পাখির বাসা – ১৩

১৩

ডিউটি থেকে ফিরছিল রানু। গলির মুখটায় হঠাৎ ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল। শীত যাই যাই করছে। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে লোডশেডিং। এই গলিটা বড় খারাপ লাগে তার। নোংরা, দুর্গন্ধময়, স্যাঁতসেতে! ভবেশের কথা মনে পড়ে যায়। ভবেশ আর নেই। তবু এই গলিটায় ঢুকলে মনে পড়ে যায়।

হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলে নিজেকে কেমন পরিত্যক্ত আর প্রতিরোধহীন মনে হয়। গা ছমছম করে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় রানু। বাড়ির কাছে এসে চমকে ওঠে। দরজার সামনে অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে।

থমকে দাঁড়ায় রানু। বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটার শব্দ হয়।

অন্ধকারে মোবাইল জ্বলে ওঠে। বলে—আমি।

চিনতে পারে রানু। মেজোবাবু। সে বলে, কখন এলেন?

এইমাত্র, ফিরে যাচ্ছিলাম।

ও।

কেমন আছেন?

ওই আর কি!

চুপচাপ ঘরের তালা খোলে রানু। ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালে। বুঝতে পারে, মেজোবাবু দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। এখন মাঝেমধ্যেই আসে মেজোবাবু। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসারের মতো আসে। বিজুর খোঁজখবর নেয়। একই কথা। রোজ বলে, এলেই আমাকে একটা মিসড কল দেবেন। তারপর বলে, এক গ্লাস জল দেবেন…? রানু জল দেয়। একটু একটু করে জল খায় মেজোবাবু। অনেকটা সময় নিয়ে খায়। খায় আর এটা-সেটা কথা বলে। ঠিক পুলিশি তদন্তের মতো মনে হয় না রানুর। একদিন জিগ্যেস করল, আপনি পায়রা পুষতেন? মেজোবাবুর নাকি অনেক পায়রা ছিল, সবার আলাদা আলাদা নাম—টনি মিনি জনি—এইসব। রানু তো অবাক। হাসিও পায়। আবার ভাবে, হতেও পারে, সে কতটুকুই বা বোঝে…এইসব সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই হয়তো কোথাও লুকিয়ে থাকে গোপন সূত্র, অপরাধীর কাছে পৌঁছে যাবার হালহকিকত। না হলে, তার কাছে শুধু শুধু কথার ঝাঁপি খুলে বসবে কেন অমন একজন পুলিশ অফিসার। একটু আফশোস হয় রানুর। সেই মস্তান ছেলেটা—বিজু—তাকে যদি একবারও আর দেখতে পায় সঙ্গে সঙ্গে খবর দেবে মেজোবাবুকে। একটু অন্তত উপকারে লাগবে মেজোবাবুর।

বাতিটা ঘরের মেঝেতে বসিয়ে রানু বলে, আসুন। ঘরে ঢোকে উজ্জ্বল। দেওয়াল জুড়ে ছায়া পড়ে। টুলটা টেনে নিয়ে বসে পড়ে সে।

চা খাবেন? আজ একটু সাহস করে বলে ফেলে রানু।

চা…? কিছুটা যেন অবাক হয়ে রানুর দিকে তাকায় উজ্জ্বল।

হ্যাঁ। রানু বলে, আমার অবশ্য দানা চা—আপনার বোধহয় ভালো লাগবে না।

একটু চুপ করে বসে থাকে উজ্জ্বল। তারপর বলে, সেজন্যে নয়, আমি বেশি চা খাই না।

আর কিছু বলে না রানু। তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বলের দিকে। খুবই যেন অন্যমনস্ক লোকটা।

আমাকে বরং একটু জল দিন। জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে উজ্জ্বল বলে, আপনার ওদিকের কী খবর?

কোনদিকে?

শ্বশুরবাড়ির।

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানু বলে, শাশুড়ি এখনও আমার চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করছে।

আপনার…কেন…!

ওর ছেলের মৃত্যুর জন্যে আমি দায়ী…।

সে কী! খুব অবাক হয়ে বলে উজ্জ্বল।

আমি ওর ছেলেকে ঠিক রাখতে পারিনি, আমার জন্যেই নাকি সে বিপথে গিয়েছিল…।

আশ্চর্য।

একটু মলিন হাসে রানু।

আপনি কি ফিরে যাবেন—ভেবেছেন কিছু…?

কোথায়?

শ্বশুরবাড়ি…?

নাহ, সেখানে গিয়ে কী করব?

বাপের বাড়িতেও তো যাওয়া যাবে না।

মাথা নেড়ে রানু বলে—না।

এখানেই কি থাকবেন তাহলে…এইভাবে…?

তা ছাড়া আর উপায় কী?

না, আসলে…একা একটা মেয়ের এভাবে থাকা…আসলে দিনকাল তো ভালো নয়…।

আমার কিছু হবে না…। রানু বলে, আমি নিজেও তো ভালো নই—আমার আর কী খারাপ হবে…।

আপনি খারাপ হতে যাবেন কেন…! তাড়াতাড়ি বলে ওঠে উজ্জ্বল।

আমি গুন্ডা-মস্তানদের আশ্রয় দিই—খারাপ নয়তো কী…।

একটু অপ্রস্তুত গলায় উজ্জ্বল বলে, এ আবার কেমন কথা!

ঠিকই।

সে তো নেহাতই বাধ্য হয়ে…।

কে বলে বাধ্য হয়ে? সত্যি হয়তো যোগাযোগ আছে। না হলে আমার কাছে পরের বারই বা আসবে কেন…! আপনি তো সেই আশাতেই যখন-তখন আসেন এখানে, যদি পাওয়া যায় তাকে—তাইতো…? রানু সোজা তাকায় উজ্জ্বলের দিকে।

না না, তা নয়…। এখনও অপ্রস্তুত উজ্জ্বলের গলা।

আপনি হয়তো ভদ্রতা করে বলছেন না সামনে, কিন্তু আমাকে নিয়ে আপনার ঘোর অবিশ্বাস আছে—ঠিক কিনা বলুন…? এই তো দেখুন না, আমার নামে চুরির অভিযোগ উঠেছে।

চুরি…? একটু অবাক হয়ে বলে উজ্জ্বল।

হ্যাঁ, একটা পার্টির বাড়ি থেকে সেন্টারে বলা হয়েছে, আমি নাকি তাদের মোবাইল, ঘড়ি এইসব চুরি করেছি।

সে কী!

কিছু বলে না রানু। চুপচাপ আঁচলের খুঁট পাকায় বসে বসে। মুখে কোল্ডক্রিমের মতো মাখা অভিমানের হাসি। উজ্জ্বল বলে, ছি: ছি:, ছেড়ে দিন কাজটা।

ম্লান হাসিটা মুখে নিয়েই রানু বলে, ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাব? নতুন জায়গায় আবার কেউ বেড়াতে যাবার, সিনেমা দেখার প্রস্তাব দেবে আড়ালে একা পেলেই। আর রাজি না হলে বলবে চোর…।

হতবাক হয়ে রানুর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে উজ্জ্বল।

থাক গে ছাড়ুন। রানু বলে, এখন তাড়াতাড়ি বুড়ি হয়ে গেলে বাঁচি।

অ্যাঁ! খুব অবাক গলায় উজ্জ্বল বলে, কে বুড়ি হবে?

আমি।

আপনি বুড়ি হতে যাবেন কেন?

বুড়ি হলে অন্তত চোর অপবাদ শুনতে হবে না।

খুব অসহায় বোধ করে উজ্জ্বল। চূড়ান্ত অপ্রস্তুত গলায় বলে, কী যা-তা বলছেন!

সত্যি বলছি! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানু বলে, আমি রোজ ঠাকুরকে বলি,—তাড়াতাড়ি আমাকে বুড়ি করে দাও, একেবারে বুড়ি, মুখ তুবড়ে যাবে, গায়ের চামড়া ঝুলে যাবে, কেউ ফিরেও তাকাবে না আমার দিকে।

এত অদ্ভুত কথা সম্ভবত আগে কোনওদিন শোনেনি উজ্জ্বল। উদভ্রান্তের মতো বলে উঠে, বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন—আমি আপনাকে…সত্যি বলছি…!

মোটেই সত্যি বলছেন না আপনি। সোজা উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে বলে রানু।

দাগি অপরাধীর মতোই উজ্জ্বল চোখ সরিয়ে নেয় রানুর চোখ থেকে। অন্যদিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে, বিশ্বাস করুন, আপনাকে নয়, আমার সন্দেহ হয় ওকে।

কাকে?

ওই যে ওই ছেলেটা—বিজু।

বিজুকে।

হ্যাঁ।

কী সন্দেহ হয়?

একটু ইতস্তত করে উজ্জ্বল বলে, না মানে…।

বড় বড় চোখ করে উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে থাকে রানু। বলে, বলুন না, কী সন্দেহ হয়?

না, আসলে ছেলেটা ক্রিমিনাল ঠিকই, কিন্তু একটু কেমন যেন, অন্য ধরনের; না হলে বলুন না, আপনাকে তো একাই পেয়েছিল—অন্য কেউ হলে একা একটা মেয়েকে এভাবে অসহায় অবস্থায়…মানে…।

একটু যেন শিউরে ওঠে রানু। চোখের সামনে সেই দৃশ্যটা ভেসে ওঠে—অজ্ঞান রানু এলিয়ে পড়ে আছে সেই ছেলেটার বুকের মধ্যে, ওইরকম একটা দাগি আসামী, সেদিন চলে যাবার পর কেঁদেছিল রানু। জীবনে সেই প্রথম তার মনে হয়েছিল, সে বড় ভাগ্যবান। ভাবলে আজও চোখে জল আসে তার।

একটু গলা ঝেড়ে উজ্জ্বল বলে, তাই আমার খালি মনে হয়, আজ হোক বা কাল, ও ঠিক আসবে, এসে জল চাইবে, একটু একটু করে খাবে জলটা, যেমন আগের দিন করেছিল, করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিল, কেন কে জানে, আমার বারবার মনে হয়…।

মাথা নামিয়ে বসে থাকে রানু। কী বলবে সে? তারও তো কেমন যেন মনে হয়, মাঝে মাঝে সত্যি মনে হয়—একদিন আবার আসবে সেই ছেলেটা, হঠাৎ অকারণেই আসবে, এসে আবার জল চাইবে, জল খাবে একটু একটু করে। মেজোবাবুও যে ঠিক তেমনই ভাবে…বড় লজ্জা! এত লজ্জা নিয়ে সে তাকাবে কী করে মেজোবাবুর দিকে। মেজোবাবু যে সব জেনে গেছে! ছি: ছি:!

রানুকে অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচাতেই বোধহয় উজ্জ্বলের বুক পকেটে মোবাইল বেজে ওঠে পিঁক পিঁক করে। একটু যেন বিরক্তি নিয়েই কানে মোবাইলটা ধরে মেজোবাবু।

রানু দেখে দু-একটা কথা বলেই উঠে দাঁড়িয়েছে উজ্জ্বল। জলের গ্লাসটা নামিয়ে রেখেছে পাশে। মুখে উদবেগ।

কথা বলতে বলতেই দরজার দিকে এগিয়ে যায় উজ্জ্বল। রানু একটু সাহস করে বলে, কিছু হয়েছে?

ফোনটা পকেটে রেখে উজ্জ্বল বলে, আসছি আমি।

রানু বলে, কী হয়েছে?

উজ্জ্বল বলে, আমাদের যা কাজ, গন্ডগোল বোমাবাজি।

জলটা যে একটুও খেলেন না?

মৃদু হেসে উজ্জ্বল বলে, আজ সময় নেই, অন্যদিন আসব।

বড় বড় পা ফেলে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় উজ্জ্বল। তাড়াতাড়ি দরজার সামনে আসে রানু। অন্ধকারকে লক্ষ করেই বলে, সাবধানে যাবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *