পাখির বাসা – ৮

বলি, মা, শরীরগতিক আজ কেমন?

মন? কার মন বাপ? আমার? খারাপ তো নয়—ভালোই আছে। ক্যান র‌্যা?

রানিবালাকে নিয়ে এই মুশকিল। কানটা একেবারেই গেছে। শুধু কানটাই গেছে। শরীরের আর সব কলকবজা কিন্তু খুব তেজি। দিনরাত খুটুরখুটুর ঘোরাঘুরি করছে। সুচে সুতো পরিয়ে দিব্যি কাঁথাখানি সেলাই করছে খালি চোখে, ভাত খেতে বসে এই এত্ত ডাঁটা চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলছে, দু-চার গাছা ছাড়া মাথার চুল সব ভুসিকালো। শুধু শোনার সময় বেতাল।

দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে উঠোনের ছাওয়ায় বসে বিড়ি খাচ্ছে রুইদাস। কুমড়ো গাছের গোড়াটা কাস্তে দিয়ে খুসকে দিচ্ছে রানিবালা। তেজ হয়েছে বটে গাছটার। রান্নাঘরের চালে উঠে ছেয়ে ফেলেছে চালখানা। একঝলক তাকালে চালের টালি নজরে আসে না—শুধু নধর ডাঁটা পাতা। মুখ থেকে বিড়িটা সরিয়ে রুইদাস একটু গলা তুলে বলে, মন নয়, মন নয়—শরীরটা তোর ভালো আছে কি…?

হাতের কাজ থামিয়ে রানিবালা বলে, খারাপ আর কী এমন—শরীল আমার ভালোই…।

সকালে দুবার বাগান সারতে গেলি—প্যাট খারাপ নাকি গো…?

ফের হাতের কাস্তে চালাতে চালাতে রানিবালা বলে, প্যাট কিছু খারাপ নয়কো আমার।

বলি, বুকে কফ জমেছে নাকি?

চপ? হ্যাঁ, নিয়ে আসিস আলুর চপ দুটো, খাব’খন—প্যাট আমার ঠিকই আছে।

বলি, চপ নয়—কফ। বুকে তোর কফ জমেছে, কাশছিলি কাল রাতে খুব তো!

কাশছিলাম কাল রাতে! রানিবালা একটু অবাক গলায় বলে, কাশিনি তো…তোর কান দুটো দেখি যে একেবেরেই গেছে, তোর বাপের তাই ছিল, এক কথা বিশবার বললে তবে কানে ঢুকত।

ঘাড় নেড়ে বিড়িতে একটা টান দেয় রুইদাস। বলে, বলি কী, শীতের দিন তো এল ফের?

সে তো এল। হাত চালাতে চালাতেই রানিবালা বলে, ভাবছিলুম কী, এবার সামনেটায় দুটো পালং বুনব, আর ধনেপাতা; দিস তো এনে আমায়…।

রুইদাস বলে, সে দেব’খন, এবার কিন্তুক শীত পড়বে খুব, এখনই ভোরের দিকে কেমন জার লাগে দেখেছিস?

রানিবালা বলে, ভালো ভালো, জারকালে জার পড়াই তো চাই, আর বোছর জারই তো পড়লুইনি…।

এবার কিন্তুক খুব পড়বে—তোকে বলি শোন কথা, সকালবেলা বাগান সারতে বাইরে যাবিনি…আমি মাটির শরা আনি, তুই শরাতে করিস।

বরাতে যা লেখা আছে তাই হবে, সে তো সবাই জানে বাপ…পটল মুখুজ্জে দেখ, কত বড়লোক…মরল কিনা কুকুর-ছাগলের অধম…আর নন্তু তেলি দেখ…

রাইদাস একটু গলা তুলে বলে, বরাতে নয় শরাতে—মাটির শরাতে! বলি, সকালবেলাতে ঘরে বসে শরাতে বাহ্যে করবি এবার।

অ্যা! রানিবালা আঁতকে ওঠে, শরাতে ঘরের ভেতর…ম্যাগো আর কি…ছ্যা ছ্যা…

কেন করবিনি? রুইদাস একটু রাগের গলায় বলে, বুড়োমানুষ হলে সবাই তাই করে—তুই করবিনি কেন…!

আমি কি অথব্ব হয়ে গেছি র‌্যা বাপ…তবে কেন ঘরেতে করব…?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুইদাস। বিড়বিড় করে বলে, আর কবে অথব্ব হবি তুই…এবার আমি যে হয়ে যাই! পাপ যে আমার বড় হল কিনা…!

রানিবালা বলে, পালং দানা দুটো দিবি কিন্তুক বাপ, ধারে ধারে ধনে ছড়িয়ে দেব চাট্টি…বিজেটা আমার ধনেপাতার পোকা ছ্যালো…হ্যাঁ বাপ, বিজে ঘরে ফিরবে কবে?

রুইদাস আনমনে বলে, কী জানি!

ওকে বলেকয়ে ঘরেতে আন, না তো আবার মারপিট করে বসে…আবার জেল জরিমানা…মাথা গরম ছেলেটা বড়…তোর বাপের ছিল ওইরকম…রেগে গেল তো একেবারে চণ্ডাল…।

রুইদাস একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। ছেলেটা তার বড় চিন্তার কথা। মা-মরা ছেলে। বিয়েটা পাপেরই হয়ে গেল। ছেলেটা বয়ে গেল তার। বদসঙ্গে পড়ল; জেল হল। তার পাপেই ছেলেটা গেল। এই তো কদিন আগে এল হঠাৎ। পুজোর মুখটায় এল। বিশে আশ্বিনই তা হলে ছাড়ান পেয়েছিল কি হিসেবমতো! এল তার ক’টা দিন পর—পুজোর মুখটায়—পঞ্চুমি বুঝি সে দিন…।

রুইদাস ভাবল, যাক বাবা, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে, রাগ পড়েছে। মালতীকে আড়ালে বলেছিল মাফ চেয়ে নিতে। কাজটা সেদিন মালতীর অন্যায় কাজই হয়েছিল। ওর মায়ের হাতের আসন—রাগ হওয়ারই কথা বটে। মা-মরা ছেলে—বড় মাথা গরম ছেলে। খুব সকালে ছেলেটা এল। চোখ দুটো লাল, চুল উসকোখুসকো। আহা, জেলের ভেতর কত না কষ্ট! তার পাপেই সব হল। বড় পাপ যে! ঘরের দরজা বন্ধ করে ছেলেটা পড়ে পড়ে ঘুমোল সারাদিন। সন্ধের মুখে উঠল। মালতী চা করে দিয়ে এল। খেল চুপচাপ। মালতী মাফ চেয়ে নিল। সত্যিই তো—অন্যায় কাজ করেছিল মালতী। একবার বলতেই মালতী মাফ চেয়ে নিল। বিজু বলল না কিছু। চুপচাপ দেখল মালতীকে। মালতীর নাকি খুব ভয় পাচ্ছিল তখন। মা-মরা ছেলে, রাগী ছেলে যা হোক…।

দুটো দিন ছিল বাড়িতে। বাইরে বেরোত না বড় একটা। কথাও বলত না বিশেষ। রানিবালার সঙ্গে যা দু-চারটে কথা শুধু। রানিবালা একটা কথাই বলত বারবার। বিজে বে কর এবার; নাতবউ দেখি…।

শুনে মৃদু একটু হাসত শুধু।

একদিন খুব ভোর-ভোর উঠল বিজু। মালতী তখন পুজোর ফুল তুলছিল। যাওয়ার সময় শুধু বলল, যাচ্ছি।

মালতী সাহস করে তবু বলেছিল, কোথায় যাওয়া হবে এত সকালে?

কাজ আছে।

চা করে দিই?

না।

কখন ফেরা হবে?

জানি না।

আর কিছু বলেনি বিজু।

রুইদাস খুব আশা করেছিল ছেলেটা ফিরবে। ফিরল না! এখনও রোজই সকালে উঠে মনে হয়, আজ ঠিক আসবে।

ধরেবেঁধে বে দিয়ে দে দিকিন..।

অ্যাঁ! রুইদাস তাকায় রানিবালার দিকে।

বিজেটার বুঝলি…আনা করা আগে…বে দিয়ে দে…ঘরে বউ হলেই মতি হবে—চণ্ডাল রাগ যে বড়…ওই দেখ, কারা আসে আবার—ইদিকেই আসছে যেন…

রুইদাস তাকায় দরজার দিকে। চমকে ওঠে খুব। পুলিশ! তিন-চারটে পুলিশ! তাড়াতাড়ি মুখ থেকে বিড়িটা নামিয়ে ভালো করে নজর করে। পুলিশই বটে! খাকি জামাপ্যান্ট, মাথায় টুপি। পেছন পেছন একটু তফাত রেখে একপাল মানুষ। গ্রামেরই লোক সব।

পুলিশগুলো উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভিড়টা থেমে গেছে দরজার সামনে।

রুইদাস মণ্ডল কে? টুপি মাথায় মাঝারি চেহারার একটা পুলিশ প্রশ্ন করে রুইদাসের দিকে তাকিয়ে।

উজ্জ্বল মাথার টুপিটা ঠিক করে বসিয়ে নিল। তারপর পুলিশি চোখে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল চারপাশ। রোয়াকের একদিকে ধানের বস্তা কতগুলো। উঠোনে পাঁচমিশেলি সবজির চাষ। নধর একটা লাউ গাছ উঠে গেছে ঘরের চালে।

রুইদাস মণ্ডল কে আছে? ফের গম্ভীর গলায় বলে উজ্জ্বল।

রুইদাস তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, আজ্ঞে আমি…

উজ্জ্বল ভালো করে দেখে রুইদাসকে। তারপর বলে, বিজু মণ্ডল কে হয়?

ছেলে আজ্ঞে।

কোথায় সে?

নেই তো…।

ঠিক করে বলুন। ধমকে ওঠে উজ্জ্বল।

আর কথা বেরোয় না রুইদাসের মুখ থেকে। পা-দুটো কাঁপছে তার। গলা শুকিয়ে কাঠ। শুধু অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে।

কী হল বলুন, কোথায় বিজু?

মাথা নাড়ে রুইদাস, সত্যি কথা বলছি।

উজ্জ্বল ঘর চেক করতে বলে। দুজন কনস্টেবল ঢুকে যায় ঘরে।

মালতী ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। ভয়ে মুখ সাদা। উজ্জ্বল এগিয়ে যায়—আপনি কে?

আমি…আমি…! বিড়বিড় করে থেমে যায় মালতী।

হ্যাঁ, আপনি।

আমি মানে—ওর মা—মানে…।

মা! বিজুর মা! একটু অবাক গলায় বলে উজ্জ্বল।

মালতী ঘাড় নাড়ে।

একবার মালতীর দিকে আর একবার রুইদাসের দিকে তাকায় উজ্জ্বল। এরা স্বামী-স্ত্রী—ঠিক মেলাতে পারছে না সে।

কনস্টেবল দুটো সার্চ করছে ঘর। মালতী ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে সেদিকে।

উনি কে? রানিবালাকে দেখিয়ে বলে উজ্জ্বল।

আমার মা হয়। রুইদাস বলে।

রানিবালা এগিয়ে এসেছে রুইদাসের সামনে। হাতে কাস্তে। বলে, কী হল র‌্যা—এরা সব কারা?

কিছু বলে না রুইদাস।

কনস্টেবল দুটো বেরিয়ে এসে বলল, না স্যার—নেই।

উজ্জ্বল একটু নরম গলায় বলে, ঠাকমা, নাতি কোথায়?

জানিনি তো বাপ, সে এল, ফের চলে গেল—কেন গা বাপ—ফের মারপিট করেছে বুঝি; মাথা গরম ছেলে বাপ—মা-মরা ছেলে তো…।

এবার বুঝতে পারে উজ্জ্বল। রুইদাসের দিকে তাকিয়ে বলে—আপনার দ্বিতীয় পক্ষ?

অ্যাঁ—হ্যাঁ স্যার। মাথা নিচু করে বলে রুইদাস। হঠাৎ বুঝি তার মনে পড়ে গেছে পুলিশকে স্যার বলাই দস্তুর।

একজন কনস্টেবল রানিবালার কাছে গিয়ে বলে, ও দিদা, ঠিক করে বলো, কোথায় নাতি তোমার?

মোতি কামার! বুড়ি বলে, তাকে এখানে কোথায় পাবে, সে তো সেই কামারপাড়ায়। হ্যাঁ, বয়েসকালে সে ডাকাতদলে ভিড়েছিল বটে।

কনস্টেবলের মুখে একটু বিরক্তির ছাপ পড়ে। গলা আর একটু তুলে বলে, মোতি কামার-টামার নয়—তোমার নাতি—বিজু; কোথায় সে?

ও বিজু, সে তো এল একদিন, তারপর আর তো দেখি না; ওর বাপকে তাই বলছিলুম, বে দিয়ে দে ছেলের, তবে যদি…।

উজ্জ্বল এবার রুইদাসের দিকে তাকিয়ে কড়া ধমক দিয়ে বলে, কবে এসেছিল বিজু?

রুইদাস ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে।

ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ছুটছে গাড়িটা। দুদিকে ধানখেত। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। হেলে পড়া সূর্যের আলোয় ভীষণ সতেজ দেখাচ্ছে গাছগুলো। সেদিকে তাকিয়ে ভাবছিল উজ্জ্বল। বিজুকে পাওয়া গেল না। এসেছিল, কিন্তু চলেও গেছে। বাবাটা নেহাতই সরল সাদা লোক। মিথ্যে বলছে না, উজ্জ্বল নিশ্চিত। হিসেব করে উজ্জ্বল দেখল, ভোঁদাই মার্ডারের পরই এসেছিল এখানে। কয়েকদিন থেকে চলে গেছে। বুঝেছিল বদলা আসতে পারে অসিতের কাছ থেকে। তারা এতদূর পৌঁছোতে পারবে না। পুলিশ পারে আসতে; কিন্তু পাতি একটা মস্তান-মার্ডার নিয়ে অত কাঠখড় পোড়াবে না তারা। বিজুর অনুমান একদম ঠিক ছিল। সত্যিই পুলিশ তখন মাথা ঘামায়নি। এখন প্রসূনের চাপে ঘামাতে হচ্ছে। বুড়োটাকে জেরা করে বিজুর বেলাইন চলে যাওয়ার কারণটা জানার চেষ্টা করেছিল উজ্জ্বল। স্পটে কিছু বুঝতে পারেনি। লোকটা কেবল বিড়বিড় করছিল—পাপ, খুব পাপ আমার…। লোকটা সরলই বটে। আর গাছপালা ভালোবাসে খুব। কনস্টেবল সুকুমারের একবার সন্দেহ হল, চালের টালির নীচে মাট গুদামের ওপর ঘাপটি মেরে বসে আছে বিজু। চালে উঠে টালি সরিয়ে সরিয়ে দেখছিল তারা। তখনই খুব যেন হানটান করছিল লোকটা—কেমন একটা অস্থির ভাব। দেখে সন্দেহ আরও প্রবল হয় উজ্জ্বলের। তারপর বোঝা গেল চালের কুমড়ো গাছটার জন্যে যত উদবেগ। দলে-পিষে যাচ্ছে গাছটা। আশ্চর্য! এমন গাছ-অন্ত প্রাণ সরল লোকের ছেলে ক্রিমিনাল হয় কী করে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *