দেবলরাজার গড় – ৫

পরের দিন ঘুম ভাঙল জয়ন্তর ধাক্কাধাক্কিতে, ‘নিবারণ, এই নিবারণ, শিগগিরি ওঠ। এদিকে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে!’

ধড়মড় করে উঠে বসলাম, ‘কী হল, কী হয়েছে?’

‘ওসি সাহেবের ফোন এসেছিল৷ রমেনবাবু খুন হয়েছেন।’

‘মানে? সে কী? কী করে?’

‘কে যেন রাত্রিবেলা ওঁর শোওয়ার ঘরে ঢুকে গলাটা মুচড়ে রেখে গেছে৷ আর চোখদুটো খোবলানো।’

আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলাম। জয়ন্ত তাড়া দিল, ‘তাড়াতাড়ি চল। লোকজন থানা ঘেরাও করেছে, ওখানে বাগলবাবু আর ডক্টর লাহাও আছেন। আমাদের এক্ষুনি যেতে হবে।’

খানিকটা সময় গেল হতভম্ব ভাবটা কাটাতে৷ তারপর বিছানা থেকে লাফিয়ে নামলাম৷ সর্বনাশ করেছে! এখানে এবার পশুপাখির পর মানুষ খুন হওয়া শুরু হল নাকি?

থানায় গিয়ে দেখলাম হুলস্থুল কাণ্ড। অন্তত শ’খানেক লোক জড়ো হয়েছে থানার সামনে। মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছে। ওসি ওসমান সাহেব চেঁচিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সে কথা লোকের কান অবধি পৌঁছচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

আমাদের দেখে ভিড় খানিক শান্ত হল। জয়ন্ত, আমি আর পীতাম্বরবাবু দ্রুত ঢুকে পড়লাম থানার ভেতর। দেখি বাগলমশাই জবুথবু হয়ে বসে আছেন, আর তার পাশে বসে আছেন ডক্টর লাহা। চোখ বুজে, ধ্যানস্থ।

জয়ন্তকে দেখে হাউমাউ করে উঠলেন জ্যোতিষ বাগল, ‘ও মশাই, এ কী কাণ্ড! সরকারি কাজ করতে এসে প্রাণটা খোয়াব নাকি? লোকে তো আমাদের মুন্ডু চাইছে মশাই।’

জয়ন্ত ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করল, ‘চিন্তা করবেন না। আমরা থাকতে আপনাদের কিচ্ছু হবে না। খুনটা তো আর আপনারা করেননি।’

লাহাবাবু চোখ বুজেই বললেন, ‘লোকজনের ধারণা আমরা দেবলরাজার গড়ে পা রেখে মহাপাপ করেছি, তাই বকরাক্ষস এসে এসব খুন টুন করছে৷ লোকজনের খেপে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে জয়ন্তবাবু৷ মনে হয় না ওসি সাহেবের কথা শুনে এরা শান্ত হবে। যা করার আপনাকেই করতে হবে।’

পীতাম্বরবাবু বললেন, ‘ওই জন্যই তো দৌড়ে এলাম। দাদাবাবু আছেন যখন, আপনাদের আর চিন্তা নেই।’

জয়ন্ত বেরিয়ে গেল। তখনও চেঁচামেচি হচ্ছিল বটে, কিন্তু ক্রমে সেটা শান্ত হয়ে এল। জয়ন্ত চেঁচিয়ে কী সব যেন বলতে থাকল, তার কিছু কিছু কানে আসছিল। বুঝতে পারলাম ও জনতাকে শান্ত থাকতে আর পুলিশের ওপর ভরসা রাখতে বলছে৷

এরপর ওসমান আলির গলার স্বর পেলাম। তিনি বলছেন যে ব্যাপারটা জেলা সদরে জানানো হয়েছে। খুব শিগগিরই বড় সাহেবরা আসছেন তদন্ত করতে। এবার এসবের একটা সুরাহা হবেই।

ভিড় হালকা হলে ঘর্মাক্ত ওসি সাহেব আর জয়ন্ত ভেতরে এল। ওসমান আলি একটা জলের বোতলের প্রায় অর্ধেকটা একবারে খালি করে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘উপরমহলে ট্রান্সফারের জন্য আগেই অ্যাপ্লাই করেছিলাম, এবার যদি না হয়, ইস্তফা দিয়ে স্কুলে ছাত্র পড়ানোর চাকরি নেব। এত হুজ্জত সহ্য হয় না মাইরি।’

জয়ন্ত বলল, ‘খুনের ব্যাপারটা বলুন তো! রমেনকাকু খুন হলেন কী করে?’

‘বীভৎস দৃশ্য মশাই। না দেখলে বিশ্বাস হবে না। লোকটার গলাটা কে যেন অসম্ভব গায়ের জোরে মুচড়ে উলটো দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে গেছে৷ আর চোখের সকেটদুটো খালি। জীবনে অনেক খুন দেখেছি দাদা, কিন্তু এমন বীভৎস খুন আর দুটি দেখিনি।’ ফের রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন ওসি সাহেব।

‘বডিটা একবার দেখা যায়?’

‘নাহ্‌, সদর থেকে লোক এসে পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে গেছে। আর ও বডি না দেখাই ভালো। আমরা পুলিশ, খুনজখম দেখা আমাদের ডিউটি। কিন্তু আপনারা সিভিলিয়ান, ওরকম ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখলে নার্ভের ওপর যা চাপ পড়বে সামলাতে পারবেন না।’

কথাটা যুক্তিযুক্ত। জয়ন্ত বলল, ‘একবার বরং রীতাকাকিমার সঙ্গে কথা বলে আসি। বাবলুকে খবর দেওয়া হয়েছে নিশ্চয়ই।’

বুঝলাম এঁরা প্রয়াত রমেন সাঁতরার স্ত্রী এবং ছেলে। ওসমান সাহেবের আগে উত্তর দিলেন পীতাম্বরবাবুই, ‘হ্যাঁ, দেওয়া হয়েছে। বাবলু কাল ফেরেনি, হাসপাতালে নাকি নাইট ডিউটি ছিল। সুপারকে খবর দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণে ট্রেনে চেপে গেছে নিশ্চয়ই, একটু পরেই পৌঁছে যাবে। তারপরই বোধহয় বডি পোস্টমর্টেম হয়ে যাবে, কী ওসি স্যার?’

‘আশা তো করছি তাই।’

‘তার মানে কাল বা পরশুর আগে দাহ হচ্ছে না।‘ বলল জয়ন্ত। ‘চল নিবারণ, রীতাকাকিমার সঙ্গে কথা বলে আসি।’

ওসমান আলি বললেন, ‘হ্যাঁ, চলুন। আমিও রীতাদেবী আর বাকিদের একটা প্রাথমিক এজাহার নিয়ে আসি। সকালে তো অত ঝামেলার মধ্যে…

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা, ওঁর ওই সর্পোদ্যানের সাপগুলোর কী হবে?’

‘সদর থেকে আলিপুর চিড়িয়াখানার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ওঁরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাপগুলোকে ওঁদের কাছে নিয়ে যান।’

বাগলমশাই করুণস্বরে বললেন, ‘কিন্তু আমাদের এক্সকাভেশনের কী হবে?’

ওসমান আলি বললেন, ‘আপাতত বন্ধ রাখা ছাড়া তো উপায় দেখছি না।’

ডক্টর লাহা গম্ভীরমুখে বললেন, ‘সম্ভব নয় ওসি সাহেব। সরকারি আদেশ। নিশ্চয়ই মানবেন যে এই আদেশ আমি, আপনি, সবাই মানতে বাধ্য।’

ওসি সাহেব একটা রূঢ় উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। তারপর বোধহয় বুঝলেন যে প্রফেসর লাহা যুক্তিযুক্ত কথাই বলছেন। চুপ করে গেলেন তিনি।

বাগলমশাই সহানুভূতির সঙ্গে বললেন, ‘আরে, পুলিশের চাকরিতে অনেক ঝামেলা দাদা, আগেও দেখেছি৷ সেই তো সেবার বিহারের বেতিয়ায় গেছি, একটা গুপ্ত যুগের শিলালিপির খোঁজে। দোষের মধ্যে জায়গাটা ছিল একটা কবরস্থানের মধ্যে। পুলিশের কর্তা ছিলেন আবদুল খান। ইয়াং ব্লাড, হেবি জোশ। পইপই করে বললাম, “স্যার, একবার লোকাল লোকজনের সঙ্গে কথা বলে নিন।” ভদ্রলোক শুনলেন না। আমাদের গাড়িতে তুলে সিধে রওনা দিলেন।’

এই পর্যন্ত বলে থামলেন জ্যোতিষ বাগল। ওসমান আলি শুকনো গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর?’

‘তারপর আর কী, রাস্তাতেই মশাল, পেট্রোলবোমা এসব নিয়ে ঘিরে ধরল পাবলিক। সে কী বাওয়াল মশাই! সেবার বেগুনপোড়া হতে হতে বহু কষ্টে বেঁচে গেছিলাম দাদা।’

ওসমান আলি ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললেন, ‘আমি আর নেই। কালই ইস্তফা পাঠিয়ে দিচ্ছি। বাকিটা আপনারা বুঝবেন।’

বাকিরা হাঁ-হাঁ করে উঠতে যাচ্ছিলাম। তার আগে মুখ খুললেন লাহাবাবু। শান্তস্বরে বললেন, ‘তার দরকার হবে না ওসি সাহেব৷ আপনারা ঘোষণা করে দিন দেবলগড় নিয়ে যাবতীয় এক্সপিডিশন আপাতত বন্ধ করা হল। ওই জঙ্গলে কেউ যাবে না, কোনও খোঁড়াখুঁড়িও হবে না।’

সবাই একটু চমকালাম। বাগলমশাই স্খলিতস্বরে বললেন, ‘এ কী বলছেন প্রফেসর লাহা? একটু আগেই যে অন্য কথা বললেন?’

লাহামশাই চারিদিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বললেন, ‘লোকজনকে জানিয়ে দেবলরাজার গড়ে আর যাওয়া যাবে না মিস্টার বাগল। যা করতে হবে গোপনে। এবার যা হবে, শুধু আমরা এই ছ’জন—মানে আমি, মিস্টার বাগল, পীতাম্বরবাবু, জয়ন্তবাবু, নিবারণবাবু আর ওসি সাহেব জানবেন। বাকি আর কারও জানার দরকার নেই।’

ওসমান সাহেব কম্পিতস্বরে বললেন, ‘কিন্তু এসব করার কি খুব দরকার? এটা একেবারে বন্ধ করে দিলেই হয় না? মানে এসব ঝামেলা মিটে যাওয়ার পরেও তো এক্সকাভেশন-টন করা যায়।’

আমাদের কেউ কিছু বলার আগেই পীতাম্বরবাবু দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘তা হয় না ওসি সাহেব। শুনলেন না লাহাবাবু কী বললেন? সরকারের আদেশ মানতেই হবে। আমার মনে হয় লাহাবাবু যা বলছেন সেটাই আমাদের মেনে চলা উচিত।’

বাকিদের দিকে চাইলাম। সবাই মনে হল পরিস্থিতিটা গভীরভাবে পর্যালোচনা করছেন। একটু পর ওসি সাহেব সামান্য অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘কিন্তু লোকে যদি জেনে যায়? তাহলে?’

একইরকম চাপাস্বরে লাহাবাবু বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। ওসব আমরা দেখে নেব। ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে, মানে এই ছ’জনের মধ্যেই থাকবে৷ গড়টা যে ওই জঙ্গলের মধ্যে কোথায় সেটা তো জেনেই গেছি। আর একবার দু’বার চুপচাপ গিয়ে কয়েকটা আর্টিফ্যাক্টস নিয়ে আসা, এই তো ব্যাপার।

‘বাকি যা হবে, সে তো বছরখানেক পরের গল্প। তখন এলাহি ব্যাপার। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের পুরো ফোর্স মোতায়েন থাকবে। তখন আমি আর বাগলবাবু সিনে থাকতেও পারি, নাও থাকতে পারি। জয়ন্তবাবু আর পীতাম্বরবাবুকে থাকতে হবে। তবে তাঁরা কতটা কী করতে পারবেন জানি না। তবে ওসি সাহেব আর নিবারণবাবু বোধহয় তখন এ তল্লাটে থাকবেন না, সে আমি হলফ করে বলতে পারি৷’

মাথা নাড়ালাম। কথাটা সত্যি, এক বছর বাদে আমি কোথায়, আর দেবলগড় কোথায়? ওসমান সাহেব রুমাল দিয়ে ফের কপাল মুছে কম্পিতস্বরে বললেন, ‘আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক ডক্টর লাহা। এই ঝামেলা থেকে বেরোতে পারলে বাঁচি। আপাতত কী কর্তব্য?’

ডক্টর লাহা বললেন, ‘আলি সাহেব, আপনি ঘোষণা করে দিন যে আপাতত এক্সকাভেশন স্থগিত রইল। আমি আর বাগলমশাই একবার জঙ্গলে ঢোকার মুখটা নিজেদের চোখে দেখে নিতে চাই। বুঝতে পারছি, এরপর তো আমাদের একাই চলতে হবে।’

কথাটা যে ওসি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলা, বুঝতে পারলাম। ওসমান আলি উঠে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে বললেন, ‘ঠিক আছে। যা করার করুন৷ চলুন জয়ন্তবাবু, সাঁতরাবাবুর বাড়ির দিকে রওনা দেওয়া যাক।’

রীতা সাঁতরার বয়েস শিপ্রাকাকিমার কাছাকাছিই হবে, বা হয়তো একটু বেশিই। ভদ্রমহিলাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, মানসিক ধাক্কা থেকে তিনি এখনও বেরোতে পারেননি।

একটা চেয়ারে বসে শূন্যদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়েছিলেন। এখনও বোধহয় বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলেন না যে তাঁর জীবনটা এক রাতের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

প্রতিবেশীদের কয়েকজন মহিলা তাঁর কাছে বসেছিলেন। তাঁরাও সবাই চুপচাপ। এত বড় একটা সর্বনাশ হয়ে গেছে, মহিলারা সাধারণত কান্নাকাটির শোরগোল ফেলে দেন৷ সেক্ষেত্রে এমন নৈঃশব্দ্য অদ্ভুত লাগছিল।

জয়ন্ত ভদ্রমহিলার কাছে গিয়ে একটা মোড়া টেনে পায়ের কাছে বসল। নরম সুরে ডাকল, ‘কাকিমা…’

রীতা সাঁতরা সেই শূন্যচোখে জয়ন্তর দিকে তাকালেন। পাশ থেকে পীতাম্বরবাবু বললেন, ‘বউদি, জয়ন্তদাদাবাবু এসেছেন।’

ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। একটু একটু করে তাঁর চোখে যেন সাড় ফিরে এল। শব্দ করে কেঁদে উঠলেন, ‘জয়ন্ত…, বাবা! এ আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল!’

শোক দ্রুত সংক্রামিত হয়। বাকি মহিলারাও সমস্বরে কেঁদে উঠলেন। জয়ন্ত উঠে রীতাকাকিমাকে জড়িয়ে ধরল। ভদ্রমহিলা ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন। দেখলাম জয়ন্তর চোখও সজল হয়ে উঠেছে। পীতাম্বরবাবুও চোখ মুছে নিলেন। আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। শোকের আবহে বেশিক্ষণ থাকলে আমার অস্বস্তি হয়।

কান্নাকাটি খনিকটা কমলে জয়ন্ত প্রশ্ন করল, ‘এসব হল কী করে কাকিমা?’

রীতা সাঁতরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে গেলেন।

ওঁদের বাড়িটা দেড়তলা। একতলায় বসার ঘর, রান্নাঘর ছাড়াও দুটো শোওয়ার ঘর আর টয়লেট। দোতলায় একটা শোওয়ার ঘর, অ্যাটাচড টয়লেট৷ বাকিটা ছাদ। রীতাদেবীর আর্থ্রাইটিস আছে বলে নীচের ঘরে শোন। অন্য ঘরটা বাবলুবাবুর। রমেনবাবু ওপরের ঘরে শুতেন। ওঁর সর্পোদ্যান বাড়ির পেছন দিকে। ছাদ থেকে তার ওপর নজর রাখা সুবিধে বলে এই ব্যবস্থা।

ওঁর সংগ্রহের দেখভাল করত গণেশ পাখিরা। বাবলুবাবু যে হাসপাতালে চাকরি করেন, সেখানকার অস্থায়ী কর্মী, এই গ্রামেরই ছেলে। রমেনবাবু তাকে ট্রেনিং দিয়ে এই কাজে বহাল করেছিলেন।

গতকাল কাজকর্ম সেরে সে যখন চলে যায় তখন প্রায় ছ’টা। রমেনবাবু তারপর টিভি দেখতে দেখতে স্ত্রীর সঙ্গে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ঠিকে কাজের মেয়ে শিউলি তার কাজকর্ম সেরে চলে যায় সন্ধে আটটা নাগাদ। দুজনে রাতের খাবার খান সাড়ে ন’টা নাগাদ।

দশটা নাগাদ সাপের খাঁচার দিক থেকে একটা ঝটপটানির আওয়াজ পেয়ে টর্চ আর লাঠি নিয়ে সেদিকে যান রমেনবাবু। তখন রীতাদেবী তীব্র পচা আঁশটে গন্ধ পেয়েছিলেন, কিন্তু তেমন আমল দেননি। তারপর রমেনবাবু কিছু না পেয়ে ফিরে এসে সোজা ওপরে ঘুমোতে চলে যান। রীতাদেবীও ঘুমিয়ে পড়েন।

শিউলি কাজে আসে সকাল সাড়ে আটটায়৷ সে এসে আগের রাত্রের এঁটো বাসনপত্র মেজে, নীচের ঘর ঝাড়পোঁছ করে তারপর ওপর যায় রমেনবাবুর মর্নিং টি নিয়ে৷ তখন সকাল ন’টা৷

হঠাৎ তার বিকট চিৎকার! খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওপরে যান রীতাদেবী। বীভৎস দৃশ্যটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যান।

ওসমান আলি প্রশ্ন করলেন, ‘রাত্রিবেলা কোনও শব্দ-টব্দ পাননি?’

মাথা নাড়লেন রীতাদেবী, ‘না, এমনিতে আমার ঘুম খুব পাতলা। কিন্তু কাল রাতে যে কোন কালঘুমে পেল আমাকে… কী সর্বনাশ হয়ে গেল আমার…’ আবার হাহাকার করে উঠলেন রীতা সাঁতরা।

এই সময়ে একটি ছেলে এসে ঢুকল। তাকে দেখেই পীতাম্বরবাবু ছলোছলো চোখে বললেন, ‘বাবা গণেশ! তুই থাকতে এত বড় সর্বনাশটা হয়ে গেল? কিছু বুঝতে পারলি না?’

বুঝলাম এই-ই হচ্ছে গণেশ পাখিরা। সর্পোদ্যানের কেয়ারটেকার। সে বোধহয় কাঁদো কাঁদো স্বরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ওসি সাহেব বললেন, ‘গণেশ, আমার সঙ্গে একবার তোমাদের ওই সাপেদের আড্ডার দিকে চলো তো।’

দুজনে বেরিয়ে গেলেন। জয়ন্ত মৃদুস্বরে রীতাকাকিমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। একবার বাবলুবাবু কবে আসবেন, সেই খোঁজখবরও নিল। পীতাম্বরবাবু জানালেন বিকেলের দিকে রানিমাকে নিয়ে একবার আসবেন।

আমরা যখন বেরিয়ে এলাম, তখন ওসমান আলি দরজার কাছে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভুরুটা ভয়ঙ্কর কোঁচকানো। বললেন, ‘আপনারা এগোন। আমাকে কয়েকটা জায়গায় যেতে হবে।’

জয়ন্ত বলল, ‘কী হল ওসি সাহেব? কিছু ইঙ্গিত পেয়েছেন?’

ওসমান উত্তর না দিয়ে পুলিশের জিপে উঠে পড়লেন। বললেন, ‘রাতের দিকে একবার আপনার বাড়িতে আসতে পারি জয়ন্তবাবু৷ কিছু কথা আছে।’

আমরা রাজবাড়ির দিকে হাঁটা লাগালাম। আজকে রাস্তায় লোকজন কম। খুনজখমের খবর শুনে ভয়ে কেউ আর বাড়ির বাইরে বেরোনোর সাহস করেনি। চারিদিক থমথমে। গতকাল সন্ধের পর থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল। এখন মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে মেঘের পরত ক্রমে ঘন হচ্ছে। আরও একটা জিনিস দেখে আশ্চর্য হলাম। আকাশে একটাও পাখি উড়ছে না।

কতক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। মাঝে বোধহয় জয়ন্ত একবার জিগ্যেস করল, ‘কী রে নিবারণ, চল।’

অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলাম, ‘তোরা যা, আমি আসছি একটু পরে।’

কতক্ষণ হাঁ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সম্বিৎ ফিরল এক প্রৌঢ়ার গলার স্বরে, ‘কী গো অতিথবাবু, আসমানের দিকে অমন করে চেয়ে দেখছ কী?’

দেখলাম আর কেউ না, সেই মোক্ষদামাসি। আমাকে পীতাম্বরবাবুর সঙ্গে গাড়িতে চড়ে রাজবাড়ির দিকে যেতে দেখে আমার পরিচয় জিগ্যেস করেছিলেন। এই মুহূর্তে আমি একা। পীতাম্বরবাবু আর জয়ন্ত বোধহয় রাজবাড়িতে ফিরে গেছে।

কেন জানি না, আমার মনে হল মাসিকে একটু চেপে ধরলে অনেক কিছু জানা যাবে। হাজার হোক এই এলাকার মানুষ। কয়েকদিন ধরে যা ঘটছে তার ওপর কোনও আলোকপাত করতে পারেন।

একগাল হেসে বললাম, ‘তোমাদের গ্রামটা ভারি সুন্দর গো মাসি। তাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।’

মাসি মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘আমারে বোকা পেইছ ভাইপো? এখানে তুমি শুধু গ্রাম দেখতে এয়েছ বুঝি? এই মোক্ষদারে অত বোকা ভেবো না। এই মাগি অনেক ঘাটের জল খেয়ে চুল পাকিয়েছে। তুমি কেন এয়েছ, এসব আমি জানি না ভেবেছ?’

বুঝলাম, মাসি অতি ঘোড়েল মহিলা। এই ভদ্রমহিলাকে দিয়ে আমার কাজ হলেও হতে পারে। আমি ন্যাকা সেজে বললাম, ‘সে কী মাসি? তুমি যে কী বলছ, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

মোক্ষদামাসি আতার বিচির মতো কালো কালো দাঁতগুলো বার করে বলল, ‘ন্যাকামি কোরো না তো বাপু। এখানে যা সব ঘটছে, সে সব নিয়ে ইনিভিস্টিগিটি করার জন্যই যে রানিমা তোমারে ডেকেছে, সে কথা চাউর হতে বাকি রয়েচে ভেবেছ?’

বুঝলাম, আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য ইতিমধ্যেই কেউ গ্রামের মানুষের কাছে অতি সযত্নে লিক করে দিয়েছে।

গম্ভীরস্বরে বললাম, ‘দেখো মাসি, এখানে কী হচ্ছে বা হতে চলেছে, সেসব জেনে তো আর আমি এখানে আসিনি। এসেছিলাম আমার ছোটবেলার বন্ধু ডেকেছিল বলে। এখন তোমরা যদি বলো এখানে যা সব কাণ্ড হচ্ছে সেসব আমার জন্যই, তাহলে আমি না হয় কালই চলে যাচ্ছি। তাতে যদি এসব বন্ধ হয় তো হোক।’

মোক্ষদামাসি হাই হাই করে উঠল, ‘আরে না না না! অমন কথা বোলোনি গো দাদাবাবু। তুমি হলে গিয়ে আমাদের অতিথ। তুমি চলে গেলে আমাদের খারাপ লাগবে না? তাছাড়া তোমার কী মনে হয়, এখন এখানে যা হচ্ছে, সেসব কি একদিনে শুরু হয়েছে যে একদিনে শেষ হবে?’

মাসির শেষ কথাটা বাতাসে হারিয়ে যাওয়ার আগেই বুঝে গেলাম যে আমি যা চাইছিলাম, ঠিক তাই-ই পেয়ে গেছি।

গলাটা আরও গম্ভীর করে প্রশ্ন করলাম, ‘কী বলতে চাইছ স্পষ্ট করে একটু বলবে মাসি?’

মাসি ধূর্ত হাসি হেসে বলল, ‘সে বলতে পারি। কিন্তু তার বদলে কী পাব শুনি?’

বললাম, ‘সে পরে দেখা যাবে৷ আগে খবর দাও।’

মাসি আমার বুকপকেটের দিকে ইশারা করে বলল, ‘একটা ছিগ্রেট দাও না গো। কতদিন খাইনি।’

আমি এত অবাক হলাম যে বলার কথা নয়। এই প্রত্যন্ত গ্রামের এক প্রৌঢ়া আমার থেকে সিগারেট চাইছে?

মাসি বোধহয় আমার মনের কথাটা বুঝতে পারল। সামান্য লাজুক হেসে বলল, ‘আমার সোয়ামী বিড়ি খায় তো। তাই রাত্তিরে খাবার পর মাঝে মাঝে এক-আধটা আমিও চেয়ে খাই। তবে ছিগ্রেট বেশি পাই না। একটা দাও দিকিনি।’

পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে দিলাম। সিগারেটটা জ্বালিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে মোক্ষদামাসি বলল, ‘বাহ, ভালো খেতে তো!’

মোক্ষদামাসি আরও কয়েকবার মৌজ করে সিগারেটে টান দিল। আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘ঠিকঠাক খবর দিলে কিন্তু এই সিগারেটের প্যাকেটটা তোমার।’

মাসি লোভাতুর চোখে আমার হাতে ধরা প্যাকেটটার দিকে চাইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘এই জমিদারি তো দেবলরাজাদের ছিল, তাহলে এই জয়ন্তদাদাবাবুদের হাতে কী করে এল, পীতেম্বরদাদা কী করে এদের মেনিজার হল, সেসব কখনও ভেবে দেখিছ অতিথবাবু?’

আরে, এ তো সাংঘাতিক কথা!

ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করলাম, ‘সে জেনে আমার কী হবে শুনি?’

মাসি সিগারেটটা টানতে টানতে আমার দিকে চোরাচোখে চাইল, ‘তোমাদের ওই ফর্সাপানা টেকোমাথা এস্কিভিশিনবাবুকে কি পীতেম্বরদাদা আগে থাকতে চেনে?’

বিরক্তির সুরে বললাম, ‘কী যে বলছ মাসি! প্রফেসর লাহাকে পীতাম্বরবাবু কী করে আগে চিনবেন শুনি?’

মোক্ষদামাসি জোরে জোরে সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘সবাইকে ইনভিস্টিগিটি করো অতিথবাবু, সবাইকে। রানিমা, জয়ন্ত, পীতেম্বর, ওই টেকো এস্কিভিশিনবাবু, সবাইকে ইনভিস্টিগিটি করো। কাউকে ছেড়ো না, বুঝলে!’

‘তা ইনভিস্টিগিটি করে লাভ আছে কিছু?’

মোক্ষদামাসির গলা কয়েক পর্দা নেমে এল, ‘অনেক লাভ আছে গো দাদাবাবু। যদি ঠিক করে খবর নাও, তাহলে বুঝবে এখন এই এলাকায় যা যা ঘটছে সেসব ঘটারই ছিল। তবে তুমি কিন্তু খুব সাবধানে থাকবে, বুঝলে তো?’

‘কেন বলো তো মাসি? আমারও বিপদ ঘটতে পারে নাকি?’

‘পারে তো বটেই। তবে চিন্তা নেই। তোমাকে দেখে ভালো মানুষ বলে মনে হচ্ছে। শুধু মনে রাখবে, বলাকামুখী মা তোমার সঙ্গে আছেন, ব্যস! তাহলেই হবে।’

শেষ লাইনটা বলে নিজেই চমকে উঠল মোক্ষদামাসি৷ সিগারেটের শেষটুকু মাটিতে ফেলে, আমার হাত থেকে গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেটটা একটানে ছিনিয়ে নিয়ে, ‘না না, ছি ছি, এ কী বলে ফেললাম! না গো অতিথবাবু৷ তুমি যা করছ করো, আমি যাই। বাজারে আমার ডালাতে আবার সবিতাকে বসিয়ে এসেছি, দেখি মাগি আবার সব কিছু উড়িয়ে পুড়িয়ে দিল কিনা।’ বলতে বলতে তড়বড় করে চলে গেল।

আমি খানিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তারপর সিগারেট ধরাবার জন্য পকেটে হাত দিতে গিয়ে খেয়াল হল যে, ওটা মিনিটখানেক আগেই আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে।

হঠাৎ জঙ্গলের দিক থেকে একটা চেনা স্বরে আর্তনাদ ভেসে এল। আমি একটু থমকে গেলাম। তারপর দৌড় দিলাম জঙ্গলের দিকে।

জঙ্গলে ঢোকার মুখটায় যে অতি প্রাচীন বটগাছটা ছিল, সেখানে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল জয়ন্ত আর পীতাম্বরবাবু৷ সেখানে পৌঁছে হাঁফাতে হাঁফাতে জিগ্যেস করলাম, ‘কী রে জয়ন্ত, কী হল? তোর চেঁচানোর আওয়াজ শুনলাম বলে মনে হল?’

আমার দিকে না তাকিয়ে জয়ন্ত কাঁপা কাঁপা হাতে সামনের দিকে নির্দেশ করল। সেদিকে তাকাতেই মনে হল এবার আমার মুখ থেকেও চিৎকার বেরিয়ে আসবে।

খোঁড়া শিয়ালটাকে আগের দিন যেখানে দেখেছিলাম, আজও দেখলাম ও ঠিক ওখানেই আছে। তবে ওর শুধু দেহটা পড়ে আছে, মাথাটা নেই।

পীতাম্বরবাবুকে আজ অবধি কখনও বিচলিত বা উত্তেজিত হতে দেখিনি। এই প্রথমবার দেখলাম তাঁরও গলা কাঁপছে। তিনি বললেন, ‘আপনারা বাড়ি চলুন দাদাবাবুরা। যা হচ্ছে সেসব মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এবার মনে হচ্ছে সত্যিই মা বলাকিনী জেগে উঠেছেন। আমাদের আর রক্ষে নেই।’

জয়ন্ত ওখানেই উপুড় হয়ে বসে হড়হড় করে বমি করে দিল। আমরা দুজনে ওকে উঠিয়ে আস্তে আস্তে রাজবাড়ি নিয়ে এলাম।

আমার মাথার মধ্যে আবার সেই অস্বস্তিটা ফিরে এল। সাপের মাথা, বেজির মাথা, তারপর শিয়ালের মাথা। কী যেন হয়? কী যেন শুনেছি?

আর সেই রাত্রেই জয়ন্তর এল ধুম জ্বর।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সন্তর্পণে হাঁটছি৷ উদ্দেশ্য দেবলরাজার গড়। এবার আমি এসেছি একাই। আগেরদিন যখন দেবলরাজার গড় গেছিলাম তখনই রাস্তাটা মুখস্থ হয়ে গেছিল। তাই চেনা শুঁড়িপথ, গাছেদের সারি, আর ঝোপঝাড়ের বাঁক চিনে ওখানে যাওয়ার জন্য কারও সাহায্য দরকার ছিল না।

সূর্যদেব ঢলবার পথে। রোদ্দুরের তেজ কম। জঙ্গলের মধ্যে দুপুর যখন বিকেলের দিকে গড়াচ্ছে। তার বুকে ফুটে উঠেছে আলো আর ছায়ার এক আশ্চর্য কাটাকুটি খেলা। পথ চিনে নিয়ে এগোতে হচ্ছিল গন্তব্যের দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে পৌঁছলাম সেই ঝিলের ধারে। আগেরবারও এখানেই থামতে বলেছিলেন পীতাম্বরবাবু। সেবারের মতো এবারেও আসার পথে কয়েকটা জন্তুজানোয়ার দেখলাম, যাদের শরীরে তীব্র বা মৃদু হলুদ রঙের উপস্থিতি৷ সেদিনের সেই প্রশ্নটা মনের পর্দায় ফের ঘাই মেরে উঠল, জঙ্গলের কি জন্ডিস হয়েছে নাকি?

ঝিলের শান্ত জলের পাশে গিয়ে বসলাম। জঙ্গলের জন্ডিস কথাটা মাথায় আসতেই মনে পড়ে গেল, শিপ্রাকাকিমা বলেছিলেন এই অঞ্চলে যখন প্রথম উপদ্রব শুরু হয়, তখন নাকি হঠাৎ করেই এলাকায় জন্ডিসের প্রকোপ বেড়ে গেছিল!

আকাশের দিকে চাইলাম। দুপুরেই দেখেছিলাম একটুখানি সাদা মেঘ শাড়ির আঁচলের মতো আকাশের বুক ছেয়ে ছিল। এখন এই পড়ন্ত বিকেলের গোধূলির ছোঁয়া মেখে সে মেঘ সোনাবরণ নদী হয়ে উঠেছে। হলুদ, উজ্জ্বল হলুদ। আবার আগের প্রশ্নটাই মাথায় এসে ঘাই মেরে গেল, চারিদিকে এত হলুদ কেন?

কতক্ষণ ধরে সোনালি মেঘের আঁচলের দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম, জানি না। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করছিল না। হাত-পা শরীর ধীরে ধীরে সব শিথিল হয়ে আসছিল।

মনে পড়ল, কতক্ষণ সিগারেট খাইনি। অনমন্যস্কভাবে পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরালাম। ভুলে গেলাম, জঙ্গলের মধ্যে সিগারেট খাওয়া কতটা বিপজ্জনক।

সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছিল। সেদিকে অলসচোখে তাকিয়ে রইলাম। আস্তে আস্তে আকাশটা কেমন যেন অস্বচ্ছ হয়ে এল। শরীর ভারী… আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা জ্বলে যাচ্ছে। আমার চোখ বুজে আসছে ক্লান্তিতে…

‘কী খোকাবাবু, এখানে কী করছ?’

হঠাৎ ভেসে আসা কথাগুলো শুনে এমন চমকে গেলাম, মনে হল হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এল!

যাকে দেখলাম, প্রথমেই মনে হল মাথা ঘুরে এক্ষুনি পড়ে যাব। সেই অকৃত্রিম দাড়িগোঁফের জঙ্গলেভরা মুখ, হাড় জিরজিরে শরীর, পরনে নোংরা ছেঁড়া লুঙ্গি, আর সেই জ্বলজ্বলে চোখদুটো, যা আমি শেষ দেখেছিলাম বছর দশেক আগে। কিন্তু সে তো… সে তো…

‘মরে গেছিল, তাই তো?’ সেই খিকখিক হাসিটা হাসল লোকটা, ‘কিন্তু কী করি বলো খোকাবাবু? হাজার হোক চেলা বলে কথা, বিপদে আপদে তো আমাকেই দেখতে আসতে হবে নাকি?’

হাত থেকে সিগারেটটা পড়ে গেছে। হাত পা থরথর করে কাঁপতে লেগেছে তখন আমার। কোনওমতে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম, ‘মনা… মনা মাঝি… তুমি…’

মনা মাঝি এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে পড়ে যাওয়া সিগারেটটা তুলে ভর্ৎসনার ভঙ্গিতে চুক চুক করে বলল, ‘বয়েস হচ্ছে, সিগারেট খেতে শিখেছ, সবই না হয় বুঝলাম। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে সিগারেট বিড়ি খাওয়া নিষেধ জানো না? যদি আগুন জ্বলে যায়?’

বলতে বলতে ধুলোমাখা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, ‘বাহ, বেশ দামি সিগারেট মনে হচ্ছে! আজকাল তাহলে ভালোই কামাচ্ছ, তাই না খোকা? কাজকর্ম কী করা হয়?’

আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন একটা স্বপ্নের ঘোরে আছি। যে লোকটাকে দশ বছর আগে স্বচক্ষে মরে যেতে দেখেছি, সে এই মুহূর্তে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কথা বলছে… আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার ভয় পাওয়া উচিত নাকি আশ্চর্য হওয়া উচিত?

মনা মাঝি সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বলল, ‘দুটোই। তোমার ভয় পাওয়া উচিত, অবাক হওয়াও উচিত। তবে আমার মনে হয় তোমার জন্য ভয় পাওয়াটাই এখন ঠিক হবে।’

আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। জামা ভিজে যাচ্ছে ঘামে। লোকটা এতদিন বাদে প্রেত হয়ে ফিরে এল কেন? আর এখানেই কেন?

মনা মাঝি ততক্ষণে থেবড়ে বসে পড়েছিল। আমাকে পাশে বসতে ইঙ্গিত করে বিরক্তির সুরে বলল, ‘ভূত-প্রেত নিয়ে মনে যদি এতই ঘেন্নাপিত্তি থাকে, আমার কাছে নাড়াবাঁধা তো তোমার উচিত হয়নি খোকা। এই যে কাকচক্ষু বিদ্যা তোমাকে আমি দিয়েছি, সেও তো প্রেত জগতেরই বিদ্যা। তাহলে পরলোক নিয়ে তো তোমার এত বাতিক থাকার কথা নয়। থাকলে বলে দাও বাপু, আমি তাহলে যাই।’

আমি কাঁপা গলায় বললাম, ‘কিন্তু, তুমি… তুমি তো…’

মনা মাঝি ততোধিক বিরক্তির স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি ওই জগত থেকেই এসেছি হে। এসেছি তোমার বিপদ আসছে দেখে। হাজার হোক তোমাকে চেলা বলে মেনেছি… এখন তুমিই যদি আমাকে দেখে ভয় পাও…’

কাঁপুনি খানিকটা কমেছিল… থরথর স্বরে বললাম, ‘কিন্তু তুমি… তুমি যে বললে তোমাকে দেখে আমার ভয় পাওয়াটাই ঠিক…’

মনা মাঝি সিগারেটের শেষটুকু মাটিতে ঘষে ঘষে অন্তিম স্ফুলিঙ্গটুকু অবধি নিশ্চিহ্ন করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে নয় খোকা। তোমার বরং এখন নিজের জন্যে ভয় পাওয়া উচিত। খুব ভয় পাওয়া উচিত।’

‘কেন মনা মাঝি?’

মনা মাঝির কথাটা যেন জঙ্গলের অলুক্ষুণে হাওয়া হয়েই ভেসে এল আমার কানে, ‘কারণ তোমার ওপর মরণের ছায়া পড়েছে গো খোকাবাবু। কালপুরুষ ফিরছে তোমার পিছন পিছন। যদি তার প্রতিকার না করো… আর দু’দিন পর বৈশাখের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি, তারপর তোমায় বাঁচায় এমন শক্তি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল কোত্থাও নেই।’

কথাটা হৃদয়ঙ্গম হতে কিছু সময় লাগল। তারপর বুঝতে পারলাম কাঁপুনিটা আবার ফিরে আসছে। প্রশ্ন করলাম, ‘কে-কেন মনা মাঝি? ক্ক-কী করেছি আমি?’

মাথা নাড়ল মনা মাঝি, ‘তুমি কিছু করোনি খোকা। শুধু নিজের অজান্তেই একটা জটিল লড়াইয়ের অংশ হয়ে গেছ। একটা অভিশাপ, যা হাজার বছর পরে জেগে উঠেছে নিজের নিয়মে। তুমি অজান্তেই তার জালে আটকা পড়ে গেছ।’

‘কীসের অভিশাপ মনা মাঝি? কী হয়েছিল হাজার বছর আগে?’

‘একটা অত্যন্ত পাপকর্ম ঘটেছিল। ঘোরতর মহাপাপ। তার শরিক করা হয়েছিল স্বয়ং দেবী বলাকামুখীকে। দেবী ঘোরসিদ্ধা, ব্রহ্মাস্ত্রস্বরূপিণী। সেই পাপের ফলেই দেবীর অভিশাপে এই জনপদ ছারেখারে যায়। আজ, ঠিক হাজার বছর পর সেই অভিশাপ আবার জেগে উঠেছে। প্রতি হাজার বছরে তার জেগে ওঠার কথা। দেবীর সেই ক্রুদ্ধ রূপেরই প্রকোপ নেমে এসেছে এই অঞ্চলে।’

‘কিন্তু এর… এর কোনও প্রতিকার নেই?’

খি খি খি করে পাগলের মতো হেসে উঠল মনা মাঝি। ফের গলা নামিয়ে বলল, ‘লড়াই শুরু হয়ে গেছে খোকা! যা শুরু হয়েছিল এক হাজার বছর আগে, এখন তার শেষ হওয়ার সময়। সেই লড়াই হবে ভয়ংকর, গ্রামকে গ্রাম তছনছ হয়ে যাবে, শহরের পর শহর উজাড় হয়ে যাবে। কোনও মানুষ, কোনও পুলিশ, কোনও সরকার তা থামাতে পারবে না, যদি না দেবীর ক্রোধ প্রশমিত করা যায়। নইলে কিন্তু বিপদ নেমে আসতে চলেছে খোকা। খুব, খুব বড় বিপদ।’

বললাম, ‘কীসের বিপদ মনা মাঝি? কী হচ্ছে এই অঞ্চলে? তুমি তো এখন ওই… ওই জগতের লোক, সব দেখতে পাও। বলো না, এই অঞ্চলে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে?’

মনা মাঝি বিষণ্ণমুখে বলল, ‘না গো খোকাবাবু, আমার সেসব বলার অনুমতি নেই। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, তার সবই জানি। কিন্তু বলতে পারব না। কারণ বললে আর ওই জগতে ফিরে যেতে পারব না। শুধু বলি, খুব সাবধানে থেকো। কাউকে বিশ্বাস কোরো না, কাউকে না।’

‘কিন্তু কাকে বিশ্বাস করব, আর কাকে করব না সেটা বুঝব কী করে, মনা মাঝি?’

মনা মাঝি এবার তীব্রচোখে তাকাল আমার দিকে, ‘যে বিদ্যেটা এত কষ্ট করে শিখলে, একেবারেই ভুলে মেরে দিয়েছ? নাকি আরেকবার শেখাতে হবে?’

শুনেই আত্মসম্মানে ঘা লাগল, ‘ভুলে মেরে দেব কেন? সব মনে আছে। শুধু এতগুলো বছর চর্চা করিনি বলে… সে আমি আজ রাতেই করে নেব।’

অন্ধকার তখন বেশ গাঢ় হয়ে এসেছিল। তার মধ্যেই মনা মাঝির খুনখুনে হাসিটা আছড়ে পড়ল, ‘তাই? একরাত্রেই সব পেরে যাবে বলছ? ভালো, নিজের ওপর এই বিশ্বাসটা থাকা ভালো। চলো, এখন তোমাকে জঙ্গলের বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসি। নইলে তুমি ফিরতে পারবে না।’

‘কেন? ফিরতে পারব না কেন? এই রাস্তা ধরেই তো এলাম, না ফেরার কী আছে শুনি?’

অন্ধকারের মধ্যে মনা মাঝির শরীরটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। শুধু তার চোখদুটো জ্বলছে। আবার সেই হাসিটা হেসে সে বলল, ‘বটে? চিনে যেতে পারবে বলছ? চারিদিকে একবার তাকাও তো খোকাবাবু। দেখো তো।’

উঠে দাঁড়ালাম। তখনই বুঝতে পারলাম, কেন আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল মনা মাঝি।

যে রাস্তা ধরে এসেছিলাম, সামনে তার চিহ্নমাত্র নেই। সেই চেনা গাছ, চেনা শুঁড়িপথ, চেনা ঝোপঝাড়, কিচ্ছু নেই। আমার সামনে এক অচেনা জঙ্গুলে পথ। হিংস্র রাক্ষসের মতো চেয়ে আছে আমার দিকে।

মনা মাঝির স্বর ভেসে এল, ‘কী খোকাবাবু, পথ চিনতে পারছ?’

আমার সমস্ত দৃশ্যজগৎ মুহূর্তের মধ্যে ওলটপালট হয়ে গেল। কোথায় গেল রাস্তাটা?

মনা মাঝির স্বর ভেসে এল, ‘তোমার ডান দিকে তাকাও খোকাবাবু।’

ডান দিকে তাকালাম। এই তো, আমার থেকে একটু দূরে সেই চেনা জঙ্গলের পথ, যা ধরে আমি এই ঝিলের ধারে এসে পৌঁছেছিলাম। কিন্তু সে পথ ওখানে কী করে গেল?

মনা মাঝির স্বর ভেসে এল, ‘বাঁ দিকে তাকাও।’

বাঁ-দিকে তাকাতেই দেখলাম দেবলরাজার গড়ের সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত ভগ্নস্তূপ। এত কাছে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁওয়া যায়। কিন্তু সে তো হিসেবে আধ ঘণ্টা দূরের রাস্তা!

আবার ডান দিকে তাকালাম। এবার সেখানে অন্য পথ, অরণ্যের অন্য অংশ। বাঁ-দিকে তাকালাম, কোথায় সেই ভাঙা প্রাসাদ? গহন গভীর জঙ্গলের গাছগুলো যেন ঝুঁকে এল আমার মুখের ওপর।

আবার সেই কাঁপুনিটা ফিরে এল। এসব কী দেখছি আমি? কী হচ্ছে আমার সঙ্গে?

কানের কাছে মনা মাঝির সেই ফিসফিস স্বরটা বেজে উঠল, ‘এই জঙ্গল মায়া-অরণ্য গো খোকাবাবু, এ বকরাক্ষসের জঙ্গল। কেউ বলে দেয়নি তোমাকে?’

আমার গলা থেকে স্বর বেরোল না। তবুও আমার মনের কথা বুঝতে অসুবিধে হল না মনা মাঝির। খিলখিল করে হেসে বলল, ‘কী খোকাবাবু, ভয় পেলে? বলেছিলাম না, তোমার এখন ভয় পাওয়া দরকার? মনে আছে কথাটা?’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল মনা মাঝি। সেই হাসিটা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। জঙ্গলের গাছের পাতায়, ঝিলের সবজেটে জলে, ঘন অন্ধকারের মধ্যে উন্মাদিনীর নূপুরের মতো বাজতে লাগল।

আমার ওপর এবার ঝুঁকে এল মনা মাঝি, ‘এই বকরাক্ষসের জঙ্গল বড় অভিশপ্ত জঙ্গল গো। ক্ষণে ক্ষণে এর দিক পালটায়, পথ পালটায়, রূপ পালটায়। কখন যে কোন রাস্তা তোমার সামনে খুলবে, কোন রাস্তা যে বন্ধ হবে, কেউ জানে না। এখন যদি এক আমি বা ওই বকরাক্ষসের মালিক তোমাকে বের করে নিয়ে না যায়, তাহলে এই জঙ্গলের ভুলভুলাইয়ার মধ্যেই তুমি সারা জীবন ঘুরে ঘুরে মরে, পচে, গলে, নষ্ট হয়ে যাবে।’

হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, ‘না না, মনা মাঝি, আমি বাঁচতে চাই। আমি এক্ষুনি বেরোতে চাই এখান থেকে।’

মনা মাঝির শুকনো হাতটা যেন জাহাজের কাছির মতো আমার ডান হাতটাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ফিসফিস করে আমার কানে বলল, ‘তোমাকে বার করে নিয়ে তো যাবই খোকাবাবু। হাজার হোক, তুমি আমার চেলা। তবে তার আগে তোমাকে আরেকটা দৃশ্য দেখাই। তাতে যদি তোমার জ্ঞানচক্ষু খোলে…’

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মনা মাঝি আমার ঘাড় ধরে সেই ঝিলের পাড় থেকে টানতে টানতে এমন এক জায়গায় এনে ফেলল, যেখানে গাছের আড়াল থেকে ঝিল দেখা যায়, কিন্তু ওখান থেকে আমাদের দেখা যাবে না।

পরমুহূর্তে সমস্ত অরণ্য জুড়ে নেমে এল এক অদ্ভুত নৈঃশব্দের চাদর। বাতাস স্তব্ধ। একটা গুমোট ভাপ চাদরের মতো নেমে আসতে লাগল আমাদের ঘিরে। আর সেইসঙ্গে জেগে উঠতে লাগল একটা বিশ্রী গন্ধ। একটা মড়াপচা আঁশটে গন্ধ আমার নাসারন্ধ্র অসাড় করে দিল। আমি পকেট থেকে রুমালটা বের করে নাকে দিতে যাব, দৃশ্যটা দেখে আমার হাত থমকে গেল।

ঝিলের জল স্থির ছিল। হঠাৎ তার উপরিভাগ জুড়ে কাঁপন লেগেছে। দেখতে দেখতে ঝিলের বুক জুড়ে জেগে উঠল ঘূর্ণি। প্রথমে ধীর, তারপর দ্রুত। মনে হল যেন ছোটখাটো টর্নেডো উঠে আসছে ঝিলের বুক থেকে। ক্রমেই সেই ঘূর্ণি প্রবল হয়ে উঠল। ততক্ষণে আমার কানের জুলফি থেকে নোনতা নোনতা ঘামের ফোঁটা নামতে শুরু করেছে। শরীরের সমস্ত স্নায়ু ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল এখনই এমন একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে যা আমার দুঃস্বপ্নেরও বাইরে!

ঘূর্ণিময় জলের মধ্যেই প্রথমে জেগে উঠল দুটো কাঁধ। তারপর জেগে উঠল তার দুটো পেশিবহুল হাত, চওড়া পিঠ, সরু কোমর, পুরুষালি ঊরু, পায়ের গোছ। তার গায়ে জলজ শ্যাওলার পরত।

সেই শরীরটা ঝিলের জল থেকে উঠে এসে ডাঙায় পা রাখল। তার উলঙ্গ শরীর, লোমশ দেহ, হাঁটু অবধি ঝুঁকে আসা হাত, হাতের লম্বা নখ, আর সমস্ত শরীর জুড়ে ছেয়ে থাকা জলজ শ্যাওলার আবরণ, সব কিছুই দৃশ্যমান হল আমার সামনে। ওহঃ! কী ভয়ানক! আমি সত্যিই এবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব।

কারণ ওই শরীরটার সবই আছে, শুধু মাথা নেই!

আমার মুখ থেকে নির্ঘাত একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে আসত যদি না মনা মাঝি আমার মুখ চেপে ধরে জঙ্গলের আরও ভেতরে টেনে নিয়ে না যেত। সেই অন্ধকারে, মহাদ্রুমের আড়াল থেকে দেখলাম, মহাকায় উলঙ্গ কবন্ধ ঝিলের জল থেকে উঠে হেঁটে গেল গাংনাপুরের দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ পর আমার কাঁপুনি থামলে মনা মাঝি আমার মুখ থেকে তার হাত সরিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘বুঝেছ খোকাবাবু, কেন বলেছিলাম যে আমি ছাড়া তোমার গতি নেই?’

আমি মনা মাঝির হাত ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে বললাম, ‘ও-ও… ও কে মনা মাঝি?’

অন্ধকারের মধ্যে মনা মাঝির স্বর ভেসে এল, ‘ও একটা যখ গো খোকাবাবু, দেবী বলাকিনীর মূর্তিমান অভিশাপ। হাজার বছর ধরে এই ঝিলে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল একে। এখন জেগে উঠেছে ও। জেগে উঠেছে তার এত বছরের খিদে নিয়ে। এখন এর গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে এমন মানব-দানব-যক্ষ-রক্ষ, কেউ নেই এই ধরাতলে। ওই দেখো খোকাবাবু, শিকারে চলেছে ওই কবন্ধপিশাচ… এই জঙ্গলের মালিক… বকরাক্ষস…’

আমার স্নায়ু আর নিতে পারল না৷ আমার চোখের সামনে দুনিয়াটা ঘোলাটে হয়ে মিলিয়ে গেল।