১
ঠিক চার মাস সতেরো দিন পর জেল থেকে বেরিয়ে বিজু দেখল আকাশটা নীল। আর ভীষণ ঝকঝকে। এত ঝকমকে যে এক টুকরো ভেঙে নিয়ে আয়নার মতো সামনে ধরলে মুখ দেখা যাবে।
মেয়াদ শেষ করে বাইরে এসে বেশ ফুরফুরে লাগছে বিজুর। অনেকক্ষণ ঘাড় হেঁট করে সেলুনে চুল কাটার পর বাইরে এলে যেমন লাগে।
আবার আকাশের দিকে তাকাল বিজু। জেলে থাকতে আকাশ দেখত বেশি। চারদিকে বিধিনিষেধের বাউন্ডারি, শুধু ওপরটা অগাধ—কোনও বাধা নেই; তাই সময়ে-অসময়ে ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। তখন আকাশ জুড়ে কালো আর পাঁশুটে মেঘের হুল্লোড়—নীলের দেখা মেলা ভার। ছুটির খবরটা শোনার পর থেকে আর আকাশ দেখা হয়নি—মনটা বুঝি তখন পাঁচিল টপকে বাইরে চলে এসেছিল। ফাঁকতালে কখন যেন চোখ ঝলসানো নীল রঙের হয়ে গেছে আকাশটা। দু-একটা ফুলবাবু টাইপের সাদা মেঘ নীলের গায়ে এদিক-ওদিক আলগা হয়ে ঠেকে আছে বটে; কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় মন তাদের উড়ুউড়ু—যে-কোনও সময় ভ্যানিশ হয়ে যাবে।
জেল গেটের উলটোদিকের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনল বিজু। জেলের রোজগার। দোকানের ঘড়িটা দেখল—দশটা দশ। পুজোর বোধহয় আর ক’টাদিন মাত্র বাকি। কোন একটা সংগঠনের পক্ষ থেকে পুজোয় কয়েদিদের নতুন জামাকাপড় দেবার কথা চলছিল। আর ক’টাদিন পরে ছাড়া পেলে এক সেট নতুন জামা-প্যান্ট হত। ভেবে নিজেরই একটু হাসি পেল বিজুর।
সিগারেট টানতে টানতে মোড়ের মাথায় চলে এল বিজু। সেই চেনাজানা অফিস টাইমের হাওড়া ময়দান—সাড়ে চার মাসে বদলায়নি কিছু। সেই জ্যামে জড়িয়ে মড়িয়ে একশা জিটি রোড। বাস লরি ম্যাটাডোর ট্যাক্সি সব সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ভুসভুস করে কালো ধোঁয়া ওগলাচ্ছে আর মাঝে মাঝেই বিরক্তি প্রকাশ করছে হর্ন দিয়ে। ফাঁকফোকর দেখলেই সাইকেল বাইক মানুষ যে যার সুবিধেমতো নিজেকে গুঁজে দিয়ে জ্যামটাকে পাকিয়ে তুলছে আরও। মোড়ের মাথায় খৈনির দোকানটা আগের মতোই আছে—দোকানদার লোকটা বদলে গেছে শুধু। পাকা গোঁফওলা বুড়ো লোকটার বদলে শক্তসমর্থ চেহারার কমবয়সি একটা ছেলে। জেলে থাকতে দু-একবার খৈনি খেয়েছিল বিজু—খুব একটা জুত লাগেনি। ব্যান্ডেলের কানাই মণ্ডল বানিয়ে দিয়েছিল খৈনি। কানাই ডাকাতির আসামি, এটা নিয়ে ওর থার্ড টাইম জেল। চার বছর টানতে হবে এই খেপে। খৈনির জোর নেশা কানাইয়ের। দু:খ করে বলেছিল, এই খৈনিই কাল হল বুঝলি, নেশার জন্যেই ধরা পড়ে গেলুম।
শুনে বেশ আশ্চর্য লেগেছিল বিজুর।
ঠোঁট ফাঁক করে খৈনি গুঁজে দিতে দিতে কানাই বলেছিল, এমন ঘাপটি মেরে ছিলুম, পুলিশের বাপের সাধ্যি ছিল না ধরে। সন্ধের পর শুধু একবার বের হতুম নেশা কিনতে। শালা কী করে যে খবর রটে গেল—একদিন খৈনি কিনছি, অমনি পুলিশ এসে ক্যাঁক!
কানাইয়ের এখনও প্রায় বছরখানেক বাকি। কথাটা মনে হতেই কালো ধোঁয়া-ধুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে বড় একটা শ্বাস টানে বিজু। জেলে অবশ্য বেশ মেজাজেই থাকে কানাই। শক্তপোক্ত চেহারা, নতুন কেউ ঢুকলে ক’দিন সেবাযত্ন নেয় আর রেপ কেসের আসামি এলে উদোম পেটায়। কানাই ভেবে রেখেছে, এবার খালাস পেলে পুরোনো লাইনে আর যাবে না; আহমেদাবাদে তার কে এক পরিচিত কাজের সন্ধান দিয়েছে—মন দিয়ে সেটাই করবে। তবে তার আগে একটা কাজ বাকি—একটা খুন করতে হবে তাকে। নিজের বউকেই করতে হবে খুনটা। জেলে ঢোকার কিছুদিন পর দুটো খবর পায় কানাই। একটা ভালো খবর—বড় মেয়েটা তার এক লরির খালাসিকে বিয়ে করে সুখে ঘরসংসার করছে। আর খারাপটা হল বউ মদন নামে পাড়ার একটা ছোঁড়ার সঙ্গে ভেগেছে; যাবার সময় ছোট মেয়েটাকেও নিয়ে গেছে সঙ্গে। ফলে দেশে আর পিছুটান রইল না তার। তাই দেশ ছেড়ে আহমেদাবাদে চলে যাবে কানাই; আর যাবার আগে বউকে খুনটা করে দিয়ে যাবে। কারণ সব সহ্য করা যায়, শুধু নেমকহারামিটা নয়। যদি বাড়িতে থাকার সময় বউ পালাত তবে এত রাগ হত না; বুঝত মেয়েমানুষ ধরে রাখার মুরোদ নেই তার। কিন্তু আমি যখন জেলে তুই পালালি কোন বিবেচনায়! এ তো গদ্দারি—পেছন থেকে ছুরি মারার মতো গদ্দারি। তাই ভেবেচিন্তে বিশ বছরের পুরোনো বউকে খুন করার সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সে। মদনকে অবশ্য মার্ডার করবে না। শুধু তার বিচিটা কেটে নেবে—নে শালা থাক খোজা হয়ে সারাজীবন! কানাই বিজুকে বলত, মার্ডার-টার্ডার করেছিস না কি?
না, এখনও করিনি।
যাহ শালা, এখনও মার্ডার করিসনি, তবে কেমন দরের মস্তান তুই—!
বিজু হাসত।
কানাই বলত, তোদের লাইনে মার্ডারটাই তো আসল রে; যতগুলো মার্ডার তত হিট মস্তান! রেপ-টেপ—।’
নাহ!
এইটা ভালো, মেয়েদের ইজ্জত দিবি বুঝলি, মেয়েরা হচ্ছে মায়ের জাত। আমি এত কেস করেছি, কোনও দিন কোনও মেয়েকে বেইজ্জত করিনি। মেয়েদের সবসময় মা বলে ডেকেছি।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায় বিজু। ‘মা’ শব্দটা মনে পড়তেই একটা বউয়ের মুখ ভেসে ওঠে চোখে। খুব অসহায় চোখ মুখ তার—বিজু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে তাকে। সে পড়ে আছে, উঠছে না, আরও জড়সড়ো হয়ে গেছে যেন—বাবা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে, সে-ও অবাক হয়ে দেখছে বিজুকে, বলতে পারছে না কিছু, শুধু ঠোঁট নড়ছে বিড়বিড় করে। এই দৃশ্য বারবার বড় অস্থির করে তোলে বিজুকে—খুব অসহায় লাগে তখন।
কোথায় যাবে ঠিক নেই। কিছু না ভেবেই রাস্তা ধরে আনতাবড়ি কিছুটা হাঁটল বিজু।
একটা বাইক গায়ের ওপর প্রায় হামলে পড়ল। ছিটকে সরে এল বিজু। একটা অল্পবয়সি মেয়ে—জিন্স আর গেঞ্জি পরা, ভালো করে চালানো শেখেনি বোধহয়; ভিড়ে বেসামাল হয়ে গেছে। একটু অপ্রস্তুত গলায় মেয়েটা বলে, সরি!
কিছু বলে না বিজু, পাত্তা না দেবার ভঙ্গিতে এগোয় সামনে। ঠিক তখনই ডাকটা শুনতে পায় সে।
বিজুদা, এই শালা বিজুদা!
বিজু অবাক হয়ে পেছনে তাকায়।
এই যে—এখানে!
এবার দেখতে পায় বিজু। স্যাম্পেল। সৎকার সমিতির ডেড বডি-ভ্যান নিয়ে লম্বা জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে।
স্যাম্পেলের দিকে এগিয়ে গেল বিজু। ভেতর থেকে গাড়ির দরজাটা খুলে দিয়ে স্যাম্পেল বলে, কবে ছাড়া পেলে মাইরি?
এই তো, একটু আগে…।
উরিশালা! একেবারে টাটকা কয়েদি। হেভি জিনিস মাইরি! আনন্দের চোটেই বোধহয় জোরে দুবার হর্ন বাজিয়ে দিল স্যাম্পেল।
স্যাম্পেলের পাশে বসল বিজু। সামনে পাঁচ-সাত হাত রাস্তা ফাঁকা হয়েছিল। একটা অটো তাল করছিল সেই ফাঁকে ঢুকে যাবার। স্যাম্পেল বেমক্কা অ্যাক্সিলেটারে চাপ দিয়ে চেপে দিল অটোটাকে। অটো ড্রাইভার কিছু বলতে চোখা খিস্তি দিল একটা। তারপর বিজুর হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে মস্ত একটা সুখটান দিয়ে বলল, কেউ আসেনি নিতে তোমায়?
বিজু বলে, নাহ।
যা: শালা, কেউ এল না!
কে আর আসবে!
আমি জানলে যেতাম। স্যাম্পেল সিগারেটটা বিজুর হাতে দিতে দিতে বলে, অসিত জানত আজ তুমি খালাস হবে?
কী জানি! ছোট একটা টান দিয়ে বলে বিজু।
তোমার সঙ্গে জেলে দেখা করত না অসিত?
নাহ!
এইগুলো শালা হড়কানবাজি! তোমাকে সেভ করা উচিত ছিল ওর; উকিল টুকিল দিয়েছিল?
নাহ!
এই হড়কানবাজিগুলো শালা আমার একদম সহ্য হয় না…ওর হয়ে কাজ করতে গিয়েই কিন্তু তুমি ফাঁসলে!
কী আর করা যাবে। বিজু গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে, তুই গিয়েছিলি কোথায়?
আমার শালা যা কাজ! ফের সিগারেটটা বিজুর হাত থেকে নিয়ে স্যাম্পেল বলে, বডি ফেলতে শিবপুর ঘাটে…আরে দেখো না, কখন কেস মিটে যায়, শালা বাড়ি থেকে বডি বের করতেই বহুত লেট…বুড়োর চার-পাঁচটা মেয়ে, এক পাল নাতি-নাতনি, এ একবার বুকে পড়ে কাঁদে তো ও একবার ফিট হয়ে যায়, শা-ল-লা যত সব…মাঝখান থেকে আমি ফেঁসে গেলাম জ্যামে!
ও দিকের খবর কী?
কোন দিকের?
এলাকার!
অসিত একাই কাঁপাচ্ছে; এই তো ক’দিন আগে রাঘব মিত্র রোডে বেধড়ক বোমাবাজি হল, ভাইলালের সঙ্গে লেগেছিল অসিতের—শুনছি তো ভাইলালের দুটো ছেলে ভালো ঝাড় খেয়েছে!
ভাইলালের সঙ্গে দখলবাজি নিয়ে অসিতের বহুকালের খারাখারি। মাঝেমধ্যেই লাগে। ভাইলাল ঝাড় খেয়েছে মানে, বিজুর ভালো খবর। কিন্তু তেমন কিছু বোধ হয় না তার। সে বলে, পুলিশ তোলেনি কাউকে?
নাহ। বড়বাবু এসেছিল, দেখেশুনে গম্ভীর মুখে চলে গেল, তার পর সব চুপচাপ—। এই বড়বাবুটার দ্বারা কিছু হবে না, মেজোবাবুর হাতে কেসটা থাকলে কিছু একটা হত এতদিনে।
মেজোবাবু বলতেই চোখের সামনে সেই চেহারাটা ভেসে ওঠে বিজুর। শ্যামবর্ণ, মাঝারি উচ্চতা, খুব নিরীহ ধরনের একটা গোঁফ, আর কেমন যেন একটা ভো-কাট্টা ঘুড়ির মতো চালচলন। দেখেই বোঝা যায়, পুলিশি ধমক চমক ব্যাপারটা এর সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। সত্যি বলতে কী, খাঁকি জামা-প্যান্ট আর টুপি না থাকলে একটা বাচ্চা ছেলেও একে দেখে ঘাবড়াবে না। তবে একটা জিনিস, লোকটার হাত দুটো শরীর আন্দাজে বেশ লম্বা। অ্যারেস্টের সময় বিজুকে যখন মাটি থেকে টেনে তুলছিল, তখনই হঠাৎ ব্যাপারটা চোখে পড়ে তার। পরেও দেখেছে—হ্যাঁ সত্যি, হাত দুটো লোকটার একটু যেন বেশি লম্বা। যাদের হাত বেশি লম্বা, প্রায় হাঁটু পর্যন্ত, তাদের ভালো একটা বাংলা আছে—কী যেন একটা বলে…ভাববার চেষ্টা করে বিজু—মনে পড়ছে না কিছুতেই—।
জ্যাম একটু কেটেছে। সামনে একটা তেমাথার মোড়। মোড়ে গিয়ে বাঁ দিকে টার্ন নিল স্যাম্পেল। এই রাস্তাটায় আর জ্যাম নেই; তাই রাস্তায় ঢুকে একটু স্পিড নেয় গাড়ি।
বিজু বলে, যাদের হাত খুব বড় বড় হয় তাদের কী বলে জানিস?
হাত বড় হয় মানে! স্যাম্পেল একটু অবাক দৃষ্টিতে বিজুর দিকে একবার তাকিয়ে বলে, মানুষ, না কোনও জন্তু-টন্তুর…?
ধুস, মানুষের!
মানুষের হাত বড় মানে, সব মানুষের হাতই তো সমান, মানে তার বডির সাইজ যেরকম, হাতও সেই মাপের, তাই তো জানি আমি!
না রে, কারও কারও হাত একটু বেশি লম্বা হয়, ব্যাকরণ বইয়ে পড়েছিলাম ইস্কুলে।
স্যাম্পেল বলে, ধুর শালা, তুমিও যেমন—ব্যাকরণের কথা আমায় বলছ, আমার দৌড় তো ফোর অবধি, তারপর তো শালা হলুদ বই ছাড়া জীবনে আর কিছু পড়িনি।
মেজোবাবুর হাতগুলো বুঝলি, খুব লম্বা লম্বা। একটু অন্যমনস্ক গলায় বলে বিজু।
অ্যাঁ! তাই নাকি!
হ্যাঁ।
কিন্তু লম্বা হাত নিয়ে ফায়দা কী বল, ঘুস তো হাত পেতে নেয় না মালটা!
বিজু স্যাম্পেলের দিকে তাকিয়ে বলে, কে বলল?
সবাই জানে। বড়বাবুটা যেমন দু-হাতে নেয়, মেজোবাবুটা আবার উলটো, পুলিশ লাইনের কলঙ্ক আর কি!
একটু হেসে ফেলে বিজু।
স্যাম্পেল বলে, তোমাকে তো মেজোবাবুই ধরেছিল?
হ্যাঁ।
শালা, পালাতে পারলে না?
ছুটেছিলাম; কিন্তু দমে কুলোতে পারিনি, তারপর কাদায় পা পিছলে পড়ে গেলাম—লোকটার শালা বুকে বহুত দম, হাঁপায় না।
কেলিয়েছিল নাকি?
না তো।
চ্যাঙ্কিকে নাকি বহুত কেলিয়েছিল।
তাই! একটু অবাক হয় বিজু। মেজোবাবু লোকটার সঙ্গে যেন মারধর ব্যাপারটা কিছুতেই খাপ খায় না।
স্যাম্পেল বলে, চ্যাঙ্কি এখনও খুঁড়িয়ে হাঁটে, মাথার একদিকের একগোছা চুল ওপড়ানো।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল বিজু। হঠাৎ রাস্তার ধারে চোখ যেতেই থমকে যায়। অসিত। বাবুলির চায়ের দোকানে বেঞ্চিতে বসে। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে চায়ের ভাঁড়।
দাঁড়া।
ব্রেক কষে একটু অবাক চোখে বিজুর দিকে তাকায় স্যাম্পেল।
বিজু বলে, নেমে যাচ্ছি।
এখানে?
হ্যাঁ। চোখের ইশারায় অসিতকে দেখায় বিজু। তারপর বলে, অসিতদার সঙ্গে একটু দরকার আছে।
দেরি হবে কি তোমার? আমার একটা বডি তোলার ছিল…,
দরজার লক খুলে নামতে নামতে বিজু বলে, তুই চলে যা।
সশব্দে দরজা বন্ধ করেই গাড়ি ছেড়ে দেয় স্যাম্পেল।
রাস্তা পেরিয়ে বাবুলির দোকানের সামনে চলে আসে বিজু।
চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে যাচ্ছিল অসিত। বিজুকে দেখে একটু থমকাল। কিন্তু সে মুহূর্তের ভগ্নাংশ। তারপর লম্বা চুমুকে চা শেষ করে ভাঁড়টা ছুড়ে দিয়ে বলল, কী রে, কী খবর?
এই তো।
কবে বেরোলি?
আজই।
নীল জিনস আর কমলা টপ পরে একটা মেয়ে গটমটিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সামনে দিয়ে। সেদিকে তাকিয়ে অসিত বলে, অ। চা খাবি নাকি?
না। গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বিজু বলে, তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।
সর্দি হয়েছে নাকি তোর?
না তো! একটু অবাক হয় বিজু।
কাশছিস দেখছি। সিগারেটে একটা টান দিয়ে অসিত বলে, বল কী কথা।
কিছু টাকা দিতে হবে।
টাকা!
হ্যাঁ।
আঙুলের টোকায় সিগারেটের ছাইটা ঝেড়ে অসিত বলে, কত?
আপাতত হাজার খানেক।
এ-ক হাজার! তাও আবার আপাতত। ভুরুর মাঝখানে ভাঁজ পড়ে অসিতের।
হাঁ।—এক।
হবে না; মার্কেট খুব খারাপ।
আমারও খুব দরকার কিন্তু।
ভুরুতে ভাঁজ নিয়েই অসিত বলে, টাকার কার না দরকার, বল! দশ-বিশ হলে দিতে পারি।
আমি কি ভিখিরি নাকি! সামান্য উত্তেজিত হয়ে বলে বিজু।
আমারও তো ট্যাঁকশাল নেই। খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলে সিগারেটে একটা টান দেয় অসিত।
কিন্তু তোমার জন্যেই তো ফাঁসলাম।
আমার জন্য?
তোমার কাজ করতে গিয়েই তো ধরা পড়েছি। বিজুর গলায় এখনও উত্তেজনা।
আমি কি তোর অ্যাঁড়ে তেল দিয়ে ডেকে এনেছিলাম! একটু চড়া গলায় অসিত বলে, বরং তোর জন্যে আমি ফেঁসে গেছি, তুই আমাদের ফাঁসিয়েছিস।
আমার জন্যে! এবার বিজুর গলায় বিস্ময়।
তবে নয়তো কী—দু-ঘা ক্যালানি সহ্য করার মতো টেংরির জোর নেই, আসিস কেন এ সব কাজ করতে! শালা গদ্দার!
কী বাজে বকছ! কিছুটা চিৎকার করেই বলে বিজু।
আস্তে, আস্তে! অসিত গলা নামিয়ে বেশ কঠিন গলায় বলে, তুই লিক করিসনি?
আমি!
তবে কোন শালা…মধু বিশ্বাস লেনের ঠেকটা পুলিশ জানল কী করে?
সেটা আমি কী করে বলব!
শোন বিজু! কঠিন শান্ত গলায় অসিত বলে, তুই তো বেশ কিছুদিন আমাকে দেখছিস—আমাকে কি তোর খুব ক্যালানে মনে হয়? তোকে যেদিন তুলল, তার পরদিনই অমনি মধু বিশ্বাস লেনে পুলিশ রেড করল—আমি ক্যালানে আছি…অ্যাঁ..!
বিজু বলে, যা: শা-লা!
…পলাশ আর একটু হলেই ধরা পড়ত—মাঝখান থেকে দুটো মেশিন আর অতগুলো দানা বেরিয়ে গেল—শালা আমি ক্যালানে আছি—একটা মেশিন ছিল টপ ক্লাস, দামি জিনিস—আমাকে কী ভাবিস অ্যাঁ…ক্যালেনে…!
বিজু একটু নরম গলায় বলে, মাইরি বলছি, আমি কিন্তু একটা কিচ্ছু লিক করিনি, বড়বাবু জিগ্যেস করেছিল, আমি মুখ খুলিনি।
চ্যাল শালা, শুয়ার! ঢপবাজি অন্য জায়গায় মারাবি, ফোট এখান থেকে।
বিজু স্থির চোখে তাকাল অসিতের দিকে। একটা গরম গোলা বুক থেকে ড্রপ খেয়ে উঠে এল মাথায়। তারপর ফেটে গেল গোলাটা। মাথার মধ্যে গলগলে গরম লাভার মতো কিছু একটা ছড়িয়ে পড়ছে, কান দিয়ে নাক দিয়ে যেন বেরিয়ে আসছে অ্যাসিড ধোঁয়া, প্রচণ্ড মুঠো হয়ে উঠছে ডানহাতটা।
বিজুর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু থমকাল অসিত। বিজুর এমন ধকধকে চোখ সম্ভবত আগে দেখেনি সে। কিন্তু সে-ও এলাকার শের। এমন চোখকে পাত্তা দেবে কেন সে? সিগারেটের ধোঁয়াটা সোজা বিজুর দিকেই ছুড়ে দিয়ে বলল, ফোট শালা এখান থেকে!
কথাটা ভালো করে শেষ করতে পারল না অসিত। তার আগেই বিজুর ডান হাতের ঘুসিটা রাগী কেউটে সাপের মতো ছোবল মারল মুখে। বেঞ্চি থেকে উলটে পড়ল অসিত। পাশেই জলভরতি লোহার বালতি ছিল একটা। মাথাটা ঠক করে লাগল বালতিতে, উলটে গেল বালতিটা।
বিজু আক্রোশভরা চোখে দেখল দৃশ্যটা; ছিটকে গেছে অসিতের মুখের সিগারেট, বালতির জলে ভিজে গেছে; পাশে শুয়ে থাকা কালো কুকুরটা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ছে।
বিজু দেখল খুব দ্রুত মাটিতে গড়িয়েই উঠে বসেছে অসিত। ফুটবলে লাথি মারার মতো সজোরে একটা লাথি বিজু মারল অসিতের বুকে। আবার কাত হয়ে পড়ল অসিত। শুয়ে শুয়েই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাবার চেষ্টা করছে।
একটু থমকাল বিজু। মেশিন ছাড়া কখনও বাইরে আসে না অসিত। ছ’ঘড়ার একটা মেশিন সব সময় পকেটে থাকে ওর। হ্যাঁ, পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে অসিত।
দৃশ্যটা একটু ঝাঁকুনি দিল বিজুকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা লাফ দিয়ে সে ঢুকে পড়ল পাশের রাস্তায়। সামনেই একটা বাঁক। বাঁকটা বেঁকতেই পেছনে একটা শব্দ শুনল বিজু। খুব চেনা শব্দ। তার মানে, অসিত আসছে।
চকিতে একবার পিছনে তাকিয়ে বিজু দেখল, খোলা মেশিন নিয়েই ছুটে আসছে অসিত। অসিতের টিপ অব্যর্থ। সাধারণত একটা টার্গেট দুবার মিস হয় না তার।
ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল বিজু। সরু একটা গলিতে ঢুকে পড়ল সে।
