১৭
লাইন দিয়ে সবাই আসে। একজনের পর আর একজন। কখনও জড়াজড়ি হয়, এ-ওর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বড়বাবু তার দেশের বাড়িতে গেছে; গিয়ে উঠেছে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটায়। একটার পর একটা ফুল ছিঁড়ে কচমচ করে খাচ্ছে। নীচে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল বলছে, আর খাবেন না স্যার, এ ফুল বেশি খেলে পেট ব্যথা হয়। তারপর দেখল, পকেটমার গোবিন্দ লুডো খেলছে ঈশিতার সঙ্গে। নিখুঁত চোট্টামি করে জিতছে ঈশিতা। উজ্জ্বল পাশে দাঁড়িয়ে গোবিন্দকে সাবধান করছে; কিন্তু শুনতে পাচ্ছে না গোবিন্দ। জোরে চিৎকার করছে উজ্জ্বল, কিন্তু মুখ দিয়ে কেবল স্টিম ইঞ্জিনের মতো ভসভস করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এদিকে আবার পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ডানা লাগানো বাইকে চেপে সাঁই সাঁই করে উড়ছে প্রসূন হাজরা, পিছনের সিটে কোমর জড়িয়ে ভোঁদাই, উজ্জ্বল রিভলভার থেকে পর পর গুলি ছুড়ছে, একটাও লাগছে না; ঠিক পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রসূন; কৃষ্ণচূড়া গাছের মগডাল থেকে বড়বাবু চিৎকার করছে ঊর্ধ্বমুখে, এ চাইনিজ মাল দাদা, সাবধানে চালাবেন, কোনও গ্যারান্টি নেই। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল ঈশিতা। হাতে মস্ত লুডো। বলল, খেলবে?
উজ্জ্বল বলল, গোবিন্দর কী হল?
পালিয়েছে।
পালাল কেন?
হেরে ভূত হয়ে যাচ্ছিল।
দু-একবার ওকে জিততে দিলে না কেন?
আমি কী করব; খেলতে না পারলে তো হারবেই।
কিন্তু তুমি তো হুড়কে করছিলে।
বাজে কথা; একদম বাজে কথা! তুমি তো আমার ভালো কিছু দেখো না। তুমি নিজে চোর, তাই সবাইকে চোর বলো। ঝাউ ঝাউ করে ওঠে ঈশিতা।
আমি চোর!
চোর নয়তো কী; আমার একটা চুলের ক্লিপ চুরি করেছিলে, মনে নেই?
তোমার চুলের ক্লিপ! কবে?
ভেবে দেখো, সেই একদিন দুপুরে তোমার কাছে গিয়েছিলাম, খুলে পড়ে গিয়েছিল ক্লিপটা, কালো ক্লিপ একটা।
ওটা চুরি হল!
হল তো, পরের দ্রব্য না বলে নিলে চুরি করা হয়।
কিন্তু তোমাকে তো বলে দিয়েছিলাম; বলেই রেখেছিলাম নিজের কাছে; ওই ক্লিপটায় তোমার চুলের গন্ধ ছিল।
একটু যেন থমকে গেল ঈশিতা। তারপর আরও জোরে বলে উঠল, তুমি তাহলে ডাকাত; পরের দ্রব্য বলে নিলে ডাকাতি করা হয়; তুমি আস্ত ডাকাত; তোমার নামে আমি লালবাজারে ডায়েরি করব।
প্লিজ ঈশিতা!
তাহলে ক্লিপটা দিয়ে দাও আমায়।
আচ্ছা, দিয়ে দেব।
না, তুমি দিতে পারবে না; আমি জানি, কারণ তুমি ওটা রানুকে দিয়ে দিয়েছ।
রানুকে?
হ্যাঁ, আমার চারদিকে চর আছে; রানু আর তোমাকে ওটা ফেরত দেবে না, আমি এখনই যাচ্ছি থানায়…।
প্লিজ…প্লিজ! হাত বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি ঈশিতাকে ধরতে যায় উজ্জ্বল।
ঘুম ভেঙে যায়।
সামনে একটা মেয়ে। বেডের পাশে একটু জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা ঈশিতা নয়। খুব চেনা চেনা লাগছে মেয়েটাকে। ভালো করে দেখে উজ্জ্বল। চিনতে পারে। একটু যেন রোগা হয়ে গেছে রানু।
উজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে রানু বলে, কেমন আছেন?
ভালো। উজ্জ্বল বলে, তুমি খবর পেলে কোথায়?
রানু বলে পেয়েছি; সবাই তো বলছে, মেজোবাবু খুব সাহসী। কোথায় লেগেছে?
কী জানি; চারদিকেই তো ব্যান্ডেজ।
কবে ছাড়বে?
তাও জানি না।
হঠাৎ উজ্জ্বলের চোখে পড়ে গেল রানুর চুলে একটা কালো ক্লিপ। অনেকটা যেন ঈশিতার ক্লিপের মতো। উজ্জ্বল খুব মন দিয়ে দেখতে থাকে ক্লিপটা।
উজ্জ্বলের অমন অপলক দৃষ্টির সামনে একটু যেন লজ্জা পেয়ে গেল রানু। মুখ নামিয়ে নিল।
উজ্জ্বলের মনে হল, লজ্জা পেলে মেয়েটাকে একটু বেশি ভালো দেখতে হয়ে যায়। চোরের মতো সেই উপরি ভালোটুকু দেখে নেয় উজ্জ্বল। তারপর বলে, জানো তো, বিজু ধরা পড়েছে।
জানি।
সেই যে গন্ডগোল শুনে তোমার ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম, সেদিনই ধরা পড়েছে। তোমাদের ওই গলির মুখটা থেকেই ধরেছে পুলিশ।
যাক বাবা, বাঁচা গেছে।
কেমন এলোমেলো ঘুরছিল। পুলিশ দেখেও নাকি পালাবার চেষ্টা করেনি।
একটু যেন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে রানু। আঁচলটা ভালো করে টেনে নেয় গায়ে। বলে, আপনি কিন্তু সাবধানে থাকবেন।
উজ্জ্বল বলে, আমাদের যা চাকরি…!
কী দরকার অমন চাকরি করার, ছেড়ে দিন…কত বড় একটা বিপদ গেল বলুন তো!
আমিও মাঝে মাঝে ভাবি ছেড়ে দেব, কিন্তু একটা কাজ যে এখনও বাকি থেকে গেল আমার।
কী কাজ?
বিজু ধরা পড়েছে; এবার ওর পেট থেকে কথা বের করতে হবে।
সে না হয় অন্য লোক করবে…আপনাকে অত ভাবতে হবে না।
ওরা পারবে না; যে ক্রিমিনাল ঝুঁকি নিয়ে জল খেতে আসে, একটু একটু করে জল খায়, তার পেট থেকে কথা বের করা অত সহজ নয়…আমি ছাড়া কেউ পারবে না।
একটু যেন কেঁপে ওঠে রানু। মেজোবাবুকে খুব দুঁদে পুলিশ অফিসার মনে হচ্ছে এখন। এমন একজন, যে অপরাধীর কাছ থেকে সব কথা আদায় করে নিতে পারে। জেরার পর জেরা করে মনের সব আনাচকানাচ সার্চলাইট ফেলে দেখে নেয়। এর কাছে থাকতে কেমন ভয় ভয় করে।
রানু বলে, আসি আমি।
চলে যাবে? হঠাৎ উজ্জ্বল হাত বাড়িয়ে রানুর একটা হাত ধরে বলে, আর একটু…
দাঁড়িয়ে থাকে রানু। চোখ বুজে বড় একটা শ্বাস নেয়।
ধীরে ধীরে রানুর হাতটা ছেড়ে দেয় উজ্জ্বল।
রানু বলে, ওর তো জেল হবে আবার?
হবে হয়তো।
কত দিন?
হয়তো পাঁচ বছর, হয়তো দশ বছর—যাবজ্জীবনও হতে পারে।
যাবজ্জীবন!
কিন্তু কোনও লাভ নেই। যে ক্রিমিনাল একটু একটু করে জল খায়, যে পুলিশ দেখলেও পালায় না, তাকে হাতকড়া পরাতে নেই, তাকে সারাজীবন জেলে রেখেও লাভ হয় না কিছু। আবার মুশকিল কী জানো, বাইরেও তারা নিরাপদ নয়। পদে পদে বিপদ—পুলিশ চেজ করে, অ্যান্টিগ্রুপ টার্গেট করে, নিজের গ্যাং বলির পাঁঠা বানায়। তারা কেবল ছুটে বেড়ায় তখন।
রানু চুপ করে থাকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিজু ছুটছে, তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছে রানুর ঘরে…সে অজ্ঞান হয়ে এলিয়ে পড়ে আছে বিজুর বুকের মধ্যে; ভারি মমতায় তার মুখটা দেখছে বিজু।
উজ্জ্বল বলে, রানু তুমি চলে যাও।
কোথায়?
এখান থেকে অন্য কোথাও। এখানে তোমার অনেক বিপদ, তুমি টার্গেট হয়ে গেছ।
জানে রানু। চুপ করে থাকে সে।
উজ্জ্বল বলে, সেরে উঠলে আমিও হয়তো এখানে থাকব না আর।
সিস্টার এগিয়ে আসে। বলে, ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ।
বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানু। বলে, আমি আসি।
চলে যাবে!
সময় নেই যে।
আর হয়তো দেখা হবে না। তোমাকে কী যেন একটা জিগ্যেস করব ভেবেছিলাম।
কী?
সেটাই তো মনে পড়ছে না।
একটু দাঁড়িয়ে থাকে রানু। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে।
রানু চলে যাবার পরই মনে পড়ে যায় উজ্জ্বলের। সেই কথাটা, যা বলবে ভেবেছিল রানুকে। একদিন রানু তাকে বলেছিল, তার নাকি কেবল বুড়ি হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এখনও কি রানু তাই চায়? দিনরাত কেবল বুড়ি হয়ে যেতে চায়?
চলে গেছে রানু। আর তো দেখা হবে না। জানতে পারলে বড় ভালো হত।
হঠাৎ মৃদু একটা হাসি ফুটে ওঠে উজ্জ্বলের ঠোঁটের কোণে। উত্তরটা পেয়ে গেছে সে। একটু আগে একবার রানুর হাতটা ধরেছিল। কিছু কিছু হাত একবারই ধরা হয় জীবনে; তারপর ছেড়ে দিতে হয়। খুব যেন গরম ছিল রানুর হাতটা। বুড়ি হতে চাওয়া হাত কখনও এত গরম হয় না।
ভারি স্বস্তি বোধ করে উজ্জ্বল। এত স্বস্তি যে আবার ঘুম পাচ্ছে তার। ঘুমোবে। ঘুমোলেই ঈশিতা আসবে। ঝগড়া করবে। রাগ দেখাবে। কাঁদবে। ঈশিতার এই রাগ, দু:খ, এই কান্না থেকে মুক্তি নেই তার। ঈশিতা তাকে ছাড়বে না। সারা জীবন ঝগড়া করতে হবে ঈশিতার সঙ্গে।
রানু হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে কেউ লক্ষ রাখছে তাকে। ফলো করছে। হয়তো অসিত, হয়তো পলাশ, থানার সেই অফিসারটা, ভোঁদাই হয়তো, কিংবা ভবেশ। হয়তো এরা সবাই। চিতাবাঘের মতো গুঁড়ি মেরে ফলো করছে তাকে। সুযোগ পেলেই…।
মেজোবাবু এখান থেকে চলে যেতে বলছে তাকে। কিন্তু কোথায় যাবে? বিজু যখন ছাড়া পাবে তখন সবাই তাড়া করবে বিজুকে। তখন কোথায় লুকোবে বিজু? সে না থাকলে কার ঘরে ঢুকে লুকিয়ে পড়বে?
তাই এখানেই থাকতে হবে তাকে। যতদিন না ছাড়া পায় বিজু। পাঁচ বছর, দশ বছর…বা হয়তো যাবজ্জীবন। জীবন আর ক’টাদিন? সে তো বুড়ি হয়ে ফুরিয়ে ফেলতে চায় জীবনকে। বুড়ি হওয়ার জন্যেই না হয় অপেক্ষা করবে বাকি ক’টাদিন।
***
