শেষ অশুভ সংকেত – ১৯

ঊনিশ

হারভি ডীন অফিসে পৌঁছে দেখল একদল সাংবাদিক এলিভেটরের সামনে তার জন্যেই অপেক্ষা করছে চোখ তুলে সিকিউরিটির লোকজনের দিকে চাইল সে—ওরা কাঁধ উঁচিয়ে অসহায় ভঙ্গি করল। প্রেসের লোকজন কিভাবে ভিতরে ঢুকল এ নিয়ে চিন্তা করে আর লাভ নেই।

কোনরকম সৌজন্য বা রীতি না মেনে সাংবাদিকরা ওকে হেঁকে ধরল।

‘শ্রোতার কি থর্নের লোক ছিল?’ প্রশ্ন করল একজন।।

‘আমি দুঃখিত,’ বলল ডীন। ‘এই মুহূর্তে আমার কোন বক্তব্য নেই।‘ ভিড়ের ভিতর দিয়ে ঠেলে এগিয়ে লিফটের বোতাম টিপল সে।

আর একজন জানতে চাইল, ‘অ্যামব্যাসেডরের সাথে আমাদের কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না কেন?’

‘কারণ তিনি এখন উপস্থিত নেই।’ লিফটের দরজার দিকে অধীর অপেক্ষায় চেয়ে আছে ডীন ওটা খুললেই সে বাঁচে।

‘অ্যামব্যাসেডর কোথায়?’

ওদের কোন তথ্যই জানানো হয়নি—কিছুই না। দরজাটা খুলে যেতেই কৃতার্থ হয়ে লিফটে ঢুকল ডীন। সিকিউরিটির লোক সাংবাদিকদের ঠেকিয়ে রাখল।

লিফটের ভিতর নিরাপদ দূরত্ব থেকে সে জবাব দিল, ‘অ্যামবাসেডর বিবৃতি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত হলে আমরা আপনাদের খবর দেব।

সবাই একসাথে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে হট্টগোল বাধাল। কিন্তু ওদের মুখের ওপর লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। উপরে ওঠার পথে পকেট থেকে রুমাল বের করে ভুরু মুছল ডীন।

সেক্রেটারিদের উপেক্ষা করে মাটির দিকে চেয়ে হনহন করে এগিয়ে অফিসের দরজা খুলেই আড়ষ্ট হয়ে গেল। ডেস্কের পিছনে ডেমিয়েন বসে আছে। এই মুহূর্তে ওর মুখোমুখি হবার জন্যে ও প্রস্তুত ছিল না।

‘আমি ভেবেছিলাম আপনি এখনও বাসায়,’ বলল সে।

কোন কথা বলল না ডেমিয়েন।

‘প্রেসের লোকজন শ্রোয়ডারের ব্যাপারে একটা বিবৃতির জন্যে পাগল করে তুলছে।’ বলে চলল সে, ‘মনে হয় বুহেরের সাথে আলাপ না করা পর্যন্ত ওদের আমি ঠেকাতে পারব। কিন্তু তারপর আপনাকে…

‘গতকাল ডি কার্লো তোমার বাসায় কি করছিল?’ একটানা সুরে কথা ক’টা বলার সময়ে ডেমিয়েনের চেহারা একটুও বদলাল না।

‘কে?’ এবার কিন্তু ভণিতা করছে না ডীন। ডি কার্লো লোকটা যে কে তা সত্যিই জানে না ও।

রেগেছে ডেমিয়েন। উঠে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে। ‘ভাঁওতাবাজি ছেড়ে সত্যি কথাটা বল।’

কাঁধ ঝাঁকাল ডীন। কি বলবে সে?

মাথা নাড়ল ডেমিয়েন। ওর দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে একবার চেয়ে ঘুরে হাঁক দিল, ‘পিটার!

পাশের একটা দরজা খুলে গেল। দরজার সামনে ছেলেটা যেন স্বপ্নের ঘোরে আছে এইভাবে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল সে।

‘বলে যাও, পিটার,’ নরম স্বরে বলল ডেমিয়েন।

পিছনের পকেট থেকে একটা নোট বই বের করে খুলল ছেলেটা। কোর্টে পুলিশ যেভাবে সাক্ষী দেয় সেও ঠিক সেই সুরে বলতে আরম্ভ করল।

‘গতকাল বিকেল সাড়ে তিনটায় প্রীস্ট ডি কার্লোকে আমি ১১৩ অ্যাবে ক্রেসেন্ট-এ যেতে দেখেছি। ওখানে এক ঘন্টা বিশ মিনিট মিস্টার ডীনের স্ত্রীর সাথে কথা বলেছে সে।’

সংযম হারাল ডীন। উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল ওর চেহারায়। ডেমিয়েনের দিকে ফিরল সে। ‘আমি জানতাম না লোকটা কে। অর্থাৎ বারবারা আমাকে বলেনি…’

‘তোমার ছেলেকে ধ্বংস কর।

মাথা নেড়ে পিছিয়ে গেল ডীন। ওর মুখটা খোলা কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না। ‘একটা ছেলেই মাত্র বাকি রয়েছে,’ বলল ডেমিয়েন। আর সেটা হচ্ছে তোমার ছেলেটা,’ শান্ত কণ্ঠস্বর ওর। ‘ওকে শেষ কর, নইলে তুমি নিজেই শেষ হবে।’

আবার মাথা নেড়ে দরজার দিকে পিছিয়ে গেল ডীন। আতঙ্কগ্রস্ত ভাবে সে বলল, ‘না, না…’ এখনও মাথা নাড়ছে ও। কি বলছে নিজেও জানে না। ঈশ্বরের দোহাই, ডেমিয়েন….

তাকে উপেক্ষা করে ডীন খোদায় বিশ্বাস করছে দেখেও হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল ডেমিয়েন। ‘ঈশ্বর ইব্রাহিমকে বললেনঃ ‘তোমার সবচাইতে প্রিয়পাত্র তোমার পুত্রকেই আমার নামে কোরবানি দাও।

দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল ডীন। দেয়ালে পিঠ ঘসে দরজার দিকে সরে যাচ্ছে। হাতল ধরার জন্যে অন্ধের মত হাতরাচ্ছে সে।

ইব্রাহিম নিজের ছেলেকে কোরবানি দিতে প্রস্তুত হয়েছিল তার প্রভুর প্রতি ভালবাসার প্রমাণ দিতে,’ বলে চলল ডেমিয়েন। ওর চোখ দুটো ডীনের চোখ দুটোর ওপর স্থির ভাবে আবদ্ধ। আমার প্রতি আনুগত্য দেখাতে তুমিও কেন ছেলেকে আমার নামে বলি দাও না?’

কথা জোগাচ্ছে না ডীনের। মুখের ভিতর জিভটা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। কেবল পা দুটোই যেন ঠিকমত কাজ করছে। হেঁচকা টানে দরজা খুলে সম্ভ্রম ভুলে দৌড়ে ছুটে পালাল এলিভেটরের দিকে।

ওকে চলে যেতে দেখে ডেমিয়েনের দিকে চাইল পিটার।

‘ওকে থামাচ্ছ না কেন তুমি?’ প্রশ্ন করল সে।

মাথা নাড়ল ডেমিয়েন। ‘কোন প্রয়োজন নেই,’ শান্ত কণ্ঠে বলল সে

বিবাহিত জীবনে এই প্রথম এক ছাদের তলায় থেকেও আলাদা রাত কাটাল বারবারা। কাওচটা বাচ্চার ঘরে টেনে নিয়ে ওখানেই ঘুমিয়েছে সে। রাতে তিনবার উঠে দেখেছে ওর বাচ্চাটা ঠিক আছে কিনা।

সকালে নাস্তা খেতে বসেও দু’জনের কেউই বিশেষ কথা বলেনি। বারবারার যা বলার তা সে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। হারভি যাক বা না যাক সে বাচ্চা নিয়ে আজ সন্ধ্যার মধ্যেই বাসা ছাড়বে।

ফোন রেখে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকাল সে। মহিলা কিছুদিনের জন্যে তাকে জায়গা দিতে রাজি হয়েছে। ক্যারলের ওখানেই পরিচয়-ওরা সাসেক্স-এ থাকে। বারবারাকে ওদের ওখানে বেড়াতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল—বারবারাও অফারটা লুফে নিয়েছে।

ৰাচ্চাটা জানালা ঘেঁষে ক্যারি-কটে শোয়ানো রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক —কিছু কাপড় ইস্তিরি করে প্যাকিং করা বাকি। ইস্তিরি করার বোর্ড বের করে স্টীম ইস্তিরিতে পানি ঢালল বারবারা। জানালা দিয়ে বাঁকা হয়ে রোদ ঘরে ঢুকছে: বাচ্চাটা হাত বাড়িয়ে ওটাই ধরার চেষ্টা করছে আর মুখ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ করছে।

কাজ করতে করতেও বারবার সে চেয়ে দেখছে বাচ্চার দিকে। দু’বার কাছে গিয়েও দেখে এসেছে। দ্বিতীয়বার দেখেছে বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সব কাজ শেষ হবে। বাচ্চা নিয়ে সে রওনা হবে সাসেক্সের পথে। এর মনে আশা রয়েছে হয়ত হারভিও যাবে তার সাথে।

কুকুরটা নিঃশব্দে ঘাসের উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট পথে এগোচ্ছে সে। হীথের ধারে এসে একটু থামল। মুখ তুলে বাতাসে কি যেন শুঁকল, তারপর আবার এগিয়ে চলল। কোন বাচ্চা বা অন্য কোন কুকুর ওটার কাছে ঘেঁষছে না! সোজা একটা বাসার গেটের সামনে গিয়ে কুকুরটা থামল। ঘাড়ের কাছে ছোট পশমগুলো দাঁড়িয়ে উঠেছে, দাঁত বের করে গরগর শব্দ তুলে ভেঙচি কাটল একবার, তারপর বাড়িটার পাশে গিয়ে আর একবার ঘ্রাণ নিয়ে সোজা রান্নাঘরের জানালার ধারে দুই পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। খোলা জানালা দিয়ে কুকুরের হলুদ চোখ জোড়া একদৃষ্টে বাচ্চাটার দিকে চেয়ে রয়েছে। জিভ থেকে ফোঁটা ফোঁটা লালা কম্বলের ওপর ঝরে পড়ছে।

বারবারা চিৎকার করে উঠতেই মুখ তুলে ওর দিকে এক মুহূর্ত চেয়ে থেকে নিচে নেমে ধীর গতিতে দৌড়ে ফিরে চলল। ওর কাজ শেষ হয়েছে।

দড়াম করে জানালা বন্ধ করল বারবারা। এক হাতে বাচ্চার দুধের বোতলটা ঝাঁকিয়ে খাওয়ানোর আগে ভাল করে মিশিয়ে নিচ্ছে। বুকের ভিতরটা এখনও টিপটিপ করছে-কুকুরটাকে হঠাৎ ওখানে দেখে ভীষণ ভয় পেয়েছে। আড়চোখে বাচ্চার দিকে চাইল সে। বাচ্চাটা ঘুমের মধ্যে উল্টে গিয়ে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। একটু পরে পরেই গা ঝাড়া দিচ্ছে, যেন স্বপ্নের মধ্যে ছুটছে।

‘ওঠ, খোকন, কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিয়েছি-আর ভয় নেই,’ বলল সে।

ঝুঁকে বাচ্চাটাকে সোজা করে দেখল ওর মুখটা বুড়ো মানুষের মত কুঁচকান, চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে, চামড়ায় ভাঁজ-ব্রাউন দেখাচ্ছে। বাচ্চাটা মায়ের দিকে চেয়ে দুর্বল একটা হাত বাড়াল। গলা চেরা চিৎকার দিয়ে পিছিয়ে গেল বারবারা। বোতলটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে দুধ গড়াচ্ছে। কিছু একটা ধরার জন্যে হাত বাড়িয়ে ইস্তিরিটার ওপর ওর হাত পড়ল। মরণাপন্ন চোখে বারবারার দিকে চেয়ে নেতিয়ে পড়ল বাচ্চাটা।

*

পুলিশের মোটরসাইকেলের পিছন পিছন ট্র্যাফিক কেটে হীথের দিকে এগোল ডীন। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে গিয়ে ট্র্যাফিক লাইট লাল থাকা সত্ত্বেও থামেনি দেখে পুলিশটা থামিয়েছিল ওকে। ডিপ্লোম্যাটিক নাম্বার প্লেট দেখে ডীনের অজুহাত মেনে নিয়ে প্রমোশনের সুপারিশ পাওয়ার আশায় ওকে এসকোর্ট করে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ।

বাড়ির ড্রাইভওয়েতে পৌঁছে পুলিশটার হাত নেড়ে বিদায় নেয়া উপেক্ষা করে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতর ঢুকল। বারবারা খুশি হবে, ভাবল সে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এখন ভাল বোধ করছে। অন্তত এখন আর ওর মনে দ্বন্দ্ব নেই। বৌ আর ছেলেকে নিয়ে সে পালাবে ঝুঁকি নিয়ে দেখবে কি হয়।

‘বারবারা?’

বাড়িটা নীরব। রেডিও বাজছে না, কোন নড়াচড়ারও শব্দ নেই। একটু চিন্তিত হয়ে বসার ঘরে ঢুকল সে।

‘বারবারা?’

রান্নাঘরের দরজা ঠেলে দেখল ইস্তিরির টেবিলটার পাশে ওর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে বারবারা। ক্যারিকটের দিকে চেয়ে দেখল বাচ্চার একটা হাত শূন্যে স্থির হয়ে রয়েছে—হাতের আঙুলগুলো আড়ষ্ট।

‘কি ব্যাপার, বারবারা? আমার ডাক শুনতে পাওনি?’

তবু ফিরে চাইল না মেয়েটা। বিরক্তিতে মুখ গোমড়া করে আগে বাড়ল ডীন ‘নাও, তাড়াতাড়ি সবকিছু গুছিয়ে ফেল। আমরা….’

এবারে ফিরল বারবারা। স্তম্ভিত হয়ে থমকে দাঁড়াল ডীন। ওর চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল হয়ে রয়েছে; মুখটা প্রতিহিংসায় বিকৃত। সে পিছিয়ে যাবার আগেই বারবারা ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। গরম ইস্তিরির চোখা কোনাটা ডীনের চোখ ভেদ করে মগজে ঢুকে গেল।

ওর অন্তিম কাতরোক্তির সাথে মিশে গেল পানির ছোঁয়ায় ইস্তিরি ঠাণ্ডা হবার ‘হিস্’ শব্দ। ডীনের প্রাণহীন দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। গলে যাওয়া চোখের গর্ত দিয়ে ঘন রস গড়িয়ে পড়ছে।

সাবধানে ইস্তিরিটা টেবিলের ওপর উঠিয়ে রাখল বারবারা। কাঁধ ছুঁয়ে ঝুঁকে ওর মুখের দিকে চাইল। চোখের ফুটো দিয়ে মগজের কেন্দ্র পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। উঠে একটা পরিষ্কার কাপড় ভিজিয়ে এনে যত্ন করে স্বামীর মুখটা মুছে পরিষ্কার করল। তারপর বাচ্চার কাছে গিয়ে ওর বাড়ানো হাতটা ধরে থেঁতলান মুখটার দিকে চেয়ে বসে রইল।

অল্পক্ষণ পরে নিজের মনেই হেসে উঠল সে। বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে বারবারা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *