৪
সেদিন মনা মাঝির গল্প শুনে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেছিল। পাড়ায় ঢোকার মুখে দেখলাম একটা পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে। তার চারিপাশে অনেক লোক জটলা করে আছে। চারিদিকে একটা চাপা উত্তেজনা। তার মধ্যে আমার বাবাকেও দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে বাবা এগিয়ে এল, চোখ পাকিয়ে বলল, ‘এত রাত করে কোথায় ঘুরছিলিস তুই?’
আমি বাবার মুখের দিকে তাকানোমাত্র একটা বীভৎস দৃশ্য দেখতে পেলাম। বাবা একটা লাশের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না! তার ডান হাতের পাঞ্জাটা নেই। চারিদিকে রক্ত আর রক্ত!
আমি যেন একটা ঝটকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। তারপরেই প্রবল ইচ্ছেশক্তিতে সংযত করলাম নিজেকে। কাকচক্ষু আবৃত করলাম। জিগ্যেস করলাম, ‘কেন? কী হয়েছে?’
বাবা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ফের মুখে মুখে তক্ক?’
বলাইকাকা এগিয়ে এলেন, ‘আহা, ওকে বকছেন কেন দাদা? হয়তো গেছিল কোথাও। যাও বাবা, বাড়ি যাও। একটু দেখেশুনে যেও, কেমন?’
আমি বললাম, ‘কী হয়েছে, বলবে তো?’
বলাইকাকা গলা নামিয়ে বললেন, ‘আজ দুপুরের দিকে বিপত্তারণবাবু খুন হয়েছেন। শুধু যে খুন হয়েছেন তাই-ই নয়, খুনিরা ওঁর ডান হাতের পাঞ্জাটা কেটে নিয়ে গেছে। তুমি সাবধানে বাড়ি যাও বাবু।’
কথাটা শুনে আমার শীত শীত করতে লাগল। এই বিপত্তারণ ঘোষাল বলেছিলেন তিনি হচ্ছেন গোঁসাইপুরের ঘোষালদের আত্মীয়। যাদের কথা আমি একটু আগেই মনা মাঝির মুখে শুনে এলাম।
মনা মাঝি নাকি কী একটা কাজের জন্য আজ অবধি এখানে আটকে ছিল। কী সেই কাজ? পনেরো বছর পর কোন হিসেব মেটাতে ফিরে এল এখানে? কাকে জীয়ন্তে জীয়ন্তে মরতে দেখতে চায় সে?
সেদিন বাড়িতে ফিরে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে উঠে দেখলাম বাড়িতে চূড়ান্ত ব্যস্ততা। বাবা কোথায় যেন যাবে, গোছগাছ করছে। মা রান্না বসিয়েছে। আমি দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে আসতেই তেলের শিশিটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘হাবুর দোকান থেকে একশো গ্রাম সরষের তেল নিয়ে আয়। খাতায় লিখে আনবি। যাবি আর আসবি, দেরি যেন না হয়।’
আমি তেল এনে মা-কে দিয়ে বললাম, ‘বাবা কোথায় যাচ্ছে গো?’
‘গোঁসাইপুর।’
বুকটা কেন জানি না ধক করে উঠল। বললাম, ‘কেন?’
‘ঘোষালবাড়ি থেকে ডাক এসেছে। বড় ঘোষালের নাকি এখন তখন, প্রায় যায় যায় অবস্থা। শেষ মুহূর্তে হরিনাম শুনতে চেয়েছে বলে তোর বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছে।’
এক লাফে হৃৎপিণ্ডটা যেন কণ্ঠার কাছে উঠে এল। তবে কি মনা মাঝি তার হিসেব মেটানো শুরু করে দিয়েছে? তাহলে তো বড় ঘোষাল উপলক্ষ্য মাত্র! আসল লক্ষ্য তো অন্য কেউ!
আমার মাথার মধ্যে বিপদঘণ্টি বাজতে শুরু করে দিয়েছে তখন। ততদিনে আমি জেনে গেছি মনা মাঝি কী কী জানে। তারাপীঠ থেকে শুরু করে কামাখ্যা-মায়াং হয়ে এই পনেরো বছরে দেশের সব তন্ত্রপীঠ ঘুরেছে সে। এমন কোনও অভিচারক্রিয়া নেই যা মনা মাঝি জানে না। ও মহাযোগিনীসিদ্ধ তান্ত্রিক। সাধারণ মারণ উচাটন থেকে শুরু করে এমন কোনও পাপকর্ম নেই যা ও করতে পারে না। তার কিছু কিছু প্রমাণ আমি ইতিমধ্যেই পেয়েছি।
আর এবার বুঝতে পারলাম, কেন ও এসেছে এই চত্বরে। কেন ও হরিপদ সাহার বৃষকাঠের ডান হাতের পাঞ্জা কেটে পালিয়েছিল। কী ওর উদ্দেশ্য! কাকে জীয়ন্তে একটু একটু করে মরতে দেখতে চায় ও!
আমি গুটিগুটি পায়ে বাবার কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাবা, আমি তোমার সঙ্গে যাব?’
অন্য সময় হলে হয়তো বাবা পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে ভেবে না করে দিত। কিন্তু তখন গরমের ছুটি চলছে। বাবা কী যেন ভেবে চিন্তিতভাবে বলল, ‘যাবি বলছিস? চল তাহলে। আমারও কিছু কাজের সুবিধা হয়।’
বলা বাহুল্য, মা অনেক বারণ করল। কিন্তু বাবা নিরস্ত করে বলল, ‘এমনিতেই বাড়িতে বসে বিরক্ত হচ্ছে, ওর তো আর বন্ধুবান্ধব বেশি নেই। এক-দু’দিনের জন্য যাক না আমার সঙ্গে।’
মা কড়া চাউনি দিয়ে বলল, ‘বেশি বদমাইশি করবি না কিন্তু। আসার পর যেন তোর বাবার থেকে তোর নামে কোনও অভিযোগ শুনতে না পাই।’
তখন গোঁসাইপুর অবধি যাওয়ার উপায় ছিল বাস। সময় লাগার কথা ঘণ্টাখানেক৷ কিন্তু রাস্তাঘাটের অবস্থা এত বেহাল ছিল যে কহতব্য নয়। ঘণ্টা তিনেকের বাসজার্নি পেরিয়ে যখন গোঁসাইপুর পৌঁছলাম তখন দুপুর।
আমরা পৌঁছতেই আমাদের দ্রুত থাকার ঘর দেখিয়ে দেওয়া হল। বাবা হাত-পা ধুয়েই নামাবলি পরে, গীতা আর শালগ্রাম শিলা হাতে নিয়ে অন্দরমহলের দিকে দৌড় দিল। আমি আর গেলাম না, মরণাপন্ন রোগীকে ঘিরে আত্মীয়পরিজনের ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না আর বিলাপ আমার চিরকালই অস্বস্তিকর লাগে।
.
আমি বেরিয়ে ঘোষালবাড়িটা একটু ঘুরেফিরে দেখতে লাগলাম। মস্ত বড় দোতলা বাড়ি, অনেকটা চৌহদ্দি জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সামনে কেয়ারি করা ফুলের বাগান৷ পেছনে বড় জায়গা জুড়ে ফলের গাছ, পোষা হাঁসেদের থাকার ঘর৷ বাড়ির একপাশে পাঁচিল ঘেঁষে ধানের গোলা। তার পাশে গোয়াল। গোয়ালের পাশে ঘাড় নুইয়ে শুয়ে আছে শ্রান্ত ট্র্যাক্টর। বোঝাই যায় যে অত্যন্ত সম্পন্ন পরিবার। কিন্তু সমস্ত পরিবেশের ওপর একটা মালিন্যের আস্তরণ ছড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে সমস্ত বাড়িটা যেন কোনও এক অজানা আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে আছে।
পাঁচিল বরাবর ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির পেছন দিকে এলাম। খিড়কি দরজার ওপাশে একটা পুকুর৷ বোঝাই যাচ্ছে যে সেটাও নিশ্চয়ই এঁদেরই সম্পত্তি। পুকুরের তিন ধার ঘিরে ঘন বাঁশঝাড়৷ সেখানে এই দিনেদুপুরেও ঘন অন্ধকার।
আমি খানিক ওই বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ করেই আমার মনে হতে লাগল, ওখানে আমার যাওয়া দরকার, খুব দরকার। কে যেন ওখানে আমাকে ডাকছে, বলছে—ওরে আয়, আয়, আয়…
মোহগ্রস্তের মতো খিড়কি দরজাটা খুলে বেরোতে যাব, এই সময় পেছন থেকে একটা খ্যানখ্যানে গলা শুনে চটকাটা ভেঙে গেল। চকিতে ঘুরে দেখি এক মধ্যবয়সি কাজের মাসি, পরনের শাড়ি গাছকোমর করে পরা, গলার শিরা ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে, ‘বলি ও খোকা, ভরদুপুরে ওদিকে চললে কোথায়? তুমি, ওই যে হরিনাম করতে এসেছে তার ছেলে না?’
শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে বললাম, ‘হ্যাঁ মাসি।’
মাসি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘শিগগিরি ঘরে যাও। কর্তার এখন তখন অবস্থা, আর তুমি ঘুরে বেড়াচ্ছ?’
আমি সংকুচিত হয়ে বললাম, ‘যাচ্ছি মাসি, যাচ্ছি।’
এই বলে আমি দ্রুত পা চালাতেই ঘোষালবাড়ির অন্দর থেকে একটা কান্নার রোল ছিটকে উঠল। কে যেন ফোঁপাতে ফোঁপাতে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ও গোপালি, কোথায় তুই? বড়বাবু তো গেলেন…’
গোপালিমাসি শোনামাত্র উলটো দিকে ফিরে ‘হায় হায়, আমাদের কী হল রে’ চিক্কুর পাড়তে পাড়তে দৌড় দিল। আমি চিরকালই এসব কান্নাকাটির দৃশ্য এড়িয়ে চলি। কিন্তু এখন ওখানে আমার বাবা আছে। আমি গোপালিমাসির পিছন পিছন দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলাম।
ভূপতি ঘোষাল বড় মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে পুরো গোঁসাইপুর ঘোষালবাড়ির উঠোনে ভেঙে পড়েছিল। সে কী আর্তনাদ, হা-হুতাশ, বিলাপ আর কান্নার রোল! মনে হচ্ছিল যেন গোটা গ্রাম পিতৃহীন হয়েছে। তারপর তারা যখন তাঁর মরদেহ নিয়ে ‘বলোহরি হরিবোল’ বলতে বলতে শ্মশানের দিকে রওনা দিল, তখন আমি ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিলাম। আমার আর অত কান্নাকাটি ভালো লাগছিল না৷ তবে তার অন্য একটা কারণও ছিল।
আমার চোখে শুধু একজনেরই মুখ ভাসছিল, ভুবনেশ্বরী ঘোষাল।
এখন যেমন মেক-আপের চল আছে, সেকালে তেমন ছিল না। সেকালে একমাত্র প্রকৃত সুন্দরীদেরই সুন্দরী বলে চেনা যেত৷ ভুবনেশ্বরী দেবীকে দেখে আমার বুকের মধ্যে ছাঁৎ করে উঠেছিল। খোলা ইলেকট্রিকের তারে হাত লাগলে যেমন হয়।
একে বয়েসটা সুন্দর মেয়েদের দেখলে হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি বেড়ে যাওয়ার মতোই। তার ওপর অমন অসাধারণ রূপসী মহিলা আমি আর দেখিনি। পানপাতা কাটিংয়ের মুখ, ফরসা গায়ের রং, টিকলো নাক আর পদ্মফুলের পাপড়ির মতো চোখ নিয়ে রূপে স্বর্গের কোনও দেবীর থেকে কিছু কম ছিলেন না ভুবনেশ্বরী ঘোষাল।
আমি যখন দেখি, তখন তিনি মৃত শ্বশুরের পায়ের কাছে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। সারা ঘরে কান্নার রোল। মৃতদেহের মাথার কাছে যিনি বারবার কাঁধের গামছা দিয়ে চোখ মুছছেন, আন্দাজে বুঝলাম উনিই ধূর্জটি ঘোষাল। শালপ্রাংশু শরীর আর গাম্ভীর্য মিলিয়ে ভদ্রলোকের উপস্থিতির মধ্যে একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল। তিনি কাঁদতে কাঁদতেই লোকজনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন।
আমি যখনকার কথা বলছি, তখন ধূর্জটি ঘোষালের বয়েস প্রায় পঁয়তাল্লিশ। তাও শরীরে তার এতটুকু ছাপ পড়েনি। আর পাশে দাঁড়ানো একটি বছর পাঁচ-ছয়ের শিশু তাঁর ফতুয়ার খুঁট টানতে টানতে অবুঝস্বরে প্রশ্ন করছে, ‘কী হল বাবা? দাদাই ঘুম থেকে উঠছে না কেন?’
বুঝলাম, ধূর্জটি ঘোষাল একটু বেশি বয়সে বাপ হয়েছেন।
ওরা শ্মশানের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পর আমিও টুক করে বেরিয়ে পড়লাম। আগেই বলেছি, আমার লোকজন বেশি ভালো লাগত না। তার ওপর এই বিষণ্ণ পরিবেশের মধ্যে থাকতে একদম ইচ্ছে করছিল না।
ঘোষালবাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকলাম। সব আর-পাঁচটা গ্রামের মতোই। পুকুর, খেত, ধানের মরাই, আম কাঁঠালের বাগান। পুকুরের জলে পানকৌড়ি ভেসে বেড়াচ্ছে, পাড় ঘেঁষে উঠেছে তালগাছের সারি। শেষ বিকেলের রোদেও বড্ড তেজ। তবে রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা৷ একে গ্রামের প্রায় সব পুরুষেরা শ্মশানে গেছে। বাকি যারা আছে তারা আর আজ বাইরে বেরোয়নি।
রুখাসুখা লালমাটির পথ ধরে খানিক এতোল-বেতোল হাঁটছিলাম। মাথার মধ্যে হাজারো একটা চিন্তা। একটু পর হঠাৎ করেই দেখলাম সামনের রাস্তা শেষ। আর আমি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, তার সামনে একটা মস্ত বড় বাঁশবন।
আন্দাজে বুঝলাম, এটা ঘোষালবাড়ির খিড়কির বাঁশবনেরই অন্য দিক। চারিপাশে কেউ কোত্থাও নেই। তখন দ্রুত সন্ধে নেমে আসছে। বাঁশবনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে তরল অন্ধকার।
এমন সময় হঠাৎ করেই যেন একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল বনের মধ্যে দিয়ে। আর ওই প্রবল গ্রীষ্মের মধ্যেও একটা শিরশিরে ঠান্ডা ভাব যেন আমার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে গেল। আমি সামান্য কেঁপে উঠলাম।
তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম বাঁশবনের দিকে।
