৬
হ্যাঁ বলুন, কী যেন বলছিলেন!
ওই তো, লোকটা প্রথম যেদিন এল সেদিনই খুব মুখ খারাপ করছিল…খারাপ খারাপ গালাগালি…।
লোকটার নাম কী?
ভোঁদাই।
হুঁ—ভোদাই কী করে জানালেন?
নিজেই তো বলছিল।
হুঁ—ভালো নাম কী?
তা তো জানি না।
হুঁ—দেখতে কেমন?
দেখতে—? এই ধরুন; কীরকম বলব—!
যা: বাবা, দেখেছেন তো আপনি, দিনের আলোয় স্পষ্ট দেখেছেন, আপনাকেই তো বলতে হবে কীরকম দেখতে, আপনারা পুলিশের কাছে আসবেন, অথচ ঠিকঠাক ইনফরমেশন দিতে পারবেন না, তারপর বলবেন—পুলিশগুলো সব হারামির বাচ্চা…!
এবার মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল রানু। ভয়ঙ্কর বিরক্ত। এখন মনে হচ্ছে থানায় না এলেই ভালো হত। খুব রাগের মাথায় চলে এসেছে। প্রথম দিনেই বেশ রাগ হয়েছিল। তবু কিছু করেনি সে; সহ্য করে নিয়েছিল। আসলে সকালের ওই ঘটনার পর ভেতর ভেতর এতটাই অগোছালো হয়ে গিয়েছিল, এমন ঘেঁটে গিয়েছিল মাথা যে ঠিকমতো বিচারবুদ্ধি কাজ করছিল না তখন। তার ওপর ভোঁদাই এল বিকেলের দিকে। রানু তখন স্টোভে চায়ের জল বসিয়েছে। ওই ছেলেটা চলে যাবার পর থম হয়ে বসেছিল সে। চোখের সামনে বারবার সেই দৃশ্য ভেসে উঠছে। পিঠে ব্যথা, এখানেই ধাক্কা মেরেছিল ছেলেটা। জোরেই মেরেছিল। রানু হুমড়ি খেয়ে পড়তেই চেপে ধরেছিল মুখ। কী লোহার মতো শক্ত হাতগুলো। গায়েও প্রচণ্ড শক্তি। একটুকু নড়তে পারেনি রানু। অজ্ঞান হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। জ্ঞান আসার পর দেখল ঘরের এক কোণে পড়ে আছে সে—হাত বাঁধা, মুখ বাঁধা। ছেলেটা বসে আছে সামনে। তাকিয়ে দেখছে তার দিকে। কেঁপে উঠল রানু। খেয়াল হল, বুকের কাপড় সরে গেছে। সামনেই বসে আছে ছেলেটা। কিন্তু কিছু করার নেই। আশা ছেড়ে দিয়েছিল রানু। অপেক্ষা করছিল কখন নেকড়ের মতো ছেলেটা ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। খাবলে খুবলে খাবে তাকে। নন্দিতার মতো দশা হবে তার। হাত-পা কাঁপছিল, শুকিয়ে কাঠ গলা। কান্না আসছিল খুব। দম বন্ধ হয়ে আসছিল যেন। সে প্রার্থনা করছিল, ছেলেটা কিছু করার আগেই যেন মরে যায় সে। চোখ বুজে প্রাণপণে মৃত্যুকে ডাকছিল রানু।
কিন্তু মরণ তো হল না তার। এবং আশ্চর্য কাণ্ড! কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল না তার ওপর। অপেক্ষা করে করে এক সময় চোখ খুলল সে। জল চাইল ইশারা করে। বাঁধন খুলে জল খেতে দিল ছেলেটা। তাই নয়, একবার বলতেই আর বাঁধল না তাকে। যতক্ষণ ছিল খুবই উদবেগের মধ্যে ছিল ছেলেটা। বারবার জানলা খুলে বাইরেটা দেখছিল। আতঙ্কের মধ্যে ছিল রানুও। মনে হচ্ছিল যে-কোনও সময়ই ও ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর, ছিঁড়ে খুবলে শেষ করে দেবে। তার পর ছেলেটা যখন চলে গেল, সত্যিই চলে গেল, তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না রানু। বিস্ময়ের ধাক্কা এত প্রবল ছিল যে, চিৎকার চেঁচামেচি করার কথা মাথায় আসেনি। রানু পরে ভেবে দেখেছে, ভয় অথবা ছেলেটার প্রতি কৃতজ্ঞতা—তার মেয়েমানুষিকে দলে-পিষে না দেবার কৃতজ্ঞতা—কোনওটাই নয়; সে চিৎকার করেনি শুধুমাত্র বিস্ময়ের দমকে। অগাধ বিস্ময়। সে তখন শুধু একটা কথাই ভাবছিল; ভাবছিল, একেই কি ভাগ্য বলে, এই কি ঈশ্বরের করুণা! ঠাকুর-ঈশ্বরে ভক্তি-ভয় তার কোনওদিনই নেই। বরং শাশুড়ি আর জায়ের নিত্য পুজোপাঠ দেখে, নানা আচার-বিচার দেখে, তার মনে বিক্ষোভই ছিল শুধু এতদিন। মনে হয়েছে, এই তো ভক্তের ছিরি! এই তো তাদের চরিত্র। কী হয় অমন পুজো-অর্চনায়! কিন্তু এখন, এই অলৌকিক নিস্তার পাবার পর, তার চোখে জল আসছিল শুধু। খুব চেষ্টা করেও রোধ করতে পারছিল না সে। হায়, স্মরণ তো করি না তোমায়; বরং যখন-তখন ক্ষোভ অভিযোগের ঝাঁপি উপুড় করে দিই; তুমি বোধহয় শুধু স্মিত হাসি হেসে, সুন্দর চোখে তাকিয়ে থাকো, তাকিয়ে থাকো আর ক্ষমা করে দাও…।
তাই চিৎকার করেনি রানু, শুধু আঁচলে চোখ মুছছিল বার বার। শেষ কান্না কবে কেঁদেছে তার নিজেরই মনে পড়ে না আজ। সে তখন নি:শব্দে কাঁদছিল।
কিন্তু কী করে যেন রটে গেল সব। একজন আশ্রয় নিয়েছে তার কাছে, তারপর অনেকক্ষণ থেকে চলে গেছে।
বিকেলের দিকে সেই লোকটা এল। কালো, মাঝারি উচ্চতা, বড় বড় চুল, চোখ, চোখগুলো খুব ধূর্ত আর লোভী। এই চোখ দেখলে গা শিউরে ওঠে যেন। লোকটা ঘরে ঢুকেই চারদিকে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল একবার; তারপর রানুকে দেখতে লাগল—দেখা মানে, শরীরের কাপড়-চোপড় সরিয়ে তল্লাশি করার মতো দেখা। খুব অস্বস্তি হচ্ছিল রানুর। আঁচল টেনে তাড়াতাড়ি ঢেকেঢুকে নিচ্ছিল নিজেকে। একটু সামলে নিয়েই রানু বলল, আপনি কে?
কোনও উত্তর না দিয়ে রানুকে মেপেই যেতে লাগল লোকটা।
একেবারে ঘরে ঢুকে এলেন যে! গলায় একটু জোর আনার চেষ্টা করল রানু।
এতটুকু পাত্তা না দিয়ে বিছানায় ঝপ করে বসে পড়ল লোকটা।
এবার একটু গলা চড়াল রানু—আমি কিন্তু লোক ডাকব…বলা-কওয়া নেই, একেবারে সোজা ঘরে…!
লোকটা খুব সরু দৃষ্টিতে তাকাল রানুর দিকে। সেই দৃষ্টির সামনে একটু কুঁচকে গেল রানু। তবু গলার জোর ধরে রেখেই বলল, বেরিয়ে যাবেন, না কি—?
ওহ কী গরম আজ—বলে হঠাৎ লোকটা গেঞ্জিটা টেনে তুলে দিল বুকের ওপর। সে দিকে তাকাতেই স্থির হয়ে গেল রানু। ভীষণ ঠান্ডা গুঁড়ি গুঁড়ি লোহার বল যেন গড়িয়ে পড়তে লাগল শরীর দিয়ে। লোকটার কোমরে একটা রিভলভার গোঁজা।
লোকটা খুব শান্ত গলায় বলল, একটু চা হবে না, এই সময়টা একটু চা খাই আমি।
রানুর মাথায় আর কিছু ঢুকছে না। সে শুধু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে ওই কালো অস্ত্রটার দিকে।
বিজু কে হয়?
রানু একটু অবাক হয়ে তাকাল লোকটার দিকে। তার দৃষ্টি থেকেই পরিষ্কার প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি সে।
কে হয় বিজু? এবার একটু ধমকের গলায় বলল লোকটা।
বিজু বলে আমি কাউকে চিনি না। বলতে বলতে রানু বুঝল গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার।
তাই নাকি, উরিশশালা…!
চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল রানু। চায়ের জল টগবগ করে ফুটছে। স্টোভটা নিভিয়ে দিল সে।
কী হল, চা হবে না? কোমরে গোঁজা রিভলভারটা টেনে বের করতে করতে লোকটা বলল, তুই কি লাইনের মেয়েছেলে নাকি মাগি, যাকে-তাকে ঘরে ঢোকাস…!
কী আজেবাজে কথা বলছেন! খুব জোরে বলতে চাইল রানু। কিন্তু জোর এল না গলায়।
আজেবাজে কথা! লোকটা চাপা অথচ হিংস্র গলায় বলল, দুপুরে সে খানকির ছেলেটা তাহলে এসেছিল কেন এখানে?
গলার হিংস্রতায় একটু শিউরে উঠল রানু। অসহায় চোখে দরজার দিকে তাকাল। পাশের ঘরের বউটা রাস্তার কল থেকে বালতি ভরতি জল নিয়ে ফিরল। যাবার সময় আড়চোখে তাকিয়ে গেল ঘরের দিকে।
বউটাকে দেখে কিছুটা যেন সাহস পেল রানু। গলায় একটু জোর এনে বলল, আমার কাছে দুপুরে কেউ আসেনি।
আবার মিথ্যে কথা! জোরে ধমক দিয়ে লোকটা বলল, তাহলে এটা খেয়েছে কে?
মেঝেতে পড়ে থাকা একটা সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে রানুর মুখের সামনে ধরল লোকটা।
রানু চুপ করে তাকিয়ে থাকল সিগারেটের টুকরোটার দিকে। যাবার আগে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল সেই ছেলেটা। এটা তারই অবশেষ। খুব অব্যর্থ প্রমাণ তুলে ধরেছে লোকটা।
কী হল, কী ভাবছিস—? লোকটার ঠোঁটের কোণে যেন শ্লেষের মৃদু হাসি।
রানু একটু বেপরোয়াভাবে বলল, আমার স্বামী কাল এসেছিল, খেয়েছে।
মাগি তোর মরার শখ হয়েছে দেখছি! ফের হিসহিস করে উঠল লোকটা—আমাকে চিনিস না, তুলে নিয়ে গিয়ে তোকে গ্যাং রেপ খাওয়াব, তার পর লঙ্কাবাটা ভরে দেব, তোর স্বামীর সঙ্গে কোনও রিলেশন নেই জানি আমি, আমাদের কাছে সব খবর আছে—দশ গুনব, তার মধ্যে বলবি কি, বিজু কে—?
এবার ভেঙে পড়ল রানু। সকালের ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বলে দিল লোকটার কাছে। ভালো বুঝতে পারছিল এ লোকটা সেই ছেলেটার মতো নয়; যে-কোনও কাজ, খুন হোক বা রেপ, হাই তুলতে তুলতে করে ফেলতে পারে; রানু সম্পর্কে অনেক কিছু জানে লোকটা; এর কাছে গোপন করলে ফল ভালো হবে না।
তবু লোকটার সন্দেহ যায় না। বলে, অচেনা বলছিস যদি, তবে চলে যাবার পর চিৎকার করিসনি কেন—আর্মস কিছু ছিল সঙ্গে…?
অ্যাঁ! রানু একটু অবাক হয়ে বলে।
সঙ্গে মেশিন-টেশিন ছিল, এই আমার মতো? নিজের রিভলভারটা দেখায় লোকটা।
না, দেখিনি তো!
ঠিক বলছিস?
রানু ঘাড় নাড়ে—হ্যাঁ।
কী যেন একটু চিন্তা করে লোকটা। তার পর টপ করে উঠে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
তার পরের ঘটনাটা ঘটল গতকাল রাতে।
ডিউটি থেকে ফিরে রান্না বসিয়েছে রানু। হঠাৎ আবার সেই লোকটা। আগের দিন ছিল খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এখন একেবারে পরিষ্কার গাল। প্যান্টের ওপর একটা লাল পাঞ্জাবি। মদ খেয়েছে মনে হয়—চোখগুলো লাল, গন্ধও ছাড়ছে অল্প। বিছানায় পা তুলে বসল লোকটা; সিগারেট ধরিয়ে বেশ মৌজ করে টান দিয়ে বলল, কী রান্না হচ্ছে আজ?
রানু খুব বিরক্তির সঙ্গে বলল, দেখুন আমি তো আপনাকে যা বলার বলে দিয়েছি, সত্যি কথাই বলেছি সব, কেন তবু বারবার—!
লোকটা মাঝপথে বলে উঠল, জানি তো, আমি কি বলেছি তুমি মিথ্যে কথা বলছ; সে শালার ট্রেস আমরা করে ফেলেছি, ফিনিশ হয়ে যাবে শালা দু-এক দিনের মধ্যেই; ও কেস মিটে গেছে।
তাহলে আর কী জানতে চান?
সিগারেটে লম্বা একটা টান দেয় লোকটা। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, জানতে আর কী চাইব; তেমন কিছু জানার নেই—কই বললে না তো কী রান্না করছ আজ!
লোকটার দিকে ভালো করে একবার তাকায় রানু। লোকটা লোভীর মতো গিলছে তাকে। খুব নিস্পৃহ গলায় রানু বলে, ডাল, ভাত আর ডিমসেদ্ধ।
বাহ! কী ডাল?
মুসুর।
আমার অবশ্য মুগ ডাল ভালো লাগে।
চুপ করে থাকে রানু। চুপচাপ ডালটা হাতা দিয়ে একটু নেড়ে দেয়।
সকালে কী রান্না করলে? একটু দেঁতো হাসি হেসে বলে লোকটা।
সকালে রান্না করি না আমি।
সে কী, খাও কী তাহলে।
আবার চুপ করে থাকে রানু। ডাল ঘাঁটে।
সারাদিন উপোস নাকি?
চুপচাপ ডাল ঘাঁটতেই থাকে রানু।
যাহ শালা! লোকটা যেন একটু হতাশ গলায় বলে ওঠে, কথা বলবে না নাকি আমার সঙ্গে, আমি কিন্তু আজ খারাপ কিছু ব্যবহার করেছি, বলতে পারবে না—সেদিন অবশ্য একটু মুখ খারাপ করে ফেলেছি—আসলে মটকা সেদিন বহুত তেতে ছিল, বিজু শালাটা অসিতদার গায়ে হাত তুলেছে—ফিনিশ হয়ে যাবে শালা, আজ নয় কাল, শালা নেমকহারাম; অসিতদাই একদিন শেলটার দিয়েছিল কুত্তাটাকে—মাইরি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আজ; সেদিনের কথা আর মনে রেখো না।
রানু ডাল নাড়তে নাড়তেই বলে, ঠিক আছে, আপনি আসুন এবার, আমার অনেক কাজ।
করো না তোমার কাজ। লোকটা ফের দেঁতো হাসি হেসে বলে, আমি কি তোমায় ডিস্টাব করেছি!
সে তো একটু করছেন! কিছুটা রুক্ষভাবে রানু বলে, দেখছেন, একটাই ঘর আমার, নিজেরই নড়াচড়া করার জায়গা নেই—তারপর এই রাত্তিরবেলা—লোকে দেখলে কী বলবে বলুন?
আর লোকে কিছু বলবে না। মুখে হাসিটা ধরে রেখেই লোকটা বলে, ভোঁদাইকে এখানে সবাই চেনে, জানে ভোঁদাই মেয়েদের হেবি ভক্তি-শ্রদ্ধা করে—ভোঁদাইয়ের ক্যারেকটারে ফল্ট কিছু নেই—। বলছি, পুজোয় কী করছ তুমি—?
বেশ বিরক্তি নিয়েই রানু বলে, কী আবার করব, ডিউটি করব!
বাবা, পুজোয় ডিউটি, ছুটি নেই!
আমাদের আয়ার কাজে ছুটি থাকে না।
তুমি তো ‘সেবায়ন’ সেন্টারে কাজ করো?
একটু অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকাল রানু। এত সব খবর লোকটা জানল কী করে! মনে পড়ে গেল, লোকটা বলেছিল বটে,—আমাদের কাছে সব খবর থাকে; এমনকী স্বামীর সঙ্গে যে রানুর সম্পর্ক নেই সেটাও জানে লোকটা।
রানু ডালটা স্টোভ থেকে নামিয়ে বলল, হ্যাঁ।
আরে একটা দিন ছুটি নাও না; বলো তো আমি ব্যবস্থা করে দিই, সেবায়নে আমার চেনাজানা আছে—।
রানু ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে, না না। কিছু বলতে হবে না কোথাও!
লোকটা বলে, কাজ তো সারাজীবনই আছে, পুজোর ক’টা দিন—চলো একদিন দুজনে মিলে ঠাকুর দেখে আসি।
খুব কঠিন স্বরে রানু বলে, না।
কেন নয়, আমাকে কি বিশ্বাস হয় না তোমার—মানুষকে পেটের জন্য অনেক কাজ করতে হয়, সেদিন মাইরি মটকা বহুত তেতে ছিল—ওসব মনে রাখলে হয় না।
রানু সোজা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি যাবেন, না হলে কিন্তু খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি—এক্ষুনি বেরিয়ে যান।
কথার প্রচণ্ড ঝাপটে লোকটা একটু যেন থমকে যায়। কিন্তু সে মাত্র মুহূর্তের জন্যে। তারপরেই অশ্লীল একটা হাসি হেসে বলে, রেগে গেলে কিন্তু তোমার গলাটা হেবি সেক্সি লাগে!
কেরোসিন ভেজা কাপড় যেমন দপ করে জ্বলে ওঠে তেমনই কিছু একটা জ্বলে ওঠে রানুর মাথার মধ্যে। সেই আগুনের হলকা পুড়িয়ে দেয় চোখ-মুখ-কান। ভীষণ জ্বালা! কিছু একটা করা দরকার। বড্ড বাড়াবাড়ি করছে লোকটা। আর বাড়তে দিলে বিপদ। তার আগেই কিছু একটা করতে হবে। কী করবে লোকটা! গুলি চালাবে, মেরে ফেলবে? মারুক। মরেই তো আছে সে। কতবার তো মরতে চেয়েছে। এভাবে ঘেন্নার জীব হওয়ার চেয়ে মরণ হোক।
তাই চিৎকার করে ওঠে রানু—এক্ষুনি চলে যান, বেরিয়ে যান—বেরিয়ে যান বলছি—আমি কিন্তু চেঁচাব!
প্রথমে একটু অবিশ্বাস ফুটে ওঠে লোকটার চোখে। তারপর ক্রোধ। চাপা গলায় বলে, চুপ কর খানকি, টুঁটি ছিঁড়ে নেব।
এবার আরও জোরে চিৎকার করে রানু। সোজা উঠে দাঁড়ায়; তারপর হাতের হাতাটা ছুড়ে মারে লোকটার দিকে। বুকে গিয়ে লাগে হাতাটা।
লোকটার চোখে-মুখে তখন দগদগে ক্রোধ। ঘাড় শক্ত হয়ে উঠেছে তার। প্রচণ্ড মুঠো পাকাচ্ছে দুহাতে, এগিয়ে আসতে চায় লোকটা। কিন্তু এই রানু, কোণঠাসা বেপরোয়া রানু, চকিতে ফুটন্ত ডালের কড়াটা তুলে ছুড়ে দেয় সামনে। লোকটা দ্রুত সরে যায়। কিন্তু পুরোপুরি এড়াতে পারে না। কিছুটা গরম ডাল ছিটকে পড়ে গায়ে।
রানু চিৎকার করে, কুত্তা, কুত্তার বাচ্চা—মেরে ফেলব…
একটু যেন যন্ত্রণা ফুটে ওঠে লোকটার মুখে। ভয়ও।
পাশের ঘরের লোকটা আর বউটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আরও কাদের যেন গলা পাওয়া যাচ্ছে জানলার বাইরে।
এদিক-ওদিক তাকায় লোকটা। গরম ডালে ভেজা নিজের জামাটা দেখে। তারপর চাপা গলায় গালাগালি করতে করতে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
থরথর করে কাঁপছে রানু। পাদু-টো কেমন অবশ হয়ে আসছে। ঘরময় পাতলা ডাল। গরম ডালের গন্ধ আসছে। ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে রানু।
তারপর সারারাত টেনশনের মধ্যে কেটেছে। বড় রাস্তার ওপরে যে পুজো হয় সেই পুজো কমিটির ছেলেগুলো চাঁদা চাইতে এসেছিল। ভাগ্যিস এসেছিল সময়মতো! না হলে হয়তো খুনই হয়ে যেত সে। তারা বলেছিল, থানায় যেতে। কিন্তু তখন ঠিক মাথা কাজ করছিল না রানুর। সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সে। জেগে কাটিয়েছে সারা রাত। তক্তোপোশটা ঠেলে দরজার সঙ্গে সেঁটে নিয়েছিল। ভেতর থেকে একটা তালাও লাগিয়ে দিয়েছিল দরজায়। হাতের কাছে বঁটিটা রেখে সারারাত জেগে বসেছিল। কেবলই মনে হয়েছে, এই বুঝি এল লোকটা। সামান্য শব্দে চমকে চমকে উঠেছে। যদিও পুজো কমিটির ছেলেগুলো বলেছিল, চিন্তা করবেন না, আমরা আছি। সারারাত নাকি প্যান্ডেলের কাজ হবে। কিন্তু এখান থেকে বড় রাস্তা বেশ দূরে; গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও শোনা যাবে না।
সকালে উঠে ব্রাশ করছিল রানু। চোখ দুটো জ্বালা করছে। ডান হাতের চেটোতে টসটসে একটা ফোসকা। গরম কড়াটা চেপে ধরেছিল কাল—রাগের মাথায় খেয়াল ছিল না কড়াটা গরম। পাশের ঘরের বউটা এগিয়ে এল। বলল, কাল আর কিছু হয়নি তো রাতে?
না।
আমরা তো খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম—কী জানি একা মানুষ, কখন কী হয়—থানায় যাবে নাকি?
রানু বলল ভাবছি।
গেলেও লাভ হবে না কিছু; এদের সব থানাতেও যোগসাজশ থাকে। বরং উলটে বিপদ বাড়বে।
কিছু বলল না রানু। কথা বলতে ভালো লাগছিল না তার।
বউটা ফের বলল, তোমার দাদা বলছিল, থানা-পুলিশ হলে আমরা কিন্তু সাক্ষী-টাক্ষি দিতে পারব না, লোকটা খুব ডেনজারাস।
একটু বিরক্তির সঙ্গে রানু বলল, না, না, আপনাদের সাক্ষী দিতে হবে না।
বউটা যেন একটু স্বস্তি পেল। বলল, এ কি তোমার চেনাজানা কেউ?
রানু অবাক হয়ে বলল, না তো—কেন?
না, আগের দিন দেখলাম তোমার ঘরে বসে গল্প করছে, তাই…।
গল্প করছে! বেশ বিরক্তির সঙ্গে রানু বলে, গল্প করবে কেন, সেদিনই অসভ্যতা করছিল।
ও। কাউকে বলোনি তো সেদিন, তাই…।
বউটা চলে গেল। ভাবভঙ্গি থেকে পরিষ্কার রানুর কথা বিশ্বাস করেনি।
রানু সিদ্ধান্ত নেয় থানায় যাবে। হোক বিপদ, তবু যাবে। এখনও সেদিনের কথা ভাবলে গা রি-রি করে ওঠে; ঘেন্নায় কুঁকড়ে যায় ভেতরটা।
কিন্তু যত সহজ ভেবেছিল, থানা জায়গাটা সহজ নয়। বড়বাবু জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত। মেজবাবু কোথায় যেন গেছেন। ছোটবাবুর ঘরে মেছো বাজারের মতো ভিড়। বন্দুকধারী একটা পুলিশ বাইরের বেঞ্চে অপেক্ষা করতে বলল। বসে বসে পায়ে ঝিনঝিনে ধরে গেল রানুর; তবু ডাক আর আসে না। মাঝখান থেকে ডিউটি কামাই হল। ফোন করে জানিয়ে দিতে হল, আজ যেতে পারবে না। একদিনের টাকা কাটা গেল। এসব যত ভাবছিল রাগটা মাথার মধ্যে পাকিয়ে উঠছিল তত। শেষে ডাক যখন পড়ল তখন খিদে তেষ্টা আর রাত জাগার ক্লান্তি তাকে বেশ কাহিল করে দিয়েছে। তার ওপর মধ্যবয়সি এই পুলিশ অফিসারের ট্যারাবাঁকা কথা, অশ্লীল মন্তব্য।
তবু মেজাজ শান্ত রেখে রানু বলল, দেখুন, তখন আমি এত ভয় পেয়ে গেছি যে ঠিক খুঁটিয়ে লক্ষ করা হয়নি, যেটুকু মনে আছে বলছি।
বলুন।—বলে, রানুর বুকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা সিগারেট ধরাল পুলিশ অফিসার।
রানু এখন এখান থেকে যেতে পারলে বাঁচে। তাই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি লোকটার বর্ণনা দিল। কিন্তু পুলিশ অফিসার আর সহজে ছাড়তে চাইছে না, হাজার প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে মারছে তাকে। বাপের বাড়ি কোথায়…স্বামী কী করে…একা থাকেন কেন…শ্বশুরবাড়িতে আর কে কে আছে…ওই ছেলেটাকে আগে থেকে চিনতেন কি না…ঠিক করে বলুন…মনে হচ্ছে আপনি কিছু গোপন করে যাচ্ছেন…পুলিশের কাছে গোপন করলে ফল কিন্তু ভালো হয় না, তখন বড় বিপদে পড়বেন…ছেলেটাকে চিনতেন না বলছেন, তাহলে ও চলে যাওয়ার পর চিৎকার চেঁচামেচি করেননি কেন; বিশেষ করে সঙ্গে যখন কোনও অস্ত্র ছিল না…এইখানেই তো আপনার কথা একটু গন্ডগোলে মনে হচ্ছে…পুলিশের কাছে কিন্তু সব খবর চলে আসে…ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
বিরক্তি চেপে যত সংক্ষেপে সম্ভব প্রশ্নগুলোর উত্তর দিল রানু। চলে আসার সময় অফিসারটা গম্ভীর গলায় বলল, ঠিক আছে, সাবধানে থাকবেন, আর কিছু নজরে পড়লেই আমাদের জানাবেন।
বাইরে বেরিয়ে হাঁপ ছাড়ল রানু। থানা এত ভয়ানক জায়গা জানা ছিল না। সবচেয়ে বিরক্তিকর ওই অফিসারটা। সেদিনের ওই নোংরা লোকটার সঙ্গে বেশি কিছু তফাত নেই এর। মুখের ভাষা, চোখের দৃষ্টি, কোনও কিছুর মধ্যেই ভরসা করার মতো কিছু নেই। বরং ভয়ের যথেষ্ট কারণ আছে।
প্রচণ্ড খিদে পেটের মধ্যে দাপাদাপি করছে। বাড়ি গিয়ে রান্না চড়াতে হবে। খেতে এখনও অনেক দেরি। একটুও ইচ্ছে করছে না রান্না করতে। রাস্তার পাশে একটা দোকান থেকে হাফ পাউন্ড পাঁউরুটি কিনল সে। এটাতে ও চালিয়ে দেবে আজকের দিনটা।
বুকের মধ্যে চাপা কষ্ট হচ্ছে একটা। অন্যমনস্ক রানু হাঁটতে হাঁটতে গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল। বড় নোংরা গলি। একপাশে ভটভটে ড্রেন। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। পলেস্তারা খসা কালচে উঁচু দেওয়াল দুদিকে। রোদ-হাওয়া ঢোকে না একদম। এই গলিটায় ঢুকলে কেন কে জানে ভবেশের কথা মনে পড়ে যায় তার। শ্বশুরবাড়ির ঘিনঘিনে স্মৃতি জেগে ওঠে। যত তাড়াতাড়ি পারে গলিটা পেরিয়ে যেতে চায় সে। আজও তাই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল রানু।
বাঁকের মুখে চমকে উঠল রানু। এত জোরে চমকাল যে হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ এলোমেলো হয়ে গেল তার। কয়েক মুহূর্তের জন্যে থেমে গিয়ে তারপর বিপুল বেগে ছুটতে শুরু করেছে তার হৃৎপিণ্ড।
এখান থেকে তার ঘরের দরজাটা দেখা যায়। দরজার সামনে সেই ছেলেটা। প্রথম দিনের সেই ছেলেটা। কী যেন নাম? বিজু। তেমনই বলেছিল লোকটা। থমকে দাঁড়ায় রানু। ভালো করে দেখে। হ্যাঁ, সেই ছেলেটাই। সোজা এদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ পড়ে গেছে রানুর চোখে। ডান হাতটা প্যান্টের পকেটে। সচকিত চোখে চারদিকে নজর রাখছে ছেলেটা। লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এল রানুর দিকে—
ভোঁদাই খুব হুজ্জুতি করছে?
প্রশ্নটা শুনে শুধু বড় বড় চোখ করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে রানু। কথা বলতে পারে না একটাও।
ছেলেটা বলে, আমার জন্যেই আপনার এত ঝুটঝামেলা হচ্ছে।
এবারও কথা বলে না রানু। সামলে নেয় নিজেকে। ভেতরে ভেতরে শক্ত হয়। ভাবে, চিৎকার করবে, যা থাকে কপালে, বাঁচতে ঘেন্না ধরে যাচ্ছে তার।
ছেলেটা খুব নরম গলায় ফের বলে, আসলে সেদিন খুব বিপদে পড়েই…আপনি থানায় গিয়েছিলেন নাকি—?
ছেলেটার ওইরকম নরম করে বলার মধ্যে কিছু একটা ছিল। একটা আন্তরিক অনুশোচনা। চিৎকার করতে গিয়েও থেমে যায় রানু।
থানায় গিয়ে লাভ নেই, ওরা কিছু করবে না…। চুপচাপ ছেলেটার পাশ দিয়ে এগোতে যায় রানু। ছেলেটা একটু সরে দাঁড়ায়। তারপর বলে, ওটাকে শালা আমি সাইজ করে দেব, আপনার কোনও চিন্তা নেই, আর বিরক্ত করবে না আপনাকে।
রানু একবার তাকায় ছেলেটার দিকে। তারপর গলায় বেশ ঝাঁঝ নিয়ে বলে, কেন আমাকে বিরক্ত করছেন, আপনার যা ইচ্ছে করুন, আমাকে জড়াবেন না…!
একটু অবাক চোখে রানুর দিকে তাকিয়ে থাকে ছেলেটা। তারপর বলে, ঠিক আছে। সরি!
বলেই খুব দ্রুত পায়ে গলির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়।
বড় একটা শ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগোয় রানু। জীবন এত ঘেন্নার হয়! বেঁচে থাকা কি এতই নরকযন্ত্রণা! মরে যায় না কেন সে! কেন মরে না যে! ওহ ভগবান…!
