৪
রাজবাড়ি ফিরে এসে আমি, পীতাম্বরবাবু আর জয়ন্ত বসে আজকের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করছিলাম। আমাদের সঙ্গে আজ যেটা ঘটল সেটা এমনই অবিশ্বাস্য আর অসম্ভব যে এখনও আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।
সেই ঘাসের জমিতে আমরা সবাই পা রেখেছিলাম প্রায় একই সঙ্গে। খুব বেশি হলে দেড়শো মিটার দূরে মন্দিরটা। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে যাব।
কয়েক পা এগোবার পরেই বুঝতে পারলাম যে আমার গতি ধীর হয়ে আসছে৷ অথচ হওয়ার কথা নয়। ঘাসের উচ্চতা গোড়ালি অবধি, কোনও লতানে ঘাস নয় যে পায়ে পায়ে আটকে যাবে। তাহলে?
নিজের পায়ের দিকে তাকালাম। নাহ, কোনও লতা জড়িয়ে নেই। এমন কিছু নেই যাতে পা আটকে যায়। অথচ এক পা এগোনোও ক্রমে অসম্ভব হয়ে উঠছে৷
ব্যাপারটা বুঝলাম না। বাকিদের দিকে চাইতে দেখি, তাদেরও একই অবস্থা। পীতাম্বর আর লাহাবাবু দাঁড়িয়ে পড়েছেন। বাকিরা তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে। জয়ন্তর চিবুক কঠিন। মনে হচ্ছে, মন্দির অবধি না পৌঁছে ও ছাড়বেই না। বাগলমশাইয়ের মুখে ঘামের বুজকুড়ি।
আমি গলা তুলে জিজ্ঞাসা করতে গেলাম, ‘কী হচ্ছে বাগলমশাই?’
কিন্তু তখনই লক্ষ করলাম দ্বিতীয় আশ্চর্য ব্যাপারটা।
আমার জিভ অসাড়। একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারছি না। শুধু দুর্বোধ্য একটা আঁ-আঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে মুখ থেকে।
বাকিরা থেমে গেছে ওই আওয়াজ শুনে। জয়ন্ত বোধহয় চেঁচিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর মুখ থেকেও কয়েকটা অর্থহীন শব্দসমষ্টি ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না।
এবার আমার গায়ে কাঁটা দেওয়া শুরু করল। চারিদিকে সব স্বাভাবিক। মাথার ওপর শীতের সুনীল আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি… প্রাচীন ধ্বংস্তূপের মধ্যে বয়ে যাওয়া হাওয়ার শনশন… দূরে ওই প্রাচীন মন্দিরের উদাসীন দাঁড়িয়ে থাকা… সবই ঠিক আছে।
শুধু আমরা ঠিক নেই।
এ কী! আমার সারা শরীর স্থবির হয়ে আসতে শুরু করেছে। ঘাড় ঘোরাতে পারছি না। আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। আঙুলের ডগা থেকে একটা রিনরিনে ব্যথা ক্রমে কবজি বেয়ে, পায়ের গোছ বেয়ে চিতি সাপের মতো উঠে আসছে। উঠে আসছে সারা দেহ জুড়ে। মাথার মধ্যে একটা বোবা স্তব্ধতা গজিয়ে উঠছে ছত্রাকের মতো।
বহু কষ্টে বাঁ-দিকে ঘাড় ঘোরালাম। দেখলাম সবাই স্তব্ধ, স্তম্ভিত। মনে হচ্ছে, এই প্রাগৈতিহাসিক ঘাসবনের মধ্যে কে যেন কতগুলো রক্তমাংসের মূর্তি বসিয়ে গেছে। তাদের বোধ নেই, সাড় নেই, প্রাণ নেই।
একটু পরে বহু কষ্টে ঘাড়টা সামান্য ডান দিকে বাঁকালাম। বাকিদের অবস্থাও আমারই মতো। শুধু দেখলাম, লাহাবাবু অতি কষ্টে হাত তুলে আমাদের ইঙ্গিত করছেন পেছনে ফিরতে।
মনের সমস্ত শক্তি সংহত করে বাঁ পা-টা পেছনে নিলাম। মনে হল, বাঁ পায়ে সামান্য হলেও সাড় ফিরে এল।
এরপর ডান পা। আরও খানিকটা জীবন।
নাহ, আর ঝুঁকি নিইনি। কয়েক পা দ্রুত পিছনবাগে হেঁটে যেই বুঝলাম হাত-পা মাথা আবার কাজ করছে, ঘুরে গিয়ে উলটোপথে টেনে দৌড় দিয়েছি। বাকিরাও তাই।
পীতাম্বরবাবু বললেন, ‘কী হল বলুন তো? হঠাৎ করে সবাই ওরকম এলিয়ে পড়লাম কেন?’
আমার কাছে কোনও জবাব ছিল না। একটা আশঙ্কা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তবে সেটা শুনলে জয়ন্ত হেসে উঠবে বলে আর বললাম না।
জয়ন্ত মাথা নিচু করে বসেছিল। বুঝতে গিয়েছিলাম যে ওর মনের মধ্যে একটা ঝড় চলছে। জয়ন্ত ছোটবেলা থেকেই অবিশ্বাসী প্রকৃতির। অলৌকিক ব্যাপারে ওর বিশ্বাস বা আগ্রহ নেই। কিন্তু আজ যেটা ঘটল সেটাকে কী বলবে ও!
জয়ন্ত একটু পরে আমার দিকে মাথা তুলে বলল, ‘তোর কী ধারণা নিবারণ? আজ কী ঘটল ওখানে?’
আমি বললাম, ‘দ্যাখ, আমার যেটা মনে হয় সেটা তোর বিশ্বাস হবে না। ওখানে নিশ্চয়ই অলৌকিক ব্যাপার আছে৷’
জয়ন্ত অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘আচ্ছা, তুই যে এত অলৌকিকে বিশ্বাস করিস, অলৌকিক মানে কী? এমন একটা শক্তির প্রকাশ যা আমাদের চেনা জানা যুক্তিবুদ্ধির বাইরে, তাই তো?’
মাথা নাড়লাম। জয়ন্ত বলল, ‘ধর, ওখানে কোনও একটা খুব পাওয়ারফুল ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয়েছে, যেটা আমাদের যেতে বাধা দিচ্ছে।’
‘বিশ্বাসযোগ্য নয়। ম্যাগনেটিক ফিল্ড তো মেটাল আটকাবে। ম্যাগনেটিক ফিল্ড কি মানুষ আটকায়?’
‘জানি না, তুই খেয়াল করেছিলিস কিনা জানি না, আমি দেখেছি ওই মাঠ বা মন্দিরের মাথার ওপর কোনও পাখিও উড়ছিল না।’
‘তো? জীবন্ত কিছু আটকায় এমন ম্যাগনেটিক ফিল্ড হয় নাকি?’
জয়ন্ত ক্ষীণস্বরে বলল, ‘ধর, ওই মন্দিরটা একটা এলিয়েন স্পেসশিপ। ওই বকপাখিটা আসলে একটা এলিয়েন ওয়ার ড্রোন। ওরা এখানে কলোনি বানাবে বলে…’
‘আজ থেকে হাজার বছর আগে দেবলরাজার গড় ধ্বংস করেছিল, তাই তো?’ কড়া গলায় বললাম, ‘তোর কল্পনাটা এবার একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাচ্ছে না জয়ন্ত?’
জয়ন্ত বিহ্বলস্বরে বলল, ‘এছাড়া তো আর কোনও এক্সপ্ল্যানেশন খুঁজে পাচ্ছি না ভাই।’
পীতাম্বরবাবু মুখ খুললেন, ‘আজ যেটা হয়েছে সেটা নিয়ে আপাতত বাইরে মুখ না খোলাই ভালো। লোকে অস্থির হয়ে পড়বে৷ গাঁ-গঞ্জের মানুষ, বোঝেনই তো।’
বললাম ‘সে তো বটেই। কিন্তু বাগলমশাই আর লাহাবাবু সে কথা শুনবেন তো?’
জয়ন্ত বলল, ‘শুনবেন বইকি! শুনলেন তো, ওঁরাও চান না এই নিয়ে কোনও হইচই হোক, তাহলে ওঁদের কাজও ভেস্তে যাবে। এমনকী যারা জঙ্গল কাটতে গেছিল, তাদেরও তো আমাদের সামনেই এসব নিয়ে বাইরে কথা বলতে না করে দেওয়া হল।’
‘সে তো দেখলাম। কিন্তু তাতে তো রহস্যটা খোলসা হচ্ছে না৷’
জয়ন্ত বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু তার আগে একজন কাজের লোক দৌড়তে দৌড়তে এসে বলল, ‘দাদাবাবু, শিগগিরি বাইরে আসুন। বাইরে খুব চেঁচামেচি হচ্ছে। গাঁয়ের অনেক লোক এয়েচে আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে।’
জয়ন্ত উঠে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও।
বাইরে এসে দেখি অনেক লোক জড়ো হয়েছে রাজবাড়ির গাড়িবারান্দায়। সবাই বেশ উত্তেজিত। দূর থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমরা উপস্থিত হতে পরিস্থিতি একটু শান্ত হল।
সবার সামনে এক বয়স্ক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। বেশ সৌম্য চেহারা, একমুখ সাদা দাড়ি, পরনে একটা ফতুয়া আর পাজামা। কাল ইনিই জয়ন্তকে রাস্তায় পাকড়াও করে জানিয়েছিলেন যে দেবলরাজার গড়ে এক্সকাভেশনের জন্য লোক এসেছে।
ভদ্রলোক উদ্বিগ্নস্বরে বললেন, ‘বাবা জয়ন্ত, অনর্থ হয়ে গেছে বাবা৷ ওই জন্য আমরা পই পই করে বলছিলাম ওই বকরাক্ষসের জঙ্গলে যেন মানুষ না ঢোকে, দেবলরাজার গড়কে যেন বিরক্ত না করা হয়। তবু তোমরা শুনলে না…’
পীতাম্বরবাবু একটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘অত জ্ঞান না দিয়ে কী হয়েছে বলবে রমেন?’
বুঝলাম, ইনিই সর্পবিদ রমেন সাঁতরা৷
রমেনবাবু উদ্ভ্রান্তস্বরে বললেন, ‘আজ দুপুর থেকে বলাই শেখের পোষা বেজিটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না৷ বলাই তো খুঁজে খুঁজে হয়রান। এই বিকেল নাগাদ হরিয়া আর পাঁচু গেসল নদীর ধারে কী একটা কাজে। দেখে একটা ঝোপের আড়ালে বলাইয়ের বেজিটা মরে কাঠ হয়ে আছে। আর… আর…’
‘আর কী রমেনকাকা?’
‘মাথাটা কে যেন এক কোপে কেটে নিয়েছে।’
শুনে কী হল, বলে বোঝাতে পারব না। মাথার মধ্যে কী যেন একটা টিকটিক করে উঠল। পা দুটো জমে গেল। সাপের মাথা, বেজির মাথা, কী যেন হয় এদের মাথা নিয়ে?
জয়ন্ত কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘চলো তো দেখি।’
দেখাটা যে খুব সুখের নয় বলাই বাহুল্য৷ আমরা যখন নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা প্রায় নামব নামব করছে৷ আমাদের সঙ্গে রমেনবাবু, বলাইচাচা ছাড়াও আরও অনেক লোকজন জুটে গেছিল। তাদের মধ্যে হরিয়া আর পাঁচুকেও ডেকে নিয়েছিলেন রমেনবাবু। সবাই মিলে হরিয়ার দেখানো পথে নদীর ধারে একটা জায়গায় পৌঁছনোর পর পাঁচু আঙুল তুলে বলল, ‘ওই দেখো, চাচার বেজি! কবন্ধ।’
আলো আবছায়ার মধ্যে দেখলাম নদীর ধার ঘেঁষে একটা বেজির মৃতদেহ। মাথাটা কে যেন এক কোপে কেটে নিয়েছে।
জয়ন্ত বিভ্রান্তস্বরে বলল, ‘হোয়াট দ্য হেল! কে করল এই কাজ? একটা নিরীহ বেজির মুন্ডু এইভাবে… মাই গুডনেস…’
আমি খানিকক্ষণ মরা বেজিটার আশেপাশের মাটি দেখলাম। তারপর প্রশ্ন করলাম, ‘এই এলাকায় শিয়াল আছে?’
রমেনবাবু বললেন, ‘আছে তো বটেই। কেন বলুন তো?’
‘ওই দেখুন, শিয়ালের পায়ের ছাপ। ওই দিকে চলে গেছে।’
দু-একজন নজর করে বলল, ‘তাই তো! এ শিয়ালের পায়ের ছাপ না হয়ে যায় না।’
আমি নদীর পাড়ের জঙ্গলের দিকে হাঁটা লাগালাম। রমেনবাবুসহ আরও দু-একজন সঙ্গে এলেন। নদীর ধারে কাদামাটিতে যতটা পায়ের ছাপ পাওয়া যাচ্ছিল, শুকনো মাটিতে সেসব ছাপ ক্রমেই কমে আসছিল। তবে পায়ের চলন দেখেই বুঝতে পারছিলাম, শিয়ালটার সামনের ডান দিকের পা-টা খোঁড়া।
আমরা ফিরে এলাম। বলাইচাচাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘দুঃখ করবেন না চাচা, আপনি তো আর বেজিটাকে বেঁধে রাখতেন না। নিশ্চয়ই ঘুরতে ঘুরতে এদিকে এসে পড়েছিল। তখনই হয়তো শিয়াল-টিয়াল…’
রমেনবাবু বললেন, ‘কিন্তু শিয়াল তো সচরাচর রাত্রে বেরোয়। এই বিকেলে… তাছাড়া মাথাটাই বা কেটে নিল কে?’
বলাই শেখ ধরা গলায় বলল, ‘তুমিই বলো দাদাবাবু, কে আমার পোষা বেজিটারে এইভাবে খুন করল? এর একটা বিচার হবে না?’
জয়ন্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, ‘পোষ্যপ্রাণী খুন হলে এফআইআর হয় কিনা জানি না চাচা। তবে আমি বলব, কাল সকালে থানায় গিয়ে ব্যাপারটা জানিয়ে এসো।’
বলাই শেখ রাগতস্বরে বলল, ‘কাকে বলব? ওই ওসমান আলি সায়েব? তাকে পাওয়া যাচ্ছে নাকি? সে তো কলকাতা থেকে আসা নতুন মেহমানদের নিয়েই ব্যস্ত। ওসব আমরা জানি না৷ জয়ন্তদা, ছোটবেলা থেকে তোমাদের পরিবারকেই এলাকার মাই-বাপ বলে জেনেছি, এবার এসবের বিহিতও তুমিই করো।’
অমনি চারিদিক থেকে উচ্চকিত আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। কেউ বলল, ‘সেদিন অত বড় কেউটেটার মুন্ডু কেটে নিয়ে গেল, আজ বেজিটার, এসব কী হচ্ছে আমাদের এলাকায়?’ আরেকজন বলল, ‘আর ওই যে ঘরে ঘরে জন্ডিস হল? তারপর সেই প্রসাদ খেয়ে ভেদবমি? ওসি সাহেব তো বলেই খালাস যে এসব নাকি স্বাস্থ্যদপ্তরের কাজ৷’
জয়ন্ত হাত তুলে সকলকে শান্ত করল, ‘আপনারা অত উত্তেজিত হবেন না। আপাতত যে যার ঘরে যান। আমি পুরো ব্যাপারটা নিয়ে কাল একবার ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলব।’
জনতা আপাতত শান্ত হল। আবারও বুঝলাম, এই অঞ্চলে এখনও গাংনাপুরের জমিদারবাড়ির প্রভাব কতখানি।
সবাই মিলে বাড়ির পথ ধরেছি। ফেরার পথে একে একে গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের বাড়ির রাস্তা ধরতে ভিড় ক্রমে হালকা হতে লাগল। শেষমেশ যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন রয়ে গেলেন শুধুমাত্র রমেনবাবু৷
পীতাম্বরবাবু বললেন, ‘কিছু বলবে রমেন?’
রমেনবাবু ইতস্তত করে বললেন, ‘জয়ন্তকে ওই গল্পটার কথা বলেছ পীতাম্বর?’
ভুরু কুঁচকে গেল পীতাম্বরবাবুর, ‘কোন গল্প রমেন?’
‘ওই বলাকিনী দেবীর মূর্তির গল্পটা? দেবী যদি কখনও গৃহত্যাগী হন তাহলে…’
পীতাম্বরবাবু যেন আচমকা খেপে উঠলেন, ‘এসব গালগল্প চালিয়ে আর কদ্দিন চলবে রমেন? যুগ পালটেছে, সময় পালটেছে, এখন এসব পুরোনো ফক্কিকারি মেনে চললে হবে? ওসব ভুলে যাও। যা হচ্ছে সেসব পুলিশ ডিপার্টমেন্ট দেখবে। তুমি এখন এসো।’
রমেনবাবু নিরাশ হয়ে ফেরার পথ ধরলেন।
আমি নিজের ঘরে ঢুকে ঝট করে লাগোয়া বাথরুমের গিজার অন করে দিলাম।
স্নান-টান সেরে বসার ঘরে এলাম। তখন সেখানে শুধু শিপ্রাকাকিমা আর জয়ন্ত। বাকি কাজের লোকজন যে যার বাড়ি চলে গেছে। রয়ে গেছে শুধু কাকিমার সর্বক্ষণের সঙ্গী কার্তিকের মা। আমাদের খেতে দিয়ে, ডাইনিং টেবিল মুছে তবে তার ছুটি। সে থাকে প্রাসাদেরই পেছন দিকের একটা ঘরে।
দু’জনে অত্যন্ত চিন্তিতমুখে কিছু একটা আলোচনা করছিলেন। আমাকে দেখে কাকিমা বললেন, ‘বোসো নিবারণ। তোমার সঙ্গে কথা আছে। আমি আর জয়ন্ত সে কথাই বলছিলাম।’
বললাম, ‘বলুন কাকিমা।’
‘কী চলছে সে তো তুমি দেখছই। গ্রামগঞ্জ এলাকা, এখানে কুসংস্কার জিনিসটা অত্যন্ত প্রবল। এই মুরগিদের গলা মুচড়ে মারা, গরুর চোখ খুবলে নেওয়া, সাপের কাটা মাথা, ঘরে ঘরে অশান্তি, অসুখ-বিসুখ এসব নিয়ে গাঁয়ের লোকজন খেপে তো ছিলই, তার ওপর দেবলরাজার গড় খোঁড়া নিয়ে এই অঞ্চলের লোকেদের মধ্যে যে একটা বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছে, সেও জানো। এদিকে সরকারের উদ্যোগে বাধা দেওয়াও যায় না। সব মিলিয়ে কী যে ঘটছে, কিছু বুঝতে পারছি না৷ তোমার কী মনে হয়?’
আমি বললাম, ‘দেখুন, সেদিন বাগলমশাই আর ডক্টর লাহার কথা শুনে বুঝলাম দেবলরাজার গড় নিয়ে এএসআই, মানে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কিন্তু উঠেপড়ে লেগেছে। ফলে এই খননকার্য চলবেই, বাধা দিয়ে লাভ নেই। আর তার কারণও আছে।
‘বাগলসাহেব বলছিলেন বাংলায় যেহেতু পাথর পাওয়া যায় না, তাই এখানকার সব রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরই পোড়ামাটি আর ইট দিয়ে তৈরি। আর এখানে এত নদী আর এমন বৃষ্টি হয় যে মাটি আর ইট দিয়ে তৈরি কোনও প্রাচীন স্ট্রাকচারের রক্ষা পাওয়া প্রায় ভাগ্যের কথা।
‘সেখানে এমন দু’হাজার বছরেরও পুরোনো, প্রায়-অক্ষত প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট পাওয়া নিয়ে যে হইচই হবে, সে তো জানা কথা। তাই দেবলরাজার গড় নিয়ে এএসআই-এর আগ্রহ একেবারে তুঙ্গে।’
কাকিমা বললেন, ‘কিন্তু এই যে পশুপ্রাণী মারা যাচ্ছে, তাদের মাথা কাটা চোখ-টোখ খুবলে নেওয়ার যে ব্যাপারটা…’
বললাম, ‘আমার মনে হয়, এলাকায় কোনও অজানা জন্তুর উপদ্রব হয়েছে। সে নিয়ে স্থানীয় বনদপ্তরের কর্মচারীদের জানিয়ে রাখাটাই ঠিক হবে। তারাই ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে…’
হাত তুলে আমাকে থামালেন শিপ্রাকাকিমা, ‘না নিবারণ। কোনও প্রাণীর পক্ষেই হাঁস, সাপ বা বেজির গলা মুচড়ে মারা, গরুর চোখ খুবলে নেওয়া, সাপের গলা কেটে নেওয়াটা অস্বাভাবিক, সে জানা বা অজানা যে-ই হোক না কেন। বনদপ্তর এসব কথা বিশ্বাসই করবে না।’
অকাট্য যুক্তি৷ তিনজনে চুপ করে রইলাম। একটু পরে জিগ্যেস করলাম, ‘আচ্ছা কাকিমা, এই দেবলরাজার যে কিংবদন্তীটা আপনি আমাকে বললেন, তার আর কোনও অংশ কি বাকি আছে, যেটা আপনার মনে হয় আমার জানা উচিত?’
কাকিমা একটু অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘দেখো, দেবলরাজার ওই গড় নিয়ে আরও অনেক উড়ো গল্প বা কিংবদন্তী এই এলাকার বাতাসে উড়ে বেড়ায়। তার ক’টা যে সত্যি, আর ক’টাই বা বানানো গল্প, বলা মুশকিল। তবে একটা গল্প, একটা কিংবদন্তী আমাদের ফ্যামিলিতে বহুদিন ধরে চলে আসছে৷’
কাকিমা শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘এবার জানি না তার কতটা সত্যি। মনে হচ্ছে, গল্পটা তোমায় বলা উচিত।’
কাকিমা একটু দম নিলেন। তারপর বোতল থেকে একটু জল খেয়ে ফের বলতে শুরু করলেন।
‘দেবলরাজার রাজত্ব প্রতিষ্ঠার গল্প তো শুনেছ। দেবী বলাকিনীর গল্পও শুনেছ। সেই দেবীর কৃপায় তাঁদের রাজত্ব প্রায় হাজার বছর নির্বিঘ্নে চলেছিল, সেও জানো।
‘দেবলরাজার রাজত্ব প্রতিষ্ঠার প্রায় এক হাজার বছর পর দেশের পূর্বভাগের শাসক হলেন পাল বংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপাল। তিনি এক দিকে যেমন ছিলেন অত্যাচারী আর অযোগ্য, অন্য দিকে তেমনই অদূরদর্শী এবং সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। তাঁর আমলে বারেন্দ্রীর কৈবর্তরা বিদ্রোহী হয়। আর সেখান থেকেই এই দেবলরাজার বংশলুপ্তির কাহিনির শুরু।’
কৈবর্ত বিদ্রোহ ব্যাপারটা কোথায় যেন শুনেছিলাম। ইতিহাস বইতেই বোধহয় এক লাইন লেখা ছিল। তবে ওইটুকুই। তাই জিগ্যেস করলাম, ‘এই কৈবর্ত বিদ্রোহের ব্যাপারটা ভাসা ভাসা শুনেছি৷ একটু যদি খোলসা করে বলেন তো বাকিটা বুঝতে সুবিধা হয়।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শিপ্রাকাকিমা, ‘পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট গোপালের গল্প তো তোমরা জানোই। মাৎস্যন্যায়ের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বাংলার সাধারণ মানুষ তাঁকে নিজেদের রাজা বলে নির্বাচিত করেছিল। মানুষের রায়ে সার্বভৌম রাজা হওয়ার এমন উদাহরণ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
‘সম্রাট গোপালের পর তাঁর ছেলে ধর্মপাল আর ধর্মপালের ছেলে দেবপাল সমগ্র উত্তর ভারতকে পাল সাম্রাজ্যের অধীনে আনে। যদিও সেসব খুব সহজে হয়নি। পশ্চিম ভারতের গুর্জর প্রতিহার আর দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ হয়েছিল বটে, তবে সে অন্য গল্প।
‘তারপর ধীরে ধীরে পাল বংশের অবস্থা খারাপ হতে লাগল। নানা যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যে পড়ে তাঁদের বিশাল রাজত্ব হাতছাড়া হতে শুরু হল। এমন সময়ে, গোপালের রাজা হওয়ার প্রায় তিনশো বছর পর রাজা হন দ্বিতীয় মহীপাল৷ তার আগে বিভিন্ন বৈদেশিক আক্রমণে পাল সাম্রাজ্যের প্রায় আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তাদের অধিকার টিকে আছে কেবল অঙ্গ, পীঠী, মগধ আর বারেন্দ্রীতে।
‘অঙ্গ হচ্ছে এখনকার ভাগলপুর। মগধ আর পীঠী হচ্ছে মূলত পাটনা আর পূর্ব বিহার। আর বারেন্দ্রী বা পুণ্ড্রবর্ধন হচ্ছে এখনকার মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, বাংলাদেশের নওগাঁ, রংপুর এসব এলাকা। মোটামুটি এখনকার পূর্ণিয়া থেকে বাংলাদেশের রংপুর, আর উত্তরের শিলিগুড়ি থেকে দক্ষিণে ফরাক্কা ব্রিজ অবধি ছিল বারেন্দ্রীর সীমানা।
‘এই বারেন্দ্রীকে বলা হতো পাল বংশের জনকভূমি, যেহেতু সম্রাট গোপাল এই অঞ্চলের মানুষ ছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের পক্ষে এই বিশাল অঞ্চল নিজেদের দখলে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
‘যা বলছিলাম, দ্বিতীয় মহীপাল রাজা হিসেবে ছিলেন একজন আদ্যপান্ত অপদার্থ, বুদ্ধিহীন, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষ, তার ওপর যাকে বলে সাইকোপ্যাথ। তিনি নেহাত সন্দেহের বশে নিজের দুই ভাই রামপাল আর শূরপালকে বন্দি করেন। এতে পাল বংশের সামন্তদের অনেকেই খুব অসন্তুষ্ট হন। কারণ তাঁরা রাজা হিসেবে রামপালকেই যোগ্যতর বলে মনে করতেন। তাছাড়া সিংহাসনের লোভে নিজের বাপ ভাইয়ের বুকে ছুরি বসানো, বা তাদের কারারুদ্ধ করা পাল বংশের কালচার ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় মহীপাল শুধু যে সেই নিয়ম ভঙ্গ করলেন তাই নয়, তিনি আরও একটা মহাগর্হিত অপরাধ করলেন।
‘পালবংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ৷ আর কৈবর্তরা ছিল হিন্দু। এমনিতে সে সময়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ সদ্ভাব ছিল। অনেক পালসম্রাটই হিন্দু মন্দির স্থাপন করেছেন, তাঁদের মন্ত্রীদেরও প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু। কিন্তু দ্বিতীয় মহীপাল কৈবর্তদের পতিত বলে ঘোষণা করলেন। বললেন বৌদ্ধদের উপোসের দিন, আর বিশেষ বিশেষ তিথিতে মাছ ধরা যাবে না। কারণ বৌদ্ধধর্মে প্রাণীহিংসা বা জীবহত্যা নিষিদ্ধ।’
কথাটা শুনে আমার ভারি আশ্চর্য লাগল, ‘সে আবার কী? তিনি নিশ্চয়ই যুদ্ধ-টুদ্ধ করতেন, অপরাধীদের প্রাণদণ্ডও দিতেন। তাতে জীবহত্যা হতো না?’
শিপ্রাকাকিমা বললেন, ‘একদম ঠিক পয়েন্ট ধরেছ নিবারণ। স্বাভাবিকভাবেই এই নিয়ে কৈবর্তরা সাংঘাতিক বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল৷ তার ওপর আগুনে ঘি ঢালা হল যখন সম্রাট ঘোষণা করলেন— তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের হৃত সাম্রাজ্য উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধযাত্রা করবেন। আর তার জন্য অতিরিক্ত কর চাপালেন কাদের ওপর? সেই কৈবর্তদের ওপরে!
‘ব্যস, বিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। কৈবর্তদের এক রাজকর্মচারী দ্বিতীয় মহীপালের সভায় বেশ উচ্চপদে চাকরি করতেন। তাঁর নাম দিব্বোক৷ তাঁকে নেতা বানিয়ে কৈবর্তরা বিদ্রোহী হল। সামন্তরা বারণ করা সত্ত্বেও দ্বিতীয় মহীপাল তাদের দমন করতে এগোলেন। আর পরাস্ত হয়ে বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারালেন।’
‘তারপর এরপর পাল সাম্রাজ্যের যেটুকু রাজত্ব বেঁচে ছিল, তার রাজা হলেন রামপাল…’ এইবার মনে পড়ে গেছে ইতিহাসের চ্যাপ্টারটা। বললাম, ‘আর তিনিও দাদার মতোই চাইলেন যে কৈবর্তদের দমন করে পুরোনো রাজ্য উদ্ধার করবেন, তাই তো?’
‘একদম তাই। ইতিহাসের সব কাহিনি প্রকাশ্যে বলা হয় না। ইতিহাসবিদদের ধারণা রামপাল বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হতে বোধহয় দিব্বোকের সঙ্গে কোনও একটা আঁতাত করেছিলেন। দ্বিতীয় মহীপাল নিহত হতে রামপাল মুক্তি পেলেন বটে! কিন্তু তারপরেই তিনি স্বমূর্তি ধারণ করলেন। তাঁরও ইচ্ছে পূর্বপুরুষের রাজত্ব আবার ফিরিয়ে আনবেন। আর তার জন্য তিনি যে রাস্তাটা বেছে নিলেন তার মতো ঘৃণ্য আর খারাপ আর কিছু হয় না।’
আমি সোজা হয়ে বসলাম৷ এবার বোধহয় গল্পের একটা ইন্টারেস্টিং জায়গায় ঢুকতে চলেছি।
‘পাল সাম্রাজ্যের আশেপাশের চোদ্দোজন ছোট-বড় সামন্তকে তিনি টাকা আর জমির লোভ দেখিয়ে নিজের দলে টানলেন। তারপর সেইসব সামন্তদের সৈন্যবাহিনী, যাদের মার্সিনারি বা ভাড়াটে সৈন্য বলাই ঠিক, তাদের সাহায্যে তিনি অত্যন্ত নৃশংসভাবে কৈবর্ত বিদ্রোহ দমন করলেন। আর সেই কাজে তাঁর সাহায্য করেছিলেন এই দেবগ্রামের অধিপতি বিক্রমরাজ বা বিক্রমজিৎ, দেবলরাজার এক উত্তরসূরি।’
জয়ন্ত বলল, ‘কিন্তু মা, এই কাহিনির সঙ্গে আমাদের এসব কাণ্ডকারখানার কী যোগসূত্র?’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শিপ্রাকাকিমা, ‘লোকে বলে টাকা আর জমির লোভে দেবগ্রামরাজ বিক্রমজিৎ শুধু যে সৈন্য দিয়ে রামপালকে সাহায্য করেছিলেন তাই-ই নয়, আরও একটি অত্যন্ত গর্হিত কর্ম করেছিলেন। কিন্তু সেই গর্হিত কর্মটি কী, তিনি রামপালকে কীভাবে কী বিশেষ সাহায্য করেছিলেন, সেসব জানা যায় না। এবং লোকে বলে সেই পাপেই নাকি তাঁর রাজত্ব এক রাতের মধ্যে ছারেখারে যায়।’
এবার আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কাকিমা, তোমার কী মনে হয়, এসব কিংবদন্তীর সঙ্গে এখন যা হচ্ছে তার কোনও সম্পর্ক আছে?’
শিপ্রাকাকিমা আমার দিকে একবার ক্লান্তচোখে তাকালেন, ‘কী জানি বাবা! যেটুকু আমার বাপ-ঠাকুরদার থেকে শুনেছি, সেটুকুই বললাম। বাকিটা তুমি আর জয়ন্ত দেখো। এমনিতেও আমার বয়েস হয়েছে, বেশি টেনশন নিতে পারি না।’
আমি বললাম, ‘দেখছি কাকিমা, কতটা কী করতে পারি।’
ডিনার করে একবার বাইরে বেরোলাম সিগারেট খেতে। একবার ভাবলাম জয়ন্তকে ডাকি, তারপর ভাবলাম, থাক। আজ সারাদিন অনেক হুজ্জোত গেছে ছেলেটার ওপর দিয়ে। আর ডিস্টার্ব করব না।
সদর দরজার বাইরে থেকে একবার রাজবাড়িটার দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। মস্ত বড় প্রাসাদটাকে এখন একটা ঘুমন্ত দৈত্যের মতোই দেখাচ্ছে। দোতলা প্রাসাদ, ওপরের তলায় শিপ্রাকাকিমা, জয়ন্ত, মানে বাড়ির মালিকদের ঘর। সঙ্গে গেস্টরুম, যেখানে এখন আমি আছি।
নীচে ডাইনিং, বসার ঘর ইত্যাদির সঙ্গে আছে কাজের লোকেদের থাকার ব্যবস্থা। কার্তিকের মা থাকে পেছন দিকটায়৷ সামনের দিকে একদম কোনার ঘরে পীতাম্বরবাবুর থাকার ব্যবস্থা।
এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি শিপ্রাকাকিমার ঘরে আলো জ্বলছে। আমি জানি, কাকিমা অনেক রাত অবধি পড়াশোনা করেন। জয়ন্তর ঘর অন্ধকার। পীতাম্বরবাবুর ঘরে অল্প আলো জ্বলছে। সম্ভবত প্রদীপ বা মোমবাতির আলো। কারণ শার্সির কাচ ভেদ করে শিখার কাঁপন বোঝা যাচ্ছে। ঘরের বাইরে জানালার গ্রিলে বসানো এসির আউটডোর ইউনিট থেকে একটা মৃদু গুঞ্জন কানে আসছিল।
আমি সিগারেট ধরিয়ে আনমনে হাঁটতে লাগলাম। এমনিই, কোনও উদ্দেশ্য ছাড়া। মনের মধ্যে কিছু এলোমেলো ভাবনা ঘুরছিল। কী হচ্ছে এখানে?
হালদারবাবুর মুংলি না হয় সাপের কামড়ে মারা গেছিল, কিন্তু তার চোখ খুবলে নিল কে? রমেন সাঁতরার কেউটের মাথা কেটে নিল কে? সে কি বলাই শেখের পোষা বেজি? যদি তাই হবে তাহলে সে সাপের মৃতদেহের পাশে অমন জবুথবু হয়ে বসেছিল কেন? কী কারণে?
তারপর বলাই শেখের বেজিটারইবা একই পরিণতি হল কেন? শিয়ালের পায়ের ছাপ পেয়েছি বটে, কিন্তু শিয়াল কখনও ছুরি বা মাংস কাটার ছুরি দিয়ে তার শিকারের গলা কেটেছে বলে তো শুনিনি।
হাঁটতে হাঁটতে এতটাই অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম যে লক্ষ করিনি, বকরাক্ষসের জঙ্গলের কাছে এসে গেছি। সামনে সেই প্রাচীন বটগাছ আর তার প্রায় খসে যাওয়া বেদি। যখন সম্বিৎ ফিরল তখন সিগারেটটা প্রায় শেষ। সেটাকে এক টুসকিতে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলাম।
সিগারেটটা বটগাছের বেদির এক কোণে জ্বলতে থাকল। এবার ফিরতে হবে। ফেরার ঠিক আগে একটা জিনিস দেখে থমকে গেলাম।
যেখানে সিগারেটের শেষটুকু জ্বলছিল, তার ঠিক পাশে আরও দুটো জ্বলন্ত অগ্নিবিন্দু জ্বলে উঠল। আমি স্থিরচোখে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। কীসের অগ্নিবিন্দু? কী জ্বলছে ওখানে?
একটু পর দুটো আগুনে চোখ দেখা গেল। একটা খড়মড়ে আওয়াজ। একটা প্রাণী যেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়ে গেল জঙ্গলের ভেতরে।
জানি না কেন একটা অস্বস্তি ছেয়ে গেল আমার মাথার মধ্যে। আমি চিনেছি ওই প্রাণীটাকে। ওটা একটা শিয়াল। একটা খোঁড়া শিয়াল। সাপ, বেজি, শিয়াল… কী যেন হয়? কী যেন?
