পাখির বাসা – ১২

১২

‘হ্যালো’ শুনেই কেটে দিল বিজু। এই নিয়ে তিনবার। প্রত্যেকবারই সে আশা করছে অন্য কেউ ফোন ধরবে। অন্য কেউ বলতে বাবা। ঠাকুমা কানে শোনে না কিছু—ফোন ধরার প্রশ্ন নেই।

অবশ্য বাবা ফোন ধরলে কী বলবে ভেবে উঠতে পারেনি এখনও। আসলে কেন ফোনটা করছে সেটাই ঠিক জানে না সে। মাসখানেক সুন্দরবনের পাখিরালয়ে একটা বাড়িতে আছে বিজু। পলাশের ব্যবস্থা। চোট পাবার পর ক্যানিং-এ পালিয়ে এসেছিল বিজু। ডাক্তার অনেক চেষ্টা করেও হাতটা রাখতে পারেনি। কবজি থেকে বাদ গেছে। নিজের নুলো হাতটার দিকে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে। কেমন অসহায় লাগে নিজেকে। পলাশ কতদিন আর দেখবে তাকে। তারপর তো নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। পলাশ অবশ্য বার বার বলছে, ভালো হয়ে নিয়ে তুই চলে আয়, সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিজু বলেছিল, কিন্তু একটা হাত তো চলে গেল। তাও আবার ডান হাত।

তাতে কী? এইবার তোর নাম ফাটবে বেশি। শালা নুলো বিজু—জানবি নুলো-খোঁড়া-কানাগুলো বেশি খতরনাক হয়। পুলিশের কাছে তোকে হাতকড়া পরানো বহুত টাফ হয়ে গেল।

কিন্তু মেশিন ধরব কী করে?

আরে শালা বাঁ-হাত কি ফ্যালনা নাকি? আমরা হচ্ছি সোসাইটির বাঁ-হাত, ময়লা ঘাঁটার হাত—কিন্তু এটাও ডানহাতের সঙ্গে একই দিনে জন্মেছে, একইসঙ্গে বড় হয়েছে। তবু শালা লোকে নিচু নজরে কেন দেখে বল তো!

পারব মেশিন ধরতে?

খুব বেশি হলে একটা মাস, তারপর দেখবি ডান হাতের থেকে বাঁ-হাতে টিপ বেশি।

তবুও মাঝে মাঝে খুব অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে সে নুলো হাতটার দিকে। তখনই মনে পড়ে যায় মেয়েটার কথা। রানু। মেয়েটা খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল সেদিন। সে যত জল খাচ্ছিল তত অবাক হচ্ছিল মেয়েটা। মজা লাগছিল বিজুর। উঠে যাবার জন্যে তাগাদা দিচ্ছে, আবার জলও দিচ্ছে। এখনও আফশোস হয় বিজুর। আর একটু আগে উঠলেই অসিতদের মুখে পড়তে হত না। কিন্তু কেন যে থাকতে ইচ্ছে করছিল!

সেদিন ফোন করেছিল স্যাম্পেলকে। ফোন পেয়েই স্যাম্পেল ভয়ানক উত্তেজিত—গুরু, কোথায় তুমি?

জাহান্নমে।

এটা তো তোমার নম্বর নয়, কার এটা?

যমরাজ্যের।

নিয়ে যাবে গুরু?

কোথায়?

ওই যে বললে—জাহান্নমে।

পাসপোর্ট লাগবে। আছে?

করিয়ে নেব গুরু। কাকে কত খাওয়াতে হবে বলো। যমরাজকে, নাকি ওর ওই যে কেরানি, চন্দ্রগুপ্ত না ইন্দ্রগুপ্ত, সেই লোকটাকে?

বিজু বলে, এসে কী করবি?

ওখানে আমার কত চেনাজানা আছে জানো, কত লোককে গাড়ি করে পৌঁছে দিয়েছি, আমি মাল গেলে ঠিক জামাইআদর পাব।

জামাই আদর—! ক্যালানি খেয়ে জান যাবে তোর।

কেন গুরু?

যাদের এনেছিস সবাই ব্যাপক খচে আছে। বলছে স্যাম্পেল শালা টুপি টাপা পরিয়ে এখানে দিয়ে গেছে আমাদের, একবার পাই, হিসেব উসুল করে নেব।

ক্যালানি তো এখানেও খাচ্ছি গুরু। দাদারা ক্যালাচ্ছে, চ্যালারা ক্যালাচ্ছে, পুলিশ ক্যালাচ্ছে। ওখানে মাল টাল পাওয়া যায় কি বলো, তা হলেই হবে।

একটু হেসে ফেলে বিজু।

দিশি না বিলেতি?

মালের খোঁজ জানি না। বিজু বলে, তবে তোর মুনমুন আছে।

যা:। এইটা কিন্তু ঢপ দিলে গুরু।

কেন?

মুনমুন নরকে যেতেই পারে না, বড় পবিত্র মেয়ে, ও ঠিক স্বর্গে গেছে, গিয়ে মা সরস্বতীর কাছে গিটার শিখছে।

তাহলে আর এখানে এসে কী করবি? স্বর্গেই চলে যা।

সে কী আর নসিবে আছে বস, এত পাপ করেছি, আর তা ছাড়া গেলেও মুনমুন আমাকে পাত্তা দেবে কেন—আচ্ছা আচ্ছা দেবতা ওর সঙ্গে লাইন করার জন্যে ঘুরঘুর করবে; মুনমুনকে দেখোনি তাই, দেখলে বুঝতে পারতে।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। মুনমুন নামে একটা পবিত্র মেয়েকে কল্পনা করার চেষ্টা করে, যে হেঁটে গেলে পায়ের চিহ্ন থেকে যায় মাটিতে, যার মাথায় গোল চাঁদের মতো আলো আছে—ভাবতে ভাবতে অন্য একটা মুখ ভেসে ওঠে চোখে—শীর্ণ ক্লান্ত একটা মুখ, চোখে ভীষণ আতঙ্ক—

গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বিজু বলে, ওদিকের খবর কী?

স্যাম্পেল বলে, খবর আর কী—ভাইলাল আবার নতুন করে দম খেয়ে লেগেছে, সলিড ব্যাকিং আছে পার্টির, এই তো পরশুই, পলাশের সঙ্গে লাগল, পলাশের একটা ছেলেকে ঝেড়ে দিয়েছে।

খুব অবাক হয়ে যায় বিজু। বলে, সে কী রে, কী নাম?

বুলটিন।

বুলটিনকে ঝেড়ে দিল! শুনিনি তো।

হ্যাঁ। খেলটা হল, পুলিশ ভাইলালকে ছেড়ে পলাশের দুটো ছেলেকে তুলেছে। পার্টিতে বড় কারও ব্যাকিং খাচ্ছে ভাইলাল, খুব তেজ ধরেছে এখন।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। খবরটা বেশ ধাক্কা দেবার মতো, ক’দিন আগেই তো পলাশের সঙ্গে কথা হল, কিছু তো বলেনি। বুলটিন ছেলেটা পলাশের ডান হাত। চোখা ছেলে। সেই বুলটিন নেই মানে ব্যাপক ঝাড়।

স্যাম্পেল যেন একটু সতর্ক গলায় বলে, ভালো কথা বলছি বস, লাইন ছেড়ে দাও, অন্য ধান্দা করো, কে যে এখন কার দিকে ঝুঁকছে, কে কখন ঝাড় খেয়ে যাচ্ছে ঠিক নেই।

হু।

তাই বলছি কেটে পড়ো, তোমার দেশের বাড়িতে চলে যাও।

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে বিজু। তারপর বলে, আচ্ছা, ওই মেয়েটার খবর কী রে?

কোন মেয়েটা?

আরে ওই যে রে—রানু।

কেন বলো তো গুরু! স্যাম্পেল বলে, আমার কিন্তু কেসটায় গন্ধ-গন্ধ লাগছে।

গন্ধ মানে?

সে তুমিই ভালো বলবে, কী মারাতে ওই মেয়েটার কাছে গিয়েছিল বলো তো সেদিন?

একটু থিতিয়ে যায় বিজু। বিশ্বাসযোগ্য একটা কারণ ভেবে বের করার চেষ্টা করে। পলাশও সেদিন তাকে জিগ্যেস করেছিল—তুই আবার ওই মেয়েছেলেটার কাছে কেন গিয়েছিলি, লাভ কেস আছে নাকি!

স্যাম্পেল বলে, বরাতজোরে সেদিন সেভ হয়ে গেছ কিন্তু, শুনে থেকেই আমার মনটা খচখচ করছে, তারপর আমি ভালো করে মেয়েটাকে দেখেছি, দেখতে খারাপ নয়, কিন্তু মুনমুনের পাশে দাঁড়াবে না।

সকালেই মাল-ফাল খেয়েছিস নাকি স্যাম্পেল?

কেন বস?

ভাট বকছিস।

অমনি ভাট হয়ে গেল! স্যাম্পেল বলে, লাইন কি খারাপ জিনিস বস, সবার কপালে কি জোটে—তুমি না বলতে চাইলে শুনব না, আসলে কেউ লাইন করছে শুনলেই মনটা একটু ভালো হয়ে যায় আমার, মুনমুনের কথা খুব মনে পড়ে—

এবার একটু ধমকের সুরে বিজু বলে, বাজে কথা ছাড়, কেউ আর হুজ্জুতি কিছু করেছে নাকি ওর ঘরে?

শুনিনি তো। স্যাম্পেল বলে, করলে তো কানে আসত, তবে এখন আর কেউ ওখানে খ্যাঁচাবে না, পুলিশের নজর আছে।

পুলিশ! একটু অবাক হয়ে যায় বিজু।

হ্যাঁ। পুলিশ যাতায়াত করছে মেয়েটার কাছে।

কেন রে!

সে কি আর আমাকে বলেছে, নিশ্চয়ই গালগপ্প করতে আসে না, ওর ঘরে অত বড় একটা লাফড়া হয়ে গেল, পুলিশ তো আসবেই।

এইটাই আশঙ্কা ছিল বিজুর। মেয়েটাকে আরও বড় ঝামেলার দিকে ঠেলে দিয়েছে সে, ফালতু ফালতু দিয়েছে।

ফোনেই গুনগুন করে গান ধরে স্যাম্পেল—ফুলকলি রে ফুলকলি, বল তো এটা কোন গলি?

বিজু একটু সিরিয়াস গলায় বলে একটা কাজ করতে পারবি? মেয়েটার নম্বর জোগাড় করে দিতে পারবি?

এই গলিতে যদি কেউ একবারও আসে—চেষ্টা করে দেখব গুরু—সেই তো ফাঁসে—

পরদিনই স্যাম্পেল ফোন করেছিল। ফোন নম্বর জোগাড় করতে পারেনি। তবে দুটো তথ্য দিয়েছে। এক, রানুর স্বামী নাকি মারা গেছে। রানু নেই, ঘর বন্ধ। আর দু-নম্বর—ও আবার প্রেমে পড়েছে, বিজু এলে দেখাবে মেয়েটাকে।

ক’দিন ধরেই মনটা টানছিল। রানু নেই শুনে যাবার ইচ্ছেটুকু দপ করে নিভে গেল। রানু কি বরাবরের জন্যে চলে গেল? নাকি ফিরে আসবে আবার? রানুর স্বামীকে ভাবতে চেষ্টা করে বিজু। কেমন ছিল লোকটা? কী হয়েছিল, মরল কেন? একাই বা থাকত কেন রানু?

নিজের নুলো হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকে বিজু। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই হাতেই রানুর মুখ চেপে ধরেছিল। এই হাতেই অসিতকে ঝেড়েছিল। এই হাতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল মালতীকে। সেই লোকটার ছবি ভেসে ওঠে চোখে। লম্বা চওড়া সেই লোকটা, কেমন ছন্নছাড়া পায়ে হাঁটে, ভ্যাবাচ্যাকা চোখে সব কিছু দেখে। লোকটাকে দেখতে ইচ্ছে করে একবার। কিছু না ভেবেই ফোন করেছিল বাড়িতে। মালতী ধরল। কেটে দিল বিজু। যতবারই করছে মালতী ধরছে।

হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে এল বিজু। বেশ চওড়া নদী। ওপারে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের বাঘ মাঝে মাঝে নদী সাঁতরে এ পাড়ে চলে আসে। মুখে করে বাছুর ছাগল নিয়ে চলে যায়। ক’দিন আগেই রাতে এসেছিল একটা। দুটো লোককে জখম করে চলে গেছে।

সন্ধে হয়ে গেছে একটু আগে। দিনের বেলা বাইরে বড় একটা বেরোয় না বিজু। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে গেল সে। নদীতে জেলেদের নৌকো। নদী-নালা দিয়ে জঙ্গলের অনেক ভেতরে চলে যাবে ওরা। মাছ-কাঁকড়া ধরবে। ফিরবে দু-তিন দিন পর। দু-একজন হয়তো ফিরবেও না। চলে যাবে বাঘের পেটে।

রানুর কথা মনে পড়ে। একা থাকে মেয়েটা। ভোঁদাই ফিনিশ হয়ে গেছে; কিন্তু আরও কত আছে। এখন কেমন আছে রানু কে জানে!

একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আবার ফোন করে বিজু। এবারও মালতী ধরল। না কেটে ফোনটা ধরেই থাকে বিজু। মালতী ‘হ্যালো’ ‘হ্যাঁলো’ করছে। গানের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মালতী রেডিয়োতে গান শুনছে ঠিক। সময় পেলেই রেডিয়োতে গান শোনে মালতী। বিজু কাছেপিঠে থাকলে বন্ধ করে দেয়।

বিজু বলে, হ্যালো!

হ্যালো! কে?

আমি বিজু।

বিজু—ও!—বলে চুপ করে যায় মালতী।

গান বন্ধ হয়ে যায় ওদিকে।

কোথায় এখন?

অনেক দূরে। বিজু বলে, বাবা কোথায়?

এই তো ফিরল মাঠ থেকে; দিচ্ছি দাঁড়াও।

না না, থাক। বিজু তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ঠিক আছে তো—?

তোমার কথা বড্ড বলে—খালি বলে দিনরাত।

ও। বলে চুপ করে যায় বিজু।

একদিন পুলিশ এসেছিল বাড়িতে।

একটু থমকে যায় বিজু। তারপর বলে, কবে?

সেই যে তুমি বাড়ি এসেছিলে, তার ক’দিন পর।

কী বলছিল?

তোমার খোঁজ করছিল।

হুঁ। গম্ভীর হয়ে বিজু বলে, ক-জন এসেছিল?

চার-পাঁচজন; আমি তো ভয়ে—।

এই ক-দিনের মধ্যে আসেনি?

না তো।

একটু চুপ করে থাকে বিজু। হিসেব মেলাবার চেষ্টা করে। তার মানে ভোঁদাইয়ের কেসটার ক’দিন পরে গিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু তারপর আর যায়নি। যায়নি; কিন্তু নজর নিশ্চয়ই আছে। নজর রাখছে আড়াল থেকে।

মালতী বলে, তারপর থেকে খুব চিন্তা করছে।

কিছু বলে না বিজু।

আর একটা চিন্তা ওর হয়েছে এখন। মালতী বলে, মা কেন এখনও শক্ত, কেন এখনও বাগান সারতে বাইরে যায়, শুধু বোঝায় ঘরের মধ্যে সব করতে, মা-ও রাজি নয়—মায়ের গু-মুত পরিষ্কার করলে তবে নাকি পুণ্যি হয়—। ওর নাকি অনেক পাপ হয়েছে।

বিজু অবাক গলায় বলে, কী পাপ?

কী জানি। বলে চুপ করে যায় মালতী।

চুপ করে থাকে বিজুও। পাপ-পুণ্যের ভাবনা তার নেই। তবু তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। কতদিন হয়ে গেল মা মরেছে তার। মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে বিজু। কিছুতেই মনে পড়ছে না, বড় আবছা হয়ে গেছে যেন। অন্য একটা মুখ ভেসে উঠছে বার বার। এ কেবল আস্তে করে গান শোনে রেডিয়োতে আর বিজুকে দেখলেই বন্ধ করে দেয়। এই মুখটাকেই একদম সহ্য হয় না তার। আর এইটাই ভেসে উঠছে মনে—যত মোছার চেষ্টা করে তত দগদগে হয়ে ফুটে ওঠে। রাগ হয়, গরম হয়ে ওঠে মাথা—রাগের চোটে নুলো হাতটা ঝাঁকায়।

বাড়ি আসবে না তুমি? মৃদু গলায় বলে মালতী।

দপ করে জ্বলে ওঠে মাথা। দাঁতে দাঁত চেপে বিজু বলে—কেন যাব? কেন যাব তোমাদের ওই রঙ্গ দেখতে? লজ্জা করে না তোমাদের? শালা লজ্জা করে না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *