দেবলরাজার গড় – ২

গাংনাপুর জমিদারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মুখ হাঁ হয়ে গেল। শুনেছিলাম জমিদারবাড়ি। কিন্তু এত পেল্লাই বাড়িকে বোধহয় রাজপ্রাসাদ বললেই ঠিকঠাক সম্মান দেওয়া হয়। কম করে দুই থেকে তিন একর জমি নিয়ে বানানো তিনতলা প্রাসাদ। মেনগেট থেকে গাড়িবারান্দার দূরত্ব কম করে একশো মিটার। আর বাড়িটি দেখতেও বড় মনোহারী।

স্থাপত্য নিয়ে আমার বিশেষ কোনও জ্ঞান নেই, তবে মনে হল আধা দেশীয় শিল্পশৈলীর সঙ্গে বাকি আধা ইউরোপিয়ান ডিজাইনও আছে। বাড়ির সামনে ফুলের কেয়ারি করা বাগান। বেশ কয়েকটা শ্বেতপাথরের মূর্তি আর ফোয়ারাও আছে।

পরে শুনেছিলাম যে এককালে নাকি জমিদারবাড়ির চৌহদ্দি ছিল সাত থেকে আট একরের। প্রাসাদের পেছনে প্রায় দু’একর জমির ওপর ছিল ফলের বাহারি বাগান। এখন অবশ্য সেসব কিছু নেই।

চাকদা চৌরাস্তা থেকে ডান দিক ধরলে আধ ঘণ্টা বাদেই গাংনাপুর। বাসস্ট্যান্ডের গা ঘেঁষে বড় গঞ্জ। বেরিয়েই রিকশাস্ট্যান্ড। রাস্তার দু’পাশে কাপড়জামা, মুদি, আর মনিহারি সামগ্রীর দোকান। লোকজনের চিৎকার, টেম্পোর আওয়াজ, সাইকেলের কিড়িং কিড়িং, রিকশার ভ্যাঁপো, ফুটপাতের ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক, ফুচকা আর ঘুগনিওয়ালাদের ঘিরে থাকা ছেলেমেয়েদের ভিড়, সবমিলিয়ে ভারি জমজমাট জায়গা৷

আমাকে নিতে এসেছিলেন রাজবাড়ির বহুদিনের কর্মচারী পীতাম্বর মিশ্র। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের একটু ওপরে। রোগা ছিপছিপে শরীর, গালদুটো বসা আর চোখের দৃষ্টি অতীব ধারালো। এঁরা নাকি পুরুষানুক্রমে রাজবাড়ির নায়েব। নিজেকে অবশ্য নায়েবের বদলে ম্যানেজার বলতেই ভালোবাসেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন একটি খুব পুরোনো দিনের দামি গাড়ি। উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালের হুডখোলা স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড!

‘এই গাড়ি জয়ন্তবাবুর ঠাকুরদা যোগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীকে ষোলো বছরের জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন তাঁর বাবা, নগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী। এর বয়েস প্রায় ষাট বছর,’ মৃদু হেসে জানালেন পীতাম্বরবাবু, ‘পশ্চিমবঙ্গ কেন, সারা দেশেই এর জুড়ি কম আছে। বেশ কয়েকবার ভিন্টেজ কার ব়্যালিতে প্রাইজও পেয়েছে।’

গাড়িতে বসে বেশ একটা রাজাগজা ভাব হচ্ছিল। আশেপাশের লোকজন বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছে। দুয়েকজন বয়স্ক মানুষকে দেখলাম গাড়িটা দেখে সমীহভরে প্রণাম করতে।

বুঝলাম, গাংনাপুরের রাজবাড়ির গৌরবের কাল অস্তমিত হলে কী হবে, ভয় বা ভক্তির দাপট কিছুমাত্র কমেনি। এক মহিলা মাথায় আনাজের চুবড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি গলা তুলে জিগ্যেসও করলেন, ‘ও পীতেম্বরদা, রাজবাড়িতে নতুন কুটুম এল নাকি?’

উদ্দিষ্ট ‘পীতেম্বর’-ও, ‘হ্যাঁ রে মোক্ষদা, জয়ন্তদাদাবাবুর বন্ধু!’ বলে চেঁচিয়ে উত্তর দিলেন।

গঞ্জ পেরিয়ে ডান দিক নিয়ে সোজা কিলোমিটারখানেক গেলে রাস্তাটা ইংরেজি টি অক্ষরের রূপ নিয়েছে। আমরা বাঁ দিকের পথ ধরলাম। একটু পরেই শুরু হল আধাভাঙা পিচওঠা রাস্তা।

দু’পাশে ধানের খেত। খেতের মাঝে অহংকারী মাথা তুলে জেগে আছে আলের জাঙাল। আলের বুক চিরে সটান মাথা তুলেছে আকাশ ছুঁই-ছুঁই তাল আর নারকেল গাছের সারি। নির্মল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে একটা চিল। চারিদিকে শান্তি আর কল্যাণ।

খানিকটা এগিয়ে দেখি, একটা মস্ত বড় বিল। বিলের ওপাশে দূর থেকে দেখা যায় বিশাল একটা জঙ্গল। পীতাম্বরবাবু বললেন, এই জঙ্গল কিন্তু এই এলাকার বিখ্যাত জঙ্গল। লোকে বলে বকরাক্ষসের জঙ্গল। এককালে এই জঙ্গলে নাকি বাঘ, বাঘরোল, হরিণ এসবই পাওয়া যেত৷ তবে এখন কয়েকটা বিষাক্ত সাপ, বেজি আর শিয়াল ছাড়া তেমন কিছু নেই।’

আমাদের কথাবার্তার মধ্যেই ধুলো উড়িয়ে, রাস্তায় চরে বেড়ানো দু-একটা ছাগলছানা আর হাঁস মুরগিকে চমকে দিয়ে, গম্ভীর হাঁসের ডাকের মতো হর্ন বাজিয়ে গাংনাপুর রাজবাড়ির দেউড়িতে এসে দাঁড়াল সেই ষাট বছর পুরোনো ভিন্টেজ স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড।

আমি তো রাজবাড়ির পেল্লায় সাইজ দেখে হতবাক। তবে বেশি আশ্চর্য হওয়ার আগেই দেখলাম জয়ন্ত ‘আরে নিবারণ, কেমন আছিস? কতদিন পরে দেখা!’ বলতে বলতে তিরবেগে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

আমি তো জয়ন্তকে দেখে অবাক! সেই গেঁয়ো মুখচোরা ছেলেটা কই? এ তো রীতিমতো স্মার্ট ঝকঝকে হালফ্যাশনের নতুন জয়ন্ত! দেখতে তো সুন্দর ছিলই, এখন চেহারায় একটা আলাদা গ্ল্যামার এসেছে।

জয়ন্ত হইহই করে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল৷ শিপ্রাকাকিমা অপেক্ষা করছেন।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়াটা হয়েছিল জব্বর। মেনুর উল্লেখ করে তোমাদের মনে আর দুঃখ দিতে চাই না। এটুকু বলে রাখি অমন কাতলা মাছের কালিয়া আর হাঁসের মাংস জীবনে দু’বার খাইনি।

আমি চিরকালই মিতাহারী, এক পাতে দ্বিতীয়বার ভাত নিই না। সেই আমি অবধি দু-দু’বার ভাত চেয়ে খেলাম। তার একটা বড় কারণ অবশ্য কাকিমার হাতের রান্না।

কাকিমা যখন আমাদের টাউন ছেড়ে এখানে চলে আসেন, তিনি ছিলেন সদ্য বিধবা যুবতী। আর এখন ইনি ভারভাত্তিক গিন্নিমা। মোটা হয়েছেন অনেকখানি। চোখে চশমা উঠেছে। জুলফির চুলে অল্প পাক। শুধু আভিজাত্য এখনও পূর্ণ মর্যাদায় বিদ্যমান৷ আর রয়ে গেছে আমার প্রতি সন্তানসম স্নেহ।

খাওয়ার টেবিলে বসে অনেক কথাই হল। বেশিরভাগটাই আমার মা আর শিপ্রাকাকিমার বন্ধুত্ব নিয়ে। শিপ্রাকাকিমা যখন বিয়ের পর ঘোষালবাড়ি গিয়ে বিশাল সংসার নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, তখন মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়।

আমার মায়ের সৎপরামর্শ শিপ্রাকাকিমাকে নতুন সংসারের হাল ধরতে অনেক সুবিধা করে দিয়েছিল। সেসব পুরোনো দিনের কথা বলতে বলতে কাকিমা একবার চোখে আঁচল চাপা দিলেন। বুঝলাম, দিদির বয়সি বন্ধুটিকে তিনি আজও ভোলেননি।

খেয়ে-দেয়ে একটু বেড়াতে বেরোলাম। এমনিতে শীতের দুপুরের মিঠে রোদ ভালোই লাগে। রাজবাড়ির হাতা ছাড়িয়ে একটু এগোতেই সামনে রাস্তা। ডান দিক ধরে গেলে স্টেশন। সকালে ওই রাস্তা ধরেই এসেছিলাম।

আমি বাঁ-দিকের রাস্তাটা নিলাম।

হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারলাম যে পাড়াগাঁয়ের শীতের দুপুর কেমন আশ্চর্য নিস্তব্ধ হয়। রাস্তার দু’পাশে দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত। আউশের ফসল কাটা হয়ে গেছে, বোরো সবে রোয়া হয়েছে। মাঠ জুড়ে স্নিগ্ধ বিষণ্ণতা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট পুকুর, ডোবা বলা চলে। তাতে বোঝাই হয়ে আছে পানিফল।

একটা পানকৌড়ি উড়ে গেল দূর দিগন্তে। ডোবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাঁকানো খেজুরগাছ, তার ছায়া পড়ছে স্থির জলে। দূর আকাশে অল্প মেঘ। ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে পাখিদের দল। একটা শান্ত সমাহিত ভাব ছড়িয়ে আছে চারিধারে।

এগোতে এগোতে রাস্তাটা একসময় শেষ হল। শেষে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ। গুঁড়ির বেধ আর ঝুরি দেখে বোঝা যায় যে, বট বাবাজির বয়েসের ইয়ত্তা নেই। গোড়াটা এককালে শান দিয়ে বাঁধানো ছিল হয়তো, এখন ভেঙেচুরে একশা। গোড়ায় কয়েকটা কালো পাথর বসানো, তাদের গায়ে বিস্তর তেল-সিঁদুরের দাগ।

বট বাবাজি শেষ হলেই ঝোপঝাড় জঙ্গল শুরু। জঙ্গলের ওপার থেকে নাম না জানা পাখিদের ডাক ভেসে আসছে। পাতা ঝরার সময় শুরু হয়েছে। শুকনো পাতার ওপর শিরশিরে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। গা ছমছমে নীরবতা।

ফিরে আসব, এমন সময় মনে হল জঙ্গলের মধ্যে একটু দূরে কী যেন একটা চকিতে সরে গেল। যেন একটি হলুদ রঙের বিদ্যুতের রেখা হাওয়ার সঙ্গে মিশে মুহূর্তে উধাও!

ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ সেদিকে চেয়ে রইলাম। চোখে ভুল দেখলাম? দিনে দুপুরে এমন দৃষ্টিবিভ্রম তো ভালো লক্ষণ নয়।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। আর ঠিক তখনই আবার দেখলাম সেটা। নাকি তাকে?

একটা হলুদ শাড়ির আঁচল যেন একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়েই অন্য গাছের গুঁড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আঁচল বলা ভুল, আঁচলের প্রান্তটুকু।

তার সঙ্গেই একটা ক্ষীণ হাসির শব্দ। জলতরঙ্গের মতো, ঝরনার মতো, পাহাড়িয়া বাঁশির মতো মনকেমনিয়া সেই হাসি। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন জেগে উঠল সেই হাসির লহরী শুনে। উৎকর্ণ হয়ে রইলাম। চোখদুটি সন্ধান করে বেড়াতে লাগল সেই থিরবিজুরি আঁচলপ্রান্তখানি।

খানিক পরে আমার মনে হতে লাগল, কে যেন আমাকে জঙ্গলের মধ্যে ডাকছে। সেই ডাক আমার মাথার মধ্যে, আমার শিরার মধ্যে, আমার রক্তস্রোতের মধ্যে জেগে উঠছে বর্ষার মুথাঘাসের মতো। কে যেন মাথার মধ্যে ফিসফিস করে বলতে লাগল, ওই জঙ্গলে আমার যাওয়া দরকার, খুব দরকার। এখনই যেতে হবে, এই মুহূর্তে। না গেলে আমি কী যেন একটা হারাব। কী যেন একটা আমার জীবন থেকে চলে যাবে। একটা হারিয়ে ফেলার ভয়, একটা আক্ষেপ, একটা উগ্র আকাঙ্ক্ষা চিতিসাপের মতো আমার শিরদাঁড়া বেয়ে উঠতে লাগল।

আমি জঙ্গলের মধ্যে পা বাড়াতে যাব, এমন সময় কে যেন পেছন থেকে আমার জামার কলার টেনে ধরল।

পীতাম্বরবাবু বলে দিয়েছিলেন যে এবাড়ির সব কিছুই ঘড়ির কাঁটা মেনে হয়। তাই রাজবাড়ির মস্ত দেওয়ালঘড়িতে পাঁচটার ঢং বাজার সঙ্গে সঙ্গে আমি চা-জলখাবারের জন্য খাওয়ার ঘরে উপস্থিত হলাম। জয়ন্তও এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। এত বছর বম্বেতে একা থেকেও এই বাড়ির অনুশাসন ভোলেনি সে।

চায়ের সঙ্গে বাড়িতে ভাজা ভেজিটেবল চপ খাচ্ছি, এমন সময় পীতাম্বরবাবু বললেন, ‘গ্রামে এবার একটা বেশ অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে রানিমা।’

এখানে বলে রাখা ভালো, শিপ্রাকাকিমাকে এখানে সবাই রানিমা বলেই ডাকে। এই একবিংশ শতাব্দীতে ব্যাপারটা একটু হাস্যকর শোনায় বটে, কিন্তু এখানকার লোকজন এখনও এই প্রথা মেনে চলে। এমনকী কাজের লোকজনকেও শুনেছি জয়ন্তকে ‘রাজাবাবু’ বলে ডাকতে।

আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। আমি, শিপ্রাকাকিমা আর জয়ন্ত ছাড়া এই খাবার টেবিলে আর কেউ খেতে বসে না। পীতাম্বরবাবুকে অনেক অনুরোধ করলেও তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন।

শিপ্রাকাকিমা বললেন, ‘আবার কিছু হল নাকি পীতাম্বর?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, রানিমা। এবার আনুলিয়ার মণ্ডপাড়ায়। কাল রাতের বেলা কারা যেন দিলবর মণ্ডলের বাড়ির বেড়া ভেঙে তার পোষা মুরগিগুলোর গলা মুচড়ে ছিঁড়ে রেখে গেছে। আর সেইসঙ্গে চোখগুলো খুবলে নিয়েছে।’

শুনে কিছুই বুঝলাম না। গ্রামগঞ্জের দিকে জন্তুজানোয়ারের উৎপাত খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু গলা মুচড়ে মেরে ফেলা বা চোখ খুবলে ফেলে রেখে যাওয়ার ব্যাপারটা নতুন।

শিপ্রাকাকিমাকে জিগ্যেস করলাম, ‘এটা কী কেস কাকিমা?’

‘এজন্যই তো তোমাকে ডেকে পাঠানো বাবা। কয়েকদিন ধরে একটা অদ্ভুত জিনিস শুরু হয়েছে এ চত্বরে। তোমার তো এসব বিষয়ে আগ্রহ আর অভিজ্ঞতা দুই-ই আছে। দেখো, যদি একটা বিহিত করতে পারো।‘

শুনে বেশ অদ্ভুত লাগল। তারপর শিপ্রাকাকিমা আর পীতাম্বরবাবু মিলে যে কাহিনিগুলো বললেন, সেগুলো জুড়লে এরকম দাঁড়ায়—

সম্প্রতি আনুলিয়াতে একটা ঘটনা ঘটে। জগাই হালদার আনুলিয়ার একজন সম্পন্ন গৃহস্থ। অনেক ছোটখাটো ব্যবসার মধ্যে তাঁর একটি ব্যবসা ছিল দুধের। জগাই হালদারের বাড়ির গোয়ালে কয়েকটি গরু ছিল। তার মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড়, আর সবচেয়ে বেশি দুধ দিত, তার নাম ছিল মুংলি।

মাস দুয়েক আগে এক সকালে, জগাই গোয়ালে দুধ দুইতে গিয়ে দেখে মুংলি মরে পড়ে আছে৷ তার চোখদুটো খুবলানো। গরুটার পায়ের কাছে সাপের দাঁতের দাগ। তা সেই ঘাতক সাপ বাবাজিকেও গোয়ালেই পাওয়া গেল। সে এক মস্ত বড়, প্রায় ছ’ফুট লম্বা কেউটে। গ্রামের লোকজন পিটিয়ে মেরেই ফেলত, যদি না রমেন সাঁতরা গিয়ে সাপটাকে উদ্ধার করতেন।

‘রমেন সাঁতরা কে?’

‘রমেন সাঁতরা ওই এলাকার একজন নামী সর্পবিদ। ভদ্রলোক এককালে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন। তখনই তিনি সাপ ধরার ট্রেনিং নিয়ে, সাপ নিয়ে পড়শোনা করে রীতিমতো সর্পবিদ হয়ে ওঠেন। লোকালয়ে সাপের উপদ্রব হলে তাদের ধরে, রেসকিউ করে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসা, এই আর কী৷

‘রিটায়ার করার পর ভদ্রলোক নিজের বাড়িতেই সাপেদের একটা সর্পোদ্যান খুলে ফেলেন। তাতে গোখরো, কেউটে, করাইত, চন্দ্রবোড়া পাওয়া যায় না, এমন বিষধর সাপ নেই।

‘এই নিয়ে রমেনবাবুর বেশ কিছু নামডাকও হয়। সংবাদপত্র, টিভি এসব জায়গায় বেশ কয়েকবার বাইটও দিয়েছেন।

‘অতঃপর কেউটেটাকে রমেনবাবুর সর্পোদ্যানে নিয়ে আসা হয়। বনদপ্তর বলে পাঠায় যে কয়েকদিন বাদে তাকে তারা নিয়ে কোনও জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসবে।

‘দু’দিন বাদেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। রমেন সাঁতরার সর্পোদ্যান থেকে হঠাৎই উধাও হয়ে যায় সেই সর্পরাজ। জঙ্গলের সামনে যে প্রাচীন বটগাছটি আছে, তার সামনে পাওয়া যায় শুধু তার দেহখানি, মুন্ডু নেই! আর তার পাশে ঘোরাঘুরি করছিল গ্রামেরই বাসিন্দা বলাই শেখের পোষা বেজি।’

আমি একটুও আশ্চর্য হলাম না। বললাম, ‘এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে কাকিমা? সাপে-বেজিতে মারামারি তো সাধারণ ঘটনা। আর বেজি যে সাপকে লড়াইতে হারিয়ে তার মুন্ডু কেটে নেয় সেও তো জানা।’

‘না বাবা, এটা ঠিক সেরকম ঘটনা নয়। বেজি যে অত্যন্ত ক্ষিপ্র প্রাণী সে তো তুমি জানোই, সে সচরাচর সাপের মাথা ছিঁড়ে নেয়, সেও জানা। কিন্তু এক্ষেত্রে বেজিটা মরা সাপটার পাশে শান্ত হয়ে বসেছিল। আর সাপটার মাথাটা কাটা হয়েছিল যেন ছুরি বা অন্য কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে৷ সেই মাথাটা আর পাওয়া যায়নি।’

‘কিন্তু কাকিমা, কেউটের মাথা তো আর গন্ডারের শিংয়ের মতো দামি জিনিস নয়, যে চোরাবাজারে বেচে কেউ পয়সা কামাবে!’

‘সেটাই তো প্রশ্ন।’ কাকিমা বললেন, ‘এটা নিয়ে বেশ কয়েকদিন হইচই হল এ অঞ্চলে। তারপর যা হয়, সব থিতিয়ে গেল।

‘তারপর এ অঞ্চলে হঠাৎ করেই শুরু হল জন্ডিসের উপদ্রব৷ কথা নেই, বার্তা নেই, ঘরে ঘরে জন্ডিস। স্বাস্থ্যদপ্তরের টনক নড়ল। কর্মীরা এসে দেখে গেলেন, খাওয়ার জল বা অন্য কোথা থেকে কোনও সংক্রমণ হল কিনা। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না।

‘তারপর যেটা হল সেটাও… তুমি এখন বড় হয়েছ, তোমাকে বলাই যায়। তুমি তো জানোই, সব পাড়াগাঁয়েই কয়েকটা মাতাল থাকে, যারা রোজ মদ খেয়ে মাতলামি, মারামারি, চেঁচামেচি এসব করে। এখানেও এমন এক-দুজন ছিল। যেমন ধরো ফণীভূষণ, গগন, আর রমাকান্ত। তারা মদ খেলেও কেউই অসুস্থ ছিল না, নিয়মিত কাজে যেত আর রোজ রাতে মদ খেয়ে হইহল্লা করত। হঠাৎ করে হপ্তাদুয়েকের মধ্যে তিনজনেই গুরুতর অসুস্থ হল। এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মারা গেল। কারণ— লিভার সিরোসিস।’

‘রোজ মদ খেলে তো লিভার সিরোসিস হবেই কাকিমা।’

‘সে তো আমরা সবাই জানি নিবারণ। কথা সেটা নয়। কথা হচ্ছে তিনজনেই কিন্তু যথেষ্ট সুস্থ ছিল। লিভারের জন্য আয়ুর্বেদিক ওষুধপত্র খেত৷ যদিও সেটা নিয়মিত মদ্যপানের বিরুদ্ধে কোনও প্রোটেকশন নয়, কিন্তু দিব্যি সুস্থসবল তিনটে লোক দু’হপ্তার মধ্যে লিভার ফেইল করে মরে গেল, এটা একটু অস্বাভাবিক নয়?’

যদিও কাকিমার কথাটা খুব একটা যুক্তিযুক্ত ঠেকল না, তাও মাথা নাড়িয়ে সায় দিলুম।

‘বুঝতেই পারছ, হাজার হোক এখানে সব গাঁয়ের লোক। তারা এবার ভয় পেল। পাড়ার বুড়োরা বললেন শান্তি স্বস্ত্যয়ন করাতে। ছেলে ছোকরারাও ভারি উৎসাহের সঙ্গে চাঁদা আদায় করা, পুজোর প্যান্ডেল বাঁধা, মূর্তির অর্ডার দেওয়া, পুজো-আচ্চা আর যজ্ঞের আয়োজন করা, এসব কাজে নেমে পড়ল।

‘দু’দিন ধরে পুজো আর হোমযজ্ঞ হল। তারপর রাত্তিরে জলসা আর খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। যজ্ঞ-টজ্ঞের সব টাকাপয়সা অবিশ্যি রাজবাড়ি থেকেই দেওয়া হল।

‘পীতাম্বরের চেনাজানা এক মস্ত তান্ত্রিককে আনা হয়েছিল ওঁর দেশের বাড়ি থেকে। দু’দিন ধরে ঘটা করে পুজো হল। মোষবলি হল, মোষের রক্ত নিয়ে দেবীর সামনে যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি দেওয়া হল। তার পরদিন রাতভর মোচ্ছব। চার গাঁয়ের লোক পেটপুরে খেয়ে সারা রাত ধরে জলসা দেখল। তারপর ভোর ভোর বাড়ি ফিরে গেল।

‘পরের দিন থেকে শুরু হল খেলা। এলাকা জুড়ে বাড়ি বাড়ি জ্বর আর ভেদবমি। তড়িঘড়ি সরকারি হাসপাতাল থেকে টিম এল, ওষুধ দেওয়া হল। কারো প্রাণহানি হল না বটে, তবে এলাকার লোক ভয়ে কাঁটা হয়ে গেল। ফিসফিস স্বরে গুজব রটতে লাগল—জেগে উঠেছে, বকরাক্ষস জেগে উঠেছে। এবার আর কারো রক্ষা নেই!’

‘বকরাক্ষস! বকরাক্ষসের ব্যাপারটা কী?’

‘সে তোমাকে পরে বলব। আপাতত যা বলছি, তা শোনো।

‘পাড়ার গুরুজনেরা সেই তান্ত্রিককে তলব করলেন। নিশ্চয়ই দেবীর পূজায় বা যজ্ঞকর্মে ত্রুটি হয়েছে। তান্ত্রিক এসে হলফ করে বলল, তার পূজায় ত্রুটি হতেই পারে না। সে তার জ্ঞানমতে যতটা সম্ভব গ্রামবন্ধন করে দিয়ে গেছে। তবে যদি বকরাক্ষস জেগে ওঠে, তবে তার কিছু করার নেই।’

বিকেলের জলখাবারের পর আমি আর জয়ন্ত একটু হাঁটতে বেরোলাম। এ-কথা সে-কথার পর জয়ন্ত একটা সিগারেট ধরিয়ে জিগ্যেস করল, ‘দুপুরে জঙ্গলের দিকে গেছিলিস নাকি? শুনলাম কার নাকি শাড়ির আঁচল-ফাঁচল দেখে প্রায় ঝাঁপ মারতে বাকি রেখেছিলিস?’

বুঝলাম, পীতাম্বরবাবু আমার অনুরোধ রাখেননি।

দুপুরে যখন জঙ্গলের মধ্যে সম্মোহিতের মতো এগিয়ে যাচ্ছি, পিছন থেকে আমার কলার টেনে ধরেছিলেন পীতাম্বরবাবুই। তিনিই বারণ করেছিলেন জঙ্গলের মধ্যে যেতে। কিন্তু তার কারণ কিছু বলেননি।

আমি ওই শাড়ির আঁচল দেখার কথাটা বলতে ভদ্রলোকের মুখ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেছিল৷ আমি বলেছিলাম কথাটা জয়ন্ত বা কাকিমাকে জানাবার দরকার নেই। এখন দেখছি নায়েবমশাই আমার অনুরোধ অগ্রাহ্য করে কর্মচারীর কর্তব্য পালন করার পথটাই বেছে নিয়েছেন।

পুরো গল্পটা জয়ন্তকে বলতেই হল। শুনে হো হো করে হেসে উঠল জয়ন্ত, ‘ওই জঙ্গলের মধ্যে তুই হলুদ শাড়ির আঁচল দেখছিস? মাইরি, তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নিবারণ। তুই এবার একটা বিয়ে কর।’

আমি কিন্তু হাসতে পারলাম না। বললাম, ‘না রে, বিশ্বাস কর, আমি সত্যিই দেখেছি।’

‘হুম।’ কৌতুকের চোখে তাকাল জয়ন্ত, ‘বুঝেছি। তবে পীতাম্বরকাকা তোকে বাধা দিয়ে ঠিক কাজই করেছেন। দিনেদুপুরে জঙ্গলের মধ্যে ছেলেধরা ডাইনি আমার বন্ধুটাকে ধরে নিয়ে গেলে জবাব দিতে আমার প্রাণান্ত হতো।’

আমি কিন্তু হাসলাম না। ভুরু কুঁচকে বললাম, ‘এই ডাইনির ব্যাপারটা কী বল তো? পীতাম্বরবাবুও বললেন, এ নাকি বকরাক্ষসের জঙ্গল। এখানে যখন তখন ঢোকা মানা?’

সিগারেট শেষ হয়ে গেছিল। শেষ টুকরোটা একটা টুসকিতে ফেলে দিল জয়ন্ত, ‘চ’, ঘরে চ’। ডিনার টেবিলে বরং মায়ের থেকে শুনে নিস। দেরি হলে কিন্তু মা খেতে দেবে না।’

‘ওই জঙ্গল প্রায় হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। লোকে বলে সেই পালরাজাদের সময় থেকে। এতকালের মধ্যে কত জঙ্গল উজাড় হয়ে গেল, কত বন কেটে লোকে বসতি বসাল, কিন্তু এই বকরাক্ষসের জঙ্গল যেমন ছিল, তেমনই আছে।’

ডিনার টেবিলে বসে চা খেতে খেতে বকরাক্ষসের জঙ্গলের কথা শোনাচ্ছিলেন শিপ্রাকাকিমা।

‘লোকে বলে এ নাকি অভিশপ্ত জঙ্গল। যারা এর ভেতরে কাঠ কাটতে বা মাছ ধরতে বা জন্তুজানোয়ার শিকার করতে গেছে, তাদের ওপর নাকি বকরাক্ষসের অভিশাপ নেমে এসেছে। হয় তারা পাগল হয়ে গেছে, অথবা সবংশে নির্মূল হয়েছে।’

‘বকরাক্ষস?’ একটুকরো গাওয়া ঘি-তে ভাজা লুচি ছিঁড়ে ছোলার ডালে চুবিয়ে মুখে দিয়ে বললাম, ‘বকরাক্ষসটা আবার কে?’

শিপ্রাকাকিমা আরও দুটো লুচি আমার থালায় তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘প্রবাদ আছে, এই বনজঙ্গল, জঙ্গলের মধ্যে থাকা গড় আর জঙ্গলের সমস্ত প্রাণীকে রক্ষা করে এক পিশাচ। লোকে তার নাম দিয়েছে বকরাক্ষস।

‘এই বকরাক্ষসের কাহিনির পেছনে এক বহু পুরোনো লোকগাথা আছে।

‘আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে, এখন যেখানে ওই জঙ্গল, সেখানে দেবগ্রাম নামে একটা গ্রাম ছিল। সেখানে বাস করত দেবপাল বা দেবল নামে এক কুমোর।

‘কুমোর হলে কী হবে, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু পরিশ্রম করে ধনী হওয়া তার ধাতে ছিল না। সে চাইত ঝটপট বড়লোক হতে। তাই সে দিনরাত কুমোরের চাকা ঘোরাত আর ভাবত কীভাবে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরবে।

‘দেবলের এক ব্রাহ্মণ বন্ধু ছিল। নাম সুবুদ্ধিমিশ্র। নাম সুবুদ্ধি হলেও, সে ছিল বড় অলস আর ধূর্ত। দেবলকে যত সব ফন্দিফিকির সে-ই জোগাত।

‘একবার সেই গ্রামে এক সিদ্ধ মহাপুরুষ আসেন। তাঁর গায়ের রং উজ্জ্বল তামার মতো, সারা মুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গলে ভর্তি আর চোখদুটো অবলোকিতেশ্বরের চোখের মতো করুণাঘন।

‘তিনি নাকি মন্ত্রবলে জলকে মদ বানিয়ে দিতে পারতেন, জলের ওপর হাঁটতে পারতেন, এক কুনকে চাল থেকে ভাত রান্না করে পুরো গ্রামের লোককে খাওয়াতে পারতেন, মুমূর্ষু রোগীকে জড়িবুটি খাইয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারতেন ইত্যাদি।

‘দেবলের অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল কোনও অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষের সেবা করে অশেষ ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে বসবে। সে অবরে-সবরে বিভিন্ন সাধু মহাত্মাদের সেবা করে বেড়াত আর সহজে বড়লোক হওয়ার উপায় খুঁজত।

‘কিন্তু সাধুরাও অধিকারী-অনধিকারী ভেদ বিলক্ষণ বুঝতেন৷ তাঁরা তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন।

‘দেবল এই সিদ্ধপুরুষকে পেয়ে একেবারে বিগলিত হয়ে পড়ল। একে তো তাঁর অসামান্য অলৌকিক বিভূতি। তার ওপর স্বভাবটিও ভারি মিঠে। কাউকে কড়া কথা বলেন না। গলার স্বর যেমন মৃদু, বলার ভঙ্গিটিও তেমন নম্র। দেবল একেবারে কাজকর্ম লাটে তুলে দিয়ে সাধুর সেবায় লেগে পড়ল।

‘সাধু থাকতেন গ্রামের প্রান্তে একটি পরিত্যক্ত গোয়ালে। দিনে একবার খেতেন, আর অবসর সময়ে কাঠ কেটে কেটে আশ্চর্য সব মূর্তি বানাতেন। একবার কাকে যেন বলে ফেলেছিলেন, উনি পূর্বাশ্রমে ছুতোর ছিলেন।

‘তবে দিনের বেশিরভাগ সময়েই চোখ বুজে যোগধ্যান করতেন। কেউ উপদেশ চাইতে এলে শুধু বলতেন, কারো ক্ষতি কোরো না, কাউকে ঈর্ষা কোরো না, সবাইকে ভালোবাসো, সবাইকে সমদৃষ্টিতে দেখো ইত্যাদি। শাস্ত্রজ্ঞান, যোগবিভূতি ইত্যাদির কোনও কথাই নেই।

‘সাধুর একটা পোষা বকপাখি ছিল। অমন প্রকাণ্ড বকপাখি এই অঞ্চলে কেউ কোনওদিন দেখেনি। তার চঞ্চু, মানে ঠোঁট নাকি এত বড় ছিল আর তার নীচে একটা এত্ত বড় থলি ছিল যে তার মধ্যে একটা বাছুরকে লুকিয়ে রাখা যেত।’

আমি অস্ফুটে বলে ফেললাম, ‘পেলিকান?’

কাকিমা ঘাড় নাড়লেন, ‘বর্ণনা শুনে তাই মনে হয়। সে বকপাখি নাকি মাছ ছাড়া কিছু খেত না। আর আমাদের দেবল মাছ ঘুষ দিয়ে পাখিটিকে দিব্যি বশ করেছিল।

‘কিন্তু দেবল দিনের-পর-দিন সাধুর সেবা করেও কোনও বিভূতি, হঠাৎ বড়লোক হওয়ার মন্ত্র, কোনও স্পেশাল আশীর্বাদ কিছুই পেল না। উপরন্তু একদিন সাধু তাকে জানালেন, পরের দিন রাতেই তিনি এই অঞ্চল ছেড়ে উত্তর দিকে চলে যাবেন।

‘শুনে দেবলের তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। এতদিনের পরিশ্রম বিফলে যায় যায় প্রায়। সে বুঝতে পারল না, কী করবে।

‘তখন তাকে বুদ্ধি জোগাল তার সেই বন্ধু সুবুদ্ধি। দেবল সারাদিন সাধুর সেবা করে সন্ধেবেলা গোয়াল ছেড়ে নিজের ঘরে চলে যেত। সেদিন সুবুদ্ধির পরামর্শমতো সাধুর গোয়ালঘরের বাইরে একটা বড় আমগাছে উঠে বসে রইল সে।

‘গাছে উঠে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে দেখল, মাঝরাত নাগাদ গোয়ালের বাইরে বসে থাকা নিজের পোষা বকপাখিটার কাছে এলেন সাধু। নিজের ঝোলা থেকে একটা বড় পাথর বার করলেন। তার গায়ে হাত ঘষে বিড়বিড় করতেই তাঁর পায়ের কাছে ধুপ ধুপ করে কয়েকটা মাছ এসে পড়ল।

‘দেবল স্পষ্ট বুঝে গেল, তার ভবিষ্যৎ কোন পথে বইবে। সেই রাতে সাধু ঘুমিয়ে পড়লে সে চুপিসারে সাধুর কুটিরে ঢুকে ঝোলা থেকে পাথরটা চুরি করে পালিয়ে গেল।’

আমি প্রশ্ন না করে পারলাম না, ‘সে কী? সেই সাধু নাকি এত ক্ষমতাবান, এত অতিপ্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী ছিলেন যে বিভিন্ন অলৌকিক বিভূতি দেখাতে পারতেন। তারপরেও দেবল তাঁর ঘুমের সুযোগ নিয়ে পাথরটা চুরি করে নিয়ে গেল? তিনি বুঝতে পারলেন না?’

কাকিমা হেসে বললেন, ‘বুঝতে কি আর পারেননি? দেবল ওঁর গোয়ালে ঢোকামাত্রই উনি সব জানতে পেরেছিলেন৷ তিনি কি চাইলে তাঁর পাথরটা কেড়ে নিতে পারতেন না? নিশ্চয়ই পারতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, তিনি সেসব কিছুই করেননি।

‘শোনা যায়, দেবল যখন পাথরটা নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন নাকি ঘুম ভেঙে উঠে বসেছিলেন তিনি। হেসে বলেছিলেন, দেবল যদি সৎ আর নির্লোভ হয়ে প্রজাশাসন করে তাহলে তিনি মনে করবেন যে পাথরটা উপযুক্ত হাতেই গেছে৷

‘কিন্তু যদি সে বা তার কোনও উত্তরসূরি দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তাঁর ওই পোষা বকপাখি এসে সবাইকে সবংশে বিনাশ করবে। যে রাজ্য আর রাজবংশের পত্তন করবে দেবল, সেই রাজ্য আর রাজবংশ ছারেখারে যাবে।’

‘বাব্বা! ভারি ভালো সাধু বলতে হবে।’

‘সে আর বলতে! তিনি সেই যে ঘুম থেকে উঠে বসলেন, তারপর আর বিছানায় শোননি। ওই মুহূর্তেই নিজের পোষা বকপাখিকে নিয়ে ঝোলা উঠিয়ে এই জনপদ ত্যাগ করেন।’

‘তারপর?’

কাকিমা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, ‘কী কাণ্ড দেখো! এত রাত হয়ে গেল, আর আমি বসে বসে গল্প করছি। এদিকে রাজ্যের কাজ বাকি৷ এখন তোমরা যাও দেখি। বাকিটা পরে বলব।’

সেই রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। একটা ঘাসে ছাওয়া বিস্তীর্ণ মাঠ। ঠিক তার মধ্যিখানে একটি অতি প্রাচীন মন্দির। আর সেই মন্দিরকে ঘিরে পাঁচটি অতি প্রাচীন মহাদ্রুম।

একটু পরে দেখলাম, সেই মন্দির থেকে হলুদ রঙের শাড়ি পরা এক অপরূপ সুন্দরী নারী বেরিয়ে এসে আমার দিকে একবার বিষণ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দিগন্তের দিকে চলে গেলেন। তাঁর মাথার ওপর উড়ে গেল একটি অতি বিশাল বকপাখি।

পরদিন সকালে জলখাবার খেতে বসেছি, কাকিমা জয়ন্তকে বলছেন আমাকে চারিদিকটা ঘুরিয়ে দেখানোর কথা, এমন সময়ে পীতাম্বরবাবু এসে উত্তেজিতস্বরে বললেন, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে বাবা! মহা অনর্থ উপস্থিত হয়েছে।’

জয়ন্ত বলল, ‘কী হয়েছে কাকা?’

‘সরকার থেকে লোক এসেছে। তারা নাকি দেবলরাজার গড় খুঁড়ে দেখবে।’

জয়ন্ত বলল, ‘সে কী? হঠাৎ? চলুন তো পীতাম্বরকাকা, কী কেস দেখা যাক। নিবারণ, তুইও চল।’

রাস্তায় বেরিয়ে খানিকটা যেতেই দেখি, মোড়ে মোড়ে উত্তেজিত জটলা। গ্রামের নারী-পুরুষ একত্র হয়ে হাত পা নেড়ে কী যেন একটা আলোচনা করছে। আমরা কাছে যেতেই এক প্রৌঢ় ছুটে এলেন, ‘ও বাবা জয়ন্ত, এদিকে তো মহাপ্রলয় হতে চলেছে!’

‘কী হয়েছে রমেনকাকা?’

‘এক্সকাভেশন হবে গো বাবা। গরমেন্ট থেকে লোক এয়েচে। দেবলরাজার গড় খুঁড়ে দেখবে বলচে।’

ভুরু কুঁচকে জয়ন্ত বলল, ‘তারা এখন আছে কোথায় কাকা?’

‘থানাতে বসে আছে বাবা। চলো না! সবাই মিলে চলো।’

গাংনাপুর থানাটা গঞ্জের ওপারে। পায়ে হেঁটে যেতে লাগল দশ মিনিট। গিয়ে দেখি দুজন সুবেশ মানুষ থানায় বসে ওসি ওসমান আলির সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা গিয়ে উপস্থিত হতেই ওসি সাহেব জয়ন্ত’র পরিচয় দিলেন। জয়ন্ত আমার সঙ্গে বাকি সবার পরিচয় করিয়ে দিল। গ্রামের লোকেরা থানার বাইরেই রইল।

জানা গেল, এঁরা আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের লোক। এখানে এসেছেন এক্সকাভেশনে। কীসের এক্সকাভেশন, সে বিষয়ে খুলে বললেন প্রকল্পের অধিকর্তা জ্যোতিষ বাগল। বাগলমশাইয়ের মোটা, কালো, মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। কথা বললে মনে হয় যেন বাজ ডাকছে।

জয়ন্ত বলল, ‘দেখুন, সরকারের কাজ সরকার করবেই। ব্যাপারটা হচ্ছে যে, জঙ্গল আর দেবলরাজার গড় নিয়ে স্থানীয় লোকেদের মনে অনেকদিন ধরে একটা সংস্কার জমে আছে। ওদের সঙ্গে কথা না বলে এক্সকাভেশন করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আপনারা কী চান যদি জানান, তাহলে আমি লোকজনকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে পারি।’

বাগলমশাই মাথা নেড়ে বললেন, ‘সে তো বটেই। তবে এই দেবলরাজার গড় নিয়ে কিন্তু স্টেট নয়, সেন্ট্রাল অবধি আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টে একটা, হিন্দিতে যাকে বলে হলচল, সেটা পড়ে গেছে। এএসআই একেবারে উঠেপড়ে লেগেছে এই গড় খুঁড়ে দেখবে বলে।’

আমি বললাম, ‘বুঝলাম৷ কিন্তু তার আগে আমাদের বলুন তো, গভর্নমেন্ট হঠাৎ এই দেবলরাজার গড় নিয়ে এত উৎসাহী হয়ে উঠল কেন? মানে দেশে কি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটের কমতি আছে!’

বাগলমশাই চায়ের কাপে একটা তৃপ্তির চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আহা! চা-টা বড় ভালো আনিয়েছেন আলি সাহেব৷ শরীর মন একেবারে তরতরে হয়ে গেল৷ হ্যাঁ, কী যেন জিগ্যেস করছিলেন ভাই? গভর্নমেন্ট কেন এর পেছনে হাত ধুয়ে পড়ে গেছে সেটা জানতে চান, তাই তো? তাহলে বলি, এর পেছনে একটা কাহিনি আছে—

‘আজ থেকে মাস দুয়েক আগে শিয়ালদহ রেল স্টেশনের কাছে এক চোর ধরা পড়ে। ধরা পড়ার কথা নয় এমনিতেই। কলকাতা শহরটা চোর-ছ্যাঁচড়ে একেবারে গিজগিজ করছে। ক’জনই বা পুলিশের জালে পড়ে! কিন্তু এই বাবাজীবন খুব অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ধরা পড়ে যান।

‘সেদিন শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরে ভোরবেলার দিকে দেখা যায় এক পাগল গোছের লোক ফুটপাতের একটা চায়ের দোকানের সামনে প্রবল জ্বরে ধুঁকছে। কথাবার্তা অসংলগ্ন। কেউ কাছে গেলেই হাউমাউ করে ঢিল ছুড়ছে আর গালি দিচ্ছে। সঙ্গে আর কিছু নেই, কেবল একটা ঝুলি বুকের কাছে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখা। ট্রাফিক পুলিশ কোনওমতে তাকে পাকড়াও করে তার ঝুলিটা কেড়ে নেয়। সেই ঝুলি খুলে দেখা যায় তার মধ্যে বেশ কিছু প্রাচীন যুগের জিনিসপত্র আছে। আর্কিওলজিকাল আর্টিফ্যাক্টস।

‘বলা বাহুল্য, দেখে পুলিশের টনক নড়ে। তাকে বিআর সিং-এ ভর্তি করে কেস যায় উঁচু লেভেলে৷ লোকটার পকেটে একটা মানিব্যাগ ছিল। তার মধ্যে কিছু টাকাপয়সাসহ একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। জানা যায়, তার বাড়ি মালদা জেলার বুলবুল চণ্ডীতে। নাম লেখা ছিল, মুন্নালাল।

‘মালদা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানকার পুলিশ জানায়, নাম ঠিকানা দুটোই ফলস। তবে ছবি দেখে এক প্রবীণ ওসি লোকটাকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। তার নাম রতন মণ্ডল। বহুদিনের পুরোনো পাপী, দাগি। সাকিন বাংলাদেশের নওগাঁ জেলা৷ তবে শ্রীমান রতন মণ্ডল কোনও সাধারণ ছিঁচকে চোর নন। ইনি হচ্ছেন যাকে হিন্দিতে বলে কংস রাজার বংশধর।’

ওসমান আলি বিরক্তস্বরে বললেন, ‘ওটা হিন্দি নয়, বাংলা।’

‘আহা, ওই হল।’ হাত নাড়িয়ে আপত্তিটা হাওয়াতে উড়িয়েই দিলেন বাগলমশাই। ‘মোটমাট রীতিমতো উচ্চমার্গের প্রশিক্ষিত চোর৷ তার কাজই হচ্ছে বাংলার বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আর্কিওলজিকাল সাইট থেকে পুরাকীর্তি চুরি করে এনে বিদেশের বাজারে বেচে টু-পাইস কামানো। বাংলাদেশে তাড়া খেলে সে ইন্ডিয়াতে এসে লুকোয়, এদিকের পুলিশ হুড়কো দিলে ওপারে গা ঢাকা দেয়৷ বছরখানেক তাকে ইন্ডিয়াতে দেখা যায়নি। পুলিশ ভেবেছিল তাড়া খেয়ে আপাতত এলাকার বাইরে আছে।

‘এই রতন মণ্ডলের কাছ থেকে যা যা উদ্ধার করা হয় তার মধ্যে বেলেপাথরের তৈরি একটা অত্যন্ত প্রাচীন কালের দ্বিভুজা দেবীমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটা সম্ভবত কুষাণ যুগের। ইনট্যাক্ট, বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি। আর্টের দিক দিয়েও অসামান্য।

‘বাকি যা যা আর্টিফ্যাক্টস পাওয়া যায়, তার মধ্যে কুষাণ যুগ তো বটেই, গুপ্ত এবং পাল যুগেরও কিছু আইটেম আছে৷ অধিকাংশই বেলেপাথরের। কিছু ব্যাসল্ট পাথরে তৈরি পুরাকীর্তিও আছে। আর সেখান থেকেই সব কিছুর শুরু।

‘কিন্তু মণ্ডলের পো-কে কোনও জেরাই করা যায়নি৷ যখন তাকে ধরা হয়, তখনই সে প্রবল নিউমোনিয়ায় ভুগছে। হাসপাতালে ভর্তি করার পরদিনই সে কোমায় চলে যায়।’

জয়ন্ত প্রশ্ন করল, ‘বুঝলাম। কিন্তু তার সঙ্গে আপনাদের এই উদ্যোগের কী সম্পর্ক?’

বাগলমশাই গলার স্বর একটু নিচু করলেন, ‘লোকটা কোমায় চলে যাওয়ার ঠিক আগে একবার চোখ খুলে “ওই যে, বকরাক্ষস খেতে এল রে, কে কোথায় আছ, বাঁচাও, বাঁচাও” বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। ব্যস, সেই তার শেষ কথা।’

আমরা সবাই সপ্রশ্নচোখে ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে রইলাম।

বাগলমশাই বললেন, ‘ব্যাপারটা এখানেও মিটে যেতে পারত। মিটল না একটা পার্টিকুলার কারণে। তার আগে এঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।’

বাগলমশাই তাঁর সঙ্গীর দিকে ফিরলেন, ‘ইনি হচ্ছেন প্রফেসর দেবব্রত লাহা, বরোদার মহারাজ সয়াজিরাও ইউনিভার্সিটির আর্কিওলজির প্রফেসর। ভারতের প্রাচীন যুগের পুরাকীর্তি বিষয়ে ইনি একজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ।’

প্রফেসর লাহা দু’হাত তুলে নমস্কার করলেন। ভদ্রলোকের লম্বা দোহারা চেহারা, উচ্চতায় ছ’ফুটের বেশি বই কম নয়। মাথার মধ্যিখানে সামান্য টাক। পরিধানে অতি সাধারণ কেজো পোশাক। পায়ে একটা বাহারি কেডসের জুতো। তবে দেখার মতো হচ্ছে ভদ্রলোকের চোখদুটো। এমন শান্ত, গভীর অথচ অস্বস্তিকর চোখ দেখিনি বললেই চলে।

ভদ্রলোক এতক্ষণ একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে একটানা জয়ন্ত’র দিকে চেয়েছিলেন। বাগলমশাই বললেন, ‘প্রফেসর লাহা, আপনার বক্তব্য আপনিই বলুন না।’

প্রফেসর লাহা একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন, ‘গভর্নমেন্ট থেকে আমার সঙ্গে ওই দ্বিভুজা দেবীমূর্তি নিয়ে যোগাযোগ করা হয়। আমি মূর্তিটাকে দেখে বুঝতে পারি, এর সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার একটা যোগসূত্র আছে৷

‘বুঝতেই পারছেন, আমাদের মতো আর্কিওলজিস্টদের কাছে ব্যাপারটা কতটা ইমপর্ট্যান্ট। হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর ব্যাপারে তো আপনারা জানেন। এও জানেন যে সেই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেই সুদূর পশ্চিমে পাঞ্জাব সিন্ধ এলাকায়। এখন যদি তার সঙ্গে এই পুব দিকের বাংলার কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়, তাহলে ভারতের ইতিহাসের আদিপর্বের অনেকটাই নতুন করে লিখতে হবে।’

‘সুতরাং গোটা ডিপার্টমেন্টে একেবারে হুলস্থুল পড়ে গেল৷ কিন্তু কথা হচ্ছে এই বকরাক্ষসের জঙ্গলের খোঁজ দেবে কে? রতন মণ্ডল তো থেকেও নেই।

‘আমরা তখন ঠিক করি, পুরো ওয়েস্ট বেঙ্গলে কোথায় কোথায় বকরাক্ষসের লেজেন্ড আছে, সেসব নিয়ে খোঁজ করা শুরু করব। ইন ফ্যাক্ট, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গেও এই নিয়ে যোগাযোগ করব বলে ভাবছিলাম৷ প্ল্যান প্রোগ্রাম ছকে ফেলা হচ্ছে, ঠিক তখনই আমাদের দপ্তরে একটা উড়ো চিঠি আসে। আর তাতে এই দেবলরাজার গড় আর সেই নিয়ে এই এলাকাতে প্রচলিত সব কিংবদন্তী আর সংস্কারের কথা লেখা ছিল। ব্যস, আমাদের জায়গাটা খুঁজে পেতে আর অসুবিধাই হয়নি।’

আমার মনে তখনও কিছু প্রশ্ন ঘুরছিল, ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু রতন মণ্ডল এর খোঁজ পেল কোথা থেকে?’

বাগলমশাই হাত ওলটালেন, ‘দেখুন এসব সার্কিটে যারা ঘোরাফেরা করে তাদের নেটওয়ার্ক অনেক দূর দূর অবধি ছড়ানো থাকে। হয়তো সেরকম কোনও সূত্রেই এই জঙ্গল আর দেবলরাজার গড়ের কথা শুনেছিল সে। সেসব অবশ্য আমাদের মাথাব্যথা নয়, পুলিশ বুঝবে। মোদ্দা কথা হল, গভর্নমেন্ট খুব উৎসাহিত হয়ে পড়েছে নিদর্শনগুলো হাতে পেয়ে। তাই আমাদের ওপর হুকুম হয়েছে ওই দেবলরাজার গড় খুঁড়ে আরও যে সব পুরাকীর্তি আছে, সেসব খোঁজ করার।’

জয়ন্ত এতক্ষণ চেয়ারে সোজা হয়ে বসেছিল। এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘বুঝলাম৷ তা আপাতত আপনাদের প্ল্যান কী?’

বাগলমশাই বললেন, ‘আপাতত আমরা সার্ভে করতে এসেছি। তাতেই মাস দুয়েক লাগবে। আসল কাজ শুরু হবে ডিসেম্বর নাগাদ, চলবে পরের বছর জুন অবধি। ততদিন যা পাওয়া যায় যাবে। তারপর বর্ষা শুরু হলে কাজ বন্ধ। আবার শুরু হবে দুর্গাপুজোর পর।’

জয়ন্ত ইতস্তত করে বলল, ‘একটা কথা। আপনারা ওই জঙ্গল আর রাজার গড় নিয়ে প্রচলিত লোককথা জানেন তো? ওই জঙ্গল অভিশপ্ত।’

বাগল সাহেব সামান্য হেসে বললেন, ‘দেখুন জয়ন্তবাবু, আমরা এখানে আসার আগে ওসব নিয়ে রিসার্চ করেই এসেছি। আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টে নয় নয় করেও আমার বিশ বচ্ছর হয়ে গেল। প্রাচীন পুরাকীর্তি নিয়ে সব জায়গাতেই এরকম গল্পকাহিনি শোনা যায়৷ সেসবে কান দিতে গেলে মহেঞ্জোদারোও আবিষ্কৃত হতো না! পার্থেননও লোকচক্ষুর অগোচরেই থেকে যেত!

‘আমরা এখানে এসেছি জায়গাটা সরেজমিনে তদন্ত করে যাব বলে৷ থাকব দিন দশেক। আপনাদের সহযোগিতা পাব তো?’

জয়ন্ত নিমরাজি হয়ে ঘাড় নাড়ল।

‘চিন্তা করবেন না জয়ন্তবাবু।’ শান্ত স্বরে বললেন প্রফেসর লাহা, ‘আমরা স্থানীয় লোকবিশ্বাস নিয়ে যথেষ্ট সংবেদনশীল। আমরা এমন কিছুই করব না, যাতে দেবগ্রাম গাংনাপুর আনুলিয়া জুড়ে এই জঙ্গল আর গড় নিয়ে যে প্রাচীন বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে তাতে কোনও আঘাত লাগে।’

জ্যোতিষ বাগল ঘড়ি দেখেই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ‘যাই হোক, আমাদের কথা তো বললাম৷ আপনারা এই এলাকার মান্যগণ্য লোক। স্থানীয় লোকজনদের একটু ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবেন। কাল সকাল থেকে কাজ শুরু করতে হবে৷ চলি তাহলে?’

আমরাও উঠে দাঁড়ালাম। বাগলমশাই প্রফেসর লাহাকে বগলদাবা করে বেরিয়ে গেলেন।

‘এই বকরাক্ষসের অভিশাপের ব্যাপারটা কী এবার খুলে বল তো জয়ন্ত।’

আমি, জয়ন্ত আর পীতাম্বরবাবু ফিরে আসছিলাম বাড়ির দিকে। বেলা প্রায় দেড়টা বাজে। আমাদের কারোরই স্নান খাওয়া হয়নি। মোড়ে মোড়ে, পানের দোকানের সামনে জটলা। দু-একজন আমাদের দেখে এগিয়ে এল। উদ্বিগ্নস্বরে প্রশ্ন করল, সরকার থেকে নাকি রাজার গড় খুঁড়ে দেখবে? সত্যি নাকি?

জয়ন্ত সবাইকেই আশ্বস্ত করল। তারপর আমাকে বলল, ‘কাল তো মায়ের কাছ থেকে শুনলি গল্পটা। বাকিটা পীতাম্বরকাকা বলুন।’

পীতাম্বরবাবু জেনে নিলেন কতটা শুনেছি। তারপর বলা শুরু করলেন।

‘দেবল তো সেই মন্ত্রপূত পাথরের জোরে এই সমস্ত অঞ্চলের রাজা হয়ে বসল। তখনকার দিনে ছোটখাটো জমিদারদেরও রাজাই বলত লোকে। সুবুদ্ধি হল তার পরামর্শদাতা আর মন্ত্রী। দেবগ্রাম হল তার রাজধানী। লোকলশকর লাগিয়ে সে একটা মস্ত বড় প্রাসাদ বানিয়ে ফেলল। প্রাসাদ ঘিরে উঁচু দেওয়াল। সে দেওয়াল এত চওড়া যে তার ওপর দিয়ে ঘোড়সওয়ার ঘোড়া হাঁকিয়ে যেতে পারে। আর প্রাসাদের একদম ভেতরে সে প্রতিষ্ঠা করল একটা মন্দির। দেবী বলাকিনীর মন্দির।’

‘কীসের মন্দির?’

‘দেবী বলাকিনী। বলাকা মানে বক। লোকে বলত বকদেবীর মন্দির।’

কথাটা শুনে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলাম। ‘বকদেবীর মন্দির? এরকম কোনও দেবী আছেন নাকি?’

‘এখন বোধহয় নেই। তবে সেকালে ছিলেন নিশ্চয়ই। নইলে তাঁর নামে মন্দির হবে কেন?’

চুপ করে গেলাম। যুগে যুগে মানুষের ধর্মবিশ্বাস যে পালটায়, নতুন নতুন দেব-দেবীর আবির্ভাব ঘটে, সে তো চোখের সামনেই দেখা।

‘হুম। কিন্তু এই বলাকিনী দেবীর মন্দির বানানোর দরকার হল কেন?’

‘সুবুদ্ধিমিশ্র অতি বুদ্ধিমান লোক ছিল। সে বুঝেছিল যতদিন দেবলরাজার বংশধর এই অঞ্চলের জমিদার বা শাসক হয়ে থাকবে, ততদিন তার উত্তরাধিকারীদের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত থাকবে। শুধু একটাই ভয়, যদি দেবলরাজার উত্তরাধিকারীরা খুব অন্যায় কিছু করে ফেলে? তাই সে এই দেবী বলাকিনী বা বকদেবীর মূর্তি আর পূজার পরিকল্পনা করল। অর্থাৎ তাঁকে তুষ্ট রাখলে দেবলরাজার গড় আর রাজত্ব নির্বিঘ্ন থাকবে।’

‘কিন্তু এমন দেবীর পরিকল্পনা তার মাথায় এল কী করে?’

‘কিংবদন্তী বলছে, সুবুদ্ধিমিশ্র প্রকাশ্যে ব্রাহ্মণ হলেও আসলে ছিলেন একজন মস্ত বড় তন্ত্রবিদ। তখনকার দিনে ব্রাহ্মণদের জন্য তন্ত্রবিদ্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল বটে। কিন্তু এদিকে তখনও ধর্মীয় নিয়মনীতির অত কড়াকড়ি ছিল না। তখন এখানে জলে-জঙ্গলে প্রাচীন আদিবাসীদের মধ্যে প্রাকৃত ধর্ম আর প্রাকৃতিক তন্ত্রক্রিয়ার বিশেষ প্রচলন ছিল।

‘সুবুদ্ধিমিশ্র গোপনে গোপনে তন্ত্রক্রিয়া শিখে মস্ত তান্ত্রিক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজে সপ্তমাতৃকা তন্ত্রে মহাসিদ্ধ তো ছিলেনই, তার ওপর তিনি পিশাচখণ্ডী নামে একটি সঙ্গী জুটিয়েছিলেন।

‘পিশাচখণ্ডী জাতিতে ছিল চণ্ডাল। সে নিজেও কম বড় তান্ত্রিক ছিল না। শাবর তন্ত্রে ঘোর সিদ্ধি ছিল তার। পিশাচখণ্ডী আর সুবুদ্ধি মিলে দুজনে যা যা শিখেছিলেন, যত তন্ত্রমন্ত্র তুকতাক জানতেন, সবমিলিয়ে এই দেবী বলাকিনীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

‘জনশ্রুতি আছে, সেই বলাকিনী দেবীর মূর্তি নাকি মহাজাগ্রত ছিল। তাঁর কাছে শুদ্ধাচারে পূজা বা ক্রিয়া করে কিছু চাইলে তা কখনও ব্যর্থ হতো না। দেবলরাজার বংশধরদের প্রত্যেকে যুদ্ধে যাওয়ার আগে বলাকিনীর দেবীর পুজো করে যেতেন। তাতেই তাঁদের যুদ্ধে জয় অনিবার্য ছিল৷ সেই দেবীর আশীর্বাদেই তাঁরা প্রায় এক হাজার বছরের ওপর ধরে এই অঞ্চলের জমিদারি তথা রাজত্ব চালিয়ে এসেছেন।

‘সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। দেবলরাজা লোভী ছিল বটে। তবে খুব ধর্মভীরুও ছিল। সাধুর অভিশাপের ভয়ে সে প্রজাদের ভালোই দেখভাল করত। উত্তরসূরিদেরও তেমনই নির্দেশ দিয়ে গেছিল। তার নামডাক ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। প্রজারা দেবলরাজার প্রাসাদকে বলত দেবলরাজার গড়।

‘তবে রাজ্য খুব বেশি বড় ছিল না। কারণ সে বা তার বংশধররা কেউ নিজেরা অন্য রাজ্য আক্রমণ করেনি। অযথা রক্তপাত এড়িয়ে গেছে।

‘প্রায় হাজার বছর পর দেবগ্রামের রাজা হলেন বিক্রমজিৎ, বা বিক্রমরাজ। তখন দেবগ্রাম পালরাজাদের অধীন একটি ছোট সামন্তরাজ্য। বিক্রমরাজ ছিলেন পাল বংশের সম্রাট রামপালের অনুগত একজন সামন্তরাজা। সেই সময় উত্তরবঙ্গের কৈবর্তরা দিব্বোকের নেতৃত্বে বিদ্রোহী হয়। রামপাল তাঁর অনুগত সামন্তদের নিয়ে নির্মমভাবে সেই বিদ্রোহ দমন করেন। এসব নিশ্চয়ই ইতিহাস বইতে পড়েছেন।

‘বিক্রমরাজও রামপালের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনে সামিল হয়েছিলেন। রামপাল যেদিন কৈবর্ত বিদ্রোহ দমন করেন, তার পরদিনই বিক্রমরাজ রাজধানীতে ফিরে আসেন। সেইদিন রাত্রিবেলায় তাঁর প্রাসাদে আগুন লাগে। শুধু রাজপ্রাসাদে নয়, দেবলরাজের পুরো জমিদারিতে। শোনা যায়, একটি প্রাণীও বাঁচেনি।’

এতক্ষণ খুব মন দিয়ে গল্পটা শুনছিলাম। পীতাম্বরবাবু থামতে বলে উঠলাম, ‘সে আবার কী? আগুন লেগেছে দেখলে তো লোকে দৌড়ে পালাবে! একটি প্রাণীও বাঁচবে না, সে আবার হয় নাকি?’

‘সেটাই তো আশ্চর্যের। জনশ্রুতি বলে, সেই ভয়ঙ্কর রাতে নাকি দেবলগড়ের সমস্ত বাসিন্দাদের চলাফেরার ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল৷ কেউ যেন মন্ত্রবলে বেঁধে ফেলেছিল তাদের। একটি লোকও পালাতে পারেনি।’

অবিশ্বাসের সুরে বললাম, ‘এ আবার হয় নাকি? তাছাড়া আগুন তো এমনিতেও লাগতে পারত। এর সঙ্গে সাধুবাবার অভিশাপের কী সম্পর্ক?’

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন পীতাম্বরবাবু, ‘লোকপ্রবাদ অনুযায়ী সেই রাতে নাকি লোকে দেখেছিল রাতের আকাশে এক দৈত্যাকার বকপাখি রাজপ্রাসাদের ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে আর তার মুখ থেকে বেরোচ্ছে আগুনের হলকা। সেই হলকাই রাজপ্রাসাদ জ্বালিয়ে দেয়। তার পাখার হাওয়ায় আগুন ছড়িয়েছিল অস্বাভাবিক দ্রুততায়। অত বড় প্রাসাদ, রাজত্ব সবকিছু ভস্মীভূত হতে নাকি এক রাত্রির বেশি সময় নেয়নি। লোকে বলে বিক্রমরাজ নিশ্চয়ই এমন কোনও পাপ করেছিলেন, যার দরুন সেই প্রাচীন সাধুর অভিশাপ ফলে যায়! বকরাক্ষস এসে দেবলরাজার রাজ্য আর বংশলোপ করে!

‘ধীরে ধীরে দেবলরাজার সাধের প্রাসাদ জঙ্গল গ্রাস করে নিল। জঙ্গলের নামই হয়ে গেল বকরাক্ষসের জঙ্গল। লোকে বলে দেবলরাজার গড়ে রাক্ষসের অভিশাপ আছে। তাই ওই জঙ্গলে কেউ ভুলেও ঢোকে না।’

রাজবাড়ি চলে এসেছিলাম। স্নানখাওয়া সারতে গেলাম।