১৫
খুব ক্ষীণ একটা ডাক কানে আসছে উজ্জ্বলের। কেউ নাম ধরে ডাকছে তাকে। সতর্ক হয়ে শোনে সে। খুব চেনা লাগছে গলাটা। চোখ খোলার চেষ্টা করে উজ্জ্বল। দু-চোখে অনন্ত ক্লান্তি। আবার চোখ বুজে ফেলে সে। চোখ বুজে গলাটা চেনার চেষ্টা করে।
উজ্জ্বল, শুনতে পাচ্ছ?
কে ঈশিতা?
যাক। চিনতে পেরেছ তাহলে!
তোমার গলা কি ভোলা যায়!
থাক, মিথ্যে করে আর বলতে হবে না! আমি জানি, আমাকে ভুলে গেছ তুমি!
না না, ভুলিনি…।
বাজে কথা, এখন তুমি কেবল ওই মেয়েটাকে ভাবো।
কোন মেয়েটা?
ওই যে, রানু!
কী যে বলো! একদম ঠিক নয়।
ঠিক নয়? তাহলে ছুতোনাতায় ওর কাছে যাও কেন?
সে তো ইনভেস্টিগেশনের জন্যে। আমাদের কাজটাই এইরকম, সবসময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয়…
ইনভেস্টিগেশন। হাসালে! তাহলে রোজ জল খাও কেন?
পিপাসা পায় যে…।
বাজে কথা। পিপাসা থাকলে কেউ ওইটুকু করে জল খায় না। তুমি আসলে অন্য কারণে মেয়েটার কাছে যাও, আমার কাছে ফাঁকিবাজি চলবে না, বুঝলে, তোমাকে আমি খুব ভালো করে চিনি…। পিপাসা না ছাই!
সত্যি পিপাসা! উজ্জ্বল একটু জোরে বলার চেষ্টা করে—ওই যে ছেলেটা, যাকে ধরতে আমি রানুর কাছে যাই, সেই ছেলেটাও তো একটু একটু করে জল খায়…আসলে রানু মেয়েটা এমন একটা মেয়ে যে ওর সামনে চোঁ চোঁ করে জল খাওয়া যায় না, একটু একটু করে খেতে হয়…।
খুব অবাক গলায় ঈশিতা বলে, তোমার পাগলামিগুলো একদম আগের মতোই রয়ে গেছে দেখছি…এসব অদ্ভুত-অদ্ভুত পাগলামি আগেও ছিল। তোমার ধারণা ছিল ফটফটে চাঁদের আলোয় সাদা পোশাক পরে থাকলে জ্যোৎস্নার গন্ধ পাওয়া যায়। জ্যোৎস্না রাতে সাদা পোশাক পরে অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে ঘুরতে তুমি, আর ঠান্ডা লাগিয়ে জ্বর সর্দি বাধাতে—এ সব বদ্ধ পাগলামি নয়তো কী…!
ঈশিতা তুমি সেই আগের মতনই রাগী রয়ে গেছ দেখছি—সেইরকমই রেগে গিয়ে ঝড়ের মতো কথা বলো, দম দেবার জন্যে বিরতি পর্যন্ত নাও না।
তোমার এই পাগলামিগুলো দেখলে যে-কোনও মানুষেরই মাথা গরম হয়ে যাবে। সবেতেই পাগলামি আর বাহাদুরি, সস্তা হাততালি পাবার চেষ্টা শুধু!
হাততালি আমি কোনওদিন পাইনি ঈশিতা। কেবল ‘দুয়ো’ পেয়ে গেছি সারাজীবন…আমি জানি, সবাই আমাকে ‘দুয়ো’ দেয়, এমনকী থানার কনস্টেবলগুলো পর্যন্ত আমাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে; এতদিন কাজ করেও নাকি ঠিকঠাক পুলিশ হয়ে উঠতে পারিনি আমি!
সস্তা বাহাদুরি নয়…! কী দরকার ছিল ওই গোলাগুলি-বোমাবাজির মধ্যে যাবার…?
এটা তো আমার ডিউটি ঈশিতা। সরকার এর জন্যে আমাকে খাওয়া-পরা দেয়।
আবার বাজে কথা! আরও তো অনেকেই ছিল, কেউ তো ওইরকম উন্মাদের মতো ছুটে যায়নি। তারাও তো পুলিশ; ইনফ্যাক্ট, তোমার সহকর্মীরাই তোমাকে নিষেধ করেছিল যেতে। কারও কথা শোনোনি তুমি।
আমি না গেলে ওরা ওকে মেরে দিত।
কাকে?
বিজুকে। তাড়া খেয়ে বিজু ঢুকে পড়েছিল গলিতে, ওটা ব্লাইন্ড লেন ছিল ঈশিতা…অসিতের ওই ছেলেরা ওকে শেষ করে দেবার জন্যেই ঢুকছিল গলিটায়…আমি না গেলে শেষ করে দিত ওকে।
দিত, দিত…একটা অ্যান্টিসোশ্যালের হাতে আর-একটা অ্যান্টিসোশ্যাল খুন হত। এরকম তো কতই হয়।
কিন্তু বিজু আমার কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড…ওকে আমার জ্যান্ত চাই।
কী করবে?
ওর থেকে অনেক কথা আদায় করতে হবে।
কী কথা?
গোপন কথা সব, পেটের কথা; ভালো কথায় না হলে মেরে ধরে আদায় করব…জানি, সহজে মুখ খুলবে না ও…তবু কথা আমার চাই।
আরও বড় চাঁইদের ধরতে চাও ওকে জেরা করে, তাই তো? কিন্তু তুমি তো খুব ভালো করেই জানো তা অসম্ভব, চারদিক থেকে বাধা আসবে, সরকার-বিরোধী পক্ষ, তোমার বড়কর্তা সবাই তোমাকে বাধা দেবে, টানবে পেছন থেকে। দুর্নীতিতে ভরে গেছে আমাদের সমাজটা।
দুর, দুর…দুর্নীতি-টুর্নীতি নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, এতদিন পুলিশে থেকে এটুকু বুঝে গেছি, ওসব মানুষের বড় কিছু সঙ্কট নয়, মানুষের সঙ্কট অন্য জায়গায়। সেই সঙ্কটের জন্যেই মানুষ অ্যান্টিসোশ্যাল হয়, সেই সঙ্কটের জন্যেই মানুষ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জল খেতে আসে। পিপাসা না থাকলেও আসে, আর একটু একটু করে জল খায়…এসব তুমি ঠিক বুঝবে না ঈশিতা…মাথায় এত রাগ থাকলে এসব বোঝা যায় না।
বুঝেছি, বুঝেছি! ঈশিতা বলে, তুমি আমাকে আর একদম সহ্য করতে পারো না, আমার সব কথাই তোমার খারাপ লাগে। ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি আমি।
প্লিজ, যেও না।
কী করব তোমার আবোলতাবোল বকবকানি শুনে।
প্লিজ, একটু বোঝার চেষ্টা করো।
উন্মাদের কথা বোঝার কী আছে বলো তো। উন্মাদ না হলে কেউ যায় ওই মেয়েটার কাছে? কী আছে মেয়েটার! রং আমার চেয়ে অনেক চাপা, ফিগার আমার অনেক ভালো ওর চেয়ে, চোখ-মুখ তো অতি সাধারণ…শুধু চুলটা একটু বেশি, কপালের চুলগুলো কোঁকড়ানো…মনে করবে আমিও ওইরকম কোঁকড়ানো চুল করে নিতে পারি; দুটো দিন পার্লারে যেতে হবে শুধু…তুমি যদি বলো, কালই যাব পার্লারে।
চুল কোঁকড়ানো! একটু অবাক গলায় উজ্জ্বল বলে, কই খেয়াল করিনি তো।
খেয়াল করোনি! একটু উচ্ছ্বাসের গলায় ঈশিতা বলে, আসলে তেমন বেশি কোঁকড়ানো তো নয়; মনে হয় পার্লারে গিয়ে করিয়েছিল কোনও সময়, এখন আবার সোজা হয়ে গেছে—রংটা কিন্তু বেশ চাপা।
তা হবে।
একদম আর যাবে না ওর কাছে।
কিন্তু বিজুকে তাহলে ধরব কী করে, ওকে তো আমার চাই…জ্যান্ত চাই। মেরে ধরে ওর থেকে কথা আদায় করব আমি। রানু বলেছে, ওকে ধরিয়ে দেবে।
ওহ! আবার সেই রানু। মেয়েটা কী করে বশ করল তোমায় বলো তো, ও মনে হয় ঠিক তুকতাক জানে। সাবধান কিন্তু… মেয়েটা ভালো নয়…দেখলে না, সংসার করতে পারল না।
সে তো ওর স্বামীর জন্যে…ওর বরটা ভালো মানুষ ছিল না।
খুব যে দরদ দেখছি! ঈশিতা একটু ফুঁসে ওঠে—মেয়েদের একটু মানিয়ে চলতে হয়।
ও খুব চেষ্টা করেছিল।
চেষ্টা না ছাই! স্বামী মরে গেছে, তবু সাজগোজের কী ঘটা! মন্দ মেয়ে, খুব মন্দ মেয়ে একটা!
সাজগোজের ঘটা দেখলে কোথায়! একটাই তো শাড়ি রোজ পরে দেখি।
বা বা, তোমার তো খুব উন্নতি দেখছি। কে কেমন শাড়ি পরে তা-ও মনে রাখছ! আগে তো এ সব খেয়ালই করতে না, কত ভালো ভালো শাড়ি-চুড়িদার পরে তোমার কাছে গেছি, কোনওদিন তো বলতে শুনিনি!
আসলে কী জানো, ভালো ভালো পোশাক, দামি পোশাক সব একরকম মনে হয় আমার। মনে হয় একই মেশিন থেকে বেরিয়ে, একই ধান্দায় পৃথিবীতে এসেছে। সেই তুলনায় সস্তা পোশাক, ছেঁড়া-তালিমারা পোশাকের টিকে থাকার নিরন্তর লড়াইকে অনেক যেন বর্ণময় মনে হয়।
ওহ, তোমার পাগলামি কী যে ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সেটা তুমি বুঝতে পারছ না। তোমার চিকিৎসা দরকার। না হলে…না হলে…।
বলতে বলতে ক্ষীণ হয়ে আসে ঈশিতার গলা।
খুব কষ্ট করে চোখ খোলে উজ্জ্বল। এদিক-ওদিক তাকায়। কোথাও নেই ঈশিতা। ছোট একটা ঘরে শুয়ে আছে সে। সাদা বিছানা। ঝোলানো রক্তের পাউচ থেকে ড্রিপ নামছে একটু একটু করে। ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। পেটে অসম্ভব যন্ত্রণা। গলা শুকিয়ে কাঠ।
সাদা পোশাক পরা সিস্টার এগিয়ে আসে তার দিকে। হাতে ইনজেকশানের সিরিঞ্জ।
ধীরে ধীরে আবার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে উজ্জ্বলের।
