২
সকালে উজ্জ্বলের ঘুম ভাঙল শরীর-ভেজা একটা অনুভূতি নিয়ে। শরীরের এই চপচপে ভিজে ভাবটাকে বড় ভয় পায় উজ্জ্বল। যেদিন এমন হয়, দিনটা বড় কষ্টে, বড় দোটানায় কাটে তার।
মনে হয়, কেউ যেন ঠেলে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল তাকে, হাবুডুবু খেতে খেতে কোনওরকমে উঠে পড়েছে পাড়ে, নাক দিয়ে মুখ দিয়ে জল ঢুকে গেছে, জলে একটা গন্ধ, মনখারাপ মনখারাপ গন্ধ গোলা, সেই গন্ধ তার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে অবশ করে দিচ্ছে একটু একটু করে। চারপাশের পৃথিবী ভয়াভয়, ধূসর আর বিস্বাদ, কেবলই মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার কোনও অর্থই হয় না। এই জীবন বড় যন্ত্রণার, ভীষণ একঘেয়ে এই সকাল-দুপুর-সন্ধে, চূড়ান্ত দিশাহীন রোজ এই ঘুমিয়ে পড়া আর জেগে ওঠা। এই অর্থহীন আর ক্লান্তিকর জীবন থেকে তার ছুটি করে নেওয়া উচিত। শুধু একটু মনের জোর দরকার। তাই সার্ভিস রিভলভারটা নিয়ে একা একা নাড়াচাড়া করে উজ্জ্বল। ট্রিগারে আঙুল দিয়ে মাথায় ঠেকায়, অনেকক্ষণ ঠেকিয়ে রাখে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামিয়ে রাখে পাশে।
কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। একটা ইভটিজিং কেস ছিল। গিটার স্কুলের মেয়েদের পিছনে লেগেছিল ক’টা ছেলে। একটা ছেলে আবার লোকাল নেতার। তাই ঝামেলা পাকিয়ে উঠতে দেরি হল না। গ্রুপটাকে ধরেছিল উজ্জ্বল। কিন্তু ম্যাজিকের মতো কোথা থেকে একদল লোক এসে ঘিরে ধরল গাড়ি। দাবি—ছেড়ে দিতে হবে সবাইকে। বেশ কষ্ট করেই সবাইকে হটিয়ে ছেলেগুলোকে থানায় নিয়ে এল উজ্জ্বল। প্রত্যাশামতোই সেই নেতা হাজির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। গন্ধ শুঁকে মিডিয়াও। মিডিয়া না এলে হয়তো বড়বাবু নেতার সঙ্গে একটা রফায় চলে আসত। মিডিয়ার ভয়ে হালকা-পলকামতো একটা কেস দিতেই হল। সব মিটিয়ে উজ্জ্বল কোয়ার্টারে ফিরল তখন বাজে প্রায় বারোটা। খিদে মরে গেছে। খাবার গরম করার ইচ্ছেটাও নেই। কোনওরকমে ইউনিফর্ম ছেড়ে শুয়ে পড়েছিল। ঘুম আসছিল না কিছুতেই। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঘুমের মধ্যে ঝাঁক ঝাঁক আজগুবি স্বপ্ন ছেঁকে ধরল তাকে। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে বড়বাবু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিরক্ত করছে মেয়েদের। গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো সার্ভিস রিভলভার, সেটা হুইসলের মতো বাজাচ্ছে মাঝে মাঝে। উজ্জ্বল গেছে বড়বাবুকে অ্যারেস্ট করতে। সঙ্গে কনস্টেবল বাপি। বাপির হাতে বন্দুক নেই, একটা কোদাল। বাপি বলছে, এটা সোনার কোদাল স্যার, চব্বিশ ক্যারাট সোনার। কোদাল দিয়ে বড়বাবুর চারদিকে মাটি কোপাচ্ছে বাপি। আবার দেখল ওই গিটার স্কুলে গিটার শিখতে যাচ্ছে ঈশিতা। রাস্তায় দেখা হয়ে গেল ঈশিতার সঙ্গে। উজ্জ্বল এগিয়ে গেল ঈশিতার দিকে। বলল, ঈশিতা তোমার বর কোথায়?
ঈশিতা বলল, বর আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
সে কী! কোথায়?
আন্দামানে।
কেন?
একটা জংলি জারোয়া মেয়েকে বিয়ে করেছে। সুখে আছে ওরা।
উজ্জ্বল বলল, তাহলে তো তোমার খুব কষ্ট।
ঈশিতা বলল, সে তো বটেই; সেইজন্যেই তো আমি গিটার বাজাই; যখন কষ্ট হয় তখনই গিটার বাজাই; গিটার বাজালে আর কষ্ট থাকে না।
ও মা, তাই নাকি!
হ্যাঁ; সেইজন্যেই সব দু:খী মানুষের উচিত একটা করে গিটার কেনা।
উজ্জ্বল বলল, আমার তো গিটার নেই।
সেই জন্যেই তোমার এত কষ্ট; এবার একটা গিটার কেনো; ধার করে হলেও কিনে ফেলো…
উজ্জ্বল বলে, আমাকে বরং তুমি বিয়ে করো ঈশিতা।
সেই পুরোনো দিনের মতো ভুরু তুলে অবাক গলায় ঈশিতা বলে, ও মা! তোমাকে বিয়ে করব কেন!
উজ্জ্বল বলে, সেরকমই তো কথা ছিল আমাদের। তখন আমার চাকরি ছিল না বলে বিয়েটা ভেস্তে গেল। তুমি অন্য ছেলেকে বিয়ে করলে।
ঈশিতা বলে, তোমাকে কত করে বলেছিলাম—ভালো করে চাকরির পরীক্ষা দাও, মন দিয়ে জিকে মুখস্থ করো; তা নয়, তুমি কেবল পায়রা পুষতে, কুকুর পুষতে, ঘুড়ি ওড়াতে, আর আমাকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখতে। এসব করে কি চাকরি পাওয়া যায়—তোমায় কিন্তু আমি সময় দিয়েছিলাম, বলো, দিইনি…?
তা অবশ্য ঠিক…। উজ্জ্বল বলে, কিন্তু এখন তো আমি চাকরি করি, এখন তুমি আমাকে চোখ বুজে বিয়ে করতে পারো ঈশিতা। বিয়ের পর তোমাকে নিয়ে সাঁতরাগাছি হানিমুন করতে যাব।
সাঁতরাগাছি!
হ্যাঁ, সাঁতরাগাছি একটা চমৎকার জায়গা, আমার ছোটমাসির বাড়ি, আমি কয়েকবার গেছি, হানিমুনের পক্ষে একবারে আদর্শ জায়গা; সেখানে রেললাইন আছে, আর রেললাইনের ধারে ধারে কত শিংওয়ালা হরিণ ঘুরে বেড়ায়, তারা মানুষের গলায় কথা বলে, তোমার খুব ভালো লাগবে—যাবে তো তুমি…!
হাতের কবজি তুলে ঘড়ি দেখে ঈশিতা। তারপর বলে, না। এখন আর বিয়ে করা সম্ভব নয়…আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে…।
কেন নয়, ঈশিতা…?
পুলিশরা লোক ভালো হয় না—তারা গুলি ছোড়ে, মানুষকে মেরে ফেলে।
উজ্জ্বল খুব কাতর গলায় বলে, আমি কিন্তু আজ পর্যন্ত একটাও মানুষ মারিনি ঈশিতা, বিশ্বাস করো,…গুলি অবশ্য ছুড়েছি; কিন্তু তাতে কেউ মারা যায়নি…।
সে তো তোমার টিপ ভালো নয় বলে। গম্ভীর গলায় ঈশিতা বলে, তার মানে তুমি বন্দুক চালানোটাও ভালো করে শেখোনি; ট্রেনিংয়ে ফাঁকি দিয়েছিলে, এই হচ্ছে তোমার চরিত্রের দোষ, কোনও কিছুই মন দিয়ে শিখতে পারো না; পুলিশ হয়েছ অথচ আনাড়ির মতো বন্দুক চালাও—খুব বাজে তুমি।
উজ্জ্বল বলল, ঠিক আছে এবার রোজ সকালে উঠে মন দিয়ে বন্দুক চালানো প্র্যাকটিস করব, একটা অপরাধীরও আর নিস্তার নেই আমার হাত থেকে, এই দেখো চোখ ছুঁয়ে বলছি; এবার তাহলে আমাকে বিয়ে করবে তো ঈশিতা?
না, তাহলেও করব না। জোরে জোরে মাথা নাড়ে ঈশিতা; একগোছা দলছুট চুল কপালে টিকটিকির ল্যাজের মতো নড়েচড়ে।
তাহলে কেন নয় ঈশিতা?
কারণ পুলিশকে বাচ্চারা খুব ভয় পায়! এই ব্যাপারটা আমার একদম পছন্দ নয়। ভাবো তো, আমাদের যে ছেলে হবে সে তোমাকে কত ভয় পাবে…
উজ্জ্বল বলে, সে তো আমার ছেলে, আমি তো ওর বাবা, আমাকে তাহলে ভয় পাবে কেন?
পুলিশ পুলিশ-ই। ঈশিতা ঠোঁট উলটে বলল, পুলিশ কখনও বাবা হতে পারে না।
উজ্জ্বল একটু করুণভাবে বলে, প্লিজ ঈশিতা ভেবে দেখো একটু, প্লিজ…।
ভাবার কিছু নেই। ঈশিতা বলে, আমার ডিসিশান হয়ে গেছে; আমি ওই গিটার স্কুলের টিচারকে বিয়ে করব।
তখন তাড়াতাড়ি বুকের কাছে হাত দুটো জোড় করে উজ্জ্বল বলতে লাগল, প্লিজ, ঈশিতা প্লিজ…।
ঈশিতার চোখে প্রচণ্ড আতঙ্ক ফুটে উঠল। বলল, তুমি কি আমাকে মারতে চাও, তুমি ওভাবে রিভলভার তুলেছ কেন…?
উজ্জ্বলের খেয়াল হয় তাড়াহুড়োর মাথায় রিভলভারটা হাতে নিয়েই হাতজোড় করে ফেলেছে, আর ঈশিতা ভয় পেয়ে ছুটে পালাচ্ছে…
ঘুম ভেঙে গেল উজ্জ্বলের। শরীরে সেই ভেজা বিচ্ছিরি অনুভূতি। সেইসঙ্গে বিশাল বপু হাতির মতো একটা অবসাদ চেপে আছে শরীরে। বিষণ্ণতার সেই গন্ধ অবশ করে দিচ্ছে ভেতরটা। নিস্তার নেই তার। সারাদিন এই গন্ধ লেগে থাকবে গায়ে। খুব অন্যমনস্ক থাকবে সে; কাজে ভুল হবে বারবার।
টেবিলের ওপর রিভলভার। ভেতরে ছ’-ছ’টা মৃত্যুবাণ। মাথার মধ্যে একটা নিয়ে নিতে পারলেই শান্তি। তখন সেই বিষাদ গন্ধের আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকতে হবে না। ধূসর মন নিয়ে ডিউটিতে যেতে হবে না। মাঝে মাঝেই ঈশিতা হানা দিয়ে বুকের ভেতর আঁচড়ে চলে যেতে পারবে না। ঘুমহীন লম্বা রাতগুলোয় বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে হবে না। শান্তি, শুধু শান্তি—নিটোল শান্তি। পূর্ণিমার রাতে মাখন রঙের চাঁদের আলো যেমন লেপে দেয় চরাচর তেমনি মোলায়েম আর অগাধ শান্তি।
মায়ের মুখটা একবার ভেসে উঠল মনে। মা তার কাঁদতে কাঁদতে কুটনো কুটছে। কেন এই দৃশ্যটা ভেসে উঠল কে জানে! বুকের ভেতরে কী যেন একটা খামচে ধরল। সে মরে গেলে, আর কেউ না কাঁদুক, মা কাঁদবে। খুব কাঁদবে তার জন্যে। কেঁদে কেঁদে হয়তো খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেবে। মায়ের জন্যে এই কষ্টটুকু নিয়েই তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ ছাড়া আর কোনও দু:খ নেই তার। সত্যিই নেই। কোনও কিছুর জন্যেই তার কোনও পিছুটান নেই।
তখনই উজ্জ্বল শুনল সেই গলা। সেই অমোঘ কণ্ঠস্বর। এই গলায় রাগ নেই, বিরক্তি নেই, বিতৃষ্ণা নেই—ভালোবাসাও নেই। এত নির্মম নিস্পৃহ গলা, এত ভয়াভয় উদাসীন বলার ভঙ্গি, শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দৃশ্য—অতিকায় একটা পাথর গড়িয়ে যাচ্ছে, বিশাল গোল বহুতল বাড়ির মতো উঁচু পাথরটা—গড়িয়ে যাচ্ছে একটানা, গড়িয়েই যাচ্ছে খুব ধীরে ধীরে, যা কিছু সামনে পড়ছে—বাড়িঘর গাছপালা মানুষ—সব গুঁড়িয়ে পিষে মিশিয়ে দিচ্ছে মাটির সঙ্গে, এতটুকু চিহ্ন থাকছে না তার। একই গতিতে খুব ধীরে ধীরে গড়াচ্ছে, কিন্তু দেখেই বোঝা যায়, কোনওদিন থামবে না, অনন্ত অনাদিকাল গড়িয়েই যাবে, যা কিছু সামনে পাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যাবে।
এই নিষ্ঠুর উদাসীন গলার সঙ্গে কথা বলার সময়, কেন কে জানে, চোখ বন্ধ হয়ে যায় উজ্জ্বলের!
ঠিক বলছ কি তুমি উজ্জ্বল, কোনও পিছুটান নেই?
গলা শুনেই উজ্জ্বলের মনে হল বুকের ভেতর ভারী কিছু একটা গড়িয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে খুব মৃদু গলায় বলল, হ্যাঁ ঠিক।
আরও একটু ভেবে বলো।
আর ভাবার কিছু নেই।
কিছু ভালো লাগে না তোমার?
না, কিচ্ছু না। জোরে মাথা নাড়ল উজ্জ্বল।
ভেবে বলছ?
হ্যাঁ। টাকা পয়সা, দামি পোশাক, হইহুল্লোড় কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার—এসব পেলে এতটুকু আনন্দ হয় না আমার, সত্যি বলছি, ভেবেই বলছি।
দুর; ওসব ফালতু জিনিস নিয়ে আমোদ শুধু গবেটরাই করে, পেলেই দু-হাত তুলে নৃত্য করে। ওসব ছাড়াও আরও তো কত কিছু আছে—আনন্দের আরও কত শত টুকরো ছড়িয়ে আছে চারপাশে, যাদের চোখ আছে তারা ঠিক খুঁজে নেয়।
উজ্জ্বল ফিসফিস করে বলে ওঠে, সেসব কিছু নেই, কিচ্ছু নেই…কোনও কিছুতেই আমার মোহ নেই।
এই তো কিছুদিন আগে একজন অন্ধ ভিখারিকে তার বাচ্চা মেয়েটা হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছে—তুমি গোগ্রাসে গিললে দৃশ্যটা, যতক্ষণ দেখা যায় দেখলে, দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে তুমি নিজেই প্রায় লরির তলায় চলে যাচ্ছিলে—সত্যি করে বলো এই ফালতু দৃশ্যটায় অমন দেখার কী ছিল? এটা কি ভালো লাগা নয়?—সত্যি করে বলবে কিন্তু…।
চুপ করে থাকে উজ্জ্বল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তারপর আর একদিন—সেই যে একটা সাদা কুকুর চারটে বাচ্চা দিয়েছিল থানা কম্পাউন্ডে, চারটে উলের বলের মতো সাদা সাদা বাচ্চা হুটোপাটি করত, ধুলো মাখত, একদিন রাতে হঠাৎ একটা বাচ্চা গর্তে পড়ে গেল, ভেতর থেকে কী মর্মান্তিক কেঁউ কেঁউ চিৎকার করছিল বাচ্চাটা, বাইরে থেকে মা-টা আকুলি-বিকুলি করছিল, অসহায় আর্তনাদ করছিল ওপর দিকে চোয়ালে তুলে—মনে করতে পারো তুমি…?
হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
তাহলে তুমি সেদিন ঘুমোতে পারছিলে না কেন…কেন ছটফট করছিলে বিছানায় শুয়ে…?
উজ্জ্বল বলল, কানের কাছে ওই প্রচণ্ড চিৎকারে কেউ ঘুমোতে পারে না।
তাহলে সকাল হতেই যখন উদ্ধার করা হল বাচ্চাটাকে, বাচ্চাটা হামলে পড়ে দুধ খাচ্ছিল মায়ের, ওর মা ডুবডুব স্নেহ-মমতায় চেটে দিচ্ছিল গা—দৃশ্যটার মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে যাচ্ছিলে তুমি, মা-কুকুরের চেয়েও যেন বেশি, এক পুকুর দরদ জমেছিল তোমার চোখে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজ্জ্বল বলল, সবই সত্যি, কিন্তু এসব ঘটনা এত গুটিকয় মাত্র ঘটে, আর তুলনায় জীবনটা এত বেশি লম্বা, সময় এমন বিপুল ভারী হয়ে চেপে ধরে, যে কোথায় হারিয়ে যায় সেসব টুকরো-টাকরা ভালোগুলো—মনেও পড়তে চায় না আর…। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি আমি—চলে যাব…।
আচ্ছা, ঈশিতার কথা ভাবো না তুমি, দু:খ হয় না তার জন্যে…?
নাহ, ঈশিতা এখন অতীত, ঘোর অতীত আমার কাছে।
এটা তুমি বড্ড মিথ্যে বললে!
মিথ্যে বলব কেন; একদম সত্যি কথা।
অত সহজ নয় উজ্জ্বল; ঈশিতাকে ভোলা অত সহজ নয়।
ভুলে গেছি, অন গড, ঈশিতার মুখটা ভালো করে আজকাল মনেও পড়ে না আমার।
হাসালে।
কিছু বলে না উজ্জ্বল। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস অজান্তেই যেন বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকে।
তুমি এখনও ঈশিতার মতো ভুরু তুলে কোনও মেয়েকে তাকাতে দেখলে চমকে ওঠো, ঈশিতার মতো কেউ ঘাড় ঘোরালে দুবার ফিরে তাকাও, আর বলছ, ঈশিতাকে ভুলে গেছ…। আসলে সত্যি বলছ না বলেই তুমি আমার কাছে আসতে পারছ না; যেদিন সব সত্যিগুলো ঠিকঠাক নিজের কাছে বলতে পারবে, সেদিন আমি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে নেব—খুব গভীরভাবে সৎ না হলে আমাকে জড়িয়ে ধরা যায় না। সেইজন্যেই তো মৃত্যুকালীন জবানবন্দি মিথ্যে হতে পারে না—একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে তুমি তো জানো, ডাইং স্টেটমেন্টের গুরুত্ব কতটা। ভাবো; আরও গভীরে অবগাহন করে দেখো, আমি তোমার কাছাকাছিই আছি—যেই দেখব তুমি খুব আন্তরিকভাবে চাইছ আমায়, আমি কোলে তুলে নেব তোমাকে—কিন্তু তার আগে সব সত্যি করে বলতে হবে, গোপন কিছু থাকবে না তোমার-আমার মধ্যে…।
উজ্জ্বল বলল, ঠিক আছে, এই মুহূর্ত থেকে আমি ঈশিতাকে একেবারে মুছে ফেলছি মন থেকে; মনের অলিগলি কোথাও ঈশিতার ছায়াটুকু থাকবে না।
তখন মোবাইলটা বেজে উঠল। বড়বাবুর ফোন; জরুরি তলব।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল উজ্জ্বল। ব্যাজার মুখে ইউনিফর্ম পরল। মাঝপথেই ভেস্তে গেল বোঝাপড়া।
মনখারাপ যখনই হয় এইভাবেই একটা মীমাংসা খোঁজে উজ্জ্বল; বোঝাপড়ায় আসতে চায় প্রতিপক্ষের সঙ্গে। যুক্তি-তর্ক চাপান-উতোর। বার বার প্রতিপক্ষের অমোঘ যুক্তিজালে জড়িয়ে যায় সে, তার মিথ্যেটা বেআব্রু হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষ তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তার দুর্দম আসক্তিগুলো, তার অমোঘ পিছুটানগুলো, মাথা হেঁট করে তাই ফিরে আসতে হয় তাকে। আবার বিপুল ভারী দিনগুলো পিঠে তুলে নিতে হয় তাকে—আবার ক্রীতদাসের মতো কুঁজো হয়ে, লম্বা জিভ বের করে, হাঁপাতে হাঁপাতে, পা টেনে টেনে চলতে হয়।
দুবার, মাত্র দুবার, প্রতিপক্ষকে কাবু করে দিয়েছিল উজ্জ্বল। তার শাণিত যুক্তি ফালাফালা করে দিয়েছিল প্রতিপক্ষের সব অজুহাত। যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে সে বুঝিয়ে দিয়েছিল এই পৃথিবীতে আর একটা মুহূর্তও থাকার ইচ্ছে নেই তার; সব গ্রন্থি, সব বাঁধন খুলে ফেলেছে সে—মাথা নামিয়ে ফিরে গিয়েছিল প্রতিপক্ষ। প্রথমটা হয়েছিল বাগনান থানায়, প্রতিপক্ষকে কাবু করে যখন জয়ের আনন্দে সে বুঁদ, মনে হচ্ছে, এবার শুধু শান্তি, অগাধ অতল শান্তি, শুধু উঠে গিয়ে রিভলভারটা তুলে নেওয়া, তারপর মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগারে চাপ, ব্যস! তখনই দৌড়ে তার ঘরে ঢুকল এক কনস্টেবল, এক্ষুনি চলুন স্যার, বিরাট গন্ডগোল, থানা ঘেরাও হয়েছে…।
সেবার আশ্চর্য এক কাণ্ড করেছিল উজ্জ্বল। থানায় গিয়ে দেখল জনা পঞ্চাশ লোকের একটা মব জড়ো হয়েছে গেটের সামনে। একটু একটু করে ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে মন। যে-কোনও সময় মারাত্মক কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। বড়বাবু বেশ নার্ভাস। সাব ডিভিশন কন্ট্রোলে ফোন করে একস্ট্রা ফোর্স চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই আতঙ্কিত—তার আগেই না কিছু একটা হয়ে যায়। উজ্জ্বল গেটের কাছে গিয়ে শান্তভাবে দাঁড়াল। লোকগুলো হাত-পা ছুড়ে, দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কী সব বলছে। দু-একটা ইটের টুকরো উড়ে এল তার দিকে। কে যেন পেছন থেকে বলল—স্যার চলে আসুন! চলে আসার কথা উঠছে কেন উজ্জ্বল বুঝতে পারল না। ওই লোকগুলোর তো বরং এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। এসব হইহল্লার মানে কী! উজ্জ্বলের হাতে শুধু একটা লাঠি; হেলমেট নেই, ঢাল নেই, লেগ গার্ড নেই—সেই চূড়ান্ত অরক্ষিত অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ল, এলোপাথাড়ি লাঠি চার্জ শুরু করল উজ্জ্বল। তাকে ওভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে থানার আরও ক’জন লাঠি চার্জ শুরু করে দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড একটা হইচই, ঠেলাগুঁতো, একটু পরেই জায়গাটা একেবারে ফাঁকা; শুধু ইতস্তত পড়ে আছে কয়েকটা চটি আর ইটের টুকরো এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, উজ্জ্বলের কোনও চোট লাগেনি। কে যেন একজন এগিয়ে এসে বলল, স্যার খুব বড় রিস্কে গিয়েছেন কিন্তু, ফোর্স তো এসেই যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে…।
এতক্ষণ পর এই কথাটা ঠিকমতো মাথায় বসল তার। তখন মনে হল, হ্যাঁ, কাজটা একটু ঝুঁকির হয়ে গেছে; কিন্তু একই সঙ্গে খুব আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল আত্মহত্যার সেই তীব্র ইচ্ছেটা আর নেই; বরং বেশ চনমনে লাগছে; অকেজো হয়ে যাওয়া অনুভূতি, বোদা হয়ে যাওয়া মন, যেন ফের হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয়টা এখানেই। ক-মাস মাত্র আগের কথা। দুপুরে ডিউটি ছিল। সেদিন একেবারে ঝুটঝামেলাহীন ছিল দুপুরটা। প্রচণ্ড গরম, বাইরের পৃথিবী ঝাঁ-ঝাঁ করছে রোদে। মানুষের লোভ ক্রোধ লালসা সব যেন ঝলসে গেছে রোদের মাঝে। পাহারাদার কনস্টেবলটা নতমুখী বন্দুকের বাঁটে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। লক আপে দুটো আসামি। একটা মার্কামারা। চ্যাঙ্কি। আগের দিন রাতে সিনেমা হলে গন্ডগোল করার জন্যে তুলে আনা হয়েছে। অন্যটা অল্পবয়সি একটা ছেলে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিকার গলা টিপে ধরেছিল প্রকাশ্য রাস্তায়। মেয়েটার বাবা খুব ইনফ্লুয়েনশিয়াল। সঙ্গে সঙ্গেই তুলে আনা হয়েছে ছেলেটাকে। দেখে ভদ্রঘরের ছেলে বলেই মনে হয়। দুজনেই ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়েছিল লক আপের দরজার একেবারে সামনে। গ্রিলের গেটের বাইরে একটা টেবিল ফ্যান, প্রচণ্ড গরম বলে উজ্জ্বলই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল; দুজনেই ভাগাভাগি করে হাওয়া পেতে চাইছিল।
সেই ঝিমঝিমে দুপুরে, নির্জন থানায় একা বসে বসে নিজের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলল উজ্জ্বল। পরাজয় স্বীকার করে মাথা নামিয়ে চলে গেছে তার সেই প্রতিপক্ষ। ভারী যেন একটা স্বস্তি বোধ করছে উজ্জ্বল, এবার শান্তি, অনন্ত শান্তি…। শেষ কাজটুকু শুধু বাকি। তখনই লক আপের ভেতর থেকে চিৎকার। ফ্যানের হাওয়া নিয়ে দুজনের গন্ডগোল লেগেছে। চ্যাঙ্কি প্রচণ্ড একটা লাথি মারল ছেলেটার পেটে। ছেলেটা ঝটকাচ্ছে লক আপের মধ্যে। আবার একটা লাথি মারতে যাচ্ছে চ্যাঙ্কি। উজ্জ্বল ধমক দিল; কিন্তু তাকে এতটুকু গ্রাহ্য না করে লাথিটা বসিয়েই দিল চ্যাঙ্কি। আঁক করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল ছেলেটার মুখ দিয়ে।
এক মুহূর্ত দেরি করেনি উজ্জ্বল। লক আপে ঢুকে চুলের মুঠি ধরল চ্যাঙ্কির। তারপর এলোপাথাড়ি মার। শান্তশিষ্ট উজ্জ্বলের এমন টগবগে রাগ কেউ দেখেনি আগে। চ্যাঙ্কি চিৎকার করছে, ক্ষমা চাইছে; কিন্তু উজ্জ্বলের মার থামছে না। কয়েকজন দৌড়ে এসে থামাল উজ্জ্বলকে; না হলে চ্যাঙ্কি হয়তো শেষ হয়ে যেত সেদিন। ধোপা-কাচন ঠ্যাঙানি খেয়ে চ্যাঙ্কি একেবারে ভেবলে গেছে। চোখেমুখে প্রচণ্ড আতঙ্ক। সবাই যখন লক আপের বাইরে টেনে নিয়ে এল উজ্জ্বলকে, তখন সে হাঁফাচ্ছে, হাতের মুঠোতে চ্যাঙ্কির মাথার গোছা চুল।
কী আশ্চর্য! এরপর আত্মহত্যার কথাটা আর মনেই রইল না উজ্জ্বলের। ধীরে ধীরে খুব শান্ত হয়ে গেল মন। খুব স্থিরভাবে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল সে। একটা ফাইল টেনে নিয়ে মন দিল কাজে।
খুবই অন্যমনস্কভাবে থানায় এল উজ্জ্বল। বড়বাবুর ঘরে ঢোকার আগে খেয়াল পড়ল রিভলভারটা আনা হয়নি সঙ্গে। ঘরে ঢুকতেই বড়বাবু একটু বিরক্তির সঙ্গেই যেন বললেন, ফোন ধরতে এত দেরি করেন কেন। দুবার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। উজ্জ্বল ভুলটা বুঝতে পারে, চিন্তার মধ্যে এত ডুবেছিল যে প্রথম রিংগুলো শুনতে পায়নি। একটু ক্লান্ত গলায় সে বলে, বাথরুমে ছিলাম স্যার।
তাড়াতাড়ি যান, পার্বতী সিনেমার কাছে ঝামেলা হচ্ছে—অসিত ঝামেলা পাকিয়েছে।
অসিত। নামটা শোনা উজ্জ্বলের। এখানে আসার পর অনেকবার শুনেছে। এর গ্রুপের একটা ছেলেকে কিছুদিন আগে ধরেছে সে। জেল হয়েছে ছেলেটার। কী যেন নাম ছেলেটার…কী যেন নাম…মনে পড়েছে। বিজু।
