পাখির বাসা – ১৬

১৬

খুব জোরে চমকাল রানু। এত জোরে যে গ্লাসের জল চলকে হাতে পড়ল কিছুটা। মেজোবাবু চলে যাবার পর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসেছিল সে।

মানুষটা জল চাইল, কিন্তু খেতে পেল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বিপদের মধ্যে দৌড়ে যেতে হল। অন্যমনস্ক হয়ে সামনে তাকিয়ে ছিল রানু। দরজার বাইরে ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিল। এখনও কারেন্ট এল না। বাতিটা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ছোট্ট হয়ে গেছে একেবারে। বাতি ফুরিয়েছে। খেয়াল ছিল না। কাল আনতে হবে বাতি।

জলের গ্লাসটা মেঝেতে বসানো। বাতির আলোয় বড়সড় একটা ছায়া পড়েছে গ্লাসের। ক্ষয়ে ক্ষয়ে একেবারে মেঝের সঙ্গে মিশে গেছে বাতিটা। শুধু সলতেটুকু জ্বলছে। নিভে গেল বলে। জলের গ্লাসটা মেঝে থেকে তুলে নেয় রানু। দরজার কাছে শব্দ হয় একটু। তাকিয়ে চমকে ওঠে সে। গ্লাসের জল চলকে হাতে পড়ে।

আর তখনই দপ করে জোরে জ্বলে উঠে নিভে যায় বাতি।

ঘোর মিশমিশে অন্ধকারে কাঠের মতো বসে থাকে রানু। বুঝতে পারে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে সে। ঘামের গন্ধ পায় রানু। বড় বড় শ্বাস টানার শব্দ শোনে।

বাতিটা নিভে গেল! সামনের অন্ধকার থেকে ভেসে আসে কথাগুলো।

রানু বুঝতে পারে ঘরের ভেতর ঢুকে এসেছে সে। গলা যেন বড় ক্লান্ত। শ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে রানু।

আর বাতি নেই?

রানু খুব মৃদু গলায় বলে, না।

ট্রান্সফরমারে গন্ডগোল মনে হয়।

কিছু বলে না রানু। অন্ধকারে বসে নিজের বুকের ধুকধুক শব্দ শোনে।

একটু বসি…? খুব ক্লান্ত গলায় বলে সে।

অন্ধকারের মধ্যেই জলের গ্লাসটা সাবধানে নামিয়ে রাখে রানু। ভিজে হাতটা মুছে নেয় শাড়ির আঁচলে। একটু একটু করে কমে আসছে বুকের মধ্যে খ্যাপাটে ইঞ্জিনের শব্দ। বসতে চাইছে সে। কতক্ষণ বসবে? তার মধ্যে কি ফোন করে খবর দেওয়া যাবে না মেজোবাবুকে?

অনেকদিন বাইরে ছিলাম আমি। লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল আমায়…অনেক দূরে লুকিয়ে ছিলাম…।

ফোনটা কোথায়? একটা মিসড কল দিতে হবে মেজোবাবুকে। অন্ধকারে বসে মেঝেটা হাতড়ে হাতড়ে দেখতে থাকে রানু।

কেমন আছ তুমি?

মেঝেতে নেই ফোনটা। গেল কোথায়? একটু অধৈর্য হয়ে পড়ে রানু। দেরি হয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ আর বসবে সে? তার আগেই খবরটা দিতে হবে মেজোবাবুকে। কথায় কথায় বসিয়ে রাখতে হবে একে।

রানু বলে, ভালো…ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

নিজের কানেই নিজের প্রশ্নটা কেমন বেখাপ্পা লাগে রানুর।

কিছু বলে না সে। ঘোর অন্ধকারে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

ফোনটা মনে হয় বিছানায়। দেশলাইটা জ্বালতে হবে। হাতড়ে হাতড়ে দেশলাই খোঁজে রানু। খুঁজতে খুঁজতে বলে, আপনার বাড়ি যেন কোথায়?

অনেক দূর।

একটা নাম আছে তো?

প্রশ্নগুলো নিজের কানে তত বেখাপ্পা লাগে না আর রানুর।

কী হবে জেনে তোমার; আমিই তো ভুলে গেছি। গলায় আবার ক্লান্তি নেমে এসেছে তার।

দেশলাইটা মনে হয় স্টোভের পাশে। স্টোভের দিকে একটু একটু করে সরে যায় রানু। অন্ধকারে মেঝেতে ঘষে ঘষে সরতে থাকে। বলে, বাড়িতে কে আছে?

ঠাকুমা, বাবা, আর…।

আর কে?

আমার মা। ক্লান্ত গলায় সে বলে, কিছু কি খুঁজছ তুমি?

হ্যাঁ। দেশলাইটা। আছে নাকি দেশলাই?

না তো, দেশলাই নেই…তবে মোবাইল আছে…জ্বালব…?

রানু তাড়াতাড়ি বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

মোবাইলের মৃদু আলো জ্বলে ওঠে। সেই আলোয় রানু দেখে কোণের দিকে পড়ে আছে দেশলাইটা। তাড়াতাড়ি গিয়ে তুলে নেয় রানু। একটা কাঠি জ্বালে।

অন্ধকারটা সরে গিয়ে ঘরের কোণে কোণে জড়ো হয়। অল্প আলোয় রানু দেখে ভিজে চপচপ করছে মুখ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের কোণে কালি, একটু রোগা হয়ে গেছে যেন।

আগুনের তাত লাগছে আঙুলে। রানু তাড়াতাড়ি বিছানাটা দেখে। না, নেই তো!

টুক করে নিভে যায় কাঠিটা। লাল আঙরা ছিটিয়ে পড়ে মেঝেতে। রানু ভাবে, কত সময় তো হঠাৎ হঠাৎ অকারণ ফোন আসে, মোবাইল কোম্পানির ফোন, এখন যদি একটা আসে তেমন! মোবাইলটা খুঁজে পায় তাহলে।

কিছু খুঁজছ?

মোবাইলটা যে কোথায় গেল…। বলতে বলতে আর একটা কাঠি জ্বালে রানু।

এবার দেখতে পায় মোবাইল। জানলার খাঁজে। তাড়াতাড়ি মোবাইলটা তুলে নেয় রানু।

এবার একটা মিসড কল শুধু।

তখনই চড়াৎ করে জ্বলে ওঠে ঘরের আলো। চোখ ধাঁধিয়ে যায় যেন।

এ কে, সামনে দাঁড়িয়ে…! সেই ছেলেটা…! হ্যাঁ, সেই ছেলেটাই তো…। একটু রোগা হয়ে গেছে শুধু। আর ভীষণ ক্লান্ত যেন। মনে হচ্ছে, এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়বে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়বে হয়তো। খুব কষ্ট করে তাকিয়ে আছে রানুর দিকে। কিন্তু…!

এখনও কি আলো-আঁধারির ঘোর কাটেনি রানুর? ঠিক দেখছে তো সে! খুব দ্রুত চোখ দুটো একবার বুজে আবার তাকায় রানু। সেই ছেলেটাই; কিন্তু ডান হাতটা…! ডান হাতটা কবজি পর্যন্ত নেমে এসে কী নিদারুণভাবে ফুরিয়ে গেছে। কেমন অসহায় আর একা হয়ে ঝুলে আছে হাতটা।

ক্লান্ত চোখ মেলে ছেলেটাও দেখছে রানুকে। ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি যেন একটু।

একটু জল দেবে…?

রানু তাড়াতাড়ি গ্লাসটা মেঝে থেকে তুলে নেয়। হাত আবার কাঁপছে। বলে, ভালো জল, একটু আগেই ঢেলেছি। বাঁ-হাতটা এগিয়ে দেয় ছেলেটা। একটু নড়ে ওঠে কাটা হাতটা। যেন ব্যর্থ হয়ে মাথা ঝাঁকায়।

একটু এগিয়ে গিয়ে গ্লাসটা হাতে দেয় রানু।

ছেলেটা এক নি:শ্বাসে খেয়ে নেয় সব জল।

আর দেব…?

নাহ, চলে যাব আমি…। ক্লান্ত গলায় সে বলে, চলে যাব আমি…এখনই চলে যাব…একটু বসি…? রানু শুধু অল্প ঘাড় নাড়ে। ঘাড় নেড়ে বলে—হ্যাঁ।

মোবাইলটা ধরাই থাকে হাতে, তালুর ঘামে ভিজে ওঠে মোবাইলটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *