১১
বাড়ি এলে প্রতিবারই এই সমস্যাটা হয় উজ্জ্বলের। ডিউটিতে ফিরে যেতে আর ইচ্ছে করে না। যত ছুটি ফুরিয়ে আসে তত মনে হয়—কেউ একটা তাকে অপহরণ করে না কেন! অপহরণ করে কোনও গোপন ডেরায় লুকিয়ে রাখুক, সরকারের কাছে কোনও বন্দিমুক্তির দাবি জানাক, দীর্ঘ কথাবার্তা টালবাহানা চলুক—আর সে দিব্যি শুয়ে বসে গড়িয়ে কাটিয়ে দেবে সময়টা। কিন্তু কিছুই হয় না তেমন। ছুটির দিনগুলো কেমন যেন হুসহাস করে হাউইয়ের মতো মিলিয়ে যায়। তারপর আবার সেই থানা, কোমরে রিভলভার ঝুলিয়ে ডিউটি, লোকজন নিয়ে গাড়ি করে অপরাধী তাড়িয়ে বেড়ানো…। ভালো লাগে না আর। মনে হয়, ছেড়ে দিই চাকরিটা।
এবার অনেকদিন পর বাড়ি এল উজ্জ্বল। অতি কষ্টে পাঁচ দিনের ছুটি ম্যানেজ হয়েছে। দিন দিন থানায় চাপ বাড়ছে। পলাশের দলটা খুব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। অসিত অবশ্য কিছুটা কোণঠাসা। আর কোণঠাসা বলেই নানা মহল থেকে চাপ দেওয়াচ্ছে। প্রসূন হাজরা একদিন থানার সামনে লোকলশকর নিয়ে চোঙা ফুঁকে পুলিশকে গালমন্দ করল খুব। মোদ্দা দাবি, পুলিশের প্রশ্রয়েই সমাজবিরোধীদের বাড়বাড়ন্ত, পুলিশ ইচ্ছে করেই ধরছে না তাদের।
বড়বাবু একটু ক্ষোভের গলায় উজ্জ্বলকে বলল, দেখছেন তো, কী ঝামেলা!
পুলিশ লাইনে এসব ঝামেলা বড় কোনও ব্যাপার নয়, হামেশাই হয়ে থাকে এমন। তবু বড়বাবু কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করল উজ্জ্বলের কাছে। বলল, তখনই বলেছিলাম ওই মেয়েটাকে একটা কেস দিয়ে দেওয়া হোক, বিজুর সঙ্গে ওর যোগাযোগ একেবারে ক্লিয়ার। মেয়েটাকে তুলে আনলে লোকে ভাবত কিছু একটা করছি, ক্ষোভবিক্ষোভ এত বাড়ত না।
রানুকে তুলে আনাই যেত। খুব স্পষ্ট যে, বিজু সেদিন ওর ঘরেই ছিল। অসিতরা সুযোগটা নেয়; ওখানেই অ্যাটাক করে। অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে বিজু। প্রচুর বোমাগুলি চলে। মাঝখান থেকে একটা নিরীহ লোক জখম হয়। ফোর্স নিয়ে উজ্জ্বল যখন পৌঁছোল, বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল রানুকে। প্রাইমারি ইন্টারোগেশান করে থানায় ফেরে উজ্জ্বল। শুনেই বড়বাবু বললেন, একটা ফলস কেস দিয়ে তুলে আনুন মেয়েটাকে, তারপর চাপ দিয়ে কথা বের করুন। একটু রাত করে উজ্জ্বল আবার গেল রানুর কাছে। কনস্টেবলদের বাইরে রেখে সে একা ঢুকল ঘরে। রানু জেগেছিল। তখনও চোখমুখ ভয়ে সাদা। উজ্জ্বলকে দেখে মাথা নিচু করে বসে রইল। এখন এই মেয়েটার ঘরে দুটো পেটো রেখে ফাঁসিয়ে দেওয়া যায় সহজে। বড়বাবুর তেমনই নির্দেশ।
উজ্জ্বল সোজা রানুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে কিন্তু আমি বিশ্বাস করেছিলাম। আপনি কিন্তু বিট্রে করলেন আমার সঙ্গে!
খুব ভীত চোখে উজ্জ্বলের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল রানু।
…তার মানে ভোঁদাইয়ের বাড়ির লোকের কথাই ঠিক। উজ্জ্বল গম্ভীর গলায় বলল, আপনার জন্যেই মার্ডার হয়েছে ভোঁদাই।
না না, বিশ্বাস করুন…। ফাঁকা গলায় বলে রানু।
কী বিশ্বাস করব? উজ্জ্বল আরও কঠিন গলায় বলে, কোনও রিলেশান না থাকলে, ও শুধু শুধু আপনার কাছে আসে—আমাদের আপনি এত বোকা বলতে চান…?
বিশ্বাস করুন। রানু বলে, হঠাৎই এসেছিল, আমি কিছু জানতাম না…।
এসে কী বলছিল?
জল চাইল।
জল…! খুব অবাক হয়ে উজ্জ্বল।
হ্যাঁ।
বেশ। ভালো কথা। তারপর কী বলল?
তারপর আবার জল চাইল।
অ্যাঁ!
হ্যাঁ, পরপর চার-পাঁচ গ্লাস জল খেল।
তাই নাকি…?
আমি প্রতিবারই ভাবছিলাম এই জলটা খেয়ে চলে যাবে, ও মা, সেটা শেষ করে, আবার চাইছে…!
আশ্চর্য!
হ্যাঁ। জল চাইলে না দিয়ে তাড়িয়ে দেব, বলুন?
সে তো বটেই।—অন্যমনস্কভাবে বলে উজ্জ্বল। এমন অদ্ভুত কাণ্ড সে কোনওদিন শোনেনি। একটা হার্ডকোর ক্রিমিনাল ঝুঁকি নিয়ে এসেছে এমন একটা জায়গায়, যেখানে যে-কোনও সময়ে বিপদে পড়তে পারে সে। এসে মেয়েটাকে বিরক্ত করছে না, ভয় দেখাচ্ছে না। শুধু গ্লাসের পর গ্লাস জল খেয়ে যাচ্ছে—কী কারণ হতে পারে…কী কারণ…বড় অদ্ভুত ব্যাপার…!
আমি তাও বলেছি, তাড়াতাড়ি জল খেয়ে চলে যান। আমার কাজ আছে।
শুনে কী বলল?
বলল যে, এই গ্লাসটা খেয়েই চলে যাব; কিন্তু তারপর আবার চাইছে—চায়ের মতো একটু একটু করে খাচ্ছে জলটা!
তার মানে, খুব তেষ্টা ছিল না?
তাই মনে হয়। রানু বলে, খুব তেষ্টা থাকলে ওভাবে একটু একটু করে জল খাবে কেন?
হঠাৎ উজ্জ্বল বলে, এইবার বুঝেছি।
কী?
আমার মনে হয়, ও আবার আপনার কাছে আসবে।
খুব অসহায়ভাবে রানু বলে, তার জন্যে আমি কী করি বলুন, লোকটার সঙ্গে সবসময় রিভলভার থাকে। আজ তো গন্ডগোল হতেই রিভলভার বের করল!
খুব শান্ত গলায় উজ্জ্বল বলে, আপনাকে কিছু করতে হবে না, আপনি শুধু একটা মিসড কল দেবেন আমার ফোনে, চুপিচুপি দিয়ে দেবেন।
একটু আতঙ্কিত গলায় রানু বলে, কিন্তু জানতে পারলে…।
কিচ্ছু জানবে না। উজ্জ্বল গম্ভীর গলায় বলে, এ ছাড়া কিন্তু আপনার বাঁচার উপায় নেই, না হলে আপনাকে অ্যারেস্ট করা হবে। লক-আপ কিন্তু খুব ভালো জায়গা নয়—এবার আপনি ভেবে দেখুন…। তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপার, এবার কিন্তু আপনি অসিতদের গ্রুপের টার্গেট হয়ে গেছেন, ওরাও আপনার ওপর রিভেঞ্জ নিতে পারে। অসিত এমন একটা ক্রিমিনাল, যার কোনও কাজ করতেই আটকায় না, আপনি মহিলা, একা থাকেন —বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা…?
একটু কেঁপে ওঠে রানু। কাঁপা গলায় বলে, আচ্ছা।
এখনও পর্যন্ত রানুর কাছ থেকে কোনও খবর পায়নি উজ্জ্বল। সে নিজে কয়েকবার ফোন করেছে রানুকে। মেয়েটার সঙ্গে কথাবার্তা বলে মনে হচ্ছে মেয়েটা চায় বিজু ধরা পড়ুক। কিন্তু বিজু আর ওদিক মাড়াচ্ছে না। ছুটিতে আসার আগের দিন একটা খবর পাওয়া গেল। বিজু এলাকায় নেই। সেদিন হাঙ্গামার সময় কিছুটা ইনজিওরড হয়েছে। তারপর থেকেই হাওয়া! কোথায় আছে, সে খবর অবশ্য সোর্স দিতে পারেনি। দেশের বাড়িতেও যায়নি। এরকম অবস্থায় দেশের বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে থাকার মতো বোকা নয় বিজু। তবু লোকাল থানাকে অ্যালার্ট করে রেখেছে উজ্জ্বল।
ছুটিতে আসার আগের দিন রানুর কাছে গিয়েছিল সে। সেদিন ছুটি ছিল রানুর। বিছানায় বসে কিছু একটা সেলাই করছিল। জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ পড়েছিল মেয়েটার মুখে। পিঠের ওপর একঢাল খোলা চুল। বেশ দেখাচ্ছিল মেয়েটাকে। এর আগে কয়েকবারই মেয়েটার মুখোমুখি হয়েছে সে, প্রত্যেকবারই খুব উদবেগ আর আতঙ্কের মধ্যে ছিল মেয়েটা। চাপের মধ্যে ছিল উজ্জ্বলও। ধমক-চমক করতে হয়েছিল মেয়েটাকে। ফলে সেভাবে লক্ষ করা হয়নি। আজ দেখল ভালো করে; এবং দেখেই মনে হল, বাহ, বেশ দেখতে তো! তখনই মনে হল, বিজু কি ওর প্রেমে পড়েছে? কে জানে বাবা! প্রেম ভালোবাসা ব্যাপারটা তার কাছে বড় গোলমেলে লাগে। ঈশিতা কী সব সাংঘাতিক সাংঘাতিক কথা বলত তখন। বলত, উজ্জ্বলকে না পেলে সে নাকি বিষ খাবে। যতদূর খবর পেয়েছে, বিষ-টিস এখনও কিছু খায়নি সে; বরং দিব্যি সুখে সংসার করছে। উজ্জ্বলেরই বরং মাঝে মাঝে মরে যেতে খুব ইচ্ছে করে।
উজ্জ্বলকে দেখেই ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়াল রানু। বসতে বলল। বিছানায় বসতে বসতে একটা মিষ্টি গন্ধ পেল উজ্জ্বল। মেয়েটার যা আর্থিক সামর্থ্য তাতে খুব দামি কিছু প্রসাধন ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এটা হয়তো মেয়েটার নিজস্ব গন্ধ। কোনও কোনও মেয়ের একেবারে নিজের একটা গন্ধ থাকে; আর কোনও গন্ধের সঙ্গে মেলে না সেটা। ঈশিতার ছিল। এখনও চোখ বন্ধ করে নাক টানলে সেই গন্ধটা পায় উজ্জ্বল।
চুপিচুপি গন্ধটা একবার টেনে নিয়ে উজ্জ্বল বলল, কী করছিলেন?
তেমন কিছু নয়, একটু সেলাই করছিলাম আর কি…ওই ছেলেটা আর আসেনি, এলেই আপনাকে জানাব, মিসড কল দেব। একটু ব্যস্তভাবেই বলে রানু।
ও এখানে নেই।
তাই নাকি…। একটু অবাক গলায় রানু বলে, কোথায় তাহলে…?
সেটা ঠিক এখনও জানতে পারিনি, তবে এলাকায় নেই, সম্ভবত সেদিন চোট পেয়েছে, হয়তো কোথাও গিয়ে ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে।
সেদিনের প্রসঙ্গটা উঠতেই বোধ হয় একটু যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল রানুর মুখ। চোখ বুজে বলল, বাবা:!
উজ্জ্বল বলল, আপনি কেমন আছেন?
আমাদের আর থাকা…! একটু মলিন হেসে বলল রানু।
মলিন হাসিতেও বেশ দেখায় মেয়েটাকে। চুরি করে একবার দেখে নিয়ে উজ্জ্বল বলল, না মানে, আপনার হাজব্যান্ড কি আর উৎপাত করছে?
না। ঘাড় নেড়ে বলে রানু।
করলেই আমাকে বলবেন কিন্তু।
রানু বলে, এর মধ্যে একদিন এসেছিল, কারখানার ঝামেলা মিটে গেছে, আবার কাজ করছে।
তাই নাকি! বাহ ভালো…।
আমাকে ফিরে যেতে বলছে।
তাই নাকি! উজ্জ্বল একটু কৌতূহলের সঙ্গে বলে, তাহলে চলে যাচ্ছেন…?
এখনও কিছু ঠিক করিনি! একটা শ্বাস ছেড়ে রানু বলে, ওর এই ভালোমানুষিটা বিশ্বাস করা শক্ত। এখন নিয়ে যাচ্ছে, দুদিন পর আবার অত্যাচার শুরু করে দেবে!
তাহলে…? খুব কৌতূহল নিয়ে রানুর দিকে তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বল।
কিন্তু এখানেও তো আমাকে এই বিপদ আপদের মধ্যে থাকতে হচ্ছে—তাই ভাবছি…কোনওদিন হয়তো এখানে খুনই হয়ে যাব আমি।
উজ্জ্বল একটু ব্যস্তভাবে বলে ওঠে, না না, সে ভয় পাবেন না, আমরা আছি কী করতে?
আবার একটু মলিন হেসে রানু বলে, দেখি…!
চুরি করে হাসিটা আবার দেখে নেয় উজ্জ্বল। তারপর বলে, একটু জল খাওয়াবেন?
হ্যাঁ হ্যাঁ! ব্যস্তভাবে বলে ওঠে রানু।
স্টিলের গ্লাসে জল দেয় উজ্জ্বলকে।
জলটা খেতে খেতে উজ্জ্বলের হঠাৎ মনে হয় এই গ্লাসটা করেই হয়তো বিজুকে জল দিয়েছিল রানু।
জল শেষ হতেই রানু বলল, আর দেব?
শুনে বড় আনন্দ হল উজ্জ্বলের। পিপাসা মিটে গিয়েছিল তার। তবু বলল, দিন, আর এক গ্লাস।
গ্লাস ভরতি করে জল দিল রানু। গ্লাসটা হাতে নিয়ে উজ্জ্বলের মনে হল সেদিন পরপর পাঁচ-ছ’গ্লাস জল খেয়েছিল বিজু। চায়ে চুমুক দেওয়ার মতো করে জল খাচ্ছিল। নিশ্চিত যে পিপাসা ছিল না তার, শুধু রানুর কাছে থাকবে বলেই বারবার জল চাইছিল, সেদিনও কি রানু এমন মলিন হাসি হেসেছিল? চুরি করে সেই হাসি দেখছিল বিজু, সেদিনও কি এই মিষ্টি গন্ধটা ছাড়ছিল, বিজু কি পাচ্ছিল সেই গন্ধ…ভাবতে ভাবতে বিজুর চেহারাটা ভেসে ওঠে চোখে।
এক চুমুক জল খেয়ে উজ্জ্বল বলে, আমি ক’দিনের জন্যে ছুটিতে যাচ্ছি।
ও। ছোট করে বলে রানু।
ফোন নাম্বার তো রইল আপনার কাছে, তেমন কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করবেন।
আচ্ছা।
একদম হেজিটেট করবেন না।
ঠিক আছে।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে রানু। গ্লাসে আর একটা চুমুক দেয় উজ্জ্বল। মাঝে মাঝে বড় চুপ হয়ে যায় মেয়েটা; কথা এত কম বলে যে ওর কাছে বসে থাকলে ঝপ করে নির্জনতা নেমে আসে চারপাশে। তখন গ্লাসের পর গ্লাস জল খেয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।
জলে ছোট একটা চুমুক দিয়ে উজ্জ্বল বলে, অনেক দিন বাড়ি যাইনি।
উজ্জ্বলের দিকে একবার তাকিয়ে রানু বলে, ও।
আমাদের লাইনে ছুটি পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার।
ও।
মা এত করে বলে, কিন্তু যাওয়ার উপায় থাকে না।
বাড়িতে কে কে আছে? প্রশ্নটা করে উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে থাকে রানু।
এই সামান্য কথাগুলোয় সেই মিষ্টি গন্ধটা আরও যেন ঘন হয়ে জড়িয়ে ধরল উজ্জ্বলকে। গভীর একটা শ্বাস টেনে সে বলল, মা।
আর কেউ নেই?
না, আর কেউ নেই।
ও। তাহলে তো মায়ের মন খারাপ হবেই।
গভীর একটা শ্বাস ফেলে উজ্জ্বল। ছোট একটা চুমুক দেয় গ্লাসে।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর নিজের ঘরে শুয়ে ছিল উজ্জ্বল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। জানলার পাশে একফালি জমিতে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটা ছিল। এত ফুল ফুটত, এত ফুল ঝরে থাকত নীচে যে, গাছতলার আলোবাতাসটা পর্যন্ত যেন লালচে হয়ে যেত। এই গাছতলাতেই তখন ঈশিতার সঙ্গে দেখা হত উজ্জ্বলের। কথা বলতে বলতে ফুল কুড়িয়ে পাপড়িগুলো ছিঁড়ত ঈশিতা। গাছটা নেই। কাটা পড়েছে। কেমন যেন অসহায় বিধবার মতো দেখাচ্ছে জায়গাটা। উজ্জ্বল অবাক হয়ে দেখল, গাছটার গোড়া থেকে অনেকগুলো নতুন ডালপালা বেরিয়েছে আবার। ওগুলো বড় হবে, আবার ফুল ধরবে, আবার লালচে করে দেবে চারপাশ।
চারটে দিন কোথা দিয়ে যেন কেটে গেল। কাল চলে যেতে হবে। ওদিকের কী খবর কে জানে! বিজু কি ফিরল এলাকায়? আবার কি এসেছিল রানুর কাছে? ভাবতে ভাবতেই রানুকে ফোনটা করে উজ্জ্বল।
অনেকক্ষণ রিং হবার পর উজ্জ্বল শুনল—হ্যালো! ভীষণ ক্লান্ত শোনাল গলাটা।
আমি উজ্জ্বল বলছি।
বুঝতে পেরেছি।
কেমন আছেন?
ওই আর কি! খুব ক্ষীণ গলায় রানু বলল, আমার মনে আছে, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন…। ঠিক মিসড কল পাবেন।
না না, সে জন্যে ফোন করিনি। একটু ব্যস্তভাবে বলে উজ্জ্বল।
ও।
আসলে ভাবছিলাম, কেমন আছেন…?
ও।
আর কোনও প্রবলেম হয়নি তো?
একটু চুপ করে রানু বলল—না।
ভাবলাম ওখানেই আছেন, না কি হাজব্যান্ডের কাছে চলে গেছেন…।
কিছু বলল না রানু। একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।
আপনার হাজব্যান্ড আর এসেছিলেন নাকি…?
আবার চুপ রানু।
হ্যালো…হ্যালো…।
ওর একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল কারখানায়। মারা গেছে। এবার দীর্ঘশ্বাসের স্পষ্ট শব্দ পেল উজ্জ্বল।
চুপ করে থাকে উজ্জ্বল। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না সে। এই রকম অবস্থায় কী বলতে হয় জানা নেই তার। কিছুক্ষণ পর সে খুব আস্তে করে বলল, কবে?
গতকাল।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল উজ্জ্বল। কৃষ্ণচূড়া গাছটা নেই। কেমন যেন হাহাকার করছে জায়গাটা। তাকে স্বস্তি দিয়েই ফোনটা কেটে গেল একসময়।
