বাঙলার মুসলমান সমাজ

বাঙলার মুসলমান সমাজ

এবার আমরা মধ্যযুগের বাঙলার সমাজ সম্বন্ধে কিছু বলব। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বাঙলা বিজিত হবার পর, বাঙলায় বেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ এক মুসলমান সমাজ গড়ে ওঠে। তবে এটা ভাবলে ভুল হবে যে, বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বাঙলা বিজিত হবার পূর্বে বাঙলায় মুসলমান ছিল না। আরবদেশীয় বণিকগণ, যারা বাঙলার সঙ্গে বাণিজ্য করত, তারা চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটা মুসলমান উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। তবে বাঙলায় সমগ্র জনসমাবেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা নগণ্য।

বখতিয়ার খিলজি একহাতে কোরান ও অপর হাতে অসি নিয়েই বাঙলায় প্রবেশ করেছিল। সুতরাং গোড়া থেকেই আগন্তুক মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুর মঠ মন্দির ও প্রতিমা ভাঙার ও ধর্মান্তর-করণের এক উন্মদনা ছিল। সঙ্গে তাদের স্ত্রীলোকও কম ছিল। সেজন্য এদেশের মেয়েদের বিয়ে করা তাদের পক্ষে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্রাহ্মণদের আত্মশ্লাঘা ও হিন্দুসমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষের প্রতি অবিচার মুসলমানদের ইসলাম ধর্ম প্রচারে সাহায্য করেছিল। অনেককে অবশ্য বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হত। কিন্তু নিম্নশ্রেণির হিন্দুদের অনেকেই ইসলামের সাম্যবাদে আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত। অনেকে আবার পীর, ফকির ও মুসলমান সাধুসন্তদের মহিমায় আকৃষ্ট হত। এ ছাড়া ছিল ধর্ষিতা, লুণ্ঠিতা, অপহৃতা, পদস্খলিতা নারী। হিন্দুসমাজে তাদের কোন স্থান ছিল না। কিন্তু যে যদি মুসলমান হয়ে যেত, তা হলে সে মুসলমান সমাজে বিবির আসন পেত। বাঙলার অধিকাংশ মুসলমানই এই তিন শ্রেণির। বাঙলার জনসমুদ্রে এরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর মধ্যে ছিটেফোঁটা হিসাবে ছিল কিছুসংখ্যক বহিরাগত মুসলমান। বস্তুতঃ বাঙলার মুসলমান বাঙালীই, মাত্র ধর্মের তফাত। (লেখকের ‘বাঙলার নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’, জিজ্ঞাসা, দ্রষ্টব্য)।

বখতিয়ার খিলজি আসবার দু’শ বছর পর পর্যন্ত বাঙলায় চলেছিল বিপর্যয়ের এক তাণ্ডবলীলা। নিষ্ঠুরভাবে চলেছিল হিন্দু-নিপীড়ন, হিন্দুর মঠ-মন্দির ও প্রতিমা ভাঙা ও ধর্মান্তরকরণের ঢেউ। গোড়ায় যে নূতন শাসনতন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল, তাতে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের স্থান ছিল, হিন্দুদের ছিল না। এ ছাড়া, হিন্দুদের ওপর নানারকম বৈষম্য ও ঘৃণিত জিজিয়া কর স্থাপন করা হয়েছিল। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে যখন মুসলমান সুলতানরা হিন্দুর মেয়েকে বিয়ে করতে থাকে। (পরে দ্রষ্টব্য) সেটা প্রথম শুরু হয় সুলতান ইলিয়াস শাহ-এর আমল (খ্রিঃ ১৩৪২-১৩৫৮) থেকে। তার পর থেকেই পর পর কয়েকজন সুলতান হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করে। তাদের আমলে হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস ক্রমশ হ্রাস পায় ও অনেক হিন্দুকে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত করা হয়। এতে সাধারণ হিন্দুদেরও মনোবৃত্তির পরিবর্তন ঘটে। সুলতানের পক্ষ নিয়ে হিন্দু সৈন্যরা ওড়িশা অভিযানে যোগ দেয়। রাজস্ব আদায়ের জন্য অনেক হিন্দু জমিদার নিযুক্ত হয়। অনেক ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য ও অন্যশ্রেণির হিন্দুরা রাজানুগ্রহ লাভ করে। সুলতানদের দরবারে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের স্থান হয়। বৃহস্পতি মিশ্র একাধিক মুসলমান সুলতানের মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সুলতান হুসেন শাহের আমলে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) যশোহর নিবাসী ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ মহাপণ্ডিত ও মহাকবি সনাতন ও তাঁর ভাই রূপ যথাক্রমে ‘দবীর-খাস’ ও ‘সাকর মল্লিক’ ছিলেন। তাঁদের অপর ভাই অনুপ (নামান্তর বল্লভ) ‘মুদীর-ই জবর’ ছিলেন। ‘দবীর-খাস’ মানে গোপন-সচিব। সাকর মল্লিক ‘প্রধান অমাত্য’ ‘মুদীর-ই- জবর’ মানে ‘মাস্টার অভ্ মিন্ট’ ইত্যাদি। হুসেন শাহের দুই যুদ্ধাভিযানের সেনাপতি ছিলেন দুই বাঙালী হিন্দু। তাঁদের মধ্যে একজন গৌরমল্লিক পরিচালনা করেছিলেন ত্রিপুরা অভিযান। আর একজন সেনাপতি রামচন্দ্র খান রাজ্যের দক্ষিণাংশের অধিকর্তা ছিলেন। এছাড়া, রাজ-অন্তঃপুরে হিন্দু বৈদ্যদেরও চিকিৎসা করতে দেওয়া হত। এ সময় সুলতানদের অনুগ্রহে বহু হিন্দু কবি তাঁদের কাব্য রচনা করেছিলেন। তাঁদের কথা অন্য অধ্যায়ে বলেছি।

সরকারী রাজস্ব বিভাগেরও অনেক হিন্দু নাম অবলুপ্ত করা হত না। আইন-ই-আকবরী অনুযায়ী তুর্ক-আফগান যুগের শেষপাদে বিদ্যমান ১৯টি সরকারী রাজত্ব বিভাগের মধ্যে ১০টির হিন্দু ও ৯টির মুসলমান নাম ছিল। আবার অনেক সময় হিন্দু নামের সঙ্গে মুসলমান শব্দ ও মুসলমান নামের সঙ্গে হিন্দু শব্দ যোগ করে দেওয়া হত। যথা, রাজশাহী, মহম্মদপুর বারবাকপুর ইত্যাদি।

দুই

যেহেতু বাঙলা ছিল গ্রামপ্রধান দেশ ও গ্রামের মুসলমানরা ছিল ধর্মান্তরিত মুসলমান, সেই হেতু তারা ধর্মান্তরিত হবার পর তাদের পূর্বেকার হিন্দুজীবনের সনাতনী সংস্কার ও লোকাচারসমূহ অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণ করত। যেমন, জন্মের পর জ্যোতিষীকে দিয়ে পুত্রের কোষ্ঠী তৈরি করানো ও বিবাহের সময় জ্যোতিষীকে দিয়ে শুভদিন বিচার করিয়ে নেওয়া। পুরুষদের চেয়ে মেয়েরাই সনাতনী সংস্কারের বেশী বশীভূত ছিল। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হিন্দুদের নানাবিধ মামুলী সংস্কার মানত ও শিশু জন্মের পর হিন্দুনারীদের মতো নানাবিধ অনুষ্ঠান পালন করত। এছাড়া, মুসলমানরা শীতলা, ওলাইচণ্ডী প্রভৃতি দেবতার স্থানে পূজা ও হিন্দুদের পূজা ও শুভ অনুষ্ঠানে যোগ দিত। অনেকে ধর্মান্তরিত হবার পরও হিন্দুনাম পরিহার করত না। কালু শেখ, হারু শেখ ইত্যাদি নাম মুসলমানদের মধ্যে সচরাচর দেখতে পাওয়া যেত। মালতী নামে এক মুসলমান মহিলা এক মসজিদ তৈরি করে দিয়েছিলেন। শুভোধন নামে এক মুসলমান তন্তুবায়ের নামও আমরা শুনি। ধর্মান্তরিত হবার পর অনেক মুসলমান তাদের পূর্বেকার কৌলিক বৃত্তি পরিহার করত না।

বস্তুতঃ গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান সদ্ভাবেই বাস করত। পরস্পর পরস্পরকে ‘চাচা’, ‘চাচী’ প্রভৃতি সম্ভাষণে সম্বোধন করত। এ সম্বন্ধে কৃষ্ণদাস কবিরাজের “চৈতন্যচরিতামৃত’তে একটি বেশ চিত্তাকর্ষক ঘটনার উল্লেখ আছে। চৈতন্য রোষান্বিত হয়ে যখন কাজীর বাড়ি চড়াও হন, তখন কাজী চৈতন্যের মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন—গ্রাম সম্পর্কে চক্রবর্তী হয় মোর চাচা। দেহসম্বন্ধ হইতে হয় গ্রাম-সম্বন্ধ সাঁচা ॥ নীলাম্বর চক্রবর্তী হয় তোমার নানা। সে সম্বন্ধে হও তুমি আমার ভাগিনা ॥ গ্রামে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এই সম্প্রীতি গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। মাত্র বিংশ শতাব্দীতে নানা কারণে এই সম্পর্কের বিচ্যুতি ঘটেছে।

তিন

হিন্দুদের প্রতি বাঙলার সুলতানদের বিদ্বেষভাব হ্রাস পেতে থাকে। যখন মুসলমান হিন্দুমেয়ে বিয়ে করতে থাকে। এটা শুরু হয়েছিল সুলতান ইলিয়াস শাহের সময় (খ্রিঃ ১৩৪২-১৩৫৮) থেকে। তিনি বিয়ে করেছিলেন বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামের ফুলমতি নামে এক বামুনের মেয়েকে। তাঁর পরবর্তী সুলতান সিকন্দর শাহ ও (খ্রিঃ ১৩৫৮-১৩৯০) বিয়ে করেছিলেন এক হিন্দু মেয়েকে। তাঁর হিন্দুপত্নীর গর্ভজাত সন্তান হচ্ছেন পরবর্তীর সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ (খ্রিঃ ১৩৯০-১৪১০)। আবার রাজা গণেশ বা দনুজমর্দনদেব (খ্রিঃ ১৪১৪-১৪১৫) গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ-এর বিধবা পত্নী ফুলজানিকে বিয়ে করেছিলেন। পরবর্তী সুলতান যদু জয়মল্ল বা সুলতান জালালুদ্দিন মহম্মদ শাহ (খ্রিঃ ১৪১৮-১৪৩৩) গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ-এর কন্যা আশমানতারাকে বিয়ে করেছিলেন। এক কথায় মুসলমান সুলতানরা যেমন হিন্দুর মেয়েকে বিয়ে করতেন, হিন্দুরাও তেমনই মুসলমানের মেয়েকে বিয়ে করতেন, বলে মনে হয়। এই যুগে এরূপ বিবাহ প্রায়ই ঘটত। ভাতুড়িয়ার ব্রাহ্মণ মদন ভাদুড়ীর পত্র কন্দর্পদের সুলতান হুসেন শাহ-এর (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) এক মেয়েকে বিবাহ করেছিলেন। বোধ হয় মদন ভাদুড়ীর একাধিক পুত্রের সঙ্গে মুসলমান কন্যার বিবাহ হয়েছিল। সুলতান হুসেন শাহ-এর এক উজির চতুরঙ্গ খানও এক মুসলমান কন্যার পাণিগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর গর্ভজাত দুই পুত্র সুবি খান ও সুচি খান খুলনা জেলার সেনের বাজারের কাজী নিযুক্ত হয়েছিল। এই কাজী পরিবার হিন্দু-কুলোদ্ভব বলে গর্ব অনুভব করত। এরূপ হিন্দু-মুসলমান বিবাহের ফলই পীরালি ব্রাহ্মণ। কথিত আছে যে পনেরো শতকের মাঝখানে এক ব্রাহ্মণ পীরজাহান আলি দ্বারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। দীক্ষার পর তাঁর নাম হয় তাহের আলি। তাঁর দুই স্ত্রী ছিল। একজন মুসলমান। অপরজন হিন্দু। হিন্দু-স্ত্রীর ছেলেরাই পীরালী ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। আর মুসলমান স্ত্রীর পুত্ররা নিজেদের তাহেরিয়া নামে অভিহিত করে। যে পীরজাহান আলি, তাহের আলিকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন, তিনি নিজেও সোনামণি নামে এক হিন্দুমেয়েকে বিবাহ করেছিলেন। মেয়েটি স্বামীর মৃত্যুর পর আত্মঘাতী হয়েছিল। পীর ফকিররা অনুরূপভাবে প্রায়ই হিন্দুমেয়েদের বিবাহ করতেন। এরূপ এক ফকির সাতক্ষীরার রাজা মুকুটরাজকে নিহত করে রাজকন্যা চম্পাবর্তীকে বিয়ে করেছিলেন। এরূপ বিবাহের পর হিন্দু মেয়েরা অনেক সময়েই তাঁদের পতিভক্তির জন্য প্রসিদ্ধা হয়ে রয়েছেন। দৃষ্টান্ত র স্বরূপ পরমবৈষ্ণব আন্দময়ীর উল্লেখ করা যেতে পারে। আনন্দময়ী মুর্শিদাবাদের মূর্তজা খানকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর পতিভক্তি অনেক ছড়াগানের মাধ্যমে লোকমানসে এখনও জাগরুক হয়ে রয়েছে।

চার

হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের এক বিরাট পার্থক্য ছিল বিবাহ ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধানে। হিন্দুদের ন্যায় মুসলমান সমাজেও বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল, তবে হিন্দুদের স্ত্রী-গ্রহণের যেমন কোন পার্যন্তিক সীমা ছিল না, মুসলমান সমাজে কিন্তু শরিয়াত অনুযায়ী চার-এর ওপর স্ত্রী গ্রহণ অবৈধ ছিল। হিন্দুবিবাহের সঙ্গে মুসলমান বিবাহের মূলগত পার্থক্য ছিল এই যে, হিন্দুবিবাহে যেমন বিচ্ছেদ ঘটে না, মুসলমান বিবাহে বিচ্ছেদ বা তালাক ঘটানো যায়। তাছাড়া উত্তরাধিকার সম্বন্ধে হিন্দুর মিতাক্ষরা ও দায়ভাগ সম্পর্কিত বিধি, মুসলমানদের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।

মুসলমান সমাজ সাম্যবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ওই সমাজে হিন্দুদের মতো জাতিভেদের কোন অবকাশ ছিল না। তবে বাঙলায় আসবার পর এখানে চার শ্রেণির মুসলমানের উদ্ভব ঘটেছিল। এই চার শ্রেণি হচ্ছে (১) বহিরাগত আমীর-ওমরাহরা, যাঁরা সঙ্গে স্ত্রী নিয়ে আসতেন। এরূপ মুসলমানরা সাধারণত রাজধানী ও নগরসমূহের আশেপাশে বসতি স্থাপন করতেন, (২) আগন্তুক মুসলমান যাঁরা স্ত্রী আনতেন না, এবং বাঙলায় এসে বিয়ে করতেন, (৩) এদেশের ধর্মান্তরিত মুসলমান, ও (৪) মিশ্র মুসলমান, মানে যাদের পিতামাতার কেউ হিন্দু হতেন। (এ সম্বন্ধে বিশদ বিবরণ লেখকের ‘বাঙলার নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ জিজ্ঞাসা, পৃ. ৫৩-৫৭ দ্রষ্টব্য)।

মুসলমান সমাজে জাতিভেদ প্রথার প্রচলন না থাকলেও ধর্মান্তরিত মুসলমানরা তাঁদের ধর্মান্তরিত হবার পূর্বেকার হিন্দুর সনাতনী আচার- ব্যবহার ও রীতিনীতি পরিহার করতে পারতেন না। অনেক মিশ্র মুসলমান যাদের পিতামাতার মধ্যে কেউ হিন্দুব্রাহ্মণ হতেন, সে সকল মুসলমান নিজেদের ব্রাহ্মণ মুসলমান বলে অভিহিত করে গর্ব অনুভব করতেন। এখনও অনেকে করেন। তা ছাড়া ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই তাঁদের ধর্মান্তরিত হবার পূর্বেকার কৌলিক বৃত্তি পরিহার করতেন না। মধ্যযুগের হিন্দুসমাজে জাতিভেদ প্রথা মূলতঃ কৌলিক বৃত্তির ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেদিক থেকে মুসলমান সমাজে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের কৌলিকবৃত্তি পরিহার না করার মধ্যে আমরা মুসলমান সমাজের ওপর হিন্দুসমাজেরই প্রভাব লক্ষ্য করি। পরন্তু মধ্যযুগের শেষভাগে আমরা হিন্দুসমাজের ওপর মুসলমান পীর, ফকির, সাধুসন্ত ও সুফী সম্প্রদায়ের প্রভাবও লক্ষ্য করি। মুসলমান হয়ে গেলেও গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান পরস্পর সম্প্রীতিমূলক মনোভাব নিয়েই পাশপাশি বাস করত। তবে যেসব হিন্দু বেশি মেলামেশা করত বা হিন্দুর নিষিদ্ধ খাদ্য মুসলমানগৃহে গ্রহণ করত, তাদের ‘যবনদোষ’ ঘটত এবং হিন্দুরা তাদের একঘরে করে দিত। তবে ভাল মুসলমানরা কখনও ইচ্ছা করে হিন্দুদের যবনদোষ ঘটাত না। কথিত আছে যে যুক্ত বাঙলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হকের পরিবারের জমিদারীর মধ্য দিয়ে যে সকল ব্রাহ্মণ প্রভৃতি হিন্দুরা গ্রামান্তরে যেত, তাদের ফজলুল হক পরিবার কখনও অভুক্ত অবস্থায় যেতে দিতেন না। তাদের স্নানাহারের জন্য ওই পরিবার হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিচালিত অতিথিশালা রক্ষা করতেন। এছাড়া গ্রামে হিন্দুদের জন্য মুসলমানরা পৃথক হুঁকা রাখতেন। এক কথায় উত্তম শ্রেণির মুসলমানরা কখনও ইচ্ছাপূর্বক হিন্দুর ধর্ম কলুষিত হতে দিতেন না।

নাগরিক মুসলমান সমাজের হিন্দুদের প্রতি অন্য মনোভাব থাকলেও গ্রামে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাবের অভাব ছিল না। গ্রামের মুসলমানরা হিন্দুর বাড়ীর বিয়ে-সাদি দুর্গাপূজা ইত্যাদি উপলক্ষে হিন্দুদের মতো ভাল জামাকাপড় পরে পূজা বা বিয়ে বাড়ীতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করত, হিন্দুরাও তেমনই মুসলমানদের মহরম ইত্যাদি পরবে যোগদান করত। আবার বসন্ত, ওলাওঠা ইত্যাদির প্রকোপের সময় মুসলমানরা যেমন শীতলাতলা ও ওলাদেবীর থানে এসে পূজো দিত, হিন্দুরাও তেমনই ছেলেদের নজর লাগলে মুসলমানদের দরগা থেকে জলপড়া এনে ছেলেদের পান করাত। এছাড়া ভূতে পেলে মুসলমান রোজাও ডাকা হত। এছাড়া যুক্তসাধনার ক্ষেত্রে সত্যপীর, বনবিবি, গাজী সাহেব, ঘোড়া সাহেব ইত্যাদি পূজা করা বা তাঁদের আস্তানায় অর্ঘ্যদান করা হিন্দুসমাজে ঢুকে গিয়েছিল। এসব ছাড়া হিন্দুদের সাল গণনা, যা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত, তা সম্রাট আকবরের সময় মুসলমানী বৎসরের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে বলা হয়, যদিও এটা প্রমাণসাপেক্ষ।

বাঙালী সমাজের ওপর মধ্যযুগের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ভাষা ও সাহিত্যের ওপর। বাংলা ভাষা বিশেষভাবে পুষ্ট হয়েছিল মুসলমানী আরবী ও ফরাসী শব্দের অনুপ্রবেশের ফলে। অজ্ঞাতসারে আজকের দিনে আমরা আমাদের কথাবার্তায় যেসব শব্দ ব্যবহার করি, তার মধ্যে অনেক শব্দই এ জাতীয়। যেমন, গোলমাল, জাহাজ, জিরান, জিলা, ইজারা, বনিয়াদ, বরকন্দাজ, মিয়াদ, মকদ্দমা, ছানি, মকুব, মক্কেল, মখমল, মগজ, মসলিন, মজা, মজুত, মজুর, শরবত, শরিক, শর্ত, শহর, শহিদ ইত্যাদি।

মুসলমানী শব্দ যেমন বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিল, বাংলা সাহিত্যকে তেমনই ঋদ্ধিবান করেছিলেন অনেক মুসলমান কবি। এটা বিশেষভাবে ঘটেছিল চৈতন্যোত্তর যুগে। বৈষ্ণবসাহিত্য বিশেষভাবে মুসলমান সমাজকে প্রভাবিত করেছিল। ন্যূনপক্ষে ১২১ জন মুসলমান কবির রচিত বৈষ্ণব পদাবলী আমাদের জানা আছে। মধ্যযুগের এই ধারা আজও বজায় রয়েছে। আজ বাংলাদেশে ইসলামিক রাষ্ট্র হলেও বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা (বা মাতৃভাষা) রূপে গ্রহণ করেছে। এবং বাংলদেশের মনীষীরা আজ বাংলা সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করছেন। তাঁরা মনে করেন যে বাংলা যাদের মাতৃভাষা তারা একই জাতি ও একই সংস্কৃতির ধারক।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *