১০
রানু খুব অবাক হয়ে যাচ্ছে—একটা মানুষ এত জল খেতে পারে! এত অল্প সময়ে কাউকে এত বেশি জল খেতে দেখেনি রানু। এই নিয়ে পাঁচ গ্লাস! চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পাঁচ গ্লাস জল খেল বিজু।
আজ কাজে যায়নি রানু। শরীরটা ভালো নেই—মাথা টিপটিপ করছে; গা-হাত-পায়ে ব্যথা। সকাল থেকে ঘরের মধ্যে শুয়ে বসেই কাটিয়ে দিয়েছে। ভেবেছিল ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাবে। কিন্তু বাইরে বেরোতেই ইচ্ছে করছে না। শীত শীত করছে। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বসেছিল ঘরে। টিভি নেই তার। ছোট একটা রেডিয়ো-সেট আছে। এফএম স্টেশনে গান শুনছিল বসে বসে।
খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে হচ্ছে এখন। দুপুরের পরই রোদটা কেমন তাপ-উত্তাপ হারিয়ে ভসভসে হয়ে যায়। বিকেলটা যেন দায়সারা মতো হাজিরা দিয়েই সরে পড়ে। অন্ধকার নেমে আসে ঝুপ করে।
সন্ধে উতরে যেতেই সেই ছেলেটা এল। বিজু। খুবই কুণ্ঠিত পায়ে ঘরে ঢুকল। প্লাস্টিকের টুলটা টেনে বসল। কিছু বলল না রানু। তার রাগ হচ্ছে না তেমন, বিরক্তিও নয়। মাথার মধ্যে টিপটিপে ব্যথা। একে প্রশ্ন করার, ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলার শক্তিটুকুও যেন নেই। রেডিয়ো বন্ধ করে দিল শুধু। ক’দিন আগেও একবার এসেছিল ছেলেটা। একটু অস্থির, কী করবে যেন ঠিক করতে পারছে না। রানু কথা বলেনি। জল চাইল। দিল রানু। খেয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় হঠাৎ বলল—তোমার নাম তো রানু?
আজ ডিউটি নেই? খুব মৃদু গলায় বলল বিজু।
কিছু বলল না রানু। বিজুর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল।
শরীর খারাপ নাকি?
এবারও কিছু বলল না রানু।
তাই বলি। বিজু একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, রোজ সকালে যেতে দেখি, আজ দেখলাম না। কী হয়েছে?
কী জানি!
জ্বর-টর নাকি?
জানি না।
ওষুধ খেয়েছ?
রানু মাথা নেড়ে বলে—না। চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়ে। হঠাৎ তার মনে খটকা লাগে একটু। রোজ সকালে তাকে যেতে দেখে বিজু। তার চোখে তো কোনওদিন পড়েনি। তাহলে কি আড়াল থেকে তাকে লক্ষ রাখে ছেলেটা? ভাবতেই গা-টা একটু শিউরে ওঠে যেন। এই ছেলেটার আলিঙ্গনের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে। তখন কেউ ছিল না ঘরে! শুধু সে আর এই ছেলেটা। এই ছেলেটা চাইলে তার চরম সর্বনাশ করতে পারত। পারত খুন করতেও। কেউ বাধা দেওয়ার ছিল না সেদিন। কিন্তু কিছু করেনি ছেলেটা। এই ঘটনা সে পরে যতবার ভেবেছে চোখে জল এসে গেছে তার। বার বার প্রণাম জানিয়েছে ঈশ্বরকে। তার মতো হতভাগ্যের মাথায় করুণাময় যে এভাবে হাত রাখবে—এ তার খুব দূর কল্পনাতেও আসে না যে!
আবার সেই কথাটা মনে পড়ে যায় রানুর। চোখের সামনে ভেসে ওঠে দৃশ্যটা। রানু অজ্ঞান হয়ে গেছে। চোখ বোজা। এলিয়ে পড়ে আছে ছেলেটার দুহাতের বেড়ের মধ্যে। ভাবতে ভাবতেই যেন আরও শীত পেয়ে যায় তার।
বিজু বলল, ওষুধ না খেলে জ্বর তো সারবে না।
ঠিক সেরে যাবে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল রানু।
বড় রাস্তার মুখে একটা ডাক্তার বসে; খুব কম পয়সায় রোগী দেখে, ওকে একবার দেখাতে পারো।
এবার গলাটা একটু কঠিন করে রানু বলে, কিছু বলার আছে আপনার? না থাকলে চলে যান, আমার কাজ আছে।
খুব অপ্রস্তুত একটা হাসি হাসে বিজু। বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলে যাব…এক গ্লাস জল দেবে…?
রানু উঠে গ্লাসে করে জল দেয় বিজুকে। এক নি:শ্বাসে জলটা খেয়ে নেয় বিজু। তারপর বলে, আর এক গ্লাস…!
তারপর থেকে পাঁচ গ্লাস জল খেয়ে ফেলল ছেলেটা। একটু সময় নিয়ে খাচ্ছে এখন। জল চাইলে তো আর মানুষকে ‘না’ বলা যায় না। তাই রানু অপেক্ষা করছে, আর অবাক হয়ে যাচ্ছে—একটা মানুষ এত অল্প সময়ে এত জল খেতে পারে!
পঞ্চম গ্লাসটা যেন বেশি সময় ধরে খাচ্ছে ছেলেটা। খুব স্বাভাবিক। পেটে আর জায়গা থাকলে তো খাবে! রানু বলেই ফেলল, এত জল খাচ্ছেন কেন?
বিজু বলল, খুব তেষ্টা পাচ্ছে যে!
এবার বমি হয়ে যাবে।
না না, বমি হবে না। একটু ব্যস্তভাবে বিজু বলে, তোমার বোধহয় সব জল খেয়ে শেষ করে দিলাম…।
সেটা কোনও কথা নয়…। রানু নির্লিপ্ত গলায় বলে, তেষ্টা পেলে নিশ্চয়ই খাবেন, কিন্তু…।
জল বোধহয় তোমার অনেক দূর থেকে আনতে হয়?
না, অনেক দূর আর কোথায়, এই তো গলির মুখটায়।
এই জ্বর গায়েও সব কাজ করতে হচ্ছে?
আমার এসব অভ্যেস আছে।
তা অবশ্য ঠিক। বিজু বলে, কিন্তু কষ্ট তো হচ্ছে…?
আপনি করে দেবেন নাকি আমার কাজগুলো?
না না, সে কথা নয়…। একটু যেন অপ্রস্তুত বিজু।
আপনি কি আর জল খাবেন? গলাটা আবার কঠিন হয় রানুর।
না, না, এটাই এখনও শেষ হয়নি। গ্লাসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে বলে বিজু।
আপনার কি সত্যি তেষ্টা পাচ্ছে?
পাচ্ছে তো। ফের ছোট একটু চুমুক দেয় বিজু।
তাহলে চায়ের মতো একটু একটু করে খাচ্ছেন কেন, যার তেষ্টা পাবে…রানু বিরক্তির সঙ্গে বলে, আপনার জন্যে আমার ঝামেলা হচ্ছে।
জানি আমি। বিজু অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, সেদিন আমি যাওয়ার পর তুমি যদি চিৎকার করতে তাহলে তোমার এত ফ্যাচাং হত না, তবে ভোঁদাই আর কিছু করতে পারবে না—শুনেছ বোধহয়, ভোঁদাই…।
ভোঁদাই নয়, এবার থানা থেকে ঝামেলা করছে।
থানা থেকে! একটু অবাক গলায় বিজু বলে, থানা আবার কী করছে?
আপনি যে এখানে আসেন সে খবর চলে গেছে সেখানে।
একটু চুপ করে থাকে বিজু। হাতের গ্লাসটা এক মনে দেখে। তারপর বলে, এরকম কিছু একটা যে হতে পারে, মনে হয়েছিল আমার…।
আর আমাকে তার জন্যে জবাবদিহি করতে হচ্ছে! এবার চরম বিরক্তি রানুর গলায়।
সরি; আসলে চারদিকে ওদের সোর্স থাকে। তবে এবার সেরকম ভয় আর নেই। বেশ আত্মবিশ্বাসের গলায় বিজু বলে, এবার কারও বাপের ক্ষমতা নেই, বুঝতে পারে।
কিছু বলে না রানু। চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে থাকে শুধু।
আমি যে রুটে এসেছি, কেউ ধারণা করতে পারবে না, সেই রুটেই চলে যাব—তোমার কোনও ভয় নেই।
একটু বিস্ময় ফুটে ওঠে রানুর চোখে। কোন রুটে এসেছে রে বাবা! এখানে আসার তো একটাই রাস্তা!
আমি সামনে দিয়ে আসিনি, ভয় নেই তোমার; কেউ দেখতে পাবে না—পেছন দিয়ে এসেছি, ওদিক দিয়েই চলে যাব।
পেছন দিয়ে এসেছে ছেলেটা! বিস্ময় চরমে ওঠে রানুর। পেছন দিকে আসার পথ কোথা! ওদিকে তো একটা এঁদো ডোবা—নোংরা আবর্জনা ভরতি, তারপর উঁচু পাঁচিল ঘেরা একটা পোড়ো বাড়ি—তাহলে এল কোথা দিয়ে?
রানুর চোখ মুখের বিস্ময়টা লক্ষ করেই বোধহয় বিজু বলে—সবসময় সোজা রুটে চলাফেরা করলে আমাদের চলে না।
রানু ভাবে, মরুক গে যাক…যারা মানুষ খুন করে তাদের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়! সে বলে, হল জল খাওয়া।
হ্যাঁ, এই যে আর একটুখানি। গ্লাসে একটু চুমুক দিয়ে বিজু বলে, কী জিগ্যেস করল পুলিশ?
কী আবার…বললাম তো!
তুমি কী বললে?
বললাম, না কেউ আসেনি আমার কাছে। আমার কিন্তু ভীষণ শরীর খারাপ লাগছে—আপনি দয়া করে আসুন এবার!
টপ করে উঠে পড়ে বিজু। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে, মিথ্যে বললে কেন—সত্যিটা বলে দিতে পারতে!
এবার বলব। বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে রানু।
একটু হেসে ফেলে বিজু। চুপচাপ এক চুমুক জল খায়।
রানু রাগের চোখে দেখে। রাগের মধ্যেও তার মনে হয়, হাসলে ছেলেটাকে ঠিক খুনির মতো দেখায় না। আবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ছবিটা—অসহায় রানু অজ্ঞান হয়ে আছে এই ছেলেটার দু-হাতের মধ্যে।
সে চোখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে।
বিজু বলে, আর কী বলবে…?
রানু একটু অবাক হয়ে বলে, আর কী—মানে?
পুলিশকে আর কী বলবে? এই যে জল খেতে দিলে, বলবে এটা? তাহলে কিন্তু পুলিশ তোমাকেও সন্দেহ করবে।
করুক।
বলেই যখন দেবে, তবে আর এক গ্লাস জল দাও। একটু হেসে বলে বিজু।
আবার হাসিটা দেখে রানু। এবার আর চোখ সরায় না। ভালো করে লক্ষ করে বিজুকে।
কী হল—দেবে না? জল চাইলে না বলতে নেই কিন্তু, আমার মাকে বলতে শুনেছি কথাটা।
রানু ওঠে। চুপচাপ বোতল থেকে জল ঢালে গ্লাসে। তারপর বাড়িয়ে ধরে বিজুর দিকে।
বিজু হাত বাড়ায়। কিন্তু দরজার দিকে তাকিয়ে একটু সচকিত হয়ে ওঠে সে। একটা ছায়া দরজার বাইরে। একটু যেন ফিসফিসানি।
সঙ্গে সঙ্গে টানটান হয়ে ওঠে বিজুর শরীরটা। সে গন্ধ পায়। বিপদ।
রানু দেখে চকিতে পকেট থেকে ছোট কালো কিছু একটা বের করে বিজু। এরকমই একটা জিনিস সে আগে দেখেছে ভোঁদাইয়ের হাতে। বাইরে থেকে কেউ একটা সিটি দেয় যেন। বিজুর হাতের অস্ত্রটা আলো ঝলকে গর্জন করে ওঠে।
ভয়ে চোখ বুজে ফেলে রানু। হাত-পা কাঁপছে তার। ভরতি গ্লাস থেকে জল ছলকে পড়ছে।
বাইরে প্রচণ্ড জোরে একটা শব্দ হয়। বোমার শব্দ। বাড়িটা যেন কেঁপে ওঠে। রানু বসে পড়ে বিছানায়। দেখে, বিজুর হাতের অস্ত্র ফের গর্জন করে ওঠে। চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় বিজু বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
বাইরে বোমা-গুলির শব্দ হয় পর পর। গ্লাসের জল চলকে হাতটা ভিজে গেছে রানুর। গ্লাসটা সে নামিয়ে রাখে পাশে।
