৬
ঘুমটা ভাঙতে ভাঙতেও ভাঙছিল না। মনে হচ্ছিল আমার অসাড় দেহটা যেন সেই ঝিলের তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসছে৷ আমার চেতনা আছে, সাড় নেই। আমি সবই দেখছি, সবই বুঝছি, কিন্তু কিছুই অনুভব করতে পারছি না।
আমার শরীরটা ক্রমে ভেসে উঠছে। আমি দেখতে পাছি জলস্তরের ওপারে অস্বচ্ছ একটা আলো। সেই আলোটা একটু একটু করে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। হাঁসফাঁস করছি আমি, উঃ… উঃ…
ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসে হাঁফাতে লাগলাম৷ কী ভয়ঙ্কর স্বপ্ন, বাপ রে বাপ! নিশ্চয়ই কাল রাতের খাবার হজম হয়নি, নইলে এমন স্বপ্ন দেখে কেউ?
বিছানা থেকে নেমে সটান বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। রাজবাড়ির নিয়ম বড় কড়া। সময়ে না গেলে ব্রেকফাস্ট পাব না।
ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে সবে চায়ের কাপে চুমুকটা দিয়েছি, কার্তিকের মা ঘুগনি, পরোটা আর ডাবল ডিমের পোচ টেবিলে দিয়ে বলল, ‘আজকের বেরেকফাস একাই করে নাও নিবারণদাদা, রানিমা আর দাদাবাবু কেউই আসতে পারবে না, দুজনেরই শরীল খারাপ। একেবারে দুপুরবেলা দেখা হবে।’
‘সে কী? কেন? কী হয়েছে?’
‘পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, গা গরম, এই আর কী।’
‘ডাক্তার ডাকা হয়েছে?’
উত্তর দিলেন পীতাম্বরবাবু৷ এদিকেই হেঁটে আসছিলেন তিনি। বললেন, ‘ডাক্তার দত্তচৌধুরীকে খবর দেওয়া হয়েছে। উনি এই এসে পড়বেন। আমার মনে হয় না খুব সিরিয়াস কিছু। তবুও রাজবাড়ির ব্যাপার।’
‘ইয়ে, মানে ভালো ডাক্তার তো?’
‘কী বলছেন? ডক্টর অরুণাচল দত্তচৌধুরী হলেন গিয়ে চাকদা স্টেট জেনারেল হাসপাতালের সবচাইতে অভিজ্ঞ ডাক্তারবাবু। লোকে বলে ধন্বন্তরী দত্তচৌধুরী।’
স্টেট হাসপাতালের ডাক্তারবাবু কারও হোম ভিজিটে আসছেন, এরকমটা হতে দেখিনি। বুঝলাম যে এই এলাকায় এখনও রাজবাড়ি সবার ওপরে।
রাজবাড়ি শব্দটা মাথায় আসতেই মোক্ষদামাসির কথাটা মনে পড়ে গেল। এই জমিদারি তো দেবলরাজাদের ছিল। তাহলে এই জমিদারি জয়ন্তর পূর্বপুরুষদের হাতে এল কী করে?
প্রশ্নটা পীতাম্বরবাবুকে করতে গিয়েও থেমে গেলাম। হাজার হোক উনি এবাড়ির ম্যানেজার। কার্তিকের মা ওঁর জন্যেও এক কাপ চা এনে দিলেন। দুধ চিনি ছাড়া লিকার চা।
পীতাম্বরবাবু চা খেতে খেতে চিন্তিতমুখে বললেন, ‘রানিমার সঙ্গে কথা বলতে পারলে খুব ভালো হতো৷ কারণ কাল রাতে আবার একটা ঘটনা ঘটেছে৷ সেটা নিয়ে লোকজন আরও ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে আছে৷ ভয় লাগছে, কোনদিন একটা বড় অঘটন না ঘটে যায়৷’
আমি প্রশ্ন করলাম, ‘অঘটন?’
‘হ্যাঁ। গাঁ-গঞ্জের লোক, কলকাতার লোকজনদের মতো অত বুঝদার না। ভয়-টয় পেয়ে একদিন হয়তো সব ভেঙেচুরে আগুন-টাগুন জ্বালিয়ে দিল।’
কথা বলতে বলতেই একজন খর্বকায়, কৃষ্ণকায়, বিরলকেশ ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে এলেন। হাতে ডাক্তারি ব্যাগ আর স্টেথোস্কোপ। একগাল হেসে বললেন, ‘মা জননী কি নিজের ঘরেই আছেন? আর আমাদের রাজকুমার?’
বুঝলাম ইনিই ডাক্তার রায়চৌধুরী। কিছু কিছু ডাক্তারকে দেখলে রোগীর রোগ এমনিতেই অর্ধেক উধাও হয়ে যায়। ইনিও সেই গোত্রেই পড়েন।
কার্তিকের মা একগাল হেসে বলল, ‘হ্যাঁ গো ডাক্তারবাবু, দুজনেই ঘরে আছেন। তুমি চলে যাও, ওনাদের বলাই আছে যে তুমি আসবে। এমন একটা ম্যাজিক ওষুধ দাও দিকিনি, যাতে মা ব্যাটা দুজনেই দুপুরের আগে ঝাড়াপাড়া দিয়ে খাড়া হয়ে যায়।’
ডাক্তার দত্তচৌধুরী একটা ঝলমলে হাসি উপহার দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন। আমি প্লেট সাবাড় করার দিকে মন দিলাম। পীতাম্বরবাবু চুপচাপ চা খেতে লাগলেন।
বেসিনে মুখ ধুয়ে আবার টেবিলে এসে বসেছি। ফের কৌতূহল চাগিয়ে উঠেছে। প্রশ্ন করলাম, ‘হ্যাঁ পীতাম্বরবাবু, কাল রাতে আবার কী হয়েছে বলছিলেন?’
পীতাম্বরবাবু চিন্তিতমুখে বললেন, ‘কাল রাতে আনুলিয়ার গোবিন্দ দাসের ছাগলের খোঁয়াড়ে সবক’টাই মারা পড়েছে। আর সবারই মাথা মুচড়ে রাখা আর চোখগুলো খুবলানো। সারা এলাকা জুড়ে চাপা উত্তেজনা টগবগ করে ফুটছে। যে-কোনও মুহূর্তে খুব খারাপ কিছু ঘটতে পারে৷ শুনেছি কলকাতার কয়েকজন সাংবাদিকের কাছেও এর খবর পৌঁছেছে। এটা পেপারে বেরোলো বলে।’
‘তাতে অসুবিধা কী কাকা? বড় খবর হলে গভর্নমেন্টের টনক নড়বে, আরও বড় টিম আসবে, এই রহস্যের খোলসা হবে, সেটাই তো ভালো হবে!’
এরপর যে কী হল, সেটা আমি লিখে বোঝাতে পারব না। মুহূর্তের মধ্যেই ভদ্রলোকের চেহারা বদলে গেল৷ চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল। হাতের পেশি আর কানের রগও ফুলে উঠেছে। খপ করে আমার গলাটা চেপে ধরে হিসহিস করে বললেন, ‘কেউ আসবে না! কেউ না! দেবলগড়ে আমি ছাড়া আর কেউ যাবে না।’
আমি হতভম্ব। এ কী, এই সামান্য কথায় কেউ কারো গলা টিপে ধরে নাকি? ভদ্রলোক কি পাগল হয়ে গেছেন?
তবে সে কয়েক মুহূর্তের জন্য৷ তার পরেই গলা ছেড়ে দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন পীতাম্বরবাবু। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিন নিবারণবাবু, ক্ষমা করে দিন। মাথাটা এমন খারাপ হয়ে আছে… মনে হচ্ছে যেন পাগল হয়ে যাব। তাই ভুল করে আপনার গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছি। দয়া করে রানিমা আর জয়ন্তদাদাবাবুকে এই কথাটা বলবেন না। তাহলে এই বুড়ো বয়েসে চাকরি হারিয়ে না খেতে মরতে হবে।’
দয়াই হল লোকটাকে দেখে। বয়স্ক লোক, উত্তেজনার বশে একটা ভুল করে ফেলেছেন। এই বয়সে চাকরি খোয়ালে ভদ্রলোককে হয়তো সত্যিই না খেয়ে মরতে হবে।
আমি উঠে গিয়ে ওঁর পিঠে হাত রাখলাম। বললাম, ‘আরে, ওসব বাদ দিন কাকা। আমি কিছু মনে করিনি। আশা করি শিপ্রাকাকিমা আর জয়ন্তর খুব খারাপ কিছু হয়নি। আর এখানে যা যা ঘটছে সেসবও ঠিক হয়ে যাবে৷ আপনি চিন্তা করবেন না।’
পীতাম্বরবাবু চোখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। এই সময়ে ডক্টর দত্তচৌধুরীর কথা কানে এল, ‘এ কী ইয়ং ম্যান, আপনি একা কেন? মিশিরমশাই গেলেন কই?’
মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম সেই খর্বকায়, কৃষ্ণকায়, বিরলকেশ ভদ্রলোক সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছেন। কিন্তু মুখে একটা চিন্তার ছায়া। শঙ্কিতস্বরে জিগ্যেস করলাম, ‘কী হল ডাক্তারবাবু, খুব খারাপ কিছু দেখলেন?’
ডাক্তার রায়চৌধুরী বললেন, ‘এমনিতে তো পেটের গন্ডগোল মনে হচ্ছে। তবে লিভার সংক্রান্ত কিছু হলে আশ্চর্য হব না, এমনকী জন্ডিসও হতে পারে। তবে ব্লাড টেস্ট না করলে কিছুই বলতে পারব না।’
কার্তিকের মা পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছিল। উদ্বিগ্নস্বরে বলল, ‘খুব খারাপ কিছু হয়েছে নাকি গো ডাক্তারবাবু?’
ডাক্তার রায়চৌধুরী বললেন, ‘আরে না না, সাংঘাতিক কিছু নয়। ঠিক হয়ে যাবে। যাই হোক, আপাতত চলি। প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে এসেছি, মিশিরমশাইকে বলবে ব্লাড টেস্ট করিয়ে তার রিপোর্ট কাল আমাকে একবার দেখাতে। আর এই ক’দিন মা-ছেলের জন্য ঝাল মশলা ছাড়া খাবারই রান্না কোরো কার্তিকের মা। এবার আমাকে একবার তোমাদের লাইব্রেরিতে নিয়ে চলো তো মা। আগেরবার দুটো বই ধার নিয়ে গেছিলাম। সে-দুটো ফেরত দিয়ে যাই।’
‘লাইব্রেরি! এই রাজবাড়িতে লাইব্রেরি আছে নাকি? কই, জয়ন্ত তো বলেনি আমাকে?’
আমার কথা শুনে কার্তিকের মা একঘর হেসে বলল, ‘সে কী গো নিবারণদাদা! দাদাবাবু তোমাকে বইঘরের কথা বলেনি?’
মাথা নেড়ে জানাতেই হল যে আগে শুনিনি।
কার্তিকের মা জানাল, এই রাজবাড়ির পিছন দিকে একটা লাইব্রেরিও আছে। এই রাজবাড়ির যবে থেকে প্রতিষ্ঠা, তবে থেকে এই বইঘর শুরু। জয়ন্তর পূর্বপুরুষদের মধ্যে অনেকেই বিদ্যোৎসাহী ছিলেন৷ প্রথম দিকে দেশ-বিদেশ থেকে নিয়মিত বই আসত। আশেপাশের এলাকার প্রচুর পড়ুয়া লোক উপকৃত হতেন। তবে তাতে ভাটা পড়ে জয়ন্তর পিতামহের সময় থেকে। উনি ব্যয়সংকোচের অজুহাতে বই কেনা বন্ধ করে দেন। আস্তে আস্তে বইঘরে লোক আসা বন্ধ হয়ে যায়। এখন তো বইঘর বন্ধই থাকে প্রায়। ইদানীং ডাক্তারবাবু আসছেন বলে তাও খোলা হয়।
এবার বুঝলাম স্টেট হাসপাতালের ডাক্তারবাবু কেন পার্সোনাল ভিজিটে আসেন। কোনও অনুরোধ উপরোধে নয়, উনি আসেন বইয়ের লোভে!
লাইব্রেরিটা যেমন অন্ধকার তেমনই গুমোট। এমনিতে যখন এই রাজবাড়ির পেছন দিকের অংশটায় ঢুকছিলাম তখনই গা ছমছম করছিল। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম এখানে কালেভদ্রে কারও পা পড়ে।
ডাক্তারবাবু তাঁর ব্যাগ থেকে সন্তর্পণে দুটো বই বার করে তাকের দুটি শূন্যস্থান ভরাট করে দিলেন। আমি অভ্যেসবশত ঘুরে ঘুরে দু-একটা বই নেড়েচেড়ে দেখতে থাকলাম। বইঘরের মেঝে থেকে শুরু করে প্রতিটি বইয়ের ওপর পুরু ধুলোর আস্তরণ।
ডক্টর দত্তচৌধুরী দেখলাম তারই মধ্যে এক হাত দিয়ে নাকে রুমাল ধরে ঘুরে ঘুরে বই খুঁজছেন। বই নাড়াচাড়া করতে করতে বুঝলাম, যাঁরাই এই সংগ্রহ বানিয়ে থাকুন না কেন, বই চেনার ব্যাপারে তাঁদের রুচি ছিল বটে।
বেশ কিছু বিখ্যাত বই দেখলাম, যার প্রথম সংস্করণ আছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার একটা ভিন্টেজ কালেকশন দেখলাম৷ এছাড়াও দেশি-বিদেশি এমন অনেক দুর্লভ বই দেখলাম, যেগুলো যে- কোনও পুরোনো বইয়ের সংগ্রাহক পেলে লুফে নেবেন।
লাইব্রেরির মধ্যিখানে একটা বড় শ্বেতপাথরের টেবিল। তাকে ঘিরে কয়েকটা চেয়ার। কিছুক্ষণ পর বই দেখায় ক্ষান্তি দিয়ে তারই একটা একটু ঝাড়পোঁছ করে বসলাম। দেখলাম ডাক্তারবাবু আঁতিপাঁতি করে তখনও খুঁজে যাচ্ছেন। বোঝাই যাচ্ছে যে, তিনি কিছুতেই তাঁর পছন্দের বইটি খুঁজে পাচ্ছেন না।
দেখতে দেখতে ক্রমে হাই উঠতে লাগল। কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। একটা হাই চাপতে চাপতে জিগ্যেস করলাম, ‘বিশেষ কোনও বই খুঁজছেন ডাক্তারবাবু?’
ডাক্তার দত্তচৌধুরী অন্যমনস্কভাবে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, ‘হ্যাঁ গো ইয়ং ম্যান… একটা বিশেষ বই… খুব পুরোনো… এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাকে ও বলেছে লাস্ট কপি… এখানেই আছে… আর সেটা নাকি খুব খুব জরুরি…’
আমি আশ্চর্য হলাম, ‘ও বলতে? আপনি কি অন্য কারও জন্য এখান থেকে বই নিয়ে যাচ্ছেন?’
ডাক্তারবাবু হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠলেন। লজ্জা পেয়ে জিভ-টিভ কেটে অনুনয়ের সুরে বললেন, ‘এ হে হে, মুখ ফসকে বলে ফেললাম দেখছি৷ প্লিজ, কাউকে বোলো না, হ্যাঁ।’
এবার বেশ কৌতূহল হল, ‘কী কেস ডাক্তারবাবু? না না, কাউকে বলব না।’
‘সত্যি তো? বিপদে ফেলবে না তো?’
‘না না, মায়ের কিরে কেটে বলছি।’
ডাক্তারবাবু আমার পাশে আরেকটা চেয়ার সাফ করে বসলেন। তারপর গলা খাটো করে বললেন, ‘আমার এক বন্ধু, বুঝলে, এই বাড়িতে এককালে তার যাতায়াত ছিল। তখন সে এই বইঘরে অনেকবার এসেছে। খুব পড়ুয়া ছেলে বুঝলে… সারাক্ষণ বইতে মুখ গুঁজেই বসে থাকত। তখনই নাকি এখানে এমন একটা বইয়ের খোঁজ পেয়েছিল, যেটা ওর এখন চাই। চাই মানে চাই-ই। সে রোজ ফোন করে করে আমার মাথা খেয়ে নিচ্ছে প্রায়। না পেলে নাকি অনর্থ হয়ে যাবে। আজ আমাকে বইটার জন্য এখানে আসতেই হতো। মা ব্যাটার শরীর খারাপ শুনে আসার একটা অজুহাত পেয়ে গেলাম।’
কৌতূহলটা এবার আরও চাগিয়ে উঠল, ‘বইয়ের কী নাম বলুন তো? আমিও তাহলে খুঁজে দেখি, কী এমন বই যার জন্য আপনার বন্ধু একেবারে উঠেপড়ে লেগেছে?’
ডাক্তার দত্তচৌধুরী বললেন, ‘একটা খুব প্রাচীন বই বুঝলে, হে। নাম হচ্ছে “দেবল বংশাবলী চরিত”। একটি মাত্র সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল, সেও উনিশশো সালের প্রথম দিকে, বটতলা থেকে। খুব বেশি হলে শ’খানেক কপির বেশি ছাপা হয়নি। তার একটাও আর আজকাল পাওয়া যায় না।
‘সেই বইটারই নাকি একটা কপি এই বইঘরেই সে ছোটবেলায় দেখেছে, বা আছে বলে কারো কাছে শুনেছে। কিন্তু এখন তার কোনও কারণে অকস্মাৎ মনে হয়েছে এই বইটা যে করেই হোক তার চাই, বুঝলে কী না! সে একেবারে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে হে…’
অবাকস্বরে বললাম, ‘আপনার বন্ধুর যখন ছোটবেলায় এ বাড়িতে যাতায়াত ছিল, সেক্ষেত্রে তো উনি বইটার জন্য নিজেই আসতে পারতেন। আপনাকে রিকোয়েস্ট করতে হল কেন?’
ডাক্তারবাবু বোধহয় প্রশ্নটা শুনে একটু অপ্রস্তুত হলেন। তার সঙ্গে তাঁর মুখে যে একটু দুষ্টু লাজুক হাসি খেলে গেল, সে আমার নজর এড়ালো না। রুমালে মুখ মুছে একটু সলজ্জ অপ্রতিভস্বরে বললেন, ‘ব্যাপারটা বুঝলে তো, যাকে বলে… মানে একটু বড়দের ব্যাপার। মানে তোমাকে বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না।’
রেগে উঠে বললাম, ‘আরে, কী বলেন, হ্যাঁ! আমার বয়েস চব্বিশ, এই সামনের আষাঢ়ে পঁচিশে পা দেব। আমি বাচ্চা নই! আপনাদের মতো পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ বছর বয়সি বুড়োদের এইসব কথা শুনলে না রাগে গা জ্বলে যায়।’
ডাক্তারবাবু হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ‘আরে এই দেখো, বেকার আমার ওপর রাগ করছ। আরে, আমি কী তাই বলেছি? আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, স্লাইট ইয়ে আর কী, হেঁ হেঁ হেঁ।’
‘এবার এই হেঁ হেঁ হেঁ-টা বাদ দিয়ে কেসটা খুলে বলবেন কি?’
‘এই দেখো, আবার রাগ করে! শোনো বাপু, কেসটা তাহলে বলেই ফেলি। তোমাদের ওই রানিমা, মানে শিপ্রা ম্যাডাম, আর আমার এই বন্ধুটি, তাদের মধ্যে কলেজজীবনে, ইয়ে, মানে ভারি ভাব-ভালোবাসা ছিল আর কী। গ্র্যাজুয়েশনে দুজনেরই সেম সাবজেক্ট ছিল কি না। সেই সূত্রেই বন্ধুটির এ বাড়িতে যাতায়াত ছিল৷ তবে কালেক্রমে যা হয় আর কী, নিয়তির ইয়েতে দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেল বেঁকে। ফেমাস গানটা এখানে কেমন লাগিয়ে দিলুম দেখেছ হে?’
আমি আবার তেড়েফুঁড়ে উঠতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই আমায় থামিয়ে দিলেন ভদ্রলোক, ‘আহা, এই দেখো, গানের কথা শুনে আবার খেপে উঠলে। বলছি, বলছি। তা আমার বন্ধুটি ছোটবেলা থেকেই এই অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে খুব ইন্টারেস্টেড ছিল৷ গ্র্যাজুয়েশনের পর আরও পড়াশোনা করে মস্ত বড় লেভেলে চলে গেছে।
‘রানিমা তো বিয়ে-শাদি করে, তারপর বিধবা হয়ে এ বাড়িতে ফিরে এসেছেন সেও দশ-বারো বছরের ওপরে হয়ে গেল। আমার বন্ধুটি আবার কী একটা কারণে এদিকেই ফিরে এসেছে। বইটা তার নাকি এখন চাই-ই চাই। কিন্তু লজ্জাবশত রানিমাকে সরাসরি অ্যাপ্রোচ করতে পারছে না। অগত্যা আমাকে বলা।’
আমার কৌতূহল ততক্ষণে চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। প্রশ্ন করলাম, ‘কী নাম বলুন তো আপনার বন্ধুর?’
‘আমরা তো ডাকতাম দেবু বলে, সারনেম লাহা। এখন সে হিস্ট্রির বড় প্রফেসর হয়েছে। পুরো নাম প্রফেসর দেবব্রত লাহা।’
থানায় গিয়ে দেখি ওসি সাহেবের সঙ্গে জ্যোতিষ বাগল আর ডক্টর লাহাও উপস্থিত। তিনজনে চা খাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে আরেক কাপ আনতে বলা হল।
বসতেই ওসমান আলি জিগ্যেস করলেন, ‘রানিমা আর জয়ন্তবাবুর শরীর খারাপ শুনলাম। খুব সিরিয়াস কিছু নয় আশা করি।’
বললাম, ‘সকালে ডাক্তার দত্তচৌধুরী এসেছিলেন। কয়েকটা ব্লাড টেস্ট করতে বলেছেন আর কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে গেছেন। পীতাম্বরবাবু বোধহয় সেসব নিয়ে ব্যস্ত। খুব সিরিয়াস নয়, তবে ডাক্তারবাবু লিভার সংক্রান্ত কোনও গন্ডগোল বলে সন্দেহ করছেন।’
ওসমান আলি চিন্তিতমুখে বললেন, ‘রিসেন্টলি এই এলাকায় জন্ডিসের বেশ কয়েকটা কেস কানে এসেছে। লিভার ফেল করে কয়েকজন মারা গিয়েছে বলেও খবর পেয়েছি। পাবলিক হেলথ থেকে কয়েকজন এসে জলের নমুনা-টমুনা সব নিয়ে গেছিলেন। তাঁরা বললেন কোনও ইস্যু নেই। কী যে হচ্ছে, বুঝতে পারছি না।’
ডক্টর লাহা চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন, ‘ওসব বাদ দিন আলি সাহেব। কাল রমেন সাঁতরার বাড়ি থেকে বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে গেলেন কোথায়?’
ওসমান আলির মধ্যে পুলিশি গাম্ভীর্য ফিরে এল। বললেন, ‘কাল রমেন সাঁতরার ওই সর্পোদ্যানের আশেপাশে আমি কয়েকটা ছাপ দেখেছি। দেখে মানুষের পা বলেই মনে হয়। কিন্তু ওরকম অস্বাভাবিক বড় পা কোনও মানুষের হতে পারে না।’
তিনজনে সপ্রশ্নচোখে ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
‘দেখুন স্বীকার করতে বাধা নেই, হাঁস-মুরগি-ছাগলের খোঁয়াড়ে ঢুকে গলা মুচড়ে রাখার ব্যাপারটা নিয়ে প্রথমে তত বিশেষ মাথা ঘামাইনি।’
বুঝলাম, মানুষ খুন হওয়াতে পুলিশের টনক নড়েছে।
‘কাল রমেন সাঁতরা খুন হওয়ার পর যাদের যাদের খোঁয়াড়ে হামলা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বাড়ি গেছিলাম। সবক’টা কাণ্ডই ঘটেছে রাতের বেলায়। সবাই বলছে, সেই রাতে তাদের এত ঘুম পেয়েছিল যে বলার নয়। দু-একজন বলেছে, ঘুম আসার আগে নাকি একটা পচা আঁশটে গন্ধ পেয়েছিল।
‘একজনই শুধু দাবি করেছে সে নাকি আততায়ীকে দেখেছে৷ আনুলিয়ার গোবিন্দ দাস বলেছে, সে নাকি সেই রাতে ছোট বাইরে করতে উঠে দেখেছে, তার ছাগলের খোঁয়াড় থেকে একটা বড়সড় জন্তু দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। তবে তার কথা বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই।’
‘কেন? কারণ নেই কেন?’
‘প্রথমত সে স্বীকার করেছে আগের রাতে প্রচুর ধেনো টেনেছিল। দ্বিতীয়ত, সে প্রাণীটাকে দেখেছে এক মুহূর্তের জন্য, তাও ঘুমজড়ানো চোখে। তৃতীয়ত, আর এটাই মোক্ষম, প্রাণীটা নাকি দুপেয়ে। তবে শরীরটা বোঝা গেলেও মাথাটা দেখা যাচ্ছিল না। হ্যাঁ, পচা আঁশটে গন্ধটার কথা সেও কনফার্ম করেছে।’
শেষের কথাটা শুনে আমার কেমন শীত শীত করতে লাগল। কিন্তু আমি চুপ করে বসে রইলাম, কিছু বললাম না।
‘সবক’টা ঘটনা ডিটেইলে শুনে আমার ধারণা হয়েছে, কোনও একটা গ্যাং গোপনে এই কুকর্ম করে বেড়াচ্ছে লোককে ভয় দেখাবার জন্য।’
আমার কথাটা খুব একটা যুক্তিযুক্ত মনে হল না। বলেই ফেললাম, ‘নদীয়ার এই প্রত্যন্ত গ্রামে বাইরের কোনও গ্যাং এসে এসব করে যাচ্ছে, আর এলাকার লোক বা আপনাদের কাছে তার কোনও খবর নেই, এটা কি হতে পারে ওসমান সাহেব?’
ওসমান আলি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন, ‘হুম, আমিও সেটা ভেবেছি। বাইরের গ্যাং নয়, খুব সম্ভবত গ্রামেরই কয়েকজন মিলে এইসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে।’
লাহাবাবু বললেন, ‘যদি সেটা মেনেও নিই, তাহলেও নিবারণবাবুর প্রশ্নটা থেকেই যায়—তারা কারা? তাদের এত সাহস হল কী করে যে মানুষ খুন অবধি পৌঁছে গেল? আর এসব করে তাদের লাভটাই বা কী?’
‘লাভ-লোকসানের কথা জানি না। গ্রামের লোককে ভয় পাওয়ানো হতে পারে, যাতে তারা রাতের বেলা না বেরোয়। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।’
আমি বললাম, ‘আর ওই সাপ, বেজি, শিয়াল, এদের মাথা কেটে নেওয়াটা?’
ওসমান আলি বললেন, ‘একই গ্যাংয়ের কাজ হতে পারে। আবার না-ও হতে পারে। পুরো ব্যাপারটাই এখন ধোঁয়াশা।’
‘তাহলে আপাতত কিং কর্তব্যম?’ ডক্টর লাহা প্রশ্ন করলেন।
ওসমান আলি বললেন, ‘আমি আমার ইনভেস্টিগেশন চালিয়ে যাই। আপনারা আপনাদের মতো কাজ করে যান। গোপনে বার দুয়েক ওই গড়ে গিয়ে ভিজিট করে আসুন। তবে দেখবেন, গাঁয়ের মানুষ যেন না জানে! তাহলে কিন্তু আমার আর কিচ্ছু করার থাকবে না।’
ঠিক এই সময় থানার টেলিফোনটা বেজে উঠল। একজন কনস্টেবল গিয়ে ফোনটা তুলে দুটো কথা বলেই ওসি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘স্যার, আপনার ফোন, কলকাতা থেকে।’
ওসমান আলি ফোনটা ধরে ‘হ্যালো’ বলেই চুপ করে গেলেন। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম ভদ্রলোকের ভুরু ক্রমেই আরও কুঁচকে যাচ্ছে, মুখের মধ্যে উদ্বেগের ছাপ। ফোনটা রেখেই উত্তেজিতস্বরে ওসমান আলি বললেন, ‘আরেকটা বিশাল কাণ্ড। বিআর সিং হাসপাতাল থেকে রতন মণ্ডলকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
চমকে গেলাম। ডক্টর লাহা রুদ্ধশ্বাসে বললেন, ‘সে কী! রতন মণ্ডল কোমায় ছিল না?’
‘হ্যাঁ, সেখান থেকেই তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। কোথা থেকে, কীভাবে সে উধাও হল, কেউ কিছু বলতে পারছে না।’
‘দিনেদুপুরে কলকাতা শহরের ব্যস্ততম হাসপাতাল থেকে কোমায় থাকা রোগী উধাও? কী বলছেন ওসি সাহেব?’
‘হ্যাঁ। তবে দিনেদুপুরে নয়, রাতদুপুরে। রাতেও কর্তব্যরত নার্স তাকে বিছানায় দেখেছিল। ভোরবেলা থেকে সে হাওয়া।’
‘কলকাতার পুলিশ কী বলছে?’
‘বলছে দুটো কেস হতে পারে। এক, রতন মণ্ডল হয় নিজে নিজেই কোমা থেকে ফিরে এসেছিল। তারপর নিজেকে হাসপাতালের বেডে দেখে চুপিচুপি কেটে পড়ে। অথবা, ওর সঙ্গীসাথিরা হাসপাতালের ভেতরে কারও সঙ্গে সাঁট করে ওকে তুলে নিয়ে গেছে।’
জ্যোতিষ বাগল চিন্তান্বিতমুখে বললেন, ‘দ্বিতীয়টার সম্ভাবনা কম। কারণ আমি যদ্দূর শুনেছি রতন মণ্ডল একাই অপারেট করত, বড় গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করত না। প্রথমটা হলে খুব তাড়াতাড়িই ধরা পড়ে যাওয়ার কথা ওর। অসুস্থ শরীরে, গায়ে রোগীর পোশাক পরে কতদূরই বা যাবে ও!’
‘পুলিশ আপাতত খানাতল্লাশি শুরু করেছে। দেখা যাক কী হয়।’
আমি বললাম, ‘বাই দ্য ওয়ে, শুনে মনে পড়ল, তার কাছ থেকে যে দেবীমূর্তিটি উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটা এখন কোথায় রাখা আছে?’
ওসমান আলি বললেন, ‘আইন মোতাবেক তো পুলিশের ট্রেজারি স্ট্রংরুমে থাকার কথা। কেন বলুন তো?’
প্রশ্নটা ভেবে করিনি। তাই আমতা আমতা করে বললাম, ‘না, মানে হঠাৎ করে মনে হল রতন মণ্ডল যদি ওটা আবার হাতাতে চায়। তাছাড়া মূর্তিটাকে দেখারও খুব ইচ্ছা ছিল…’
হো হো করে হেসে উঠলেন ওসমান আলি, ‘আপনি ভাবছেন ওই অসুস্থ শরীরের লোকটা, কলকাতা পুলিশের স্ট্রংরুম থেকে একটা আইটেম তুলে আনবে? হাসালেন নিবারণবাবু!’
ডক্টর লাহাও মৃদু হেসে বললেন, ‘ওসি সাহেব ঠিকই বলেছেন। তাছাড়া আপনার যদি মূর্তিটাকে দেখার ইচ্ছে হয়, আপনার সেই ইচ্ছে আমি এখনই পূরণ করতে পারি। প্রথম যখন ট্রেজারিতে মূর্তিটাকে দেখি, তখনই তার একটা ছবি তুলে নিয়েছিলাম। ছবিটা আমার সঙ্গেই আছে। এই দেখুন।’ এই বলে একটা ফটোগ্রাফ আমার হাতে তুলে দিলেন ডক্টর লাহা।
ছবিটার দিকে চাইতেই ক্ষণমুহূর্তের জন্য মনে হল যেন একটা ইলেকট্রিক শক বয়ে গেল আমার শরীর বেয়ে। অথচ তার কোনও কারণ নেই। একটা অতি সাধারণ ছবি। পুলিশের স্ট্রংরুমের টেবিলে রাখা বেলেপাথরে তৈরি একটি প্রাচীন মূর্তি। তবুও মনে হল, হঠাৎ করেই খোলা ইলেকট্রিকের তারে হাত দিয়ে ফেলেছি।
তবে তা সামান্য সময়ের জন্য। নিজেকে সামলে নিয়ে ছবিটার দিকে মন দিলাম। তার মধ্যেই চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করলাম, ডক্টর লাহা তীব্র খরচোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন।
ছবিটার দিকে নজর দিলাম। হলদে বেলেপাথরে তৈরি একটা মূর্তি। ছবি দেখে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এসব আন্দাজ করা বেশ কঠিন। তবুও আন্দাজে মনে হল, উচ্চতা খুব কম করে হলেও সাত বা আট ইঞ্চি, তার বেশিও হতে পারে। দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ আনুপাতিক। যেটা আমার মনোযোগ আকর্ষণ করল, সেটা হচ্ছে মূর্তির মুখমণ্ডল।
দেবীর মুখ এখানে মানুষের নয়, পাখির। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, বকের। সেই দীর্ঘ ঠোঁট বা চঞ্চু, বড় বড় চোখ, বেশ অস্বস্তিকর এবং ভীতিকর মুখ।
দেবী দ্বিভুজা। ডান হাতটি ওপরে তোলা। সেই হাতে একটি অস্ত্র, যার নীচের দিক সরু, ওপরের দিকটা মোটা, অনেকটা গদার মতো। বাঁ হাত নীচের দিকে প্রসারিত, সেখানে কিছু একটা ধরা আছে, কিন্তু সেটা যে কী, তা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ সেই অংশটা ভাঙা।
আরও লক্ষ করলাম মূর্তিটার চারিদিক ভাঙা ভাঙা। পুরো মূর্তিটাই মনে হচ্ছে বড় পাথর কুঁদে তৈরি।
ছবিটা ফেরত দিলাম। লাহামশাই ছবিটা তাঁর ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন, ‘ভাবছিলাম কাল সকালে একবার মূর্তিটা দেখে আসব। যাবেন নাকি?’
শুনেই আমি উত্তেজিত, ‘অবশ্যই যাব। এত পুরোনো একটা মূর্তি নিজের হাতে ধরে দেখব, সে তো মস্ত বড় সৌভাগ্য।’
‘বেশ। তাহলে কাল সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ গাংনাপুর রেলস্টেশনে চলে আসুন। কলকাতা পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হবে। কাজকর্ম সেরে ফিরতে ফিরতে ধরুন রাত আটটা-ন’টা।’
‘সে কী! একটা মূর্তি দেখে আসতে চার-সাড়ে চার ঘণ্টা লাগবে নাকি?’
‘আহা, আমাদের আরও কাজ আছে। আপনি অবশ্য চাইলে মূর্তিটা দেখে চলে আসতেই পারেন। দুপুর দুটো নাগাদ বোধহয় শিয়ালদা থেকে একটা লালগোলা প্যাসেঞ্জার আছে। ধরলে ছ’টা-সাড়ে ছ’টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন।’
ভাবলাম ঘণ্টা দুয়েক আগে ফিরে এসে করবটাই বা কী? জয়ন্ত তো কাল বিকেলের আগে খাড়া হতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। দুজন পণ্ডিত মানুষের সঙ্গে থাকব, হয়তো বেশ কিছু নতুন জিনিস শিখতেও পারব। বললাম, ‘না না, আপনাদের সঙ্গেই থাকব। এখন আপনারা যাবেন কোথায়?’
জ্যোতিষ বাগল বললেন, ‘আপাতত পীতাম্বরবাবুর সঙ্গে দেখা করার কথা আছে। আরও এক-দু’বার তো দেবলরাজার গড়ে যেতেই হবে। সে নিয়ে কথা বলা।’
চকিতের জন্য মনে হল, আহা, কী সুখের সরকারি চাকরি! সারাদিনে দুটো মিটিং, সেসব হয়ে গেলেই ব্যস। হাসিমুখে ব্যাগ উঠিয়ে বাড়ি। আর প্রাইভেট কম্পানিতে? পাঁচ মিনিট আগে বেরোলেই, ব্যস, মাইনে কাটো, সবার সামনে অপমান, হেনস্থা, কটু কথা, আরও কত কী!
লাহাবাবু মৃদু হেসে বললেন, ‘কী ভাবছেন নিবারণবাবু? খুব আরামের চাকরি করি, তাই না? আপাতত চলুন দেখি। সরকারি কর্তব্যটা করেই আসি।’
তিনজনে থানা থেকে বেরিয়ে রাজবাড়ির দিকে খানিকটা এগোতেই আমি ওঁদের বললাম, ‘আমার একটা কাজ মনে পড়ে গেছে। আপনারা এগোন, আমি একটু পরে আসছি।’
জ্যোতিষ বাগল আর ডক্টর লাহা পথের বাঁকে মিলিয়ে যেতেই প্রায় দৌড়েই থানায় ফিরে এলাম। ওসি সাহেব নিজের ডেস্কে বসে খুব মন দিয়ে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আমাকে দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘এ কী! ফিরে এলেন যে?’
বললাম, ‘একটা অনুরোধ করার ছিল। হয়তো অন্যায় অনুরোধ, কিন্তু আপনাকে রাখতেই হবে।’
ওসমান আলি সোজা হয়ে বসলেন, ‘অনুরোধ?’
‘হ্যাঁ। এই জ্যোতিষ বাগল আর ডক্টর লাহা কলকাতায় কোথায় থাকেন, কবে এখানে প্রথম এসেছেন, যবে থেকে এখানে এসেছেন তবে থেকে কোথায় কোথায় গেছেন, তার সব খবর চাই।’
ওসমান আলির মুখে বিস্ময়, ‘কেন বলুন তো? কোনও লিড পেয়েছেন?’
ওসমান আলিকে যদি এখন বলি আমার এই অনুসন্ধিৎসার উৎস মোক্ষদা-চেতাবনি, তাহলে ভদ্রলোক আমাকে পাগল ছাড়া অন্য কিছু ভাববেন না। তাই বললাম, ‘এই দুজন এখানে আসার পরই এসব কাণ্ডকারখানা বেড়ে গেছে, সেটা খেয়াল করেছেন কী? ওসি সাহেব, আমার মন বলছে, এঁদের ব্যাপারে খোঁজখবর করুন। কিছু না কিছু তো বেরোবেই।’
ওসমান আলি আমার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলেন। তারপর তাঁর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। আমাকে বসতে বলে দু’কাপ চা অর্ডার দিলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে সেই হাসিটা ঝুলিয়ে বললেন, ‘ইউ আর রিয়েলি অ্যান ইনটেলিজেন্ট পার্সন। ইয়েস, আমি দু’দিন আগেই এই নিয়ে কলকাতা পুলিশকে খোঁজখবর করতে রিকোয়েস্ট করেছিলাম। ওঁরা জানিয়েছেন যে এঁদের পরিচয় একদম কারেক্ট। সন্দেহ করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তবুও ওঁরা আমার অনুরোধে এই দুজনের লাস্ট কয়েকদিনের গতিবিধির রিপোর্ট আমাকে পাঠাবেন বলেছেন।’
ততক্ষণে চা এসে গেছিল। কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, আমিও সন্দেহের তালিকায় আছি নাকি?’
ওসমান আলি চায়ের কাপে চুমুক দিলেন, নজর আমার থেকে সরল না। চাউনি দেখে এই প্রথম টের পেলাম যে ভদ্রলোকের আপাত নিরীহ আবরণ নিতান্ত ভেক৷ তার আড়ালে লুকিয়ে আছেন এক দুঁদে দারোগা। ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আছেন তো বটেই, আপনারই যুক্তি অনুযায়ী। ইন ফ্যাক্ট, জয়ন্তবাবুর ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া শুরু করা হয়েছে। আপাতত কোনও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে না। তবে ইয়েস, আমরা সবার ওপরেই নজর রাখছি।’
শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল৷ আমি দ্রুত চা শেষ করে উঠে পড়লাম। বললাম, ‘ঠিকাছে, ঠিকাছে বুঝেছি।’
থানা থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠতেই দেখলাম, এলাকার যত ছেলেপুলের দল যেন গুলতি থেকে ছোড়া ঢিলের মতো ছুটে চলেছে রাজবাড়ির দিকে। মুহূর্তের মধ্যে ভয় ঘিরে ধরল, আবার কোনও অঘটন ঘটল নাকি?
একটি ধাবমান কুচোকে ধরে দাঁড় করালাম। জিগ্যেস করলাম, ‘কী রে? তোরা ওদিকে ওরকম করে ছুটছিস কেন?’
সে কুচোর গা একেবারে খালি, দৌড়ের চোটে সেফটিপিন দিয়ে আটকানো হাফ-প্যান্ট কোমর থেকে নেমে এসেছে। ছোঁড়া কোনওমতে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করে বলল, ‘দেবীর থানে মাদারি এসেছে, হনুমানের খেলা দেখাবে। তুমি যাবে না?’
বলেই সে আমার হাত ছাড়িয়ে আবার তিরবেগে ছুটে গেল সামনের দিকে।
আমিও দ্রুতপদে সেদিকে এগোলাম। একটাই কথা ভাবছিলাম, দেবীর থানটা ঠিক কোন জায়গা?
ছেলেপিলেদের লক্ষ্য করে যেখানে পৌঁছলাম, সেটা আর কোনও জায়গা নয়, জঙ্গলে ঢোকার মুখে সেই বটগাছের তলাটা। ইতিমধ্যেই জায়গাটা সাফসুতরো করে একজন খালি-গা ছেঁড়া লুঙ্গি পরা হতদরিদ্র লোক একটা রোগা হনুমান নিয়ে খেলা দেখানো শুরু করে দিয়েছে। বাচ্চারা তো বটেই, কয়েকজন বয়স্ক মানুষও দেখলাম খেলা দেখতে এসেছেন।
আমিও খেলা দেখায় মজে গেলাম। বড় বয়সেও একই আনন্দ পেলাম। হনুমানটার নাম ভানুমতী। তার মজাদার কাণ্ডকারখানা দেখে মুহুর্মুহু হাততালির চটাপটিতে চারিদিক ভরে উঠল।
শিশুরা চিরকালই আমার কাছে এক দুর্বোধ্য প্রহেলিকা। এরা যে কীসে আনন্দ পায় আর কীসে পায় না, সে বোঝা ভারি মুশকিল। তাদের আনন্দের উপকরণ যেমন সহজ সাধারণ, আবার তেমনই অপ্রতুল বটে। দামি খেলনা মুহূর্তের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিতে এদের বাধে না, আবার অতি সামান্য উপকরণের মধ্যেও এত আনন্দ পায় যে তার ইয়ত্তা নেই।
একটু পর খেলা শেষ হলে মাদারি কিছু বকশিশের আশায় শতচ্ছিন্ন গামছা পেতে দিল সবার পায়ের কাছে৷ কয়েকটা পয়সা আর কয়েন পড়ল গামছায়। তারপর জমায়েত দ্রুত ফাঁকা হতে লাগল। আনন্দের রস চেটেপুটে খাওয়া হয়ে গেছে, এখন কে তার দাম দেয়?
সবাই চলে গেলে লোকটা খুচরো কয়েনগুলো গুনতে লাগল। আমি ঠিক ওর পিছনে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম, লোকটা কী করে।
লোকটা পয়সাগুলো গেঁজেতে গুঁজে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন
ফিরতেই আমার মুখোমুখি হয়ে গেল। প্রথমে সামান্য চমকে গেলেও পরক্ষণেই ম্লান, ক্লান্ত হাসিটা ফিরে এল লোকটার মুখে। বলল, ‘এখানে দাঁইড়ে রয়েছেন যে বাবু। কিছু বলবেন নাকি?’
আমি নিজে মা সরস্বতীর আশীর্বাদবঞ্চিত বলেই হয়তো যাঁরা নেচে গেয়ে মানুষকে আনন্দ দেন, তাঁদের প্রতি আমার মনে একটা অপ্রকাশ্য শ্রদ্ধা আছে। তাই পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘বড় ভালো খেলা দেখিয়েছ কাকা, খুব আনন্দ পেলাম। এই টাকাটা রাখো।’
সেই দরিদ্র মাদারি যে শ্রদ্ধার সঙ্গে দু’হাত পেতে আমার হাত থেকে টাকাটা নিল তার তুলনা নেই। নোটটা দু’চোখে ছুঁইয়ে দু-একবার বিড়বিড় করে ‘খোদা মেহেরবান, খোদা মেহেরবান’ আউড়ে টাকাটা গেঁজেতে গুঁজে বলল, ‘বড় উপকার করলেন গো বাবু। আজ বহুদিন বাদে মেয়েটার মুখে হাসি দেখতে পারব। আল্লাতালা আপনাকে জন্নত নসিব করুন গো বাবু।’
দরিদ্রলোকের দুঃখ বড় মর্মস্পর্শী হয়। বললাম, ‘কেন গো চাচা? মেয়ে বায়না করে কিছু চেয়েছে বুঝি?’
লোকটা ক্লিষ্টস্বরে বলল, ‘আমার একটি মা-মরা মেয়ে আছে বাবু, নাম সাকিনা। খুব লক্ষ্মী মেয়ে। কিচ্ছু চায় না, কোনও বায়না নেই। শুধু কয়েকদিন ধরে বড় অবুঝের মতো বেলের মোরব্বা খেতে চাইছে।
‘জিগ্যেস করলাম, “কেন রে মা, এত বেলের মোরব্বা খাওয়ার শখ হয়েছে কেন?” সে বলল, কবে যেন ঘুঁটে কুড়িয়ে আসার পথে পাশের পাড়ায় কোন বড়লোকের বেটিদের খেতে দেখেছে। সেই থেকে তারও বড় ইচ্ছে হয়েছে খাওয়ার।
‘বেটি আমার বড় লক্ষ্মী মেয়ে বাপু। কোনওদিন চেয়ে খেতে শেখেনি। আমার কাছে খেতে চেয়েছে বলে আজ গঞ্জের দোকানে দর করলাম। এক ঠোঙা দশ টাকা চাইল। আমি গরিব মানুষ গো দাদাবাবু, দু’বেলা কোনওমতে বাপ-মেয়ের খাবার নুন-ভাতটুকু জুটে যায়। অত টাকা দিয়ে আমার মেয়ের শখ মেটাবার ক্ষ্যামতা আমার আছে? তুমিই বলো।
‘তাই মরমে মরে ছিলাম গো দাদাবাবু। এই যে টাকাটা দিলে, আজ মেয়ের মুখে হাসি ফুটবে। তোমার খুব ভালো হোক, আল্লাতালার বরকত যেন তোমার ওপর সব সময় থাকে এই দোয়া করি।’
বলতে বলতে লোকটা রোগা হনুমানটাকে কাঁধে তুলে চোখের জল মুছতে মুছতে ফেরার পথ ধরল।
লোকটা চলে যাওয়ার পর খানিক ওদিকে তাকিয়ে থেকে জঙ্গলের দিকে মুখ ফেরালাম। এই জায়গাটাকে কী যেন বলছিল ছেলেটা? হ্যাঁ, দেবীর থান, মনে পড়েছে। কিন্তু কোন দেবীর থান? ভাবতে ভাবতে আনমনে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললাম। ঠিক সেই সময়ে পিছন থেকে চেনা স্বর ভেসে এল, ‘কী গো অতিথবাবু, কী দেখছ অমন করে?’
পেছনে ঘুরে দেখি, সেই মোক্ষদামাসি। আমি বিব্রত হয়ে বললাম, ‘দেখো মাসি, আমার কাছে আজ একটাই সিগারেট ছিল। আর নেই।’
মাসি আজ বোধহয় একটু সাজগোজ করে এসেছে। আগেরদিনের সেই অপরিছন্ন, ধুলোমাখা বিস্রস্ত বেশ আর নেই৷ আজ মাসি চুলে কলপ লাগিয়েছে, পরেছে একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি, তার সঙ্গে গলায় আর কানে ঝুলিয়েছে সস্তা নকল সোনার গয়না।
মানুষ প্রৌঢ়ত্বের কোঠায় পা রাখলে তার মধ্যে শান্ত স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আসে দেখেছি। মনে হয় যেন হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলের মায়াময় আলো। মোক্ষদামাসিকে দেখে আমার ঠিক সেরকমই মনে হল।
মোক্ষদামাসি একটু হেসে বলল, ‘না গো অতিথবাবু, আজ আর ছিগ্রেট খাব না। নেশা হল গিয়ে শত্তুর, বুঝলে তো। তাকে লাই দিলেই মাথায় চড়ে বসে।’
জানি না কেন, মাসির কথাগুলোও আজ ভারি মিষ্টি শোনাল। সেই একই গলার স্বর, তবুও তার মধ্যে কেমন যেন এক শুদ্ধ, স্নিগ্ধ, প্রসন্ন ভাব মিশে আছে।
কৌতুক করে বললাম, ‘সিগারেট খাবে না যখন, তাহলে দর্শন দিলে যে বড়? দেখো মাসি, আমি কিন্তু দাঁতে গুড়াখু দিই না। তাই ও জিনিসও কিন্তু পাবে না বলে দিচ্ছি।’
মাসি সশব্দে হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস জঙ্গলের দিক থেকে বয়ে এসে যেন হেসে লুটিয়ে পড়ল আমাদের ঘিরে।
মোক্ষদামাসি বলল, ‘কেন দর্শন দিলাম? ওই যে তুমি ওই দুখী মানুষটার মুখে হাসি ফোটালে, ওইটে দেখেই তো এলাম গো অতিথবাবু। তুমি বড় ভালো ছেলে। গরিবের দুঃখ বোঝো, সাধ্যমতো সাহায্য করো। আজকাল কে এত করে বলো তো? তোমার ভালো হোক গো অতিথবাবু, খুব ভালো হোক।’
বললাম, ‘বড় ভালো লাগল গো মাসি। এই যে তুমি আমার ভালো চাইলে, ব্যস, আমি এতেই খুশি। আজকাল আর কেই বা পরের জন্য অত ভাবে বলো।’
মাসি স্নিগ্ধ হেসে বলল, ‘সে তো বটেই। নিজের ভালো চাওয়া, আর পরের ভালো করা, এই তো ধর্ম। এর বাইরে ধর্ম বলতে আর কী আছে গো? আমি, আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, আমাদের ঘিরে থাকা প্রকৃতি, গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি, জন্তুজানোয়ার, এমনকী ভিটের জমির কেন্নো অবধি, সবার ভালো চাওয়াই তো ধর্ম।’
এই বলে মাসি একটা অদ্ভুত কাজ করল। নিজের শাড়ির আঁচল থেকে খানিকটা কাপড় ছিঁড়ে আমার ডান হাতের বাহুতে বেঁধে দিল। তারপর স্নেহের সুরে বলল, ‘এই কাপড়ের টুকরোটা আর খুলবে না গো অতিথবাবু। একে যত্নে রেখো। তোমার ভালো হবে।’
ততক্ষণে আমি পাথর হয়ে গেছি। কারণ মাসি আমাকে ছোঁওয়ার সঙ্গে আমার শরীরের মধ্যে সেই বিদ্যুতের শক খেলে গেছে, যেটা আমি ডক্টর লাহার এগিয়ে দেওয়া ফটোটা ছুঁয়ে অনুভব করেছিলাম।
মোক্ষদামাসি আমার ওই অবস্থা দেখে মৃদু হাসল। বলল, ‘নিজের গুরুর কথাটা শুনো গো অতিথবাবু। তাঁর শেখানো বিদ্যেটা এবার কাজে লাগাও। ওই কাকচক্ষুর বিদ্যেই এবার তোমাকে পথ দেখাবে।’
বলতে বলতে মোক্ষদামাসি হেঁটে গেল বটগাছ আর তার গোড়ায় বাঁধানো ভাঙাচোরা বেদি পেরিয়ে বকরাক্ষসের জঙ্গলের মধ্যে। তখন সূর্য মধ্যগগনে। আমার চোখে যেন ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল৷ এ কী! মাসি এমন অনায়াসে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল কী করে?
ধীরে ধীরে মাসির শরীর মিলিয়ে যাচ্ছিল বকরাক্ষসের জঙ্গলের মধ্যে। সেখান থেকেই তার স্বর ভেসে এল, ‘তুমি জানতে চাইছিলে না এ কোন দেবীর থান? তাহলে শোনো, এ আমারই থান। আমিই এই জঙ্গলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী৷ আমার নাম মোক্ষদা নয়, আমি দেবী মোক্ষচানী।’
আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখলাম, একটা বাসন্তী রঙের শাড়ির আঁচল যেন একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়েই আবার অন্ধকারে মিশে গেল। আঁচল বলা ভুল, আঁচলের প্রান্তটুকু। আর তার সঙ্গেই ভেসে এল একটা ক্ষীণ হাসির শব্দ। ঠিক প্রথম দিনের মতো।
প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে আমার দিকে চাইলেন প্রফেসর লাহা, ‘হঠাৎ এই প্রশ্ন করার কারণ?’
ট্রেন তখন কৃষ্ণনগর ছাড়িয়ে বাদকুল্লা ঢুকব ঢুকব করছে। এখন সকাল প্রায় দশটা। এর মধ্যেই এত রোদ চড়ে গেছে যে বাইরে তাকানো দায়। বসেছিলাম জানলার পাশে। কামরায় থিকথিক করছে লোক, সবাই রুজিরোজগারের টানে কলকাতা চলেছে।
প্রফেসর লাহার থেকে সেটাই জানতে চেয়েছিলাম, যেটা নিয়ে মোক্ষদামাসি আমাকে ‘ইনভিস্টিগিটি’ করতে বলেছিল— কী করে এই জমিদারি জয়ন্তদের পূর্বপুরুষদের হাতে এল।
বললাম, ‘না মানে, এমনিই আর কী। শুনেছিলাম যে সামন্ত বিক্রমরাজের রাজত্ব নাকি এক রাত্রিতে বকরাক্ষসের অভিশাপে ধ্বংস হয়ে গেছিল। তারপর এই জমিদারি কী করে জয়ন্তদের হাতে এল, সেইটে জানার কৌতূহল হচ্ছিল।’
প্রফেসর লাহা বললেন, ‘নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রর নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। সেই বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন জানেন?’
তখন বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বলে উত্তরটা জানা ছিল। বললাম, ‘ভবানন্দ মজুমদার। অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনী।’
‘বাহ!’ উত্তর শুনে খুশি হলেন প্রফেসর লাহা, ‘ইয়েস। ভবানন্দ মজুমদার। সেই ভবানন্দ মজুমদারের ছেলে ছিলেন রাঘব রায়। এই দেবগ্রাম অঞ্চল তিনিই নিজের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁদের থেকেই জয়ন্তবাবুর পূর্বপুরুষরা জমিদারির সনদ পেয়েছিলেন। তবে এ সাধারণ তথ্য। জয়ন্তবাবু বা শিপ্রাদেবীকে জিগ্যেস করলেই জানতে পারতেন।’
মনে মনে এত হতাশ হলাম যে বলার নয়। মোক্ষদামাসি সেদিন জয়ন্তর পূর্বপুরুষদের এই জমিদারি প্রাপ্তির ব্যাপারটা এমন রহস্য করে বলেছিল, মনে হচ্ছিল যেন এটা জানলেই সব রহস্য খোলসা হয়ে যাবে। বেজারমুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
প্রফেসর লাহা একটু হেসে বললেন, ‘কী হল, উত্তরটা আপনার পছন্দ হল না মনে হচ্ছে? না হলে অবশ্য আমার কিছু করার নেই। “অন্নদামঙ্গল”-এ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর স্বয়ং লিখে গেছেন।’
এরপর আর কিছু বলার থাকে না। জ্যোতিষ বাগল দেখলাম ওই ভিড়ের মধ্যেই চোখ বুজে ঝিমোচ্ছেন। রাত্রিবেলা বোধহয় ভালো ঘুমোননি। প্রফেসর লাহা একটা বই খুলে পড়তে শুরু করলেন। আমি চোখ বুজে কাল দুপুর থেকে আজ ভোর অবধি আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আবার ভেবে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম।
কাল জঙ্গল থেকে ফিরেছিলাম প্রায় টলতে টলতে। মনে হচ্ছিল যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি। যা দেখলাম, যা শুনলাম সে কি সত্যি? নাকি স্বপ্ন? কে ওই মহিলা, যিনি মোক্ষদামাসির রূপ ধরে আমাকে দেখা দিয়ে গেলেন? তিনি কি মানবী? নাকি দেবী? বটবৃক্ষমূল সত্যিই তাঁর থান?
বিছানায় শোওয়ার সঙ্গে হু-হু করে আমার গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এক অবাধ্য, দামাল বুনো জ্বর। মুহূর্তের মধ্যে সারা শরীর জুড়ে নেমে এল তপ্ত বৈশাখী দুপুরের উত্তাপ। আর সেই উত্তপ্ত আগুনের গ্রাস দ্রুত, অতি দ্রুত গিলে ফেলছিল আমাকে। আমার সমস্ত অস্তিত্ব তখন যেন জ্বলছিল এক অনন্তচিতায়। মনে হচ্ছিল আমি ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছি আদিম অন্ধকারের চোরাবালিতে। নিশ্চেতন, নিশ্চেষ্ট পক্ষাঘাত বেঁধে ফেলছিল আমাকে। নিতান্ত অসহায়ের মতো তার গ্রাসের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলাম আমি, মিশে যাচ্ছিলাম এক বোধহীন নিশ্চিহ্নতার পথে।
অবশেষে সেই সময় এল। বোধহীন, বেধহীন, মাত্রাহীন এক গহীন অতলে স্থির হলাম আমি। আর সেই অন্ধকার গর্ভ আমাকে জড়িয়ে নিল তার সমস্ত সর্বগ্রাসী উত্তাপের চাদরে। বুঝলাম, আমি মরে গেছি।
জানি না, কত অনিঃশেষ মুহূর্ত ধরে এক শবদেহের মতো সেখানে পড়েছিলাম। অনন্তকাল পর সেই অন্ধকারের বুক চিরে একটি অতি পরিচিত ক্ষীণস্বর ভেসে এল, ‘কী খোকাবাবু, ভালো আছ?’
আমার অস্তিত্ব কোনওরকমে শুনল সেই ডাক৷ তার উত্তর দেওয়ার জন্য আমার সমস্ত শরীর ফেটে পড়তে চাইল! কিন্তু হায়, আমার সমস্ত চৈতন্য তখনও যেন স্তম্ভিত, স্থাণু, মৃতপ্রায়।
সেই পরিচিত স্বর ক্রমে জেগে উঠল, ‘কী খোকাবাবু, কোথায় তুমি?’
আমার অন্তর থেকে কে যেন উঠে এসে প্রশ্ন করল, ‘তুমি… তুমি এসেছ মনা মাঝি?’
সেই চিরপরিচিত খিকখিক হাসিটা ভেসে এল অন্ধকারের বুক চিরে। হাসি থামলে মনা মাঝি বলল, ‘কী করি বলো খোকাবাবু! চেলা বলে স্বীকার করেছি যখন, বিপদে-আপদে না এসে কি পারি?’
আমার অন্তরাত্মা প্রশ্ন করল, ‘উনি কে মনা মাঝি? কে এই দেবী মোক্ষচানী? বকরাক্ষসের জঙ্গলে ঢোকার মুখে তাঁর থান কেন? কে এই দেবী?’
মনা মাঝির গাঢ় স্বর ভেসে এল, ‘বড় ভাগ্য করে জন্মেছ গো খোকাবাবু। যাঁর রাঙা পা দু’খানি পাব বলে আজীবন সাধনা করে এসেছি, সেই তিনিই আজ তোমাকে দেখা দিয়ে আশীর্বাদ করে গেলেন। মা সাক্ষাৎ সিদ্ধবিদ্যা, মায়ের কৃপায় সাধকের সমস্ত কামনা বাসনা পূর্ণ হয়৷ আমরা, মায়ের সাধকেরা জন্ম-জন্মান্তর সাধনা করে যাই তাঁর কৃপাকণাটুকু পাব বলে। অথচ তিনি এতই চঞ্চলা যে কখন কার প্রতি কৃপা করবেন, তা জানা স্বয়ং ব্রহ্মারও অসাধ্য।
‘আজ তিনিই এক গ্রামের মেয়ের রূপ নিয়ে তোমাকে দর্শন দিয়ে গেলেন। ভারি হিংসে হচ্ছে গো খোকাবাবু, ভারি হিংসে হচ্ছে।’
আমার চেতনা থেকে প্রশ্ন উঠে এল, ‘আমি এখন কী করব মনা মাঝি?’
‘যে বিদ্যে তোমাকে শিখিয়েছি, সেই বিদ্যে জাগিয়ে তোলো খোকাবাবু৷ মা নিজেও তোমাকে তাই করতে বলে গেছেন। আমার কথাটা শুনো। নইলে তোমার কিন্তু মস্ত বড় বিপদ আসতে চলেছে, এই বলে দিলাম।’
মনা মাঝির স্বর মিলিয়ে যেতেই বিছানার ওপর উঠে বসলাম। পুব দিকে তাকিয়ে বুঝলাম এ ব্রাহ্মমুহূর্ত। অনুভব করলাম, সমস্ত শরীরখারাপ অলৌকিক মন্ত্রবলে উধাও৷ জ্বর-টর তো নেই-ই, বরং সারা শরীরে মনে এক চনমনে অনুভূতি!
প্রাতকৃত্যাদি শেষ করে স্নান করে পরিশুদ্ধ হলাম। তারপর বিছানায় বসেই খানিক ধ্যানজপ করলাম মনের শক্তি একাগ্র করতে। কাকচক্ষু বিদ্যার পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে মনের শক্তির ওপর৷ আর সেটা নিয়মিত অভ্যাসের ব্যাপার। গত দশ বছরের অনভ্যাসে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ যে অনেকটাই চলে গেছিল, বুঝতে পারলাম। তবে গুরু যদি কৃপা করেন তো অসম্ভবও সম্ভব হয়। তাই মনে মনে গুরুপ্রণাম করে মনের শক্তি সংহত করে গুরুদত্ত বিদ্যা জাগ্রত করতে শুরু করলাম।
না, কাজটা সহজ নয়৷ সব শিক্ষারই নিয়মিত অভ্যাসের প্রয়োজন হয়৷ ব্যক্তিগত আলস্যই হোক বা আমার অবহেলা, যে অমূল্য বিদ্যা মনা মাঝি অযাচিতভাবে আমাকে উপহার দিয়ে গেছিল, তাকে আমি ইতিমধ্যেই খুইয়ে বসেছি। তবুও আমি চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলাম। ক্রমে আমার কপাল, মুখ, সারা শরীর জুড়ে ঘাম জমতে লাগল। স্নায়ুদণ্ড বরাবর একটা চিনচিনে ব্যথা ঘাড় থেকে কোমরের নিচ অংশ অবধি বিদ্যুতের মতো যাতায়াত করতে থাকল।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল, কিন্তু চঞ্চল চিত্ত কিছুতেই স্থির হল না। বুঝতে পারলাম, যে মহাবিদ্যা আমার করায়ত্ত হয়েছিল, সেই অমূল্য ধন শুধুমাত্র নিজের দোষে, নিজের অবহেলার কারণে আমি হারিয়ে ফেলেছি। মা আমাকে পরিত্যাগ করেছেন।
কতক্ষণ বিছানায় বসেছিলাম, জানি না। যখন চেতনা ফিরল তখন মনে পড়ল যে আজই সকালে প্রফেসর লাহা আর জ্যোতিষ বাগলের সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার কথা। ব্রেকফাস্ট করব বলে নীচে এসে দেখি জয়ন্তও নেমেছে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে অত্যন্ত দুর্বল। কার্তিকের মা একটা স্যুপ করে দিয়েছে, সেটাই একটা সেঁকা পাঁউরুটি দিয়ে খাচ্ছে৷
আমাকে দেখে কার্তিকের মা বলল, ‘ঝটপট চান করে এসো দাদা, তোমাকেও খাবার বেড়ে দিই।’
বললাম, ‘স্নান আমি সকালেই সেরে নিয়েছি দিদি। তুমি আমাকে খুব অল্প কিছু দিও। আজ কলকাতা যাচ্ছি, ফিরতে রাত হবে।’
জয়ন্ত ক্লান্ত অথচ জিজ্ঞাসাভরা চোখে আমার দিকে চাইল। বুঝলাম ও জানতে চাইছে আমি কোথায় যাচ্ছি৷ আমি আজকের সারাদিনের প্ল্যান খুলে বললাম। জয়ন্ত ঘাড় নাড়ল। তারপর ক্ষীণস্বরে বলল, ‘আমার যে যেতে খুব ইচ্ছে করছে নিবারণ। কিন্তু উপায় নেই।’
আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘আজকের দিনটা বিশ্রাম নে। আমি এসে কী কী করলাম সব ডিটেইলসে বলব।’
তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট শেষ করে স্টেশনে এসে দেখি, প্রফেসর লাহা আর জ্যোতিষ বাগল দুজনেই উপস্থিত। গুড মর্নিং জানাতে-জানাতেই ট্রেন চলে এল কয়েক মিনিটের মধ্যেই।
তারপর তিনজনে চলেছি কলকাতার উদ্দেশে…
খানিক পর ভারি বিরক্ত হয়ে উসখুস করতে লাগলাম। প্রফেসর লাহা চশমার ওপর দিয়ে আমাকে দেখে বললেন, ‘কী হল নিবারণবাবু? খুব বোর হচ্ছেন মনে হচ্ছে?’
চান্স পেয়েই একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ‘আচ্ছা প্রফেসর লাহা, আপনি সেদিন যে বলছিলেন রতন মণ্ডলের ওই চুরি করা মূর্তিটার সঙ্গে নাকি হরপ্পা সভ্যতার কী একটা যোগ আছে, সেটা কি সত্যি?’
প্রফেসর লাহা বললেন, ‘আছে তো। মূর্তিটার ওই বকের মতো মুখই তার প্রমাণ। ব্যাপারটা সবিস্তারে বোঝাতে গেলে আপনাকে এখন প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসের অনেক কিছু বোঝাতে হবে। তার সময়ও নেই।
‘সংক্ষেপে বলি। ধর্মের উদ্ভবের প্রথম দিকে যাঁদের পূজা করা হতো তাঁরা সবাই ছিলেন দেবী। তার অনেক কারণ ছিল। সভ্যতার উষাকালে সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক, প্রজননের সঙ্গে জমির উর্বরতা এক করে দেখা হতো। ধীরে ধীরে সেই আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বিভিন্ন জাদুবিশ্বাস বিকশিত হয়ে ধর্মের বিকাশ ঘটে। নারীদের সঙ্গে ভূ, মানে পৃথিবী, প্রাণ, প্রজনন, চাষবাস, ঝরনা, নদী, যুদ্ধ সব কিছুই এক করে দেখানো হতো।
‘ভারতীয় উপমহাদেশে হরপ্পা মহেঞ্জোদারো ছাড়াও মেহেরগড়, ঝোব বা বেলুচিস্তানের কুল্লি ঢিবি থেকে প্রাচীনকালে উপাস্য মাতৃকাদের অনেক মূর্তি পাওয়া গেছে। সব মাতৃমূর্তিই বড় ভীষণা, করোটির মতো মুখ। তাঁরা যেমন জীবনের দেবী, তেমনই পাতাললোকেরও ঈশ্বরীও। তাঁদের মূর্তির মধ্যে একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য ছিল। প্রায় অধিকাংশ মূর্তির মুখই ছিল কোনও না কোনও পাখির মুখ। সবারই চোখ বড় বড়, ভীতিপ্রদ। চঞ্চু বা ঠোঁট অতি দীর্ঘ। এই বাংলাতেও পাণ্ডুরাজার ঢিবি নামে একটি অত্যন্ত বিখ্যাত প্রত্নস্থান আছে। জায়গাটা বোলপুর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকেও প্রচুর পাখির মুখওয়ালা মাতৃকামূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে।’
প্রফেসর লাহার কথাগুলো কিছুটা বুঝলাম, অনেকটাই বুঝলাম না। প্রশ্ন করলাম, ‘দেবীমূর্তির পাখিদের মতো হওয়ার ব্যাপারটা বুঝলাম না।’
প্রফেসর লাহা সামান্য হাসলেন। তারপর বললেন, ‘স্বাভাবিক। আপনি ইতিহাস, অ্যানথ্রোপলজি বা আর্কিওলজির ছাত্র নন। আপনার বোঝার কথাও নয়। আমি খুব সহজ করে বোঝাবার চেষ্টা করছি।
‘সারা বিশ্ব জুড়ে আদিম দেবীদের যত মূর্তি পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে দুইটি প্রাণীর উপস্থিতি যাকে বলে একেবারে অনিবার্য ছিল। এক হচ্ছে পাখি, দুই হচ্ছে সাপ। এর পেছনেও অনেক নৃতাত্ত্বিক কারণ আছে৷ সেসব উল্লেখ করছি না। তবে একটু খোঁজখবর করলেই জানতে পারবেন এই পক্ষীমুখী মাতৃকাপূজার ধারা মেনেই আমাদের এই বাংলার তন্ত্রে মাতৃকাদের সহচর বা সহচরীরূপে পাখিদের বহুল উপস্থিতি আছে।
‘যেমন ধরুন মাতঙ্গী, সরস্বতী বা শ্রীকুলের দেবীদের শুকপাখি, কালীর বক আর কাক, ধূমাবতীর কাক, সরস্বতীর হাঁস আর ময়ূর, কৌমারীর ময়ূর আর মোরগ, মহামায়ূরী এবং ত্বরিতার ময়ূর, লক্ষ্মীর প্যাঁচা, ব্রাহ্মীর হাঁস… অজস্র উদাহরণ।’
প্রশ্ন করলাম, ‘সে তো সহচর বা বাহন হিসেবে। কিন্তু দেব-দেবী রূপে?’
‘তারও অনেক উদাহরণ আছে। দেবী চণ্ডিকার কোকামুখী বা শৃগালমুখী রূপের কথা জানেন নিশ্চয়ই। দেবী বারাহীর মুখও শূকরীর মতো। তাছাড়া সিংহের মুখযুক্ত নারসিংহী, শৃগালমুখী শিবদূতী। আপনি তো এখন সরকারি চাকরির প্রিপারেশন নিচ্ছেন। অভয়ামঙ্গলে গোধিকাসনা চণ্ডী নিজেই স্বর্ণগোধিকার রূপ ধারণ করেছেন, সে নিশ্চয়ই পড়েছেন?’
কথাগুলো মাথায় ঢুকতে একটু সময় লাগল। প্রফেসর লাহা আমার মুখের ভাব দেখে বোধহয় তৃপ্ত হলেন৷ বললেন, ‘এখন যে মূর্তিটা আমরা রতন মণ্ডলের কাছ থেকে উদ্ধার করেছি, সেটিও যে একটি পাখির মুখওয়ালা মাতৃকামূর্তি সেটা নিশ্চয়ই ছবি দেখে বুঝতে পেরেছেন। ওই জন্যই ওটা আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেবলরাজার গড়ে এমন আরও অনেক পক্ষীমাতৃকার মূর্তি পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের মেনে নিতেই হবে যে আজ থেকে দুই-আড়াই হাজার বছরের আগে থেকেই মেহেরগড় আর বাংলার মধ্যে একটা যোগাযোগ তো ছিলই। ফলে আরিয়ান ইনভেনশন থিওরি, মানে আর্যজাতি বাইরে থেকে এসে ভারতজয় করেছিল, এই ধারণা আরও জোর ধাক্কা খাবে। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বদলে যাবে।’
প্রফেসর লাহা আমার মুখ দেখে বুঝতে পারছিলেন না, তিনি যখন আমাকে পক্ষীমাতৃকা নিয়ে লেকচার দিচ্ছিলেন, তখন আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আমার কাকচক্ষু উন্মীলিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। ফলাফল সকালের মতোই, শূন্য। খানিক চেষ্টা করে আমি হাল ছেড়ে দিলাম।
একটু পর ট্রেন শিয়ালদা পৌঁছলে আমরা ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। তত ব্যস্ত হওয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু কেউ যদি ট্রেন থেকে নেমেই দেখে তার আশেপাশের সব্বাই উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছে, তাহলে তার মধ্যেও একটা দৌড়নোর প্রবণতা জন্মায়। আমরাও তাই সেই ধাবমান উন্মত্ত জনস্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছি, আর তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটল। আমি যেন কারও একটা চপ্পল পরা পায়ে পা লাগিয়ে প্ল্যাটফর্মের ওপর সটান উপুড় হয়ে পড়লাম। আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা কোথায় যেন ছিটকে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে চারিদিকে একটা হইচই বেধে গেল। প্রফেসর লাহা আর জ্যোতিষবাবু হাঁ-হাঁ করে দৌড়ে এলেন আমাকে তুলে ধরার জন্য। চারিপাশে লোকজনের ভিড় জমে গেল দ্রুত। সমবেত সাহায্যকারীদের ‘আহা, পড়ল কী করে?’, ‘গরমে মাথা ঘুরে যায়নি তো?’, ‘মাথা-টাথা ফাটল নাকি?’ এসবের মধ্যেই কেউ একজন এগিয়ে এসে আমার মুখে জলের ঝাপটা দিলেন।
মাথাটা প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে জোর ঠুকে গিয়ে ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। চোখে যেটা দেখছিলাম সেটাকেই খুব সম্ভবত লোকে সরষেফুল বলে। যখন উঠে বসলাম, তখনও চোখের সামনেটা অন্ধকার দেখছি।
কয়েক মুহূর্ত পর দৃষ্টি পরিষ্কার হতে দেখলাম, আমাকে ঘিরে কয়েকটি অপরিচিত উদ্বিগ্ন মুখ। তাঁদেরই এক-দুজনকে ধরে খাড়া হলাম। চারিদিক থেকে ধেয়ে আসা ‘কী করে পড়লেন মশাই’, ‘শরীর ঠিক আছে তো?’, ‘ডাক্তারখানায় একবার দেখিয়ে নিন না’, এর উত্তর দিতে যাব, এমন সময় একটু দূরে থামের আড়ালে একটা পরিচিত মুখ দেখে থমকে গেলাম।
পরনে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর নোংরা লুঙ্গি, হাড় জিরজিরে শরীর, আর একমুখ জংলি দাঁড়িগোঁফ, একটা শরীর আমাকে একবার দেখা দিয়েই যেন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। আমি শুধু শেষ মুহূর্তে লক্ষ করলাম তার পায়ের চপ্পলটা। ওটাতেই কি হোঁচট খেয়ে পড়লাম?
গত দু’দিন ধরে অবাক হওয়া ভুলে গেছি! তাই মনা মাঝিকে এখানে দেখে আশ্চর্য হলাম না। নিজের পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছি দেখে এতক্ষণ ধরে আমাকে ঘিরে থাকা জমায়েতটা দ্রুত হালকা হয়ে গেছিল। এটাই স্বাভাবিক। শিয়ালদা হল গিয়ে এশিয়ার ব্যস্ততম স্টেশন।
সবাই চলে গেছে। প্ল্যাটফর্ম প্রায় খালি। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বেরোব। এমন সময় দেখলাম প্রফেসর লাহা আমার দিকে তীব্রচোখে তাকিয়ে আছেন, তাঁর এক হাতে আমার ঝোলা, আর অন্য হাতে আমার ঝোলা থেকে ছিটকে পড়া একটা প্রাচীন বই, যার নাম ‘দেবল বংশাবলী চরিত’।
কাল ডাক্তার দত্তচৌধুরী লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও আমি বেশ কিছুক্ষণ থেকে গেছিলাম বইঘরে। ডাক্তার দত্তচৌধুরী যা বলে গেছিলেন, তার পরে ওই বইটা খুঁজে বার করা আমার জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। কেমন যেন মনে হচ্ছিল ওর মধ্যেই একটা বড় সমাধান লুকিয়ে আছে।
কিন্তু প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও এই নামের কোনও বইয়ের খোঁজ পেলাম না। এর মধ্যে কার্তিকের মা বার দুয়েক ডাকতে এসে সাড়া না পেয়ে ফিরে গেছে। শেষে সে যখন শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে গম্ভীরস্বরে বলল, ‘এবার এই ধুলো ঘাঁটা বন্ধ করে আমার সঙ্গে এসো দিকিনি। রানিমা তোমাকে ডাকছেন,’ তখন নেহাত বাধ্য হয়েই তার সঙ্গে যেতে হল।
এর আগে শিপ্রাকাকিমার ঘরে ঢোকার সৌভাগ্য হয়নি। এবার ঢুকে মনে হল, হ্যাঁ, গাংনাপুরের জমিদারনীর ঘর এমন হলে তবেই মানায়৷ ঘরের সিলিংটাই প্রায় দেড়তলা উঁচু। ঘরের কোণে প্রাচীন ডিজাইনের তেকোনা ফার্নিচার আর তার ওপরে সাজিয়ে রাখা অ্যান্টিক শো-পিস, দেওয়ালে ঝোলানো দামি ছবি আর অভিজাতদর্শন ঘরসজ্জার সামগ্রী, তার সঙ্গে ছত্রিওয়ালা প্রাচীন খাট, সব মিলিয়ে অতি জমকালো ব্যাপার বটে।
শিপ্রাকাকিমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। এক রাতের মধ্যেই কাকিমার চোখমুখ পুরো বসে গেছে৷ শরীরে একটা ক্লান্ত হলুদ আভা। কাকিমা আমাকে তাঁর পাশে বসতে ইশারা করলেন। তারপর ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘বাবা নিবারণ, বলছিলাম, কিছু খুঁজে পেলে? এই অঞ্চলে যা ঘটছে, আশু একটা সুরাহা না হলে কিন্তু যে কোনওদিন মস্ত অঘটন ঘটে যেতে পারে।’
স্বীকার করতেই হল, এখনও অবধি কিছু খুঁজে পাইনি তবে বেশ কিছু সূত্র জোগাড় হয়েছে৷ কথায় কথায় বইঘরের কথাটা এল। শিপ্রাকাকিমা জিগ্যেস করলেন, ‘কার্তিকের মা বলছিল, তুমি নাকি আজ বইঘরে অনেকক্ষণ ধরে কী একটা বই খুঁজছিলে। বিশেষ কোনও বই কি, বাবা?’
আমার মাথায় কী চলকে উঠল, জানি না! ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম, ‘হ্যাঁ। একটা রেয়ার বই, নাম “দেবল বংশাবলী চরিত”।’
কাকিমার মুখ দেখে মনে হল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থেকে বললেন, ‘তুমি এই বইটার নাম জানলে কোথা থেকে?’
আমার মাথায় তখন দুষ্ট সরস্বতী ভর করেছে। অম্লানবদনে বললাম, ‘এই দেবলরাজার গড়ের এক্সকাভেশনের দায়িত্বে যিনি আছেন, প্রফেসর দেবব্রত লাহা, তিনিই এর খোঁজ দিলেন। বললেন বইটা পেলে আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ওঁকে একবার দেখাতে।’
সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে হেলে পড়বে পড়বে করছে৷ তার আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল কাকিমার ফরসা গালে। তাতে বুঝতে পারলাম যে কাকিমার ইতিমধ্যেই গাল রাঙা হয়ে উঠেছে। চোখটা সামান্য নরম হয়ে এল। আমার দিকে খানিক চেয়ে থেকে মুখটা জানলার দিকে ঘুরিয়ে নিলেন কাকিমা।
দুষ্ট সরস্বতী বড়ই অবাধ্য দেবী৷ তিনি আমার ঘাড় থেকে নামার কোনও লক্ষণই দেখালেন না। এখানে আমার চুপ করে যাওয়া উচিত ছিল। তার বদলে আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম যে, আমি ওঁকে প্রশ্ন করছি, ‘ইয়ে, উনি বলছিলেন যে আপনি নাকি ওঁকে চেনেন। এককালে এই বাড়িতে ওঁর যাওয়া-আসা ছিল। কথাটা সত্যি নাকি?’
কাকিমা মুখটা জানলার দিকে ঘুরিয়ে রেখেই ধীরস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, উনি আমার কলেজের সহপাঠী ছিলেন। সেই সূত্রে উনি অনেকবারই আমাদের বাড়িতে এসেছেন। বইঘরেও গেছেন অনেকবার। এমনকী শেষ দিকে শুধু বইঘরে যাওয়ার জন্যেই এ বাড়িতে আসতেন।’
কার্তিকের মা দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে বললাম, ‘দু’কাপ আদা দিয়ে বেশ কড়া লিকার চা করে আনো তো দিকি৷ কাকিমার সঙ্গে বেশ কিছু কথা আছে।’
কার্তিকের মা বেরিয়ে যেতে আমি তীব্রস্বরে প্রশ্ন করলাম, ‘কাকিমা, পুরো কথাটা খুলে বলবেন আমাকে? নইলে কিন্তু আপনাকে সাহায্য করতে পারব না।’
শিপ্রাকাকিমা ধীরে ধীরে মুখটা এদিকে ফেরালেন। পরিণত বয়সে যৌবনের প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করলে দেখেছি মানুষের মুখে হেমন্তের এক আশ্চর্য আলো খেলা করে। শিপ্রাকাকিমা একটু ম্লান হেসে বলতে শুরু করলেন।
‘ওঁর সঙ্গে আমার আলাপ কলেজে পড়তে গিয়ে৷ তখনই শুনেছিলাম, ওঁর পূর্বপুরুষও নাকি এই অঞ্চলেরই লোক ছিলেন। তাই ছোটবেলা থেকেই ওঁর এই দেবলগড়, রাজা দেবলের কিংবদন্তী, বিক্রমরাজের অভিশাপ এসব নিয়ে খুব উৎসাহ ছিল।
আমাদের দুজনেরই সাবজেক্ট এক ছিল, হিস্ট্রি। সাবজেক্ট এক হওয়া ছাড়াও আমাদের অনেক শখ, ইচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ বেশ মিলত। সেই সূত্রেই ওনার সঙ্গে আমার বেশ গভীর বন্ধুত্ব হয়।
‘উনি আমাদের বাড়ি প্রায়ই আসতেন। আমার বাবা-মা’ও বেশ পছন্দ করতেন ওঁকে। উনি এ বাড়িতে এসে বেশিরভাগ সময়েই ওই বইঘরে কাটাতেন। মা-বাবা খুশি হতেন খুব। ভাবতেন ওঁদের মেয়ের বিশেষ বন্ধু খুবই বই পড়ুয়া, টিচার বা প্রফেসর।’
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বললাম, ‘তাহলে? বইটা উনি খুঁজে পেলেন না কেন?’
শিপ্রাকাকিমার মুখে বাতাসের একটা ঝাপট খেলে গেল, ‘কারণ বইটা ওঁর হাতে দিইনি, তাই। ওটা বরাবর আমার কাছেই ছিল।’
আমার মাথার সমস্ত অ্যান্টেনা তখন খাড়া হয়ে উঠেছে, ‘কেন কাকিমা? ওঁর হাতে দেননি কেন?’
শিপ্রাকাকিমা এইবার আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চাইলেন। মনে হল যেন চকিতের জন্য তাঁর মুখে কিশোরীবেলার কষ্টের ছায়া দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। বললেন, ‘বইটা খুব রেয়ার বই, বুঝলে বাবা! রেয়ার মানে খুবই রেয়ার। সেটা আমি বা আমার বাবাও জানতাম। তাই বইটা খুব সুরক্ষিত জায়গায় রাখা ছিল। আমি একবার মুখ ফসকে ওঁর কাছে বইটার কথা বলে ফেলেছিলাম। সেই থেকে উনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে বা, আরও ভালো করে বলতে গেলে বইঘরে আসতেন বইটার খোঁজে।’
আমি আগের প্রশ্নটাই রিপিট করলাম, ‘কিন্তু আপনি বইটা ওঁর হাতে তুলে দিলেন না কেন?’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গাংনাপুর রাজবাড়ির রানিমা, ‘চাইলে হয়তো পারতাম, জানো। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, উনি এত ঘন ঘন এই বাড়িতে আসেন শুধুমাত্র ওই বইটার খোঁজে। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য নয়। ক্রমেই আমার মনে হতে লাগল যে বইটা আমার…’
মুখ ফসকে বলে ফেললাম, ‘সতীন?’
কথাটা মুখ ফসকে বলে ফেলেই শঙ্কিত হয়ে উঠলাম। ছি ছি ছি, এই ইতর প্রগল্ভতা আমার মুখে এল কী করে?
কিন্তু শিপ্রাকাকিমা রাগলেন না৷ বরং ক্লান্ত হেসে বললেন, ‘তোমরা আজকালকার ছেলে, আমাদের থেকে অনেক বেশি বোঝো। তাই তোমার কাছে আর লুকোব না৷ হ্যাঁ, ওঁর সঙ্গে আমার একটা বিশেষ সম্পর্ক ছিল। সেটা পরিণতি পেতে পেতেও এগোয়নি ওই বইটার জন্যই…
‘অথচ প্রথমে এমন ছিল না। আমার বাবা বইটা লাইব্রেরি থেকে সরিয়ে এনে যত্ন করে রেখেছিলেন একটা বিশেষ কারণে। কোথায় রেখেছিলেন সে আমি জানতাম। আমার কাছে একবার চাইলেই হয়তো বইটা ওঁর হাতে তুলে দিতাম৷ কিন্তু ওঁর ওই বইটার প্রতি অন্ধ, উন্মাদের মতো আকর্ষণ দেখে বইটার প্রতি, তুমি যে শব্দটা মুখ ফসকে উচ্চারণ করে ফেললে, হ্যাঁ, সেই একটা সতীনের মতোই বিদ্বেষ জন্মাল। সেই থেকে আমাদের মধ্যে মনোমালিন্যের সূত্রপাত। তারপর তো…’
শিপ্রাকাকিমা কথাটা শেষ না করেই চুপ করে গেলেন। ততক্ষণে কার্তিকের মা দু’কাপ চা দিয়ে গেছিল। দুজনে নীরবে চা খেলাম। তারপর কাকিমা কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বিছানার ওপর বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বিছানা থেকে নেমে, দেরাজ থেকে চাবি নিয়ে, দেওয়ালে গাঁথা আলমারির থেকে একটা বই আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘বইটা লাহাবাবুর হাতে দিও। বোলো যে ওঁকে দেওয়ার মতো আমার কাছে এ ছাড়া আর অন্য কিছু নেই। এ আমি আর ফেরত চাই না। আশা করি তিনি খুশি হবেন।’
