পাখির বাসা – ১৪

১৪

বিজু দৌড়োচ্ছে। প্রাণান্তকর দৌড়। একটা হাত নিয়ে ছোটা খুব ঝামেলার। বারবার বেটাল হয়ে যাচ্ছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো হচ্ছে। দমও হালকা হয়ে আসছে তার।

বুকে টান লাগছে। ভারী হয়ে যাচ্ছে পা-দুটো। তবু থামতে পারছে না বিজু। পেছনে কেউ আসছে—হয়তো অসিত, কিংবা পলাশ, খোলা রিভলভার হাতে মেজোবাবুও হতে পারে। মেজোবাবুর বুকে পাগলাটে দম। হাঁপায় না শালা লোকটা। সেবার মেজোবাবুই ধরেছিল তাকে। কেমন মেশিনের মতো দৌড়োয় লোকটা। থামার পর বড় বড় করে শ্বাস ফেলে না, একটুও ওঠানামা করে না বুক; যেন মনে হয় দৌড়োয়নি, হাওয়ায় ভেসে ভেসে চলে এসেছে।

এমন গান্ডু-মার্কা পুলিশও আগে দেখেনি বিজু। আজ কী করতে চাইছিল মেজোবাবু? এ তো একরকম সুইসাইড!

বিজু খবরটা পেল লাস্ট মোমেন্টে। এত বোমকে গিয়েছিল যে প্রথমে পালাবার কথা মাথায় আসেনি। ফোনের ওদিকে স্যাম্পেল উত্তেজিত গলায় বলছে, কী ক্যালানের মতো ‘ভ্যাট’ ‘ভ্যাট’ করছ, আগে কেটে পড়ো…।

পলাশ নাকি বিজুকে সরাতে চাইছে। হ্যাঁ, বিজুকে। পলাশের অবস্থা ভালো নয়। বুলটিন বডি। ভাইলালের যে ছেলেগুলোকে পলাশ টেনেছিল তারা আবার ভাইলালের কাছে চলে গেছে। ভাইলাল নিজে শার্প শুটার; আরও একস্ট্রা দুটোকে জোগাড় করেছে। প্রসূন হাজরার অ্যান্টি গ্রুপ পেছনে আছে ভাইলালের। হাতে প্রচুর আর্মস। পুরো এলাকার কন্ট্রোল চাইছে। অসিতকেও ব্যাপক ঝাড় দিয়েছে কদিন আগে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার, অসিতের গড-ফাদার প্রসূন হাজরার অবস্থা ভালো নয়। পার্টিতে একদম কোণঠাসা। পার্টির ওপর লেভেল থেকে কড়কে দিয়েছে। সম্পত্তির হিসেব-নিকেশ করে দেখছে। একদম গুটিয়ে গেছে প্রসূন। কোনও ঝামেলায় যেতে চাইছে না। অসিত তাই পলাশের সঙ্গে জুড়তে চাইছে। পুরোনো খারাখারি ভুলে ফের একসঙ্গে কাজ করবে। শুধু একটাই শর্ত—বিজুকে চাই। বিজুর ওপর ঝাল তার এখনও যায়নি। যে বিজুকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল, সেই বিজুই তার গায়ে হাত দিয়েছে। বিজুকে তাই সরাতেই হবে। পলাশ টাইম নিয়েছিল। এখন রাজি হয়ে গেছে।

শুনে একদম উড়িয়ে দিয়েছিল বিজু—ভ্যাট শালা, সন্ধেবেলাতেই মাল টেনেছিস।

স্যাম্পেল আরও উত্তেজিত—তোমার পায়ে পড়ছি, এক্ষুনি কেটে পড়ো, না হলে কিন্তু আর সময় পাবে না।

বিজু তবু বলে, তুই কী করে জানলি?

জেনেছি, আমি সাত ঘাটে ঘোরা ছেলে। সোর্স বলা যাবে না—বাঁচতে চাও তো এক্ষুনি কেটে পড়ো।

সুন্দরবনের ডেরা থেকে বিজু ফিরেছে সবে গতকাল। ফিরে নির্মল ঘোষ রোডের পুরোনো এই ডেরাটায় ঢুকে গেছে। পলাশের সঙ্গে দেখা হয়নি। একবার ফোন করেছিল বিজুকে। বুলটিনকে নিয়ে কথা হল। হেক্কো আর জয়কে পুলিশ তুলেছে, সে-কথাও বলল, বিজুকে বারবার সাবধান করল—একদম বাইরে বেরোবি না এখন, বহুত চাপ চারদিকে, তুই মার্কড হয়ে গেছিস, সবাই চিনে ফেলবে। দৌড়ঝাঁপ করতে পারবি না ভালো করে। ঝাড় খেয়ে যাবি। তাই বিজু ভাবতেও পারছে না পলাশ তাকে সরাতে চাইছে।

হঠাৎ যেমন ফোন করেছিল তেমনই কথার মাঝপথেই যেন ছেড়ে দিল স্যাম্পেল। তারপরও বেশ কিছুক্ষণ থম হয়ে বসে থাকল বিজু। অন্ধকার ঘরে মোবাইল স্ক্রিনের আলোটুকু মাত্র ছিল। স্যাম্পেল ফোন ছাড়ার পর জ্বলছিল স্ক্রিনটা। একটু পরেই নিভে যেতে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল ঘরটা। সঙ্গে সঙ্গে বিজুর ভেতরের সাহসটুকুও যেন নিভে গেল। পালাতে হবে। শুধু এই কথাটাই মনে হল তখন। সে এখন একা। একদম একা। মেশিনটা আছে সঙ্গে। চারটে মাত্র দানা আছে। খুব যত্ন করে এতদিন রেখে দিয়েছে সে। মেশিনটা মাঝে মাঝে বাঁ-হাতে ধরেছে, ঘোড়া টেনে ফাঁকা ফায়ার করেছে। খ্যাট করে আওয়াজ হয়েছে শুধু। কিন্তু দানা থাকলে যে ঝাঁকুনি হয় বাঁ-হাত সেটা নিতে পারবে কি না কে জানে!

মেশিনটা কোমরে গুঁজে নেয় বিজু। দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে। এদিক-ওদিক তাকায়। পালাতে হবে। কোথায় জানে না। শুধু জানে পালাতে হবে।

গলিটা ফাঁকা। সাইকেলে করে দু-একজন যাওয়া-আসা করছে শুধু। একটা ম্যাটাডোর দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। স্টার্ট বন্ধ, আলো নেভা। বিজুর মনে হল কেউ যেন দেখছে তাকে। ওই ম্যাটাডোরটার আড়ালেই আছে হয়তো। বা অন্য কোথাও। বিজুর ভেতর থেকে কেউ যেন বলে দেয় ম্যাটাডোরটার দিকে নয়, উলটোদিকে দৌড়োও।

দৌড়ে বড় রাস্তার মোড়ে আসতেই একটা শব্দ শুনল বিজু। কে যেন লাঠি দিয়ে ল্যাম্পপোস্ট পেটাল। খুবই নিরীহ শব্দ। কিন্তু বিজুর মনে হল কেউ কিছু বলতে চাইছে।

শব্দ এল যে দিক থেকে তার উলটোদিকে দৌড়োল বিজু। আবার হল শব্দটা। চকিতে পিছনে তাকিয়ে দেখল বিজু। বাপ্পা। আজ দুপুরেও তাকে ডেরায় ভাত পৌঁছে দিয়ে গেছে বাপ্পা। কিন্তু বাপ্পার সঙ্গে এখন লাটিম। অসিতের ছেলে। এই দৃশ্যই এক ধাক্কায় স্পিড বাড়িয়ে দিল বিজুর।

বড় রাস্তায় মোটামুটি ভিড়। কেউ কেউ অবাক হয়ে দেখছে বিজুকে। পেছনে ছুটে আসছে ওরা। রেঞ্জের মধ্যে পেতে চাইছে বিজুকে। একটাই সুবিধে বিজুর, ভিড়ের মধ্যে ঝট করে মেশিন চালাবে না, চালাবার আগে দুবার ভাববে।

বোম পড়ল পরপর দুটো। ওরা চমকাতে চাইছে পাবলিককে। বলতে চাইছে, তোমরা কেটে পড়ো এখন, বাড়িতে ঢুকে যাও, রাস্তা ফাঁকা করে দাও, কিছুক্ষণের জন্যে এলাকার দখল নেব আমরা।

আতঙ্কগ্রস্ত লোকজন ছোটাছুটি করছে। এর মধ্যেই বিজু দেখতে পেল সামনের মোড়ে ছাতু আর রবিন। এদিকেই তাকিয়ে সিগারেট টানছে। বিজু থামকাল একটু। শুধু সিগারেট টানার জন্যে নিশ্চয়ই ওরা ওখানে দাঁড়িয়ে নেই।

ডান দিকে নতুন বাড়ি উঠছে একটা। সামনে একটু ফাঁকা জায়গা। ইটের গাছি সাজানো। মেশিনটা কোমর থেকে টেনে বের করল বিজু। বেশি ভাবার সময় নেই। ইটের গাছি টপকে বাড়িটার সামনে চলে এল সে। সামনের একটা ঘরে বালব ঝুলিয়ে ক’টা লোক তাস পেটাচ্ছিল। বিজুকে দেখেই উঠে পড়ল ঝেড়েমেড়ে। মেশিনটা উঁচিয়েই তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল বিজু। বালির বস্তা, স্টোনচিপস, ইটকাঠ টপকে উঠতে হচ্ছিল তাকে।

একদম ছাদে এসে থামল বিজু। হাঁপাচ্ছে। শ্বাস পড়ছে বড় বড়। এখান থেকে সামনের বড় রাস্তাটুকু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাপ্পারা দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার আধ-খ্যাঁচড়া বাড়িটার দিকে দেখছে তাকিয়ে।

চারটে মাত্র দানা সম্বল। তবু রিস্ক নিতে হবে। ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে তার কাছেও মাল আছে। বাঁ-হাতে শক্ত করে ধরে ট্রিগার টিপল বিজু। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি। অনভ্যস্ত হাত নিতে পারল না ঝাঁকুনিটা। নড়ে গেল। গুলিটা মিলিয়ে গেল হাওয়ায়।

আওয়াজে কাজটা হল। সামনে থেকে সট করে সরে গেল ওরা। পানগুমটির আড়ালে গা-ঢাকা দিল। ওখান থেকেই বাড়িটার সামনে চার্জ করল পর পর দুটো। তিনদিকের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে শব্দের এফেক্টটা হল মারাত্মক। কেঁপে উঠল জায়গাটা। ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে গেল আশপাশের বাড়ির জানলা। আলো নিভে গেল।

অন্ধকার ছাদে বসে তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল বিজু। স্ট্রিট লাইটের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সামনের রাস্তা। ওরা বুঝে গেছে বিজুর কাছেও মাল আছে। সামনে দিয়ে ঝট করে আসার রিস্ক নেবে না। কিন্তু পেছন দিয়ে যদি অ্যাটাক করে? তিনটে মোটে দানা সম্বল। কতক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে ওদের?

উঠে দাঁড়ায় বিজু। ওপর থেকে চারদিকটা দ্রুত দেখে নেয়। ক’তলা বাড়ি এটা? চার, নাকি পাঁচ? পাশের বাড়ির ছাদটা বেশ কিছুটা দূরে। দুটো হাত থাকলে ঠিক লাফ দিয়ে চলে যাওয়া যেত। এক হাতে ব্যালেন্স রাখা যাবে না। স্লিপ করে একবার নীচে পড়লেই ফিনিশ।

আবার দুটো বোম পড়ল পরপর। এবার পেছনে দিকে। এরকমই আশঙ্কা ছিল বিজুর। পেছন দিক থেকে অ্যাটাক আসছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা, পেছনের গলিটা অন্ধকার। ঘাপটি মেরে কেউ এলে দেখা যাবে না।

তিনটে গুলি আছে আর। বিজু পেছন দিকের গলি লক্ষ করে একটা চালায়। ঝনাৎ করে একটা শব্দ হয়। কোথাও টিনের গায়ে লেগেছে মনে হয়।

আবার চুপচাপ। খুব সাবধানে নীচে নামতে থাকে বিজু। দোতলায় এসে থামে। খোলা একটা জানলার কাছে আসে। এখানে একটু বেঁকে গেছে বাড়িটা। কাছেই পাঁচিল ঘেঁষে একটা ছোট ছাদ। পাশের বাড়িটার আউট হাউস বা পাম্প ঘরটর হবে। অন্ধকারে আন্দাজ করে বিজু। এখান থেকে লাফ দিলে পেয়ে যাবে ছাদটা।

বিজু লাফ দেয়। কিন্তু এক হাতে ব্যালেন্সটা ঠিক রাখতে পারে না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছাদে। ধপ করে আওয়াজ ওঠে একটা। বুঝতে পারে, হাঁটু দুটো ধাক্কা খেয়েছে প্রচণ্ড। অসহ্য যন্ত্রণা।

দাঁত চেপে বিজু উঠে দাঁড়ায়। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নামে পাশের কম্পাউন্ডে। তারপর গেট দিয়ে বেরিয়ে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে পেছনে তাকায় একবার। নাহ। শেষ পর্যন্ত হল না মনে হচ্ছে। আসছে ওরা; টের পেয়ে গেছে বিজু পালাচ্ছে এটা দিয়ে।

হঠাৎ প্রচণ্ড চমকে যায় বিজু। সামনে একটু দূরেই পুলিশের গাড়ি। মেজোবাবু দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে।

ডানদিকের গলিটায় ঢুকে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না বিজুর। কিন্তু ঢুকেই বুঝতে পারল, মরণকূপ। কানা গলি একটা।

হাল ছেড়ে দেয় বিজু। গলিটাতে পুলিশ আগে ঢুকলে অ্যারেস্ট হবে সে। কিন্তু তার আগেই যদি ওরা গলিটার দখল নেয়, ফিনিশ করে দেবে তাকে। বেপরোয়া বিজু আর-একটা ফায়ার করে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গলির মুখে চার্জ হয় একটা।

মরিয়ার মতো শেষ চেষ্টা করে বিজু। মেশিনটা শক্ত করে ধরে গলি থেকে বেরোবার চেষ্টা করে। হঠাৎ দেখে গলির মুখে প্রায় পৌঁছে গেছে মেজোবাবু। একা। হাতে খোলা রিভলভার। ঠিক তখনই একটা চার্জ হল মেজোবাবুর সামনে। ধোঁয়া আর আগুনের কুন্ডলী ঘুলিয়ে দিল জায়গাটা। আর তার মধ্যেই কেমন যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল মেজোবাবু।

পুলিশকে পড়তে দেখলে যত বড় শের-ই হোক ঠিক থমকে দাঁড়ায়। পুলিশের কাছে সব আবদার চলে, কিন্তু নিজেদের গায়ে হাত পড়লে ডেনজারাস। তখন কাউকে রেহাই দেয় না। ওরা তাই বোধহয় থমকাল। পুলিশের গাড়িটাও এগিয়ে আসছে স্পিড তুলে।

কয়েক মুহূর্ত থমকাল বিজুও। হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেজোবাবুর দিকে তাকাল একবার। উলটো দিকে আর একটা গলি। খুব সরু। লাফ দিয়ে গলিটায় ঢুকে গেল সে।

ছুটতে-ছুটতে বুঝতে পারছিল বড় বাঁচান বেঁচে গেছে আজ। এতক্ষণে তার ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে থাকার কথা। মেজোবাবু ওভাবে দৌড়ে না এলে…কিন্তু কী করতে চাইছিল লোকটা? সাহস দেখাতে, নাকি বিজুকে ধরতে, অমন গুলি-বোমার মধ্যে কেউ ওভাবে দৌড়ে আসে? যতই সাহস থাক—একদম একা, সঙ্গে কেউ নেই…এমন পাগলাটে সাহসের মানে হয় না কোনও!

কী হল মেজোবাবুর কে জানে! মরে গেলে কিন্তু কেলো হয়ে যাবে। পুলিশ মরলে বহুত ঝাড়। তখন বিজু, পলাশ, অসিত কেউ বাঁচবে না। ইঁদুরের গর্তে ঢুকলেও ঠিক টেনে বের করবে।

বিজু যাচ্ছে কোথায়? পালাবার তো আর জায়গা নেই। পলাশ তাকে সরিয়ে দিতে চাইছে। কোন আশ্রয়ে যাবে সে? বাড়িতে? সেখানেও কি বাঁচবে? পুলিশ ঠিক পৌঁছে যাবে। হুজ্জুতি করবে সবার ওপর। সেই লোকটার ছবি মনের মধ্যে ভেসে ওঠে বিজুর। মাটিমাখা সেই লোকটা। আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকা সেই বউটার ছবিও দেখতে পায়। দৈত্যের মতো বড়সড় লোকটার মনে খুব কষ্ট—মা তার এখনও বড় সবল, মায়ের সেবা করতে পারছে না। বিজুর কথা নাকি খুব বলে লোকটা। আর ওই বউটা! কেমন জড়সড় ভয়ে। কেমন পালিয়ে বেড়ায়—বিজুর সামনে থেকে পালায়। একা বসে রেডিয়োতে গান শোনে, বিজু এলেই বন্ধ করে দেয়। বিজু তো ধাক্কা দিয়েছিল। পড়ে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল। বিজুর রাগ হয় খুব। এত ভয় কেন তোমার? কেন রেডিয়ো বন্ধ করে দেবে তুমি, কেন পালিয়ে যাবে সামনে থেকে, কীসের ভয় এত তোমার…?

আর পারছে না বিজু। মাথা টলছে। দাঁড়িয়ে পড়ে সে। হাঁটু দুটো গেছে মনে হয়। অসহ্য যন্ত্রণা। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে খুব।

লোকজন খুব কম এই রাস্তায়। এগলি-সেগলি দিয়ে পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে বিজু। ঘামে ভিজে গেছে জামা। তার এতক্ষণ হয়ে যেত! মেজোবাবু ওভাবে পড়ে না গেলে হয়ে যেত। এখনও কি পড়ে আছে, নাকি উঠে পড়েছে? লোকটা শালা কেমন যেন—লম্বা লম্বা হাত, মেশিনের মতো দৌড়োয়। অঢেল দম বুকে। তাকে তাড়া করে একদিন ধরে ফেলেছিল লোকটা। আজও কি তাকে ধরতেই ওভাবে ছুটে আসছিল। ওইরকম চার্জ হচ্ছে যখন, তখন কেউ ওভাবে দৌড়ে আসে! মানেটা কী…। বিজুর তো কিছু করার ছিল না; কানা গলিতে ঢুকে পড়েছিল সে। কানা গলিতে ঢুকলে ফিনিশ হয়ে যেতেই হয়।

পেছনে কে যেন দৌড়ে আসছে। চমকে তাকায় বিজু। দেখতে পাচ্ছে না কাউকে। কিন্তু কেউ একটা আসছে ঠিক। মেজোবাবু নয়তো? না কি অসিত? পলাশও হতে পারে।

আর পালাবার চেষ্টা করে না বিজু। পালাবার কোনও মানে হয় না। দিনরাত শুধু টেনশন। ধরা পড়ার ভয়, মার খাবার ভয়। কোথাও গিয়ে রেহাই নেই।

নিজের নুলো হাতটার দিকে তাকায় বিজু। এই হাতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল বউটাকে। বউটা ভয়ে ভয়ে সরে থাকে সবসময়। বিজুকে দেখলেই রেডিয়ো বন্ধ করে দেয়।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে বিজু। একটা অন্ধকার গলির মুখে থমকে দাঁড়ায়। চেনা চেনা লাগছে। অসিতের তাড়া খেয়ে এই গলিটাতেই ঢুকে পড়েছিল একদিন। তখন দুটো হাতই ছিল তার। দু-হাত দিয়ে চেপে ধরেছিল মেয়েটাকে। তার বুকের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। অজ্ঞান মানুষকে বড় অসহায় লাগে। তবু বিজু বেঁধে ফেলেছিল মেয়েটাকে।

এই অন্ধকার গলির মধ্যে যেন নিজেকে খুব নিরাপদ লাগে বিজুর। বড় করে দম নেয়। এই গলিতে ঢুকে একদিন বেঁচে গিয়েছিল বিজু। গলির শেষে সেই ঘরটা। আজ স্যাম্পেল তাকে বাঁচিয়ে দিল। না হলে এতক্ষণে স্যাম্পেলের গাড়ির প্যাসেঞ্জার হয়ে যায় সে। স্যাম্পেল আবার লাইন করছে। ডিটো নাকি মুনমুনের মতো দেখতে। চুলের ঢালটা আর একটু বেশি হলেই কে বলবে মুনমুন নয়। ঘন চুল হবার একটা তেল কিনে দিয়েছে স্যাম্পেল। এখন শুধু দিনরাত ভালো তেলের সন্ধানে থাকে ও। বিয়ে করবে শিগগিরি। মেয়েটার মড়ার গাড়ি চালানো পছন্দ নয়। অন্য কাজ খুঁজছে এখন স্যাম্পেল।

হঠাৎ মনে হয় বিজুর, স্যাম্পেল জানল কী করে সব? বিজু প্রথমে উড়িয়ে দিয়েছিল—যাহ, তা আবার হয় নাকি! কিন্তু স্যাম্পেল জানল কী করে? ও কি পুলিশের সোর্স হয়ে গেছে। কে জানে, হতেও পারে।

একটু বসতে ইচ্ছে করছে। পালিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। একটু নিশ্চিন্তে বসতে ইচ্ছে করছে। ঘুমোতে ইচ্ছে করছে শান্তিতে। এই গলির শেষেই সেই ঘরটা। মেয়েটার স্বামী নাকি মরে গেছে। ফিরেছে কি সে? ওই ঘরে গেলে নিশ্চিন্তে বসতে পারে একটু…গলির শেষেই তো ওই ঘরটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *