন্ধকারের মধ্যে হারিয়েই যেতাম, যদি না নরম কিছু আমার পায়ে ঠেকায় আমার চটকাটা ভেঙে যেত। আমি থমকে গেলাম। তারপর নিচু হয়ে বসলাম। যেখানে পা ঠেকেছিল, সেখানে হাত বুলিয়ে বুঝলাম একটা লোমে ঢাকা শরীর। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। একটা আর্তনাদের মৃদু আওয়াজও কানে এল।
আস্তে আস্তে গলার কাছ অবধি হাত বুলিয়ে বুঝলাম, এটা একটা কুকুর। মস্ত সাইজের কুকুর। এত বড় কুকুর সচরাচর দেখা যায় না।
আমি ছোটবেলা থেকেই কুকুর বড় ভালোবাসি। ওই আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যেও আমার কী মনে হল জানি না, আমি কুকুরটাকে ধরে দাঁড় করাবার চেষ্টা করলাম। মনে হল দমবন্ধ করা অন্ধকারটা যেন একটু আলগা হল। তার সঙ্গে খুব সামান্য হলেও কুকুরটার একটা আবছায়া অবয়ব আমার সামনে ফুটে উঠল।
বুঝলাম, মস্ত নয়, এ প্রকাণ্ড আকারের কুকুর। প্রায় ছোটখাটো বাঘ বললেই চলে। আমাদের এদিকে রাস্তাঘাটে চট করে এইরকম কুকুর দেখা যায় না। তাহলে কি এ বিলিতি কুকুর? কারও পোষা?
ভাবতে ভাবতেই কুকুরটা আরেকবার যন্ত্রণায় অস্ফুটে শব্দ করে উঠল। আমি আস্তে আস্তে চেষ্টা করলাম ওকে জড়িয়ে ধরে বাইরের দিকে টেনে নিয়ে আসার। জানি না, কেন যেন মনে হল আমার যাত্রাপথ থেকে অন্ধকারের চাদর দু’পাশে সরে সরে যাচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে বাঁশবনের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
এখনও মনে আছে, দিনটা ছিল কৃষ্ণা ত্রয়োদশী। ক্ষয়ে যাওয়া নষ্ট চাঁদ আর অগণন নক্ষত্রের ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে আছে গ্রামের পথ জুড়ে। এছাড়া চারিদিক নিস্তব্ধ, নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রদীপ। আমি তার মধ্যেই সেই বিশালদেহী প্রাণীটার দেহের ওপর ঝুঁকে পড়লাম। কী হয়েছে ওর?
একটু পরেই বুঝলাম, কী হয়েছে। ওর ডান পায়ের নীচে একটা ছোট্ট লোহার শলা বিঁধে আছে। কী করে বিঁধল, কে জানে।
আমি অবশ্য সে নিয়ে মাথা ঘামালাম না। ওকে জড়িয়ে ধরে লোহার শলাটা টেনে বার করে নিলাম। কুকুরটার মস্ত শরীরটা একবার থরথর করে কেঁপে উঠেই স্থির হয়ে গেল৷ ভয় পেয়ে গেলাম আমি! ওর আরও বড় কোনও ক্ষতি করে দিলাম না তো?
আমার সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে কুকুরটা উঠে দাঁড়াল। তারপর আকাশের দিকে মুখ করে কী যেন শুঁকে মুখটা নামিয়ে আনল আমার মুখের কাছে। একটু পর টের পেলাম একটা খরখরে জিভ আমার গাল চাটছে।
আমি কুকুরটাকে আদর করতে যাব, এমন সময় ও আকাশের দিকে মুখ করে ডেকে উঠল। বাপ রে, সে কী ডাক! গর্জন বললেই চলে! নেহাত কুকুর ভালোবাসি বলে, নইলে এই অন্ধকার জায়গায় অমন গম্ভীর আর হিংস্র ডাক শুনে আচ্ছা আচ্ছা লোকের নাড়ি ছেড়ে যায়।
কুকুরটা আমার দিকে আরেকবার তাকিয়ে একটু মাথা নিচু করল। তারপর দৌড়তে লাগল গ্রামের সীমানার বাইরে।
আমি আস্তে আস্তে ঘোষালবাড়ি ফিরে এলাম। লোহার শলাটা তখন আমার পকেটে।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দামাল শিশুর মতো চড়া রোদ্দুর ঝাঁপিয়ে পড়ে চোখটা কুঁচকে দিল। উঠে বসে দেখলাম, বেশ বেলা হয়ে গেছে। প্রথমেই মনে হল ইসস, এত বেলা হয়ে গেল, বাবা ডেকে দিল না? তাহলে বাড়ি যাব কখন?
পাশ ফিরে দেখলাম বিছানা ফাঁকা। বাবা নেই৷ বিস্মিত হলাম, লোকটা গেল কোথায়?
ঘরের সঙ্গে লাগোয়া কলঘরে চোখ হাত মুখ ধুয়ে বাইরে এলাম। দেখলাম, ঘোষালবাড়ির উঠোনে মেলা লোক জড়ো হয়েছে। তাদের সবার মুখে চাপা উদ্বেগ। সবাই নিচুস্বরে কথাবার্তা বলছে, ভেতরবাড়ি থেকে ভেসে আসছে চাপা কান্নার আওয়াজ। চারিদিকে ঘোষালবাড়ির কাজের লোকেরা শশব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।
কিছু বুঝলাম না। বাবাকে দেখলাম ধূর্জটিবাবুর সঙ্গে এক কোনায় গভীর আলোচনায় মগ্ন। আমি ওদিকে এগোবার আগেই বাবা হাত নেড়ে আমাকে যেতে বারণ করল।
ধূর্জটি ঘোষাল বোধহয় আমাকে দেখেছিলেন৷ তিনি দ্রুত পায়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকেই বেরিয়ে এলেন।
একটু পরেই দেখলাম গোপালি মাসি দৌড়ে এল আমার দিকে৷ তারপর বলল, ‘খিদে পেয়েছে খোকাবাবু? লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে যাই? সঙ্গে মোহনভোগ?’
একটু আশ্চর্য হলাম। কাল তো সারাদিন এত আদরযত্ন দেখিনি। আজ হঠাৎ এত সোহাগ কীসের? যাই হোক, সেসব ভাবার সময় ছিল না, খিদেও পেয়েছিল প্রচুর, আমি ঝট করে ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে দিলাম।
একটু পরে যখন ঘরে বসে লুচি মোহনভোগ খাচ্ছি, বাবা ঘরে এল। সারা শরীরে একটা ছটফটে ভাব, মুখে চাপা চকচকে উত্তেজনা। আমাকে এসে বলল, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নে বাবু! তোকে কয়েকটা জিনিস এদিক ওদিক থেকে আনতে হবে।’
আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। নিচুস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী হয়েছে বাবা?’
বাবা গলা নামিয়ে বলল, ‘ধূর্জটি ঘোষালের ছেলের কাল রাত থেকে অবস্থা খারাপ। ধুম জ্বর, সঙ্গে ভেদবমি। ক্রমাগত প্রলাপ বকছে আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় অবস্থা খারাপ হয়েই চলছে। কাল ভোররাতে ডিসপেনসারি থেকে ডাক্তার এসেছিল। কিছু করতে পারেনি৷ এখন জেলা সদর থেকে বড় ডাক্তার আসছে।’
শুনেই বুকটা ধক করে উঠল। এসব কী হচ্ছে ঘোষালবাড়িতে? ভূপতি ঘোষাল মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই বিপদ?
আমি বললাম, ‘কী করতে হবে?’
বাবা কয়েকটা জিনিসের নাম বলল। সবই সাধারণ জিনিস, যেমন জটামাংসীর মূল, নতুন চন্দনকাঠ, একগাছা নতুন পৈতে, রাস্তায় পড়ে থাকা কাকের পালক, সাদা সরষে, সৈন্ধব লবণ এসবই। জটামাংসীর মূল বা রাস্তায় পড়ে থাকা কাকের পালক ছাড়া সবই কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাবা এসব কেন আনতে বলল, বুঝলাম না। অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘এসব নিয়ে কী হবে বাবা?’
বাবা চাপা গলায় বলল, ‘যা বলছি কর। যজ্ঞে লাগবে।’
‘যজ্ঞ? কীসের যজ্ঞ?’
‘আমি ছোট ঘোষালকে বলেছি বাড়িতে বিশেষ তান্ত্রিক যজ্ঞ করলে ওর ছেলে ভালো হয়ে যাবে। ছোট ঘোষাল তার ব্যবস্থা করছে।’
আমি আরও বিস্মিত হলাম, ‘তো? কে করবে সেই যজ্ঞ?’
‘কেন, আমি!’
আমি অবিশ্বাসের সঙ্গে বাবার দিকে চেয়ে রইলাম। তান্ত্রিক যজ্ঞ করবে বাবা? বৈষ্ণববাড়ির ছেলে, সারা জীবন কৃষ্ণনাম করে কাটানো আমার বাবা তান্ত্রিক যজ্ঞ করবে?
বাবা বোধহয় আমার মনের কথা বুঝতে পারল। মুখটা কানের কাছে এনে বলল, ‘ও ছেলে বাঁচবে না খোকা, আমি সকালে একনজর দেখেই বুঝেছি। আমি ধূর্জটিকে বুঝিয়েছি এ হল ভূপতি ঘোষালের আত্মার টান, সে নিজের নাতিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। বিশেষ কালভৈরব যজ্ঞ না করলে এই শাপ কাটবে না।’
‘তো?’
‘আমি ওকে বলেছি যে আমি সেই যজ্ঞ করতে পারি। সেই শুনে ধূর্জটি ঘোষাল যজ্ঞ করাতে রাজি হয়ে গেছে। বলেছে টাকা দেবে, অনেক টাকা।’
শেষ কথাটা শুনে আমার মাথার ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল। বাবা এসব কী বলছে?
বাবা উত্তেজিত স্বরে ফিসফিস করে বলল, ‘তান্ত্রিক যজ্ঞ মানে কী? অং বং মন্ত্র বলতে বলতে কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস আহুতি দেওয়া, এই তো? আর মন্ত্র? অমন গাদাগুচ্ছের সংস্কৃত মন্ত্র আমার মুখস্থ। তার মানে বোঝে কোন ব্যাটা? তুই ঝটপট জিনিসগুলো নিয়ে আয় দেখি। বুঝলি, এ হচ্ছে বড় দাঁও, যেন ফসকে না যায়।’
আমি ফিরে আসছিলাম জিনিসগুলো জোগাড় করে। এর মধ্যে প্রায় ঘণ্টা তিনেক কেটে গেছে। সময় লাগল জটামাংসীর মূল আর সৈন্ধব লবণ জোগাড় করতে গিয়ে। নইলে বাকি সব জিনিস তো পাওয়াই যায়, এক কাকের পালক ছাড়া৷
বাবার কথাগুলো মনে যত ঘুরপাক খাচ্ছিল, মুখের ভেতরটা ততই তেতো তেতো লাগছিল। আমি জানি, বাবা যা করছে ঠিক করছে না। বাবা তান্ত্রিক পূজাবিধি কিছুই জানে না। শুধু বড়লোক কিন্তু বেকায়দায় পড়ে দিশেহারা এক পিতা, তাকে ঠকিয়ে কিছু পয়সা পকেটে পুরতে চায়৷
কাজটা অত্যন্ত অন্যায়। কিন্তু আমি এও জানি যে টাকাটা আমাদের দরকার, খুব দরকার। বাড়ির ছাদ থেকে বর্ষাকালে জল পড়ে, ওই টাকায় ছাদটা ঠিক হবে। আমাদের বাথরুমের অবস্থা খুব খারাপ, সেই বাথরুম সারাই করতে পারব।
বাবার ইচ্ছে, আমাদের গ্রামের স্টেশন রোডে একটা মনিহারির দোকান দেওয়ার, সেই দোকান দিতে পারব। মায়ের ইচ্ছে, একটা সেলাই শেখাবার স্কুল খোলার, সেই স্কুল খুলতে পারব। আর একটু ভালো থাকা, আর একটু ভালো বাঁচা…
ভাবতে ভাবতে বোধহয় একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলাম, এমন সময় একটা দমকা হাওয়ায় হাত থেকে কাকের পালকটা উড়ে চলে গেল৷ আমিও দৌড়লাম তার পেছন পেছন। আর যতই দৌড়ই, ততই দেখি পালকটা আরও উড়ে উড়ে যায়।
আমার কেমন যেন জেদ চেপে গেল। ওই পালকটাকেই আমার চাই। নইলে গ্রামগঞ্জের পথে কতই কাকের পালক পড়ে থাকে। চাইলে কি একটা কুড়িয়ে নিতে পারতাম না?
