দেবলরাজার গড় – ১

কাহিনির শুরুটা কিন্তু খুব সাধারণ ছিল বুঝলে, আর পাঁচটা সাধারণ কাহিনির মতোই। কিন্তু হঠাৎ করে তার মধ্যেই এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেল যে আমরা তার থই খুঁজে পেলাম না। আর যখন পেলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, বিপদ তখন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে।

সময়টা ফেব্রুয়ারির শেষাশেষি। শীতটা যাই যাই করেও যাচ্ছে না। এদিকে দুপুরে বাইরে বেরোলে কপালে ঘাড়ে বিনবিনে ঘামের ফোঁটা। দিনের বেলা হালকা ফ্যান চালালেও রাতে গায়ে একটা সুজনি কি নিদেনপক্ষে কাঁথা দিতেই হচ্ছে৷ পরের সপ্তাহে দোলপূর্ণিমা। পলাশগাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। বসন্ত জাগ্রত দ্বারে!

দেখেছি, বসন্ত জাগ্রত হলেই সত্যব্রতর মনে প্রেমবাসনা একেবারে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উথলে ওঠে। বলা বাহুল্য, সেইসব সমুদ্রমন্থনে অমৃত নয়, বরং গরলই ওঠে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এবং সত্য অবধারিতভাবে কেস খায়। সেসব কেসের অধিকাংশই এত গোলমেলে যে ছাপার অক্ষরে লেখা যায় না।

এবারেও তেমনই একটা কাণ্ড ঘটেছে। এমনিতেই প্রায় গোটা কুড়ি ডেটিং অ্যাপ সত্যব্রতর মোবাইল আলো করে রেখেছে। এবং তার ব্যবহারও হয় নিয়মিতই। আমার ধারণা, কলকাতা শহরের প্রতি পিনকোডে সত্যব্রতর একটি করে স্বল্পসময়ের প্রেয়সী আছেন। প্রেয়সীরা মাঝেমধ্যেই বদলে বদলে যান, তবে পিনকোড বদলায় না৷ এঁদের সঙ্গে সত্যর সম্পর্ক (ওর ভাষাতে) একদম চব্বিশ ক্যারেট পিওর ভালোবাসা।

কিন্তু কথা হচ্ছে যে, সময়টা ঘোর কলি। চব্বিশ ক্যারেট পিওর ভালোবাসাতেও প্রায়ই ভালো রকমের খাদ ধরা পড়ে৷ আর সত্যবাবু সেই খাদের কিনারা থেকে পা হড়কে একেবারে শ্রপাত ধরণীতল হব হব হলে তার উদ্ধারকল্পে আমাকেই নামতে হয়। আর আমারও যদি বুদ্ধিতে না কুলোয়, তাহলে একজনই আছেন ভরসা করার মতন, দ্য গ্রেট নিবারণ চক্রবর্তী, কাকচক্ষু বিশারদ।

বহুদিন বাদে আজ নিবারণবাবুকে তাঁর বিরাটির বাড়িতে পাওয়া গেছে৷ ভদ্রলোক শহরে ছিলেন না অনেকদিন, পাহাড়ে ঘুরতে গেছিলেন। নিজেই বলেন যে পাহাড়ে ঘুরলে নাকি ওঁর শহুরে জীবন যাপনের ক্লান্তি ধুয়ে যায়। তাতে অসুবিধা নেই। অসুবিধা এটাই যে মোবাইল ফোনের এই বাড়-বাড়ন্তের জমানাতেও ভদ্রলোক ব্যবহার করেন একটি আদ্যিকালের বাটনটেপা ফিচার ফোন।

আর সে ফোনও বোধহয় মোবাইল ফোন আবিষ্কারের প্রথম দিককার সময়ের। তার স্ক্রিন গেছে ফেটে, ব্যাটারির কভার রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা, বাটনের ওপর লেখা নাম্বার আর অক্ষরগুলো অনেক আগেই উঠে গেছে বলে হোয়াইট মার্কার দিয়ে লিখে রাখা আছে।

আমরা অনেকবার বলেছি নতুন মোবাইল নিতে৷ সত্যব্রত সদ্য একটি মোবাইল ফোনের কোম্পানিতে কাজ পেয়েছে। ও অনেকবারই একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড মোবাইল অত্যন্ত সস্তায়, প্রায় নামমাত্র মূল্যে এনে দেওয়ার কথা বলেছে, কিন্তু নিবারণবাবু তাতে কর্ণপাত করেননি। ওঁর একটাই কথা—যতটুকু না হলেই নয়, তার ওপর একটি পয়সাও খরচ করতে উনি নারাজ।

বলা বাহুল্য, এখানে নিবারণবাবুর জীবনধারণের খরচা বা আয়ের ব্যাপারটা এসেই পড়ে। বাপ-মা মারা গেছেন অনেকদিন হল৷ পৈতৃক ভদ্রাসন বীরভূমের নলহাটিতে। সেখানে কালেভদ্রে যান। বহুদিন নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি ল্যান্ড অ্যান্ড রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেছেন। প্রভিডেন্ট ফান্ড আর বাপের জমানো টাকা, এর সুদেই ওঁর দিন চলে যায়। বিরাটির এই বাড়িতে উনি ভাড়া থাকতেন। বাড়ির মালকিন ছিলেন বিধবা এবং নিঃসন্তান৷ তিনিই মারা যাওয়ার সময় বাড়িটা ওঁকে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে যান।

যেটুকু বুঝেছি, ভদ্রলোক দিনরাত পুজো-আচ্চা নিয়েই থাকেন। কোনও বিলাসিতা নেই, কোনও দেখনদারি নেই, কোনও আসক্তি বা নেশা নেই—একমাত্র ভালো সিগারেট ছাড়া। ভদ্রলোক প্রায় সব জাগতিক বন্ধনই জয় করেছেন, শুধু দামি সিগারেটের নেশাটুকু বাদ দিয়ে।

আজ মঙ্গলবার। যখন ওঁর বাড়িতে পৌঁছলাম তখন সন্ধে হয় হয়৷ নিবারণবাবু তাঁর মঙ্গলবারের বিশেষ পুজো সেরে সামান্য সরষের তেল আর চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে খাচ্ছিলেন। আমরা অবশ্য জানতাম এই সময়ে উনি মুড়িমাখা খান। তাই বুদ্ধি করে কয়েকটা শিঙাড়া আর আলুর চপ নিয়ে গেছিলাম। ভদ্রলোক তাই দেখে যা খুশি হলেন, সে আর কহতব্য নয়।

সত্যব্রত ঢিপ করে একটা প্রণাম সেরে গদগদস্বরে বলল, কেমন আছেন দাদা? আপনার দেখা পাওয়া ক্রমেই ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে দেখছি।

নিবারণবাবু শিঙাড়ায় একটা কামড় দিয়ে আড়চোখে সত্যর দিকে চেয়ে বললেন, তোমার তো বৃশ্চিক রাশি হে। এখন রাহু আর শুক্র ষড়ষ্টক যোগে আছে, তার ওপর দুটিই নীচস্থ। টাইম তো খুবই খারাপ যাচ্ছে ভাই।

সত্য প্রায় কেঁদে ফেলল, হ্যাঁ দাদা, একটা বিচ্ছিরি ঝামেলায় ফেঁসে গেছি৷ কী আর বলব, সেই সঙ্গীতা দত্তর কেসটার পর…

নিবারণবাবু নিমীলিত নয়নে চপ-মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললেন, একে সপ্তমে রাহু নীচস্থ, আর দ্বাদশে শুক্র পীড়িত হয়ে বসে আছে কেতুর সঙ্গে, নীচ স্বভাবের মহিলাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া, নারী সংসর্গজনিত কলঙ্ক, এসব তো তোমার আজীবনের ভূষণ৷ তার ওপর এখন আবার শনি বক্রী হয়ে একাদশে। হুম, এদিকে তাকাও তো দেখি—।

নিবারণবাবু খানিকক্ষণ সত্যর কপালের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর মিচকি হেসে বললেন, এবার তো ভালোই ফেঁসেছ দেখছি। মহিলার পতি আর উপপতি, দুজনেই তো দেখছি তোমাকে গরুখোঁজা খুঁজছেন। আর খুব একটা ভালো উদ্দেশ্যে খুঁজছেন বলে মনে হচ্ছে না। কী, ঠিক বলেছি তো?

সত্য ঝট করে গোল্ড ফ্লেক কিং-সাইজের প্যাকেটটা ভদ্রলোকের সামনে নামিয়ে রেখে বলল, একদম ঠিক বলেছেন দাদা। মহিলার নাম করিশমা। কী একটা গানবাজনার স্কুল চালান। ফেসবুকে আলাপ। আমি সেলসে কাজ করি শুনে সেলসের জ্ঞান-ট্যান নিতে ডেকেছিলেন। তারপর, ইয়ে… মানে… বাকিটা তো বুঝতেই পারছেন…

আমি শ্লেষভরে বললাম, এবার পতি আর উপপতির পরিচয়টা দে।

সত্য মুখখানা করুণ করে বলল, স্বামী প্রোমোটার-কাম-কাউন্সিলর। উপপতিটি আবার পুলিশের দারোগা৷ কী করি বলুন তো?

—কয়েকদিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে উধাও হয়ে যাওয়া ছাড়া তো উপায় দেখছি না। বম্বে না পুনে কোথায় তোমার এক খুড়তুতো ভাই চাকরি করে বলেছিলে না?

সত্য বেজারমুখে বলল, উধাও হব বললেই কি হওয়া যায়? কাজকর্ম চাকরি-বাকরি নেই?

নিবারণবাবু হাত উলটোলেন, তাহলে আর আমার কিছু করার নেই।

সত্যব্রত তেমন বেজারমুখেই বসে রইল। নিবারণবাবু হেসে বললেন, রাগ কোরো না হে। এ হচ্ছে তোমার পূর্বজন্মের প্রারব্ধ। আজীবন তোমাকে ভোগ করে যেতে হবে। শুধু পূর্ব নয়, অনেক জন্মের সঞ্চিত কৃতকর্মের ফল। প্রারব্ধ বড় সাংঘাতিক জিনিস হে। সেরকম বলিষ্ঠ বা প্রভাবশালী পুরুষ হলে তাঁর প্রারব্ধের ফল বহু বহু পুরুষ ধরে ক্রিয়াশীল থাকে। সেবারে যা হয়েছিল…

বলতে বলতে যেন শিউরে উঠলেন নিবারণবাবু৷

ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি যে এখন ভদ্রলোককে খোঁচালে একটা জম্পেশ গল্প পেলেও পেতে পারি। তাই চেপে ধরে বললাম, একটা জম্পেশ গল্পের গন্ধ পাচ্ছি যে দাদা। কী হয়েছিল খুলে বলুন দেখি। এই সত্য, সিগারেটটা বার করে ধরিয়ে দিতে পারছিস না? দাদা কি নিজে ধরাবেন নাকি?

সত্য ঝটপট একটা সিগারেট বার করে নিবারণবাবুর মুখে গুঁজে দিয়ে লাইটার দিয়ে মুখাগ্নি করে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কী কেস বলুন না দাদা!

সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলেন নিবারণবাবু। তারপর একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলা শুরু করলেন।

—সে অনেকদিন আগের কথা। তখন বাবা-মা দুজনেই সদ্য সদ্য মারা গেছেন। আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কলকাতায় বড়বাজারে এক মাড়োয়ারির গদিতে খাতা লেখার কাজ করছি আর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছি। থাকতাম মানিকতলার কাছে একটা মেসে। মফস্‌সলের ছেলের সেই প্রথম কলকাতায় পা রাখা। বলতে নেই, আমার ভালোই লাগছিল। শহুরে জীবনের একটা মনোহারী ঝলক আছে। প্রথম প্রথম মন্দ লাগে না।

তবে কয়েকদিনের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠলাম। যেখানে থাকতাম, সেই মেসবাড়িটা ছিল চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউয়ের ওপরেই। রাতদিন হইহুল্লোড় আর যানবাহনের আওয়াজে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়৷ মাঝে মাঝে মাঝরাতে রিকশাওয়ালা আর মাতালের ঝগড়াতে ঘুম ভেঙে যেত৷ তারপর পুলিশ এসে দুজনের একজনকে ধরে নিয়ে গেলেই তখনকার মতো শান্তি।

আর চোরের উৎপাত তো কহতব্য ছিল না। গেঞ্জি জামা ঘটি বাটি তো বটেই, এমনকী একদিন দেখি ঘরের সামনের পাপোশটা অবধি কে চুরি করে নিয়ে গেছে!

এরই মধ্যে একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি একটা চিঠি এসে হাজির। এসেছিল আমাদের নলহাটির গ্রামের বাড়িতে। রিডাইরেক্ট হয়ে এখানে এসেছে। আমি তো অবাক! আমাকে আবার চিঠি লিখল কে?

তবে চিঠিটা খুলেই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। জয়ন্ত আসছে ওদের দেশের বাড়িতে, মাসকয়েক থাকবে। বলেছে ওর কাছে গিয়ে কয়েকদিন কাটিয়ে আসতেই হবে।

চিঠির শেষে শিপ্রাকাকিমার নিজের হাতে লেখা কয়েকটা লাইন—

বাবা নিবারণ, তোমাকে দেখিনি অনেক বছর হয়ে গেছে৷ আমার বয়েসও হয়েছে, আজকাল তোমার মায়ের কথা বড় মনে পড়ে। একবার এসো। এখানে বেশ কিছু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে। তোমার সঙ্গে সাক্ষাতে আলোচনা করলে কিছু সুরাহা হতে পারে বলে মনে হয়।

সত্যব্রত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ইয়ে, আমরা কিন্তু কিছুই বুঝলাম না নিবারণদা। জয়ন্তই বা কে আর এই শিপ্রাকাকিমাই বা কে?

নিবারণবাবু একটা টান দিয়ে বললেন, বলছি। শিপ্রাকাকিমা হচ্ছেন আমার মায়ের মকরসই সখী। সেকালে গঙ্গাজলকে সাক্ষী রেখে, বা কোনও বিশেষ তিথিতে সই পাতানোর রেওয়াজ ছিল। মকর সংক্রান্তিতে সই পাতালে তাকে বলত মকরসই।

শিপ্রাকাকিমা ছিলেন নদীয়ার গাংনাপুরের এক প্রাচীন জমিদার বংশের সন্তান।

কাকিমা যখন বিয়ে করে আমাদের পাশের গ্রামে আসেন, তখন তাঁর বয়েস বেশ অল্প। তাঁর সঙ্গে আমার মায়ের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। কাকিমা সময় পেলেই আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করতে আসতেন। আমার মা যদিও বয়সে কাকিমার থেকে বেশ খানিকটা বড় ছিলেন, তবু তাঁদের বন্ধুত্ব হতে আটকায়নি।

এতটা বলে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন নিবারণবাবু—তোমাদের যখন মনা মাঝির কাহিনিটা বলি, বিপত্তারণ ঘোষালের কথা বলেছিলাম কি?

বললাম, মনা মাঝি যার হাতের পাঞ্জা কেটে নিয়েছিল?

