৩
রানু ভাবে, কবে যে বুড়ি হবে সে—কুঁচকে যাওয়া গায়ের চামড়া, তুবড়ে যাওয়া মুখ, ঝুলে যাওয়া বুকের থুত্থুরি বুড়ি। সে খুব চায়, তার বার্ধক্য রাস্তাটাকে ছোট করে নিয়ে তাড়াতাড়ি এসে জমিয়ে সংসার পাতুক শরীরে। বড় ধিক্কার, বড় ঘেন্না।
একলা মেয়ে, যৌবনের মেয়ে দেখলেই তামাম পুরুষকুল যেন হামলে পড়ে হাকলাসের মতো। বেশরম অমানুষ সব। কত যে মুখ তাদের। কেউ বেড়ালের মতো ছোঁক ছোঁক করে, কেউ নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, কেউ আবার কুকুরের মতো ল্যাজ নাড়ে সামনে এসে, উপকারী বন্ধু হতে চায়, তারপর একটু সুযোগেই বের করে লালাঝরা লকলকে জিভ। চলতে ফিরতে রাস্তাঘাটে সর্বদা আতঙ্ক যেন!
কাল রাতে ঘুম হয়নি ভালো। ডিউটি থেকে ফিরে দেখল দরজার সামনে ভবেশ। দেখেই মেজাজ তিতকুটে হয়ে গেল। তারপর আবার বুঝতে পারল, ভবেশ গিলেও এসেছে কিছুটা।
একটু কাঠ কাঠ গলায় রানু বলল, কী ব্যাপার।
ছোট একটা হাই তুলে ভবেশ বলল, খুব তেষ্টা পাচ্ছে, একটু জল দেবে…।
জল খেতেই এখানে এলে…?
আর কিছু থাকলে দাও না, খিদে পেয়েছে মাইরি!
কথা বাড়াল না রানু। গম্ভীর মুখে দরজা খুলে জলের বোতল একটা নিয়ে বাইরে এল; তারপর ভবেশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, খেয়ে বিদেয় হও।
বোতলটা নিতে নিতে ভবেশ বলল, যা: শালা, দোরগোড়া থেকেই বিদেয় করে দেবে…!
কিছু বলল না রানু। চোখ-মুখ কঠিন করে দাঁড়িয়ে রইল।
রানুর দিকে তাকিয়ে ভবেশ বলল, তুমি মাইরিটা দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছ…কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি, পাগুলো ধরে গেল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে…।
বাড়ি যাও, তোমার লোক আছে, টিপে দেবে।
নিজের লোকই তাড়িয়ে দিচ্ছ…কে আর পা টিপে দেবে আমার…। তোমার আজ এত দেরি হল কেন গো…?
আমি তোমার নিজের লোক হতে যাব কোন দু:খে! কঠিন গলায় রানু বলে, তাড়াতাড়ি জলটা খেয়ে তুমি এসো—আমার অনেক কাজ আছে।
সত্যিই তাড়িয়ে দেবে! একটু কাতর গলায় ভবেশ বলল, আমি তো আজ এখানে থেকে যাব ভেবেছিলাম।
না। গলা আরও কঠিন করে বলে রানু।
না কেন…?
না বলেছি, তাই—না! কারণ আমি অতশত ব্যাখ্যা করতে পারব না এখন।
যাহ শালা, নিজের বউয়ের কাছে স্বামী থাকবে, তাতে ‘না’ কেন…আশ্চর্য মাইরি।
কিছু বলে না রানু। চুপ করে থাকে।
কী অসুবিধে বলো, আমি থাকলে…?
অসুবিধে আছে।—বলে খুব জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ভবেশের দিকে একবার তাকায় রানু। লোকটার রোমকূপে রোমকূপে শয়তানি। বিয়ের পর থেকে প্রত্যেক দিনই এই শয়তান দেখে এসেছে সে। বিয়ের কিছুদিন পরেই রানু বুঝল বউদি ভেড়া বানিয়ে রেখেছে লোকটাকে। দাদাটা হাবাগোবা জড়বস্তু। তার সামনেই দেওর-বউদির লীলা চলে। এতটুকু শরম লজ্জা নেই এদের, দয়ামায়া নেই এক ছটাকও। শাশুড়ি আর ননদও তেমনি—চোখ থেকেও অন্ধ, কান থেকেও বধির। মদ খেয়ে ভবেশ যখন রানুকে লন্ডভন্ড মার দিত, কেউ কোনওদিন এগিয়ে আসেনি, থামায়নি ভবেশকে। ওদের চোখের সামনে, ওদের বিকারহীন হাজিরাতেই মার হজম করত রানু। মার খেয়ে চিৎকার চেঁচামেচির ধাত কোনওদিনই ছিল না তার। গরুর মতো স্থির আর বোবা হয়ে মারগুলো হজম করে নিত সে।
একদিন শুধু চিৎকার করেছিল রানু। সজোরে প্রতিবাদ করেছিল, বাধা দিয়েছিল হাত-পা ছুড়ে। সেদিন বেশ জ্বর গায়ে। শুয়েছিল বিছানায়। একটা জামা খুঁজে পাচ্ছিল না ভবেশ। রানুকে জিগ্যেস করল। উঠতে ইচ্ছে করছিল না রানুর; তাই শুয়ে শুয়েই বলল—জানি না। ব্যস; বিছানা থেকে হিঁচড়ে টেনে রানুকে তুলে আনল ভবেশ। মাগি তুই জানিস না তো জানে কে, তোর কোন ভাতার জানে বল, না কি জামার ঠ্যাং গজাল…বুক পকেটের টাকাগুলো কোথায় বল আগে…। বিকট চিৎকার করছিল ভবেশ, আর শিলাবৃষ্টির মতো কিল-চড়-লাথি মারছিল তাকে। সে দিন আর সইতে পারেনি রানু। নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছিল, চিৎকার করছিল, এমনকী আগে যা করেনি কোনওদিন সে, অন্ধের মতো, বেপরোয়ার মতো হাত-পা পর্যন্ত ছুড়ছিল। মনে হচ্ছিল, খুন করে ফেলে লোকটাকে।
তখন সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল ওর ননদ পায়েল। যে ফোনগুলো এলে সিঁড়ির নীচে চলে যায় ও সেগুলো সাধারণত লম্বা ফোন হয়। ফোনের ও-প্রান্ত বোধহয় জানতে চাইল হট্টগোলের উৎস। পায়েল আড় চোখে একবার দেখে নিয়ে খুব বিরক্তির সঙ্গে বলল, কুকুরের খেয়োখেয়ি চলছে! সেদিন ফোন ছাড়ার পর ভীষণই ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল পায়েল, তোমাদের জ্বালায় আর বাড়িতে থাকা যাবে না, যা আরম্ভ করেছ…।
ভবেশের হাত থেকে কোনওরকমে নিজেকে মুক্ত করে রানু বলেছিল, আমাকে বলছ কেন, তোমার দাদাকে দেখছ না…!
সবই তো দেখছি। পায়েল গজগজ করতে করতে বলল, দোষ কিন্তু তোমারই।
আমার দোষ?
নয়তো কী…জানো তো দাদার একটু মাথা গরম, যা বলে একটু মেনে নাও না কেন—মুখে মুখে শুধু তোমার চোপা…। আর তোকেও বলি দাদা, যে ঢ্যাটা তাকে কি মারধোর করে সিধে করা যায়…!
সেদিনই আবার কুটনো কুটতে কুটতে হাত কেটে ফেলেছিল শাশুড়ি। তারও দায় ওই রানুর। কানের কাছে অমন ষাঁড়ের মতো চেল্লালে কি মাথা ঠিক থাকে,…হাত তো কাটবেই—বলি, পুরুষমানুষ রাগ একটু-আধটু করবেই, মানিয়ে গুনিয়ে নিতে হয়, তা নয় মেয়েছেলে হয়ে তুমি হাত তুলবে…!
রানু অবাক—আমি মারলাম কোথায়…!
নিজের চোখেই তো দেখেছি বউমা…। শাশুড়ি মুখ থোম্বা করে বলে, চোখের মাথা তো খাইনি, তুমিই তো ছুটে গিয়ে ওকে লাথি মারলে।
প্রতিবাদ করতে গিয়েও চুপ করে যায় রানু। মনে হয়, ভবেশ একা নয়, সবাই মিলে কিল-চড়-লাথিগুলো মারল তাকে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। বাবার দেওয়া গয়না আর সামান্য কিছু জামাকাপড় নিয়ে জ্বর গায়েই বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। উঠল নবগ্রামে বাপের বাড়ি।
নবগ্রামে বেশিদিন থাকা যাবে না জানত রানু। সেখানে প্রায় পরদিন থেকেই দু-বউদি পাল্লা দিয়ে দুর্ব্যবহার করত। মস্ত অসুবিধে ঘরের। মা যে ঘরটায় থাকে সেটা এত ছোট যে হাত-পা মেলে দিলেই দেওয়ালে ঠেকে যায়। বাক্সর মতো সেই ঘরে হাত-পা মুড়ে ঘাড় গুঁজে গুটিপোকার মতো ক’টাদিন কাটিয়ে দিল রানু। খুব সন্ধান করছিল একটা ভদ্রসভ্য কাজ আর আলাদা বাসার। স্কুলের বন্ধু মিতালির বিয়ে হয়েছিল হাওড়ার খুরুটে। সে-ই আয়ার কাজ আর এই বাসাটার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বাসা মানে, টালি ছাওয়া, ফাটাফুটি নোনা ধরা দেওয়াল আর স্যাঁতসেতে মেঝের খুপরি একটা। বাথরুম অন্য ভাড়াটেদের সঙ্গে কমন। তবে জায়গা হিসেবে খারাপ নয়। নেতাজি সুভাষ রোড হেঁটে মিনিট তিনেক। আয়া সেন্টার ‘সেবায়ন’ কাছেই। খুরুট, কালীবাবুর বাজার, হাওড়া ময়দান, কদমতলা এই সব জায়গাতেই বেশিরভাগ পার্টির বাড়ি। তাই হেঁটেই চলে যায়, বেঁচে যায় গাড়ি ভাড়া।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই রানুর এই বাসাটার কথা জেনে যায় ভবেশ। খুঁজে খুঁজে ঠিক হাজির হয় এখানে। তারপর থেকে মাঝেমধ্যে এসে আঙবাঙ বকে। কখনও বলে—ফিরে চলো; কখনও বলে—আমি এখানে থাকব। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা-ঝগড়া হতেই পারে, তার জন্যে আলাদা থাকতে হবে কেন! কিন্তু রানু অটল। সে জানে, ফিরে যাওয়া মানে নরকের দরজার দিকে জেনে বুঝে পা বাড়ানো।
একটা হেঁচকি তুলে ভবেশ বলে, তুমি কি বলতে চাও আমি তোমার স্বামী নই…?
তোমার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই; আমি রাখতেও চাই না—। গলা আরও কঠিন করে রানু।
যা: শা—লা। তাহলে শাঁখা সিঁদুর পরো কার জন্যে? আবার বিয়ে-টিয়ে করেছ নাকি…?
বাজে কথা ছাড়ো। রানু বলে, জল খাবে তো খাও, না হলে চলে যাও!
বিশ্বাস করো; আজ থাকব বলেই এসেছি।
অবিশ্বাস তো করছি না; কিন্তু এখানে থাকা হবে না তোমার।
কেন গো, তোমার এখানে অন্য কেউ থাকে নাকি? একটু শয়তানির হাসি হেসে বলে ভবেশ।
দাঁতে দাঁতে চেপে রানু বলল, শয়তান, ছোটলোক!
রানু ভালো বুঝতে পারছে জানোয়ারটার মতলব খারাপ। আর একদিনও এইরকম হয়েছিল। তখন নবগ্রামে রানু। সন্ধেবেলা হঠাৎ ভবেশ হাজির। এসেই মায়ের পা ধরে খুব এক প্রস্থ কান্নাকাটি হল—বড় অপরাধ করে ফেলেছে সে, মরমে মরে যাচ্ছে, মা যেন তাকে ক্ষমা করে দেয়। তারপর বলল, রাতে থাকব। সে নাকি অন্য বাসার সন্ধান করছে, ব্যবস্থা হয়ে যাবে দু-চার দিনের মধ্যেই, সেখানে নিয়ে যাবে রানুকে, অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়…ইত্যাদি। রানু বুঝতে পারছিল সব ধাপ্পা, অন্য মতলব আছে শয়তানটার, চোখ মুখই বলছে খারাপ ধান্দা নিয়ে এসেছে লোকটা। সে সোজা বিদেয় করে দিতে চেয়েছিল। মা নারাজ—আহা তা কি হয়, জামাইয়ের মতি ফিরেছে যা হোক—মানুষ তো ভুল করেই…। মা তাই জামাই আদর করল; নিজে ঘর ছেড়ে বাইরে শুল। আর সারারাত ধরে রানুকে উস্তম খুস্তম করে দলেছিল ভবেশ, পশুর মতো ভোগ করেছিল। মা দরজার বাইরেই শুয়ে, তাই বেশি তর্কবিতর্ক, বাধা-আপত্তি করতে পারছিল না রানু। কাঠ হয়ে শুয়ে থেকে সইয়ে নিচ্ছিল ভবেশের অত্যাচার। কী খিটখিটে গ্লানি যে হয়েছিল সেদিন। তারপর বেশ ক’দিন খুব অশুচি লাগছিল নিজের শরীরটাকে।
আজও রানু বুঝতে পারছে তেমনই কিছু কু-ইচ্ছে আছে লোকটার। ওর চোখ মুখ তেমনই বলছে, তাই সে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনওরকম প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না লোকটাকে।
ভবেশ আবার বলে, থাকে না কি অন্য লোক…?
আমি কিন্তু চিৎকার করব এবার! রানু একটু ফুঁসে ওঠে।
শয়তানি হাসিটা মুখে ধরে রেখেই ভবেশ বলে, এটা কিন্তু তোমার অন্যায়—আমার নামে শাঁখা সিঁদুরটা চালাবে, আর অন্যজনের সঙ্গে পিরিত করবে—তা কী করে হয়…?
রানু বলে, তুমি নোংরা, তাই তোমার মনও নোংরা!
তাই সই। হলুদ দাঁতের হাসি হেসে ভবেশ বলে, গোটা পঞ্চাশ টাকা দাও, কেটে পড়ি।
টাকা! খুব অবাক গলায় বলে রানু।
হ্যাঁ রে বাবা, টাকা!
তুমি আমার থেকে টাকা চাইছ?
বিশ্বাস করো, মাইরি বলছি, খুব দরকার—এ মাসে মাইনে পাইনি।
কেন, মাইনে পাওনি কেন?
কোম্পানি সাসপেন্ড করেছে—আমাদের চারজনকে এ মাস থেকে…।
কী কীর্তি করেছ?
একটু চুপ করে থাকে ভবেশ। তারপর বলে, সে অনেক কথা, পরে বলব’খন…।
আমার শোনার দরকার নেই! রানু বলে, টাকা আমি দিতে পারব না, পাব কোথায় টাকা!
সত্যি বলছি, মাইরি বিশ্বাস করো। একটু কাতর গলায় বলে ভবেশ।
তুমি কি জলটা খাবে?
হ্যাঁ হ্যাঁ খাব।
বোতলের ছিপি খুলে আলগোছে জল খাচ্ছিল ভবেশ। হাত কাঁপছে। জল চলকে পড়ছে গলায় বুকে। হঠাৎ বিষম খেল। সেইসঙ্গে প্রচণ্ড কাশির দমক। কাশতে কাশতে বসে পড়ল। কপালের শিরা ফুলে উঠেছে, চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে মণিকোঠা থেকে।
ব্যাগটা তাড়াতাড়ি পাশে রেখে ভবেশকে ধরল রানু। হড়হড় করে বমি করে দিল ভবেশ। পাশের ঘর থেকে মাঝবয়সি বউটা বেরিয়ে এসেছে; অবাক হয়ে দেখছে দৃশ্যটা।
বমি হবার পর কাশিটা থামল। চোখ মুখ লাল ভবেশের। নেতিয়ে পড়েছে যেন। ঘরের সামনেই শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল। রানু তাড়াতাড়ি দরজা খুলে ঘরে শুইয়ে দিল ভবেশকে।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে কাল চলে গেছে ভবেশ। তবে যাবার আগে কুড়িটা টাকা আদায় করে নিয়ে গেছে। তার সঙ্গে নাকি ফেরার গাড়ি ভাড়াটাও নেই।
বমি-টমি পরিষ্কার করে শুতে রাত হল কাল। ঘুম হল না ভালো। নানা চিন্তা মাথার মধ্যে টিকিস টিকিস করছে। কাজটা গেছে ভবেশের। এখন টাকার ধান্দায় যখন-তখন হানা দিলেই তো মুশকিল। লোকটার আটকায় না কিছু।
আজ ডিউটিতে যায়নি। গুচ্ছের কাজ—কাচাকুচি ঘর ঝাড়া বাজার দোকান—সব জমে জমে ছোটখাটো পাহাড় একখানা। মাথার মধ্যে চিন্তার টিকটিকিনি নিয়েই দোকান বাজার করেছে। ক’দিন পরেই পুজো। বাজার যেন আগুন। ওর মধ্যেই বিস্তর ঘোরাঘুরি করে দামদস্তুরের পর কেনাকাটা করতে হয়েছে। আর তার মধ্যেই ছ্যাঁকা খেতে হয়েছে পুরুষমানুষের লোভ লালসার। এক জায়গায় কচু বিক্রি হচ্ছিল। কচুগুলো ভালো, দামও কম। বেশ ভিড় জায়গাটা। ভিড়ের মধ্যে একটা হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল রানুর বুক। ভিড়ের জন্যে খুব বেশি সরে দাঁড়াবার উপায় নেই, লোকটার সাহসও বাড়ছে, আড়চোখে রানুর দিকে তাকিয়ে মৃদু ইঙ্গিতও ছুড়ল একটা। বিরক্ত রানু কচু না কিনেই চলে এল সেখান থেকে।
তারপর রাস্তায় আর একজন। এ লোকটার বয়েস হয়েছে বেশ—চুলটুল সব সাদা। রাস্তার এক জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে—ভয়ানক এবড়োখেবড়ো জায়গাটা। অন্যমনস্ক রানু হোঁচট খেল। বাঁ-হাতের ব্যাগটা ছিটকে পড়ল রাস্তায়—আলু ছিল ব্যাগে—সব রাস্তায় গড়াগড়ি। আহা-আহা করে এগিয়ে এল বুড়ো লোকটা। ব্যাগটা নিয়ে তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে দিল আলুগুলো। তারপর মাথায় হাত রেখে নাম কী, বাড়ি কোথায়…এইসব। মাথার হাত পিঠে নামল একটু পরেই, আর পরক্ষণেই রানু বুঝতে পারল হাতটা নোংরামি শুরু করে দিয়েছে। লালা চকচকে জিভ বের করে ফেলেছে বুড়ো। মনে হল, বুড়োর চোখ দুটো গেলে দেয় আঙুল গুঁজে। ব্যাগটা ছিনিয়ে নেবার মতো করে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে এল রানু।
দু-হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটছে রানু। যেন বাইরের এই আব্রুহীন জগৎ, এই লোভ-লালসার গনগনে আঁচ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে তাকে। হাঁটছে আর ধিক্কার দিচ্ছে তার এই নারীজন্মটাকে। ভাবছে কতদিন—আর কতদিন শরীরের এই বাহুল্যগুলো—এই টানটান ত্বক এই ভরাট বুক বয়ে বেড়াতে হবে তাকে! কতদিন ছ্যাঁকা খেতে হবে পুরুষের লালসার!
নিজের ঘরের সামনে এসে থামে রানু। ব্যাগগুলো হাত থেকে নামিয়ে দম নেয়। খুব জোরে হেঁটেছে, ঘাম হচ্ছে দরদরিয়ে। পাশের ঘর দুটো তালা দেওয়া। মাঝবয়সি স্বামী-স্ত্রী দুটো দশ-বারো বছরের মেয়ে নিয়ে থাকে। এখনও তেমন আলাপ পরিচয় হয়নি। কাল যখন ভবেশ বমি করছিল উঁকি দিয়ে দেখছিল বউটা। চোখে-মুখে থকথকে হয়ে জমে আছে কৌতূহল। এই সব কৌতূহলকে বড় ভয় পায় রানু। আজ সকালেও বউটা আর মেয়েদুটো বার বার দেখছিল তাকে। রানু জানে, আলাপ জমাবার জন্যে এদের প্রাণ একেবারে আনচান করছে। রানু কোনও সুযোগ দেয়নি। চোখে চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। একটু গম্ভীর করে নিয়েছে মুখটা।
ঘরে তালা খোলে রানু। দরজা দুটো ঠেলে।
তখনই প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খায় পিছনে। কেউ যেন ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় তাকে, তারপর কঠিন হাতে চেপে ধরে মুখ।
ছটফট করে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে রানু। শরীরের যত শক্তি সব এক করে একটা ধাক্কা দেবার চেষ্টা করে সে। হাত দিয়ে টেনে মুখের হাতটাকে সরাতে চায়। কিন্তু হাতের মালিক প্রবল রকমের শক্তিমান। আরও কঠিনভাবে চেপে ধরে তাকে। এতটুকু নড়াচড়া করার ক্ষমতা থাকে না রানুর।
এবার প্রচণ্ড ভয় পায় সে। ভয়ের ঠান্ডা একটা স্রোত শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে আসে। পেটের মধ্যে থেকে কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠে আসে বুকে। সে ধর্ষিত হতে যাচ্ছে। উহ ভগবান, এই ছিল তার কপালে, তার আগে মৃত্যু হল না কেন তার?
তবু শেষ একটা মর্মান্তিক চেষ্টা করে সে। পা ছুড়ে লাথি মারার চেষ্টা করে পেছনের লোকটাকে। তখন কানের কাছে হিসহিস করে ওঠে একটা গলা—চুপ, একদম চুপ, খুন করে ফেলব কিন্তু!
অসহায় রানুর চোখে ভেসে ওঠে একটা ছবি। তাদের বাড়ির পাশে থাকত নন্দিতা। একসঙ্গে খেলত তারা। তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভ হবে, হঠাৎ একদিন নন্দিতা নিখোঁজ। চারদিকে খোঁজ খোঁজ—কোথাও পাওয়া গেল না তাকে। পরদিন সকালে ঘোষালদের বাঁশবাগানে পাওয়া গেল নন্দিতাকে। নগ্ন পড়ে আছে, প্রাণ নেই শরীরে, মাথাটা একদিকে হেলা, সারা শরীরে আচড় কামড়ের চিহ্ন। এখন হঠাৎ সেই ছবিটা ভেসে ওঠে চোখে। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরে যায় তার। পা দুটো কেমন হালকা হয়ে এল।
ধীরে ধীরে কঠোর আলিঙ্গনের মধ্যেই নেতিয়ে গেল রানু।