পালকটাকে তাড়া করতে গিয়ে হুঁশ ছিল না কোথায়, কোন দিকে যাচ্ছি৷ হুঁশ ফিরল, যখন পালকটা ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে এল।
পালকটা তুলে নিয়ে সামনে তাকাতেই বুকটা ধক করে উঠল। আরে! এ তো সেই জায়গাটা, কালকে যেখান থেকে আমি বাঁশবনে ঢুকেছিলাম।
আবার আমার মাথার মধ্যে সব কিছু গুলিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম বুকের মধ্যে আবার মাথা তুলছে অন্ধ হাহাকারের ফণা। কে যেন ফিসফিস করে আমাকে ডাকছে—আয় আয় আয়…
হাতের জিনিসগুলো নামিয়ে রেখে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগোলাম সেই বাঁশবনের দিকে।
আজ কিন্তু কালকের মতো অমন অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল না৷ সেটা অবশ্য স্বাভাবিক। কাল যখন আসি তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। আর এখন ঘোর দুপুর।
আমি বাঁশবনের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম। বাঁশপাতার মধ্যে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া। তার শব্দ ছাড়া চারিদিকে একটিও শব্দ শোনা যাচ্ছে না। কঠিন পাথুরে নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে বনের মধ্যে। মাটিতে কাটাকুটি খেলছে গাছের পাতার ছায়া। খানিক সেই কাটাকুটির খেলা দেখলাম। লক্ষ্য করলাম, বুকের মধ্যে ধুকপুকুনিটা যেন একটু একটু করে বাড়ছে, বেড়েই চলেছে। কানদুটো কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে, মাথার ভেতরটা ফাঁকা।
.
একটু পরে ফেরার পথ ধরলাম। রাস্তায় গাছের পাতারা কাটাকুটি খেলে চলেছে। আমি একটু এগিয়েই বুঝলাম, রাস্তা হারিয়েছি। এটা বেরোবার রাস্তা নয়৷ অন্য রাস্তা ধরলাম। সঙ্গে সঙ্গে কানে এল, একটা খরখরে আওয়াজ। কে যেন আমার পেছন পেছন হাঁটছে। দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালাম। কই, কেউ নেই তো!
আবার হাঁটতে শুরু করলাম। খরখরে আওয়াজটা এবার আর মাটিতে নয়। বাঁশগাছের গায়ে গায়ে। খুব দ্রুত পায়ে কে যেন দৌড়ে চলেছে বাঁশগাছের গা বেয়ে৷ আর বিশ্রী আওয়াজটা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে।
ক্রমেই মনে হচ্ছে কারা যেন চাপাস্বরে কিছু বলছে। কীসের উল্লাস ওদের স্বরে? এবার মনে হচ্ছে ওই খ্যারখ্যারে, ক্যারক্যারে আওয়াজটা আমার পায়ের পাতা বেয়ে উঠে আসছে।
.
নীচের দিকে তাকালাম। কই, না তো! এই তো বনের মাটিতে ছায়ার কাটাকুটি খেলা চলছে। শিরশিরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে বাঁশবনের মধ্যে। খরখরে আওয়াজটা কি ক্রমশ বাড়ছে?
বুকের মধ্যে ধুকপুকুনির শব্দ এখন আরও জোরালো। খরখরে আওয়াজটা মাথার ভেতর চারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
আমি একবার থেমে চারিদিক দেখে নিলাম। ও কী? ওই বাঁশগাছের মাথা থেকে মস্ত বড় মাকড়শার মতো কী একটা দ্রুত নেমে এসে কোথায় মিলিয়ে গেল না?
মাথাটা গুলিয়ে গেল আমার। আবার অন্য রাস্তা নিলাম৷ আবার সেই বাঁশবনের মাটি জুড়ে পাতার ছায়ার কাটাকুটি খেলা। সঙ্গে সেই আওয়াজ!
কান পেতে বুঝলাম, ক্যারক্যারে আওয়াজটা এবার সারা বাঁশবন জুড়ে শোনা যাচ্ছে। আমি চারিদিকে তাকালাম।
এই তো, ওই তো ওটা। চারটে না পাঁচটা পায়ের ওপর ভর দিয়ে দৌড়চ্ছে ওটা কী? প্রকাণ্ড একটা মাকড়শা? নাকি কাঁকড়া? আমি দৌড়লে ওটাও দৌড়চ্ছে। আমি থামলে সে-ও থেমে যাচ্ছে কোনও বাঁশগাছের আড়ালে।
আমার কপাল, কানের পাতা, ঘাড়, কাঁধ সব বেয়ে ঘাম গড়াতে লাগল। এখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। বাঁশপাতার মধ্যে বয়ে যাওয়া হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। আমার মাথার মধ্যে কারা যেন ফিসফিস করে কিছু বলছে…
না, এটাও রাস্তা নয়। আবার ফিরলাম। অন্য পথ। না, এটাও নয়। ওটাও নয়। সেটাও নয়। কোনওটাই নয়। পথ নেই, ফেরবার পথ নেই৷ ওদিকে ওই বিশ্রী আওয়াজটা আমাকে তাড়া করেছে। মারবে। ও মারবে আমাকে…
পাগলের মতো লাগল এবার। দৌড়তে শুরু করলাম। প্রথমে ভীত শিশু, তারপর ত্রস্ত উন্মাদের মতো। কিন্তু না, পথ কই? যে পথেই যাই, সে পথ রুদ্ধ। আমি দৌড়তে থাকলাম। সঙ্গে সেই খরখর শব্দ। কোথাও একটা উল্লাসের হাসি আমার মাথার মধ্যে বোমার মতো ফেটে পড়ল। মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাব! মাথার মধ্যে উন্মত্ত প্রলাপ। মনে হচ্ছে আমার বুকটা এবার ফেটে যাবে। কী করব আমি? কোথায় যাব? নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার।
আর দৌড়তে পারছি না। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। আমি কি মরে যাব?
হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ তুলে চাইলাম। ওই তো, ওটা দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। চারটে… না না, পাঁচটা পা ওর। একদম ডান দিকের পা-টা ছোট। কালো কুৎসিত বিচ্ছিরি কী যেন একটা।
মস্ত বড় একটা কাঁকড়া, না না, একটা মাকড়সা… নাকি ওটা একটা… একটা একটা… না… আমি যা ভাবছি তা ঠিক নয়। ওটা নিশ্চয়ই সেটা নয়। ওটা কিছুতেই একটা কাটা হাতের…
ভাবতে ভাবতেই মনে হল, আমি বোধহয় মরে যাচ্ছি। হ্যাঁ, মরে যাচ্ছি৷ ওই জিনিসটা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আওয়াজ উঠছে খরর… খরর… খরর… আমার দৃষ্টি ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে… সামনে সেই আলোছায়ার খেলা… বুকের ভেতর কষ্ট, বড় কষ্ট…
ঠিক সেই সময় পরিচিত স্বরটা আবার শুনলাম, ‘কী খোকাবাবু, খুব কষ্ট হচ্ছে?’
কোথা থেকে কী হল জানি না, হঠাৎ করে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। সব স্বাভাবিক। সব কষ্ট উধাও। আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলাম। দেখলাম, আমার একটু দূরে একটা মোটা বাঁশগাছের গোড়ায় বসে খইনি ডলতে ডলতে আমার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আর কেউ নয়, মনোরঞ্জন মাঝি!
জানি না, মাথার মধ্যে কী হয়ে থাকবে, প্রথমেই চেষ্টা করলাম কাকচক্ষু খুলতে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হল, কে যেন একটা সপাটে থাপ্পড় মেরে আমার কাকচক্ষু আবৃত করে দিল।
শুধু দূর থেকে একটা ব্যঙ্গের খ্যানখ্যানে হাসি শুনতে পেলাম, ‘গুরুর দেওয়া বিদ্যা গুরুর ওপর চালাতে নেই খোকাবাবু। ওতে ক্ষতি বই লাভ হয় না।’
ধীরে ধীরে প্রশ্ন করলাম, ‘কী চাও তুমি? কেন এসেছ এখানে?’
খইনিটা নীচের ঠোঁট আর দাঁতের মাঝে ঢেলে, হাত ঝেড়ে আমার দিকে তীব্র তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল মনা মাঝি৷ লক্ষ্য করলাম, ওর চোখের মণিটা বড়, অস্বাভাবিক বড়। প্রায় সারা চোখ ছেয়ে ফেলেছে যেন। আর মুখের মধ্যে একটা পাগলাটে ভাব।
মনা মাঝি বলল, ‘তোমার বাবা ভেবেছে মনা মাঝিকে আটকাবে? ঘণ্টা নেড়ে চালকলা-বাঁধা পুরুত মনা মাঝির সঙ্গে লড়াইতে নামবে? এখনও সময় আছে খোকা। তোমার বাবাকে বোঝাও। আজকের লড়াই আমার জীবনের শেষ লড়াই। তার মধ্যে যে আসবে, সেই মরবে।’
আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কী করবে তুমি? কী করতে পারো?’
অপ্রকৃতিস্থের মতো হা-হা করে হেসে উঠল লোকটা৷ সেই পাগলাটে হাসি যেন সারা বাঁশবনকে শিউরে তুলল। লক্ষ্য করলাম, এ ক’দিনের মধ্যেই মনা মাঝি আরও শুকিয়ে গেছে। শরীরে যেন মাংস নেই, হাড়ের গায়ে কুঁচকোনো চামড়া জড়িয়ে রেখেছে কেউ। লোকটার ঊর্ধাঙ্গে কিছু নেই, পরনে শুধু একটা নোংরা লুঙ্গি পরা।
হাসি থামলে মনা মাঝি বলল, ‘কী করতে পারি, সে কি তুমি জানো না খোকা? কাল তো এখানে ঢুকতে গিয়ে মরতে বসেছিলে। কী করে বেঁচে বেরোলে জানি না। আজও একটু শিক্ষে দিলাম। একে বলে স্থানবন্ধন। এখনও জিগ্যেস করছ, আমি কী কী পারি?’
আমি কিছু বলার আগেই লোকটা ঠিক মাকড়সার মতো তড়বড় করে চার হাতে পায়ে দৌড়ে এল আমার দিকে৷ আমি ভয়ে ঘেন্নায় একেবারে সিঁটিয়ে গেলাম। মনা মাঝি ফিসফিস করে বলল, ‘আমি আরও অনেক কিছু জানি গো খোকা। আমার সঙ্গে লড়তে যেওনি। তোমার বাপকেও বারণ করে দাও। ধুজ্জটি ঘোষালের বাপকে মেরেছি। আজ ওর ছেলেকে নেব।’
জানি না, কোথা থেকে বুকের মধ্যে এত সাহস এল, চেঁচিয়ে বললাম, ‘তারপর? কী হবে ওইটুকু একটা বাচ্চাকে মেরে? তোমার ইচ্ছে পূরণ হবে? ভুবনেশ্বরীদেবী তোমাকে বিয়ে করবেন?’
খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল মনোরঞ্জন মাঝি। তারপর সারা মুখে একটা পৈশাচিক উল্লাস ছড়িয়ে বলল, ‘ওর বাপকে খেয়েছি, শ্বশুরকে খেলাম, কাল ওর ছেলেকে খাব৷ আর তারপর? তারপর খাব ধুজ্জটি ঘোষালকে। তারপর? তারপর কোথায় যাবে ও? আমাকে ছেড়ে আর কোথায় যাবে ভুবি?’
আমি ঘৃণার স্বরে বললাম, ‘তুমি কি পাগল?’
লোকটা ওর বড় বড় চোখগুলো আমার মুখের ওপর স্থির করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ করে গলা নামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ খোকা, আমি পাগল। কেন পাগল হয়েছি জানো? সারা জীবন জ্বলেছি বলে। ওকে চেয়ে আজীবন জ্বলেছি আমি। আমার সর্বস্ব গেছে, ইহকাল-পরকাল সব নষ্ট হয়ে গেছে৷ আমার সব বেচে দিয়েছি গো খোকাবাবু, সব বেচে দিয়েছি, শুধু ওকে ফিরে পাব বলে।’
আমি অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে রইলাম মনোরঞ্জন মাঝির দিকে। ভালোবাসা মানুষকে এমনই পাগল করে যে, সে অনায়াসে কাউকে খুন করতে পারে? ভালোবাসা কি এতই উন্মত্ত যে সে উচিত-অনুচিত, ঠিক-বেঠিকের তফাত বোঝে না?
আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম। মনা মাঝি তখন মাটিতে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছে।