—বাহ বাহ! তোমার স্মৃতি তো খুব শার্প ভায়া!—সপ্রশংস চোখে আমার দিকে তাকালেন নিবারণবাবু—হ্যাঁ, সেই বিপত্তারণ ঘোষাল। তার জ্ঞাতি ছিলেন শিবপ্রসাদ ঘোষাল। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ, জেলা সদরে ভালো চাকরি করতেন। এই শিবপ্রসাদকাকুর সঙ্গেই বিয়ে হয় শিপ্রা রায়চৌধুরীর, মানে আমার শিপ্রাকাকিমার। খুব দাপুটে মহিলা ছিলেন কাকিমা। হাজার হোক জমিদারবাড়ির মেয়ে, ব্যক্তিত্বই ছিল আলাদা।

শিপ্রাকাকিমা আর শিবপ্রসাদকাকুর ছেলে হচ্ছে গিয়ে এই জয়ন্ত। আমার ছোটবেলায় খেলাধুলোর একমাত্র সঙ্গী। জয়ন্তর যখন বারো বছর বয়স, তখন একদিন হঠাৎ করেই শিবপ্রসাদকাকু হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। শিপ্রাকাকিমা তখন অথই জলে পড়েন বললেই চলে। কারণ তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি অনেক আগেই মারা গেছেন, শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে তেমন কোনও আত্মীয়ও ছিল না।

তিনি তখন জয়ন্তকে নিয়ে গাংনাপুরে ওঁর বাপের বাড়ি ফিরে যান। এমনিতেও তাঁকে অনেকবারই মায়ের কাছে আক্ষেপ করতে শুনেছিলাম যে, তাঁর বাবার মৃত্যুর পর নাকি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি বারোভূতে লুটেপুটে খাচ্ছে।

—কেন? ওঁর কোনও দাদা বা ভাই ছিল না?

প্রশ্নটা শুনে আমার দিকে একটু অদ্ভুত চোখে তাকালেন নিবারণবাবু। তারপর সামান্য হেসে বললেন, না, তিনি তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। তবে এই প্রশ্নটার একটা আলাদা তাৎপর্য আছে, সেটা তোমরা পরে বুঝবে।

সে যাই হোক, তিনি জয়ন্তকে নিয়ে গাংনাপুর চলে গেলেন। শুনেছিলাম উনি হিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেছিলেন, ওদিকেই একটা কলেজে প্রফেসারির চাকরি নেন। জয়ন্তও ওখান থেকেই স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি হয়। ছোটবেলা থেকেই ওঁর আঁকার হাত ছিল দুর্দান্ত। তারপর মুম্বাই চলে যায় একটা অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে ইলাস্ট্রেটরের চাকরি নিয়ে। সেই থেকে ওখানেই থাকে।

—আর ওই অদ্ভুত ব্যাপারটা কী কেস? জিগ্যেস করলাম আমি।

—মনা মাঝির সেই অদ্ভুত কাহিনিটার পর আমাদের গ্রামে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু আশ্চর্য ঘটনা ঘটত, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। আর আমার এমনই কপালের ফের যে সেসব ঘটনায় আমাকে জড়িয়ে পড়তেই হতো। অনেকবারই এমন হয়েছে যে আমার জন্য বেশ কিছু বিপদ কেটে গেছে। তবে তার পেছনে কতটা আমার কৃতিত্ব আর কতটা ভাগ্যের সহায়তা বলা মুশকিল।

যাই হোক, চিঠিতে জয়ন্ত লিখেছিল ও আসছে সামনের শনিবার। একটা নতুন চাকরি জুটিয়েছে। জয়েন করার আগে এক মাসের ছুটি নিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসছে। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ও নাকি ভারি উতলা হয়ে পড়েছে।

লোভ যে আমারও ছিল না, তা নয়। সত্যিই অনেকদিন হল কলকাতার বাইরে যাওয়া হয়নি। অতএব ওকে আমার যাবার দিনক্ষণ জানিয়ে একটা চিঠি লিখে এক্সপ্রেস কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিয়ে ব্যাগ গোছাতে শুরু করে দিলাম।