১
ভদ্রলোক সিগারেটে একটা মস্ত টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললেন, মহিলার চরিত্র ভালো না মশাই। ওর জালে ফেঁসে মস্ত ভুল করেছেন।
আমি আর সত্যব্রত লোকটার কথা শুনে থমকে গেলাম। কী বলছে এই লোকটা?
আমি আর সত্যব্রত এসেছিলাম বাগবাজার গঙ্গার ঘাটে। সময়টা ঘোর বোশেখ মাস, কয়েকদিন ধরে সূয্যিদেব যেন আগুন ঢালছিলেন ধরিত্রীর ওপরে। দুপুরে রাস্তায় বেরোলে মনে হতো যেন কলকাতা নয়, খোদ সাহারা মরুভূমিতে বাস করছি। শুধু বাড়তির মধ্যে অসহ্য প্যাচপ্যাচে ঘাম। বাইরে বেরোতেই ইচ্ছে করে না।
শেষে আমাকে ঘর থেকে টেনে বার করল সত্যব্রতই। ওর নাকি কী সব জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার আছে আমার সঙ্গে, তাই এখানে আসা।
আগে যে কখনও মায়ের ঘাটে আসিনি তা নয়, তবে সে দিনের বেলা। বিকেলের পর কখনও আসিনি। এবার এসে সত্যি চোখ জুড়িয়ে গেল৷ তখন সূয্যিমামা পাটে বসবেন বসবেন করছেন।
মনে হল গঙ্গার ধারে যেন একটুকরো মিনি ভারতবর্ষ উঠে এসেছে। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন ভাষার লোকজনে ছয়লাপ। তার সঙ্গে ফুচকা, বেলুন, ঘটিগরম, ঝালমুড়ি, স্কুলপালানো ছেলেপিলে, আমাদের বয়সি কপোত-কপোতী, পুণ্যলোভী বিহারি বুড়ো-বুড়িদের দল—সবমিলিয়ে বেশ জমজমাট জায়গা।
আমরা তারই মধ্যে ঘাটের একদম প্রান্তে একটা বটগাছের নীচে বসলাম। এদিকটা তুলনামূলকভাবে ফাঁকা। বটগাছের গোড়ায় একটা শিবলিঙ্গ, তার সারা গায়ে সিঁদুর আর চন্দন লেপা। বটগাছের গায়ে আবার প্রচুর লাল হলুদ সুতো বাঁধা, লোকে মানত করে গেছে।
আমরা ছাড়া আর একজনই ছিলেন ওখানে। এক বয়স্ক ভদ্রলোক। পরনে ফতুয়া আর পাজামা, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। গায়ের রং কালো, গালদুটো চুপসানো আর মাথার চুল সাদা-কালোয় মেশানো, যাকে বলে সল্ট অ্যান্ড পেপার।
ভদ্রলোক উদাসীন দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সারা শরীর নিষ্কম্প, স্থির। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এই পৃথিবীতে নেই। শুধু শরীরটাই এই পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গার ধারে পড়ে আছে।
আমি সত্যব্রতকে জিগ্যেস করলাম, বল এবার, কী বলতে ডেকে আনলি।
সত্যব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। দেখে মনে হল, কথাগুলো আমাকে বলার আগে নিজে মনে মনে একবার সাজিয়ে নিচ্ছে। ওর এই ভাবটা আমি খুব ভালো করে চিনি। এর মানে হচ্ছে, বাবু এবারে কোনও জটিল কেসে ফেঁসেছেন এবং ওঁকে এখন আরও বেশ কয়েকবার খোঁচালে তবেই তিনি কেসটা একটু একটু করে খোলসা করবেন।
সত্যব্রত কিছু না বলে পকেট থেকে একটা গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেট বার করে একটা আমাকে দিয়ে, আর একটা লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে গম্ভীরমুখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি প্রথম খোঁচাটা দিতে যাব, এমন সময় সেই বয়স্ক ভদ্রলোক সামান্য নড়ে উঠে এদিক ওদিক চাইলেন। মনে হল, যেন দীর্ঘ সুষুপ্তির শেষে জেগে উঠলেন তিনি। চোখদুটো সামান্য ফ্যালফেলে। দেখেই বোঝা যায় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন।
তবে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। দ্রুত তাঁর চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে এল৷ একবার অস্ফুটে বলে উঠলেন, মা তারা, ব্রহ্মময়ী।—তারপর আমাদের দিকে ফিরে হাসিমুখে বললেন, সিগারেট খাচ্ছেন?
কয়েক বছর আগে হলেও এর একটা তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক জবাব দিতাম। যাতে আমার সস্তা স্মার্টনেসের সামনে পড়ে সামনের লোকটি অপ্রস্তুত হতেন, আর আমিও অন্তরে অশ্লীল শ্লাঘা অনুভব করতাম। কিন্তু এখন আরও একটু পরিণত হয়েছি। বুঝতে শিখেছি যে লোককে অপ্রস্তুত আর অপমান করার মধ্যে কোনও সপ্রতিভতা নেই, বরং একধরনের কদর্য আত্মবিকৃতি আছে। তাই স্মিত হেসে বললাম, ওই আর কী।
লোকটি এইবার একটু ইতস্তত করে বললেন, একটা বার করা যাবে? আমি আবার আমার প্যাকেটটা কোথায় যে ফেলে এলাম…
সত্যব্রত কথা না বাড়িয়ে একটা সিগারেট আর ওর লাইটারটা ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিল। উনি একটা টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, আহ, বাঁচালেন মশাই। সব নেশাই ছেড়ে দিয়েছি৷ শুধু এই একটা নেশাই আর ছাড়া হয়ে উঠল না।
আমরা কিছু বললাম না। এমনিতেও আমার আর সত্যব্রতর মধ্যে কথাটা অসমাপ্ত রয়ে গেছে৷ ভাবছিলাম, অন্য কোথাও উঠে যাব কি না। সত্যব্রতর অধিকাংশ কেসই জটিল হয়ে থাকে, এবং সেসব সচরাচর অন্য কারও সামনে আলোচনা করার মতো হয় না। আর সেসবের সমাধান করতেও আমাকে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়।
তবে তার আর দরকার হল না। ভদ্রলোক সিগারেট খেতে খেতেই একবার সত্যব্রতর দিকে তাকালেন। আমার কেমন যেন মনে হল, মুহূর্তের জন্য লোকটার চোখদুটো একটু বদলে গিয়েই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল৷ ব্যাপারটা এতই আকস্মিক যে ঠিক কী হল বলে বোঝাতে পারব না। মনে হল, লোকটার চোখের মণি যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে সারা চোখ ছেয়ে ফেলে আবার নিজের আকারে ফিরে গেল।
ভদ্রলোক একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললেন, মহিলার চরিত্র ভালো না মশাই। ওর জালে ফেঁসে মস্ত ভুল করেছেন।
আমরা দুজনে প্রথমে থমকে গেলাম। তারপর সত্যব্রত ভুরু কুঁচকে বলল, কী সব বলছেন বলুন তো?
লোকটা বলল, একধরনের মেয়ে মাকড়সা হয় জানেন তো, যারা সঙ্গীকে ভোগ করে উদরস্থ করে? ইনিও ঠিক তাই। এর আগেও অনেক পুরুষকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে নিঃস্ব করে ছেড়েছেন উনি। আর এসবের পেছনে ওর স্বামীরও পূর্ণ মদত আছে। ওই জন্য ওরা কোথাও টিকতে পারে না, কয়েকদিন বাদেই স্থানীয় লোক পাড়াছাড়া করে।
সত্যব্রত এবার একটু অস্বস্তির সঙ্গে বলল, আপনি কী বলছেন, বুঝতে পারছি না।
ভদ্রলোক একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন, কী বলছি, সে আপনি ভালোই জানেন। আপনি তো জালে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছেন দেখছি। গত দু’মাস ধরে প্রতিদিন দুপুরে আপনি বউদির বাড়িতে গেছেন সঙ্গসুখ পেতে। এইবার গত হপ্তায় তিনি আপনাকে জানিয়েছেন যে তিনি গর্ভবতী, আপনার সন্তান ওর পেটে। এবং আপনাকে বলেছেন গর্ভপাতের খরচা বাবদ একটা মোটা টাকা ওকে না দিলে কথাটা তিনি ওর স্বামী এবং আপনার বাবা-মা’কে জানিয়ে দেবেন। কী, ঠিক বলছি তো?
সত্যব্রতর হাত থেকে সিগারেটটা মাটিতে পড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে গঙ্গার জলে ভেসে গেল। দেখে মনে হল, ছোকরার মাথায় যেন বজ্রপাত হয়েছে। মুখে রক্ত নেই, চোখ বিস্ফারিত, বিঘতখানেক বড় হাঁ-এর মধ্যে আলজিভ অবধি দেখা যাচ্ছে। আমিও অত্যন্ত অবাক। এ আবার কী কেস? আর এই ভদ্রলোক সে ব্যাপারে জানলেনই বা কী করে?
ভদ্রলোক চুকচুক করে বললেন, বেকার বেকার সিগারেটটা নষ্ট করলেন। এত টেনশন নেওয়ার কিছুই ছিল না। খবর নিলেই জানতে পারতেন, আপনার এলাকার অন্তত আরও তিনটে ছেলেকে এইভাবে ফাঁসিয়েছেন উনি। এটাই ওই স্বামী-স্ত্রী দুজনের চাল, বিজনেস মডেল বলতে পারেন। কোথাও গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে এলাকার তিন-চারটে অল্পবয়সি ছেলেকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে, গর্ভবতী হওয়ার নাটক করে টাকা কামিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া। আপনি নতুন মুরগি, এই আর কী।
আমি এবার চেপে ধরলাম সত্যব্রতকে, কী কেচ্ছা বাধিয়েছিস ভাই? খুলে বল তো।
সত্যব্রত ইনিয়েবিনিয়ে যা বলল, তা এইরকম—
মহিলার নাম সঙ্গীতা দত্ত। সত্যব্রতদের পাড়ায় এসেছেন মাস ছয়েক হল। দেখতে যেমন অসামান্যা সুন্দরী, তেমন স্মার্ট আর তেমনই যৌন আবেদনময়ী। স্বামী ভদ্রলোক দমদমে কোনও একটা কোচিং সেন্টার চালান। বউদি এসেই পাড়ার জনচিত্ত জয় করে নিয়েছেন বললেই চলে। ছেলে-ছোকরাদের দল তো বটেই, অনেক মধ্যবয়সি দাদারাও সঙ্গীতা বউদি বলতে অজ্ঞান।
সবার মধ্যে সঙ্গীতা বউদি সত্যব্রতকে কেন এমন অহৈতুকী কৃপা করলেন, সেটা সত্যব্রত প্রথমে বোঝেনি তেমন। এমনিতেই সত্যব্রতর জিম করা শরীর। তার ওপর দেখতে শুনতেও মন্দ না। সঙ্গীতা বউদির সঙ্গে ওর আলাপ পাড়ার সরস্বতী পুজোর মণ্ডপে। সেখান থেকে মোবাইল-হোয়াটসঅ্যাপের বৈতরণী পেরিয়ে বউদির বেডরুমে প্রমোশন পেতে দেরি হয়নি বিশেষ।
বলা বাহুল্য, ছোকরা রঙিন মেঘের ওপর উড়ছিল বললে কম বলা হয়। আমাদের বয়সি সদ্যযুবাদের পক্ষে যেটা খুবই স্বাভাবিক। ঘোর ভাঙল গত হপ্তায়, যেদিন বউদি ডেকে ঠিক সেই কথাগুলোই বলেছেন, যেগুলো এই অচেনা ভদ্রলোক এক্ষুনি বললেন।
—আর তুই কী বললি?
সত্যব্রত মিনমিন করে উত্তর দিল, বললাম যে আমার অত টাকা নেই। আর মা-বাবাকে বললে পাড়ায় বাস করা যাবে না…
—তাতে উনি কী বললেন?
—বলল, ‘আর কিছু না পারো, অন্তত একটা ল্যাপটপ দাও। আমার একটা ল্যাপটপের খুব দরকার।’
আমি কিছু বলার আগেই সেই ভদ্রলোক হা হা করে হেসে উঠলেন৷ আমিও খানিক স্তম্ভিতভাবে সত্যব্রতর দিকে চেয়ে রইলাম। ও স্লাইট মাথামোটা জানতাম, কিন্তু মাথাটা যে ভীমের গদা হয়ে গেছে সেটা আগে আন্দাজ করিনি। ছেলেটা কি নিজের সাধারণ বুদ্ধিশুদ্ধিগুলোও সঙ্গীতা বউদির বালিশের পাশে রেখে এসেছে?
কড়া গলায় বললাম, বুঝতে পারছিস না যে ইনি একজন পয়লা নম্বরের ফ্রড? তুই এক কাজ কর। বল, কাল তুই আর আমি ওনাকে নিয়ে গাইনোকলজিস্টের কাছে যাব। ডাক্তার কনফার্ম করলে তবেই বাকি কথা।
ভদ্রলোক হাত তুলে বললেন, অত কষ্ট করতে হবে না ভাইটি। আপনি ভদ্রমহিলাকে শুধু একবার জিগ্যেস করবেন, সুরজিৎ ফ্রান্সিস দত্তর অস্বাভাবিক মৃত্যুটা খুন না আত্মহত্যা! আর জানাবেন যে মৃত সুরজিৎ দত্তর বাবা অবিনাশ আব্রাহাম দত্ত তাঁর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া পুত্রবধূকে গরুখোঁজা করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অবিনাশবাবুর সঙ্গে আপনার সদ্য যোগাযোগ হয়েছে৷ ব্যস, বাকিটা দেখে যান।
আমরা দুজনেই অবাক। বললাম, এই সুরজিৎ দত্ত, অবিনাশ দত্ত, এরা কারা?
—সুরজিৎ দত্ত ছিলেন এই সঙ্গীতা দত্তর প্রথম হাজব্যান্ড। শান্ত সজ্জন ভদ্রলোক। ভালো চাকরি করতেন সেলসে। কিন্তু হলে কী হবে, উচ্চাকাঙ্ক্ষী রূপসী বউয়ের অস্বাভাবিক টাকার খাঁই মেটাতে পারছিলেন না।
সঙ্গীতা দেবী তখন বাঁকা লাইন ধরেন, একজন পয়সাওয়ালা দুপুর ঠাকুরপো জোটান। কিন্তু পাপ কি কখনও চাপা থাকে? একদিন সুরজিৎবাবু অসময়ে অফিস থেকে ফিরে নিজের স্ত্রীকে নিজেরই বেডরুমে অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখে ফেলেন। ভদ্রলোক সেই রাতেই আত্মগ্লানিতে আত্মহত্যা করেন, বিষ খেয়ে।
সঙ্গীতা দেবী স্বামীর সৎকার কর্ম সম্পন্ন করার পর গয়নাগাটি এবং সাধের নাগরটিকে নিয়ে উধাও হয়ে যান। তারপর দুজনে এই ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। বিষকন্যা বোঝেন তো? এই দত্ত ম্যাডামেরা হচ্ছেন আধুনিক বিষকন্যা।
দুজনেই খানিক হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। তারপর আমি জিগ্যেস করলাম, কিন্তু আপনি এতসব জানলেন কী করে?
ভদ্রলোক অমায়িক হাসলেন, কেন, ওঁর কপাল দেখে।
—কপাল দেখে সব জেনে ফেললেন?
মনে হল সত্যব্রত বিস্মিত হওয়ার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
—হ্যাঁ৷ যাই হোক, এবার উঠি। অনেক দূর যেতে হবে, সেই বিরাটি। সিগারেটের জন্য অনেক ধন্যবাদ, ভাইটি।
সত্যব্রত লাফিয়ে উঠে, ভদ্রলোকের হাত চেপে ধরল। তারপর ওঁর পকেটে গোল্ড ফ্লেকের পুরো প্যাকেটটা গুঁজে দিয়ে বলল, কোথায় যাচ্ছেন দাদা? কপাল দেখে এতসব কী করে জানলেন, সেটা বলে যান অন্তত।
আমিও ধুয়ো তুললাম—আর বিষকন্যার জন্য আপনার দেওয়া কার্বলিক অ্যাসিডে কাজ হল কি না, সেটাও তো আপনাকে জানাতে হবে!
ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন, কার্বলিক অ্যাসিড? বেড়ে বলেছেন মশাই। নিন, এই লিখে নিন আমার ফোন নাম্বার। শনি মঙ্গলে ব্যস্ত থাকি। এই দুটো দিন বাদ দিয়ে অন্য যে কোনও দিন কল করে নেবেন। কার্বলিক অ্যাসিডে কাজ হল কি না জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। পুলিশের ডান্ডায় অবশ্য বেটার কাজ দেয়। তবুও… যাক, চলি তাহলে।
ভদ্রলোক চলে যাওয়ার উদ্যোগ করতেই সত্যব্রত আবার ভদ্রলোকের হাত টেনে ধরল, আপনার নামটা যে বলে গেলেন না দাদা। আর আমার কপাল দেখে আপনি কী করে…
মৃদু হাসলেন ভদ্রলোক—আমার নাম নিবারণ। নিবারণ চক্রবর্তী। আমি একজন কাকচক্ষু বিশারদ।
.
এর দিন তিনেক পর ছিল শনিবার৷ নিবারণবাবু বলেইছিলেন যে শনি মঙ্গলে ওঁকে যেন ডিস্টার্ব না করা হয়। কিন্তু ওঁর দেওয়া ‘কার্বলিক অ্যাসিড’-এর কার্যকারিতা দেখে আমাদের আর তর সয়নি। ফোন করে ঠিকানা নিয়ে সোজা উপস্থিত হয়েছি ওঁর বিরাটির ভদ্রাসনে।
ভদ্রাসন বলতে অবশ্য একটা রুমালের সাইজের ছোট জমিতে তোলা ছোট বাড়ি। আধুনিক পরিভাষায় বললে, ওয়ান বিএইচকে-র একটু উন্নততর ভার্সান। একটি বসার ঘর, একটি শোওয়ার ঘর, ছোট্ট একটি কিচেন আর টয়লেট। কোথাও আসবাবপত্রের কোনও বাহুল্য নেই। যেখানে যেটুকু দরকার, ঠিক সেটুকুই আছে। সবমিলিয়ে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।
শোওয়ার ঘর আর বসার ঘরের মাঝে একটি ছোট ঠাকুরঘর। তাতে মা কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। আজ বোধহয় বিশেষ পুজো হয়েছে। মায়ের সারা গা জুড়ে জবা ফুলের মালা, তার মধ্যে শুধু মুখখানি জেগে আছে। পায়ের কাছে একটা থালায় কয়েক টুকরো সন্দেশ। সারা ঘর জুড়ে ধূপের স্নিগ্ধ সুবাস ছড়িয়ে।
আমরা বসেছিলাম বাইরের ঘরে, দুটো কাঠের চেয়ারে। দরজা খুলে বসিয়েছিলেন নিবারণবাবুই। তখন তাঁর পরনে রক্তাম্বর, কপালে লাল চন্দনের টিকা। দেখে বোঝা যায় যে সদ্য পুজো সেরে উঠে এসেছেন। আমাদের দেখে হাসিমুখে বললেন, মন বলছিল যে আজ আপনারা আসবেন। আসুন, ভেতরে বসুন। আমি ধড়াচুড়ো ছেড়ে আসছি।
একটু পরে যখন নিবারণবাবু এলেন তখন তাঁর পরনে একটি পাজামা এবং ফতুয়া। কপালে লাল চন্দনের টিকাটি অবশ্য তেমনই আছে। তিনি এসে বসে বললেন, চায়ের জল চাপিয়ে এসেছি। একটু পরেই আসছে। তারপর মায়ের প্রসাদ দেব। এবার বলুন দেখি, আমার কার্বলিক অ্যাসিডে কাজ হল?
সত্যব্রত কিছু না বলে ভদ্রলোকের পায়ের কাছে সটান প্রণিপাত হল। নিবারণবাবু হাঁ-হাঁ করে উঠলেন। আমি হেসে বললাম, করতে দিন। ও এখন আপনার অন্ধ ভক্ত বললেই চলে। ভক্তের প্রণামটুকু তো অন্তত নেবেন।
—বটে? কাজ হয়েছে বলছেন?
ততক্ষণে সত্যব্রত উঠে বসেছিল। সে প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলল, হয়েছে মানে? আপনার দেওয়া ওই গুরুমন্ত্রে যা ম্যাজিকের মতো কাজ হয়েছে, সে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না।
—কীরকম শুনি।
—যেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হল, সেদিনই সন্ধেবেলায় বউদির ফোন। বলে, ‘কী ঠাকুরপো, ল্যাপটপের ব্যাপারে কী ভাবলে?’ আমি মিষ্টি করে বললাম, ‘কোন কোম্পানির ল্যাপটপ দেব তাই ভাবছি৷ বাই দ্য ওয়ে, তুমি অবিনাশ অ্যাব্রাহাম দত্ত বলে কাউকে চেনো?’
বলার পর দেখি খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর বউদি সতর্ক গলায় প্রশ্ন করল, ‘না, আমি এই নামে কাউকে চিনি না। কেন বলো তো?’
আমি বললাম, ‘আজ বিকেলে যখন ক্লাবঘরে একা বসেছিলাম, তখন এই নামের একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ক্লাবের দরজায় উঁকি দিয়ে জিগ্যেস করলেন, সঙ্গীতা দত্ত নামের কোনও মহিলা এ পাড়ায় ভাড়া থাকেন কি না।’
বউদি চাপা গলায় বলল, ‘তুমি কী বললে?’
বললাম, ‘কিছু বলিনি, শুধু ওঁর ঠিকানা আর ফোন নাম্বারটা নিয়ে রেখেছি। ভাবলাম তোমার সঙ্গে একবার কথা বলে নিই।’
শোনার সঙ্গে সঙ্গে দেখি বউদি ফোন কেটে দিল। তারপর দু’দিন কোনও সাড়াশব্দ নেই। আজ সকালে উঠে দেখলাম বউদির বাড়ি ভোঁ ভাঁ। রাতের মধ্যে মালপত্র গুছিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তল্লাট ছেড়ে রাতারাতি হাওয়া।
—যাক, সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেছে তাহলে। আশা করি ভদ্রমহিলা আর আপনাকে জ্বালাতন করবেন না। আর আপনি আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট বলেই বলছি, এবার থেকে প্রেমে পড়ার আগে একটু দেখেশুনে পড়বেন।
আমি বললাম, সে তো বুঝলাম, কিন্তু আপনি কী করে ওর কেসটা জেনে ফেললেন সেটা বলুন দেখি। সেদিন কাকচক্ষু বিশারদ না কী একটা বলেছিলেন বটে, তবে ভালো বুঝিনি।
ভদ্রলোক একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন—ও ভুলে যান। ধরে নিন ও আমার কোনও বিশেষ ক্ষমতা। গুরুর অবিশ্যি বারণ ছিল রাস্তাঘাটে এসব দেখাতে। কিন্তু সেদিন ওই সিগারেটের লোভেই সর্বনাশটা হল। দাঁড়ান, চা নিয়ে আসি।
নিবারণবাবু উঠে গিয়ে তিন কাপ ধোঁয়া-ওঠা লিকার চা নিয়ে এলেন। সত্যব্রত আগেই এক প্যাকেট কিং-সাইজ গোল্ড ফ্লেক টেবিলে নামিয়ে রেখেছিল, খুব সম্ভবত গুরুদক্ষিণা হিসেবে।
দেখে ভারি প্রীত হলেন নিবারণবাবু৷ উদার হেসে বললেন, আহা, এসবের আবার কী দরকার ছিল!
আমি বুঝে গেছি যে ভদ্রলোকের দামি সিগারেটের প্রতি দুর্বলতা আছে। প্যাকেট ছিঁড়ে একটা কাঠি বার করে দিয়ে বললাম, কাকচক্ষু ব্যাপারটা একটু বোঝান না চক্কোত্তিমশাই।
সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলেন নিবারণবাবু। তারপর একটা বড়সড় ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললেন, দেখুন, এ অতি প্রাচীন গারুড়িক বিদ্যা। এতে মানুষের মুখ আর কপাল থেকে তার অতীত বলে দেওয়া যায়। তবে আপনারা আজকালকার ছেলেপিলে। আপনারা এসবে বিশ্বাস করেন না জানি। আমিও তাই চট করে কারও সামনে এসব নিয়ে বলিটলি না। তাছাড়া গুরুর বারণের ব্যাপারটা তো আছেই।
আমি বললাম, দেখুন, অপরাধ নেবেন না। সত্যি কথা বলতে কী, অবিশ্বাসের ব্যাপারটা তো আছেই। আসলে চারিদিক এত বুজরুকে ছেয়ে গেছে…
—সে তো বটেই। আমি বিশ্বাস করতে বলছিও না। তবে আপনি এখন চাইছেন আমি যেন আপনার কপাল বা মুখ দেখে আপনার অতীতের ব্যাপারে কিছু বলি, তাই তো?
ভেতরে ভেতরে চমকে গেলেও মুখে সেটা প্রকাশ করলাম না। একটু অপ্রস্তুত হেসে বললাম, ওই… মানে… আর কী…
—বেশ। তাহলে শুনে রাখুন, আপনার জন্ম ষোলোই অঘ্রাণ, চোদ্দোশো আট বঙ্গাব্দ। বৃশ্চিক রাশি, কন্যা লগ্ন। ছ’বছর বয়সে কাঁকড়াবিছের কামড় খেয়ে মরতে বসেছিলেন। এগারোতে সিঁড়ি থেকে পড়ে যান৷ পড়াশোনায় মোটামুটি। তবে যুক্তি-বুদ্ধি অতি প্রখর। অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি প্রবল টান আছে৷ বেশ কয়েকবার বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। মঙ্গল অতি প্রবল। সদ্য বাবার কাছে বাইক চেয়ে আবদার করেছেন, কিন্তু বাবা শুনছেন না বলে অভিমান করে বসে আছেন। কী, ঠিক বলছি তো?
সেদিন সত্যব্রতর ঠোঁট থেকে সিগারেট পড়ে গেছিল, আজ আমার। তবে এবার নিবারণবাবু সতর্ক ছিলেন। চট করে সিগারেটটা তুলে নিয়ে বললেন, ও, রিসেন্টলি মায়ের চাপে কয়েকটা সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছেন, তবে সেসবের দিকে আপনার মন নেই। তাই তো?
শুকনো গলায় বললাম, ইয়ে, পরীক্ষার রেজাল্ট…
ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন নিবারণবাবু—না ভাই, এই কাকচক্ষু বিদ্যায় অতীত বা বর্তমান বলা যায়, ভবিষ্যৎ বলা যায় না।
সত্যব্রত সাগ্রহে এগিয়ে এসে বলল, আর গার্লফ্রেন্ড? ব্যাটার কোথাও কোনও চক্কর চলছে কি না খুলে বলুন তো দাদা। আমার ইয়ে একটু বেশি বলে ব্যাটা আমার ওপর ভারি সর্দারি ফলায়।
নিবারণবাবু হেসে ফেললেন—একটু ইয়ে হওয়া খারাপ কে বলল? প্রকৃতি আর পুরুষের মধ্যে আকর্ষণ থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। নইলে তো সৃষ্টি রসাতলে যাবে। কাম হচ্ছে সৃষ্টির আদিবিন্দু। লোকে কামকে ষড়রিপুর প্রথম রিপু বলে বটে, তবে ও রিপু নয়, জগজ্জননীর বিলাসলীলা মাত্র। কামবিহীন জগৎ প্রাণহীন জড়পিণ্ড ছাড়া আর কিছু নয়।
আমি একটু আত্মবিশ্বাস বাড়াবার জন্য গম্ভীর গলায় বললাম, কিন্তু ষড়রিপু মাত্রেই তো খারাপ বলে শুনেছি।
—না, তা নয়। সবক’টি রিপুরই মনুষ্যজীবনে প্রয়োজন আছে। তবে মাত্রাজ্ঞান আর পরিমিতিবোধ, ওইটিই সবচেয়ে জরুরি। প্রথম রিপুর কথা তো বললামই। তারপর ধরুন দ্বিতীয় রিপু—ক্রোধ। জননী এবং জন্মভূমির অপমানে যার দ্বিতীয় রিপু প্রজ্জ্বলিত হয় না, সে কাপুরুষ। তৃতীয় রিপু—লোভ। ব্রহ্মজ্ঞানের প্রতি লোভ মানুষকে কৈবল্যদান করে। ঠাকুর বলেছিলেন, অহংবোধ খারাপ হলেও ঈশ্বরভক্তের ‘আমি ভক্ত’ এই অহংটুকু থাকা ভালো৷ এরকম অনেক উদাহরণই আছে।
সিগারেটের শেষাংশটুকু অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে সত্যব্রত বলল, আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো চক্কোত্তিমশাই, রিপু নেই এমন মানুষ হয়?
—না, ষড়রিপু মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আমি অন্তত আজ অবধি এমন কাউকে দেখিনি যিনি সর্বরিপু জয় করেছেন। তাহলে তিনি মানুষ নন, মহামানব।
সত্যব্রত খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল—একটা কথা বলছি, কিছু মনে করবেন না। ধরুন আপনার এই যে বিশেষ ক্ষমতা, কাকচক্ষু না কী একটা বললেন, এ তো অসাধারণ ক্ষমতা। এবার ধরুন আপনারও কোনও একটা রিপু প্রবল, মানে লাগামহীন আর কী! তাহলে তো ওই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আপনি আপনার রিপুর চাহিদা মেটানোর জন্য যা খুশি তাই করতে পারেন মশাই।
নিবারণবাবু এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিলেন না। সত্যব্রতর দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বড় কঠিন প্রশ্ন করলেন সত্যব্রতবাবু। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। এই তুকতাক, সিদ্ধাই, এসব ক্ষমতা হজম করা বড় কঠিন ব্যাপার। সাধনার পথে ঈশ্বর এসব ক্ষমতা দান করে সাধকের ব্রহ্মত্ব অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করেন। যিনি এসব অলৌকিক অতিজাগতিক শক্তির প্রলোভন এড়িয়ে শুধুমাত্র ব্রহ্মপদে নিজেকে সঁপে দেন, একমাত্র তিনিই নির্বিকল্প নির্বাণ লাভ করেন।
আমাকে এই বিদ্যা শিখিয়েছিলেন আমার গুরু। নাম মনোরঞ্জন মাঝি। লোকে বলত মনা মাঝি। কাকচক্ষু বিদ্যায় তিনি সার্থক সিদ্ধপুরুষ ছিলেন। এছাড়াও বাটিচালা, কুলোচালা, নখদর্পণ, সাপে কাটাকে বাঁচিয়ে তোলা, বন্ধ্যা নারীকে গর্ভবতী করা এসব বিদ্যেও তাঁর কাছে ছেলেখেলা ছিল।
আমার সেই গুরুই শেষে কাম আর মোহের টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে মস্ত বড় অনর্থ বাধিয়েছিলেন। কম করে তিনটি জীবন নষ্ট করেছিলেন তিনি।
আদি রিপু বড় তীব্র রিপু। যদি তার সঙ্গে অন্য কোনও রিপু পাকেচক্রে জড়িয়ে যায়, তাহলে তার থেকে উদ্ধার পাওয়া মুশকিল। তার ওপর সেই মানুষটি যদি কোনও অপ্রাকৃতিক শক্তির আধার হন, তাহলে তো কথাই নেই। তিনি জগৎ-সংসার ছারখার করে দিতে পারেন।
ততক্ষণে আমরা গল্পের গন্ধ পেয়ে গেছি। দুজনেই একটু এগিয়ে এলাম। সত্যব্রত বলল, কী হয়েছিল চক্কোত্তিমশাই? খুলে বলুন না।
আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলা শুরু করলেন নিবারণ চক্রবর্তী।
