আট
‘ওই চেয়ারে গিয়ে বসো।’ শেফালি-মা হুকুম করলেন ঘরের উলটোকোণে জানলার গায়ে একটি টেবিল এবং চেয়ার। বিনা বাক্যব্যয়ে নবকুমার চেয়ার টেনে বসল। শেফালি-মায়ের গলা ভেসে এল, ‘বাঁ-দিকের ড্রয়ার টেনে খোলো। ওখানে কাগজ আর কলম পাবে। বের করো।’
সুন্দর সাদা কাগজ আর ফাউন্টেন কলম বের করল নবকুমার। ছেলেবেলায় পেনসিলে লেখা শুরু করার পর ডট পেনে লেখালেখি করেছে সে। ফাউন্টেন কলম একটাও ছিল না।
‘এদিকে তাকাও। পড়াশুনা তো করেছ বলছ। একটা চিঠি লেখো তো।’
‘চিঠি?’
‘হ্যাঁ। লেখো, সভাপতি, মহিলা দুর্বার সমিতি, কলকাতা। লিখেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী লিখেছ?’
‘সভাপতি, মহিলা দুর্বার সমিতি, কলিকাতা।’ লেখাটা পড়ল নবকুমার।
‘কলিকাতা কেন? আমি কি কলিকাতা বলেছি?’
‘আজ্ঞে, ভূগোলের স্যার বলতেন, কলিকাতা হল শুদ্ধ, কলকাতা অশুদ্ধ। জব চার্নক সাহেবের সময় এই অঞ্চল তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। গোবিন্দপুর, সুতানুটি এবং কলিকাতা। কোনও স্থানের নাম বিকৃত করা অনুচিত। ইংরেজরা বিকৃত করে বলত ক্যালকাটা।’ বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল নবকুমার।
অবাক হয়ে ব্যাখ্যা শুনলেন শেফালি-মা। তারপর বললেন, ‘চিঠিতে কী লিখতে হবে শোনো। আমি সভাপতিকে জানাচ্ছি যে আমার বাড়িতে বীণারানি নামের একটি মেয়েমানুষ আমার অজান্তে যে মেয়েটিকে কিনে রেখেছিল যাকে দুর্বার সমিতির সামনে আজ নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তাকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বীণারানি এই কথা জানিয়েছে। আমি এই ব্যাপারে আর কিছু জানি না। বুঝলে?’
মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘এবার চটপট লিখে ফেলো।’ শেফালি-মা মুখ ফেরালেন।
একটু ভেবে চিঠিটা লিখল। তারপর নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘মেয়েটার নাম—?’
‘জানি না। এখানে যেসব মেয়ে আসে তাদের আসল নাম কেউ জানে না। দু-দিন পরপর নাম পালটায়। নামের দরকার নেই।’ শেফালি-মা মাথা নাড়লেন।
চিঠি শেষ করে চেয়ার ছেড়ে সামনে এল নবকুমার, ‘হয়ে গিয়েছে।’
‘দেখি।’ হাত বাড়িয়ে খাপ থেকে চশমা বের করে নাকে চাপিয়ে কাগজটা নিলেন শেফালি-মা।
‘ওমা! হাতের লেখা দেখছি মুক্তোর মতো সুন্দর। হুঁ! সভাপতি, মহিলা দুর্বার সমিতি, কলিকাতা। সবিনয় নিবেদন। আমার অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিটস্থ বাড়িতে শ্রীমতী বীণারানি ভাড়ায় থাকে। বীণারানি একটি নবাগতাকে তাহার আশ্রয়ে রাখিয়াছিল। এই ব্যাপারে সে আমার মতামত গ্রহণ করে নাই। আপনারা এই তথ্য অবগত হইয়া নির্দেশ দিয়াছিলেন সেই নবাগতাকে আপনাদের সামনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ উপস্থিত করিতে হইবে। কিন্তু এইমাত্র অবগত হইলাম সেই নবাগতাকে নাকি খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। সত্যমিথ্যা জানি না কিন্তু শ্রীমতী বীণারানি বলিতেছে মেয়েটি নাকি তাকে না জানাইয়া উধাও হইয়া গিয়াছে। এমত অবস্থায় সমস্ত ঘটনা আমি দুর্বার সমিতির কাছে নিবেদন করিলাম। ইতি-।’
‘আমার নামটা লেখো।’
‘আমি আপনার পুরো নাম জানি না।’ নবকুমার বলল।
‘মাস্টার বলেনি?’
‘আজ্ঞে, প্রথম নামটা বলেছিল।’
‘অ। তার সঙ্গে দেবী জুড়ে দাও। ঠিকানা, বাইশের এ অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিট।’
নবকুমার সেগুলো লিখে এগিয়ে ধরল কাগজটা, ‘সই দেবেন।’
‘সই? তুমি আমার নাম লেখোনি?’
‘লিখেছি। তার ওপরে সই করা নিয়ম।’
‘অ। দাও।’ হাত বাড়িয়ে কাগজকলম নিয়ে চিঠিতে চোখ নামিয়ে নিজের নামের ওপর সই করলেন শেফালি-মা। তারপর বললেন, ‘তোমার পেটে দেখছি বিদ্যে ঢুকেছিল। কত বিএ পাশ ছেলেকে দেখেছি এক লাইন লিখতে বললে কলম ভেঙে ফেলে। চিঠিটা মন্দ লেখোনি। তা তুমি মাস্টারের সঙ্গে জুটলে কী করে?’
‘রতনের দোকানে আলাপ হয়েছিল।’
‘রতনটা কে?’
‘আমার সঙ্গে পড়ত। পড়া ছেড়ে স্টেশনের সামনে চায়ের দোকান করেছে। আমাদের স্টেশন থেকে কয়েকটা স্টেশন দূরে মাস্টারদার গ্রাম। কলিকাতায় কাজ না থাকলে গ্রামে চলে যেতেন। তখন মাঝে-মাঝে রতনের দোকানে আসতেন।’
‘সে তোমাকে এখানে নিয়ে এল চাকরি দেবে বলে।’
‘না। আমি ওঁকে অনুরোধ করেছিলাম।’
‘কী চাকরি দেবে বলেছে?’
‘কিছু বলেননি। চেষ্টা করে দেখবেন।’
‘হুঁ। এক কাজ করো। এই চিঠিটা তুমি মহিলা দুর্বার সমিতির অফিসে গিয়ে দিয়ে এসো। এর আগে মহিলা দুর্বার সমিতির নাম শুনেছ?’
‘আজ্ঞে না।’
শেফালি-মা হাসলেন, ‘এই পাড়াটায় কারা থাকে বুঝতে পেরেছ?’
নীরবে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
‘কাল রাত্রে যখন মাস্টারের সঙ্গে এখানে ঢুকলে তখন যাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছ তাদের কি আগে কোথাও দেখেছ?’
‘হুঁ।’
‘কোথায়?’
‘আমাদের পাশের গ্রামের মাঠে মেলা হয়। সেখানে একদিকে হোগলার ঘরে ওরা আসে। দূর থেকে দেখেছি।’
‘তোমার বয়সে ওদের কাছে না যাওয়াই ভালো। তবে একটা কথা শুনে রাখো। এইসব মেয়েরা দেহ বিক্রি করে বেঁচে থাকে। কেন দেহ বিক্রি করে? কারণ, ওদের সামনে অন্য পথ খোলা নেই। সমাজে যখন ছিল তখন ওদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে ব্যবহার করত পুরুষেরা। এখানে আসার পরেও স্বস্তি নেই। পুলিশ, মাস্তান ওদের রোজগারে ভাগ বসায়। ওরা খারাপ মেয়ে। কিন্তু ওদের রোজগারের টাকায় ভাগ নিতে লোভের সীমা নেই। কোনও-কোনও বাড়িওয়ালিও একই অত্যাচার করে। আমার এই বাড়িতে সেসব ঝামেলা নেই। কিন্তু পুলিশ বা মাস্তানদের হাত থেকে তো আমি বাঁচাতে পারি না। সেটা করতে এগিয়ে এসেছে মহিলা দুর্বার সমিতি। এটা এই মেয়েদের নিয়ে তৈরি সমিতি। সমিতি তৈরি হওয়ার পর অত্যাচার অনেক কমেছে। এই মেয়েরা সমাজের বিষ গেলে বলেই সমাজ এখনও টিকে আছে। দাঁড়াও, একটা খামে চিঠিটাকে ভরে দিই তোমাকে।’ শেফালি-মা খাট থেকে নামলেন।
গতরাত্রে এই বাড়ির দেখা চেহারাটা যেন উধাও। সেইসব রং মেখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর বদলে দু-তিনজন সাধারণ চেহারার মেয়ে চাতালে বসে গল্প করছে। ওদের পোশাক, ভঙ্গিতে একদম আটপৌরে ছাপ। চিৎকার, হাসি, গান, এখন শোনা যাচ্ছে না। নবকুমার সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতেই ওই মেয়েদের একজন মন্তব্য করল, ‘কার ঘরের নাগর? এই অসময়ে?’
সঙ্গে-সঙ্গে আর একজন বলে উঠল, ‘অ্যাই চুপ। শেফালি-মায়ের লোক।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। কাল রাতে এসেছে।’
নবকুমার বেরিয়ে এল। যে রাস্তায় কাল রাত্রে নাটক হতে দেখেছিল সেখানে সবাই চুপচাপ। কয়েকটা দোকান খোলা আছে, খদ্দের নেই। রিকশা যাচ্ছে ঠুনঠুন করে। একটা বছর তেরো-চোদ্দোর মেয়ে সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিল, নবকুমারকে দেখে হেসে চোখ মারল। নবকুমার দেখে চোখ সরিয়ে নিল।
কিন্তু মহিলা দুর্বার সমিতির অফিসটা কোথায়? শেফালি-মা যেভাবে বললেন তাতে মনে হল ওটা এই পাড়াতেই। সে একটা মুদির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে একটি মাঝবয়সি মহিলা জিনিস নিয়ে টাকা দিচ্ছে। নবকুমার দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, মহিলা দুর্বার সমিতি কোথায়?’
লোকটি নবকুমারকে দেখল, ‘তোমার কী দরকার?
‘দরকার আছে।’ নবকুমার জবাব দিল।
‘এই এক হয়েছে। ঠিকানা দেখিয়ে দিতে-দিতে—, আমি যেন পোস্ট অফিস হয়ে বসে আছি।’ লোকটি মাথা ঝাঁকাল।
মহিলা তাকাল নবকুমারের দিকে, ‘আমি ওইদিকে থাকি। এসো।’
নবকুমার অনুসরণ করল। এবার রাস্তাটা বেশ চওড়া। দু-ধারের বাড়ির দরজায় অল্পবয়সি মেয়েরা ছোট স্কার্ট পরে কায়দা করে দাঁড়িয়ে আছে। মহিলা মিনিটচারেক হাঁটার পর বলল, ‘এই রাস্তা দিয়ে খানিকটা গেলে ডানহাতে যে গলি পাবে তার শেষ দিকের বাড়ি।’
নবকুমার মাথা নাড়ল।
মহিলা চলে গেলে নবকুমার এগোল। বাড়িটার সামনে এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছিলেন। এঁর পোশাক, চেহারা একদম আলাদা। দেখেই মনে হয় বেশ শিক্ষিত। নবকুমার তাঁর সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, এটা কি মহিলা দুর্বার সমিতির বাড়ি?’
‘হ্যাঁ ভাই। কী চাই?’
‘আমি ওদের সভাপতির সঙ্গে দেখা করতে চাই!’
‘কবিতা তো এখন নেই। ও অধ্যাপক নরনারায়ণ রায়কে আনতে গিয়েছে। যে-কোনও মুহূর্তেই এসে পড়বে। অবশ্য তুমি আমাকে প্রয়োজনটা বলতে পারো।’
‘আপনি?’
‘আমি এখানে চাকরি করি।’
নবকুমার একটু ভাবল। এখানে এইরকম চেহারার মহিলা কী চাকরি করতে পারেন সে বুঝতে পারল না। এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে বলল, ‘আমি তাহলে অপেক্ষা করি। উনি এলে ওঁর সঙ্গে কথা বলব।’
‘ও। তাহলে তুমি ভেতরে গিয়ে ভিজিটার্স রুমে গিয়ে বসতে পারো।’
‘না-না। আমি এখানে ঠিক আছি।’
এই সময় সাধারণ চেহারার একটি বয়স্কা মহিলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘দিদি, আপনার ফোন এসেছে। ডাক্তারবাবু ফোন করছেন।’
‘ও। তুমি এখানে দাঁড়াও। ওরা এখনই এসে পড়বে।’ ভদ্রমহিলা ভেতরে চলে গেলেন।
মহিলা নবকুমারকে দেখলেন, ‘কী চাই?’
‘কবিতা—।’
‘ও। এখনই আসবে।’
‘আচ্ছা, উনি কে?’
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না মহিলা। একটা গাড়ি তখন গলির ভেতর ঢুকছে। মহিলা দরজার দিকে দু-পা এগিয়ে চিৎকার করল, ‘দিদি, ওরা এসে গেছে। তাড়াতাড়ি।’ বলে এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে।
গাড়ি থামলে ড্রাইভার নেমে পেছনের দরজা খুলে দিতে নবকুমার ধবধবে পাঞ্জাবি, পাজামা পরা একটি শীর্ণ চেহারার বৃদ্ধকে নামতে দেখল। ওপাশ থেকে নেমে এল শ্যামলা চেহারার খাটো এক যুবতী। এই মহিলা এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করে বলল, ‘আসুন, আসুন।’
এই সময় বাড়ির ভেতর থেকে সেই ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এসে দু-হাত জড়ো করে বললেন, ‘নমস্কার। আসুন। আমি চন্দ্রিমা দত্ত।’
বৃদ্ধ হাসলেন, ‘ডক্টর চন্দ্রিমা দত্ত?’
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘ওটা বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না। আসুন।’
বৃদ্ধ এগিয়ে যেতে-যেতে নবকুমারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়ালেন, ‘এটি কে? এলাকার ছেলে নিশ্চয়ই। এসো, তোমার সঙ্গেও গল্প করব।’
নবকুমার ঘাবড়ে গেল। ভদ্রমহিলা, যাঁর নাম চন্দ্রিমা, বললেন, ‘এসো ভাই। উনি আমাদের এখানে পায়ের ধুলো দিয়েছেন। আমাদের খুব গর্বের দিন। এসো।’
ভিজিটার্স রুমে তখন জনাদশেক মেয়ে দাঁড়িয়ে। ডক্টর নরনারায়ণ রায়কে ওদের সামনে উঁচু চেয়ারে বসানো হল। চন্দ্রিমা মেয়েদের বসতে বললেন। নবকুমার ঘরে ঢোকেনি। বাইরে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করছিল কবিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। চন্দ্রিমা তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওঁর কোনও অসুবিধে হয়নি তো?’
কবিতা বলল, ‘না। উনি তৈরি হয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন।’
চন্দ্রিমা ভেতরে যেতেই নবকুমার কবিতাকে বলল, ‘আপনার সঙ্গে কথা আছে।’
কবিতা বলল, ‘পরে শুনব। তুমি ভেতরে এসো। উনি যা জানতে চাইবেন পরিষ্কার করে বলবে। হ্যাঁ, তোমার মা কোন বাড়িতে থাকে?’
