কাকচক্ষু – ৩

দিনটা আমার এখনও মনে আছে।—আরও একটা সিগারেট টেনে নিয়ে বললেন নিবারণ চক্রবর্তী—আমাদের গ্রামের সীমানা বরাবর একটা ছোট জঙ্গল ছিল। সেখানে গেছিলাম একটা বিশেষ কারণে। ও, তোমাদের বোধহয় বলা হয়নি, আমার মা ছিলেন তাঁর বাপের, মানে আমার দাদুর একমাত্র মেয়ে। আমার দাদু ছিলেন বৈদ্য। পৈতৃক সূত্রে আমার মা-ও অনেক আয়ুর্বেদিক ভেষজ ওষুধের গুণাগুণ জানতেন। অবরে-সবরে তিনি গ্রামের মহিলাদের নানা মেয়েলি সমস্যার ওষুধ দিতেন। মায়ের কথামতোই জঙ্গলে গেছিলাম কয়েকটা নির্দিষ্ট লতাপাতা তুলে আনতে।

ওলটকম্বলের গাছ খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলের পশ্চিম দিকে চলে গেছিলাম। এদিকে জঙ্গল অনেকটা ঘন। সেখানে একটা ছোট ডোবা ছিল। ডোবার পাশে বহু পুরোনো একটা নিম গাছ। তার গা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে গুলঞ্চের লতা বেয়ে উঠেছে।

সেইটে পাড়ার জন্য হাত বাড়িয়েছি, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠল, ‘কী খোকাবাবু, কী করছ?’

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, মনা মাঝি! প্রথমে বুকটা ধক করে উঠেছিল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘তুমি আবার এসেছ? তোমার তো সাহস কম নয় দেখছি! এবার গ্রামের লোক তোমাকে হাতের কাছে পেলে না পিটিয়ে ঠ্যাং ভেঙে দেবে।’

লোকটা থুক করে একটু থুতু ফেলল। তারপর বলল, ‘অতই সহজ? মনা মাঝিকে ধরবে এমন লোক এ দিগরে এখনও জন্মায়নি।’

‘তুমি সেদিন ওই বৃষকাঠের কাপড় আর পাঞ্জা কেটে নিয়ে পালিয়েছিলে কেন?’

লোকটা চতুর হাসি হাসল, ‘কেন, মায়ের কথা বিশ্বাস হল না বুঝি?’

ভুলে গেছিলাম, লোকটা কাকচক্ষু বিশারদ। ফলে এসব প্রশ্ন করে লাভ নেই বুঝে সরাসরি অ্যাটাক করা শুরু করলাম, ‘ওই কাপড় আর কাটা আঙুল দিয়ে কোন তুকতাকটা করবে তুমি?’

লোকটা একটু থমকে গেল। তারপর উত্তর দিল, ‘বললে তুমি বুঝবে না খোকাবাবু।’

‘কী করবে? মারণ উচাটন করবে তো? কাকে মারবে শুনি?’

লোকটা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। তারপর সামান্য বাঁকা হেসে বলল, ‘মেরে ফেললে তো হয়েই গেল খোকাবাবু। কিন্তু কাউকে জীয়ন্তে ধীরে ধীরে মরতে দেখার যে আনন্দ, তার তুলনা হয় না গো।’

বলে সেই নিস্তব্ধ জঙ্গল কাঁপিয়ে অপ্রকৃতিস্থের মতো হা-হা করে হেসে উঠল। বলতে বাধা নেই, সেই হাসি শুনে আমার বুকের ভেতর শিরশির করে উঠল।

লোকটা হাসি থামিয়ে আমার দিকে যখন তাকাল, তখন তাকে দেখে চমকে গেলাম। ওই নোংরা দাড়িগোঁফের জঙ্গল ছাপিয়ে লোকটার চোখমুখ থেকে একটা তীব্র হিংস্রতা ফুটে বেরোচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সংসারের সব তিক্ততা, সব উগ্রতা, সব চণ্ডক্রোধ লোকটার দু’চোখে জমা হয়েছে। ঘৃণা আর ক্রোধের এরকম বহিঃপ্রকাশ আগে আর কখনও দেখিনি।

তবে তা কিছুক্ষণের জন্যই। একটু পরেই লোকটার চোখমুখ স্বাভাবিক হয়ে এল। তারপর সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকচক্ষু বিদ্যা শিখবে খোকা?’

বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা কী হল জানি না, একটা দুরন্ত লোভ আমার মধ্যে মাথাচাড়া দিল। মনে হল, এই বিদ্যে না শিখলে আমার ইহকাল-পরকাল সব তুচ্ছ৷ আমার জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া, সব কামনা-বাসনা যেন একবাক্যে বলছে ওই বিদ্যা আমাকে শিখতে হবে। শিখতেই হবে। কাকচক্ষু না শিখলে আমার মুক্তি নেই, আমার মোক্ষ নেই, আমার নির্বাণ নেই।

সাগ্রহে বললাম, ‘হ্যাঁ শিখব। তুমি শেখাবে?’

লোকটার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে গেল। বলল, ‘শেখাব তো বটেই। তোমার আধার ভালো। দেহলক্ষণে অবধূতের চিহ্ন আছে৷’

‘অবধূত মানে?’

‘অবধূত মানে যারা গৃহে থেকেও সন্ন্যাসী। যেমন তুমি হবে। তোমার কপালে বৈরাগ্য লেখা আছে বাপু। তুমি জীবনে না সংসার করতে পারবে, না সংসার ছাড়তে পারবে। না সন্ন্যাসী হতে পারবে, না সংসারী। তুমিই উপযুক্ত লোক। আর তোমার শিখতে বেশিদিন লাগবেও না। কাল ঠিক এই সময়ে এখানে এসো। তোমাকে কাকচক্ষু বিদ্যা শিখিয়ে দিই।’

পরদিন, অক্ষয় তৃতীয়া থেকে মনা মাঝির কাছে আমার কাকচক্ষু বিদ্যা শেখা শুরু। রোজ সন্ধেবেলা চলে আসতাম ডোবার ধারে৷ লোকটা ঠিক উপস্থিত থাকত। কোনওদিন কিছু চায়নি। তবে এক-দু’দিন কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলাম যে লোকটার স্নান বা খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই। তাই রোজই যাওয়ার সময় দুটো রুটি আর একটু গুড় বা কোনও তরকারি লুকিয়ে নিয়ে যেতাম। দেখতাম, খাওয়ার সময় লোকটার মুখে একটা আলাদা তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠত।

কাকচক্ষু বিদ্যাটা কী? কী করে শিখলাম? সেসব বললে তোমরা বুঝবে না, ত্রাটক থেকে শুরু করে নাড়িবন্ধন, অনেক গূঢ় সাধনার রহস্যই লুকিয়ে আছে ওর মধ্যে। কিন্তু যেটা সবচাইতে বেশি জরুরি, সেটা হচ্ছে মনের শক্তি সংযত আর সংহত করতে শেখা। পুরো বিদ্যেটাই দাঁড়িয়ে আছে মনের জোরের ওপর। মন যত শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন আর সুতীক্ষ্ণ থাকবে, এই বিদ্যার প্রয়োগ ততই কার্যকরী হবে।

তবে একটা কথা মনা মাঝি ঠিকই বলেছিল। কাকচক্ষু বিদ্যা শিখতে আমার পনেরো দিনও নয়, সবমিলিয়ে মাত্র বারো দিন মতো লেগেছিল। লোকটা রোজই আমার উন্নতি দেখে খুশি হয়ে ভূয়সী প্রশংসা করত। বলত, আমার থেকে ভালো শিষ্য ও নাকি আর দ্বিতীয়টি পায়নি।

যেদিন শেখা শেষ হল, সেদিনটা ছিল পূর্ণিমা। লোকটা বলেছিল, সেদিন যেন আমি একটা হরীতকী ফল নিয়ে যাই। সেদিন যখন এল, দেখলাম মদে একেবারে চুর হয়ে আছে৷ সারা গা জুড়ে তাড়ির বদখত গন্ধ৷ তবে হাবেভাবে একটা হাসিখুশি ভাব।

এসেই হরীতকীটা আমার হাত থেকে নিয়ে বলল, ‘আজ তোমার শেখা শেষ হল খোকাবাবু। তোমাকে এই বিদ্যেয় যা শেখাবার, সব শিখিয়ে দিলাম, আর কিছু বাকি রইল না। আর এই রইল আমার গুরুদক্ষিণা।’

 .

আমি বললাম, ‘কাল থেকে আর আসবে না?’

মনা মাঝি জড়ানো গলায় বলল, ‘না গো খোকাবাবু৷ কয়েকটা জিনিস জোগাড় করতেই আমার এ দিগরে আসা। তার একটার জন্য আজ অবধি এখানে আটকে থাকতে হল। তবে আজ সে জিনিস পেয়ে গেছি।’

‘সেটা কী জিনিস?’

লোকটা ঢুলুঢুলু চোখে বলল, ‘সে জেনে তোমার কাজ নেই। তবে আজই এই গ্রামে আমার শেষ রাত। কাল থেকে আমাকে আর দেখতে পাবে না।’

জিগ্যেস করলাম, ‘কোথায় যাবে?’

লোকটার চোখের মধ্যে ধক করে আগুনের গোলা ফুটে উঠল। দাঁতে দাঁত চিপে বলল, ‘একটা হিসেব মেটাবার আছে গো খোকাবাবু, অনেক পুরোনো হিসেব। পনেরোটা বছর—পনেরোটা বছর অপেক্ষা করেছি প্রতিশোধ নেওয়ার। অবশেষে আজ এসেছে, সেই দিন এসেছে। এবার দেখব মনা মাঝিকে বোকা বানায় এমন সাহস কার হয়।’

এতদিনে লোকটাকে একটু একটু চিনেছি। ওর স্বভাব, পাগলামি, খিদে, কষ্ট, রাগ সবই বুঝতে পারতাম। ও যে কোনও একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই এ অঞ্চলে এসেছে সেও আন্দাজ করতে কষ্ট হতো না। তবে উদ্দেশ্যটা কী, সেটা জানতে পারিনি কখনও।

আজ লোকটাকে এমন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পেয়ে মনে হল, আজ একবার চেষ্টা করে দেখি। যদি জানা যায় লোকটার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী! আর নেশা করলে যে কাকচক্ষু বিদ্যে কাজ করে না সে মনা মাঝিই বলেছিল। বুঝলাম, যদি জানার হয় তো আজই সেই দিন।

.

এই সময়ে ফস করে সত্যব্রত জিজ্ঞাসা করে বসল—যদি জানতেনই যে নেশা করলে মনা মাঝির কাকচক্ষু বিদ্যা কাজ করবে না, তাহলে তো আপনি এমনিতেই গুরুমারা চেলা হয়ে ওর হিস্ট্রি জানতে পারতেন।

—না সত্যব্রতবাবু, অত সহজ নয়। প্রথমত, মনা মাঝি কাকচক্ষু বিদ্যায় মহারথী, আমি তখনও প্রায় শিক্ষানবিশ। যদি এই বিদ্যায় শিক্ষিত দুজন একে অপরের মুখোমুখি হয়, তাহলে যে অধিক শিক্ষিত বা উন্নততর অধিকারী, তারই ইচ্ছাই জয়ী হয়। নেশাগ্রস্ত হলে কী হবে, মনোরঞ্জন মাঝির মনের ভেতর ঢোকা আমার কম্ম ছিল না।

সে যাই হোক। আমি জানতাম যে লোকটা দামি সিগারেটের ভক্ত৷ আমি বাবার পকেট থেকে চুরি করে আনা দুটো চারমিনার লোকটার দিকে এগিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনা মাঝির চোখমুখের চেহারা পালটে গেল। একটা সিগারেট টেনে নিয়ে পকেট থেকে দেশলাই বার করে তাতে আগুন ধরাল। তারপর কয়েকটা লম্বা টান দিয়ে সে তার জীবনের গল্প বলতে লাগল।

মনোরঞ্জন মাঝির বাড়ি ওই গোঁসাইপুর গ্রামেই। বাপ দুখিরাম মাঝি ছিলেন ছোট ব্যবসায়ী। গঞ্জে একটা ছোট মুদিখানার দোকান ছিল তাঁর।

মনা মাঝি ছোটবেলা থেকেই যেমন অবাধ্য, তেমনই জেদি আর একগুঁয়ে। স্বভাবে দুরন্ত ছেলেটা কোনও কথা শুনত না, কারও কথা মানত না। একমাত্র ছেলে বলে বাপেরও তেমন শাসন ছিল না। একমাত্র মা-ই কিছুটা শাসন করতেন।

মা যখন গলায় দড়ি দিয়ে মারা যান, তখন মনার বয়েস দশ। বাপ দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করে আনলেন।

তারপর যা হওয়ার তাই হল। মনা মাঝি পুরো উড়তে শুরু করল। লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পর্ক তো বহুকাল আগেই চুকে গেছিল। এখন তো পুরো ঘরছাড়া গরু। সঙ্গী হল ডোম আর বাগদিদের ছেলেপুলের দল৷ তাদের সঙ্গে রাতদিন খেলাধুলা করে, গাঙে ঝাঁপিয়ে মাছ ধরে, লোকের বাগান থেকে ফলপাকুড় চুরি করে, দিব্যি চলে যাচ্ছিল তার।

এগারোয় বিড়ি ধরে মনা মাঝি, তেরোয় চুল্লু, ষোলোয় গাঁজা। ক্রমে বাড়িতে আসা কমে যায় তার, দিনরাত শ্মশানে ঝোপেঝাড়েই পড়ে থাকত নেশা করে। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগও কমে যায়। বাড়ি যেত শুধু বাপের ওপর হুজ্জত করে নেশার পয়সা নিতে।

মনা মাঝির সৎমায়ের নাম ছিল শঙ্করী। শঙ্করী দুলে। বয়স অল্প, আঁটোসাটো শরীর, আর চলনে বলনে যেন দুলেপাড়ার উর্বশী। শঙ্করীর মায়ের খুব একটা সুনাম ছিল না গঞ্জের বাজারে। লোকে তাকে আড়ালে আবডালে যেসব নামে ডাকত, সেসব ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করা যায় না। শঙ্করীর বাপের পরিচয় কেউ জানত না। কু-লোকে বলত, শঙ্করীও ঠাটে ঠমকে লাস্যে কটাক্ষে তার মায়ের থেকে বেশি বই কম নয়। মনার বাপের মন কীসে মজেছিল সে কথা সবাই জানত, জানত না একমাত্র মনা নিজে।

এভাবেই দিন চলছিল। চলেই যেত, যদি না পাশের গ্রামের ঠাকুরপাড়ার নবীন সান্যালের মেয়ে ভুবনেশ্বরী তার চোখে পড়ে যেত চৈত্রের মেলায়।

এমন নয় যে মনোরঞ্জন আগে কখনও ভুবনেশ্বরীকে দেখেনি। কিন্তু যৌবন এলে চোখে অন্য রং ধরে। তাকে কবিরা বলেন মায়াঅঞ্জন, প্রাকৃতজনে বলে আশনাই। চৈত্রের সেই সর্বনাশী বিকেলে আশনাইয়ের রঙে মন রাঙিয়ে যখন ভুবনেশ্বরীকে দেখল মনোরঞ্জন, তখন তার আর কিছু করার ছিল না। তার সর্বনাশ হয়ে গেছে।

সেকালে প্রেম-পিরিতি ব্যাপারটা আজকালকার মতো অত সহজ-সুলভ-সার্বজনীন ছিল না। তাছাড়া জাতের কড়াকড়িও খুব ছিল। মনোরঞ্জন গিয়ে ধরল ভুবনেশ্বরীর প্রাণের সখী ললিতাকে। তাকে রীতিমতো একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড রেডিও কবুল করতে হল নিজের মনোবাসনাটি প্রিয়তমার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

কথায় বলে ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়। ললিতা হপ্তাখানেক বাদে ফিরে এসে বলল, অনেক চেষ্টার পর ভুবনেশ্বরী নিমরাজি হয়েছে বটে, তবে একটি কঠিন শর্ত দিয়েছে।

কী সেই শর্ত?

মনোরঞ্জন মাঝিকে নেশা-ভাং করা ছাড়তে হবে, কাজের খোঁজ দেখতে হবে, বদসঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। তবেই ভুবনেশ্বরী ভেবে দেখবে মনোরঞ্জন মাঝির গলায় মালা দেওয়া যায় কি না।

তরুণ বয়েসটাই এমন যে তখন সব অসম্ভবকেই সম্ভব বলে মনে হয়। হয়তো দুনিয়াদারির পাটোয়ারি বুদ্ধি তখন দেখার চোখ আর ভাবার মনটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে না, তাই। আর ভালোবাসার থেকে বড় উন্মাদনা, বড় শক্তি আর কী-ই বা হতে পারে? মনোরঞ্জন মাঝি কাজে লেগে গেল। তাকে ভুবনেশ্বরীর উপযুক্ত হয়ে উঠতেই হবে।

কিন্তু নেশা ছাড়ব বললেই ছাড়া যায় না। হঠাৎ করে নেশা করা বন্ধ করে দিলে খিঁচুনি, ঘুম না আসা, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া এসব লক্ষণ দেখা দেয়। তখনকার দিনে পাড়ায় পাড়ায় এত সাইকিয়াট্রিস্ট, ওষুধের দোকানে দোকানে উইথড্রয়াল সিম্পটম সামলানোর ট্যাবলেট এসবও পাওয়া যেত না। তা সত্ত্বেও মনোরঞ্জন গুনে গুনে ঠিক তিন সপ্তাহের মধ্যে সমস্তরকম নেশার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এল। আমি তখন বুঝিনি, এখন বুঝি, কী অসামান্য মানসিক শক্তি থাকলে তবেই লোকে এই অসাধ্য সাধন করতে পারে।

মনোরঞ্জনের বাবা ছেলের এই পরিবর্তনে খুশি তো হলেনই, এমনকী তদবির তদারক করে তাকে একটা কাজেও ঢুকিয়ে দিলেন। কী সেই কাজ?

গ্রামের সবচেয়ে বড়লোক হচ্ছে ঘোষালরা। গঞ্জের বাজারে বড় আড়ত, তিন-তিনটে মাছভরা দিঘি, চালকল, তেলকল, সার আর বীজের হোলসেল, সবমিলিয়ে রমরমা কারবার৷ মনোরঞ্জনের বাবা বলে কয়ে ছেলেকে ঘোষালদের বাড়ি কাজে ঢুকিয়ে দিলেন। কাজ তেমন কিছুই না, বড়কর্তা ভূপতি ঘোষালের ফাইফরমাশ খাটা।

এদিকে মনা মাঝির প্রেমও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। ললিতা প্রায়ই এসে খবর দিচ্ছে, মনোরঞ্জনের এই উন্নতিতে ভুবনেশ্বরী খুব খুশি। সে বলছে, আরও এক-দুটো বছর মনা আরেকটু শক্ত পায়ে দাঁড়ালেই ভুবনেশ্বরী নিজে বাড়িতে তার ব্যাপারে কথা বলবে। মনা মাঝি কাজে আরও মনপ্রাণ ঢেলে দেয়।

ভূপতি ঘোষালের বড় ছেলে ছিল ধূর্জটি ঘোষাল। যেমন দেখতে, তেমনই মুগুরভাজা শরীর৷ হিসেবপত্র, কাজেকর্মেও ভারি চৌকস। সব দিকে নজর, আর মানুষটিও তেমন খারাপ ছিল না। দেবদ্বিজে ভক্তি, দানধ্যানে মতি, কড়া হলেও যথেষ্ট বিবেচক লোক, মোটমাট সবমিলিয়ে আদর্শ ভালো লোক বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই।

কাজের সূত্রে মনোরঞ্জন মাঝির সঙ্গে ধূর্জটি ঘোষালের বেশ একটা অসমবয়সি বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এমনিতেও নেশা করা ছাড়া মনা মাঝির চুরিচামারি ইত্যাদি কোনও চরিত্রদোষ ছিল না। এমন সৎ, কর্মঠ, সদা হাস্যমুখ যুবকটিকে ধূর্জটি বেশ পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন। অবরে-সবরে তিনি নিজের কিছু এটা-ওটা কাজ দিতেন, তার জন্য আলাদা করে টাকাও দিতেন। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা গেল মনোরঞ্জন ভূপতি ঘোষালের অন্ধের যষ্ঠি হয়ে উঠেছে, তার ওপর ঘোষালবাড়ির কুলপ্রদীপ ধূর্জটি ঘোষালের ন্যাওটা।

এমন সময় একটা ঘটনা ঘটে গেল।

সেবার শীতকালের শুরুর দিকে এক পশলা অকাল বৃষ্টি হয়ে চাষিদের মাথায় হাত। ঘোষালবাড়িতেও উদ্বেগের ছায়া। ফসল নষ্ট হলে চাষিরা সার বীজের দাম শোধ দেবে কী করে? আর সেই নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করতে গিয়েই বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়ে বসল মনা মাঝি।

জ্বর মানে সে ধুম জ্বর। দু’দিন ধরে আচ্ছন্ন হয়ে রইল সে৷ তার সঙ্গে ক্রমাগত ভুল বকা। জানতে পেরে ভূপতি ঘোষাল নিজে উদ্যোগ নিয়ে বড় ছেলের সঙ্গে ডাক্তার পাঠিয়ে দিলেন। তখনও পেটেন্টেড ওষুধের যুগ শুরু হয়নি। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনমতো কম্পাউন্ডাররা দাগ কাটা, কাগজ সাঁটা, কর্কের মুখ আঁটা চ্যাপ্টা শিশিতে ওষুধ দিয়ে যেতেন। তার সঙ্গে বার্লি-সাবুর পথ্য। ধূর্জটি ঘোষাল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব করালেন। চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। কাজের লোকের জন্য কোন মালিক এতটা করে?

সেই প্রথম মনা মাঝির বাড়ির উঠোনে পা রাখলেন ধূর্জটি ঘোষাল। তারপর কী হল কেউ জানে না, সবাই অবাক হয়ে দেখল যে ধূর্জটিবাবু একাই মনা মাঝির চিকিৎসার সমস্ত ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। রোজই আসছেন, খোঁজখবর নিচ্ছেন। শঙ্করীর সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন৷ মাঝে মাঝে প্রায় দিনভরই পড়ে থাকছেন এখানে।

মনা মাঝি ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠে কাজে যোগ দিল। ধূর্জটি ঘোষালের কিন্তু আসা-যাওয়া বন্ধ হল না। ক্রমে গাঁয়ে কথা রটতে লাগল৷ সবই অবশ্য মনোরঞ্জনের অগোচরে। ধূর্জটির তখন একটাই পাখির চোখ, ভুবনেশ্বরীকে বধূবেশে ঘরে নিয়ে আসা।

ক্রমে বসন্তকাল এল। একদিন কাজ সেরে ঘোষালবাড়িতে এসে মনোরঞ্জন দেখল, ভূপতি ঘোষালের ঘরে ঘটক এসেছে। বড়গিন্নি গিরিজাসুন্দরীও উপস্থিত। আলোচনা বোধহয় তখন শেষের পথে। সারা ঘোষালবাড়ি জুড়ে একটা চাপা খুশির আমেজ। তাকে দেখতে পেয়ে ঘোষালগিন্নি হাতে একটা বড় রসগোল্লা দিয়ে বললেন, ‘ও মনা, একটা মিষ্টি খেয়ে যা বাপ।’

মনোরঞ্জন মিষ্টিটা গলাধঃকরণ করে জিগ্যেস করল, ‘কী খবর গো কাকিমা? কোনও খুশির খবর আছে নাকি?’

ঘোষালগিন্নি আলো-ঝলমলমুখে বললেন, ‘তোর বড়দাবাবুর বিয়ে ঠিক হল যে রে! এই তো এই জ্যৈষ্ঠেই। বাড়ির প্রথম বড় কাজ, তোদের ছাড়া তুলতে পারব না কিন্তু বাবা, আগে থেকেই বলে রাখলাম।’

সুখবরটা শুনে প্রায় উড়তে উড়তে উঠোনে নেমে এল মনোরঞ্জন। সাইকেলটা বার করে ভাবল বউভাতের নেমন্তন্ন তো বাঁধা, বরযাত্রীর লিস্টি থেকেও কি একেবারেই বাদ পড়বে সে? মনে তো হয় না। সে না গেলে বড়কর্তার খিদমত খাটবে কে? আর বিয়ে মাত্রেই যে হাজার মজা, কে না জানে।

সেকালে গাঁ-গেরামে বিয়ে একটা মস্ত ব্যাপার ছিল। আর তেমন তেমন বড়মানুষের বিয়ে হলে তো কথাই নেই। চারিদিকে যেন উৎসবই লেগে যেত।

কাজের মাসি গোপালি তখন একগাদা এঁটো বাসন নিয়ে পুকুরপাড়ে বাসন মাজতে যাচ্ছিল। তাকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘অ মনা, খবরটা শুনেছিস বাপ?’

মনোরঞ্জন উজ্জ্বল হেসে বলল, ‘শুনেছি গো মাসি। বলছি কনে কে, জানো নাকি?’

‘জানি বইকি। ওই তো ঠাকুরপাড়ার ভুবনেশ্বরী গো, নবীন সান্যালের মেয়ে।’

লোকে বলে, অত্যন্ত আকস্মিকভাবে চরম সর্বনাশের সংবাদ পেলে মানুষের বোধ নাকি সাময়িকভাবে লোপ পেয়ে যায়। মনোরঞ্জনের মনে হল হঠাৎই যেন তার তলপেটে কে একটা সজোরে ঘুষি মেরেছে, এক ঝটকায় তার বুকের হাওয়া কেড়ে নিয়েছে কেউ। নিঃশ্বাস পৌঁছচ্ছে না তার পাঁজরায়, কানের মধ্যে শোঁ-শোঁ আওয়াজ, হাঁটুদুটো নিমেষে দুর্বল, যেন এখনই পড়ে যাবে সে।

কোনওমতে নিজেকে সামলে পালটা প্রশ্ন করল মনা মাঝি, ‘কার নাম বললে মাসি?’

‘কানে কি ক্যারাপোকা হইচে নাকি রে ছোঁড়া? বললাম যে, নবীন সান্যালের মেয়ে ভুবনেশ্বরী।’

মনা মাঝি কীভাবে তার সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে গেল, সেটা যদি সেদিন মন দিয়ে দেখত গোপালি, তাহলে হয়তো একটা অনর্থ এড়ানো গেলেও যেতে পারত।

সেইদিন মনোরঞ্জন সোজা গেছিল ললিতার বাড়ি। গিয়ে জেনেছিল ললিতা বাড়িতে নেই। সে গেছে ভুবনেশ্বরীর কাছে। সেখান থেকে সাইকেল চালিয়ে ভুবনেশ্বরীর বাড়িতেও গেছিল মনা মাঝি৷ তখন সেই বাড়ি জুড়েও আনন্দের আমেজ। ঘোষালদের সমকক্ষ না হলেও, নবীন সান্যালেরও পয়সাকড়ি কম নয়। মনোরঞ্জন দূর থেকেই ঝাপসা চোখে দেখতে পেল সান্যালবাড়িতে একে একে ঢুকছে উল্লসিত আত্মীয়দের দল। পাঁচিলের ওপার থেকে ভেসে আসছে হাসি-গান-আনন্দের কলতান।

একটা আমগাছের নীচে হাত-পা ছেড়ে বসে পড়েছিল মনোরঞ্জন। কতক্ষণ, সে নিজেও জানে না। হয়তো খিদেয় বা ক্লান্তিতে বা হতাশায় চোখ লেগে এসেছিল তার। হুঁশ ফিরল কাঁধে একটা টোকা পেয়ে।

সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বলল, ‘ললিতা… তুই… এসব… কবে… কী করে?’

ললিতার তর্জনী তার ঠোঁটের কাছে উঠে এল। সাপের মতো হিসহিসানি স্বরে সে বলল, ‘যা হয়েছে ভুলে যাও মনাদা। ভুবনেশ্বরীর বিয়ে ঠিক হয়েছে ঘোষালদের বড় ছেলের সঙ্গে। এর মধ্যে দয়া করে তুমি আর গোল পাকিও না।’

মনোরঞ্জন বিহ্বলভাবে বলল, ‘কিন্তু ও যে কথা দিয়েছিল…’

মনোরঞ্জনের অবস্থা দেখে বোধহয় সামান্য অনুকম্পা হল ললিতার। সে সামান্য গলা নামিয়ে বলল, ‘বড়লোকের বেটিরা মনের খেয়ালে অমন অনেক কথা দিয়ে থাকে মনাদা। ওসব ধরতে নেই। তাদের অমন অনেক প্রেমের শখও হয়, তারপর ভালো ঘর থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এলে সেসব শখ মিটেও যায়। ধরে নাও তুমিও ভুবি-র একটা শখ ছিলে। এবার ওঠো, এ নিয়ে আর গোল কোরো না! দোহাই তোমার।’

মনোরঞ্জন স্খলিতস্বরে আবারও বলল, ‘কিন্তু ও যে কথা দিয়েছিল…’

ললিতা অনুনয়ের সুরে বলল, ‘এ যে হওয়ার নয় সে তোমার বোঝা উচিত ছিল মনাদা। একে ওরা বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ, আর তুমি নিচুজাত। তার ওপর যে ঘোষালবাড়িতে চাকর হিসেবে কাজ করো, সেই বাড়িতেই বউমণি হয়ে যাবে ভুবি। তুমি সত্যিই ভাবছ যে এসব ছেড়ে ও তোমাকে বিয়ে করবে? দোহাই তোমার! তুমি এবার সুস্থ হও, বাড়ি যাও। আমি কাল তোমার সঙ্গে আলাদা করে দেখা করে যা বলার বুঝিয়ে বলব। এখনকার মতো তুমি যাও লক্ষ্মীটি।’

মনোরঞ্জন মাঝি ল্যাগব্যাগ করতে করতে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে লাগল। তখন তার মাথার ভেতরে সব ফাঁকা। সে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কেউ জানে না।

বিড়ালকে নাকি কোথাও দূরে ফেলে দিয়ে এলে সে ঠিকই তার নিজের ঠাঁই খুঁজে খুঁজে ফিরে আসে। মনা মাঝিও অর্ধ অচৈতন্য অবস্থায় তার নিজের ঠাঁই খুঁজে ফিরে এসেছিল সেই ভয়ংকর কালসন্ধ্যায়।

বাড়ি ফিরে এসেছিল মনা মাঝি। চুপচাপ! নিঃশব্দ! সাইকেলটা সযত্নে নামিয়ে রেখেছিল বেড়ার গায়ে৷ আহা, ওর গায়ে যেন কষ্ট না লাগে, যেমন তার লেগেছে আজ।

তারপর ধীরে ধীরে, চুপি পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল সে। সে ঘরে তখনও একটা আবছা আলো জ্বলছিল। কুপির আলো। যত না আলো, তার থেকে বেশি ধোঁয়া, তার থেকে বেশি অন্ধকার।

হুঁশে থাকলে হয়তো দূর থেকেই হাসি-শীৎকারের আওয়াজগুলো শুনতে পেত মনা। কিন্তু তখন সে একজন হাঁটতে থাকা মৃত মানুষ বললেই চলে। তার মন, বুদ্ধি, চেতনা, সব যেন মরে গেছে কত কয়েক ঘণ্টায়।

নিজের শেষ হয়ে যাওয়া শরীরটা টেনে টেনে ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল মনোরঞ্জন। বন্ধ দরজার ওপাশে আরও উচ্চকিত সেই আনন্দের উচ্ছ্বাস আর সহ্য হল না তার। এক লাথিতে সে খুলে ফেলল ঘরের দরজা।

পরের দৃশ্যটা দেখার জন্য বোধহয় মনা মাঝি বা ওরা, কেউই প্রস্তুত ছিল না। নিজের বাপের বিছানায় সৎমা শঙ্করী আর ধূর্জটি ঘোষালকে একসঙ্গে দেখে নিশ্চয়ই মাথার মধ্যে কিছু উন্মত্ত বিক্রিয়া হয়ে থাকবে তার। নইলে লাফিয়ে পড়ে ধূর্জটি ঘোষালের টুঁটি চিপে ধরবে কেন সে? তবে ধূর্জটি ঘোষালের এক ঘুষিতে জ্ঞান হারিয়েছিল সে, এটুকুই শেষ মনে আছে তার।

সেই রাতে ঠিক কী হয়েছিল, নিজেও জানে না মনোরঞ্জন মাঝি। শুধু জানে পরের দিন তাকে মাথা কামিয়ে, মাথায় ঘোল ঢেলে গ্রামের বাইরে বার করে দেওয়া হয়েছিল। আর তার কপালে লেপে দেওয়া হয়েছিল নিজের সৎমায়ের ওপর মন্দ অভিপ্রায়ে চড়াও হওয়ার অনপনেয় কলঙ্ক!