৪
মাটি না মাখলে লোকটার গা কুটকুট করে। তাই রোজদিন সকাল-বিকাল মাটি মাখা। খেতে গিয়ে গাছগুলোকে না দেখলে, উদোম মাঠে রোদ জলে গা না ভেজালে চোখের পাতা বুজতে চায় না রাতে।
রাতভর শুধু বিছানায় শুয়ে আনচান আর যত বাউন্ডুলে চিন্তা—ওই যা:, বেগুনে বুঝি পোকা এল—খুব পোকা লাগছে এদিক-ওদিক এখন…দুপুরের দিকে একটু ঝটকা বাতাস দিল যেন…ঝিঙে মাচাটা শুয়ে না পড়ে মাটিতে…।
তিন মেয়ে তার; বিয়ে হয়ে গেছে সবার; তারা খুব বলে—বাবা, দুটো দিন থেকে যাও না কেন আমার বাড়ি…। যায় সে; কিন্তু মন টেঁকে না কোথাও। টিকবে কী করে—শোভা মাগিটার দশ-বারোটা ছাগল মিলে একেবারে জ্বালাতনে কাণ্ড যে ওদিকে—টঙটঙ ঘুরছে সারাদিন, এর খেতের বেড়া ভাঙছে, ওর খেতে মুখ দিচ্ছে…মাগি ছাগল বাঁধবে না তবু—এই তো সেবার আলুগাছগুলো একেবারে মুড়িয়ে খেয়ে নিল! তাই কোনও প্রকারে একটা রাত কাটিয়ে কাকভোরে বেরিয়ে পড়ে সে, মাঠে যায় আগে, সব কিছু নিজের চোখে দেখে তবে শান্তি!
লোকটা মানে রুইদাস মণ্ডল। পাক্কা সাড়ে তিন হাত লম্বা শরীর, ফরসা রং রোদ-জলে ঝান খেয়ে গিয়ে তামাটে। বয়স তিন কুড়ি পেরিয়েও সারা গায়ে টইটুম্বুর পেশি এমন শক্ত ডেলা ডেলা হয়ে আছে যে কাটারির কোপ বসে না যেন। চোখগুলো একটু গর্তে ঢোকা, নাকটা চাপা, চোয়াল ভাঙা, আর হাঁ-মুখ এত বড় যে খেতে বসে গোটাগুটি একখানা রুটি একেবারে ঢুকিয়ে দেয়। আবছা আঁধারে আচটকা দেখলে পেল্লাই দৈত্য মনে হয় মানুষটাকে।
আলধারে বসে বিড়ি টানতে টানতে ওই যে রুইদাস দুটো কথা বলছে পাঁচু বদ্দির সঙ্গে। নদীর ওপারে সুয্যিটা নেমে গেল একটু আগেই। যাওয়ার সময় সাদা সাদা কোপানো মেঘগুলোতে যেন মেটে সিঁদুর গুলে দিয়ে গেছে। সামনের সবুজ ধানখেতে ওষুধ স্প্রে করার মতো কে যেন একটু একটু করে ভুসো কালি স্প্রে করে দিচ্ছে। কালি মিশে আরও গাঢ় হচ্ছে সবুজ। বিড়ির আগুনটা বেশ লালচে হয়ে উঠছে টান দিলে।
পাঁচু বদ্দির ধানটা এবার মার খেয়ে গেছে একটু। রোয়ার পর জল পেল না ভালো, পোকা এসে গেল ধানে। পাঁচু একটু মরা গলায় বলে, খুড়ো, তোমার আর চিন্তা কী…!
একটু ধোঁয়া ছেড়ে রুইদাস বলে—অ্যাঁ!
বলছি গাছের জেল্লা যা দিয়েছে তোমার, শিষ এলে একেবারে লুটোপুটি খাবে যে!
একটু গর্বের চোখে খেতের দিকে তাকিয়ে রুইদাস বলে, বলছিস তুই…!
মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা; তখন গিয়ে বোলো আমায়…।
দেখি! বিড়িতে একটা সুখটান দিয়ে বলে রুইদাস। মনটা তার ক’দিন বড় দম চাপ হয়ে আছে। ছটফটাচ্ছে দিন-রাত। পাপ, পাপ! বড় পাপ! পাপের ঝাঁকা চেপে বসছে মাথায়। পুণ্যি আর হল না এ জন্মে। দিন দিন ভারী হয়ে যাচ্ছে ঝাঁকা। কথাটা রুইদাস বলেই ফেলে এখন পাঁচুকে।
বুঝলি পাঁচু।
হুঁ, বলো।
আমার মা-টাকে দেখেছিস তো…?
দেখেছি তো, দেখব না কেন…!
কবেটা করে দেখলি?
এই তো ক’দিন আগে—বাবলাদের বাগানে দেখি কলাপাতা কাটছে।
কলাপাতা কাটছে দেখলি?
হ্যাঁ, তাই তো দেখলুম।
বল তাহলে, নিজের চোখে দেখলি তো…কী করি বল!
পাঁচু রুইদাসের দিকে একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকায়।
রুইদাস আবার বলে, কী করি বল দিকিন…?
পাঁচু বলে, কী আবার করবে!
কেমন ডাঁটো পোক্ত দেখেছিস তো?
হ্যাঁ, তা বটে।
চার কুড়ি বয়েস হয়ে গেল, তবু দেখ ঠিক ভোরবেলা উঠবে, ঝাঁটপাট দেবে, ঠকঠক করে পাড়াময় ঘুরবে, কাঠ কুড়োবে—এসব কী বলতো…!
হ্যাঁ। পাঁচু বলে, বয়েস আন্দাজে তোমার মা-টা দেখি বেশ খরখরে আছে—আমার মা তো সেই কবেই চিতায় উঠল।
সেই তো চিন্তার কথা রে…!
পাঁচু রুইদাসের সমস্যাটা বুঝতে পারে না ঠিক; তাই একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, চিন্তার কেন হবে খুড়ো…?
আমার বয়েস তো ইদিকে বসে নেই বাপ, বেশ বুঝতে পারি শরীর ভাঙছে রে…
কোথায় খুড়ো, তোমার শরীর তো দিব্বি আছে!
না রে, শরীরে যেন জন্মের আলিস্যি, তাকত কমছে, বেশ বুঝি আমি—আগেতে এক-একটা আলুর বস্তা মাথায় নিয়ে এক দমে বাড়ি যেতুম, এখন হাঁপটান লাগে, এক টানে কতটা কুপিয়ে ফেলতুম, এখন আর হয় না, শরীরের জোর-বলে ভাটা পড়েছে রে, খুব বুঝি…।
ও কিছু নয় খুড়ো। পাঁচু বলে, সারের দামটা কেমন লাফ দিল দেখলে তো? দুটো পয়সা যে ঘরে তুলবে তার গিরিন্টি নেই।
সারের দাম নিয়ে এখন একেবারেই ভাবিত নয় রুইদাস। সে বলে, কাজটা তো বলতে গেলে পাপেরই হল…পাপেই ভাঙছে শরীর…বুড়ো-হাবড়া বয়েসে বিয়েতে বসলুম—কাজটা পাপেরই হল, কী বলিস…?
পাঁচু আড়চোখে তাকায় রুইদাসের দিকে। রুইদাসের বউ মরল এই ক-বছর আগে, অকালেই চলে গেল বউটা, তারপর হঠাৎ এক কাণ্ড করল রুইদাস, মাইতি পাড়ার মৃত্যুঞ্জয়ের ছোট বোনটাকে বিয়ে করে বসল। অকালবিধবা মালতী ভায়ের সংসারে ভালো ছিল না মোটেই—তাকে একদিন ঘরে তুলল রুইদাস।
পাড়াময় হইচই; বাড়িতে কত অশান্তি। ছ্যা: ছ্যা:, এই বয়সে! রুইদাস বলে, কী করি…ভাতের জলে চোখের জলে বেঁচে ছিল, কবে না কবে গলায় দড়ি দেয়—আহা কুকুর-বেড়ালও তো খিদেয় কাঁদে—না হয় এঁটোকাঁটা কুড়িয়েই খাবে’খন…। মেয়েরা যা-ও বা মেনে নিল, ছেলে বিজু কিন্তু খুব নারাজ। নিত্যদিন চেঁচামেচি ঝগড়া বিবাদ—তারপর একদিন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েই গেল বিজু।
পাঁচু বলে, পাপ হতে যাবে কেন—তোমার এখনও শরীর আছে, ভাত কাপড় জোগান দেওয়ার ক্ষমতা আছে, পাপ আবার কী কথা…বাদ দাও ওসব।
চুপ করে বসে থাকে রুইদাস। ফুকফুক করে বিড়ি টানে।
পাঁচু বলে, ওই তো দখিনবাড়ির গণেশ দাস, তোমার চেয়েও বেশি বয়েস—বিয়ে করল, ছেলেও হয়েছে একটা শুনছি—দিব্বি আছে।
রুইদাস মাথা নাড়ে—না রে পাপ হয়েছে ঠিক, পাপেই শরীর ভাঙছে…আর একটু যে পুণ্যি করব… কিন্তু মা আমার এত ডাঁটো….
পাঁচু একটু অবাক গলায় বলে, এ তো ভালো কথা…।
না রে, মায়ের গু-মুত না ফেললে পুণ্যি হয় না, মা যদি বিছানায় পড়ে থাকত, তবে সেবাযত্ন করতুম, গু-মুত ফেলতুম—কিন্তু ভাগ্য আমার দেখ, মা আমার এখনও সবল, বিছানা নেওয়ার নাম নেই, আর আমার ইদিকে শরীর যাচ্ছে, কদিন পর আমাকেই বিছানা নিতে হবে—পুণ্যি আর ভাগ্যে নেই আমার…।
পাঁচু হেসে বলে, মায়ের গু-মুত না ঘাঁটলে পুণ্যি নেই কে বলে খুড়ো…আমার মা তো এসটোক হয়ে পড়ল আর ম’ল—আমারও তাহলে পুণ্যি নেই বলো…।
ফের মাথা নাড়ে রুইদাস, আবার বলে, না রে, মায়ের গু-মুত ঘাঁটতেই হয়—ওপরে কী জবাবদিহি হবে কে জানে…বড় পাপ রে… পাপেই আমার ছেলেটা বয়ে গেল বুঝি আমি…।
পাঁচু একটু গলা নামিয়ে বলে, বিজুর খবর কী?
খবর আর কী হবে…। একটু হতাশ গলায় রুইদাস বলে, সে তো জেলে—সবই পাপ আমার…।
ছাড়া পাবে কবে?
সাড়ে চার মাসের মেয়াদ শুনেছিলুম—শেষ হয়ে এল যেন…এই আশ্বিনেই তো ছাড়া পাবে—তেমনই যেন শুনেছিলুম তখন…।
কোন জেলে আছে যেন?
মল্লিকফটক।
ও বাবা, সে তো অনেক দূর!
হ্যাঁ, দূর আছে, সে হাওড়া—যেতে একটা বেলা কাবার হয়ে যায়।
যাও না তুমি দেখা-সাক্ষাৎ করতে?
একটু চুপ থেকে রুইদাস বলে, যেতুম তো আগে—আর যাই না অনেক দিন—ছেলে কথা কয় না, দেখাই দেয় না—তাই আর…।
আশ্বিন তো যায় যায় খুড়ো।
হুঁ।
বলি কী, যাও একবার, ছাড়া পেল কি দেখো, নিয়ে এসো সঙ্গে করে—বদ পাল্লায় বেলাইন হয়ে গেছে তোমার ছেলে—বুঝিয়ে তাকে নিয়ে এসো এখানে…।
হুঁ।
না হলে, ফের বিগড়ে যাবে ছেলে কিন্তু তোমার।
নতুন একটা বিড়ি ধরিয়ে রুইদাস বলে, আজ যেন আশ্বিনের কত তারিখ হল?
বিশে আশ্বিন আজ।
বিশে আশ্বিন…বিশে আশ্বিন…। ঘন ঘন বিড়িতে টান দেয় সে। বলে, বিশে আশ্বিন ঠিক…?
হ্যাঁ গো খুড়ো।
কথা আজকাল মনে থাকে না যেন…মালতী গাঁট গুনে বলেছিল তখন…ক্যালেন্ডার দেখে হিসেব কষেছিল—কত বলেছিল যেন…বিশে আশ্বিন কি…সব যেন তালগোল পাকিয়ে যায়…।
রুইদাস বলে, বিশে আশ্বিনই যেন বলেছিল…বিজু ছাড়া পাবে সেদিন—বলেছিল যেন…।
পাঁচু বলে, তোমার কি এখন সন-তারিখ সব গুলিয়ে যাচ্ছে খুড়ো…?
যায় রে…। একটু আনমনে রুইদাস বলে, ঘেঁটেমেটে যায় সব—খালি যে পাপের ভাবনা মাথায় আসে, ঘোর লেগে যায় সব…।
বিড়িটা ফেলে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় রুইদাস।
পাঁচু বলে, চললে তাহলে…?
হ্যাঁ, যাই গিয়ে—মালতীকে জিগ্যেস করি, বিশে আশ্বিনই যেন…।
বিড় বিড় করতে করতে অপরিচ্ছন্ন পদক্ষেপে আলপথ দিয়ে মস্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলে রুইদাস। যেতে যেতে পাপের কথা ভাবে। তার পাপেই তো গেল ছেলেটা…পাপই তো…না হলে, এত বয়স হল মায়ের, তবু কেমন ঠকঠকে…এ পাপ কি সহ্য হয়…হবে না…হবে না কিছুতেই…
